📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 শামুয়েল আ.-এর বংশধারা

📄 শামুয়েল আ.-এর বংশধারা


শামুয়েল বা ইশমুঈল ইবনে বালী ইবনে আলকামা ইবনে ইবনে আল ইয়াহু ইবনে তাহ্ ইবনে সূফ ইবনে 'আলকামা ইবনে মাহিছ ইবনে 'আমূসা ইবনে 'আযরুবা। মুকাতিল রহ. বলেছেন, তিনি ছিলেন হারুন আ.-এর বংশধর। মুজাহিদ রহ. বলেছেন, তাঁর নাম ছিল ইশমুঈল ইবনে হালফাকা। সুদ্দী ইবনে আব্বাস, ইবনে মাসউদ রাযি. প্রমুখ সাহাবী থেকে এবং ছালাবী ও অন্যান্য ঐতিহাসিকগণ এ প্রসঙ্গে বর্ণনা করেন, গাজা ও 'আসকালান এলাকার অধিবাসী আমালিকা সম্প্রদায় বনি ইসরাঈলের উপর বিজয় লাভ করে। এরা তাদের অসংখ্য লোককে হত্যা করে এবং বিপুল সংখ্যক লোককে বন্দী করে নিয়ে যায়। তারপর লাবী বংশের মধ্যে দীর্ঘ দিন পর্যন্ত নবী প্রেরণ বন্ধ থাকে। এ সময়ে তাদের মধ্যে মাত্র একজন মহিলা গর্ভবতী ছিল।

সে আল্লাহর নিকট একজন পুত্র সন্তানের জন্য দোয়া করে। আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেন এবং একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। মহিলা তার নাম রাখেন ইশমুঈল। ইবরানী বা হিব্রু ভাষায় ইশমুঈল ইসমাঈল শব্দের সমার্থক। যার অর্থ হচ্ছে আল্লাহ আমার প্রার্থনা কবুল করেছেন। পুত্রটি বড় হলে তিনি তাঁকে মসজিদে (বায়তুল মুকাদ্দাসে) অবস্থানকারী একজন পুণ্যবান বান্দার দায়িত্বে অর্পণ করেন। উদ্দেশ্য ছিল যাতে তার পুত্র ওই পুণ্যবান বান্দার সাহচর্যে থেকে তাঁর চারিত্রিক গুণাবলী ও ইবাদত-বন্দেগী থেকে সুশিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন। ছেলেটি মসজিদেই অবস্থান করতে থাকেন।

যখন তিনি পূর্ণ যৌবন প্রাপ্ত হন তখনকার একটি ঘটনা হচ্ছে এই, একদিন রাত্রিবেলা তিনি মসজিদের এক কোণে ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ মসজিদের পার্শ্ব থেকে একটি শব্দ তাঁর কানে আসে। তখন ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে তিনি জেগে উঠেন। তাঁর ধারণা হয়, তাঁর শায়খই তাঁকে ডেকেছেন। তাই তিনি শায়খকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি আমাকে ডেকেছেন? তিনি ভয় পেতে পারেন এই আশঙ্কায় শায়খ তাঁকে সরাসরি কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি শুধু বললেন, হ্যাঁ, ঘুমিয়ে পড়। তখন তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। দ্বিতীয়বার অনুরূপ ঘটনা ঘটল। তারপর তৃতীয়বারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল। তিনি দেখতে পেলেন, স্বয়ং জিবরাইল আ.-ই তাঁকে ডাকছেন। জিবরাইল আ. তাঁকে জানালেন, আল্লাহ আপনাকে আপনার সম্প্রদায়ের প্রতি নবীরূপে প্রেরণ করেছেন।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 তাবুতে সাকীনাহ

📄 তাবুতে সাকীনাহ


বনি ইসরাঈলের এই বাদ-প্রতিবাদ এত দীর্ঘসূত্রতার রূপ ধারণ করল, তারা বলতে লাগল, যদি তালুতের নিযুক্তি আল্লাহ তাআলার তরফ থেকেই হয়ে থাকে, তবে এর জন্য আল্লাহ তাআলার কোনো নিদর্শন প্রদর্শন করুন। হযরত শামুয়েল আ. বললেন, যদি আল্লাহ তাআলার এই মীমাংসার সত্যায়নই তোমাদের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তবে প্রমাণ পূর্ণায়নের জন্য তোমাদেরকে তা জানানো হচ্ছে। তা হলো, যেই পবিত্র সিন্দুক (তাবুতে সাকীনাহ) তোমাদের হস্তচ্যুত হয়েছে এবং যাতে হযরত মূসা আ.-এর লাঠি এবং তাওরাত আর হযরত হারূন আ.-এর মুবারক বস্তুসমূহ রক্ষিত রয়েছে, তা তালূতের বদৌলতে তোমাদের নিকট ফিরে আসবে এবং আল্লাহ তাআলার হেকমতে ব্যাপারটি এরূপ হবে, তোমাদের চোখের সম্মুখেই ফেরেশতাগণ তা বহন করে নিয়ে আসবেন। এবং পুনরায় এটি তোমাদের অধিকারে চলে আসবে।

তাওরাতে 'তাবুতে সাকীনা' ফিরে আসার কাহিনীটি যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে তা হলো: শামুয়েল আ.-এর ভ্রমণবৃত্তান্তে উল্লেখ রয়েছে, যখন থেকে 'তাবুতে সাকীনা' এনে 'বাইতে দাজুনে' রাখা হয়েছে; তখন হতে ফিলিস্তিনিরা প্রত্যহ এই দৃশ্য দেখতে লাগল- যখনই তারা প্রাতঃকালে তাদের দেবতা দাজুনের ইবাদতের জন্য গমন করে, তখনই সেটাকে উপুড় হয়ে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখতে পায়। সকালবেলা যখন তারা সেটাকে পুনরায় নিজের জায়গায় দাঁড় করিয়ে দেয়, তখন পরবর্তী রাত্রি অবসানের পর পুনরায় সেটাকে সেরূপ উপুড় হয়ে পতিত থাকা অবস্থায় দেখতে পায়। আবার একটি নূতন ব্যাপার ঘটল। সেই শহরে এত অধিকসংখ্যক ইঁদুর উৎপন্ন হল, সেগুলো তাদের সর্ববিধ মালামাল বিনষ্ট ও বরবাদ করে দিল। আর এক বিশেষ রকমের গলগণ্ড রোগের মহামারী সেখানে এসে বাসা বাঁধল, যার ফলে ভীষণভাবে প্রাণহানি ঘটতে লাগল।

ফিলিস্তিনিরা যখন কোনো প্রকারেই এ সমস্ত বিপদ হতে মুক্তি পেল না, তখন চিন্তা ও গবেষণার পর বলতে লাগল, মনে হয় আমাদের উপর এ সমস্ত বিপদ শুধু এই সিন্দুকটির কারণেই ঘটছে। সুতরাং একে এই শহর হতে বের করে দাও। এই চিন্তা করে ফিলিস্তিনিরা নিজেদের বড় বড় গণক ও জ্যোতিষীদের একত্র করে তাদের নিকট সমুদয় ঘটনা ব্যক্ত করে প্রতিকার দাবি করল। গণক ও জ্যোতিষীরা বলল, এর একমাত্র প্রতিকার- যথাসম্ভব সত্বর এই সিন্দুকটি এখান হতে বের করে দাও। আর বের করে দেওয়ার অবস্থা হবে, স্বর্ণ দ্বারা সাতটি ইঁদুর নির্মাণ করা হোক এবং সাতটি প্রতীকি গলগণ্ড ব্যাধিও। এরপর ঐগুলিকে সিন্দুকটিসহ একটা গরুর গাড়ির উপর উঠিয়ে দেওয়া হবে এবং গাড়িটিতে দুইটি দুগ্ধবতী গাভী জুড়ে দেওয়া হবে। এরপর তাদেরকে বস্তির বাইরে সড়কের উপর নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হবে। যেন গাড়ির মুখ যেদিকে থাকে, গাভিগুলি সিন্দুকটিকে সেই দিকেই নিয়ে যায়।” ফিলিস্তিনিরা তা-ই করল। আল্লাহ পাকের কুদরত! সেই গাভীগুলি নিজে নিজেই গাড়িটিকে সেই দিকেই নিয়ে চলল, যেদিকে বনি ইসরাঈলদের বস্তি ছিল। চলতে চলতে অবশেষে এমন একটি ক্ষেতে গিয়ে পৌঁছল, যেখানে ইসরাঈলরা তাদের ক্ষেতের শস্য কাঁটছিল। ইসরাঈলীরা সিন্দুকটি দেখে খুশি ও আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল এবং তৎক্ষণাৎ দৌড়িয়ে 'বাইতে শামস' শহরে গিয়ে সংবাদ দিল। এরপর বাইতে ইয়ারীমের ইহুদিরা এসে সিন্দুকটিকে অতিশয় সম্মান ও তাযীমের সাথে নিয়ে গিয়ে টিলার উপরে অবস্থিত ইন্দাবের ঘরে হেফাযতের সাথে রেখে দিল। ফেরেশতারা সিন্দুকটি কিভাবে এনেছিলেন, তা আল্লাহই ভালো জানেন।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 তালুত ও জালূতের যুদ্ধ এবং বনি ইসরাইলের পরীক্ষা

📄 তালুত ও জালূতের যুদ্ধ এবং বনি ইসরাইলের পরীক্ষা


এ সমস্ত বাদ-প্রতিবাদের পর বনি ইসরাঈলদের আর অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করার জো রইল না। হযরত শামুয়েল আ.-এর এলহামী মীমাংসার ওপরই তালুতকে বনি ইসরাঈলদের বাদশা করে দেওয়া হল। এখন তালুত বনি ইসরাঈলদের প্রতি সাধারণ ঘোষণা প্রদান করলেন, তারা যেন সকলেই ফিলিস্তিনি শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য বের হয়ে পড়ে। বনি ইসরাঈলরা যখন তালুতের নেতৃত্বে যুদ্ধের ময়দানের দিকে যাত্রা করল, তখন বনি ইসরাঈলের পরীক্ষার জন্য আরও একটি ক্ষেত্র সম্মুখে আসল। তা এই, তালুত চিন্তা করলেন, যুদ্ধের ব্যাপারটি নিতান্তই সঙ্গিন ব্যাপার এবং এতে কোনো কোনো সময় একজন লোকের কাপুরুষতা এবং কপটতাপূর্ণ আচরণ পূর্ণ সেনাবাহিনীকেই ধ্বংস করে দেয়। সুতরাং যুদ্ধে প্রবৃত্ত হওয়ার পূর্বে বনি ইসরাঈলদেরকে পরীক্ষা করে নেওয়া একান্ত আবশ্যক, কার মধ্যে আদেশ পালন, সংযম, সততা ও এখলাছ আছে; আর কার মধ্যে নেই এবং তাদের কে দুর্বল ও কাপুরুষ, যাতে যুদ্ধের কর্তব্য সমাধা করার পূর্বেই ওই সমস্ত লোককে দল হতে পৃথক করে দেওয়া যায়।

অনন্তর যখন এই দল একটি নদীর তীরে পৌঁছিল, তখন তালুত ঘোষণা করলেন, আল্লাহ পাক এই নদীটি দ্বারা তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে চান। তা হলো- কেউই এই নদী থেকে তৃপ্তির সঙ্গে পানি পান করবে না। যে ব্যক্তি এর অন্যথায় করবে, তাকে আল্লাহ তাআলার দল হতে বের করে দেওয়া হবে। আর যে ব্যক্তি আদেশ পালন করবে সে আল্লাহর দলেরই অন্তর্ভুক্ত থাকবে। অবশ্য কঠিন পিপাসায় এক অঞ্জলি পানি পান দ্বারা গলা ভিজিয়ে নেওয়ার জন্য অনুমতি রয়েছে। ফলে মুজাহিদীনের দল সম্মুখের দিকে অগ্রসর হল এবং সৈন্যদের সম্মুখে সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান হল। শত্রুপক্ষীয় মুজাহিদরা আল্লাহ পাকের দরবারে অকপট মনে বিনয় ও কান্নাকাটির সঙ্গে দোয়া করল- “আল্লাহ! শত্রুদেরকে পরাজিত করে দিন এবং আমাদেরকে (জিহাদে) দৃঢ়পদ রাখুন এবং স্বীয় সাহায্যে ও বিজয়ে আমাদেরকে সফলকাম করুন।"

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 হযরত দাউদ আ.-এর বীরত্ব

📄 হযরত দাউদ আ.-এর বীরত্ব


বনি ইসরাঈলীদের এই সেনাবাহিনীতে জনৈক যুবকও ছিল। যিনি বাহ্যিক দৃষ্টিতে কোনো বৈশিষ্ট্যধারী ছিলেন না। সাহাসিকতা ও বীরত্বেও কোনো বিশেষ খ্যাতিসম্পন্ন ছিলেন না। এ যুবকের নাম হযরত দাউদ। কথিত আছে, তিনি তাঁর পিতার সর্বকনিষ্ঠ পুত্র ছিলেন এবং যুদ্ধে যোগদানের ইচ্ছায়ও আসেন নি। বরং বৃদ্ধ পিতার তরফ হতে নিজের ভাইদের এবং অন্যান্য ইসরাঈলীদের অবস্থাবলী অনুসন্ধানের জন্য সেনাবাহিনীর সঙ্গে প্রেরিত হয়েছিলেন। কিন্তু যখন তিনি জালূতের বীরত্বসূচক প্রতিদ্বন্দ্বী আহবান এবং ইসরাঈলীদের উক্ত আহবানে সাড়া প্রদানে ইতস্ততভাব দর্শন করলেন, তখন তিনি আর নীরব থাকতে পারলেন না। তালুতের নিকট অনুমতি চাইলেন, জালূতের প্রতিদ্বন্দ্বী আহবানে জবাব প্রদানের সুযোগ তাঁকে প্রদান করা হোক। তালূত বললেন, তুমি এখনও অনভিজ্ঞ বালক, সুতরাং তুমি জালূতের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে না। কিন্তু দাউদ আ.-এর আবদার বৃদ্ধিই পেতে থাকল। অবশেষে তালূতকে অনুমতি দিতেই হল।

দাউদ আ. সামনে অগ্রসর হলেন এবং জালূতকে হুঙ্কারের সাথে আহবান করলেন। জালূত একজন তরুণ যুবককে প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে সম্মুখে দেখে তাকে তুচ্ছ মনে করে তাঁর দিকে তেমন মনোযোগ দিল না। কিন্তু যখন উভয়ের মধ্যে যুদ্ধ আরম্ভ হয়ে গেল, তখন দাউদের প্রবল সাহসিকতা ও বীরত্বের অনুমান করতে পারল। দাউদ আ. যুদ্ধ করতে করতে নিজের গুলেল বের করে নিলেন এবং লক্ষ্যস্থির করে জালূতের মস্তকে উপযুপরি তিনটি প্রস্তরখণ্ড নিক্ষেপ করলেন এবং জালূতের মস্তককে খণ্ড-বিখণ্ড করে ফেললেন। এরপর অগ্রসর হয়ে তার গর্দান কেটে নিয়ে আসলেন। জালুত নিহত হওয়ার সাথে সাথেই যুদ্ধের পট পরিবর্তিত হয়ে গেল এবং বনি ইসরাঈলদের পরাজয়মুখী যুদ্ধ আক্রমণাত্মক রূপ ধারণ করল এবং শয়তানী শক্তির পরাজয় ঘটল। বনি ইসরাঈল কৃতকার্য ও সফলকাম হয়ে প্রত্যাবর্তন করল। এই ঘটনাটি শত্রু ও মিত্র উভয় পক্ষের অন্তরে হযরত দাউদ আ.-এর বীরত্বের মোহরাঙ্কিত করে দিল এবং তিনি সকলের নিকট অত্যন্ত প্রিয় হয়ে উঠলেন। তাঁর ব্যক্তিত্ব সকলের দৃষ্টিতে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ও দৃষ্ট হতে লাগল।

ফন্ট সাইজ
15px
17px