📄 কোরআন মাজিদে হিযকিল আ.
কুরআন মাজিদে হিযকিল নামে কোনো নবীর উল্লেখ নেই। কিন্তু সূরা বাকারায় বর্ণিত একটি ঘটনা সম্বন্ধে প্রাচীনকালের ওলামায়ে কেরাম হতে যে সমস্ত রেওয়ায়েত নকল করা হয়েছে, তা হতে জানা যায়, সেই ঘটনাটি হযরত হিযকীল আ.-এর সাথে সংশ্লিষ্ট। তাফসিরের কিতাবসমূহে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস এবং অন্যান্য কতিপয় সাহাবায়ে কেরাম থেকে বর্ণিত আছে, বনি ইসরাঈলদের একটি বিরাট দলকে তাদের বাদশা কিংবা পয়গম্বর হিযকীল আ. যখন বললেন: অমুক শত্রুর সাথে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত হও, আল্লাহ তাআলার বাণীকে উন্নত করার কর্তব্য পালন কর, তখন তারা প্রাণের ভয়ে পলায়ন করল এবং এত দূরে চলে গেল, তাদের মনে বিশ্বাস জন্মাল, এখন আমরা জিহাদ হতে আত্মরক্ষা করে মৃত্যুর হাত হতে সুরক্ষিত হয়ে গেছি। এরপর সেই দূরবর্তী এলাকায় এক উপত্যকায় বসবাস করতে লাগল। এখন হয়ত তাদের এই পলায়নকার্যকে আল্লাহ তাআলার আদেশ অমান্য করা কিংবা অদৃষ্টের ফয়সালা হতে বিমুখ হওয়া মনে করে পয়গম্বর আ. অসন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহ পাকের দরবারে তাদের জন্য বদদুআ করলেন কিংবা স্বয়ং আল্লাহ তাআলাই তাদের এ কার্যকলাপের প্রতি বিরাট অসন্তুষ্ট হলেন। মোটকথা, আল্লাহ তাআলার গযব নাযিল হয়ে তাদের ইহলীলা সাঙ্গ করে দিল। এক সপ্তাহ পরে হিযকীল আ. তাদের নিকট গমন করে তাদের এ অবস্থা দর্শন করে আফসোস করলেন এবং দুআ করলেন, ইয়া আল্লাহ! এদেরকে মৃত্যুর আযাব হতে মুক্তি দান করুন! যেন তাদের জীবন প্রাপ্তি স্বয়ং তাদের জন্য এবং অন্যান্য মানুষের জন্য দৃষ্টান্তমূলক উপদেশ হয়। পয়গম্বরের দুআ কবুল হল। তারা সকলে জীবনপ্রাপ্ত হয়ে উপদেশমূলক দৃষ্টান্ত হল।
তাফসিরে ইবনে কাসিরে বর্ণিত আছে, এ ইসরাঈলী দলটি 'দাদারওয়ান' নামক স্থানের অধিবাসী ছিল। এরা পলায়ন করে 'উনীহ' পার্বত্য এলাকার উপত্যকা ভূমিতে চলে গিয়েছিল। তথায় তাদের উপর মৃত্যুর আযাব নাযিল হয়েছিল। যেমন কুরআন মাজিদে এ সম্পর্কে ইরশাদ হচ্ছে: "তুমি কি তাদেরকে দেখ নি যারা মৃত্যুভয়ে হাজারে-হাজারে তাদের আবাসভূমি ত্যাগ করেছিল? তারপর আল্লাহ তাদেরকে বলেছিলেন, "তোমাদের মৃত্যু হোক!" তারপর আল্লাহ তাদেরকে জীবিত করেছিলেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের প্রতি অনুগ্রহশীল; কিন্তু অধিকাংশ লোক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।" (সূরা বাকারা: ২৪৩)
মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ সূত্রে বর্ণনা করেছেন: ইউশার মৃত্যুর পর কালিব ইবনে ইউহান্না বনি ইসরাঈলের নেতা হন। তাঁর ইনতেকালের পর হিযকীল ইবনে ইউযী বনি ইসরাঈলে পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এ হিযকীল ইবনুল আজুয তথা বৃদ্ধার পুত্র হিসেবে পরিচিত। যার দুআয় আল্লাহ সে-সব মৃতলোকদেরকে জীবিত করে দিয়েছিলেন, যাদের ঘটনা পূর্বোক্ত আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে। ইবনে ইসহাক বলেন, এসব লোক মহামারীর ভয়ে ঘর-বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায় এবং এক প্রান্তরে উপনীত হয়। আল্লাহ বললেন, তোমাদের মৃত্যু হোক! ফলে তারা সকলেই তথায় মারা যায়। অবশ্য তাদের লাশগুলো হিংস্র জন্তুর কবল থেকে রক্ষা করার জন্য বেষ্টনীর ব্যবস্থা করা হয়। এভাবে সুদীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হয়। একবার হযরত হিযকীল তাদের নিকট দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তিনি থমকে দাঁড়ান ও চিন্তা করতে থাকেন। এ সময় একটি গায়েবী আওয়াজের মাধ্যমে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, আল্লাহ এ মৃত লোকগুলোকে তোমার সম্মুখে জীবিত করে দেন, তা কি তুমি চাও? হিযকীল বললেন, জ্বী! এরপর তাঁকে বলা হল, তুমি হাড়গুলোকে আদেশ কর, যাতে সেগুলো গোশত দ্বারা আবৃত হয় এবং শিরাগুলো যেন পরস্পর সংযুক্ত হয়ে যায়। আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী হিযকীল হাড়গুলোকে সে আহবান করার সাথে সাথে লাশগুলো সবই জীবিত হয়ে গেল এবং সমস্বরে তাকবির ধ্বনি উচ্চারণ করল।
আসবাত ঐতিহাসিক সুদ্দী থেকে বিভিন্ন সূত্রে ইবনে আব্বাস, ইবনে মাসউদ রাযি. প্রমুখ সাহাবীর উদ্ধৃতি দিয়ে উপযুক্ত ... المْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ خَرَجُوا আয়াতে উল্লিখিত ঘটনা সম্পর্কে লিখেছেন: ওয়াসিত এর নিকটে অবস্থিত একটি জনপদের নাম ছিল দাওয়ার-দান। এ জনপদে একবার ভয়াবহ মহামারী দেখা দিল। এতে সেখানকার অধিকাংশ লোক ভয়ে পালিয়ে গিয়ে পার্শ্ববর্তী এক এলাকায় অবস্থান করল। জনপদে যারা থেকে গিয়েছিল তাদের কিছু সংখ্যক মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়; কিন্তু বেশির ভাগ লোকই বেঁচে যায়। মহামারী চলে যাওয়ার পর পালিয়ে যাওয়া লোকজন জনপদে ফিরে আসে। জনপদে থেকে যাওয়া লোকদের মধ্যে যারা বেঁচেছিল- তারা পরস্পর বলাবলি করল, আমাদের যেসব ভাইয়েরা এলাকা ত্যাগ করে চলে গিয়েছিল, তারাই বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে। তাদের মতো যদি আমরাও চলে যেতাম, তবে সবাই বেঁচে থাকতাম। পুনরায় যদি এ রকম মহামারী আসে, তবে আমরাও তাদের সাথে চলে যাব। পরবর্তী বছর আবার মহামারী ছড়িয়ে পড়ে। এবার জনপদ শূন্য করে সবাই বেরিয়ে গেল এবং পূর্বের স্থানে গিয়ে অবস্থান নিল। সংখ্যায় এরা ছিল তেত্রিশ হাজার বা তার চাইতে কিছু বেশি। যে স্থানে তারা সমবেত হয়, সে স্থানটি ছিল একটি প্রশস্ত উপত্যকা। তখন একজন ফিরিশতা উপত্যকাটির নিচের দিক থেকে এবং আর একজন ফিরিশতা উপত্যকাটির উপর দিক থেকে আওয়াজ দিয়ে বললেন, "তোমাদের মৃত্যু হোক!" এতে যে সমস্ত লোক মারা গেল, তাদের মৃতদেহগুলো সেখানে পড়ে থাকল।
একবার নবী হিযকীল আ. সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ দৃশ্য দেখে তিনি বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। গভীরভাবে চিন্তা করতে লাগলেন এবং আপন মুখের চোয়াল ও হাতের আঙ্গুল মোচড়াতে থাকলেন। এ অবস্থায় আল্লাহ তাঁর নিকট ওহি পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হিযকীল! তুমি কি দেখতে চাও, আমি কিভাবে এদেরকে পুনরায় জীবিত করি? হিযকীল আ. বললেন, জ্বী! আমি তা দেখতে চাই। বস্তুত তিনি এখানে দাঁড়িয়ে এ বিষয়েই চিন্তামগ্ন ছিলেন এবং অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁকে বলা হল, তুমি আহবান কর! তিনি আহবান করলেন, হে অস্থিসমূহ! আল্লাহ তোমাদেরকে একত্র হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। দেখা গেল, যার যার অস্থি উড়ে উড়ে এসে পরস্পর সংযুক্ত হয়ে কঙ্কালে পরিণত হয়েছে। তাঁকে পুনরায় বলা হল, আহবান কর! তিনি আহবান করলেন, "হে অস্থিসমূহ! আল্লাহ তোমাদের কঙ্কালগুলো গোশত ইত্যাদি দ্বারা আবৃত করার নির্দেশ দিয়েছেন।” দেখা গেল, কঙ্কালগুলো মাংস দ্বারা আবৃত হয়ে তাতে শিরা-উপশিরা চালু হয়ে গিয়েছে এবং যে কাপড় পরিহিত অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়েছিল, সে কাপড়গুলোই তাদের দেহে শোভা পাচ্ছে। এরপর হিযকীলকে বলা হল, আহবান কর! তিনি আহবান করলেন, “হে দেহসমূহ! আল্লাহর হুকুমে দাঁড়িয়ে যাও!” সাথে সাথে সবাই দাঁড়িয়ে গেল। আসবাত বলেন, মনসুর মুজাহিদ সূত্রে বর্ণনা করেছেন, লোকগুলো জীবিত হয়ে এ দুআটি পাঠ করে: "হে আল্লাহ! আপনি অতি পবিত্র-মহান, যাবতীয় প্রশংসা আপনার, আপনি ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই"। এরপর তারা জনপদে আপন সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে যায়। জনপদের অধিবাসীরা দেখেই তাদেরকে চিনতে পারল, এরাই ঐসব লোক, যারা আকস্মিকভাবে মৃত্যু মুখে পতিত হয়েছিল। তবে যে কাপড়ই তারা পরিধান করতেন, তাই পুরনো হয়ে যেত। এরপর এ অবস্থায়ই নির্ধারিত সময়ে তাদের সকলের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়।
এদের সংখ্যা সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত পাওয়া যায়। ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে এদের সংখ্যা চার হাজার, আট হাজার, অপর এক বর্ণনা মতে চল্লিশ হাজার বর্ণিত আছে। তারা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী একটি জাতি। অধিকাংশ আলেমের মতে এটা ছিল একটি বাস্তব ঘটনা। ইমাম আহমদ, বুখারী ও মুসলিম রহ. হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, একবার ওমর ইবনে খাত্তাব রাযি. সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন। 'সারাগ' নামক স্থানে পৌঁছুলে আবু ওবায়দা ইবনে জাররাহ রাযি. ও তাঁর সঙ্গী সেনাধ্যক্ষগণ তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে জানান, সিরিয়ায় বর্তমানে মহামারীর প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এ সংবাদ শুনে সম্মুখে অগ্রসর হবেন কি-না, সে বিষয়ে পরামর্শের জন্যে তিনি মুহাজির ও আনসারদের সাথে বৈঠকে বসেন। আলোচনায় তাদের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দেয়। এমন সময় আবদুর রহমান ইবনে আউফ রাযি. এসে তথায় উপস্থিত হন। তাঁর কোনো এক প্রয়োজনে তিনি প্রথমে পরামর্শ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন না। তিনি বললেন, এ ব্যাপারে আমার একটা হাদিস জানা আছে। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি : যদি কোনো এলাকায় মহামারী দেখা দেয়, আর পূর্ব থেকেই তোমরা সেখানে অবস্থানরত থাক, তা হলে মহামারীর ভয়ে পালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সে এলাকা ত্যাগ করো না। আর যদি কোনো অঞ্চলে মহামারী ছড়িয়ে পড়ার সংবাদ পাও এবং তোমরা সে অঞ্চলের বাইরে থাক, তবে সে দিকে অগ্রসর হয়ো না। হাদিসটি শোনার পর হযরত ওমর রাযি. আল্লাহর শোকর আদায় করেন এবং মদীনায় ফিরে আসেন। বস্তুত এই মহামারী দ্বারা পূর্ববর্তী যুগের উম্মতদেরকে শাস্তি দেওয়া হত।
মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক রহ. বলেন, হিযকীল আ. বনি-ইসরাঈলের মধ্যে কত কাল অবস্থান করেছিলেন, সে সম্বন্ধে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। একসময়ে আল্লাহ তাঁকে তাঁর নিকট উঠিয়ে নেন। হিযকীলের মৃত্যুর পর বনি-ইসরাঈলরা আল্লাহকে প্রদত্ত অঙ্গীকারের কথা বেমালুম ভুলে যায়। ফলে তাদের মধ্যে ব্যাপকভাবে বেদায়াতের প্রসার ঘটে। তারা মূর্তিপূজা আরম্ভ করে। তাদের এক উপাস্য বেদ-মূর্তির নাম ছিল বাআল (بعل) অবশেষে আল্লাহ তাদের প্রতি একজন নবী প্রেরণ করেন। তাঁর নাম ইলিয়াস ইবনে ইয়াসীন ইবনে ফিনহাস ইবনে ঈযার ইবনে হারুন ইবনে ইমরান। সামনে তাঁর জীবনী আলোচনা করা হবে।