📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 বংশ পরিচয়

📄 বংশ পরিচয়


হযরত ইউশা আ. বনি ইসরাঈলদের বারো গোত্রের মধ্যে হযরত ইউসুফ আ.-এর গোত্রের সাথে সম্পর্কিত ছিলেন। ঐতিহাসিকগণ তাঁর বংশ-পরম্পরা বর্ণনা করেছেন: ইউশা ইবনে নূন ইবনে ফারাহীম ইবনে ইউসুফ আ. ইবনে ইয়াকুব আ. ইবনে ইসহাক আ. ইবনে ইবরাহীম আ.। কিতাবীরা বলেন, ইউশা হলেন হুদ আ.-এর চাচাতো ভাই। আল্লাহ তাআলা কুরআন শরীফে খিযির আ.-এর ঘটনা প্রসঙ্গে ইউশা আ.-এর নাম উল্লেখ না করে তাঁর বর্ণনা দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন: 'স্মরণ কর, যখন মূসা তার খাদেমকে বলেছিল। বুখারী শরীফেও উবাই ইবনে কাব রাযি. থেকে নাম ধরে তাঁর বর্ণনা এসেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তিনি হলেন ইউশা ইবনে নূন আ.।

আল্লাহর পাকের মহিমার একটি বিচিত্র প্রদর্শনী! হযরত ইউসুফ আ.-এর বদৌলতে কেনানের ৭০ জন লোকের একটি খান্দান মান-মর্যাদা ও প্রতাপের সাথে কেনান থেকে হিজরত করে মিসরে এসে বসতি স্থাপন করেছিল। আজ তারই প্রপৌত্র ইউশা আ.-এর নেতৃত্বে সেই খান্দানই সংখ্যায় লাখ লাখ জনে পরিণত হয়ে পুনরায় নিজেদের পূর্বপুরুষদের জন্মভূমি কেনানে সেই মান-মর্যাদা এবং প্রতাপ ও প্রতিপত্তির সাথে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। এর বিস্তারিত বিবরণ হচ্ছে: চল্লিশ বছর গত হওয়ার পর আল্লাহ তাআলা হযরত ইউশা আ.-কে আদেশ করলেন, তুমি বনি ইসরাঈলদের এই দলটিকে নিয়ে প্রতিশ্রুত ভূমির দিকে অগ্রসর হও এবং তথায় আমালেকা ও অন্যান্য অত্যাচারী সম্প্রদায়গুলির সাথে যুদ্ধ করে তাদেরকে পরাজিত কর, আমার সাহায্য তোমাদের সঙ্গে রয়েছে।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 নবুয়ত লাভ ও বনি ইসরাঈলের দায়িত্ব গ্রহণ

📄 নবুয়ত লাভ ও বনি ইসরাঈলের দায়িত্ব গ্রহণ


হযরত ইউশা ইবনে নূন আ.-এর নবুয়ত প্রাপ্তির বিষয়ে আহলে কিতাবরা একমত। তাদের একটি দল যারা সামিরাহ বলে বিখ্যাত, তারা মূসা আ.-এর পর ইউশা ইবনে নূন আ. ব্যতীত কারো নবুয়ত স্বীকার করে না। তাওরাতে ইউশা আ.-এর নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই তারা ইউশা আ. ব্যতীত অন্যের নবুয়তকে অস্বীকার করে। অথচ অন্যদের নবুয়ত প্রতিপালকের তরফ থেকে সত্য ও যথার্থ। তাদের উপর কিয়ামত পর্যস্ত আল্লাহ তাআলার লানত বর্ষিত হতে থাকবে।

তাওরাতে উল্লেখ আছে "আল্লাহ তাআলার বিশিষ্ট বান্দা হযরত মূসা আ.-এর ওফাত প্রাপ্তির পরে তাঁর খাদেম ইউশা ইবনে নূনকে আল্লাহ তাআলা বললেন, আমার বান্দা মূসার মৃত্যু হয়েছে। এখন তুমি উঠ এবং তোমাদের সমস্ত লোকদেরকে সঙ্গে নিয়ে সেই জর্দান নদীর তীরবর্তী সেই দেশে যাও, যা আমি তাদেরকে অর্থাৎ বনি ইসরাঈলদেরকে দান করেছি। যেই যেই স্থান তোমাদের পদতলে পতিত হবে, সেই স্থানগুলি আমি তোমাদেরকে দান করলাম, যেমন আমি মূসাকেও একথা বলেছিলাম। মরুপ্রান্তর বা অরণ্যভূমি এবং লেবানন হতে আরম্ভ করে বড় ফোরাত নদী পর্যন্ত হিত্তীদের সমগ্র দেশ এবং পশ্চিমদিকে বড় সমুদ্র পর্যন্ত তোমাদের সীমা হবে। তোমার জীবিতকাল পর্যন্ত তোমার সম্মুখে কেউই দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না। আমি মূসার সঙ্গে যেরূপ ছিলাম, তোমার সঙ্গেও তদ্রুপ থাকব। আমি তোমার থেকে হাতও উঠাব না এবং তোমাকে ত্যাগও করব না।"

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ

📄 পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ


হযরত ইউশা আ. বনি ইসরাঈলকে আল্লাহ তাআলার পয়গাম শুনিয়ে দিলেন। তারা সকলে সানা প্রান্তর থেকে বের হয়ে কেনান ভূমির সর্বপ্রথম শহর ইয়ারীছ বা আরীহার দিকে অগ্রসর হয়ে শত্রুপক্ষকে যুদ্ধে আহবান করল। শত্রুরাও বের হয়ে ভীষণভাবে মোকাবিলা করল, পরিশেষে পরাজিত হয়ে সেখানেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হল। আর বনি ইসরাঈলগণ যুদ্ধ করতে করতে সমগ্র 'পবিত্র ভূমি অধিকার করে নিল। আর অত্যাচারী মুশরিকদের হতে উক্ত ভূমিকে পবিত্র করে পুনরায় নিজেদের পূর্বপুরুষদের জন্মভূমির মালিক হয়ে গেল।

তাওরাতে বর্ণিত আছে: যখন বনি ইসরাঈলরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হল, তখন আল্লাহ তাআলার আআদেশে প্রতিশ্রুত 'তাবুতে সাকীনা' নামক সিন্দুকটি অদৃশ্য জগৎ হতে আবির্ভূত হয়ে তাদের সঙ্গী হল। তাতে ছিল মূসা আ.-এর লাঠি, হারুন আ.-এর পিরহান, 'মান্না'র পাত্র। এতদ্ব্যতীত্য অন্যান্য মুবারক দ্রব্যাদিও ছিল।

আল্লামা ইবনে আসীর রহ. বলেন, হযরত মূসা আ. জীবিতকালেই পবিত্র ভূমিতে অত্যাচারী মুশরিক কওমগুলির সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য হযরত ইউশা আ.-কে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করেছিলেন এবং বনি ইসরাঈলদেরকে গোত্রে গোত্রে বিভক্ত করে প্রত্যেক গোত্রের সেনাপতির নাম ঘোষণা করে দিয়েছিলেন। সুতরাং হযরত ইউশা আ.-এর এ ব্যাপারটি হুবহু হযরত উসামা রাযি.-এর ব্যাপারে অনুরূপ ছিল। কারণ, সেনাবাহিনী যাত্রা করার পূর্বেই হযরত মূসা আ.-এর ওফাত হয়ে গেল। আর এখন আল্লাহ তাআলা হযরত ইউশা আ.-কে নবুয়তের সম্মানেও ভূষিত করলেন এবং তাঁরই হাতে অবশেষে পবিত্র ভূমি অত্যাচারী মুশরিক শক্তিগুলি হতে পবিত্র হয়ে গেল। আরীহার সাফল্য সমগ্র পবিত্র ভূমির বিজিত ও অধিকৃত হওয়ার সূচনা বলে সাব্যস্ত হল।

হযরত ইউশা আ. সর্বপ্রথম কোন শহরটি অধিকার করেছেন, কুরআন মাজিদ এর নাম উল্লেখ করে নি। বরং 'জনপদ' বলে অস্পষ্ট রেখে দিয়েছে। হাফেয ইমাদুদ্দীন ইবনে কাসীর বলেন: প্রবল মত হল, এটা বাইতুল মুকাদ্দাসে (জেরুজালেম)। 'আরীহা' বলা ঠিক নয়। কিন্তু বনি ইসরাঈলরা সর্বপ্রথম আরীহাতে আমালেকা সম্প্রদায়কে পরাজিত করেছেন। এরপর কেনান ভূমি জয় করতে করতে ফিলিস্তিন ভূমিতে গিয়ে পৌঁছলেন এবং বাইতুল মুকাদ্দাসও জয় করলেন।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 বনি ইসরাইলের না-শোকরি

📄 বনি ইসরাইলের না-শোকরি


কুরআন মাজিদে উল্লেখ আছে, যখন আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাঈলকে সফলকাম করে দিলেন এবং শহরে তাদের বিজয়সূচক প্রবেশ হতে লাগল, তখন তিনি আদেশ করলেন, গর্বিত এবং অহংকৃত লোকদের মতো প্রবেশ করো না। বরং আল্লাহর শোকরগুযার বান্দাদের মতো আল্লাহ পাকের দরবারে বিনয়ের সাথে অবনমিত হয়ে এবং তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করতে করতে প্রবেশ করো! কিন্তু বিজয় লাভের পর বনি ইসরাঈলদের জাতিগত স্বভাব মাথা-চাড়া দিয়ে উঠল এবং আল্লাহ পাকের আদেশের বিরোধিতা করে অহংকারী ও অবাধ্য মানুষের মতো শহরে প্রবেশ করল। তারা সদর্পে পদক্ষেপ করতে করতে মাথা উঁচু করে বুক ফুলিয়ে চলছিল। আর ক্ষমা প্রার্থনা ও বিনয়ের পরিবর্তে ধৃষ্টতামূলক শব্দ উচ্চারণ করতে করতে যেন আল্লাহ পাকের আদেশের সাথে বিদ্রুপ প্রকাশ করতে করতে প্রবেশ করছিল। অবশেষে আল্লাহ তাআলার ক্রোধ উথলে উঠল এবং আল্লাহ তাআলার কর্মফল নীতি আযাবের আকারে এসে তাদেরকে পাকড়াও করল। যেমন এ সম্পর্কে সূরা বাকারায় ইরশাদ হচ্ছে: وَإِذْ قُلْنَا ادْخُلُوا هَذِهِ الْقَرْيَةَ فَكُلُوا مِنْهَا حَيْثُ شِئْتُمْ রগাদান ওয়া আদখুলুল বাবা সুজ্জাদান। অনন্তর সেই জালিমরা, ওই বাক্যটিকে, যা তাদেরকে উচ্চারণ করতে বলা হয়েছিল, অন্য একটি (মনগড়া) উক্তিতে পরিবর্তিত করে দিয়েছিল। কাজেই আমি সেই জালিমদের উপর তাদের নাফরমানীর কারণে আসমান হতে কঠিন আযাব প্রেরণ করলাম।

সুরা আরাফেও আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: وَإِذْ قِيلَ لَهُمُ اسْكُنُوا هَذِهِ الْقَرْيَةَ... এরপর সেই যালিমরা উক্ত বাক্যটিকে, যা তাদেরকে উচ্চারণ করতে বলা হয়েছিল, তা অন্য এক (মনগড়া) উক্তিতে পরিবর্তিত করে দিল। সুতরাং আমি তাদের উপর আসমান হতে আযাব নাযিল করে দিল তাদের যালিম হওয়ার কারণে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px