📄 হযরত মূসা আ.-এর প্রতিনিধিত্ব
হযরত মূসা আ.-এর জীবনীতে হযরত হারুন আ.-এর পরেই তাওরাতে ইউশা আ.-এর উল্লেখ অধিক পরিমাণে এসেছে। তিনি হযরত মূসা আ.-এর জীবৎকালে তাঁর খাদেম ছিলেন। হযরত হারূন ও হযরত মূসা-এর ইন্তেকালের পরে তাঁদের খলিফা এবং নবুয়তের স্থলবর্তী হলেন। কেনানে অত্যাচারী মুশরিক (অংশীবাদী) কওমগুলির অবস্থাবলী জানার জন্য যেই প্রতিনিধিদল গমন করেছিল, তন্মধ্যে তিনিও একজন ছিলেন। হযরত মূসা আ. যখন বনি ইসরাঈলকে সেই কওমগুলোর সঙ্গে জিহাদের আহবান ও উৎসাহ প্রদান করলেন, কিন্তু তারা অস্বীকার করল, তখন ওনিই প্রথম ব্যক্তি ছিলেন যিনি বনি ইসরাঈলকে হিম্মত ও সাহস প্রদানের চেষ্টা করেছিলেন এবং আল্লাহ তাআলার সাহায্যের ওয়াদা স্মরণ করে দিয়ে জিহাদের প্রতি অনুপ্রাণিত করে বলেছিলেন, (যদি তোমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও, তবে তোমাদের বিজয় সুনিশ্চিত।"
তাওরাতে আরো উল্লেখ আছে, হযরত মূসা আ.-এর জীবৎকালেই আল্লাহ তাআলা তাঁকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, 'ইউশা' আমার বিশিষ্ট বান্দা। বনি ইসরাঈল বংশের যুবকেরা তারই নেতৃত্বে কেনান ভূমি ও বাইতুল মুকাদ্দাসকে অত্যাচারী (যালিম) মুশরিকগণ হতে পবিত্র করবে। "আল্লাহ তাআলা মূসা আ.-কে বললেন, নূনের পুত্র ইউশাকে নিয়ে তাঁর উপর নিজের হাত (অধিকার) রাখ। কেননা এ ব্যক্তির মধ্যে প্রাণ আছে। আর তাকে জ্যোতিষী ইয়াযার এবং সমগ্র দলের সম্মুখে দাঁড় করিয়ে তাদের চোখের সম্মুখে ইউশাকে অসিয়ত কর এবং তোমার নিজের ও প্রতিপত্তির অংশ তাকে দান কর, যেন বনি ইসরাঈলদের পূর্ণ দলটি তাঁর আদেশানুবর্তী থাকে। আর নূনের পুত্র ইউশা জ্ঞানে পরিপূর্ণ ছিল। কেননা মূসা আ. তার ওপর আপন হাত রাখতেন। বনি ইসরাঈল তাঁর অনুসরণ করতে থাকল।
মোটকথা, হযরত মূসা আ.-এর পরে তাঁরই নেতৃত্বে চল্লিশ বছর পরে বনি ইসরাঈল পবিত্র ভূমিতে (বায়তুল মুকাদ্দাসে) আগমন করল। তারা কেনান, শাম ও পূর্ব-জর্দান হতে সমস্ত অত্যাচারী ও যালিম শক্তিগুলিকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলল।
📄 কুরআনে হযরত ইউশা আ.-এর আলোচনা
কুরআন মাজিদে হযরত ইউশা আ.-এর নাম উল্লেখ করা হয় নি। অবশ্য সূরা কাহাফের দুই জায়গায় হযরত মূসা আ.-এর সফর সাথী এক যুবকের আলোচনা করা হয়েছে, যখন তিনি হযরত খিযির আ.-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন। যেমন ইরশাদ হচ্ছে: وَإِذْ قَالَ مُوسَى لِفَتَاهُ لَا أَبْرَحُ حَتَّى أَبْلُغَ মগমায়া আল বাহরাইনি আউ আমদিয়া হুকুবা। হযরত উবাই ইবনে কাব রাযি. হতে রেওয়ায়েত কৃত একটি সহিহ হাদিসে সেই যুবক সাথীর নাম ইউশা বলা হয়েছে। এরূপে যেন তাঁর আলোচনাও কুরআন মাজিদে বিদ্যমান রয়েছে। সমস্ত কিতাবী সম্প্রদায়গুলি তাঁর নবী হওয়া সম্বন্ধে একমত। প্রাচীনকালের তাওরাতে ইয়াশু আ.-এর ওপর স্বতন্ত্র সহিফা নাযিল হয়েছিল বলে উল্লেখ রয়েছে।
📄 বংশ পরিচয়
হযরত ইউশা আ. বনি ইসরাঈলদের বারো গোত্রের মধ্যে হযরত ইউসুফ আ.-এর গোত্রের সাথে সম্পর্কিত ছিলেন। ঐতিহাসিকগণ তাঁর বংশ-পরম্পরা বর্ণনা করেছেন: ইউশা ইবনে নূন ইবনে ফারাহীম ইবনে ইউসুফ আ. ইবনে ইয়াকুব আ. ইবনে ইসহাক আ. ইবনে ইবরাহীম আ.। কিতাবীরা বলেন, ইউশা হলেন হুদ আ.-এর চাচাতো ভাই। আল্লাহ তাআলা কুরআন শরীফে খিযির আ.-এর ঘটনা প্রসঙ্গে ইউশা আ.-এর নাম উল্লেখ না করে তাঁর বর্ণনা দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন: 'স্মরণ কর, যখন মূসা তার খাদেমকে বলেছিল। বুখারী শরীফেও উবাই ইবনে কাব রাযি. থেকে নাম ধরে তাঁর বর্ণনা এসেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তিনি হলেন ইউশা ইবনে নূন আ.।
আল্লাহর পাকের মহিমার একটি বিচিত্র প্রদর্শনী! হযরত ইউসুফ আ.-এর বদৌলতে কেনানের ৭০ জন লোকের একটি খান্দান মান-মর্যাদা ও প্রতাপের সাথে কেনান থেকে হিজরত করে মিসরে এসে বসতি স্থাপন করেছিল। আজ তারই প্রপৌত্র ইউশা আ.-এর নেতৃত্বে সেই খান্দানই সংখ্যায় লাখ লাখ জনে পরিণত হয়ে পুনরায় নিজেদের পূর্বপুরুষদের জন্মভূমি কেনানে সেই মান-মর্যাদা এবং প্রতাপ ও প্রতিপত্তির সাথে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। এর বিস্তারিত বিবরণ হচ্ছে: চল্লিশ বছর গত হওয়ার পর আল্লাহ তাআলা হযরত ইউশা আ.-কে আদেশ করলেন, তুমি বনি ইসরাঈলদের এই দলটিকে নিয়ে প্রতিশ্রুত ভূমির দিকে অগ্রসর হও এবং তথায় আমালেকা ও অন্যান্য অত্যাচারী সম্প্রদায়গুলির সাথে যুদ্ধ করে তাদেরকে পরাজিত কর, আমার সাহায্য তোমাদের সঙ্গে রয়েছে।
📄 নবুয়ত লাভ ও বনি ইসরাঈলের দায়িত্ব গ্রহণ
হযরত ইউশা ইবনে নূন আ.-এর নবুয়ত প্রাপ্তির বিষয়ে আহলে কিতাবরা একমত। তাদের একটি দল যারা সামিরাহ বলে বিখ্যাত, তারা মূসা আ.-এর পর ইউশা ইবনে নূন আ. ব্যতীত কারো নবুয়ত স্বীকার করে না। তাওরাতে ইউশা আ.-এর নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই তারা ইউশা আ. ব্যতীত অন্যের নবুয়তকে অস্বীকার করে। অথচ অন্যদের নবুয়ত প্রতিপালকের তরফ থেকে সত্য ও যথার্থ। তাদের উপর কিয়ামত পর্যস্ত আল্লাহ তাআলার লানত বর্ষিত হতে থাকবে।
তাওরাতে উল্লেখ আছে "আল্লাহ তাআলার বিশিষ্ট বান্দা হযরত মূসা আ.-এর ওফাত প্রাপ্তির পরে তাঁর খাদেম ইউশা ইবনে নূনকে আল্লাহ তাআলা বললেন, আমার বান্দা মূসার মৃত্যু হয়েছে। এখন তুমি উঠ এবং তোমাদের সমস্ত লোকদেরকে সঙ্গে নিয়ে সেই জর্দান নদীর তীরবর্তী সেই দেশে যাও, যা আমি তাদেরকে অর্থাৎ বনি ইসরাঈলদেরকে দান করেছি। যেই যেই স্থান তোমাদের পদতলে পতিত হবে, সেই স্থানগুলি আমি তোমাদেরকে দান করলাম, যেমন আমি মূসাকেও একথা বলেছিলাম। মরুপ্রান্তর বা অরণ্যভূমি এবং লেবানন হতে আরম্ভ করে বড় ফোরাত নদী পর্যন্ত হিত্তীদের সমগ্র দেশ এবং পশ্চিমদিকে বড় সমুদ্র পর্যন্ত তোমাদের সীমা হবে। তোমার জীবিতকাল পর্যন্ত তোমার সম্মুখে কেউই দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না। আমি মূসার সঙ্গে যেরূপ ছিলাম, তোমার সঙ্গেও তদ্রুপ থাকব। আমি তোমার থেকে হাতও উঠাব না এবং তোমাকে ত্যাগও করব না।"