📄 নাম ও বংশ পরিচয়
হযরত খিযির আ.-এর নাম সম্পর্কে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে একাধিক মত আছে। আবু হাতিম রহ. বলেন, আমার উস্তাদ আবু ওবায়দা রহ. বলেছেন, আদম সন্তানদের মধ্যে দীর্ঘতম আয়ুর অধিকারী হচ্ছে খিযির আ., আর তার নাম হচ্ছে খায়রুন। তিনি ছিলেন আদম আ.-এর পুত্র কাবীলের সন্তান।
ইবনে ইসহাক রহ. উল্লেখ করেছেন, যখন আদম আ.-এর মৃত্যুর সময় হল, তখন তিনি তাঁর সন্তানদের জানালেন, একটি প্লাবন আসন্ন। তিনি তাদেরকে অসিয়ত করলেন, তারা যেন তাঁর মৃতদেহ তাদের সাথে নৌযানে উঠিয়ে নেয় এবং তার নির্দেশিত স্থানে তাঁকে দাফন করে। যখন প্লাবন সংঘটিত হল, তখন তারা তাঁর লাশ তাদের সাথে উঠিয়ে নিলেন আর যখন তারা অবতরণ করলেন, তখন নূহ আ. তাঁর পুত্রদের নির্দেশ দিলেন, যেন তারা তাঁকে তাঁর অসিয়ত মতো নির্দিষ্ট স্থানে দাফন করেন। তখন তাঁরা বলতে লাগলেন, পৃথিবী এখনও বসবাসযোগ্য হয়ে উঠে নি। এখনো তা নিভৃত নির্জন। তখন নূহ আ. তাদেরকে দাফনের কাজে উৎসাহিত করলেন। তিনি বললেন, 'আদম আ.-এর দাফনের দায়িত্ব যিনি নেবেন, তাকে দীর্ঘায়ু করার জন্যে আদম আ. আল্লাহর দরবারে দুআ করেছিলেন। সে সময় তাঁরা দাফনের নির্দেশিত স্থানে যেতে ভীতিবোধ করলেন। ফলে আদম আ.-এর দেহ তাদের কাছেই রয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত খিযির আ. আদম আ.-এর দাফনের দায়িত্ব পালন করেন। এবং আল্লাহ তাআলাও তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেন। তাই আল্লাহ তাআলা যত দিন চান, খিযির আ. ততদিন জীবিত থাকবেন।
মাআরিফ গ্রন্থে আছে, খিযির আ.-এর নাম বালিয়া। কেউ বলেন, তার নাম ঈলীয়া ইবনে মালকান ইবনে ফালিগ ইবনে আবির ইবনে শালিখ ইবনে আর-ফাখশায ইবনে সাম ইবনে নূহ আ.। কেউ বলেন, মামার ইবনে মালিক ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে নসর ইবনে লাযিদ। কেউ বলেন, খাযিরুন ইবনে আমীয়াঈল ইবনে ইয়াফিয ইবনে ঈস ইবনে ইসহাক ইবনে ইবরাহীম খলীল আ.। আবার কেউ বলেন, আরমীয়া ইবনে খালকীয়া। আল্লাহ তাআলাই অধিক পরিজ্ঞাত। কেউ কেউ বলেন, তিনি যুলকারনাইন এর অগ্রবর্তী বাহিনীর দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। কেউ বলেন, তিনি ছিলেন এমন এক মুমিন বান্দার পুত্র, যিনি ইবরাহীম খলীল আ.-এর প্রতি ঈমান আনয়ন করেছিলেন এবং তাঁর সাথে হিজরতও করেছিলেন। আবার কেউ বলেন, তিনি বাশতাসিব ইবনে লাহরাসিরের যুগে নবী ছিলেন।
ইবনে জারীর তাবারী বলেন, বিশুদ্ধ মতে তিনি ছিলেন আফরীদুন ইবনে আসফীয়ান-এর যুগের প্রথম দিকের লোক। এবং তিনি মূসা আ.-এর যুগ পেয়েছিলেন। হাফেয ইবনে আসাকির রহ.-এর মতে খিযির আ.-এর মা ছিলেন রোম দেশীয় এবং পিতা ছিলেন পারস্য দেশীয়। আবু যুরআ রহ. 'দালায়েলুল নবুয়ত' নামক কিতাবে উবাই ইবনে কাব রহ. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেরাজের রাতে সুগন্ধি অনুভব করেন। তখন তিনি বললেন, জিবরাঈল! এ সুগন্ধি কিসের? জবাবে জিবরাঈল আ. বললেন, এটা ফেরাউন কন্যার চুল বিন্যাসকারিণী মহিলা, তার কন্যা ও তার স্বামীর কবরের সুগন্ধি।
হাফেয আবু বকর বায়হাকী আনাস ইবনে মালিক রাযি. থেকে বর্ণনা করেন। যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইনতেকাল করেন, তাঁর সাহাবীগণ তাঁর চারপাশে বসে গেলেন এবং কাঁদতে লাগলেন। তাঁরা সকলে একত্র হলেন। এমন সময় একজন আধাপাকা শ্মশ্রুধারী উজ্জ্বল স্বাস্থ্যবান ব্যক্তি ঘরে প্রবেশ করলেন এবং সকলকে ডিঙ্গিয়ে তাঁর নিকটবর্তী হলেন এবং কান্নাকাটি করলেন। অতঃপর সাহাবায়ে কেরামের প্রতি তাকালেন এবং বললেন: “প্রতিটি মুসিবত হতেই আল্লাহ তাআলার কাছে সান্ত্বনা রয়েছে। প্রতিটি ক্ষতিরই ক্ষতিপূরণ রয়েছে এবং প্রতিটি নশ্বর বস্তুর স্থলবর্তী রয়েছে। সুতরাং আল্লাহর প্রতি সকলে প্রত্যাবর্তন করুন! তাঁরই দিকে মনোযোগী হন! তিনি আপনাদেরকে মুসিবতের মাধ্যমে পরীক্ষা করছেন। আপনারা ধৈর্যধারণ করুন! ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সে-ই, যার ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়। এ কথা বলে তিনি চলে গেলেন।" সাহাবীগণের একজন অন্যজনকে বলতে লাগলেন, তোমরা কি এ ব্যক্তিকে চেন? আবু বকর রাযি. ও আলি রাযি. বললেন : হ্যাঁ, এ হলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জ্ঞাতি ভাই খিযির আ.।
📄 হযরত খিযির নবী ছিলেন কি না?
মুজাহিদ রহ. বলেন, হযরত মূসা ও ইউশা আ. যখন নিজেদের পদাঙ্ক অনুকরণ করে পশ্চাতে অগ্রসর হচ্ছিলেন, তখন তাঁরা সমুদ্রের মাঝে একটি ফরাশের ওপর শোয়া অবস্থায় খিযির আ.-কে দেখতে পেলেন। তিনি কাপড়ের দুই প্রান্ত মাথা ও দুই পায়ের নিচে মুড়ে রেখেছিলেন। মূসা আ. তাঁকে সালাম করলেন। তখন তিনি মুখ থেকে কাপড় সরালেন ও সালামের উত্তর দিলেন এবং বললেন, এ জায়গায় সালাম কোত্থেকে এল? আপনি কে? মূসা আ. বললেন, 'আমি মূসা।' তিনি বললেন, আপনি কি বনি ইসরাঈলের মূসা?' তিনি বললেন, জি হ্যাঁ। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা কুরআন শরীফে বর্ণনা দিয়েছেন। উক্ত বর্ণনাধারা থেকে খিযির আ. নবী ছিলেন বলেই কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
দ্বিতীয়ত কোরআনে উল্লিখিত মূসা আ.-এর উক্তি হযরত খিযির আ. নবী হওয়ার ব্যাপারে সমর্থন করে। যেমন কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে:
হলি অত্তবিউকা আলা আন তুআল্লিমানি মিম্মা উল্লিমতা রুশদা (মূসা তাঁকে বললেন, 'সত্য পথের যে জ্ঞান আপনাকে দান করা হয়েছে, তা থেকে আমাকে শিক্ষা দিবেন- এ শর্তে আমি আপনার অনুসরণ করব কি?)। যদি তিনি নবী না হতেন, তবে মূসা আ. তাঁকে এরূপ কথা বলতেন না।
তৃতীয়ত খিযির আ. কিশোরটিকে হত্যা করলেন। আর এটা মহান আল্লাহর ওহি ব্যতীত হতে পারে না। এটিই তাঁর নবুয়তের রীতিমতো একটি দলীল এবং তাঁর নিষ্পাপ হওয়ার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। কেননা ওলির পক্ষে ইলহামের মাধ্যমে আদিষ্ট হয়ে প্রাণ বধ করার পদক্ষেপ গ্রহণ বৈধ নয়। ইলহামের দ্বারা নিষ্পাপ হওয়ার বিষয়টি সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয় না। বরং এখানে ভুল-ভ্রান্তির আশঙ্কা সর্বজন স্বীকৃত। চতুর্থত খিযির আ. যখন তাঁর কর্মকাণ্ডের রহস্য মূসা আ.-এর কাছে ব্যাখ্যা করলেন এবং মূসা আ.-এর কাছে তার তাৎপর্য সুস্পষ্ট হল, তারপর খিযির আ. মন্তব্য করেন: 'রহমাতুম মির রব্বিকা ওমা ফাআলতুহু আন আমরি' (আমি যা কিছু করেছি আমার নিজের ইচ্ছে মতো করি নি বরং আমি এরূপ করতে আদিষ্ট হয়েছিলাম। আমার কাছে ওহি প্রেরণ করা হয়েছিল)।
এসব কারণ দ্বারা খিযির আ. যে নবী ছিলেন, তা প্রমাণিত হয়। তবে এটা তাঁর ওলি হওয়া বা রাসূল হওয়ার পরিপন্থী নয়। তাঁর ফেরেশতা হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। উপর্যুক্ত বর্ণনায় তাঁর নবী হওয়ার ব্যাপারটা প্রমাণিত হওয়ার পর তিনি ওলি হওয়ার সপক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ থাকে না। যদিও কোনো কোনো সময় আল্লাহর ওলিগণ এমন সব তথ্য অবগত হন, যেগুলো সম্বন্ধে প্রকাশ্য শরিয়ত প্রতিষ্ঠার জন্যে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ অবহিত থাকেন না।
📄 হযরত মূসা আ. ও খিযির আ.-এর ঘটনা
আল্লাহ তাআলা এ সম্পর্কে কুরআনে কারিমে ইরশাদ করেন :
'স্মরণ কর, যখন মূসা তাঁর সঙ্গীকে বললেন, দুই সমুদ্রের সঙ্গমস্থলে না পৌঁছে আমি থামব না অথবা আমি যুগ যুগ ধরে চলতে থাকব। তারা উভয়েই যখন দুই সমুদ্রের সংগমস্থলে পৌঁছুল, তারা নিজেদের মাছের কথা ভুলে গেল। এটা সুড়ঙ্গের মতো পথ করে সমুদ্রে নেমে গেল। যখন তারা আরও অগ্রসর হল, মূসা তাঁর সঙ্গীকে বললেন, 'আমাদের সকালের নাশতা নিয়ে এসো, আমরা তো আমাদের এ সফরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।' সঙ্গী বলল, আপনি কি লক্ষ করেছেন- আমরা যখন শিলাখণ্ডে বিশ্রাম করছিলাম, তখন আমি মাছের কথা ভুলে গিয়েছিলাম। শয়তানই এটার কথা বলতে আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল। মাছটি আশ্চর্যজনকভাবে নিজের পথ করে সমুদ্রে নেমে গেল। মূসা বললেন, আমরা তো সেই স্থানটিরই অনুসন্ধান করছিলাম। তারপর তারা নিজেদের পদচিহ্ন ধরে ফিরে চলল। এরপর তারা সাক্ষাৎ পেল আমার বান্দাদের মধ্যে এমন একজনের, যাকে আমি আমার নিকট হতে অনুগ্রহ দান করেছিলাম এবং আমার নিকট হতে শিক্ষা দিয়েছিলাম এক বিশেষ জ্ঞান। মূসা তাঁকে বললেন, 'সত্য পথের যে জ্ঞান আপনাকে দান করা হয়েছে, তা থেকে আমাকে শিক্ষা দিবেন-এ শর্তে আমি আপনার অনুসরণ করব কি?' তিনি বললেন, আপনি কিছুতেই আমার সঙ্গে ধৈর্যধারণ করে থাকতে পারবেন না। যে বিষয় আপনার অবগতিতে নেই, সে বিষয়ে আপনি ধৈর্যধারণ করবেন কেমন করে?' মূসা বললেন, 'আল্লাহ চাইলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন এবং আপনার কোনো আদেশ আমি অমান্য করব না।' তিনি বললেন, 'আচ্ছা আপনি যদি আমার অনুসরণ করেনই, তবে কোনো বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করবেন না, যতক্ষণ না আমি সে সম্বন্ধে আপনাকে কিছু বলি।' তারপর উভয়ের চলতে লাগল। পরে তারা যখন নৌকায় আরোহণ করল, তখন তিনি ওটা বিদীর্ণ করে দিলেন। মূসা বললেন, আপনি কি আরোহীদের নিমজ্জিত করে দেওয়ার জন্যে এটা বিদীর্ণ করলেন? আপনি তো এক গুরুতর অন্যায় কাজ করলেন।' সে বলল, 'আমি বলি নি, আপনি আমার সঙ্গে কিছুতেই ধৈর্যধারণ করতে পারবেন না?' মূসা বললেন, আমার ভুলের জন্য আমাকে অপরাধী করবেন না এবং আমার ব্যাপারে অত্যধিক কঠোরতা অবলম্বন করবেন না।
তারপর উভয়ে চলতে লাগল। চলতে চলতে ওদের সাথে এক বালকের সাক্ষাৎ হলে তিনি তাকে হত্যা করলেন। তখন মূসা বললেন, আপনি কি এক নিষ্পাপ জীবন নাশ করলেন হত্যার অপরাধ ছাড়াই? আপনি তো এক গুরুতর অন্যায় কাজ করলেন।' সে বলল, 'আমি কি বলি নি, আপনি আমার সঙ্গে কিছুতেই ধৈর্যধারণ করতে পারবেন না?' মূসা বললেন, এটার পর যদি আমি আপনাকে কোনো বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি, তবে আপনি আমাকে সঙ্গে রাখবেন না, আমার ওযর-আপত্তির চূড়ান্ত হয়েছে।' তারপর উভয়ে চলতে লাগল। চলতে চলতে তারা এক জনপদের অধিবাসীদের কাছে পৌঁছে তাদের কাছে খাদ্য চাইল, কিন্তু তারা তাদের মেহমানদারী করতে অস্বীকার করল। তারপর তারা এক পতনোন্মুখ প্রাচীর দেখতে পেলেন। তিনি সেটাকে সুদৃঢ় করে দিলেন। মূসা বললেন, 'আপনি তো ইচ্ছে করলে এর জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করতে পারতেন।' তিনি বললেন, 'এখানেই আপনার এবং আমার মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ হল; যে বিষয়ে আপনি ধৈর্যধারণ করতে পারেন নি, আমি তার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করছি।'
নৌকাটির ব্যাপার- এটা ছিল কয়েকজন দরিদ্র ব্যক্তির, ওরা সমুদ্রে জীবিকা অন্বেষণ করত; আমি ইচ্ছা করলাম নৌকাটিকে ত্রুটিযুক্ত করতে। কারণ, তাদের পশ্চাতে ছিল এক রাজা, যে বলপ্রয়োগে সকল নৌকা ছিনিয়ে নিত। আর কিশোরটি- তার পিতামাতা ছিল মুমিন। আমি আশঙ্কা করলাম, সে বিদ্রোহাচরণ ও কুফরির দ্বারা তাদেরকে বিব্রত করবে। তার পরে আমি চাইলাম, ওদের প্রতিপালক যেন ওদেরকে তার পরিবর্তে এক সন্তান দান করেন, যে হবে পবিত্রতায় মহত্তর ও ভক্তি-ভালোবাসায় ঘনিষ্ঠতর। আর ওই প্রাচীরটি- এটা ছিল নগরবাসী দুই পিতৃহীন কিশোরের। এর তলদেশে আছে ওদের গুপ্তধন। ওদের পিতা ছিল সৎকর্মপরায়ণ। সুতরাং আপনার প্রতিপালক দয়াপরবশ হয়ে ইচ্ছা করলেন, ওরা বয়োপ্রাপ্ত হোক এবং ওরা ওদের ধনভাণ্ডার উদ্ধার করুক। আমি নিজ থেকে কিছু করি নি, আপনি যে বিষয়ে ধৈর্যধারণে অপারগ হয়েছিলেন, তার ব্যাখ্যা এটাই।' (সূরা কাহাফ: ৫৯-৮২)
উবাই ইবনে কাব রাযি. বলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন, একদিন মূসা আ. ইসরাঈলীদের কাছে বক্তব্য রাখছিলেন। এমন সময় তাঁকে প্রশ্ন করা হল, মানবজাতির মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী কে? তিনি বললেন, 'আমি'। যেহেতু জ্ঞানকে তিনি আল্লাহ তাআলার দিকে সম্পর্কিত করেন নি, তাই আল্লাহ তাআলা তাঁকে ভর্ৎসনা করলেন। তাঁর কাছে আল্লাহ তাআলা এ মর্মে ওহী প্রেরণ করেন- দুই সমুদ্রের সঙ্গমস্থলে আমার এক বান্দা রয়েছে যিনি তোমার চেয়ে অধিক জ্ঞানী। মূসা আ. বললেন, “হে আমার প্রতিপালক! আমি কেমন করে তার কাছে পৌঁছুতে পারব?” আল্লাহ তাআলা বললেন, 'একটি মাছ সাথে নিয়ে তা থলেতে পুরে নাও। যেখানেই মাছটি হারিয়ে যাবে, সেখানেই তাকে পাওয়া যাবে।'
তিনি একটি মাছ থলেতে নিয়ে নিলেন। তারপর তিনি চলতে লাগলেন। তাঁর সাথে তাঁর খাদেম ইউশা ইবনে নূনও ছিলেন। যখন তাঁরা শৈলশীলার কাছে পৌঁছলেন, তখন তাঁরা তাতে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন। মাছটি লাফ দিয়ে থলে থেকে বের হয়ে গেল এবং সুড়ঙ্গের পথ করে সাগরে নেমে গেল। আল্লাহ তাআলা মাছের যাত্রাপথের পানি ঠেকিয়ে রাখলেন, যাতে সুড়ঙ্গের মতো হয়ে গেল। মূসা আ. যখন জাগলেন, তখন খাদেম মাছটি সম্বন্ধে তাঁকে অবহিত করতে ভুলে গেলেন। পরদিন সকালে মূসা আ. তাঁর খাদেমকে বললেন, 'আমাদের নাশতা আন, আমরা তো আমাদের এ সফরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।' যে স্থানে পৌঁছার জন্য আল্লাহ তাআলা মূসা আ.-কে হুকুম দিয়েছিলেন সে স্থান অতিক্রম করার পূর্ব পর্যন্ত তিনি কোনো ক্লান্তি বোধ করেন নি। খাদেম মূসা আ.-কে বললেন: "আপনি কি লক্ষ করেছেন আমরা যখন শিলাখণ্ডে বিশ্রাম করছিলাম, তখন আমি মাছের কথা ভুলে গিয়েছিলাম? শয়তানই এটার কথা বলতে আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল। মাছটি আশ্চর্যজনকভাবে নিজের পথ করে সাগরে নেমে যায়।” মূসা আ. বললেন, 'আমরা তো সেই স্থানটিরই অন্বেষণ করছিলাম।'
তারপর তাঁরা নিজেদের পদচিহ্ন ধরে ফিরে চললেন এবং পাথরটির কাছে গিয়ে পৌঁছলেন। তাঁরা সেখানে একজন বস্ত্রাবৃত লোককে দেখতে পান। মূসা আ. তাঁকে সালাম দিলেন, তখন ওই ব্যক্তি অর্থাৎ খিযির আ. বললেন, আমার এ জনপদে সালাম আসল কোত্থেকে? মূসা আ. বললেন, আমি মূসা। তিনি প্রশ্ন করলেন, বনি ইসরাঈলের মূসা আ.? মূসা আ. বললেন: হ্যাঁ, তাই। সত্যের যে জ্ঞান আপনাকে দান করা হয়েছে, তা থেকে আমাকে শিক্ষা দিবেন এজন্য আমি আপনার কাছে এসেছি। খিযির আ. বললেন, "হে মূসা আ.! আল্লাহ তাআলা তাঁর জ্ঞান থেকে আমাকে একটি বিশেষ জ্ঞান প্রদান করেছেন, যা আপনার অজ্ঞাত। অনুরূপভাবে আপনাকে এমন একটি জ্ঞান দান করেছেন, যা আমার অজ্ঞাত। তাই আপনি কিছুতেই আমার সঙ্গে ধৈর্যধারণ করে থাকতে পারবেন না।"
হযরত মূসা আ. খিযির আ.-কে বললেন, "আল্লাহ ইচ্ছা করলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন এবং আপনার কোনো আদেশ আমি অমান্য করব না।" খিযির আ. মূসা আ.-কে বললেন, 'যদি আপনি আমার অনুসরণ করেনই, তবে কোনো বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করবেন না, যতক্ষণ না আমি সে সম্বন্ধে আপনাকে কিছু বলি।' তারপর উভয়ে সাগরের তীর ধরে চলতে লাগলেন এবং একটি নৌকার দেখা পেলেন। নৌকার মালিকদের সাথে পারাপারের ব্যাপারে আলোচনা করলেন। নৌকার মালিকগণ খিযির আ.-কে চিনতে পারলেন। ভাড়া না নিয়েই তাদেরকে পার করে দিলেন। যখন তারা উভয়ে নৌকায় আরোহণ করলেন, খিযির আ. কিছুক্ষণের মধ্যে কুঠার দ্বারা নৌকার একটি কাঠ খুলে ফেললেন। তখন মূসা আ. তাঁকে বললেন, 'এরা বিনা ভাড়ায় আমাদেরকে পার করে দিলেন আর আপনি আরোহীদেরকে নিমজ্জিত করার জন্যে নৌকাটিকে বিদীর্ণ করে দিলেন! আপনি তো এক গুরুতর অন্যায় কাজ করলেন!” তিনি মূসা আ.-কে বললেন, "আমি কি আপনাকে বলি নি, আপনি আমার সাথে কিছুতেই ধৈর্যধারণ করতে পারবেন না?" মূসা আ. বললেন, "আমার ভুলের জন্য আমাকে অপরাধী সাব্যস্ত করবেন না এবং আমার ব্যাপারে অত্যধিক কঠোরতা অবলম্বন করবেন না।"
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, প্রথম বারের প্রশ্নটি মূসা আ. হতে ভুলক্রমে সংঘটিত হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, এমন সময় একটি চড়ুই পাখি এসে নৌকার একপাশে বসল। তারপর ঠোঁট দিয়ে পানি উঠাল। তখন খিযির আ. মূসা আ.-কে লক্ষ্য করে বললেন, আল্লাহ তাআলার জ্ঞানের তুলনায় আমার ও আপনার জ্ঞানের পরিমাণ হচ্ছে সাগর থেকে নেওয়া চড়ুই পাখির একবিন্দু পানির মতো। তারা উভয়ে নৌকা থেকে অবতরণের পর সাগরের কূল ঘেঁষে চলতে লাগলেন। এরপর খিযির আ. এক বালককে দেখতে পেলেন। সে অন্যান্য বালকের সাথে খেলাধুলা করছিল। খিযির আ. কিশোরটির মাথা ধরে টেনে ছিঁড়ে ফেললেন। এভাবে তাকে তিনি হত্যা করলেন। মূসা আ. তখন তাঁকে বললেন, আপনি কি এক নিষ্পাপ জীবন নাশ করলেন, হত্যার অপরাধ ছাড়াই? আপনি তো এক গুরুতর অন্যায় কাজ করলেন! তিনি বললেন, আমি কি বলি নি, আপনি আমার সঙ্গে কিছুতেই ধৈর্যধারণ করতে পারবেন না?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এবারের প্রশ্নটি উত্থাপন ছিল পূর্বের বারের চেয়ে গুরুতর। তাই মূসা আ. বললেন এরপর যদি আমি আপনাকে কোনো বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি, তবে আপনি আমাকে সঙ্গে রাখবেন না। আমার ওযর-আপত্তির চূড়ান্ত হয়েছে। এরপর উভয়ে চলতে লাগলেন। চলতে চলতে তাঁরা এক জনপদের আধিবাসীদের নিকট পৌঁছে তাদের কাছে খাদ্য চাইলেন। কিন্তু তারা এঁদের মেহমানদারী করতে অস্বীকার করল। এরপর তারা তথায় এক পতনোন্মুখ প্রাচীর দেখতে পেলেন, তখন খিযির আ. তা সুদৃঢ় করে দিলেন। তখন মূসা আ. বললেন, তারা এমন একটি সম্প্রদায় যাদের কাছে আমরা আগমন করলাম, তারা আমাদেরকে না দিল খাদ্য, না করল মেহমানদারী, আপনি তো ইচ্ছে করলে এটার জন্যে পারিশ্রমিক গ্রহণ করতে পারতেন। খিযির আ. বললেন, এখানেই আপনার এবং আমার মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ হল। তবে যে বিষয়ে আপনি ধৈর্যধারণ করতে পারেন নি, আমি তার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করছি।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমাদের এটা পছন্দনীয় ছিল, মূসা আ. যদি ধৈর্যধারণ করতেন, তা হলে আল্লাহ তাআলা তাদের সম্বন্ধে আমাদেরকে আরও অনেক ঘটনা শুনাতেন।