📄 ফেরাউনের দরবারে সত্যের দাওয়াত
হযরত মূসা ও হযরত হারুন আ.-এর মধ্যে যখন পরস্পর সাক্ষাৎ ও কথোপকথনের পালা সমাপ্ত হল, তখন উভয়ে সিদ্ধান্ত করলেন, আল্লাহর তাআলার আদেশ পালনের উদ্দেশ্যে ফেরাউনের নিকট গমন এবং তাকে আল্লাহ তাআলার পয়গাম পৌঁছিয়ে দেওয়া উচিত। কোনো কোনো তাফসিরকারক লিখেছেন, যখন উভয় ভ্রাতা ফেরাউনের দরবারে গমন করতে উদ্যত হলেন, তখন তাঁদের মাতা স্নেহাতিশয্যে তাঁদেরকে বারণ করতে চাইলেন। বললেন— "তোমরা এমন ব্যক্তির নিকট যেতে চাচ্ছ, যে রাজমুকুট এবং রাজসিংহাসনের মালিক, যালিম এবং অহংকারীও। সেখানে যেও না, সেখানে যাওয়া বিফল হবে। কিন্তু উভয়ে মাতাকে বুঝালেন, আল্লাহ তাআলার আদেশ লঙ্ঘন করা যায় না। তিনি ওয়াদা করেছেন, আমরা সফলকাম হব।
মোটকথা, উভয় ভ্রাতা আল্লাহ তাআলার সত্য নবী ফেরাউনের দরবারে পৌঁছুলেন এবং নির্ভয়ে ও নিশ্চিন্তে ভিতরে প্রবেশ করলেন। ফেরাউনের সিংহাসনের নিকটে পৌঁছে হযরত মূসা ও হারুন আ. নিজেদের আগমনের কারণ বর্ণনা করলেন। যখন কথোপকথন আরম্ভ হল, তাঁরা বললেন, ফেরাউন! আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে রাসূল নিযুক্ত করে তোমার নিকট পাঠিয়েছেন। আমরা তোমার নিকট দুটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চাচ্ছি। এক. আল্লাহ তাআলাকে একক ও অদ্বিতীয় বলে বিশ্বাস কর; কাউকেও তাঁর শরীক সাব্যস্ত করো না। দুই. যুলুম এবং অত্যাচার হতে নিবৃত্ত হও; বনি ইসরাঈলকে তোমার গোলামী হতে মুক্ত করে দাও। আমরা যা কিছু বলছি, দৃঢ় বিশ্বাস কর, আমরা বানোয়াট এবং কৃত্রিম বলছি না। আমাদের এমন দুঃসাধ্যও হতে পারে না, আমরা আল্লাহ তাআলা সম্বন্ধে মিথ্যা কথা বলব। আমাদের সত্যতা প্রমাণের জন্য যেমন আমাদের এ শিক্ষা স্বয়ং সাক্ষী রয়েছে, তদ্রুপ আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দুটি নিদর্শন অর্থাৎ মুজিযাও দান করেছেন। তাই তোমার জন্য এ সত্যকে এবং আল্লাহ পাকের এ পয়গামকে কবুল করা এবং বনি ইসরাঈলকে মুক্তি দেওয়াই সঙ্গত। আমি তাদেরকে পয়গম্বরগণের সেই দেশে নিয়ে যাব, যেখানে তারা একমাত্র আল্লাহ তাআলার এবাদত করবে। তাঁকে ছাড়া আর কারও পূজা করবে না। কেননা এটাই সত্য পথ এবং তাদের পূর্ব পুরুষগণের চিরন্তন রীতিনীতি।
📄 ফেরাউনের খোদায়ী দাবি
ফেরাউন তার কথাবার্তার সময় মূসা আ.-কে বলেছিল, তুমি আমার এখানে প্রতিপালিত হয়েছ এবং তোমার প্রতিপালক আমি। তার উদ্দেশ্য শুধু এতটুকুই নয় বরং এর অভ্যন্তরে তার সেই বিশ্বাসও কাজ করছিল, যা ভেঙে-চুরে মিসমার করার জন্য মূসা আ. প্রেরিত হয়েছিলেন। অর্থাৎ মিসর রাজ্যের রাজাকে শুধু রাজাই বলা হত না বরং তাকে রা' (সূর্য দেবতা) এর অবতার বলে মান্য করা হত। এ কারণেই রাজারা 'ফেরাউন' উপাধিতে ভূষিত হত। মিসরীয়দের আকিদায় বিশ্ব জগতের প্রতিপালনের ব্যাপারটি রা' দেবতার উপর ন্যস্ত ছিল।
হযরত মূসা আ. এ সমস্ত বাতিল মাবুদের পূজার বিরুদ্ধে আওয়ায তুলে এক খোদার ইবাদতের প্রতি আহবান জানালেন। বললেন— 'আমি রাব্বুল আলামীনের তরফ হতে প্রেরিত দূত।' তখন প্রথমে ফেরাউন নিজের ও নিজের পূর্বপুরুষদের খোদায়িত্ব এরূপে সাব্যস্ত করল, মূসা আ.-এর ব্যক্তিত্বের উপর চাপ পড়ে। আর যখন দেখল, এই উপায়ে আসল বিষয়ের মীমাংসা হচ্ছে না, তখন বিষয়টিকে আরও নগ্ন করে হযরত মূসা আ.-এর সাথে বিতর্কে প্রবৃত্ত হল। বলল, মূসা! এটা তুমি কেমন নতুন কথা শুনাচ্ছ? আমি ছাড়াও কি কোনোও খোদা আছে? যাকে তুমি 'রাব্বুল আলামীন' বলছ? যদি এটা সঠিক হয়, তবে তার স্বরূপ বর্ণনা কর। হযরত মূসা আ. বললেন, তোমার মধ্যে প্রকৃত ঈমান ও বিশ্বাসের অবকাশ থাকলে তোমার বুঝা উচিত— আমি যে মহান সত্তাকে রাব্বুল আলামীন বলছি, তিনি সেই পবিত্র সত্তা, যাঁরই ক্ষমতাধীন রয়েছে আসমান, যমীন এবং এতদুভয়ের মধ্যস্থিত সমুদয় সৃষ্টির প্রতিপালন বা খোদায়িত্ব। হে ফেরাউন! তুমি কি দাবি করতে পার, এ আসমান, যমীন এবং এতদুভয়ের মধ্যস্থিত যাবতীয় সৃষ্টিকে তুমি সৃষ্টি করেছ কিংবা এদের প্রতিপালনের কারখানা তোমারই ক্ষমতার কবলে রয়েছে? যদি না হয় এবং অবশ্যই নয়, তবে রাব্বুল আলামীনের সর্বব্যাপী খোদায়িত্ব অস্বীকার করছ কেন? ফেরাউন এ শুনে সভাসদবৃন্দকে লক্ষ্য করে বিস্ময়ের সাথে বলল, তোমরা কি শুনছ! মূসা কেমন আশ্চর্য কথা বলছে?
মূসা আ. ফেরাউন ও তার সভাসদবৃন্দের এ বিস্ময়ের কোনো পরোয়াই করলেন না। বরং বললেন, রাব্বুল আলামীন সেই অদ্বিতীয় সত্তা, যাঁর খোদায়িত্বের প্রভাব হতে তোমার এবং তোমার পূর্বপুরুষগণের অস্তিত্বও মুক্ত নয়। যখন তোমার এবং তোমার পূর্বপুরুষগণের অস্তিত্বই ছিল না, তখন তিনিই তোমাদের সকলকে অস্তিত্বে আনয়ন করেছেন। নিজের প্রতিপালন ক্ষমতা দ্বারা প্রতিপালন করেছেন।
ফেরাউন এই নিরুত্তরকারী ও শক্তিশালী প্রমাণ শ্রবণ করে কোনো উত্তর করতে পারল না। তখন সভাসদবৃন্দকে লক্ষ্য করে বলল, "আমার মনে হয় এই ব্যক্তি নিজেকে তোমাদের নিকট আল্লাহর পয়গম্বর ও রাসূল বলে দাবি করছে, একজন বিকৃত মস্তিষ্ক ও উন্মাদ।" হযরত মূসা আ. ফেরাউনের এই লা-জাওয়াব অবস্থা দৃষ্টে আরও চিত্তাকর্ষক ভঙ্গিতে আল্লাহ তাআলার খোদায়িত্বের বর্ণনা স্পষ্ট করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে বললেন: এই যে মাশরিক ও মাগরিব এবং এদের মধ্যস্থিত সমুদয় সৃষ্টি দৃষ্টিগোচর হচ্ছে, এই সমুদয়ের প্রতিপালন যাঁর কুদরতের হস্তে নিহত রয়েছে, আমি তাঁকেই 'রাব্বুল আলামীন' বলছি। তুমি যদি সামান্য মাত্র জ্ঞান-বুদ্ধি খরচ কর, তবে অতি সহজে এ সত্যকে হৃদয়ঙ্গম করতে পার।
মূসা আ. বললেন, আমাদের পালনকর্তা তো সেই একমাত্র পালনকর্তা, যিনি দুনিয়ার প্রত্যেকটি বস্তুকে দেহ দান করেছেন। এরপর সর্বপ্রকারের প্রয়োজনীয় ক্ষমতা প্রদানপূর্বক তার জন্য যিন্দেগীর যাবতীয় কার্যের দ্বার মুক্ত করে দিয়েছেন। যিনি প্রত্যেক বস্তুকে দেহ এবং অস্তিত্বরূপী নেয়ামত দান করেছেন। এরপর সকলকে পূর্ণতা লাভের পথে চলার জন্য পথ প্রদর্শন করেছেন। তখন ফেরাউন নিরুত্তর হয়ে কথার মোড় ঘুরিয়ে দিয়ে বলল, 'তবে অতীতকালের লোকদের অবস্থা কিরূপ হয়েছে?' উদ্দেশ্য ছিল, যদি তোমার কথাই ঠিক হয়, তা হলে আমাদের পূর্বে যারা অতীত হয়ে গেছে, যেমন আমাদের পূর্বপুরুষগণ, যাদের আকিদা তোমার আকিদার অনুকূলে ছিল না, তারা কি সকলেই আযাবে পতিত হবে? হযরত মূসা আ. ফেরাউনের এ বক্র কথা বুঝতে পারলেন এবং বললেন, তাদের উপর কি ঘটেছে, তাদের সঙ্গে আল্লাহ তাআলা কিরূপ ব্যবহার করেছেন, সেই জ্ঞান আমার পালনকর্তার নিকট কিতাবে সুরক্ষিত রয়েছে। আমার পালনকর্তা ভুল-ত্রুটি হতে সম্পূর্ণ পবিত্র। যে যা কিছু করেছে, তার ব্যাপারে বিন্দুমাত্রও ভুল এবং জুলুম হবে না।
ফেরাউন যখন দেখল তার যুক্তিতে কাজ হচ্ছে না, তখন সে বলল, যদি তুমি আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে মাবুদ সাব্যস্ত কর, তবে আমি তোমাকে অবশ্যই জেলখানায় আটক রাখব। মূসা বললেন: যদিও আমি তোমার নিকট স্পষ্ট নিদর্শন নিয়ে এসেছি, তবুও কি! ফেরাউন বলল, যদি তুমি তোমার খোদার নিকট হতে কোনো নিদর্শন আনয়ন করে থাক এবং তুমি এ সম্বন্ধে সত্যবাদী হও, তবে তুমি সেই নিদর্শন দেখাও। হযরত মূসা আ. সম্মুখে অগ্রসর হলেন এবং জনসমাকীর্ণ দরবারে ফেরাউনের সম্মুখে স্বীয় লাঠিটি যমীনে ফেললেন। তৎক্ষণাৎ তা এক বিরাটকায় অজগরের আকৃতি ধারণ করল। এরপর হযরত মূসা আ. নিজের হাতকে জামার বুকের অংশের ভিতরে ঢুকিয়ে আবার বের করে আনলেন। তৎক্ষণাৎ তা একটি উজ্জ্বল তারকার মতো দীপ্তিমান দেখা যেতে লাগল। ফেরাউনের সভাসদবৃন্দ যখন একজন ইসরাঈলীর কাছে নিজেদের কওম বাদশার পরাজয় দর্শন করল, তখন বিচলিত হয়ে উঠল। তারা বলতে লাগল, নিঃসন্দেহে এ ব্যক্তি অতি বড় বিচক্ষণ জাদুকর। তার ইচ্ছা সে তোমাদেরকে তোমাদের দেশ হতে বের করে দিবে। অবশেষে ফেরাউন ও তার সভাসদরা সিদ্ধান্ত করল, দেশের বড় বড় জাদুকরদেরকে একত্র করে তাকে পরাজিত করা হবে।
📄 ফেরাউনের নিমজ্জন
হযরত মূসা আ. বনি ইসরাঈলকে সান্ত্বনা প্রদান করে বললেন, ভয় করো না। আল্লাহ পাকের ওয়াদা সত্য। তিনি অবশ্যই তোমাদেরকে নাজাত দিবেন, পরিশেষে তোমরাই সফলকাম হবে। এরপর মূসা আ. আল্লাহ তাআলার দরবারে হাত তুলে দুআ করলেন। আল্লাহ পাক মূসা আ.-কে আদেশ করলেন, তোমার লাঠি দ্বারা সমুদ্রের পানির ওপর আঘাত কর, তা হলে মধ্যস্থলে পথ বের হবে। যখন তিনি লোহিত সাগরের বুকে নিজ লাঠি দ্বারা আঘাত করলেন, তৎক্ষণাৎ পানি দ্বিখণ্ডিত হয়ে দুই পার্শ্বে দুই পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে গেল। মধ্যস্থলে রাস্তা বের হল এবং হযরত মূসার আদেশে বনি ইসরাঈলরা তাতে নেমে পড়ল এবং শুকনা পথের মতো তার উপর দিয়ে হেঁটে সমুদ্রের অপর পাড়ে চলে গেল।
ফেরাউন এটা দেখে নিজ কওমকে বলল, এটা আমারই মহিমা, তোমরা বনি ইসরাঈলকে গিয়ে ধরে ফেলবে। অতএব তোমরা চল। ফেরাউন এবং তার সেনাবাহিনী বনি ইসরাঈলের পিছে পিছে সেই পথেই নেমে পড়ল। কিন্তু আল্লাহ পাকের মহিমা হলো, বনি ইসরাঈলরা যখন সবাই অপর পাড়ে নিরাপদে পৌঁছে গেল, তখন পানি আল্লাহ পাকের আদেশে পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরে আসল। এদিকে ফেরাউন ও তার গোটা সেনাবাহিনী, যারা তখনও মধ্য সমুদ্রে ছিল, নিমজ্জিত হয়ে গেল। ফেরাউন যখন ডুবতে লাগল এবং আযাবের ফেরেশতাদেরকে সম্মুখে দেখতে লাগল, তখন ডেকে বলতে লাগল— "আমি সেই ওহদাহু লা-শারীকা লাহুর উপর ঈমান আনছি, যাঁর উপর বনি ইসরাঈলরা ঈমান এনেছে, আর আমি আল্লাহর ফরমাবরদার বান্দাগণের দলভুক্ত।” কিন্তু এ ঈমান যেহেতু প্রকৃত ঈমান ছিল না, বরং মুক্তিলাভের উদ্দেশ্যে একটি অস্থিরতামূলক উক্তি ছিল, তাই আল্লাহ পাকের তরফ হতে জবাব আসল— "এখন এটা বলছ, অথচ এর পূর্বে যখন স্বীকার করার সময় ছিল, তখন অস্বীকার এবং অব্যাহত বিরোধিতাই করে গেছ এবং প্রকৃতপক্ষে তুমি ফাসাদ বিস্তারকারীদের মধ্যে ছিলে।"
📄 গো-বাছুর পূজার ঘটনা
হযরত মূসা আ. যখন তাওরাত আনয়নের জন্য তূর পর্বতের দিকে তাশরিফ নিয়ে গেলেন, তখন বনি ইসরাঈলকে বললেন: “তূর পর্বতে আমার এতেকাফের মুদ্দত একমাস। সময় শেষ হওয়ার পর তৎক্ষণাৎ আমি তোমাদের নিকট ফিরে আসব। হারুন আ. তোমাদের নিকট রইলেন। তিনি তোমাদের যাবতীয় অবস্থার তত্ত্বাবধান করবেন।” কিন্তু তূর পর্বতে পৌঁছে সেই একমাসের মুদ্দত চল্লিশ দিন হয়ে গেল। এ সময় সামেরী নামক এক ব্যক্তি সুযোগ গ্রহণ করল। সে বনি ইসরাঈলকে বলল, যদি তোমরা নিজেদের সে সমস্ত অলংকারাদি আমার নিকট নিয়ে আস, যা তোমরা মিসরীয়দের নিকট হতে ধার করে এনেছিলে, তা হলে আমি তা দ্বারা তোমাদের জন্য মঙ্গলজনক একটি কাজ করে দিব।
যখন বনি ইসরাঈলরা সমস্ত অলংকার তার নিকট এনে দিল, তখন সে অলংকারগুলিকে আগুনের ভাট্টিতে দিয়ে গলিয়ে ফেলল। এর দ্বারা গো-বাছুরের দেহ প্রস্তুত করল। এরপর নিজের থলি হতে এক মুষ্টি মাটি বের করে সেই দেহের ভিতরে রাখল। এতে বাছুরটির মধ্যে প্রাণের লক্ষণ দেখা গেল। সেটি গো-বাছুরের মতো হাম্বা হাম্বা ডাকতে লাগল। সামেরী বনি ইসরাঈলকে বলল মূসা আ.-এর ভুল হয়েছে। তিনি খোদার অন্বেষণে তূর পাহাড়ে গিয়েছেন। তোমাদের মাবুদ তো এখানেই বিদ্যমান। বনি ইসরাঈলরা সহজেই এ প্রস্তাবটি কবুল করে নিল। হযরত হারুন আ. এ দেখে বনি ইসরাঈলকে খুব বুঝালেন, এরূপ করো না। কিন্তু তারা হারূন আ.-এর কথা মান্য করতে অস্বীকার করল।
অপরদিকে আল্লাহ তাআলা হযরত মূসা আ.-কে এ সম্বন্ধে অবহিত করে দেন। হযরত মূসা আ. অত্যন্ত দুঃখ, ক্রোধ ও লজ্জার সঙ্গে কওমের দিকে ফিরে আসলেন এবং কওমকে সম্বোধন করে বললেন, তোমরা এ কী করলে!? তারা বলল, আমাদের কোনো দোষ নেই। সামেরী অলংকার চেয়ে নিয়ে এই 'সঙ' বানিয়ে দিয়েছে এবং আমাদেরকে গোমরাহ করেছে। মূসা আ. অত্যন্ত উষ্ণ মেজাজের লোক ছিলেন। তিনি তাঁর ভাই হারুন আ.-এর ঘাড় ধরে ফেললেন এবং দাড়ির দিকেও হাত বাড়ালেন। তখন হযরত হারুন আ. বললেন, হে আমার মাতৃনন্দন! আমার কোনোই দোষ নেই। আমি তাদেরকে যতই বুঝালাম, তারা কোনো প্রকারেই মানল না বরং তারা আমাকে দুর্বল পেয়ে আমাকে হত্যা করার সংকল্প করেছিল। আমি এ অবস্থা দেখে মনে করলাম, এখন যদি এদের সাথে লড়াই বাঁধিয়ে দিই, তবে পাছে না আমার উপর এ দোষারোপ হয়, আমার অনুপস্থিতিতে তুমি কওমের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে দিয়েছ।
হারুন আ.-এর এ যুক্তিযুক্ত প্রমাণ শুনে তাঁর দিক হতে হযরত মূসা আ.-এর ক্রোধ প্রশমিত হয়ে গেল। এখন সামেরীকে লক্ষ্য করে বলতে লাগলেন, সামেরী! তুমি এটা কেমন সঙ বানালে? সামেরী উত্তর করল: "আমি এমন একটি বিষয় দেখতে পেয়েছি, যা এ বনি ইসরাঈলদের মধ্যে কেউই দেখতে পায় নি।” অর্থাৎ ফেরাউনের নিমজ্জিত হওয়ার সময় হযরত জিবরাইল আ. অশ্বরোহী অবস্থায় ছিলেন। আমি দেখতে পেলাম, তাঁর অশ্বের ক্ষুরের মাটিতে প্রাণের লক্ষণ সৃষ্টি হয়ে যায়। তখন আমি সেই মাটি হতে এক মুষ্টি নিয়ে নিজের নিকট রাখলাম এবং সেই মাটি এই বাছুরের ভিতরে নিক্ষেপ করলাম। হযরত মূসা আ. বললেন, আচ্ছা! তোমার জন্য পৃথিবীতে এ শাস্তির ব্যবস্থা করা হল, তুমি উম্মাদের মতো লক্ষ্যহীনভাবে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াবে এবং কোনো মানুষকে তোমার নিকটবর্তী হতে দেখলেই বলবে : দেখো, আমাকে যেন স্পর্শ না কর! এরপর তিনি বাছুরটি আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দিলেন এবং সেই ছাই নদীতে ভাসিয়ে দিলেন।