📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 মূসা আ.-এর সঙ্গে কারূনের ঘটনা

📄 মূসা আ.-এর সঙ্গে কারূনের ঘটনা


আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, কারূন ছিল মূসা আ.- এর চাচাতো ভাই। মূসা আ. ও কারূনের বংশপরম্পরা নিম্নরূপ বর্ণিত আছে: কারূন ইবনে ইয়াসহার ইবনে কাহিস; মূসা আ. ইবনে ইমরান ইবনে হাফিছ। অধিকাংশ উলামায়ে কিরামের মতে কারূন ছিল মূসা আ.-এর চাচাতো ভাই।

আল্লাহ তাআলা কারূনের প্রচুর সম্পদের কথা কোরআনুল কারিমে উল্লেখ করেছেন। তার চাবিগুলো শক্তিশালী লোকদের একটি দলের জন্যে কষ্টকর বোঝা হয়ে যেত। কেউ কেউ বলেন, এ চাবিগুলো ছিল চামড়ার তৈরি আর এগুলো বহন করতে ষাটটি খচ্চরের প্রয়োজন হত। তার সম্প্রদায়ের উপদেশ দাতাগণ তাকে উপদেশ দিয়েছিলেন। তাঁরা তাকে বলেছিলেন, তোমাকে যা দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে গর্ব কর না এবং অন্যের উপর দর্প কর না। কেননা, আল্লাহ তাআলা দাম্ভিক লোকদের পছন্দ করেন না। আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন, তা দিয়ে আখেরাতের আবাস অন্বেষণ কর না।

তার সম্প্রদায়ের এরূপ স্পষ্ট নসিহতের জবাবে তার একমাত্র উত্তর ছিল, আমার জ্ঞানের জন্যে আমাকে এসব দেওয়া হয়েছে। তোমরা আমাকে যেসব নসিহত করলে এগুলো মান্য করার আমার কোনো প্রয়োজন নেই। কেননা এগুলো আল্লাহ তাআলা আমায় দান করেছেন এ জন্য, তিনি আমাকে এসব বস্তুর উপযুক্ত বলে মনে করেছেন।

বহু তাফসিরকারক উল্লেখ করেছেন, একদিন কারূন মূল্যবান পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধান করে গাড়ি, ঘোড়া, বহু সংখ্যক লস্কর ও পরিচর্যাকারী নিয়ে শহরে বের হল। যারা পার্থিব সম্পদকে অত্যধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে, কারূনকে এরূপ শান-শওকতে দেখে তারা কামনা করতে লাগল যদি তাদেরও এরূপ ধন-সম্পদ থাকত!

ইমাম বুখারী রহ. আবু সালিম রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন: এক ব্যক্তিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখতে পেলেন, সে তার পরিধেয় বস্ত্র হেঁচড়িয়ে চলছে। সে ভূগর্ভে চলে যাচ্ছে। কিয়ামতের দিন পর্যন্ত সে এভাবে ভূগর্ভে তলিয়ে যেতেই থাকবে।

কথিত আছে, একদিন কারূন সাজসজ্জা করে সৈন্য-সামন্ত, ঘোড়া, খচ্চর ও মূল্যবান পোশাক-পরিচ্ছেদে সজ্জিত হয়ে তার সম্প্রদায়কে নিজ ক্ষমতা প্রদর্শনার্থে মূসা আ.-এর মাহফিলের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। মূসা আ. তাকে ডাকলেন এবং তার এরূপ করার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। কারূন বলল, হে মূসা! যদিও তুমি নবুয়ত প্রাপ্ত হয়ে আমার উপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছ, কিন্তু মনে রেখো, আমিও বিত্ত-সম্পদের দিক থেকে তোমার উপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছ। যদি ইচ্ছে কর, তা হলে তুমি ঘরের বাইরে বের হয়ে আমার বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে বদদুআ করতে পার এবং আমিও তোমার বিরুদ্ধে বদদুআ করব। তখন তারা উভয়েই জনতার সামনে হাযির হলেন। মূসা আ. বললেন, 'তুমি দুআ করবে, না কি আমি দুআ করব? "এরপর কারুন দুআ করল কিন্তু মূসা আ.-এর বিরুদ্ধে তার দুআ কবুল হল না। মূসা আ. বললেন, এবার আমি দুআ করব কি? কারূন বলল, 'হ্যাঁ। মূসা আ. বললেন, اَللَّهُمَّ مُرِ الْأَرْضَ فَلِতَطَعْنَ الْيَوْমَ 'হে আল্লাহ! ভূমিকে নির্দেশ দাও, যাতে সে আজ আমার নির্দেশ মান্য করে।' এরপর আল্লাহ তাআলা মূসা আ.-কে ওহির মাধ্যমে জানালেন, 'আমি ভূমিকে নির্দেশ দিয়েছি।' তখন মূসা আ. বললেন, 'হে ভূমি! তাদেরকে পাকড়াও কর! ভূমি তাদেরকে তাদের পা পর্যন্ত গ্রাস করল। এরপর মূসা আ. বললেন, 'হে ভূমি, তাদেরকে আরো পাকড়াও কর।' ভূমি তাদেরকে হাঁটু পর্যন্ত গ্রাস করল। তারপর কাঁধ পর্যন্ত। পুনরায় মূসা আ. বললেন, 'তাদের পুঞ্জীভূত ধন-দৌলতের দিকে অগ্রসর হও। 'ভূমি এগুলোর দিকে অগ্রসর হল এবং তারা সে দিকে তাকাল। মূসা আ. আপন হাতে ইঙ্গিত করলেন এবং বললেন, 'বনু লাওয়ি নিপাত যাও!' সাথে সাথে ভূমি তাদেরকে গ্রাস করে ফেলল।

কাতাদা রহ. বলেন, কারূন ও তার সম্প্রদায় কিয়ামত পর্যন্ত প্রতিদিন একটি মানব দেহের পরিমাণ তলিয়ে যেতে থাকবে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, সপ্ত যমিন পর্যন্ত ভূমি তাদেরকে ভূগর্ভস্থ করেছিল।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 মূসা আ.-এর মর্যাদা, স্বভাব ও গুণাবলী

📄 মূসা আ.-এর মর্যাদা, স্বভাব ও গুণাবলী


ইমাম বুখারী রহ. আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন। "রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন; মূসা আ. ছিলেন এক লজ্জাশীল ও পর্দা রক্ষাকারী ব্যক্তি। শালীনতার কারণে তাঁর দেহের কোনো অংশই দেখা যেত না। তাই বনি ইসরাঈলের কিছু সংখ্যক লোক তাকে অপবাদ দিল ও বলতে লাগল, কোনো রোগের কারণে তিনি নিজের পায়ের চামড়া কাউকে দেখতে দেন না। তিনি শ্বেত রোগ কিংবা একশিরা অথবা অন্য রোগে আক্রান্ত রয়েছেন। আল্লাহ তাঁকে সে সব দোষ থেকে মুক্ত বলে প্রতিপন্ন করতে ইচ্ছে করলেন। একদিন মূসা আ. এক নির্জন স্থানে গোসল করছিলেন। পাথরের উপর কাপড় রেখেছিলেন। যখন তিনি গোসল সেরে কাপড় পরার জন্যে কাপড় ধরতে গেলেন, অমনি পাথর কাপড় নিয়ে দৌড়াতে লাগল। মূসা আ. হাতে লাঠি ধারণ করলেন ও পাথরের পেছনে ছুটলেন এবং বলতে লাগলেন, হে পাথর! আমার কাপড়, হে পাথর! আমার কাপড়। এমনিভাবে তিনি দৌড়াতে দৌড়াতে বনি ইসরাঈলের গণ্যমান্য লোকদের সামনে হাযির হয়ে গেলেন। তখন তারা তাঁকে বিবস্ত্র অবস্থায় দেখে নিল, আল্লাহ তাআলা তাঁকে সর্বাঙ্গ সুন্দর করে সৃষ্টি করেছেন। এভাবে আল্লাহ তাআলা তাদের অপবাদ থেকে তাঁকে নির্দোষ প্রমাণ করলেন। পাথরটি থেমে গেল, মূসা আ. আপন কাপড় তুলে নিয়ে পরে নিলেন। আর পাথরকে তিনি লাঠি দিয়ে আঘাত করতে লাগলেন। তিনটি, চারটি কিংবা পাঁচটি আঘাতের কারণে পাথরের উপর অংশ ক্ষত-বিবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল।

ইমাম বুখারী রহ. আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু সম্পদ সাহাবীদের মধ্যে বণ্টন করেন। তখন এক ব্যক্তি বলল, এ বণ্টনের দ্বারা আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির দিকে লক্ষ রাখা হয় নি। বর্ণনাকারী বলেন, তখন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে তাঁকে তা জানালাম। তখন আমি তাঁর চেহারায় ক্রোধের ভাব লক্ষ করলাম। তখন তিনি ইরশাদ করেন, মূসা আ.-এর ওপর আল্লাহ তাআলার রহমত বর্ষিত হোক! তাকে এর চাইতেও বেশি ক্লেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি ধৈর্যধারণ করেছিলেন।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 মূসা আ.-এর হজ পালন

📄 মূসা আ.-এর হজ পালন


ইমাম আহমদ রহ. আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম 'আল-আযরাক' উপত্যকায় গমন করেন এবং প্রশ্ন করেন, এটা কোন উপত্যকা? উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আল-আযরাক উপত্যকা। তখন তিনি ইরশাদ করলেন, আমি যেন মূসা আ.-কে দেখতে পাচ্ছি, তিনি যেন রাস্তার মোড় থেকে অবতরণ করছেন এবং তালবিয়া সহকারে আল্লাহ তাআলাকে উচ্চ স্বরে ডাকছেন।

ইমাম আহমদ রহ. মুজাহিদ রহ. থেকে বর্ণনা করেন, ... আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমি এ কথা বলতে শুনেছি, ইবরাহীম আ. সম্বন্ধে জানতে হলে তোমাদের সাথীর দিকে অর্থাৎ আমার দিকে লক্ষ কর। আর মূসা আ. ছিলেন ধূসর রংয়ের ব্যক্তি, তাঁর ছিল কোঁকড়ানো চুল। তিনি লাল রঙের উটের ওপর সওয়ার ছিলেন। উটের নাকের দড়ি ছিল খেজুর গাছের ছালের। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আমি যেন তাঁকে দেখতে পাচ্ছি। আর তিনি উপত্যকা থেকে তালবীয়া পড়ায় রত অবস্থায় নেমে আসছেন।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 হযরত মূসা আ.-এর ইনতেকাল

📄 হযরত মূসা আ.-এর ইনতেকাল


ইমাম বুখারী রহ. তাঁর বুখারীতে 'মূসা আ.-এর ইনতেকাল শিরোনামে আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন। একদিন মৃত্যুর ফেরেশতা (আযরাঈল)-কে মূসা আ.-এর কাছে প্রেরণ করা হয়। যখন তিনি মূসা আ.-এর কাছে আসলেন, তখন তিনি তাঁকে চপেটাঘাত করলেন। ফেরেশতা আল্লাহ তাআলার দরবারে ফিরে গিয়ে আরয করলেন, 'আপনি আমাকে এমন এক বান্দার কাছে প্রেরণ করেছেন যিনি মৃত্যু চান না।' আল্লাহ তা'আলা বললেন, তাঁর কাছে পুনরায় যাও! তাঁকে একটি ষাঁড়ের পিঠে হাত রাখতে বল এবং এ কথাটিও বল, তার হাতের নিচে যতগুলো চুল পড়বে তাঁকে তত বছরের আয়ু দেওয়া হবে।' মূসা আ. বললেন, 'হে আমার প্রতিপালক! তারপর কি হবে? আল্লাহ বললেন, 'তারপর মৃত্যু। তখন তিনি বললেন, 'তা হলে এখনই তা হয়ে যাক।'

বর্ণনাকারী বলেন, তখন তিনি আল্লাহ তাআলার দরবারে আরয করলেন: যেন তাঁকে একটি ঢিল নিক্ষেপের দূরত্বে পবিত্র ভূমি বায়তুল মুকাদ্দাসের নিকটবর্তী করা হয়। আবু হুরাইরা রাযি. বলেন, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “যদি আমি সেখানে এখন থাকতাম, তা হলে ওই স্থানটিতে তাঁর কবরটি তোমাদেরকে চিহ্নিত করে দেখাতাম। এটা রাস্তার পার্শ্বে 'লাল ঢিবির' কাছে অবস্থিত।

ইমাম বুখারী রহ. আনাস ইবনে মালিক রাযি. থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, মিরাজের রাতে যখন আমি মূসা আ.-এর কাছে গমন করলাম তখন আমি তাঁকে লাল ঢিবির কাছে তাঁর কবরে নামায আদায় করতে দেখলাম।

ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ রহ. উল্লেখ করেছেন, একদিন মূসা আ. একদল ফেরেশতার কাছে আগমন করলেন। তারা তখন একটি কবর খুঁড়ছিলেন। এ কবর থেকে উত্তম, সুন্দর ও মনোরম কবর কখনো দেখা যায় নি। তিনি ফেরেশতাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, আপনারা কার জন্যে এ কবরটি খুঁড়ছেন? তাঁরা বললেন, “এটা আল্লাহ তাআলার এক বান্দার জন্যে যিনি খুবই সম্মানিত। যদি আপনি এরূপ সম্মানিত বান্দা হতে চান তা হলে এ কবরে প্রবেশ করুন। বহুক্ষণ এখানে সটান শুয়ে পড়ুন এবং আপনার প্রতিপালকের প্রতি মনোনিবেশ করুন এবং আস্তে আস্তে নিঃশ্বাস নিতে থাকুন। তিনি তাই করলেন ও ইনতেকাল করলেন। ফেরেশতাগণ তাঁর জানাযার নামায আদায় করেন এবং তাঁকে দাফন করেন। ওলামায়ে কেরাম উল্লেখ করেছেন, হযরত মূসা আ. যখন ইনতেকাল করেন, তখন তাঁর বয়স ছিল একশ বিশ বছর।

ফন্ট সাইজ
15px
17px