📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 বনি ইসরাঈলের গাভী

📄 বনি ইসরাঈলের গাভী


আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, বনি ইসরাঈলের মধ্যে এক ব্যক্তি ছিল খুবই ধনী ও অতিশয় বৃদ্ধ। তার ছিল বেশ কয়েকজন ভাতিজা। তারা তার ওয়ারিশ হওয়ার জন্যে তার মৃত্যু কামনা করছিল। তাই একরাতে তাদের একজন তাকে হত্যা করল এবং তার লাশ চৌরাস্তায় ফেলে রেখে এল। ভোর বেলায় হত্যাকারী সম্বন্ধে লোকজনের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিল। তারা আল্লাহর নবীর কাছে গিয়ে এটার ফয়সালা প্রার্থনা করল। মূসা আ. আপন প্রতিপালকের নিকট তা জানতে চান। আল্লাহ তাআলা মূসা আ.-কে হুকুম দিলেন; তুমি তাদেরকে একটি গাভী যবাই করতে আদেশ কর। তিনি তাই বললেন।

প্রতি উত্তরে তারা বলল, তুমি কি আমাদের সঙ্গে ঠাট্টা করছ? আমরা তোমাকে নিহত ব্যক্তি প্রসঙ্গে প্রশ্ন করছি, আর তুমি আমাদের গরু যবাই করার পরামর্শ দিচ্ছ? মূসা আ. বললেন, আমার কাছে প্রেরিত ওহি ব্যতীত অন্য কিছু বলার ব্যাপারে আমি আল্লাহ তাআলার নিকট পানাহ চাই। তোমরা আল্লাহ তাআলাকে প্রশ্ন করার জন্যে আবেদন করেছ, আল্লাহ তাআলা প্রশ্নের উত্তরে এটা বলেছেন।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বলেছেন: যদি তারা যে কোনো একটি গাভী যবাই করত, তা হলে তার দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য হাসিল হত। কিন্তু তারা ব্যাপারটি জটিল করে তুলল। এরপর তারা গরুটির গুণাগুণ, রঙ ও বয়স সম্পর্কে প্রশ্ন করল আর তাদেরকে প্রতিপালক আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এমনভাবে জবাব দেওয়া হল যে, এরূপ গরু খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর হয়ে দাঁড়াল।

সুদ্দী রহ. উল্লেখ করেছেন, তারা প্রথমত গরুটির সম-ওজনের স্বর্ণ দিয়ে গরুটি ক্রয় করতে চায়। কিন্তু গরুর মালিক রাজি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তার ওজনের দশগুণ স্বর্ণ দিয়ে তারা গরুটি ক্রয় করল। এরপর আল্লাহর নবী মূসা আ. এটাকে যবাই করার নির্দেশ দিলেন। তারা গরুটি যবাই করার ব্যাপারে প্রথমত ইতস্তত করছিল। পরে রাজি হল। এরপর আল্লাহ তাআলার তরফ থেকে হুকুম আসল, যেন তারা নিহত ব্যক্তিটিকে যবাইকৃত গরুটির কোনো অঙ্গ দ্বারা আঘাত করে। যখন তারা মৃত ব্যক্তিকে ওটার দ্বারা আঘাত করল, তখন আল্লাহ তাআলা তাকে পুনর্জীবিত করলেন এবং লোকটি উঠে দাঁড়াল। তার গলার শিরা থেকে রক্ত ঝরছিল। মূসা আ. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কে তোমাকে হত্যা করেছে? সে বলল, 'আমার ভাতিজা।' তারপর সে পূর্বের মতো অবস্থায় ফিরে গেল।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 তাঁবু-গম্বুজের নির্মাণ প্রসঙ্গ

📄 তাঁবু-গম্বুজের নির্মাণ প্রসঙ্গ


কিতাবীরা বলে, আল্লাহ তাআলা একবার মূসা আ.-কে শিমশার কাঠ, পশুর চামড়া ও ভেড়ার পশমের দ্বারা একটি তাঁবু তৈরি করতে নির্দেশ দিলেন। তাদের বিস্তারিত বর্ণনা অনুযায়ী রঙিন রেশম, স্বর্ণ ও রৌপ্য দ্বারা এটাকে সজ্জিত করার হুকুম দেওয়া হয়েছিল। এতে ছিল ১০টি শামিয়ানা। প্রতিটি শামিয়ানার দৈর্ঘ ছিল ২৮ হাত ও প্রস্থ ছিল ৪ হাত। এতে ছিল ৪টি দরজা। এর রশিগুলো ছিল বিভিন্ন প্রকার ও বিভিন্ন বর্ণের রেশমের। এর চৌকাঠ এবং তাক ছিল স্বর্ণ-রৌপ্যের।

আল্লাহ তাআলা মূসা আ.-কে শিমশার কাঠের একটি সিন্দুকও তৈরি করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। যার দৈর্ঘ আড়াই হাত এবং প্রস্থ দুই হাত এবং উচ্চতা ছিল দেড় হাত। ভিতরে ও বাইরে খাঁটি স্বর্ণ দ্বারা মোড়ানো।

উপর্যুক্ত তাঁবুটি তাদের বছরের প্রথম দিন স্থাপন করা হয়। আর সেই দিনটি ছিল বসন্ত ঋতুর প্রথম দিন। আবার 'শাহাদতের তাঁবু'ও এতে স্থাপন করা হয়েছিল। সম্ভবত কুরআনুল করীমে এর প্রতিই ইঙ্গিত করেই ইরশাদ হয়েছে:

إِنَّ آيَةَ مُلْكِهِ أَنْ يَأْتِيَكُمُ التَّابُوتُ فِيهِ سَكِينَةٌ مِنْ رَبِّكُمْ وَبَقِيَّةٌ مِمَّا تَرَكَ آلُ مُوسَى وَآلُ هَارُونَ تَحْمِلُهُ الْمَلَائِكَةُ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً لَكُمْ إِنْ كُنتُمْ مُؤْمِنِينَ

"তার রাজত্বের নিদর্শন এই যে, তোমাদের কাছে সেই তাবূত (ইসরাঈলীদের পবিত্র সিন্দুক) আসবে, যাতে তোমাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে চিত্ত প্রশান্তি এবং মূসা ও হারূন বংশীয়গণ যা পরিত্যাগ করেছে তার অবশিষ্টাংশ থাকবে; ফেরেশতাগণ এটা বহন করে আনবে। তোমরা মুমিন হও, তবে অবশ্যই তোমাদের জন্য এটাতে নিদর্শন রয়েছে।" (সূরা বাকারা: ২৪৮)

বায়তুল মুকাদ্দাসের নিয়ন্ত্রণভার যখন ইউশা ইবনে নূন আ.-এর ওপর ন্যস্ত হল, তখন তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসের একটি পাথরের উপর এ তাঁবু গম্বুজটি স্থাপন করেন। বনি ইসরাঈলরা এটার দিকে মুখ করে নামায আদায় করত। এরপর যখন তাঁবু গম্বুজটি বিনষ্ট হয়ে যায় তখন তারা গম্বুজের স্থান অর্থাৎ পাথরের দিকেই নামায আদায় করতে লাগল। এ জন্যেই ইউশা আ.-এর পর থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর যুগ পর্যন্ত সমস্ত নবীর কেবলা ছিল এটাই।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 মূসা আ.-এর সঙ্গে কারূনের ঘটনা

📄 মূসা আ.-এর সঙ্গে কারূনের ঘটনা


আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, কারূন ছিল মূসা আ.- এর চাচাতো ভাই। মূসা আ. ও কারূনের বংশপরম্পরা নিম্নরূপ বর্ণিত আছে: কারূন ইবনে ইয়াসহার ইবনে কাহিস; মূসা আ. ইবনে ইমরান ইবনে হাফিছ। অধিকাংশ উলামায়ে কিরামের মতে কারূন ছিল মূসা আ.-এর চাচাতো ভাই।

আল্লাহ তাআলা কারূনের প্রচুর সম্পদের কথা কোরআনুল কারিমে উল্লেখ করেছেন। তার চাবিগুলো শক্তিশালী লোকদের একটি দলের জন্যে কষ্টকর বোঝা হয়ে যেত। কেউ কেউ বলেন, এ চাবিগুলো ছিল চামড়ার তৈরি আর এগুলো বহন করতে ষাটটি খচ্চরের প্রয়োজন হত। তার সম্প্রদায়ের উপদেশ দাতাগণ তাকে উপদেশ দিয়েছিলেন। তাঁরা তাকে বলেছিলেন, তোমাকে যা দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে গর্ব কর না এবং অন্যের উপর দর্প কর না। কেননা, আল্লাহ তাআলা দাম্ভিক লোকদের পছন্দ করেন না। আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন, তা দিয়ে আখেরাতের আবাস অন্বেষণ কর না।

তার সম্প্রদায়ের এরূপ স্পষ্ট নসিহতের জবাবে তার একমাত্র উত্তর ছিল, আমার জ্ঞানের জন্যে আমাকে এসব দেওয়া হয়েছে। তোমরা আমাকে যেসব নসিহত করলে এগুলো মান্য করার আমার কোনো প্রয়োজন নেই। কেননা এগুলো আল্লাহ তাআলা আমায় দান করেছেন এ জন্য, তিনি আমাকে এসব বস্তুর উপযুক্ত বলে মনে করেছেন।

বহু তাফসিরকারক উল্লেখ করেছেন, একদিন কারূন মূল্যবান পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধান করে গাড়ি, ঘোড়া, বহু সংখ্যক লস্কর ও পরিচর্যাকারী নিয়ে শহরে বের হল। যারা পার্থিব সম্পদকে অত্যধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে, কারূনকে এরূপ শান-শওকতে দেখে তারা কামনা করতে লাগল যদি তাদেরও এরূপ ধন-সম্পদ থাকত!

ইমাম বুখারী রহ. আবু সালিম রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন: এক ব্যক্তিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখতে পেলেন, সে তার পরিধেয় বস্ত্র হেঁচড়িয়ে চলছে। সে ভূগর্ভে চলে যাচ্ছে। কিয়ামতের দিন পর্যন্ত সে এভাবে ভূগর্ভে তলিয়ে যেতেই থাকবে।

কথিত আছে, একদিন কারূন সাজসজ্জা করে সৈন্য-সামন্ত, ঘোড়া, খচ্চর ও মূল্যবান পোশাক-পরিচ্ছেদে সজ্জিত হয়ে তার সম্প্রদায়কে নিজ ক্ষমতা প্রদর্শনার্থে মূসা আ.-এর মাহফিলের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। মূসা আ. তাকে ডাকলেন এবং তার এরূপ করার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। কারূন বলল, হে মূসা! যদিও তুমি নবুয়ত প্রাপ্ত হয়ে আমার উপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছ, কিন্তু মনে রেখো, আমিও বিত্ত-সম্পদের দিক থেকে তোমার উপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছ। যদি ইচ্ছে কর, তা হলে তুমি ঘরের বাইরে বের হয়ে আমার বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে বদদুআ করতে পার এবং আমিও তোমার বিরুদ্ধে বদদুআ করব। তখন তারা উভয়েই জনতার সামনে হাযির হলেন। মূসা আ. বললেন, 'তুমি দুআ করবে, না কি আমি দুআ করব? "এরপর কারুন দুআ করল কিন্তু মূসা আ.-এর বিরুদ্ধে তার দুআ কবুল হল না। মূসা আ. বললেন, এবার আমি দুআ করব কি? কারূন বলল, 'হ্যাঁ। মূসা আ. বললেন, اَللَّهُمَّ مُرِ الْأَرْضَ فَلِতَطَعْنَ الْيَوْমَ 'হে আল্লাহ! ভূমিকে নির্দেশ দাও, যাতে সে আজ আমার নির্দেশ মান্য করে।' এরপর আল্লাহ তাআলা মূসা আ.-কে ওহির মাধ্যমে জানালেন, 'আমি ভূমিকে নির্দেশ দিয়েছি।' তখন মূসা আ. বললেন, 'হে ভূমি! তাদেরকে পাকড়াও কর! ভূমি তাদেরকে তাদের পা পর্যন্ত গ্রাস করল। এরপর মূসা আ. বললেন, 'হে ভূমি, তাদেরকে আরো পাকড়াও কর।' ভূমি তাদেরকে হাঁটু পর্যন্ত গ্রাস করল। তারপর কাঁধ পর্যন্ত। পুনরায় মূসা আ. বললেন, 'তাদের পুঞ্জীভূত ধন-দৌলতের দিকে অগ্রসর হও। 'ভূমি এগুলোর দিকে অগ্রসর হল এবং তারা সে দিকে তাকাল। মূসা আ. আপন হাতে ইঙ্গিত করলেন এবং বললেন, 'বনু লাওয়ি নিপাত যাও!' সাথে সাথে ভূমি তাদেরকে গ্রাস করে ফেলল।

কাতাদা রহ. বলেন, কারূন ও তার সম্প্রদায় কিয়ামত পর্যন্ত প্রতিদিন একটি মানব দেহের পরিমাণ তলিয়ে যেতে থাকবে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, সপ্ত যমিন পর্যন্ত ভূমি তাদেরকে ভূগর্ভস্থ করেছিল।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 মূসা আ.-এর মর্যাদা, স্বভাব ও গুণাবলী

📄 মূসা আ.-এর মর্যাদা, স্বভাব ও গুণাবলী


ইমাম বুখারী রহ. আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন। "রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন; মূসা আ. ছিলেন এক লজ্জাশীল ও পর্দা রক্ষাকারী ব্যক্তি। শালীনতার কারণে তাঁর দেহের কোনো অংশই দেখা যেত না। তাই বনি ইসরাঈলের কিছু সংখ্যক লোক তাকে অপবাদ দিল ও বলতে লাগল, কোনো রোগের কারণে তিনি নিজের পায়ের চামড়া কাউকে দেখতে দেন না। তিনি শ্বেত রোগ কিংবা একশিরা অথবা অন্য রোগে আক্রান্ত রয়েছেন। আল্লাহ তাঁকে সে সব দোষ থেকে মুক্ত বলে প্রতিপন্ন করতে ইচ্ছে করলেন। একদিন মূসা আ. এক নির্জন স্থানে গোসল করছিলেন। পাথরের উপর কাপড় রেখেছিলেন। যখন তিনি গোসল সেরে কাপড় পরার জন্যে কাপড় ধরতে গেলেন, অমনি পাথর কাপড় নিয়ে দৌড়াতে লাগল। মূসা আ. হাতে লাঠি ধারণ করলেন ও পাথরের পেছনে ছুটলেন এবং বলতে লাগলেন, হে পাথর! আমার কাপড়, হে পাথর! আমার কাপড়। এমনিভাবে তিনি দৌড়াতে দৌড়াতে বনি ইসরাঈলের গণ্যমান্য লোকদের সামনে হাযির হয়ে গেলেন। তখন তারা তাঁকে বিবস্ত্র অবস্থায় দেখে নিল, আল্লাহ তাআলা তাঁকে সর্বাঙ্গ সুন্দর করে সৃষ্টি করেছেন। এভাবে আল্লাহ তাআলা তাদের অপবাদ থেকে তাঁকে নির্দোষ প্রমাণ করলেন। পাথরটি থেমে গেল, মূসা আ. আপন কাপড় তুলে নিয়ে পরে নিলেন। আর পাথরকে তিনি লাঠি দিয়ে আঘাত করতে লাগলেন। তিনটি, চারটি কিংবা পাঁচটি আঘাতের কারণে পাথরের উপর অংশ ক্ষত-বিবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল।

ইমাম বুখারী রহ. আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু সম্পদ সাহাবীদের মধ্যে বণ্টন করেন। তখন এক ব্যক্তি বলল, এ বণ্টনের দ্বারা আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির দিকে লক্ষ রাখা হয় নি। বর্ণনাকারী বলেন, তখন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে তাঁকে তা জানালাম। তখন আমি তাঁর চেহারায় ক্রোধের ভাব লক্ষ করলাম। তখন তিনি ইরশাদ করেন, মূসা আ.-এর ওপর আল্লাহ তাআলার রহমত বর্ষিত হোক! তাকে এর চাইতেও বেশি ক্লেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি ধৈর্যধারণ করেছিলেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px