📄 বনি ইসরাঈলের বাছুর পূজা
হযরত মূসা আ. যখন আল্লাহ তাআলা নির্ধারিত সময়ে উপনীত হলেন, তখন তিনি তূর পর্বতে অবস্থান করে আপন প্রতিপালকের সঙ্গে একান্ত কথা বললেন। মূসা আ. আল্লাহ তাআলার নিকট বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চান এবং আল্লাহ তাআলা সে সব বিষয়ে তাকে জানিয়ে দেন। তাদের মধ্যকার এক ব্যক্তি যাকে সামিরী বলা হয়, সে যেসব অলংকার ধারস্বরূপ নিয়েছিল সেগুলো দিয়ে সে একটি বাছুর-মূর্তি তৈরি করল এবং বনি ইসরাঈলের সামনে ফেরাউনকে আল্লাহ তাআলা ডুবিয়ে মারার সময় জিবরাঈল আ.-এর ঘোড়ার পায়ের এক মুষ্টি ধূলা মূর্তিটির ভিতরে নিক্ষেপ করল। সাথে সাথে বাছুর মূর্তিটি জীবন্ত বাছুরের মতো হাম্বা হাম্বা আওয়াজ দিতে লাগল। কেউ কেউ বলেন, এতে তা রক্ত-মাংসের জীবন্ত একটি বাছুরে রূপান্তরিত হয়ে যায় আর তা হাম্বা হাম্বা ডাকতে থাকে।
কেউ কেউ বলেন, যখন এটার পিছন দিক থেকে বাতাস ঢুকত এবং মুখ দিয়ে বের হত, তখনই হাম্বা হাম্বা আওয়াজ হত। যেমন সাধারণত গরু ডেকে থাকে। এতে তারা এর চতুর্দিকে নাচতে থাকে এবং উল্লাস প্রকাশ করতে থাকে। তারা বলতে থাকে, এটাই তোমাদের ও মূসা আ.-এর ইলাহ, কিন্তু তিনি ভুলে গেছেন। অর্থাৎ মূসা আ. আমাদের নিকটস্থ প্রতিপালককে ভুলে গেছেন এবং অন্যত্র গিয়ে তাকে খোঁজাখুঁজি করছেন। অথচ প্রতিপালক তো এখানেই রয়েছেন।
এর পর মূসা আ. তাদের কাছে ফিরে আসলেন এবং তাদের বাছুর পূজা করার বিষয়টি জানতে পারলেন। তাঁর সাথে ছিল বেশ কয়েকটি ফলক যেগুলোর মধ্যে তাওরাত লিপিবদ্ধ ছিল, তিনি এগুলো ফেলে দিলেন। মূসা আ. তাদের দিকে অগ্রসর হলেন এবং তাদেরকে ভর্ৎসনা করলেন এবং তাদের এ হীন কাজের জন্যে তাদেরকে দোষারোপ করলেন।
হারুন আ. তাদেরকে এরূপ জঘন্য কাজ থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছিলেন এবং তাদেরকে কঠোরভাবে ভর্ৎসনা করেছিলেন। বলেছিলেন হে আমার সম্প্রদায়! এর দ্বারা তো কেবল তোমাদেরকে পরীক্ষায় ফেলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা এ বাছুর ও এর হাম্বা রবকে তোমাদের জন্যে একটি পরীক্ষার বিষয় করেছেন। নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক খুবই দয়াময় অর্থাৎ এ বাছুর তোমাদের প্রভু নয়। সুতরাং আমি যা বলি তার অনুসরণ কর এবং আমার আদেশ মান্য কর। তারা বলেছিল, আমাদের কাছে মূসা ফিরে না আসা পর্যন্ত আমরা এটার পূজা থেকে কিছুতেই বিরত হব না।
এরপর মূসা আ. সামিরীর প্রতি মনোযোগী হলেন এবং বললেন, "তুমি যা করেছ কে তোমাকে এরূপ করতে বলেছিল?” উত্তরে সে বলল, "আমি জিবরাঈল আ.-কে দেখেছিলাম, তিনি ছিলেন একটি ঘোড়ার উপর সওয়ার। তখন আমি জিবরাঈল আ.-এর ঘোড়ার পায়ের ধুলা সংগ্রহ করেছিলাম। এর পর মূসা আ. বাছুরটি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেললেন। এরপর এটাকে মূসা আ. সমুদ্রে নিক্ষেপ করলেন এবং বনি ইসরাঈলকে সেই সমুদ্রের পানি পান করতে নির্দেশ দিলেন। তারা পানি পান করল। যারা বাছুরের পূজা করেছিল, বাছুরের ছাই তাদের ঠোঁটে লেগে রইল। এতে বোঝা গেল, তারাই ছিল এর পূজারী।
কিন্তু বাছুর পূজারীদের হত্যার শাস্তি ব্যতীত আল্লাহ তাআলা কোনো তওবা কবুল করলেন না। কথিত আছে, একদিন ভোরবেলা যারা বাছুর পূজা করে নি, তারা তরবারি হাতে নিল; অন্যদিকে আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি এমন ঘন কুয়াশা অবতীর্ণ করলেন, প্রতিবেশী প্রতিবেশীকে এবং একই বংশের একজন অন্যজনকে চিনতে পারছিল না। তারা বাছুর পূজারীদেরকে পাইকারীহারে হত্যা করল এবং তাদের মূলোৎপাটন করে দিল। কথিত রয়েছে, তারা সে দিনের একই প্রভাতে সত্তর হাজার লোককে হত্যা করেছিল।
📄 বনি ইসরাঈলের মাথায় তুর পাহাড়
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. ও প্রাচীন যুগের ওলামায়ে কেরামের অনেকেই বলেন, মূসা আ. যখন তাওরাত সম্বলিত ফলক নিয়ে নিজ সম্প্রদায়ের কাছে আগমন করলেন এবং নিজ সম্প্রদায়কে তা গ্রহণ করতে ও শক্তভাবে তা ধরতে নির্দেশ দিলেন, তখন তারা বলল: তাওরাতকে আমাদের কাছে খুলে ধরুন! যদি এর আদেশ নিষেধাবলী সহজ হয় তা হলে আমরা তা গ্রহণ করব। মূসা আ. বললেন, 'তাওরাতের মধ্যে যা কিছু রয়েছে তা তোমরা কবুল কর, তারা তা কয়েকবার প্রত্যাখ্যান করে। এরপর আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদেরকে হুকুম করেন তারা যেন তূর পাহাড় বনি ইসরাঈলের মাথার ওপর উত্তোলন করেন। অমনি পাহাড় তাদের মাথার ওপর মেঘখণ্ডের মতো ঝুলতে লাগল, তাদের তখন বলা হল, তোমরা যদি তাওরাতকে তার সব কিছুসহ কবুল না কর এই পাহাড় তোমাদের মাথার উপর পড়বে। তখন তারা তা কবুল করল। তাদেরকে সিজদা করার হুকুম দেওয়া হলো, তখন তারা সিজদা করল। তবে তারা পাহাড়ের দিকে আড় নজরে তাকিয়ে রয়েছিল। ইহুদিরা আজ পর্যন্ত বলাবলি করে, যে সিজদার কারণে আমাদের ওপর থেকে আযাব বিদূরিত হয়েছিল, তার থেকে উত্তম সিজদা হতে পারে না।
📄 বনি ইসরাঈলের গাভী
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, বনি ইসরাঈলের মধ্যে এক ব্যক্তি ছিল খুবই ধনী ও অতিশয় বৃদ্ধ। তার ছিল বেশ কয়েকজন ভাতিজা। তারা তার ওয়ারিশ হওয়ার জন্যে তার মৃত্যু কামনা করছিল। তাই একরাতে তাদের একজন তাকে হত্যা করল এবং তার লাশ চৌরাস্তায় ফেলে রেখে এল। ভোর বেলায় হত্যাকারী সম্বন্ধে লোকজনের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিল। তারা আল্লাহর নবীর কাছে গিয়ে এটার ফয়সালা প্রার্থনা করল। মূসা আ. আপন প্রতিপালকের নিকট তা জানতে চান। আল্লাহ তাআলা মূসা আ.-কে হুকুম দিলেন; তুমি তাদেরকে একটি গাভী যবাই করতে আদেশ কর। তিনি তাই বললেন।
প্রতি উত্তরে তারা বলল, তুমি কি আমাদের সঙ্গে ঠাট্টা করছ? আমরা তোমাকে নিহত ব্যক্তি প্রসঙ্গে প্রশ্ন করছি, আর তুমি আমাদের গরু যবাই করার পরামর্শ দিচ্ছ? মূসা আ. বললেন, আমার কাছে প্রেরিত ওহি ব্যতীত অন্য কিছু বলার ব্যাপারে আমি আল্লাহ তাআলার নিকট পানাহ চাই। তোমরা আল্লাহ তাআলাকে প্রশ্ন করার জন্যে আবেদন করেছ, আল্লাহ তাআলা প্রশ্নের উত্তরে এটা বলেছেন।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বলেছেন: যদি তারা যে কোনো একটি গাভী যবাই করত, তা হলে তার দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য হাসিল হত। কিন্তু তারা ব্যাপারটি জটিল করে তুলল। এরপর তারা গরুটির গুণাগুণ, রঙ ও বয়স সম্পর্কে প্রশ্ন করল আর তাদেরকে প্রতিপালক আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এমনভাবে জবাব দেওয়া হল যে, এরূপ গরু খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর হয়ে দাঁড়াল।
সুদ্দী রহ. উল্লেখ করেছেন, তারা প্রথমত গরুটির সম-ওজনের স্বর্ণ দিয়ে গরুটি ক্রয় করতে চায়। কিন্তু গরুর মালিক রাজি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তার ওজনের দশগুণ স্বর্ণ দিয়ে তারা গরুটি ক্রয় করল। এরপর আল্লাহর নবী মূসা আ. এটাকে যবাই করার নির্দেশ দিলেন। তারা গরুটি যবাই করার ব্যাপারে প্রথমত ইতস্তত করছিল। পরে রাজি হল। এরপর আল্লাহ তাআলার তরফ থেকে হুকুম আসল, যেন তারা নিহত ব্যক্তিটিকে যবাইকৃত গরুটির কোনো অঙ্গ দ্বারা আঘাত করে। যখন তারা মৃত ব্যক্তিকে ওটার দ্বারা আঘাত করল, তখন আল্লাহ তাআলা তাকে পুনর্জীবিত করলেন এবং লোকটি উঠে দাঁড়াল। তার গলার শিরা থেকে রক্ত ঝরছিল। মূসা আ. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কে তোমাকে হত্যা করেছে? সে বলল, 'আমার ভাতিজা।' তারপর সে পূর্বের মতো অবস্থায় ফিরে গেল।
📄 তাঁবু-গম্বুজের নির্মাণ প্রসঙ্গ
কিতাবীরা বলে, আল্লাহ তাআলা একবার মূসা আ.-কে শিমশার কাঠ, পশুর চামড়া ও ভেড়ার পশমের দ্বারা একটি তাঁবু তৈরি করতে নির্দেশ দিলেন। তাদের বিস্তারিত বর্ণনা অনুযায়ী রঙিন রেশম, স্বর্ণ ও রৌপ্য দ্বারা এটাকে সজ্জিত করার হুকুম দেওয়া হয়েছিল। এতে ছিল ১০টি শামিয়ানা। প্রতিটি শামিয়ানার দৈর্ঘ ছিল ২৮ হাত ও প্রস্থ ছিল ৪ হাত। এতে ছিল ৪টি দরজা। এর রশিগুলো ছিল বিভিন্ন প্রকার ও বিভিন্ন বর্ণের রেশমের। এর চৌকাঠ এবং তাক ছিল স্বর্ণ-রৌপ্যের।
আল্লাহ তাআলা মূসা আ.-কে শিমশার কাঠের একটি সিন্দুকও তৈরি করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। যার দৈর্ঘ আড়াই হাত এবং প্রস্থ দুই হাত এবং উচ্চতা ছিল দেড় হাত। ভিতরে ও বাইরে খাঁটি স্বর্ণ দ্বারা মোড়ানো।
উপর্যুক্ত তাঁবুটি তাদের বছরের প্রথম দিন স্থাপন করা হয়। আর সেই দিনটি ছিল বসন্ত ঋতুর প্রথম দিন। আবার 'শাহাদতের তাঁবু'ও এতে স্থাপন করা হয়েছিল। সম্ভবত কুরআনুল করীমে এর প্রতিই ইঙ্গিত করেই ইরশাদ হয়েছে:
إِنَّ آيَةَ مُلْكِهِ أَنْ يَأْتِيَكُمُ التَّابُوتُ فِيهِ سَكِينَةٌ مِنْ رَبِّكُمْ وَبَقِيَّةٌ مِمَّا تَرَكَ آلُ مُوسَى وَآلُ هَارُونَ تَحْمِلُهُ الْمَلَائِكَةُ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً لَكُمْ إِنْ كُنتُمْ مُؤْمِنِينَ
"তার রাজত্বের নিদর্শন এই যে, তোমাদের কাছে সেই তাবূত (ইসরাঈলীদের পবিত্র সিন্দুক) আসবে, যাতে তোমাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে চিত্ত প্রশান্তি এবং মূসা ও হারূন বংশীয়গণ যা পরিত্যাগ করেছে তার অবশিষ্টাংশ থাকবে; ফেরেশতাগণ এটা বহন করে আনবে। তোমরা মুমিন হও, তবে অবশ্যই তোমাদের জন্য এটাতে নিদর্শন রয়েছে।" (সূরা বাকারা: ২৪৮)
বায়তুল মুকাদ্দাসের নিয়ন্ত্রণভার যখন ইউশা ইবনে নূন আ.-এর ওপর ন্যস্ত হল, তখন তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসের একটি পাথরের উপর এ তাঁবু গম্বুজটি স্থাপন করেন। বনি ইসরাঈলরা এটার দিকে মুখ করে নামায আদায় করত। এরপর যখন তাঁবু গম্বুজটি বিনষ্ট হয়ে যায় তখন তারা গম্বুজের স্থান অর্থাৎ পাথরের দিকেই নামায আদায় করতে লাগল। এ জন্যেই ইউশা আ.-এর পর থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর যুগ পর্যন্ত সমস্ত নবীর কেবলা ছিল এটাই।