📄 তীহ ময়দান ও অত্যাশ্চর্য ঘটনাবলী
আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাঈলকে দুটো সুস্বাদু খাবার বিনা কষ্টে ও পরিশ্রমে সহজলভ্য করে দিয়েছিলেন। প্রতিদিন ভোরে আল্লাহ তাআলা তাদের জন্যে মান্না অবতীর্ণ করতেন এবং সন্ধ্যার সময় সালওয়া নামক পাখি প্রেরণ করতেন। মূসা আ.-এর লাঠি দ্বারা পাথরে আঘাত করার ফলে তাদের জন্যে আল্লাহ তাআলা পানি প্রবাহিত করে দিয়েছিলেন। তারা এ পাথরটিকে তাদের সাথে লাঠি সহকারে বহন করত। এ পাথর থেকে বারটি প্রস্রবণ প্রবাহিত হত; প্রতিটি গোত্রের জন্যে একটি প্রস্রবণ নির্ধারিত ছিল। এ প্রসবণগুলো পরিষ্কার ও স্বচ্ছ পানি প্রবাহিত করত। তারা নিজেদারা পান করত ও তাদের প্রাণীদেরকে পানি পান করাত এবং তারা প্রয়োজনীয় পানি জমাও করে রাখত। উত্তাপ থেকে বাঁচার জন্যে মেঘ দ্বারা তাদেরকে আল্লাহ তাআলা ছায়া দান করেছিলেন। আল্লাহ তাআলার তরফ থেকে তাদের জন্যে ছিল এগুলো বড় বড় নিয়ামত ও দান। কিন্তু তারা এগুলোর পূর্ণ মর্যাদা অনুধাবন করে নি। এগুলোর জন্যে যথাযোগ্য কতৃজ্ঞতা জ্ঞাপন করে নি। আর যথাযথভাবে ইবাদতও তারা আঞ্জাম দেয় নি। এরপর তাদের অনেকেই এসব নিয়ায়তের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করল। এগুলোর প্রতি অধৈর্য হয়ে উঠল এগুলোর পরিবর্তন কামনা করল। চাইল এমন সব বস্তু ২, যা ভূমি উৎপন্ন করে। যেমন: শাক, সবজি, ফাঁকুড়, গম, মসুর ও পিঁয়াজ ইত্যাদি। এ কথার জন্যে মূসা আ. তাদেরকে ভর্ৎসনা করলেন এবং ধমক দিলেন। তাদের সতর্ক করে বললেন:
ছোট-বড় নির্বিশেষে সকল শহরের অধিবাসীর জন্য অর্জিত উৎকৃষ্ট নিয়ামতসমূহের পরিবর্তে কি তোমরা নিকৃষ্টতর বস্তু চাও? তা হলে তোমরা যেসব বস্তু ও মর্যাদার উপযুক্ত নও, তার থেকে অবতরণ করে তোমরা যে ধরনের নিকৃষ্ট মানের খাদ্য খাবার চাও, তা তোমরা অর্জন করতে পারবে। তবে আমি তোমাদের আবদারের প্রতি সাড়া দিচ্ছি না এবং তোমরা যে ধরনের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করছ, তাও আল্লাহ তাআলার দরবারে আপাতত পৌঁছাচ্ছি না। তাদের আচরণ দেখে বোঝা যায়, মূসা আ. তাদেরকে যেসব কাজ থেকে বিরত রাখতে ইচ্ছে করেছিলেন, তা থেকে তারা বিরত থাকে নি।
📄 আল্লাহর দীদার লাভ
পূর্ববর্তী যুগের ওলামায়ে কেরাম বিশেষত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, এখানে ত্রিশ রাত্রের অর্থ হচ্ছে যিলকাদ মাসের পূর্ণটা এবং যিলহজ মাসের প্রথম দশ রাত, মোট চল্লিশ রাত। এ হিসেবে মূসা আ.-এর জন্যে আল্লাহ তাআলার বাক্যালাপের দিন হচ্ছে কুরবানীর ঈদের দিন।
মূলত মূসা আ. যখন তাঁর নির্ধারিত মেয়াদ পরিপূর্ণ করলেন, তখন তিনি ছিলেন রোযাদার। কথিত আছে, তিনি কোনো প্রকার খাবার চান নি। এরপর যখন মাস সমাপ্ত হল তিনি একপ্রকার বৃক্ষের ছাল হাতে নিলেন এবং মুখে সুগন্ধি আনয়ন করার জন্যে তা একটু চিবিয়ে নিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁকে আরো দশদিন রোযা রাখতে আদেশ দিলেন। তাতে চল্লিশ দিন পুরা হল।
মূসা আ. যখন তার নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ করার জন্যে পাহাড়ের দিকে রওনা হলেন। তখন ভাই হারুন আ.-কে বনি ইসরাঈলের কাছে নিজ প্রতিনিধিরূপে রেখে গেলেন। হারুন আ. ছিলেন মূসা আ.-এর সহোদর ভাই। অতি নিষ্ঠাবান দায়িত্বশীল ও জনপ্রিয় ব্যক্তি। আল্লাহ তাআলার মনোনীত ধর্মের প্রতি আহবানের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন মূসা আ.-এর সাহায্যকারী। মূসা আ. তাঁকে প্রয়োজনীয় কাজের আদেশ দিলেন। নবুয়তের ক্ষেত্রে তাঁর বিশিষ্ট মর্যাদা থাকায় মূসা আ.-এর নবুয়তের মর্যাদার কোনো ব্যাঘাত ঘটে নি। আল্লাহ তাআলা তাকে আপন কথা শুনালেন; মূসা আ.-কে আহবান করলেন, সঙ্গোপনে তাঁর সাথে কথা বললেন এবং নিকটবর্তী করে নিলেন। এটা উচ্চ একটি সম্মানিত স্থান, দুর্ভেদ্য দুর্গ, সম্মানিত পদমর্যাদা ও অতি উচ্চ অবস্থান। তাঁর ওপর আল্লাহ তাআলার অবিরাম সালাম বা শান্তি বর্ষিত হোক। যখন তাঁকে উচ্চ মর্যাদা ও মহা সম্মান দান করা হল এবং তিনি আল্লাহ তাআলার কালাম শুনলেন, তখন তিনি পর্দা সরিয়ে নেওয়ার আবেদন করলেন এবং এমন মহান সত্তার উদ্দেশ্যে যাঁকে দুনিয়ার চোখ দেখতে পায় না, তাঁর উদ্দেশ্যে বললেন:
رَبِّ أَرِنِي أَنْظُرْ إِلَيْكَ لَنْ تَرَانِي হে আমার প্রতিপালক! আমাকে নির্দেশ দাও! আমি তোমাকে দেখব। আল্লাহ উত্তরে বলেন: لَنْ تَرَانِي তুমি আমাকে কখনই দেখতে পাবে না। অর্থাৎ মূসা আ. আল্লাহ তাআলার প্রকাশের সময় স্থির থাকতে পারলেন না। কেননা পাহাড় যা মানুষের তুলনায় অধিকতর স্থির ও কাঠামোগতভাবে অধিক শক্তিশালী। পাহাড়ই যখন আল্লাহ তাআলার জ্যোতি প্রকাশের সময় স্থির থাকতে পারে না, তখন মানুষ কেমন করে পারবে? এ জন্যই আল্লাহ তাআলা বলেন: তুমি বরং পাহাড়ের প্রতি লক্ষ কর! তা স্বস্থানে স্থির থাকলে তবে তুমি আমাকে দেখতে পারবে।
প্রাচীণ যুগের কিতাবগুলোতে বর্ণিত রয়েছে, আল্লাহ তাআলা মূসা আ.-কে বললেন, “হে মূসা, কোনো জীবিত ব্যক্তি আমাকে দেখলে মারা পড়বে এবং কোনো শুষ্ক দ্রব্য আমাকে দেখলে উলট-পালট হয়ে গড়িয়ে পড়বে। বুখারী ও মুসলিম শরীফে আবু মূসা রাযি. হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: আল্লাহ তাআলার পর্দা হচ্ছে নূর বা জ্যোতির। অন্য এক বর্ণনা মতে আগুন। যদি তিনি পর্দা সরান তা হলে তাঁর চেহারার ঔজ্জ্বল্যের দরুন যতদূর তাঁর দৃষ্টি পৌঁছে সবকিছুই পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।
যখন তার প্রতিপালক পাহাড়ে জ্যোতি প্রকাশ করলেন তখন তা পাহাড়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করল। আর মূসা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ল। যখন সে জ্ঞান ফিরে পেল, তখন সে বলে উঠল: "মহিমান্বিত তুমি, আমি অনুতপ্ত হয়ে তোমার কাছেই প্রত্যাবর্তন করলাম এবং মুমিনদের মধ্যে আমিই প্রথম।”
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, হে মূসা! আমি তোমাকে আমার রিসালাত এবং বাক্যালাপ দ্বারা তোমাকে মানুষের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি। অর্থাৎ সমসাময়িক যুগের লোকদের ওপর, পূর্ববর্তীদের ওপর নয়। কেননা ইবরাহীম আ. মূসা আ. থেকে উত্তম ছিলেন। যা ইবরাহীম আ.-এর কাহিনীর মধ্যে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। আবার তার পরবর্তীদের ওপরও নয়। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের উভয় থেকেই উত্তম ছিলেন। যেমন মিরাজের রাতে সকল নবী-রাসূলের ওপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পেয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: আমি এমন মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হব যার আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টিকুলের সকলেই করবে, এমনকি ইবরাহীম আ.-ও।
আল্লাহ তাআলা বলেন: আমি যে রিসালাত তোমাকে দান করেছি তা শক্তভাবে গ্রহণ কর, তার চাইতে বেশি প্রার্থনা কর না এবং কতৃজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হও।
📄 বনি ইসরাঈলের বাছুর পূজা
হযরত মূসা আ. যখন আল্লাহ তাআলা নির্ধারিত সময়ে উপনীত হলেন, তখন তিনি তূর পর্বতে অবস্থান করে আপন প্রতিপালকের সঙ্গে একান্ত কথা বললেন। মূসা আ. আল্লাহ তাআলার নিকট বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চান এবং আল্লাহ তাআলা সে সব বিষয়ে তাকে জানিয়ে দেন। তাদের মধ্যকার এক ব্যক্তি যাকে সামিরী বলা হয়, সে যেসব অলংকার ধারস্বরূপ নিয়েছিল সেগুলো দিয়ে সে একটি বাছুর-মূর্তি তৈরি করল এবং বনি ইসরাঈলের সামনে ফেরাউনকে আল্লাহ তাআলা ডুবিয়ে মারার সময় জিবরাঈল আ.-এর ঘোড়ার পায়ের এক মুষ্টি ধূলা মূর্তিটির ভিতরে নিক্ষেপ করল। সাথে সাথে বাছুর মূর্তিটি জীবন্ত বাছুরের মতো হাম্বা হাম্বা আওয়াজ দিতে লাগল। কেউ কেউ বলেন, এতে তা রক্ত-মাংসের জীবন্ত একটি বাছুরে রূপান্তরিত হয়ে যায় আর তা হাম্বা হাম্বা ডাকতে থাকে।
কেউ কেউ বলেন, যখন এটার পিছন দিক থেকে বাতাস ঢুকত এবং মুখ দিয়ে বের হত, তখনই হাম্বা হাম্বা আওয়াজ হত। যেমন সাধারণত গরু ডেকে থাকে। এতে তারা এর চতুর্দিকে নাচতে থাকে এবং উল্লাস প্রকাশ করতে থাকে। তারা বলতে থাকে, এটাই তোমাদের ও মূসা আ.-এর ইলাহ, কিন্তু তিনি ভুলে গেছেন। অর্থাৎ মূসা আ. আমাদের নিকটস্থ প্রতিপালককে ভুলে গেছেন এবং অন্যত্র গিয়ে তাকে খোঁজাখুঁজি করছেন। অথচ প্রতিপালক তো এখানেই রয়েছেন।
এর পর মূসা আ. তাদের কাছে ফিরে আসলেন এবং তাদের বাছুর পূজা করার বিষয়টি জানতে পারলেন। তাঁর সাথে ছিল বেশ কয়েকটি ফলক যেগুলোর মধ্যে তাওরাত লিপিবদ্ধ ছিল, তিনি এগুলো ফেলে দিলেন। মূসা আ. তাদের দিকে অগ্রসর হলেন এবং তাদেরকে ভর্ৎসনা করলেন এবং তাদের এ হীন কাজের জন্যে তাদেরকে দোষারোপ করলেন।
হারুন আ. তাদেরকে এরূপ জঘন্য কাজ থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছিলেন এবং তাদেরকে কঠোরভাবে ভর্ৎসনা করেছিলেন। বলেছিলেন হে আমার সম্প্রদায়! এর দ্বারা তো কেবল তোমাদেরকে পরীক্ষায় ফেলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা এ বাছুর ও এর হাম্বা রবকে তোমাদের জন্যে একটি পরীক্ষার বিষয় করেছেন। নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক খুবই দয়াময় অর্থাৎ এ বাছুর তোমাদের প্রভু নয়। সুতরাং আমি যা বলি তার অনুসরণ কর এবং আমার আদেশ মান্য কর। তারা বলেছিল, আমাদের কাছে মূসা ফিরে না আসা পর্যন্ত আমরা এটার পূজা থেকে কিছুতেই বিরত হব না।
এরপর মূসা আ. সামিরীর প্রতি মনোযোগী হলেন এবং বললেন, "তুমি যা করেছ কে তোমাকে এরূপ করতে বলেছিল?” উত্তরে সে বলল, "আমি জিবরাঈল আ.-কে দেখেছিলাম, তিনি ছিলেন একটি ঘোড়ার উপর সওয়ার। তখন আমি জিবরাঈল আ.-এর ঘোড়ার পায়ের ধুলা সংগ্রহ করেছিলাম। এর পর মূসা আ. বাছুরটি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেললেন। এরপর এটাকে মূসা আ. সমুদ্রে নিক্ষেপ করলেন এবং বনি ইসরাঈলকে সেই সমুদ্রের পানি পান করতে নির্দেশ দিলেন। তারা পানি পান করল। যারা বাছুরের পূজা করেছিল, বাছুরের ছাই তাদের ঠোঁটে লেগে রইল। এতে বোঝা গেল, তারাই ছিল এর পূজারী।
কিন্তু বাছুর পূজারীদের হত্যার শাস্তি ব্যতীত আল্লাহ তাআলা কোনো তওবা কবুল করলেন না। কথিত আছে, একদিন ভোরবেলা যারা বাছুর পূজা করে নি, তারা তরবারি হাতে নিল; অন্যদিকে আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি এমন ঘন কুয়াশা অবতীর্ণ করলেন, প্রতিবেশী প্রতিবেশীকে এবং একই বংশের একজন অন্যজনকে চিনতে পারছিল না। তারা বাছুর পূজারীদেরকে পাইকারীহারে হত্যা করল এবং তাদের মূলোৎপাটন করে দিল। কথিত রয়েছে, তারা সে দিনের একই প্রভাতে সত্তর হাজার লোককে হত্যা করেছিল।
📄 বনি ইসরাঈলের মাথায় তুর পাহাড়
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. ও প্রাচীন যুগের ওলামায়ে কেরামের অনেকেই বলেন, মূসা আ. যখন তাওরাত সম্বলিত ফলক নিয়ে নিজ সম্প্রদায়ের কাছে আগমন করলেন এবং নিজ সম্প্রদায়কে তা গ্রহণ করতে ও শক্তভাবে তা ধরতে নির্দেশ দিলেন, তখন তারা বলল: তাওরাতকে আমাদের কাছে খুলে ধরুন! যদি এর আদেশ নিষেধাবলী সহজ হয় তা হলে আমরা তা গ্রহণ করব। মূসা আ. বললেন, 'তাওরাতের মধ্যে যা কিছু রয়েছে তা তোমরা কবুল কর, তারা তা কয়েকবার প্রত্যাখ্যান করে। এরপর আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদেরকে হুকুম করেন তারা যেন তূর পাহাড় বনি ইসরাঈলের মাথার ওপর উত্তোলন করেন। অমনি পাহাড় তাদের মাথার ওপর মেঘখণ্ডের মতো ঝুলতে লাগল, তাদের তখন বলা হল, তোমরা যদি তাওরাতকে তার সব কিছুসহ কবুল না কর এই পাহাড় তোমাদের মাথার উপর পড়বে। তখন তারা তা কবুল করল। তাদেরকে সিজদা করার হুকুম দেওয়া হলো, তখন তারা সিজদা করল। তবে তারা পাহাড়ের দিকে আড় নজরে তাকিয়ে রয়েছিল। ইহুদিরা আজ পর্যন্ত বলাবলি করে, যে সিজদার কারণে আমাদের ওপর থেকে আযাব বিদূরিত হয়েছিল, তার থেকে উত্তম সিজদা হতে পারে না।