📄 মূসা আ.-এর মাকে ওহি প্রেরণ
মূসা আ.-এর মায়ের কাছে যে ওহি পাঠানো হয়েছিল, তা ছিল এলহাম ও হৃদয়ে প্রক্ষিপ্ত নির্দেশনা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَأَوْحَى رَبُّكَ إِلَى النَّحْلِ أَنِ اتَّخِذِي مِنَ الْجِبَالِ بُيُوتًا وَمِنَ الشَّجَرِ وَمِمَّا يَعْرِشُونَ ) ثُمَّ كُلِي مِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ فَاسْلُكِي سُبُلَ رَبِّكِ ذُلُلًا
"তোমার প্রতিপালক মৌমাছিকে তার অন্তরে ইঙ্গিতে নির্দেশ দিয়েছেন, ঘর তৈরি কর পাহাড়ে, গাছপালায় ও মানুষ যে ঘর তৈরি করে তাতে। এরপর প্রত্যেক ফল থেকে কিছু কিছু আহার কর এবং তোমার প্রতিপালকের সহজ পথ অনুসরণ কর।" (সূরা নাহল: ৬৮) এ ওহি নবুয়তের ওহি নয়। ইবনে হাযম রহ. এবং ইলমে আকাইদ বিশারদগণের অনেকেই একে তেমনি ওহি মনে করেন। কিন্তু প্রথম অভিমতটি বিশুদ্ধ। আর এটিই আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের মত বলে আবুল হাসান আশয়ারি রহ. বর্ণনা করেছেন।
সুহায়লি বলেছেন, মূসা আ.-এর মায়ের নাম ছিল আয়ারেখা। কেউ কেউ বলেন, তাঁর নাম ছিল আয়াযাপ্ত। ওহির নির্দেশনা তাঁর অন্তরে ঢেলে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর কলবে ইলহাম করা হয়েছিল- তুমি ভয় করো না এবং দুঃখিত হয়ো না। কেননা যদিও সন্তানটি এখন তোমার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। তথাপি আল্লাহ শীঘ্রই তাকে ফেরত দেবেন। আর আল্লাহ তাঁকে অচিরেই রাসূল হিসেবে মনোনীত করবেন। তিনি আল্লাহ তাআলার কিতাবকে দুনিয়া ও আখেরাতে সমুন্নত করবেন। এরপর মূসা আ.-এর মা তাই করলেন, যেভাবে তিনি আদিষ্ট হয়েছিলেন। একদিন তিনি তাকে ছেড়ে দিলেন। কিন্তু অভ্যাস মতো রশির প্রান্ত নিজের কাছে আটকে রাখতে ভুলে গেলেন। আর মূসা আ. ভেসে গেলেন নীলনদের স্রোতে। তারপর গিয়ে পৌঁছলেন ফেরাউনের বাড়ির ঘাটে। ফেরাউনের লোকজন তাকে উঠিয়ে নিল। এর পরিণাম তো ছিল, একদিন তিনি তাদের শত্রু ও দুঃখের কারণ হবেন। বস্তুত ফেরাউন, তার দুষ্ট উজির হামান এবং তাদের অনুচররা ভ্রান্তির মধ্যে ছিল। তাই তারা এ শাস্তি ও হতাশার যোগ্য হয়ে পড়ে।
মুফাসসিরগণ আরো উল্লেখ করেন, দাসিরা তাকে একটি বন্ধ সিন্দুকে দরিয়া থেকে উদ্ধার করে। কিন্তু তারা তা খুলতে সাহস পায় নি। তারা ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া বিনতে মুযাহিস ইবনে আসাদ ইবনে রাইয়ান ইবনুল ওলীদের সামনে বন্ধ সিন্দুকটি নিয়ে রাখল।
এ ওলীদই ছিল ইউসুফ আ.-এর যুগে মিসরের ফেরাউন। তৎকালীন মিসরের অধিপতীদের উপাধি ছিল ফিরাউন। আবার কেউ কেউ বলেন, আসিয়া ছিলেন বনি ইসরাঈল বংশীয় এবং মূসা আ.-এর গোত্রের মহিলা। আবার কেউ কেউ বলেন, তিনি ছিলেন মূসা আ.-এর ফুফু। প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক সুহায়লিও এরূপ বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তাআলাই অধিক জ্ঞাত।
আসিয়া যখন সিন্দুকটির মুখ খুললেন, তখন দেখলেন মূসা আ.-এর চেহারা নবুয়তের উজ্জ্বল নূরে ঝলমল করছে। মূসা আ.-কে দেখামাত্র আসিয়ার হৃদয়মন তার প্রতি স্নেহ-মমতায় ভরে উঠল। ফেরাউন এসে শিশুটিকে জবাই করার নির্দেশ দিল। কিন্তু আসিয়া ফেরাউনের কাছ থেকে তাঁকে চেয়ে নিলেন। বললেন: এই শিশুটি তোমার ও আমার চোখ জুড়াবে। ফেরাউন বলল, এটা তোমার জন্যে হতে পারে, কিন্তু আমার জন্যে নয়। একে দিয়ে আমার কোনোই প্রয়োজন নেই। কথা বাড়ালে বিপত্তিই বাড়ে। আসিয়া বলেছিলেন:
"সে আমাদের উপকারে আসতে পারে।" আল্লাহ তাআলা তাঁর সে আশা পূর্ণ করেছিলেন। দুনিয়ায় আল্লাহ তাআলা তাঁকে মূসা আ.-এর দ্বারা হেদায়েত দান করেছেন এবং আখেরাতে তাঁকে মূসা আ.-এর প্রতি ঈমান আনার কারণে তিনি জান্নাতে যাবেন। আবার তিনি বলেছিলেন: "আমরা তাকে সন্তান হিসেবেও গ্রহণ করতে পারি।” তারা তাঁকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। কেননা তাদের কোনো সন্তান ছিল না। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ অর্থাৎ তারা জানে না। মূসা আ. কে সিন্দুক থেকে উঠিয়ে নেওয়ার জন্যে ফেরাউন পরিবারকে নিযুক্ত করে আল্লাহ তাআলা ফেরাউন ও তার সৈন্যদের প্রতি কিরূপ মহাআযাব অবতীর্ণ করতে চেয়েছিলেন।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. মুজাহিদ, ইকরামা, সাঈদ ইবনে জুবাইর প্রমুখ বলেন: “মূসা আ.-এর মায়ের অন্তর দুনিয়ার অন্যান্য চিন্তা ছেড়ে দিয়ে শুধু মূসা আ.- কে নিয়ে চিন্তায় অস্থির ছিল। আল্লাহ তাআলা যদি তাঁকে ধৈর্য দান না করতেন এবং তাঁর হৃদয়ে দৃঢ়তা দান না করতেন, তা হলে ব্যাপারটি তিনি প্রকাশ করে দিতেন। এবং অন্যের কাছে প্রকাশ্যে তাঁর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে ফেলতেন। তিনি তাঁর বড় মেয়ে, মূসা আ.-এর বোনকে তার পেছনে পেছনে গিয়ে খবরাখবর নেওয়ার জন্যে পাঠালেন। মুজাহিদ রহ. বলেন, সে দূর থেকে তাকে লক্ষ করছিল। আর কাতাদা রহ. বলেন, তিনি এমনভাবে তাঁর প্রতি লক্ষ্য করছিলেন যেন এ ব্যাপারে তাঁর কোনো আগ্রহ নেই। যখন ফেরাউনের ঘরে মূসা আ.-এর থাকা চূড়ান্ত হল, ফেরাউনের লোকজন প্রথমে তাঁকে দুধ পান করানোর চেষ্টা করল, কিন্তু তিনি কারো বুকের দুধ গ্রহণ করলেন না। অন্য কোনো খাদ্যও গ্রহণ করলেন না। তারা তাঁর ব্যাপারে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে যে প্রকারেই হোক তাঁকে যে কোনো খাদ্য খাওয়াতে চেষ্টা করল; কিন্তু তারা তাতে ব্যর্থ হল। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"পূর্ব থেকেই আমি অন্যের বুকের দুধ গ্রহণ থেকে তাকে বিরত রেখেছিলাম।" তারা তাঁকে ধাত্রী ও অন্যান্য নারীসমেত বাজারে পাঠাল। যাতে তারা এমন লোক খুঁজে বের করতে পারে, যে তাকে দুধ পান করাতে সক্ষম। তারা তাঁকে নিয়ে ছিল ব্যস্ত এবং বাজারের লোকজনও তাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এমন সময় মূসা আ.-এর বোন মূসা আ.-এর দিকে তাকালেন কিন্তু তিনি তাঁকে চিনেন বলে পরিচয় প্রকাশ করলেন না, বরং বললেন:
هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى أَهْلِ بَيْتٍ يَكْفُلُونَهُ لَكُمْ وَهُمْ لَهُ ন্াসিহূণ
"তোমাদের কি আমি এমন এক পরিবারের সন্ধান দিব, যারা তোমাদের হয়ে তাকে লালন-পালন করবে এবং তার মঙ্গলকামী হবে?"
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, "মূসা আ.-এর বোন যখন তাদেরকে এরূপ বললেন, তখন তারা তাকে বলল, তুমি কেমন করে জানো, তারা তার মঙ্গলকামী ও তার প্রতি মেহেরবান হবে? তিনি বললেন: বাদশার বেগমের ছেলের উপকার সাধনে, সকলেই আগ্রহী। তখন তারা তাকে ছেড়ে দিল এবং তার সাথে তারা তাদের বাড়িতে গেল। তখন মূসা আ.-এর মা মূসা আ.-কে কোলে তুলে নিলেন ও তাঁকে নিজ বুকের দুধ খেতে দিলেন। মূসা আ. মায়ের স্তন মুখে নিলেন, চুষতে আরম্ভ করলেন এবং দুধ পান করতে লাগলেন। আসিয়া মূসা আ.-এর মাকে তাঁর মহলে ডেকে পাঠালেন এবং সেখানে অবস্থান করে তাঁকে উপকৃত করতে আসিয়া রাযি. আহ্বান জানালেন। কিন্তু মূসা আ.-এর মা তাতে রাযি হলেন না। বললেন, আমার স্বামী ও ছেলে-মেয়ে রয়েছে। তাই আমি তাদেরকে ছেড়ে মহলে থাকতে পারি না। তবে আপনি যদি তাকে আমার নিকট পাঠিয়ে দেন, তা হলে আমি তাকে দুধ পান করাতে পারি। তখন আসিয়া আ. মূসা আ.-কে তাঁর মায়ের সঙ্গে যেতে দিলেন। তিনি তাঁর জন্যে বহু মূল্যবান উপঢৌকন দিলেন ও তাঁর খোরপোশের জন্য ভাতা নির্ধারণ করে দিলেন। মূসার মা মূসা আ.-কে নিয়ে নিজ ঘরে ফিরে গেলেন এবং এভাবে আল্লাহ তাআলা পুনরায় মা-ছেলের মিলন ঘটালেন। মূসা-জননীর কাছে মূসা আ.-কে ফেরত প্রদানের মাধ্যমে একটি প্রতিশ্রুতি এভাবে পূর্ণ হল। আর এটাই নবুয়তের সুসংবাদের সত্যতার প্রমাণ হিসেবে বিবেচ্য।
তারপর তিনি যখন পূর্ণ যৌবন লাভ করেন এবং শারীরিক গঠন ও চরিত্রে উৎকর্ষ মণ্ডিত হলেন- অধিকাংশ উলামার মতে, যখন ৪০ বছর বয়সে উপনীত হলেন- তখন আল্লাহ তাআলা তাঁকে হেকমত ও নবুয়তের জ্ঞান দান করেন। এ বিষয়ে তাঁর মাতাকে পূর্বেই আল্লাহ তাআলা সুসংবাদ প্রদান করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা বলেন :
إِنَّا رَادُّوهُ إِلَيْكِ وَجَاعِلُوهُ مِنَ الْمُرْسَلِينَ
📄 মূসা আ.-এর মাদায়েন গমন
হযরত মূসা আ. যখন মিসর থেকে বের হওয়ার ইচ্ছা করলেন, তখন মাদায়েন দেশকেই মনোনীত করলেন। মাদায়েনের লোকালয়টি ছিল মিসর থেকে ৮ মনযিল দূরে অবস্থিত। খুব সম্ভব মাদায়েনবাসীদের এ গোত্রটি হযরত মূসা আ.-এর নিকটাত্মীয় ছিল। কেননা মূসা আ. ছিলেন হযরত ইসহাক ইবনে ইবরাহীম আ.-এর বংশধর। আর মাদায়েনবাসী হল হযরত ইসহাক আ.-এর ভ্রাতা মাদইয়ান ইবনে ইবরাহীমের বংশ থেকে উদ্ভূত। হয়তো এ কারণেই তিনি এদেশটি বেছে নেন।
হযরত মূসা আ. যেহেতু ফেরাউনের ভয়ে পলায়ন করেছিলেন; সুতরাং তাঁর সঙ্গে কোনো সাথী ছিল না। পথপ্রদর্শকও না। এবং কোনো পাথেয়ও ছিল না। আর দ্রুত চলার জন্য ছিলেন খালি পা।
ইমাম তাবারী হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর রাযি. থেকে রেওয়ায়েত করেছেন: পূর্ণ এ সফরে মূসা আ.-এর খাদ্য গাছের পাতা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। খালি পা হওয়ায় এ দীর্ঘ সফরে তাঁর পায়ের তলার চামড়া পর্যন্ত পড়ে গিয়েছিল। এমনি অস্থির ও পেরেশান অবস্থায় হযরত মূসা আ. মাদায়েনের ভূখণ্ডে প্রবেশ করলেন।
আল্লাহ পাক হযরত মূসা আ.-এর মিসর ত্যাগের অবস্থা বর্ণনা করেছেন। ফেরাউন সম্প্রদায়ের কেউ তাকে দেখে ফেলে কি-না, এ ভয়ে চতুর্দিকে তাকাতে তাকাতে মূসা আ. শহর থেকে বের হয়ে পড়লেন। কিন্তু কোথায় যাবেন, কোন দিকে যাবেন, তিনি কিছুই জানেন না। তিনি ইতোপূর্বে মিসর থেকে আর কোনো দিন বের হন নি। যখন তিনি মাদায়েনের পথ ধরলেন- তখন তিনি বলে উঠলেন, আমি আশা করি আমার প্রতিপালক আমাকে সোজা রাস্তা প্রদর্শন করবেন। অর্থাৎ সম্ভবত আমি এবার মনযিলে মকসুদে পৌঁছুতে পারব। বাস্তবে হয়েছিলও তাই। এ পথই তাঁকে মনযিলে মকসুদে নিয়ে পৌঁছায়। কিন্তু কি সে মনযিলে মকসুদটি?
মাদায়েনে একটি কুয়া ছিল, যার পানি সকলে পান করত। মাদায়েন হল সেই শহর, যেখানে আল্লাহ তাআলা আইকাবাসীদের ধ্বংস করেছিলেন। আর তারা ছিল শুআইব আ.-এর সম্প্রদায়।
ওলামায়ে কেরামের একটি মতানুযায়ী মূসা আ.-এর যুগের পূর্বে তারা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। যখন মূসা আ. মাদায়েনের পানির কূপের কাছে পৌঁছলেন, সেখানে একদল লোক পেলেন। নিজ নিজ পশুগুলোকে পানি পান করাচ্ছে তারা। তাদের পেছনে দুজন বালিকাকে দেখলেন, নিজেদের ছাগলগুলোকে সামলে দাঁড়িয়ে আছে। যাতে সেগুলো সম্প্রদায়ের ছাগলের সঙ্গে মিশে না যায়।
কিতাবিদের মতে সেখানে সাতজন নারী ছিল। এটাও তাদের ভ্রান্ত ধারণা। তারা সাতজন হতে পারে, তবে তাদের মধ্য হতে পানি পান করাতে এসেছিল দুজন। তাদের বর্ণনা বিশুদ্ধ হলেই কেবল এ ধরনের সামঞ্জস্যসূচক উত্তর গ্রহণযোগ্য হতে পারে। এটা স্পষ্ট, শুআইব আ.-এর কেবল দুটি কন্যাই ছিল। মূসা আ.-এর প্রশ্নের উত্তরে তাঁরা বললেন, আমাদের দুর্বলতার কারণে রাখালদের পানি পান করানোর আগে আমরা পানির কাছে পৌঁছুতে পারি না। আর এ সব পশু নিয়ে আমাদের আসার কারণ হচ্ছে, আমাদের পিতা বৃদ্ধ ও দুর্বল। তখন মূসা আ. তাদের পশুগুলোকে পানি পান করিয়ে দিলেন।
তাফসিরকারকগণ বলেন, রাখালরা যখন তাদের পশুগুলোর পানি পান করানো শেষ করত, তখন তারা কুয়ার মুখে একটি বড় ও ভারি পাথর রেখে দিত। তারপর আসতেন এ দুই নারী। লোকেরা তাদের পশুগুলোকে পানি পান করানোর পর যা উচ্ছিষ্ট থাকত, তা থেকে নিজেদের বকরিগুলোকে পানি পান করাতেন। আজ মূসা আ. একাই সেই পাথরটা উঠালেন। তারপর তিনি তাদেরকে ও তাদের বকরিগুলোকে পানি পান করালেন এবং পাথরটি আগের জায়গায় রেখে দিলেন।
আমিরুল মুমিনিন হযরত ওমর রাযি. বলেন, পাথরটি দশজনে মিলে উঠাতে হতো। হযরত মূসা আ. এক বালতি পানি তুললেন। এতে দুনো বালিকার প্রয়োজন মিটে গেল। এরপর পুনরায় তিনি গাছের ছায়ায় ফিরে আসেন। তাফসিরকারকগণ বলেন, এটা সামার গাছের ছায়া। ইবনে জারীর তাবারী রহ. ইবনে মাসউদ রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি এ গাছটিকে সবুজ ও ছায়াদার দেখেছেন।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, মূসা আ. মিসর থেকে মাদায়েন ভ্রমণকালে শাক-সবজি ও গাছের পাতা ছাড়া অন্য কিছু খেতে পান নি। তাঁর পায়ে তখন জুতা ছিল না। জুতা না থাকায় দুই পায়ের তলায় জখম হয়ে গিয়েছিল। তিনি গাছের ছায়ায় বসলেন। তিনি ছিলেন সৃষ্টিকুলের মধ্যে আল্লাহ তাআলার মনোনীত ব্যক্তি। অথচ ক্ষুধার কারণে তাঁর পেট পিঠের সঙ্গে লেগে গিয়েছিল। এবং তাঁর দেহে এর প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট। এমনকি তিনি তখন এক টুকরো খেজুরের মুখাপেক্ষী ছিলেন।
📄 বুযুর্গ ব্যক্তির সঙ্গে শ্বশুরজামাতা সম্পর্ক
হযরত মূসা আ. ও মাদায়েনের ওই বুযুর্গ গৃহকর্তার কথাবার্তা হচ্ছিল। এমন সময়ে বৃদ্ধের কন্যা, যিনি মূসা আ.-কে ডেকে আনতে গিয়েছিলেন, নিজের পিতাকে বললেন- হে পিতা! আপনি এই মেহমানকে আপনার গৃহপালিত পশুগুলি চরানো এবং এদের পানি সংগ্রহ করার জন্য শ্রমিক নিযুক্ত করুন। শ্রমিক এমন ব্যক্তিই ভালো, যে শক্তিশালীও হয় এবং আমানতদারও হয়।
তাফসিরকারকগণ বলেন, কন্যার এ উক্তি পিতার কাছে একটু বিস্ময়কর বোধ হল। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: এ মেহমানের শক্তি ও আমানতদারী তুমি কেমন করে জানতে পারলে? কন্যা উত্তর করল, আমি মেহমানের দৈহিক শক্তি তো এ থেকে অনুমান করলাম, কূপের বড় বালতিটি তিনি একাই টেনে উঠালেন। আর আমানতদারীর পরীক্ষা এ থেকে করলাম, যখন আমি তাঁকে ডাকতে গেলাম, তখন তিনি আমাকে দেখামাত্র দৃষ্টি অবনত করে নিলেন। আর কথোপকথনের সময়ে তিনি একবারও আমার দিকে দৃষ্টিপাত করেন নি। এরপর যখন তাকে ডেকে নিয়ে আসতে গেলাম, তখন আমাকে তাঁর পিছনে চলতে বললেন এবং তিনি নিজে সম্মুখে সম্মুখে চললেন। এবং শুধু ইশারা-ইঙ্গিতে আমি তাঁকে পথ দেখাতে লাগলাম। বুযুর্গ পিতা কন্যার এ সমস্ত কথা শুনে অতিশয় আনন্দিত হলেন এবং হযরত মূসা আ.-কে বললেন, "যদি তুমি ৮ বছর আমার কাছে থেকে আমার বকরি চরাও, তবে আমি আমার এ কন্যাটিকে তোমার বিবাহ বন্ধনে প্রদান করতে প্রস্তুত আছি। আর যদি তুমি এ মেয়াদকে আরো ২ বছর বৃদ্ধি করে দশ বছর পূর্ণ কর, তবে আরো উত্তম হবে। এটিই হবে এ কন্যার মহর।" হযরত মূসা আ. এ শর্ত কবুল করে নিলেন এবং বললেন, "আমার খুশির উপর ছেড়ে দিন! আমি উক্ত দুই মেয়াদের যেটি ইচ্ছে পূর্ণ করব। আপনার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বাধ্য-বাধকতা থাকবে না।" উভয় পক্ষের পারস্পরিক সম্মতির পরে মাদায়েনের বুযুর্গ লোকটি বর্ণিত মেয়াদকে মহর সাব্যস্ত করে হযরত মূসা আ.-এর সঙ্গে নিজের এ কন্যাকে বিবাহ দিলেন। কোনো কোনো তাফসিরকারক ধারণা করেন, মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে বিবাহ বন্ধন সম্পন্ন হয়েছিল এবং আকদ হওয়ার পরক্ষণেই হযরত মূসা আ. নিজের স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে মাদায়েন ত্যাগ করেছেন। তা ছাড়া তাফসিরকারকগণ হযরত মূসা আ.-এর স্ত্রীর নাম বলেছেন সফুরা।
📄 ফেরাউন ও তার বাহিনী ধ্বংসের বিবরণ
বাদশা ফেরাউনের আনুগত্য স্বীকার এবং আল্লাহর নবী মূসা ইবনে ইমরান আ.-এর বিরোধিতায় অবতীর্ণ হয়ে মিসরের কিবতিরা যখন তাদের কুফরি, অবাধ্যতা ও সত্য বিমুখতায় অবস্থান দীর্ঘায়িত হতে লাগল; আল্লাহ তাআলা তখন মিসরবাসীর কাছে বিস্ময়কর ও সুস্পষ্ট প্রমাণাদি পেশ করেন এবং তাদেরকে এমন সব অলৌকিক ঘটনা দেখান যাতে চোখ ঝলসে যায় এবং মানুষ হতবিহবল হয়ে পড়ে। এতদসত্ত্বেও তাদের কিছু সংখ্যক ছাড়া কেউ বিশ্বাস স্থাপন করে নি; অন্যায় থেকে প্রত্যাবর্তন করে নি; জোর-জুলুম-অত্যাচার থেকে বিরত থাকে নি। কেউ কেউ বলেন, তাদের মধ্যে মাত্র তিন ব্যক্তি ঈমান এনেছিলেন। একজন হচ্ছেন ফেরাউনের স্ত্রী। কিবতীরা তাঁর সম্বন্ধে মোটেও অবহিত ছিল না। দ্বিতীয়জন হচ্ছেন ফেরাউনের সম্প্রদায়ের মুমিন ব্যক্তিটি, যার নসিহত প্রদান, পরামর্শ দান ও তাদের বিরুদ্ধে দলিলাদি পেশ করার বিষয়টি সবিস্তারে বর্ণনা করা হয়েছে। তৃতীয়জন হচ্ছেন, শহরের দূর প্রান্ত থেকে ছুটে আসা ব্যক্তি, যিনি মূসা আ.-কে তাঁর বিরুদ্ধে সাজানো ষড়যন্ত্র সম্বন্ধে অবহিত করেছিলেন।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি.-এর অভিমত হল, এ তিনজন হচ্ছেন জাদুকরদের বাইরে। কেননা জাদুকররাও কিবতিদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আবার কেউ কেউ বলেন, ফেরাউনের সম্প্রদায় কিবতিদের থেকে একটি দল ঈমান এনেছিল। জাদুকরদের সকলে এবং বনি ইসরাঈলদের সকল গোত্রই ঈমান এনেছিল। কুরআন মাজিদে নিম্নোক্ত আয়াতে এর ইঙ্গিত পাওয়া যায়:
ফَمَا آمَنَ لِمُوسَى إِلَّا ذُرِّيَّةٌ مِنْ قَوْمِهِ عَلَى خَوْفٍ مِنْ فِرْعَوْنَ وَمَلَئِهِمْ أَنْ يَفْتِنَهُمْ وَإِنَّ فِرْعَوْنَ لعَالٍ فِي الْأَرْضِ وَإِنَّهُ لَمِنَ الْمُسْرِفِينَ
"ফেরাউন ও তার পরিষদবর্গ নির্যাতন করবে এ আশঙ্কায় তার সম্প্রদায়ের একদল ছাড়া আর কেউই তার প্রতি ঈমান আনে নি। যমিনে তো ফেরাউন পরাক্রমশালী ছিল এবং সে অবশ্যই সীমালঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত।" (সূরা ইউনুস: ৮৩)
মোটকথা, তারা ঈমান এনেছিল গোপনে। কেননা তারা ফেরাউন ও তার প্রতিপত্তি এবং তার সম্প্রদায়ের অত্যাচার, অবিচার ও নিষ্ঠুরতাকে ভয় করত। তারা আরো ভয় করত, যদি ফেরাউনের লোকেরা তাদের ঈমানের কথা জানতে পারে, তা হলে তারা তাদেরকে ধর্মচ্যুত করে ফেলবে। তদুপরি সে তার প্রতিটি কাজে, আচরণে ও ব্যবহারে ছিল সীমালঙ্ঘনকারী।
এক কথায় সে ছিল এমন একটি মারাত্মক জীবাণু, যার ধ্বংস ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। সে ছিল এমন এক নিকৃষ্ট ফল, যার কাটার সময় ছিল অত্যাসন্ন। সে ছিল এমন অভিশপ্ত অগ্নিশিখা, যার নির্বাপন ছিল সুনিশ্চিত।
মূসা আ. যখন তাঁর সম্প্রদায়কে আল্লাহ তাআলার উপর ভরসা, আল্লাহ তাআলার কাছে সাহায্য প্রার্থনা এবং আল্লাহ তাআলার নিকট আশ্রয় গ্রহণ করার জন্যে হুকুম দিলেন, তাঁরা তা মান্য করলেন। তাই আল্লাহ তাআলাও তাদেরকে তাদের বিপদাপদ থেকে উদ্ধার করলেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَأَوْحَيْنَا إِلَى مُوسَى وَأَخِيهِ أَنْ تَبَوَّأَ لِقَوْمِكُمَا بِمِصْرَ بُيُوتًا وَاجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ قِبْلَةً وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ
"আমি মূসা আ. ও তার ভাইয়ের নিকট প্রত্যাদেশ করলাম, মিসরে তোমাদের সম্প্রদায়ের জন্য গৃহ স্থাপন কর। তোমাদের গৃহগুলোকে ইবাদত গৃহ কর, সালাত কায়েম কর এবং মুমিনদেরকে সুসংবাদ দাও।" (সূরা ইউনুস: ৮৭)
অন্য কথায় আল্লাহ তাআলা মূসা আ. ও তাঁর ভ্রাতা হারুন আ.-কে ওহি মারফত নির্দেশ দিলেন, তারা যেন তাদের সম্প্রদায়ের জন্যে কিবতিদের থেকে আলাদা ধরনের গৃহ নির্মাণ করেন। যাতে তারা নির্দেশ পাওয়া মাত্রই ভ্রমণের জন্যে তৈরি হতে পারে এবং একে অন্যের ঘর সহজে চিনতে পারে ও প্রয়োজনে বের হয়ে পড়ার জন্যে সংবাদ দিতে পারে। এ ছাড়া তারা যেসব অসুবিধা, ক্লেশ, কষ্ট ও সঙ্কীর্ণতায় ভুগছে, তা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্যে অধিকহারে নামায আদায় করে এবং আল্লাহ তাআলার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। যেমন আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে ইরশাদ করেন:
وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ -" ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে তোমরা সাহায্য প্রার্থনা কর।" (সূরা বাকারা: ৪৫) হাদিসে বর্ণিত রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোনো কঠিন বিষয়ের সম্মুখীন হতেন, তখন তিনি নামায আদায় করতেন।
কেউ কেউ বলেন, ফেরাউন ও তার সম্প্রদায়ের অত্যাচারের ভয়ে মসজিদ বা মজলিসে প্রকাশ্য ইবাদত কষ্টসাধ্য হওয়ায় ঘরের নির্দিষ্ট স্থানে তাদেরকে সালাত আদায়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
তাফসিরকারকগণ বলেছেন, বনি ইসরাঈল তাদের ঈদের উৎসব পালনের উদ্দেশ্যে শহরের বাইরে যাওয়ার জন্যে ফেরাউনের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করলে ফেরাউন অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাদেরকে অনুমতি প্রদান করল। তারা বের হওয়ার জন্যে প্রস্তুতি নিতে লাগল এবং পুরোপুরি তৈরি হয়ে গেল। প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল ফেরাউন ও তার সম্প্রদায়ের সাথে বনি ইসরাঈলের একটি চালাকি মাত্র। যাতে তারা ফেরাউন ও তার সম্প্রদায়ের অত্যাচার-অবিচার থেকে মুক্তি পেতে পারে।
তাফসিরকারকগণ বলেন, আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাঈলকে কিবতিদের থেকে স্বর্ণালংকার নেওয়ার জন্যে হুকুম দিয়েছিলেন; তাই তারা কিবতিদের থেকে বহু অলঙ্কার করয-ধার নিয়েছিল। এরপর রাতের অন্ধকারে তারা বের হয়ে পড়ল ও বিরামহীনভাবে অতি দ্রুত পথ অতিক্রম করতে লাগল। যাতে তারা অনতিবিলম্বে সিরিয়ার অঞ্চলে পৌঁছতে পারে। ফেরাউন যখন তাদের মিসর ত্যাগের কথা জানতে পারল, তখন সে তাদের প্রতি চরম ক্রুদ্ধ হল। সে তার সেনাবাহিনীকে প্ররোচিত করল এবং বনি ইসরাঈলকে পাকড়াও করার ও তাদের সমূলে ধ্বংস করার জন্যে তাদের সমবেত করল।
তাফসিরকারকগণ বলেন, ফেরাউন যখন বনি ইসরাঈলকে পিছু ধাওয়ার জন্যে সৈন্য-সামন্ত নিয়ে বের হল, তখন তার সাথে ছিল একটি বিরাট সৈন্যদল। ওই সৈন্যদলের ব্যবহৃত ঘোড়ার মধ্যে ছিল এক লাখ উন্নতমানের কালো ঘোড়া আর সৈন্য সংখ্যা ছিল ষোল লাখের ঊর্ধ্বে। প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলাই সম্যক জ্ঞাত।
কেউ কেউ বলেন, শিশুদের সংখ্যা বাদ দিয়ে বনি ইসরাঈলের মধ্যেই ছিল প্রায় ছয় লাখ যোদ্ধা। মূসা আ.-এর-সাথে বনি ইসরাঈলের মিসর ত্যাগ ও তাদের আদি পিতা ইয়াকুব আ.-এর সঙ্গে মিসর প্রবেশের মধ্যে ছিল চারশ ছাব্বিশ সৌর বছরের ব্যবধান।
ফেরাউন সৈন্যসামন্ত নিয়ে বনি ইসরাঈলকে ধরার জন্যে অগ্রসর হল এবং সূর্যোদয়ের সময়ে তারা পরস্পরের দেখা পেল। তখন সামনাসামনি যুদ্ধ ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। এ সময়ই মূসা আ.-এর অনুসারীগণ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে বলতে লাগল, 'আমরা তা হলে ধরা পড়েই গেলাম!! তাদের ভীত হওয়ার কারণ হল, তাদের সম্মুখে ছিল উত্তাল সাগর। সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়া ছাড়া তাদের আর কোনো পথ বা গত্যন্তর ছিল না। আবার সাগর পাড়ি দেওয়ার শক্তিও ছিল না। তাদের বাঁ পাশে ও ডান পাশে ছিল সুউচ্চ খাঁড়া পাহাড়। ফেরাউন তাদেরকে একেবারে আটকে ফেলেছিল। মূসা আ.-এর অনুসারীরা ফেরাউনকে তার দলবল ও বিশাল সৈন্যসামন্তসহ অবলোকন করছিল। তারা ফেরাউনের ভয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ছিল। কেননা তারা ফেরাউনের রাজ্যে ফেরাউন কর্তৃক লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়েছিল। সুতরাং তারা আল্লাহর নবী মূসা আ.-এর কাছে তাদের অবস্থা সম্পর্কে অভিযোগ করল।
তখন আল্লাহর নবী মূসা আ. তাদেরকে অভয় দিয়ে বললেন : كَلَّا إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ - "কখনো নয়; নিশ্চয়ই আমার সাথে আমার প্রতিপালক রয়েছেন, তিনি আমাকে পরিত্রাণের সঠিক পথ-নির্দেশ করবেন।" মূসা আ. ছিলেন তাঁর অনুসারীদের পশ্চাৎভাগে। তিনি অগ্রসর হয়ে সকলের সম্মুখে গেলেন এবং সাগরের দিকে তাকালেন। তখন সাগরে ছিল উত্তাল তরঙ্গ। তিনি বললেন আমাকে এখানেই আসার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁর সাথে ছিলেন তাঁর ভাই হারুন আ. ও ইউশা ইবনে নূন। যিনি বনি ইসরাঈলের বিশিষ্ট নেতা, আলেম ও আবেদ। মূসা আ. ও হারুন আ.-এর পরে আল্লাহ তাআলা তাঁর কাছে ওহি প্রেরণ করেন এব তাঁকে নবুয়ত দান করেন।
মূসা আ. ও তাঁর দলবলের সঙ্গে ফেরাউন সম্প্রদায়ের মুমিন বান্দাটিও ছিলেন। তারা থমকে দাঁড়িয়েছিলেন আর গোটা বনি ইসরাঈল গোত্র তাদের ঘিরে দাঁড়িয়েছিল। কথিত আছে, ফেরাউন সম্প্রদায়ের মুমিন লোকটি ঘোড়া নিয়ে কয়েকবার সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু তার পক্ষে তা সম্ভব হয়ে উঠল না। তাই তিনি মূসা আ.-কে জিজ্ঞাস করেন, হে আল্লাহর নবী! আমাদেরকে কি এখানেই আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে? মূসা আ. বললেন, 'হ্যাঁ'। যখন ব্যাপারটি তুঙ্গে উঠল, অবস্থা জটিল হয়ে দাঁড়াল, ভারি ভয়াবহ আকার ধারণ করল; ফেরাউন ও তার গোষ্ঠী সশস্ত্র সৈন্য-সামন্ত নিয়ে ক্রোধভরে অতি সন্নিকটে এসে পৌঁছাল; অবস্থা বেগতিক হয়ে দাঁড়াল; চক্ষু স্থির হয়ে গেল এবং প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠল, তখন ধৈর্যশীল মহান শক্তিমান, আরশের মহান অধিপতি, প্রতিপালক আল্লাহ তাআলা মূসা কালিমুল্লাহ আ.-এর কাছে ওহি প্রেরণ করলেন : أَنِ اضْرِبْ بِعَصَاكَ الْبَحْرَ অর্থাৎ নিজ লাঠি দ্বারা সাগরে আঘাত কর! যখন তিনি সাগরে আঘাত করলেন- কথিত আছে, তিনি সাগরকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন : 'আল্লাহর হুকুমে বিভক্ত হয়ে যাও।'
কথিত আছে, সমুদ্রটি বারটি খণ্ডে বা রাস্তায় বিভক্ত হয়েছিল। প্রতিটি গোত্রের জন্যে একটি করে রাস্তা হয়ে গেল। যাতে তারা নিজ নিজ নির্ধারিত রাস্তায় সহজে পথ চলতে পারে। এ রাস্তাগুলোর মধ্যে জানালা ছিল বলেও কেউ কেউ মত প্রকাশ করেন। যাতে তারা একদল অন্যদলকে অনায়াসে চলার পথে দেখতে পায়। কিন্তু এ অভিমতটি শুদ্ধ নয়। কেননা পানি যেহেতু স্বচ্ছ পদার্থ, তাই তার পিছনে আলো থাকলে দৃষ্টি বাধাপ্রাপ্ত হয় না। সুতরাং একদল অন্যদলকে দেখার জন্যে জানালা থাকার প্রয়োজন হয় না। যে সত্তা কোনো বস্তুকে সৃষ্টি করতে 'হয়ে যাও' বললে সাথে সাথে তা হয়ে যায়, সেই সত্তার মহান কুদরতের কারণেই সমুদ্রের পানি ছিল পর্বতের মতো দণ্ডায়মান। এরপর আল্লাহ তাআলা সমুদ্রে বিশেষ ধরনের বায়ু প্রেরণ করেন, যার ধাক্কায় পানি সরে রাস্তাগুলো শুকিয়ে যায়, যাতে ঘোড়া ও অন্যান্য প্রাণীর খুর না আটকে যায়।
সমুদ্রের স্থিতিশীল অবস্থায় ফেরাউন সমুদ্রের তীরে গিয়ে পৌঁছল। সবকিছু দেখল এবং সমুদ্রের আশ্চর্যজনক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করল। আর পুরোপুরি বুঝতে পারল যেমন পূর্বেও বুঝত, এটা মহা সম্মানিত আরশের মহান মালিক প্রতিপালকেরই কুদরতের লীলাখেলা। সে থমকে দাঁড়াল। সম্মুখে অগ্রসর হল না। বনি ইসরাঈল ও মূসা আ.-কে পিছু ধাওয়া করার জন্যে মনে মনে অনুতপ্ত হল। তবে এ অবস্থায় অনুতাপ যে তার কোনো উপকারে আসবে না, সে তা ভালো করে বুঝতে পারল। তা সত্ত্বেও সে তার সেনাবাহিনীর কাছে তার অটুট মনোবলের কথা ও আক্রমণাত্মক ভাব প্রকাশ করল। ওই সম্প্রদায়কে সে হতবুদ্ধি করে দিয়েছিল। ফলে তারা তার আনুগত্য স্বীকার করেছিল। তারা তাকে বাতিলের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকা সত্ত্বেও অনুসরণ করেছিল। নিজ কুফরিতে লিপ্ত ফাসেক ও ফাজের নফসের প্ররোচনায় তাদেরকে উদ্দেশ্য করে সে বলল, 'তোমরা একটু লক্ষ করে দেখ! সমুদ্র আমার জন্যে সরে গিয়ে কী রূপে পথ করে দিয়েছে; যাতে আমি আমার ওইসব পলাতক দাসদেরকে ধরতে পারি, যারা আমার প্রভুত্ব স্বীকার না করে আমার রাজত্ব থেকে বের হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। মুখে এরূপ উচ্চবাচ্য করলেও অন্তরে সে দ্বিধাদ্বন্দের মধ্যে ছিল, সে কি তাদের পিছু ধাওয়া করবে, নাকি আত্মরক্ষার্থে পিছু হটে যাবে? হায়! তার হটে যাওয়ার কোনো উপায় ছিল না। সে এক কদম সামনে অগ্রসর হলে কয়েক কদম পিছু হটার চেষ্টা করেছিল।
তাফসিরকারকগণ বলেন, এরূপ অবস্থায় জিবরাঈল আ. একটি আকর্ষণীয় ঘোটকীর উপর সওয়ার হয়ে আত্মপ্রকাশ করলেন। এবং ফেরাউন যে ঘোড়ার ওপর সওয়ার ছিল তার সম্মুখ দিয়ে সমুদ্রের দিকে ঘোটকীটি অগ্রসর হল। তার ঘোড়াটি ঘোটকীর প্রতি আকৃষ্ট হল এবং ঘোড়াটি ঘোটকীর পিছু পিছু ছুটতে লাগল। জিবরাঈল আ. দ্রুত তার সামনে গেলেন এবং সমুদ্রে ঝাঁপ দিলেন। ঘোড়া ও মাদী ঘোড়াটি ছুটতে লাগল। ঘোড়াটি সামনের দিকে দ্রুত অগ্রসর হতে লাগল। ঘোড়ার ওপর ফেরাউনের আর নিয়ন্ত্রণ রইল না। ফেরাউন তার ভালো-মন্দ কিছুই চিন্তা করতে সক্ষম হল না। সেনাবাহিনী যখন ফেরাউনকে দ্রুত সামনের দিকে অগ্রসর হতে দেখল, তারাও অতি দ্রুত তার পিছনে সমুদ্রে ঝাঁপ দিল। যখন তারা সকলেই পরিপূর্ণভাবে সমুদ্রে ঢুকে গেল এবং সেনাবাহিনীর প্রথম ভাগ সমুদ্র থেকে বের হওয়ার উপক্রম হল, আল্লাহ তাআলা মূসা আ.-কে আদেশ করলেন- তিনি যেন তাঁর লাঠি দিয়ে পুনরায় সমুদ্রে আঘাত করেন। তিনি সমুদ্রে আঘাত করলেন। তখন সমুদ্র পূর্বের আকার ধারণ করে ফেরাউন ও তার সেনাবাহিনীর মাথার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হল। ফলে তাদের কেউই আর রক্ষা পেল না, সকলেই ডুবে মরল।