📄 মূসা আ.-এর মিসর হতে বহির্গমন
হযরত মূসা আ. দীর্ঘ একটা সময় পর্যন্ত রাজমহলে রাজকীয় আদর-যত্নে দিনাতিপাত করতে করতে যৌবনে পদার্পণ করলেন। তিনি একজন সবল দেহী সাহসী যুবকে পরিণত হলেন। মুখমণ্ডল থেকে গাম্ভীর্য প্রস্ফুটিত হতে লাগল। কথাবার্তায় এক বিশেষ ধরনের মহত্তের প্রকাশ পাচ্ছে। তা ছাড়া তিনি জানতে পেরেছিলেন, তিনি বনি ইসরাঈল বংশীয়। মিসরীয় খান্দানের সাথে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি আরো দেখলেন, বনি ইসরাঈলদের প্রতি অত্যন্ত জুলুম করা হচ্ছে এবং তারা মিসরে অনেক অপমান ও গোলামীর জীবন অতিবাহিত করছে। এটা দেখে রাগে তাঁর রক্ত টগবগ করত। সুযোগ পেলে তিনি বনি ইসরাঈলদের সাহায্য ও সংরক্ষণে এগিয়ে যেতেন।
ইমাম তাবারী রহ. তাঁর ইতিহাসে লিখেছেন: মূসা আ. যখন যৌবনে পদার্পণ করেন এবং শক্তিশালী যুবক সাব্যস্ত হন, তখন বনি ইসরাঈলদের ব্যাপারে তাঁর সাহায্য ও সংরক্ষণের সুফলে বনি ইসরাঈলদের উপর মিসরী কর্মচারীদের অত্যাচার হ্রাস পেতে লাগল। আর এতে কোনো সন্দেহ নেই, বনি ইসরাঈলদের অপমান ও দাসত্বের জন্য মূসা আ.-এর রাগান্বিত ও চিন্তান্বিত হওয়া এবং তাদের সাহায্য-সংরক্ষণের জন্য তাঁর অন্তরে গভীর ও অতিশয় আবেগ থাকা একটি স্বভাবজাত খোদাপ্রদত্ত বিষয় ছিল।
এখন আল্লাহ পাকের দানের হাত আরও অগ্রসর হল। তিনি মূসা আ.-কে দৈহিক শক্তির সাথে সাথে হেকমত এবং জ্ঞানের অলঙ্কারেও ভূষিত করলেন। এখন পরিপক্ক বয়সে পৌঁছে তাঁর মীমাংসা শক্তি, সূক্ষ্ম জ্ঞান ও চিন্তাশক্তি উচ্চস্তরে উপনীত হল। তিনি দৈহিক ও আধ্যাত্মিক শক্তিতে পূর্ণতা লাভ করলেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَمَّا بَلَغَ أَشُدَّهُ وَاسْتَوَى آتَيْنَاهُ حُكْمًا وَعِلْمًا وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ
"আর যখন (মূসা) নিজের দৈহিক শক্তি ও জ্ঞান-শক্তিতে এক সীমা পর্যন্ত পৌঁছল, তখন আমি তাকে মীমাংসা (শক্তি) এবং জ্ঞান দান করলাম। এরূপেই আমি সৎকর্মশীলদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি।" (সূরা কাছাছ)
মোটকথা, মূসা আ. শহরে ভ্রমণকালে এ সমস্ত অবস্থা দেখতেন এবং কোনো কোনো সময় বনী ইসরাঈলের সাহায্য করতেন।
একদিন তিনি শহরের লোকালয় ছেড়ে শহরের এক প্রান্তের দিকে গমনকালে দেখলেন, একজন মিসরী একজন ইসরাঈলীকে বেগার খাটানোর জন্য টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। ইসরাঈলী ব্যক্তি মূসা আ.-কে দেখে সাহায্য চাইল। মিসরী ব্যক্তির এ জুলুম দেখে হযরত মূসা আ. ক্রোধান্বিত হয়ে তাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করলেন, কিন্তু মিসরী ব্যক্তি তাঁর কথায় কর্ণপাত করল না। মূসা আ. ক্রোধে সজোরে এক চপেটাঘাত করলেন তাকে। মিসরী সেই আঘাত সহ্য করতে না পেরে তৎক্ষণাৎ মরে গেল। অনুতপ্ত ও লজ্জিত হয়ে মনে মনে বললেন, এটা নিশ্চয়ই শয়তানের কাজ। সে-ই মানুষকে ভুল পথে চালিত করে। তিনি আল্লাহ পাকের দরবারে প্রার্থনা করতে লাগলেন- যা কিছু হয়েছে অনিচ্ছাক্রমে অজ্ঞতার কারণে হয়েছে, আমি আপনার দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আল্লাহ তাআলা তাঁকে ক্ষমা করে দিলেন এবং ক্ষমার সুসংবাদও প্রদান করলেন। এদিকে শহরে মিসরীয় ব্যক্তির হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ল, কিন্তু হত্যাকারীর কোনো সন্ধান পাওয়া গেল না, অবশেষে মিসরীরা ফেরাউনের নিকট ফরিয়াদ জানাল, এ কাজ নিশ্চয়ই কোনো ইসরাঈলী ব্যক্তি করেছে। অতএব আপনি এর বিচার করুন। ফেরাউন বলল, এভাবে সমগ্র কওম হতে তো প্রতিশোধ নেওয়া সম্ভব নয়। তোমরা হত্যাকারীর সন্ধান কর। আমি অবশ্যই তাকে কর্মের প্রতিফল ভোগ করাব।
ঘটনাক্রমে পরের দিনও হযরত মূসা আ. শহরের শেষ প্রান্তে ভ্রমণ করছিলেন। দেখতে পেলেন, সেই ইসরাঈলী জনৈক কিবতীর (মিসরীর) সাথে ঝগড়া করছে এবং মিসরী ব্যক্তিকেই প্রবল মনে হচ্ছে। মূসা আ.-কে দেখে ইসরাঈলী ব্যক্তি গত দিনের মতো আজও তাঁর নিকট ফরিয়াদ করল এবং বিচারের প্রার্থনা করল।
এ ঘটনা দেখে হযরত মূসা আ. দ্বিগুণ অসন্তুষ্ট হলেন। একদিকে মিসরী ব্যক্তির জুলুম এবং অপরদিকে ইসলাঈলী ব্যক্তির চিৎকার এবং আগের ঘটনার স্মরণ, এ বিরক্তির মধ্যে একদিকে তিনি মিসরী ব্যক্তিকে নিবৃত্ত করার জন্য হাত বাড়ালেন এবং সঙ্গে সঙ্গে ইসরাঈলী ব্যক্তিকেও ধমক দিয়ে বললেন: إِنَّكَ لَغَوِيٌّ مُّبِينٌ 'তুইও একজন প্রকাশ্য গোমরাহ লোক'। অর্থাৎ অযথা ঝগড়া বাঁধিয়ে সাহায্যের জন্য ফরিয়াদ করতে থাকিস।
ইসরাঈলী ব্যক্তি হযরত মূসা আ.-কে তার দিকে হাত বাড়াতে দেখে এবং নিজের সম্বন্ধে অসন্তোষমূলক কটুক্তি শ্রবণ করে মনে করল, উনি এখন তাকে মারার জন্যই হাত বাড়াচ্ছেন এবং ধরতে চাচ্ছেন। তখন সে উদ্বেগের সঙ্গে বলল: أَتُرِيدُ أَنْ تَقْتُلَنِي كَمَا قَتَلْتَ نَفْسًا بِالْأَمْسِ "তুমি কি আমাকেও সেভাবে হত্যা করতে চাও, যেভাবে তুমি গত কাল এক (কিবতি) ব্যক্তিকে হত্যা করেছ?"
কিবতি লোকটি এ কথা শুনে তখনই ফেরাউন সম্প্রদায়ের কাছে গিয়ে সমুদয় ঘটনা বিবৃত করে শুনাল। তারা গিয়ে ফেরাউনকে জানাল, গতকালের মিসরীয় ব্যক্তির হত্যাকারী মূসা। ফেরাউন এটা শুনতেই জল্লাদকে আদেশ করল, এখনই গিয়ে মূসাকে গ্রেফতার করে আমার সম্মুখে উপস্থিত কর। মিসরীদের এ মজলিসে এমন একজন সম্মানিত ও পদস্থ ব্যক্তিও উপস্থিত ছিলেন, যিনি মনে-প্রাণে হযরত মূসা আ.-কে মহব্বত করতেন এবং ইসরাঈলী ধর্মকে সত্য মনে করতেন। তিনি ছিলেন ফেরাউনের খান্দানেরই একজন এবং দরবারের সভাসদ। তিনি ফেরাউনের এ আদেশ শ্রবণ করে জল্লাদের পূর্বেই দরবার থেকে বের হলেন। হযরত মূসা আ.-এর খেদমতে হাজির হয়ে তাকে পুরো বিষয়টি জানিয়ে পরামর্শ দিলেন, এখন আপনার জন্য মঙ্গলজনক হচ্ছে- নিজেকে মিসরীদের হাত থেকে রক্ষা করুন! এমন কোনো স্থানের দিকে হিজরত করুন, যেখানে ফেরাউনের ক্ষমতা চলবে না। হযরত মূসা আ. তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করলেন। এবং নীরবে মাদায়েন দেশের দিকে হিজরত করে চলে গেলেন।
এখানে লক্ষণীয়, কুরআন মাজিদ ওই লোকটি সম্বন্ধে শুধু বলেছে, وَجَاءَ رَجُلٌ مِنْ أَقْصَى الْمَدِينَةِ يَسْعَى “আর শহরের শেষ প্রান্ত হতে একজন লোক দৌড়ে এল।" আমরা অবশ্য তার সাথে 'সম্মানিত' ও 'পদস্থ' দুটি বিশেষ গুণ যোগ করে দিলাম। এর কারণ হল, আবদুল ওয়াহ্হাব নাজ্জার রহ. বলেন- কুরআন মাজিদ ফেরাউন বংশীয় আগন্তুক লোকটির সম্বন্ধে দুটি বিশেষণ উল্লেখ করেছে।
(১) লোকটি শহরের শেষপ্রান্ত থেকে এসেছিল। আরব দেশে এ প্রবাদ বাক্য প্রসিদ্ধ রয়েছে- الاطراف سکنی الاشراف "শহরের প্রান্ত ভাগ সম্মানিত লোকদের বাসস্থান।" (২) লোকটি এসে হযরত মূসা আ.-কে বলল: إِنَّ الْمَلَأَ يَأْتَمِرُونَ بِكَ لِيَقْتُلُوكَ “রাজ-দরবারের লোকেরা আপনাকে হত্যা করার পরামর্শ করছে।" বলাবাহুল্য, এরূপ কথা এমন ব্যক্তিই জানতে পারে, যে ব্যক্তি ফেরাউন ও তার সভাসদগণের মধ্যে বিশেষ পদ-মর্যাদার অধিকারী।
📄 মূসা আ.-এর মাকে ওহি প্রেরণ
মূসা আ.-এর মায়ের কাছে যে ওহি পাঠানো হয়েছিল, তা ছিল এলহাম ও হৃদয়ে প্রক্ষিপ্ত নির্দেশনা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَأَوْحَى رَبُّكَ إِلَى النَّحْلِ أَنِ اتَّخِذِي مِنَ الْجِبَالِ بُيُوتًا وَمِنَ الشَّجَرِ وَمِمَّا يَعْرِشُونَ ) ثُمَّ كُلِي مِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ فَاسْلُكِي سُبُلَ رَبِّكِ ذُلُلًا
"তোমার প্রতিপালক মৌমাছিকে তার অন্তরে ইঙ্গিতে নির্দেশ দিয়েছেন, ঘর তৈরি কর পাহাড়ে, গাছপালায় ও মানুষ যে ঘর তৈরি করে তাতে। এরপর প্রত্যেক ফল থেকে কিছু কিছু আহার কর এবং তোমার প্রতিপালকের সহজ পথ অনুসরণ কর।" (সূরা নাহল: ৬৮) এ ওহি নবুয়তের ওহি নয়। ইবনে হাযম রহ. এবং ইলমে আকাইদ বিশারদগণের অনেকেই একে তেমনি ওহি মনে করেন। কিন্তু প্রথম অভিমতটি বিশুদ্ধ। আর এটিই আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের মত বলে আবুল হাসান আশয়ারি রহ. বর্ণনা করেছেন।
সুহায়লি বলেছেন, মূসা আ.-এর মায়ের নাম ছিল আয়ারেখা। কেউ কেউ বলেন, তাঁর নাম ছিল আয়াযাপ্ত। ওহির নির্দেশনা তাঁর অন্তরে ঢেলে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর কলবে ইলহাম করা হয়েছিল- তুমি ভয় করো না এবং দুঃখিত হয়ো না। কেননা যদিও সন্তানটি এখন তোমার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। তথাপি আল্লাহ শীঘ্রই তাকে ফেরত দেবেন। আর আল্লাহ তাঁকে অচিরেই রাসূল হিসেবে মনোনীত করবেন। তিনি আল্লাহ তাআলার কিতাবকে দুনিয়া ও আখেরাতে সমুন্নত করবেন। এরপর মূসা আ.-এর মা তাই করলেন, যেভাবে তিনি আদিষ্ট হয়েছিলেন। একদিন তিনি তাকে ছেড়ে দিলেন। কিন্তু অভ্যাস মতো রশির প্রান্ত নিজের কাছে আটকে রাখতে ভুলে গেলেন। আর মূসা আ. ভেসে গেলেন নীলনদের স্রোতে। তারপর গিয়ে পৌঁছলেন ফেরাউনের বাড়ির ঘাটে। ফেরাউনের লোকজন তাকে উঠিয়ে নিল। এর পরিণাম তো ছিল, একদিন তিনি তাদের শত্রু ও দুঃখের কারণ হবেন। বস্তুত ফেরাউন, তার দুষ্ট উজির হামান এবং তাদের অনুচররা ভ্রান্তির মধ্যে ছিল। তাই তারা এ শাস্তি ও হতাশার যোগ্য হয়ে পড়ে।
মুফাসসিরগণ আরো উল্লেখ করেন, দাসিরা তাকে একটি বন্ধ সিন্দুকে দরিয়া থেকে উদ্ধার করে। কিন্তু তারা তা খুলতে সাহস পায় নি। তারা ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া বিনতে মুযাহিস ইবনে আসাদ ইবনে রাইয়ান ইবনুল ওলীদের সামনে বন্ধ সিন্দুকটি নিয়ে রাখল।
এ ওলীদই ছিল ইউসুফ আ.-এর যুগে মিসরের ফেরাউন। তৎকালীন মিসরের অধিপতীদের উপাধি ছিল ফিরাউন। আবার কেউ কেউ বলেন, আসিয়া ছিলেন বনি ইসরাঈল বংশীয় এবং মূসা আ.-এর গোত্রের মহিলা। আবার কেউ কেউ বলেন, তিনি ছিলেন মূসা আ.-এর ফুফু। প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক সুহায়লিও এরূপ বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তাআলাই অধিক জ্ঞাত।
আসিয়া যখন সিন্দুকটির মুখ খুললেন, তখন দেখলেন মূসা আ.-এর চেহারা নবুয়তের উজ্জ্বল নূরে ঝলমল করছে। মূসা আ.-কে দেখামাত্র আসিয়ার হৃদয়মন তার প্রতি স্নেহ-মমতায় ভরে উঠল। ফেরাউন এসে শিশুটিকে জবাই করার নির্দেশ দিল। কিন্তু আসিয়া ফেরাউনের কাছ থেকে তাঁকে চেয়ে নিলেন। বললেন: এই শিশুটি তোমার ও আমার চোখ জুড়াবে। ফেরাউন বলল, এটা তোমার জন্যে হতে পারে, কিন্তু আমার জন্যে নয়। একে দিয়ে আমার কোনোই প্রয়োজন নেই। কথা বাড়ালে বিপত্তিই বাড়ে। আসিয়া বলেছিলেন:
"সে আমাদের উপকারে আসতে পারে।" আল্লাহ তাআলা তাঁর সে আশা পূর্ণ করেছিলেন। দুনিয়ায় আল্লাহ তাআলা তাঁকে মূসা আ.-এর দ্বারা হেদায়েত দান করেছেন এবং আখেরাতে তাঁকে মূসা আ.-এর প্রতি ঈমান আনার কারণে তিনি জান্নাতে যাবেন। আবার তিনি বলেছিলেন: "আমরা তাকে সন্তান হিসেবেও গ্রহণ করতে পারি।” তারা তাঁকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। কেননা তাদের কোনো সন্তান ছিল না। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ অর্থাৎ তারা জানে না। মূসা আ. কে সিন্দুক থেকে উঠিয়ে নেওয়ার জন্যে ফেরাউন পরিবারকে নিযুক্ত করে আল্লাহ তাআলা ফেরাউন ও তার সৈন্যদের প্রতি কিরূপ মহাআযাব অবতীর্ণ করতে চেয়েছিলেন।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. মুজাহিদ, ইকরামা, সাঈদ ইবনে জুবাইর প্রমুখ বলেন: “মূসা আ.-এর মায়ের অন্তর দুনিয়ার অন্যান্য চিন্তা ছেড়ে দিয়ে শুধু মূসা আ.- কে নিয়ে চিন্তায় অস্থির ছিল। আল্লাহ তাআলা যদি তাঁকে ধৈর্য দান না করতেন এবং তাঁর হৃদয়ে দৃঢ়তা দান না করতেন, তা হলে ব্যাপারটি তিনি প্রকাশ করে দিতেন। এবং অন্যের কাছে প্রকাশ্যে তাঁর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে ফেলতেন। তিনি তাঁর বড় মেয়ে, মূসা আ.-এর বোনকে তার পেছনে পেছনে গিয়ে খবরাখবর নেওয়ার জন্যে পাঠালেন। মুজাহিদ রহ. বলেন, সে দূর থেকে তাকে লক্ষ করছিল। আর কাতাদা রহ. বলেন, তিনি এমনভাবে তাঁর প্রতি লক্ষ্য করছিলেন যেন এ ব্যাপারে তাঁর কোনো আগ্রহ নেই। যখন ফেরাউনের ঘরে মূসা আ.-এর থাকা চূড়ান্ত হল, ফেরাউনের লোকজন প্রথমে তাঁকে দুধ পান করানোর চেষ্টা করল, কিন্তু তিনি কারো বুকের দুধ গ্রহণ করলেন না। অন্য কোনো খাদ্যও গ্রহণ করলেন না। তারা তাঁর ব্যাপারে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে যে প্রকারেই হোক তাঁকে যে কোনো খাদ্য খাওয়াতে চেষ্টা করল; কিন্তু তারা তাতে ব্যর্থ হল। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"পূর্ব থেকেই আমি অন্যের বুকের দুধ গ্রহণ থেকে তাকে বিরত রেখেছিলাম।" তারা তাঁকে ধাত্রী ও অন্যান্য নারীসমেত বাজারে পাঠাল। যাতে তারা এমন লোক খুঁজে বের করতে পারে, যে তাকে দুধ পান করাতে সক্ষম। তারা তাঁকে নিয়ে ছিল ব্যস্ত এবং বাজারের লোকজনও তাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এমন সময় মূসা আ.-এর বোন মূসা আ.-এর দিকে তাকালেন কিন্তু তিনি তাঁকে চিনেন বলে পরিচয় প্রকাশ করলেন না, বরং বললেন:
هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى أَهْلِ بَيْتٍ يَكْفُلُونَهُ لَكُمْ وَهُمْ لَهُ ন্াসিহূণ
"তোমাদের কি আমি এমন এক পরিবারের সন্ধান দিব, যারা তোমাদের হয়ে তাকে লালন-পালন করবে এবং তার মঙ্গলকামী হবে?"
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, "মূসা আ.-এর বোন যখন তাদেরকে এরূপ বললেন, তখন তারা তাকে বলল, তুমি কেমন করে জানো, তারা তার মঙ্গলকামী ও তার প্রতি মেহেরবান হবে? তিনি বললেন: বাদশার বেগমের ছেলের উপকার সাধনে, সকলেই আগ্রহী। তখন তারা তাকে ছেড়ে দিল এবং তার সাথে তারা তাদের বাড়িতে গেল। তখন মূসা আ.-এর মা মূসা আ.-কে কোলে তুলে নিলেন ও তাঁকে নিজ বুকের দুধ খেতে দিলেন। মূসা আ. মায়ের স্তন মুখে নিলেন, চুষতে আরম্ভ করলেন এবং দুধ পান করতে লাগলেন। আসিয়া মূসা আ.-এর মাকে তাঁর মহলে ডেকে পাঠালেন এবং সেখানে অবস্থান করে তাঁকে উপকৃত করতে আসিয়া রাযি. আহ্বান জানালেন। কিন্তু মূসা আ.-এর মা তাতে রাযি হলেন না। বললেন, আমার স্বামী ও ছেলে-মেয়ে রয়েছে। তাই আমি তাদেরকে ছেড়ে মহলে থাকতে পারি না। তবে আপনি যদি তাকে আমার নিকট পাঠিয়ে দেন, তা হলে আমি তাকে দুধ পান করাতে পারি। তখন আসিয়া আ. মূসা আ.-কে তাঁর মায়ের সঙ্গে যেতে দিলেন। তিনি তাঁর জন্যে বহু মূল্যবান উপঢৌকন দিলেন ও তাঁর খোরপোশের জন্য ভাতা নির্ধারণ করে দিলেন। মূসার মা মূসা আ.-কে নিয়ে নিজ ঘরে ফিরে গেলেন এবং এভাবে আল্লাহ তাআলা পুনরায় মা-ছেলের মিলন ঘটালেন। মূসা-জননীর কাছে মূসা আ.-কে ফেরত প্রদানের মাধ্যমে একটি প্রতিশ্রুতি এভাবে পূর্ণ হল। আর এটাই নবুয়তের সুসংবাদের সত্যতার প্রমাণ হিসেবে বিবেচ্য।
তারপর তিনি যখন পূর্ণ যৌবন লাভ করেন এবং শারীরিক গঠন ও চরিত্রে উৎকর্ষ মণ্ডিত হলেন- অধিকাংশ উলামার মতে, যখন ৪০ বছর বয়সে উপনীত হলেন- তখন আল্লাহ তাআলা তাঁকে হেকমত ও নবুয়তের জ্ঞান দান করেন। এ বিষয়ে তাঁর মাতাকে পূর্বেই আল্লাহ তাআলা সুসংবাদ প্রদান করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা বলেন :
إِنَّا رَادُّوهُ إِلَيْكِ وَجَاعِلُوهُ مِنَ الْمُرْسَلِينَ
📄 মূসা আ.-এর মাদায়েন গমন
হযরত মূসা আ. যখন মিসর থেকে বের হওয়ার ইচ্ছা করলেন, তখন মাদায়েন দেশকেই মনোনীত করলেন। মাদায়েনের লোকালয়টি ছিল মিসর থেকে ৮ মনযিল দূরে অবস্থিত। খুব সম্ভব মাদায়েনবাসীদের এ গোত্রটি হযরত মূসা আ.-এর নিকটাত্মীয় ছিল। কেননা মূসা আ. ছিলেন হযরত ইসহাক ইবনে ইবরাহীম আ.-এর বংশধর। আর মাদায়েনবাসী হল হযরত ইসহাক আ.-এর ভ্রাতা মাদইয়ান ইবনে ইবরাহীমের বংশ থেকে উদ্ভূত। হয়তো এ কারণেই তিনি এদেশটি বেছে নেন।
হযরত মূসা আ. যেহেতু ফেরাউনের ভয়ে পলায়ন করেছিলেন; সুতরাং তাঁর সঙ্গে কোনো সাথী ছিল না। পথপ্রদর্শকও না। এবং কোনো পাথেয়ও ছিল না। আর দ্রুত চলার জন্য ছিলেন খালি পা।
ইমাম তাবারী হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর রাযি. থেকে রেওয়ায়েত করেছেন: পূর্ণ এ সফরে মূসা আ.-এর খাদ্য গাছের পাতা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। খালি পা হওয়ায় এ দীর্ঘ সফরে তাঁর পায়ের তলার চামড়া পর্যন্ত পড়ে গিয়েছিল। এমনি অস্থির ও পেরেশান অবস্থায় হযরত মূসা আ. মাদায়েনের ভূখণ্ডে প্রবেশ করলেন।
আল্লাহ পাক হযরত মূসা আ.-এর মিসর ত্যাগের অবস্থা বর্ণনা করেছেন। ফেরাউন সম্প্রদায়ের কেউ তাকে দেখে ফেলে কি-না, এ ভয়ে চতুর্দিকে তাকাতে তাকাতে মূসা আ. শহর থেকে বের হয়ে পড়লেন। কিন্তু কোথায় যাবেন, কোন দিকে যাবেন, তিনি কিছুই জানেন না। তিনি ইতোপূর্বে মিসর থেকে আর কোনো দিন বের হন নি। যখন তিনি মাদায়েনের পথ ধরলেন- তখন তিনি বলে উঠলেন, আমি আশা করি আমার প্রতিপালক আমাকে সোজা রাস্তা প্রদর্শন করবেন। অর্থাৎ সম্ভবত আমি এবার মনযিলে মকসুদে পৌঁছুতে পারব। বাস্তবে হয়েছিলও তাই। এ পথই তাঁকে মনযিলে মকসুদে নিয়ে পৌঁছায়। কিন্তু কি সে মনযিলে মকসুদটি?
মাদায়েনে একটি কুয়া ছিল, যার পানি সকলে পান করত। মাদায়েন হল সেই শহর, যেখানে আল্লাহ তাআলা আইকাবাসীদের ধ্বংস করেছিলেন। আর তারা ছিল শুআইব আ.-এর সম্প্রদায়।
ওলামায়ে কেরামের একটি মতানুযায়ী মূসা আ.-এর যুগের পূর্বে তারা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। যখন মূসা আ. মাদায়েনের পানির কূপের কাছে পৌঁছলেন, সেখানে একদল লোক পেলেন। নিজ নিজ পশুগুলোকে পানি পান করাচ্ছে তারা। তাদের পেছনে দুজন বালিকাকে দেখলেন, নিজেদের ছাগলগুলোকে সামলে দাঁড়িয়ে আছে। যাতে সেগুলো সম্প্রদায়ের ছাগলের সঙ্গে মিশে না যায়।
কিতাবিদের মতে সেখানে সাতজন নারী ছিল। এটাও তাদের ভ্রান্ত ধারণা। তারা সাতজন হতে পারে, তবে তাদের মধ্য হতে পানি পান করাতে এসেছিল দুজন। তাদের বর্ণনা বিশুদ্ধ হলেই কেবল এ ধরনের সামঞ্জস্যসূচক উত্তর গ্রহণযোগ্য হতে পারে। এটা স্পষ্ট, শুআইব আ.-এর কেবল দুটি কন্যাই ছিল। মূসা আ.-এর প্রশ্নের উত্তরে তাঁরা বললেন, আমাদের দুর্বলতার কারণে রাখালদের পানি পান করানোর আগে আমরা পানির কাছে পৌঁছুতে পারি না। আর এ সব পশু নিয়ে আমাদের আসার কারণ হচ্ছে, আমাদের পিতা বৃদ্ধ ও দুর্বল। তখন মূসা আ. তাদের পশুগুলোকে পানি পান করিয়ে দিলেন।
তাফসিরকারকগণ বলেন, রাখালরা যখন তাদের পশুগুলোর পানি পান করানো শেষ করত, তখন তারা কুয়ার মুখে একটি বড় ও ভারি পাথর রেখে দিত। তারপর আসতেন এ দুই নারী। লোকেরা তাদের পশুগুলোকে পানি পান করানোর পর যা উচ্ছিষ্ট থাকত, তা থেকে নিজেদের বকরিগুলোকে পানি পান করাতেন। আজ মূসা আ. একাই সেই পাথরটা উঠালেন। তারপর তিনি তাদেরকে ও তাদের বকরিগুলোকে পানি পান করালেন এবং পাথরটি আগের জায়গায় রেখে দিলেন।
আমিরুল মুমিনিন হযরত ওমর রাযি. বলেন, পাথরটি দশজনে মিলে উঠাতে হতো। হযরত মূসা আ. এক বালতি পানি তুললেন। এতে দুনো বালিকার প্রয়োজন মিটে গেল। এরপর পুনরায় তিনি গাছের ছায়ায় ফিরে আসেন। তাফসিরকারকগণ বলেন, এটা সামার গাছের ছায়া। ইবনে জারীর তাবারী রহ. ইবনে মাসউদ রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি এ গাছটিকে সবুজ ও ছায়াদার দেখেছেন।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, মূসা আ. মিসর থেকে মাদায়েন ভ্রমণকালে শাক-সবজি ও গাছের পাতা ছাড়া অন্য কিছু খেতে পান নি। তাঁর পায়ে তখন জুতা ছিল না। জুতা না থাকায় দুই পায়ের তলায় জখম হয়ে গিয়েছিল। তিনি গাছের ছায়ায় বসলেন। তিনি ছিলেন সৃষ্টিকুলের মধ্যে আল্লাহ তাআলার মনোনীত ব্যক্তি। অথচ ক্ষুধার কারণে তাঁর পেট পিঠের সঙ্গে লেগে গিয়েছিল। এবং তাঁর দেহে এর প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট। এমনকি তিনি তখন এক টুকরো খেজুরের মুখাপেক্ষী ছিলেন।
📄 বুযুর্গ ব্যক্তির সঙ্গে শ্বশুরজামাতা সম্পর্ক
হযরত মূসা আ. ও মাদায়েনের ওই বুযুর্গ গৃহকর্তার কথাবার্তা হচ্ছিল। এমন সময়ে বৃদ্ধের কন্যা, যিনি মূসা আ.-কে ডেকে আনতে গিয়েছিলেন, নিজের পিতাকে বললেন- হে পিতা! আপনি এই মেহমানকে আপনার গৃহপালিত পশুগুলি চরানো এবং এদের পানি সংগ্রহ করার জন্য শ্রমিক নিযুক্ত করুন। শ্রমিক এমন ব্যক্তিই ভালো, যে শক্তিশালীও হয় এবং আমানতদারও হয়।
তাফসিরকারকগণ বলেন, কন্যার এ উক্তি পিতার কাছে একটু বিস্ময়কর বোধ হল। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: এ মেহমানের শক্তি ও আমানতদারী তুমি কেমন করে জানতে পারলে? কন্যা উত্তর করল, আমি মেহমানের দৈহিক শক্তি তো এ থেকে অনুমান করলাম, কূপের বড় বালতিটি তিনি একাই টেনে উঠালেন। আর আমানতদারীর পরীক্ষা এ থেকে করলাম, যখন আমি তাঁকে ডাকতে গেলাম, তখন তিনি আমাকে দেখামাত্র দৃষ্টি অবনত করে নিলেন। আর কথোপকথনের সময়ে তিনি একবারও আমার দিকে দৃষ্টিপাত করেন নি। এরপর যখন তাকে ডেকে নিয়ে আসতে গেলাম, তখন আমাকে তাঁর পিছনে চলতে বললেন এবং তিনি নিজে সম্মুখে সম্মুখে চললেন। এবং শুধু ইশারা-ইঙ্গিতে আমি তাঁকে পথ দেখাতে লাগলাম। বুযুর্গ পিতা কন্যার এ সমস্ত কথা শুনে অতিশয় আনন্দিত হলেন এবং হযরত মূসা আ.-কে বললেন, "যদি তুমি ৮ বছর আমার কাছে থেকে আমার বকরি চরাও, তবে আমি আমার এ কন্যাটিকে তোমার বিবাহ বন্ধনে প্রদান করতে প্রস্তুত আছি। আর যদি তুমি এ মেয়াদকে আরো ২ বছর বৃদ্ধি করে দশ বছর পূর্ণ কর, তবে আরো উত্তম হবে। এটিই হবে এ কন্যার মহর।" হযরত মূসা আ. এ শর্ত কবুল করে নিলেন এবং বললেন, "আমার খুশির উপর ছেড়ে দিন! আমি উক্ত দুই মেয়াদের যেটি ইচ্ছে পূর্ণ করব। আপনার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বাধ্য-বাধকতা থাকবে না।" উভয় পক্ষের পারস্পরিক সম্মতির পরে মাদায়েনের বুযুর্গ লোকটি বর্ণিত মেয়াদকে মহর সাব্যস্ত করে হযরত মূসা আ.-এর সঙ্গে নিজের এ কন্যাকে বিবাহ দিলেন। কোনো কোনো তাফসিরকারক ধারণা করেন, মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে বিবাহ বন্ধন সম্পন্ন হয়েছিল এবং আকদ হওয়ার পরক্ষণেই হযরত মূসা আ. নিজের স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে মাদায়েন ত্যাগ করেছেন। তা ছাড়া তাফসিরকারকগণ হযরত মূসা আ.-এর স্ত্রীর নাম বলেছেন সফুরা।