📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 হযরত ইউনুস আ.-এর ঘটনা

📄 হযরত ইউনুস আ.-এর ঘটনা


ইউনুস আ.-এর ঘটনাটি যদিও সংক্ষিপ্ত এবং ঘটনা প্রকাশে পরিষ্কার ও স্পষ্ট, কিন্তু কোনো কোনো ব্যাখ্যামূলক আলোচনায় ওটার অংশ বিশেষকে জটিল করে দিয়েছে। সুতরাং প্রথমে কুরআন পাকের আয়াতসমূহের আলোকে ঘটনাটিকে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে দেওয়া সমীচীন মনে হচ্ছে। এরপর ব্যাখ্যামূলক আলোচনা করা হবে, যাতে ঘটনাটির প্রকৃত তথ্য অবগত হওয়ার ব্যাপারে সহায়ক হয়।

আল্লাহ তাআলা হযরত ইউনুস আ.-কে ২৮ বছর বয়সে নবুয়ত দান করেন এবং নীনাওয়াবাসীকে দাওয়াত দেওয়ার আদেশ করেন। হযরত ইউনুস আ. এক সুদীর্ঘকাল পর্যন্ত তাদের মধ্যে তাওহিদের দাওয়াত প্রদান করতে থাকেন। কিন্তু তারা সত্যের প্রতি কর্ণপাত করল না। বরং নাফরমানি ও অবাধ্যতাচরণের সঙ্গে শিরক ও কুফরের ওপর হঠকারিতা করতে থাকল। অতীতকালের নাফরমান উম্মতদের মতো আল্লাহ তাআলার সত্য পয়গম্বরের সত্য-প্রচারকেও ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতে থাকল। তাদের অনবরত বিরুদ্ধাচরণ ও শত্রুতার কারণে কওমের ওপর ইউনুস আ. ব্যথিত ও অসন্তুষ্ট হলেন। ক্রোধভরে তাদের ওপর আল্লাহ তাআলার আযাবের বদ দুআ করে তাদের থেকে অন্যত্র চলে গেলেন।

ইউনুস আ. যখন ফোরাত নদীর তীরে পৌঁছলেন, (তাফসিরে রূহুল মাআনী) তখন তিনি যাত্রীভর্তি একটি নৌকা পেয়ে তাতে আরোহণ করলেন। নৌকাটি নঙ্গর উঠিয়ে গন্তব্য পথে যাত্র করল। পথিমধ্যে ঝড়তুফান এসে নৌকাটিকে ঘেরাও করল। যখন নৌকাটি ভীষণভাবে টলতে লাগল এবং নৌকারোহীদের বিশ্বাস জন্মাল, তারা ডুবে মরবে, তখন তারা নিজেদের আকিদা অনুযায়ী বলতে লাগল, 'মনে হয় নৌকার মধ্যে মনিব থেকে পলাতক কোনো গোলাম আছে। তাকে নৌকা থেকে নামিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত মুক্তি পাওয়া কঠিন হবে।' এটা শুনে ইউনুস আ.-এর চেতনা হল, আল্লাহ তাআলার অহির অপেক্ষা না করে নীনাওয়া থেকে এভাবে আমার চলে আসা আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন নি। এ দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া আমার পরীক্ষার আলামত। এ চিন্তা করে তিনি নৌকার আরোহীবৃন্দকে বললেন, সেই পলাতক গোলাম আমি। আমিই নিজ মনিব থেকে পালিয়ে এসেছি। সুতরাং আমাকে নৌকার বাইরে ফেলে দাও।

কিন্তু নৌকার মাঝি ও আরোহীগণ তাঁর সততা ও পবিত্রতায় অত্যন্ত মুগ্ধ হয়ে পড়ল। তারা এরূপ করতে সম্মত হল না। পারস্পরিক পরামর্শক্রমে 'লটারি' দেওয়ার সিদ্ধান্ত হল। ফলত তিনবার লটারি করা হল, প্রতিবারই লটারিতে হযরত ইউনুস আ.-এর নাম আসল। তখন বাধ্য হয়ে তারা ইউনুস আ.-কে নদীতে নিক্ষেপ করল কিংবা তিনি নিজেই নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। সেই মুহূর্তেই আল্লাহ তাআলার আদেশে একটি মাছ তাঁকে গিলে ফেলল। মাছের ওপর আদেশ ছিল, শুধু গিলে ফেলার অনুমতি আছে; কিন্তু ইউনুস তোমার খাদ্য নয়। সুতরাং তার দেহের যেন কোনো প্রকার ক্ষতি না হয়। (ফাতহুল বারি: ৬/৫১)

ইউনুস আ. যখন মাছের পেটে নিজেকে জীবিত দেখতে পেলেন, তখন তিনি আল্লাহ তাআলার দরবারে লজ্জা ও অনুতাপ প্রকাশ করলেন, কেন আমি আল্লাহ তাআলার ওহির অপেক্ষা না করে এবং তাঁর অনুমতি না নিয়ে, উম্মতের প্রতি ধর্মপ্রচার থেকে অসন্তুষ্ট হয়ে নীনাওয়া থেকে বেরিয়ে এলাম। তাই ত্রুটি মার্জনার জন্য আল্লাহ তাআলার দরবারে এরূপে দোয়া করতে লাগলেন:
লَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
"ইয়া আল্লাহ! আপনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। আপনি অদ্বিতীয়। আমি আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি। নিঃসন্দেহে আমি নিজ নফসের ওপর নিজেই যুলুম করেছি।" আল্লাহ তাআলা ইউনুস আ.-এর এ করুণ দোয়া শ্রবণ করে তা কবুল করলেন এবং মাছকে আদেশ করলেন ইউনুস তোমার উদরে আমার আমানত রয়েছে, তাকে উগলিয়ে বের করে দাও। ফলে মাছ ইউনুস আ.-কে নদীর তীরে উগলে দিল।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. বলেন, মাছের পেটে অবস্থানের দরুন তাঁর দেহের অবস্থা এরূপ হয়ে গিয়েছিল, যেমন পাখির একটি নবজাত বাচ্চা। যার দেহ অত্যন্ত কোমল ও নরম হয়ে থাকে। (তাফসিরে ইবনে কাসীর : সূরা আস-সফফাত) দেহে পালক বা লোমও থাকে না। মোটকথা, মাছটি হযরত ইউনুস আ.-কে অত্যন্ত দুর্বল ও নিশ্চল অবস্থায় স্থলভাগের ওপর রেখে গেল। এরপর আল্লাহ তাআলা তাঁর জন্য একটি লতাগুল্মবিশিষ্ট গাছ উৎপন্ন করে দিলেন। (কথিত আছে, তা ছিল লাউগাছ।) ওটার ছায়াতলে তিনি অবস্থান করলেন। কয়েকদিন পর আল্লাহ পাকের নির্দেশে উক্ত গাছের শিকড়ে পোকা ধরে ওটাকে কর্তন করে ফেলল।

লতা যখন শুকাতে আরম্ভ করল, ইউনুস আ. চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তখন আল্লাহ তাআলা ওহি দ্বারা তাঁকে সম্বোধন করে বললেন, "ইউনুস! এ গাছটি শুকিয়ে যাওয়ার কারণে তুমি দুঃখিত হয়েছ, অথচ এটা একটা সামান্য গাছ। কিন্তু তুমি ভেবে দেখলে না, নীনাওয়ার অধিবাসী-যাতে লক্ষাধিক মানুষ বাস করছে, তাছাড়া বহু প্রাণীও বাস করে- ওটাকে ধ্বংস ও বরবাদ করে দিতে আমার একটুও অপছন্দ হবে না! এ লাউগাছের লতাটির প্রতি তোমার যতটুকু মমতা, আমি কি নীনাওয়াবাসীদের প্রতি এর চেয়ে অধিক সদয় ও মেহেরবান নই? অথচ তুমি ওহির অপেক্ষা না করে কওমের জন্য বদদুআ করে তাদের মধ্য হতে বেরিয়ে আসলে? এটা একজন নবীর সম্মানের জন্য অসঙ্গত কাজ, সে কওমের জন্য আযাবের বদদুআ করে, এবং তাদেরকে ঘৃণা করে তাদের থেকে পৃথক হয়ে যেতে তাড়াহুড়া করে। ওহিরও অপেক্ষা করে না।"

হযরত ইউনুস আ. বদদুআ করে নীনাওয়াবাসীদের থেকে পৃথক হয়ে চলে গেলেন। তিনি চলে যাওয়ার পর লোকেরা তাঁর বদদুআ প্রতিফলিত হওয়ার কিছু লক্ষণ প্রত্যক্ষ করল। এছাড়া ইউনুস আ. বসতি ত্যাগ করে চলে যাওয়ার পর তাদের দৃঢ় বিশ্বাস হল, তিনি অবশ্যই আল্লাহ তাআলার যথার্থ পয়গম্বর। সুতরাং এখন আমাদের ধ্বংস অনিবার্য। এই ভেবে রাজা হতে আরম্ভ করে প্রজাবৃন্দ সকলের অন্তর ভয়ে কম্পমান হয়ে উঠল এবং ইউনুস আ.-এর অনুসন্ধান করতে লাগল, যাতে তাঁর হাতে ইসলাম গ্রহণ করতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে তারা সকলে আল্লাহ পাকের দরবারে তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করতে লাগল। সর্বপ্রকারের পাপ কার্য ত্যাগ করে বসতির বাইরে খোলা মাঠে বেরিয়ে আসল। এমনকি গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তুগুলিকেও সঙ্গে নিয়ে আসল। দুগ্ধপোষ্য শিশুদেরকেও তাদের মাতা হতে পৃথক করে দিল। এরূপে দুনিয়ার যাবতীয় সম্পর্ক হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে আল্লাহ পাকের দরবারে কান্নাকাটি করতে লাগল। সকলে মিলে অঙ্গীকার করতে লাগল, হে আমাদের পালনকর্তা! ইউনুস আ. আপনার যে পয়গাম নিয়ে আমাদের নিকট এসেছিলেন, আমরা তার সত্যতার প্রতি ঈমান আনয়ন করছি। অবশেষে আল্লাহ তাআলা তাদের তওবা কবুল করলেন, তাদেরকে ঈমানের অমূল্য ধনে ধনবান করে দিলেন এবং তাদেরকে আযাব থেকে রক্ষা করলেন।

পরে ইউনুস আ.-এর প্রতি পুনরায় নির্দেশ হল, তিনি যেন নীনাওয়ায় চলে যান এবং কওমের মধ্যে অবস্থান করে তাদেরকে হেদায়েত করতে থাকেন। আল্লাহ তাআলার এত অধিক সংখ্যক মানুষ তাঁর ফয়েয থেকে বঞ্চিত না থাকে। ফলে ইউনুস আ. আল্লাহ পাকের এ আদেশ মান্য করলেন এবং নীনাওয়ায় ফিরে এলেন। কওমের লোকেরা তাঁকে দেখে অসীম আনন্দ প্রকাশ করল। তারা হেদায়েতপ্রাপ্ত হয়ে দীন ও দুনিয়ার সফলতা অর্জন করতে লাগল। এটা হল ঘটনার সেই পর্যায়ক্রমিক বিবরণ, যা কুরআন মাজিদের আয়াতসমূহের তাফসিরের অপব্যাখ্যা থেকে পবিত্র ও সঠিক অর্থ। বিভিন্ন সূরায় এ সম্পর্কিত আয়াতসমূহের আলোচনা দ্বারা এটি পরিষ্কার বোধগম্য। যেমন কুরআন মাজিদে ইরশাদ হচ্ছে:

"তবে ইউনুসের সম্প্রদায় ব্যতীত কোনো জনপদবাসী কেন এমন হল না, যারা ঈমান আনত এবং তাদের ঈমান তাদের উপকারে আসত? তারা যখন বিশ্বাস করল, তখন আমি তাদেরকে পার্থিব জীবনে লজ্জাজনক শাস্তি হতে মুক্ত করলাম এবং কিছুকালের জন্যে জীবনোপভোগ করতে দিলাম।" (সূরা ইউনুস: ৯৮)

সূরা আম্বিয়ায় আল্লাহ তাআলা বলেন:
"এবং স্মরণ কর যুন-নূন এর কথা! যখন সে ক্রোধভরে বের হয়ে গিয়েছিল এবং মনে করেছিল আমি তার জন্যে শাস্তি নির্ধারণ করব না। এরপর সে অন্ধকার থেকে আহ্বান করেছিল- তুমি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই; তুমি পবিত্র মহান! আমি তো সীমালঙ্ঘনকারী। তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম এবং তাকে উদ্ধার করেছিলাম দুশ্চিন্তা থেকে। আর এভাবেই আমি মুমিনদের উদ্ধার করে থাকি।" (সূরা আম্বিয়া: ৮৭-৮৮)

সূরা সাফফাতে আল্লাহ তাআলা বলেন:
"ইউনুসও ছিল রাসূলগণের একজন। স্মরণ কর! যখন সে পলায়ন করে বোঝাই নৌযানে পৌঁছল। এরপর সে লটারিতে যোগদান করল এবং পরাভূত হল। পরে এক বৃহদাকার মাছ তাকে গিলে ফেলল। তখন সে নিজেকে ধিক্কার দিতে লাগল। সে যদি আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা না করত, তা হলে তাকে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত থাকতে হত এর উদরে। এরপর ইউনুসকে আমি নিক্ষেপ করলাম এক তৃণহীন প্রান্তরে এবং সে ছিল রুগ্ন। পরে আমি তার ওপর এক লাউ গাছ উদ্‌দ্গত করলাম।" (সূরা সাফ্ফাত: ১৩৯-১৪৬)

সূরায়ে সাফাতে আল্লাহ তাআলা আরো বলেন:
"তাকে (ইউনুস) আমি এক লাখ বা ততোধিক লোকের প্রতি প্রেরণ করেছিলাম। ফলে তারা ঈমান এনেছিল। আর আমি তাদেরকে কিছুকালের জন্য জীবনোপভোগ করতে দিলাম।" (সূরা সাফফাত: ১৪৭-১৪৮)

সূরা কলমে আল্লাহ তাআলা বলেন:
"অতএব তুমি ধৈর্যধারণ কর তোমার প্রতিপালকের নির্দেশের অপেক্ষায়, তুমি মৎস্য সহচরের মতো অধৈর্য হয়ো না, সে বিষাদগ্রস্ত অবস্থায় কাতর প্রার্থনা করেছিল। তার প্রতিপালকের অনুগ্রহ তার নিকট না পৌঁছুলে সে লাঞ্ছিত হয়ে নিক্ষিপ্ত হত উন্মুক্ত প্রান্তরে। পুনরায় তার প্রতিপালক তাকে মনোনীত করলেন এবং তাকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করলেন।" (সূরা কলম: ৪৮-৫০)

উল্লিখিত আয়াতসমূহের ব্যাখ্যায় তাফসিরকারকগণ বলেন, আল্লাহ তাআলা তৎকালীন মুসেল প্রদেশের নীনাওয়া নামক জায়গার অধিবাসীদের নিকট ইউনুস আ.- কে প্রেরণ করেন। তিনি তাদেরকে মহান আল্লাহ তাআলার দিকে আহ্বান করেন। তারা তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এবং তারা তাদের কুফুরি ও অবাধ্যতায় নিমগ্ন থাকে। এরপর যখন নবীর বিরুদ্ধে তাদের অবাধ্যতা ও নাফরমানী দীর্ঘায়িত হয় তখন তিনি তাদের মধ্য হতে বের হয়ে পড়েন এবং তিন দিন পর তাদের প্রতি আযাব নাযিল হবে বলে সতর্ক করে দেন।

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. মুজাহিদ, সাঈদ ইবনে জুবাইর, কাতাদা রহ. প্রমুখ মনীষী বলেন, ইউনুস আ. যখন তাঁর উম্মতদের মধ্য হতে চলে গেলেন এবং তাঁর সম্প্রদায় আল্লাহ তাআলার আযাব তাদের ওপর অত্যাসন্ন বলে নিশ্চিত হল, আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তরে তওবার অনুভূতি সৃষ্টি করেন এবং তারা তাদের নবীর প্রতি কৃত অপকর্মের জন্যে লজ্জিত হয়ে পড়ল। তারপর তারা দৈন্যের প্রতীক মোটা কাপড় পরে নিল এবং প্রত্যেকটি পশু শাবককে তাদের মা থেকে পৃথক করে দিল। অন্যদিকে নিজেরা আল্লাহ তাআলার দরবারে কাতর হয়ে প্রার্থনা করতে লাগল। করুণ স্বরে তারা ফরিয়াদ করতে লাগল। অনুনয় বিনয় করতে লাগল। নিজেদেরকে প্রতিপালকের প্রতি সমর্পণ করে দিল। ছেলে-মেয়ে স্ত্রী-পুরুষ সকলেই আল্লাহ তাআলার দরবারে কান্নাকাটি করতে লাগল। প্রতিটি জীব-জন্তু কাতরাতে লাগল। উট ও তার বাচ্চাগুলো চিৎকার করতে লাগল। গাভী, গরু ও বাছুরগুলো হাম্বা হাম্বা ডাক ছাড়তে লাগল। ছাগল ও তার ছানাগুলো ভ্যাঁ ভ্যাঁ করতে লাগল। এক প্রচণ্ড ভয়াবহ পরিস্থিতির উদ্ভব হল। তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর কুদরত, রহমত ও করুণাবশে তাদের ওপর থেকে আযাব রহিত করে দিলেন। আল্লাহ তাআলার আযাব তাদের মাথার উপর এসে গিয়েছিল এবং রাতের তিমির রাশির মতো মাথার উপর ঘুরছিল।

এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন: "এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন: 'তবে ইউনুসের সম্প্রদায় ব্যতীত কোনো জনপদবাসী কেন এমন হল না, যারা ঈমান আনত এবং তাদের ঈমান তাদের উপকারে আসত? তারা যখন বিশ্বাস করল, তখন আমি তাদেরকে পার্থিব জীবনে লজ্জাজনক শাস্তি হতে মুক্ত করলাম এবং কিছুকালের জন্যে জীবনোপভোগ করতে দিলাম।' এতে বুঝা যায়, পরে তারা পরিপূর্ণভাবে ঈমান এনেছিল। তবে এ ধরনের ঈমান কি আখেরাতেও তাদের কোনো উপকারে আসবে এবং আখেরাতের আযাব থেকে তাদেরকে মুক্ত করবে? যেমন পার্থিব জীবনে এ ঈমান তাদেরকে পার্থিব শাস্তি থেকে রক্ষা করেছে? এ ব্যাপারে দ্বিমত আছে। বাক্যের বাচনভঙ্গিতে প্রকাশ্যতর মত হচ্ছে, আখেরাতেও এ ঈমান উপকারে আসবে। কেননা আল্লাহ তাআলা তাদের ঈমানের কথা উল্লেখ করেছেন। এতে বুঝা যায়, উল্লিখিত কিছুকালের জন্যে জীবনোভোগ ও আখেরাতে আযাব রহিত হওয়ার মধ্যে কোনো বৈপরিত্য নেই। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

যে সকল লোকের হেদায়েতের জন্যে ইউনুস আ.-কে প্রেরণ করা হয়েছিল, তাদের সংখ্যা সুনিশ্চিত এক লাখ ছিল। তবে তাফসীরকারকগণের মধ্যে এক লাখের অতিরিক্ত সংখ্যা নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে। মাকহুল রহ.-এর বর্ণনা মতে এ সংখ্যাটি ছিল দশ হাজার। তিরমিযি, ইবনে জারীর তাবারী ও ইবনে আবু হাতিম রহ. প্রমুখ উবাই ইবনে কাব রাযি. থেকে বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে 'তাকে আমি এক লাখ বা ততোধিক লোকের প্রতি প্রেরণ করেছিলাম' আয়াতাংশের তাফসির সম্পর্কে প্রশ্ন করায় তিনি বলেন, তারা এক লাখের ঊর্ধ্বে বিশ হাজার ছিল। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত আছে: তারা ছিলেন ১ লাখ ৩০ হাজার। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে অন্য এক সূত্রে বর্ণিত আছে : তাদের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩০ হাজারের ঊর্ধ্বে। অন্য এক সূত্রে বর্ণিত আছে: ১ লাখ ৪০ হাজারের ঊর্ধ্বে। সাঈদ ইবনে জুবাইর রাযি. বলেন: "তারা সর্বসাকুল্যে ১ লাখ ৭০ হাজার ছিল।"

এ সংখ্যা মাছ সংক্রান্ত ঘটনার পূর্বে ছিল না-কি পরে, এ ব্যাপারেও তাফসিরকারকগণের মতভেদ রয়েছে। এ লোকসংখ্যা একটি সম্প্রদায়ের নাকি পৃথক পৃথক দুটি সম্প্রদায়ের এ নিয়েও মতভেদ আছে। এ তিনটি বিষয়ে তাফসির গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

মোটকথা, যখন ইউনুস আ. আপন সম্প্রদায়ের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে তার নিজ জনপদ ত্যাগ করে অন্যত্র রওনা হলেন, তখন তিনি সাগর পার হবার জন্যে অন্যদের সাথে নৌকায় উঠলেন। নৌকাটি কিছুক্ষণ পর যাত্রীদের নিয়ে উত্তাল তরঙ্গের মধ্যে পড়ল। নৌকাটি ঘুরপাক খেতে লাগল এবং ডুবুডুবু অবস্থায় পতিত হল। তাফসীরকারকদের বর্ণনা মতে তাদের সকলের ডুবে মরার উপক্রম হল। সুতরাং নাবিক ও যাত্রীরা মিলে পরামর্শক্রমে লটারির মাধ্যমে পলাতক অপরাধী সম্পর্কে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছতে মনস্থ করল। তারা স্থির করল, লটারিতে যার নাম উঠবে অন্যদেরকে রক্ষা করার জন্যে তাকে নৌকা থেকে ফেলে দিতে হবে। লটারিতে আল্লাহর নবী ইউনুস আ.-এর নাম উঠল। এতে তারা তাঁকে নৌকা থেকে ফেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত না করে পুনরায় লটারি দেয়। কিন্তু এবারও তাঁর নাম উঠে। আল্লাহর নবী অন্যদেরকে রক্ষা করার জন্যে আপন কাপড় খুলে ঝাঁপ দিতে তৈরি হলেন; কিন্তু নাবিক ও যাত্রীরা তাঁকে বাধা দিল এবং তারা পুনরায় লটারি করল। তৃতীয় বারেও আল্লাহ তাআলার কোনো মহান উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে তাঁরই নাম ওঠল। আল্লাহ তাআলা এ ঘটনার প্রতিই ইঙ্গিত করেছেন সূরা সাফফাত : ১৩৯-৪১ নং আয়াতে।

পরে যখন লটারিতে বারবার ইউনুস আ.-এর নাম উঠল তখন তাকে নদীতে ফেলে দেওয়া হল। আল্লাহ তাআলা তার জন্যে সবুজ সাগর থেকে একটি বিরাট মাছ প্রেরণ করেন। মাছটি তাঁকে গিলে ফেলে। আল্লাহ তাআলা মাছকে হুকুম দেন, যেন সে তার অস্থি-মাংস কিছুই না খায়। কেননা এটা তার রিযিক নয়। তারপর মাছটি তাঁকে নিয়ে সমস্ত সাগরময় ঘুরে বেড়ায়। কেউ কেউ বলেন, এ মাছটিকে তার চেয়ে বড় আকারের মাছ গিলে ফেলে। তাফসীরকারকগণ বলেন, যখন তিনি মাছের পেটে অবস্থান করছিলেন, তখন তিনি নিজকে মৃত বলেই মনে করছিলেন এবং তিনি নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নাড়া দিয়ে এগুলো নড়ছে দেখে নিশ্চিত হন, তিনি জীবিত রয়েছেন। তিনি আল্লাহ তাআলার দরবারে সিজদায় পড়লেন এবং বললেন, "হে আমার প্রতিপালক! আমি এমন এক স্থানে আপনার দরবারে সিজদা করলাম, যেরূপ স্থানে এর আগে আর কেউই কোনো দিন সিজদা করে নি।"

ইউনুস আ.-এর মাছের পেটে অবস্থানের মেয়াদ নিয়ে তাফসীরকারকগণ বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। মুজাহিদ হযরত শাবী রহ. থেকে বর্ণনা করেন, দিনের প্রথম প্রহরে মাছ তাঁকে গিলেছিল আর শেষ প্রহরে বমি করে ডাঙ্গায় নিক্ষেপ করেছিল। কাতাদা রহ. বলেন, তিনদিন; জাফর সাদিক রহ. বলেন, সাত দিন আর সাঈদ ইবনে আবুল হাসান রহ. ও আবু মালিক রহ. বলেন, ৪০ দিন। আল্লাহ তাআলাই অধিক জানেন, কত সময় ছিলেন।

মোটকথা, যখন মাছটি তাকে নিয়ে সাগরের তলদেশে ভ্রমণ করছিল এবং উত্তাল তরঙ্গমালায় বিচরণ করছিল, তখন তিনি আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্যে নিবেদিত মাছের তাসবিহ শুনতে পেলেন। সাত আসমান ও সাত জমিনের প্রতিপালক, এতদুভয়ের মধ্যে ও মাটির নিচে যা কিছু রয়েছে এদের প্রতিপালকের জন্যে নিবেদিত পাথরের তাসবিহও তিনি শুনতে পান। তখন তিনি মুখে ও তার অবস্থার দ্বারা যে আকুতি জানান, সে সম্পর্কে সর্বজ্ঞানী আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন: 'এবং স্মরণ কর যুন-নূন এর কথা! যখন সে ক্রোধভরে বের হয়ে গিয়েছিল এবং মনে করেছিল আমি তার জন্যে শান্তি নির্ধারণ করব না। এরপর সে অন্ধকার থেকে আহ্বান করেছিল- তুমি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই; তুমি পবিত্র মহান! আমি তো সীমালঙ্ঘনকারী। তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম এবং তাকে উদ্ধার করেছিলাম দুশ্চিন্তা থেকে। আর এভাবেই আমি মুমিনদের উদ্ধার করে থাকি।'

উল্লিখিত আয়াতে 'অন্ধকার থেকে আহবান করেছিল' এর ব্যাখ্যায় আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. ও সাঈদ ইবনে জুবায়ের প্রমুখ মুফাস্সির বলেন, আয়াতে উল্লিখিত الظلمات দ্বারা মাছের পেটের অন্ধকার, সমুদ্রের অন্ধকার এবং রাতের অন্ধকারকে বুঝানো হয়েছে। সালিম ইবনে আবুল জাদ রহ. বলেন, যে মাছটি ইউনুস আ.-কে গিলে ফেলেছিল, অন্য একটি মাছ আবার ওটাকে গিলে ফেলে। এ দুই ধরনের অন্ধকার এবং তৃতীয়ত সমুদ্রের অন্ধকারের সাথে। আল্লাহ তাআলা বলেন: "সে যদি আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা না করত, তা হলে তাকে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত থাকতে হত এর উদরে।"

কাজেই কেউ কেউ বলেন, তিনি যদি সেখানে আল্লাহর পবিত্রতা ও তাঁর মহিমা ঘোষণা না করতেন, অনুনয় বিনয় সহকারে আপন ত্রুটি স্বীকার না করতেন, কৃতকর্মের জন্যে লজ্জিত হয়ে আল্লাহর প্রতি ঝুঁকে না পড়তেন, তবে মাছের পেটে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত থাকতেন। মাছের পেট থেকেই তাকে পুনরুত্থিত করা হত। আবার কেউ কেউ বলেন, মাছ তাঁকে গিলে ফেলার পূর্বে যদি তিনি আল্লাহ তাআলার অধিক স্মরণকারী, মুসল্লী ও আনুগত্য স্বীকারকারীদের অন্তর্ভুক্ত না হতেন ...। সচ্ছলতার সময় আল্লাহ তাআলাকে চিনলে তোমার সংকটকালে আল্লাহ তাআলা তোমাকে চিনবেন।

ইবনে জারীর তাবারী রহ. তাঁর তাফসির গ্রন্থে এবং বায্যার রহ. তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: যখন আল্লাহ তাআলা মাছের পেটে ইউনুস আ.-কে বন্দী করতে ইচ্ছে করলেন, তখন তিনি মাছকে নির্দেশ দিলেন, ইউনুস আ.-কে ধর! তবে তার শরীর জখম করবে না এবং তার হাড়ও ভাঙবে না। মাছ যখন তাকে নিয়ে সাগরের তলদেশে চলে গেল, ইউনুস আ. তখন মাছের পেটে আওয়াজ শুনতে পেলেন এবং মনে মনে বলতে লাগলেন, একি ব্যাপার? আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি এ মর্মে ওহি প্রেরণ করলেন, এগুলো হচ্ছে সাগরের প্রাণীদের তাসবিহ। ফেরেশতাগণ বললেন, হে আমাদের প্রতিপালক! এই জনমানবহীন স্থানে আমরা একটি আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। জবাবে আল্লাহ তাআলা বললেন, এ আমার বান্দা ইউনুস আ.। সে আমার নাফরমানি করেছে তাই আমি তাকে সাগরের মাছের পেটে কয়েদ করেছি। ফেরেশতারা বললেন, "তিনি কি ওই সৎ বান্দা নন, যার নেকআমল প্রতিদিনই আপনার দরবার পৌছত?" আল্লাহ তাআলা বললেন: 'হ্যাঁ'।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 লাউ গাছের উপকারিতা

📄 লাউ গাছের উপকারিতা


ওলামাগণ বলেন : লাউগাছ উদগত করার মধ্যে অনেক হেকমত রয়েছে। লাউ গাছের পাতা খুবই কোমল, সংখ্যায় বেশি, ছায়াদার। মাছি এর কাছে যায় না। এর ফল ধরার প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত তা খাওয়া যায়, কাঁচা ও রান্না করে খাওয়া যায়, বাকল খাওয়া যায়। আবার বীচিও খাওয়া যায়। এটা মস্তিষ্কের বলবর্ধক এবং তাতে অন্য অনেক গুণাগুণ রয়েছে।

ইবনে জারীর রহ. সাদ ইবনে মালিক রাযি. থেকে বর্ণনা করেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি- ইউনুস ইবনে মাত্তার দুআয় ব্যবহৃত আল্লাহ তাআলার নাম নিয়ে দুআ করা হলে তিনি তাতে সাড়া দেন এবং কিছু চাওয়া হলে তিনি তা দান করেন।

বর্ণনাকারী বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করলাম, আল্লাহর রাসূল! এটা কি শুধু ইউনুস আ.-এর জন্যে খাস ছিল, না কি সকল মুসলমানের জন্যেও?' উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: এটা ইউনুস আ.-এর জন্যে বিশেষভাবে এবং সাধারণভাবে মুসলমানদের জন্যে- যদি তারা এ দুআ করে। তুমি কি আল্লাহর বাণী লক্ষ কর নি? যাতে তিনি বলেছেন :
فَنَادَى فِي الظُّلُمَاتِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ (৮৭) فَاسْتَجَبْنَا لَهُ وَنَجَّيْنَاهُ مِنَ الْغَمِّ وَكَذَلِكَ نُنْجِي الْمُؤْمِنِينَ
কাজেই যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে দুআ করবে তার জন্যে হযরত ইউনুস আ. যে দুআটি করেছেন, সে দুআ করা শর্ত। অন্য এক সূত্রে সাদ ইবনে মালিক রাযি. থেকে বর্ণিত হয়েছে: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- যে ব্যক্তি ইউনুস আ.-এর দুআর শব্দ দিয়ে দুআ করে, তার দুআ কবুল করা হয়। বর্ণনাকারী বলেন, এ হাদিসের দ্বারা মুমিনদেরকে উদ্ধারের দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 ইনতেকাল

📄 ইনতেকাল


শাহ আবদুল কাদের দেহলবি (আল্লাহ পাক তাঁর সমাধিকে নূর-পূর্ণ করুন) বলেন, ইউনুস আ. নবুয়ত প্রাপ্ত হয়ে যেই নীনাওয়া শহরে প্রেরণিত হন, সেখানেই তাঁর ইনতেকাল করেন। সেখানেই সমাহিত হন।

আবদুল ওয়াহ্হাব নাজ্জার রহ. বলেন, ফিলিস্তিনের খলিল নামক শহরের কাছে হালহুল নামে প্রসিদ্ধ একটি বসতি আছে। তাতে একটি কবর আছে। ওটিকে ইউনুস আ.-এর কবর বলা হয়। সেই কবরটির কাছে আরো একটি কবর রয়েছে। যার সম্বন্ধে জনমত হলো- এটি ইউনুস আ.-এর পিতা মাত্তার কবর।

আমাদের মতে হযরত শাহ আবদুল কাদের দেহলবি রহ. এর উক্তিই সঠিক। কেননা হযরত ইউনুস আ. সম্বন্ধে যতটুকু জানা গেছে, তাতে সকলের ঐকমত্য হল, তিনি পুনরায় নীনাওয়া শহরে ফিরে গিয়েছিলেন এবং নিজ কওমের মধ্যেই অবশিষ্ট জীবন অতিবাহিত করেছেন। সুতরাং এটাই সঠিক বলে মনে হয়, তাঁর ইনতেকাল নীনাওয়া শহরেই হয়েছিল এবং সেখানেই তাঁর সমাধি হয়ে থাকবে। নীনাওয়া শহরটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর সম্ভবত সেই সমাধিটিও নিশ্চহ্ন হয়ে গেছে। পরে শ্রদ্ধাবশত হালহুলের অপরিচিত দুটি কবরকে ইউনুস আ. ও তাঁর পিতা মাত্তা- এর কবর বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 হযরত ইউনুস আ.-এর মর্যাদা

📄 হযরত ইউনুস আ.-এর মর্যাদা


রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইউনুস আ.-এর আলোচনা করে তাঁর মাহাত্ম্য-মর্যাদা বিশেষভাবে প্রকাশ করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَসَلَّمَ ، قَالَ : " لَا يَقُولَنَّ أَحَدُكُمْ : إِنِّي خَيْرٌ مِنْ يُونُسَ " زَادَ مُসَدَّদٌ: «ইউনুস ইবনে মাত্তা»
"তোমাদের মধ্য থেকে কেউই এ কথা যেন কখনো না বলে, আমি (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইউনুস ইবনে মাত্তা থেকে উত্তম।"

হযরত আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে: একবার এক ইহুদি কিছু মাল বিক্রয় করছিল। কোনো এক ব্যক্তি কিছু খরিদ করে যেই মূল্য প্রদান করতে চাইল, তা ইহুদির পছন্দ হল না। ইহুদি বলল, সেই খোদার কসম! যিনি মূসা আ.-কে মানবজাতির মধ্যে সর্বোত্তম সৃষ্টি করেছেন, আমি এ মূল্যে কখনো মাল বিক্রয় করব না। একজন আনসারি সাহাবি এ কথা শুনে ক্রোধে ইহুদিকে চপেটাঘাত করলেন। এবং বললেন, তুই এমন কথা বলছিস, অথচ আমাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদ্যমান রয়েছেন। ইহুদি তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে হাযির হয়ে ফরিয়াদ করল: আবুল কাসেম! আমি যখন আপনার প্রতিশ্রুতি ও দায়িত্বের অধীন রয়েছি, তখন এ আনসারি আমার মুখে চপেটাঘাত কেন করল? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারি সাহাবিকে কারণ জিজ্ঞাসা করেন। তিনি পূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করলেন।

তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারা মোবারক ক্রোধে রঙ্গিন বর্ণ ধারণ করল। তিনি বললেন, তোমরা কখনো আম্বিয়া আ.-এর মধ্য থেকে কাউকেও কারো ওপর অধিক ফযিলত প্রদান করো না। কেননা যখন প্রথমবার শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে, তখন যমিন ও আসমানের মধ্যবর্তীস্থানে যত প্রাণীই আছে, সকলেই বেহুঁশ হয়ে পড়বে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা যাকে মুক্ত রাখেন সে ছাড়া। এরপর দ্বিতীয় বার শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হলে সর্বপ্রথম যে ব্যক্তি হুঁশ প্রাপ্ত হবে, সে ব্যক্তি হব আমি। কিন্তু আমি বেহুঁশ অবস্থা হতে সচেতন হয়েই দেখতে পাব, মূসা আ. আরশে ঠেস দিয়ে দণ্ডায়মান রয়েছেন। এখন আমি বলতে পারি না, তাঁর বেহুঁশ হওয়ার ব্যাপারটি তূর পাহাড়ের ঘটনার মধ্যে ধরা হয়েছে কি-না? যে কারণে আজ তিনি বেহুঁশ হতে রক্ষা পেয়ে গেলেন অথবা আজ তিনি আমার পূর্বেই হুঁশ প্রাপ্ত হয়েছেন। আর আমি বলি না, কোনো নবীই হযরত ইউনুস আ. অপেক্ষা অধিক ফযিলতের অধিকারী। (বুখারী, কিতাবুল আম্বিয়া)

সূরায়ে সাফফাতে ইরশাদ হয়েছে : নিশ্চয় ইউনুস ছিল রাসূলদের একজন। অনুরূপভাবে সূরায়ে নিসা ও আনআমে তাকে আম্বিয়ায়ে কেরামের অন্তর্ভুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের উপর আল্লাহর শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক। ইমাম আহমদ রহ. আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. সূত্রেও এরূপ হাদীস বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন: 'আর কারো পক্ষেই এরূপ কথা বলা বাঞ্ছনীয় নয়, আমি ইউনুস ইবনে মাত্তার চেয়ে ভালো।' তাবারানীর বর্ণনায় অতিরিক্ত রয়েছে যে 'আল্লাহর নিকট উত্তম'। বর্ণনাটির সনদ ত্রুটিমুক্ত।

অন্য বর্ণনায় রয়েছে: 'আমাকে (অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে) ইউনুস আ. ইবনে মাত্তা থেকে উত্তম মনে করা সমীচীন নয়।'

অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: 'আমাকে অন্যান্য নবীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিও না, ইউনুস আ.-এর উপরও নয়।'

এটা অবশ্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিনয় প্রকাশের জন্যে বলেছেন। আল্লাহর রহমত ও শান্তি তাঁর প্রতি ও অন্যান্য নবী-রাসূলগণের প্রতি বর্ষিত হোক!

এ সমস্ত রেওয়ায়েতে বিশেষভাবে হযরত ইউনুস আ.-এর যে ফযিলত বর্ণনা করা হয়েছে, এতে সমস্ত ওলামায়ে কেরাম এ বিষয়ে একমত- হযরত ইউনুস আ.-এর ঘটনা পাঠকারীর মনে তাঁর পবিত্র ব্যক্তিত্ব সম্বন্ধে কোনো প্রকার ত্রুটি-বিচ্যুতির সন্দেহ না জন্মে। সুতরাং সেই পন্থা বন্ধ করার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শানের মাহাত্ম্যকে এরূপ স্পষ্টভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন মনে করেছেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px