📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 হযরত যুলকিফল আ.-এর বংশ পরিচয়

📄 হযরত যুলকিফল আ.-এর বংশ পরিচয়


কুরআন মাজিদ হযরত যুল-কি আ.-এর নাম ছাড়া অন্য কিছু উল্লেখ করে নি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকেও তাঁর সম্পর্কে কিছু বর্ণিত নেই। অতএব কুরআন ও হাদিসের আলোকে তাঁর সম্পর্কে এর চেয়ে অধিক কিছু বলার নেই- হযরত যুল-কিছ্‌ল আ. আল্লাহ পাকের মনোনীত ও নির্বাচিত একজন পয়গম্বর ছিলেন এবং কোনো এক কওমের হেদায়েতের জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন। এর অধিক বিবরণ প্রদানে কোরআন মাজিদ ও হাদিস শরিফ নীরব।

দ্বিতীয় স্তর হলো জীবনী ও ইতিহাস গ্রন্থ। যথেষ্ট অনুসন্ধানের পরেও এ সম্বন্ধে এমন কিছু জানতে পারি নি, যা দ্বারা হযরত যুল-কি আ.-এর অবস্থা ও ঘটনাবলীর আলোকপাত হতে পারে। তাওরাতও এ সম্বন্ধে নীরব এবং ইসলামি ইতিহাসও। একদল মনে করেন, যুল-কি হযরত আইয়ুব আ.-এর পুত্র। আল্লাহ তাআলা সূরা আম্বিয়ায় আইয়ুব আ.-এর ঘটনার শেষে বলেন: وَإِسْمَاعِيلَ وَإِدْرِسَ وَذَا الْكِফْلِ كُلٌّ مِنَ الصَّابِرِينَ (৮৫) وَأَدْخَلْنَاهُمْ فِي رَحْمَتِنَا إِنَّهُمْ مِنَ الصَّالِحِينَ "এবং ইসমাইল, ইদরীস ও যুল-কিলের কথা স্মরণ কর! তারা প্রত্যেকেই ছিল সবরকারী। আমি তাদেরকে আমার রহমতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম। তারা ছিল সৎকর্মপরায়ণ।" (সূরা আম্বিয়া: ৮৫-৮৬)

সূরা ছোয়াদেও আইয়ুব আ.-এর ঘটনা বলার পরে আল্লাহ বলেন: وَاذْكُرْ إِسْمَاعِيلَ وَالْيَسَعَ وَذَا الْكِفْلِ وَكُلٌّ مِنَ الْأَخْيَارِ স্মরণ কর, ইসমাইল, আল-ইয়াসাআ ও যুল-কিলের কথা। এরা প্রত্যেকেই ছিল সজ্জন। (সূরা ছোয়াদ: ৪৭-৪৮)

কুরআনের এসব আয়াতে উল্লিখিত মহান নবীগণের সাথে যুল-কিলের নাম ও প্রশংসা একত্রে উল্লেখ থাকায় স্পষ্টত বোঝা যায়, তিনিও নবী ছিলেন। তাঁর সম্পর্কে এ মতই প্রসিদ্ধ। কারো কারো ধারণা, যুল-কি নবী ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন একজন পুণ্যবান ও ন্যায়পরায়ণ শাসক। ইবনে জারীর রহ. এ ব্যাপারে মতামত প্রকাশে বিরত রয়েছেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ।

ইবনে জারীর রহ. ও ইবনে আবু নাজিহ রহ. মুজাহিদ রহ. সূত্রে বর্ণনা করেছেন, যুল-কি নবী ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন একজন পুণ্যবান ব্যক্তি। তাঁর সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত নবীর পক্ষ থেকে তিনি এ দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তিনি সম্প্রদায়ের লোকজনের দেখাশোনা করবেন এবং ন্যায়নিষ্ঠার সাথে তাদের বিচার-মীমাংসা করবেন। এ কারণে তাকে যুল-কি (জিম্মাদার) নামে অভিহিত করা হয়।

ইবনে জারীর ও ইবনে আবী হাতিম রহ. মুজাহিদ রহ. সূত্রে বর্ণনা করেন: হযরত ইয়াসাআ যখন বয়োবৃদ্ধ হন, তখন তিনি ভাবলেন- যদি আমার জীবদ্দশায় একজন লোককে সমাজে কাজ করার জন্য দায়িত্ব দিতে পারতাম এবং কিভাবে সে দায়িত্ব পালন করে তা স্বচক্ষে দেখতে পারতাম, তা হলে মনে শান্তি পেতাম। এরপর তিনি লোকজনকে জড়ো করে বললেন: তোমাদের মধ্যে কে আছ, যে তিনটি কাজ করার অঙ্গীকার করবে, তাকে আমি আমার স্থলাভিষিক্ত করব? কাজ তিনটি হল: দিনে রোযা পালন করবে, রাতে জেগে ইবাদত করবে এবং কখনো রাগান্বিত হতে পারবে না। এ কথার পর বাহ্যদৃষ্টিতে সাধারণ বলে গণ্য এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল- আমি পারব। তখন তিনি বললেন, তুমি কি দিনে রোযা পালন করতে, রাত্রি জেগে ইবাদত করতে ও রাগান্বিত না হয়ে থাকতে পারবে? সে বলল, হ্যাঁ! পারব। এরপর সেদিনের মতো সবাইকে বিদায় দিলেন। পরের দিন পুনরায় লোকদেরকে জড়ো করে আবার সেই প্রস্তাব রাখেন। সবাই নীরব, কিন্তু ওই লোকটি দাঁড়িয়ে বলল, আমি পারব। এরপর নবী আল-ইয়াসাআ ওই ব্যক্তিকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করেন।

ইবলীস তখন শয়তানদের ডেকে বলল, ওই ব্যক্তিকে পথভ্রষ্ট করার দায়িত্ব তোমাদের নিতে হবে। কিন্তু তারা সকলে তাতে ব্যর্থ হল। তখন ইবলীস বলল: আচ্ছা আমিই তার দায়িত্ব নিলাম। পরে ইবলীস এক বৃদ্ধ দরিদ্রের বেশে লোকটির কাছে এল। সে এমন সময়ই এলো, যখন তিনি দুপুরের বিশ্রামের জন্যে শয্যা গ্রহণ করেছিলেন। আর তিনি ওই বিশেষ সময় ছাড়া দিনে বা রাতের অন্য কোনো সময়ই নিদ্রা যেতেন না। তিনি যখন ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, এমন সময় ইবলীস এসে দরজা ধাক্কা দিল। ভিতর থেকে তিনি বললেন, দরজায় কে? ইবলীস বলল, আমি একজন অসহায় মজলুম বৃদ্ধ লোক। তিনি দরজা খুলে দিলেন। বৃদ্ধ তার ঘটনা বলতে লাগল। সে জানাল, আমার সাথে আমার গোত্রের লোকদের বিবাদ আছে। তারা আমার ওপর এই এই জুলুম করেছে। বৃদ্ধ তার ঘটনার বিবরণ দিতে দিতে বিকাল হয়ে গেল। দুপুরের নিদ্রার সময় অতিবাহিত হয়ে গেল। তিনি বলে দিলেন, সন্ধ্যার পরে আমি যখন দরবারে বসব তখন তুমি এসো। তোমার হক আমি আদায় করে দেব। বৃদ্ধ চলে গেল। সন্ধ্যার পরে দরবারে বসে বৃদ্ধ আসছে কি না দেখলেন। কিন্তু তাকে উপস্থিত পেলেন না। তালাশ করেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া গেল না।

পরের দিন সকালে বিচারাসনে বসে বৃদ্ধের জন্যে অপেক্ষা করেও তাকে দেখলেন না। মজলিস শেষে তিনি যখন দুপুরের শয্যা গ্রহণে গেলেন। তখন বৃদ্ধ এসে দরজায় ধাক্কা দিল। ভিতর থেকে জিজ্ঞেস করলেন, দরজায় কে? বলল, অসহায় এক মজলুম বৃদ্ধ। দরজা খুলে দেওয়া হল। বললেন, আমি কি তোমাকে বলি নি, যখন আমি দরবারে বসব তখন তুমি আসবে? সে বলল, আমার গোত্রের লোকেরা অত্যন্ত জঘন্য প্রকৃতির। যখন তারা জানল আপনি দরবারে বসা, তখন তারা আমাকে হক প্রদান করার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু যখন আপনি দরবার ছেড়ে উঠে যান, তখন তারা সে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে। তিনি বললেন, এখন চলে যাও। সন্ধ্যার পরে যখন দরবারে বসব তখন এস। কিন্তু বৃদ্ধের সাথে কথা বলতে বলতে তার আজকের দুপুরের নিদ্রাও আর হল না। রাত্রে দরবারে বসে বৃদ্ধের অপেক্ষা করলেন, কিন্তু তাকে দেখা গেল না। অধিক রাত্রি হওয়ায় তন্দ্রা তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। তিনি বাড়ির একজনকে বললেন, আমার দারুণ নিদ্রা পাচ্ছে। আমি এখন ঘুমাব। সুতরাং কেউ যদি দরজার কাছে আসতে চায়, তাকে আসতে দিও না। এ কথা বলে যাওয়ার পর মুহূর্তেই বৃদ্ধ সেখানে উপস্থিত হল। পাহারাদার লোকটি বলল, পিছনে সরো! পিছনে সরো! বৃদ্ধ বলল, আমি হুজুরের কাছে গতকাল এসেছিলাম এবং আমার সমস্যার কথা বলেছিলাম। কিন্তু পাহারাদার বলল, কিছুতেই দেখা করা যাবে না। আল্লাহর কসম! আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন কোনো লোককে তার কাছে যেতে না দিই। এভাবে পাহারাদার তাকে নিবৃত্ত করল।

বৃদ্ধ তখন ঘরের পানে তাকিয়ে দেওয়ালের এক স্থানে একটি ছিদ্রপথ লক্ষ করল। তখন বৃদ্ধরূপী ইবলীস ওই ছিদ্রপথ দিয়ে ঘরের ভিতরে ঢুকে গেল। এবার ভিতরের দিক থেকে দরজা ধাক্কা দিল। শব্দ শুনে যুল-কি আ.-এর ঘুম ভেঙে যায়। তিনি বললেন: ওহে, আমি কি তোমাকে এ সময় আসতে বারণ করি নি? সে বলল, আমি আমার নিজ প্রচেষ্টায় এসেছি। আপনি তো আমাকে আসতে দেন নি। লক্ষ করে দেখুন, কিভাবে আমি এসেছি। তিনি দরজার কাছে এসে দেখলেন, তা সেভাবেই বন্ধ রয়েছে যেভাবে তিনি বন্ধ করেছিলেন। অথচ সে ঘরের ভিতরে তার কাছেই রয়েছে। তিনি এতক্ষণে তাকে চিনতে পারলেন এবং বললেন, তুমি তো আল্লাহর দুশমন। সে বলল, হ্যাঁ! প্রত্যেক ক্ষেত্রেই আপনি আমাকে পরাজিত ও নিরাশ করে দিয়েছেন। আপনাকে রাগান্বিত করার জন্য আমি এসব কাজ করেছি- যা আপনি দেখতে পাচ্ছেন। এরপর আল্লাহ এ ব্যক্তির নাম রাখেন যুল-কিফ্ল। কারণ তিনি যে কাজ করার জিম্মাদারী গ্রহণ করেছিলেন তা পূরণ করেছেন।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 একটি ভুল সংশোধন

📄 একটি ভুল সংশোধন


ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. তাঁর মুসনাদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাযি. থেকে একটি রেওয়ায়েত নকল করেছেন। একদিন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, বনি ইসরাঈলদের মধ্যে কিফ্ল নামে এক ব্যক্তি ছিল। সে ছিল চরমস্তরের ফাসেক ও পাপিষ্ঠ দুরাচার। একদিন তার কাছে পরমা সুন্দরী এক মহিলা এল। কিফ্ল তাকে ষাট (৬০) স্বর্ণ-মুদ্রার বিনিময়ে যিনার জন্য রাজি করে নিল। কিন্তু সে যখন স্ত্রীলোকটির সঙ্গে মিলিত হওয়ার ইচ্ছা করল, তখন সে কম্পিত হয়ে ভীষণভাবে কাঁদতে আরম্ভ করল। কিফ্ল তাকে কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করল। বলল, তুমি কি আমাকে ঘৃণা কর? স্ত্রীলোকটি বলল, ঘৃণার জন্য নয়। আসলে আমি জীবনে কখনও এমন গর্হিত কাজ করি নি। কিন্তু আজ প্রয়োজনে অর্থাৎ পেটের দায়ে নিজের সতীত্বকে বিনষ্ট করছি। এ চিন্তা আমার অন্তরে ছুরির মতো বিদ্ধ হচ্ছে। এ কারণেই আমি ক্রন্দন করছি। কিন্তু এ কথা শুনে তৎক্ষণাৎ তার কাছ থেকে দূরে সরে দাঁড়াল। বলল, "যে গর্হিত কাজ তুমি জীবনে কখনো কর নি, আজ তা শুধু পেটের দায়ে পড়ে করবে, এটা কখনো হতে পারে না। যাও, তুমি নিজের সতীত্ব ও পবিত্রতা নিয়ে ঘরে ফিরে যাও। আর এ দিনারগুলোও তোমার। এগুলি নিজের প্রয়োজনে ব্যয় কর।"

এরপর কি বলল- আল্লাহ পাকের কসম! আজকের এ মুহূর্তে থেকে কি আর কখনো আল্লাহ পাকের নাফরমানি করবে না। ঘটনাক্রমে সে রাতেই তার ইনতেকাল হল। সকালে মানুষ দেখতে পেল, অদৃশ হাত তার দরজায় এ সুসংবাদ লিখে রেখেছে- "নিশ্চয় কিফ্লকে আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করে দিয়েছেন।"

এ বর্ণিত রেওয়ায়েতটিতে যুল-কি নয়; শুধু 'কিফ্ল' উল্লেখ আছে। এ ব্যক্তি হযরত যুল-কি নয়। সুতরাং কেউ যেন মনে না করে, এটি হযরত যুল-কি আ.-এর ঘটনা।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 উপদেশ

📄 উপদেশ


একমাত্র ইসলামই এমন একটি ধর্ম, যা তার দাওয়াতে হকের ভিত্তি এমন মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত রেখেছে, যাতে দেশ ও জাতি এবং গোত্র ও বংশের বিভেদসমূহের ঊর্ধ্বে থেকে এ কথা স্বীকার করতেই হয়, পয়গামে হক তার ভিত্তি ও বুনিয়াদে কোনো সীমাবদ্ধতা ও দলীয়বদ্ধতার মুখাপেক্ষী নয়। আর এটা কোনো দলীয় ইযারাদারীকেও গ্রহণ করে না। কেননা হকের সত্তা মহান আল্লাহ তাআলা যখন এক ও অদ্বিতীয়, তখন নিঃসন্দেহে তাঁর পয়গামও একই। এ পয়গামে হকের বাণী আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত সাদা-কালল, আরব ও অনারব এবং ভৌগোলিক সীমার সকল বন্ধন হতে মুক্ত করে, কোনো বিবর্তন ও পরিবর্তন ব্যতীত সকলকে বেষ্টন করে চলেছে এবং সকলের মাঝেই প্রবাহিত রয়েছে। অবশ্য প্রত্যেক কালের গতি ও অবস্থা এবং সাময়িক প্রয়োজনে, গোত্র ও জাতির ক্রমবর্ধমান উন্নতি এবং তাদের চিন্তার বিকাশ ও কার্য যোগ্যতার পরিপ্রেক্ষিতে এ তারতম্যের প্রয়োজন আছে এবং থাকাও চাই। ভিত ও মূলের কোনো পরিবর্তন হওয়া ছাড়া ওই পয়গামে হকের ব্যাখ্যা ও বিধানসমূহ পৃথক পৃথক হয়। এমনকি আধ্যাত্মিক ক্রমবর্ধন ও উন্নতি তার পূর্ণতার সীমায় পৌঁছে যায়। পরম উন্নতি লাভ করে মানবীয় ধ্যান ও চিন্তার অনুভুতি। বস্তুত ধর্মীয় এবং আধ্যাত্মিক পরিভাষায় পয়গামে হক, সত্যের আহ্বানের এই অপরিবর্তনীয় সত্যকেই দীন বা ধর্ম বলে। আল্লাহ তাআলা একেই ইসলাম বলেছেন: إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ "নিঃসন্দেহে ইসলামই হল আল্লাহ তাআলার নিকট দীন বা ধর্ম।" (সূরা আলে ইমরান)

وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ "যে কেউই 'ইসলাম' ছাড়া ধর্মের নামে অন্য কিছুর অন্বেষী হয়, তার এ প্রবৃত্তি আল্লাহর কাছে গ্রহণীয় নয়।” (সূরা আলে ইমরান)

هُوَ سَمَّاكُمُ الْمُসْلِمِينَ مِنْ قَبْلُ وَفِي هَذَا "তিনি (আল্লাহ)ই তোমাদের (মানুষের) নাম কুরআন নাযিলের পূর্বেই মুসলমান রেখেছেন এবং কুরআনেও এ নামকরণ করা হয়েছে।" (সূরা হজ)

এ বাস্তব সত্যের পরিবর্তিত পদ্ধতি ও সময়ের আবর্তনে প্রদত্ত বিধান এবং ব্যাখ্যা সমূহের নামই "মিনহাজ” ও “শরিয়ত": لِكُلِّ جَعَلْنَا مِنْكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا "তোমাদের প্রত্যেকের জন্য আমি পৃথক পৃথক পন্থা (শরিয়ত) এবং পদ্ধতি নির্ধারণ করেছি।" (সূরা মায়েদা)

আর আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় ক্রমবর্ধন ও উন্নতির পূর্ণতার সীমাকে বলেছেন 'দীনকে পরিপূর্ণ করা' এবং 'নেয়ামত পূর্ণ করা': الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا “হে মুসলমানগণ! আজ আমি তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম আর তোমাদের ওপর আমার নেয়ামতকে পুরা করে দিলাম এবং তোমাদের জন্য ইসলামকে দীনরূপে পছন্দ করলাম।" (সূরা মায়েদা)

মোটকথা, হযরত আদম আ. থেকে নিয়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সময় পর্যন্ত সকল নবী ও রাসূলের ধর্ম এবং আল্লাহ তাআলা প্রদত্ত 'পয়গামে হক' সর্বকালে একই ছিল, যার নাম 'ইসলাম'। অবশ্য নবী ও রাসূলগণের নিজ নিজ যুগে নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বিধাসমূহ ও ব্যাখ্যাসমূহ পৃথক পৃথক ছিল। যাকে 'শরিয়ত ও মিনহাজ" বলা হয়। আধ্যাত্মিক উন্নতি ও ধর্মীয় চিন্তা এবং অনুভূতি যখন পূর্ণতার সীমায় পৌঁছে যায়, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে ওই সমস্ত শরিয়তকে সর্বশেষ শরিয়তে মুহাম্মদীর অন্তর্ভুক্ত করে দেওয়া হয় এবং চিরকালের জন্য এর পরিধি ভৌগোলিক সীমারেখার ঊর্ধ্বে রেখে সমগ্র বিশ্বজগতের ওপর ব্যাপক করে দেওয়া হয়। যেমন বলা হয়েছে وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا "আর আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য সুসংবাদ প্রদানকারী ও ভয় প্রদর্শনকারীরূপে প্রেরণ করেছি।" (সূরা সাবা)

সুতরাং এ শরিয়তের শিক্ষার উল্লেখ্য দিক হল- দুনিয়ার আনাচে-কানাচে প্রত্যেক কওমের প্রতি আল্লাহ পাকের সত্য সুসংবাদ প্রদানকারী ও ভয় প্রদর্শনকারী এ "সত্যের পয়গাম" নিয়ে সে আগমন করেছে। অতএব, একজন মুমিন মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য হল- ঘোষণা করা, আমরা আল্লাহর কোনো নবী-রাসূলের মধ্যেই পার্থক্যকরণ বৈধ মনে করি না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর প্রতি যেরূপ ঈমান রাখি, অদ্রুপই আল্লাহর প্রত্যেক নবী ও রাসূল আ.-এর প্রতিও ঈমান রাখি। চাই আমরা তাঁর নাম, স্থান ও অবস্থা জানি বা না-জানি。

২। সম্ভবত যুল কিফল আ. বনি ইসরাইল বংশীয় নবীগণের একজন ছিলেন। বনি ইসরাঈলদের সে-সমস্ত অবস্থা ও ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ অন্যান্য নবীদের উল্লেখ প্রসঙ্গে কুরআন মাজিদ বর্ণনা করেছে, তা ছাড়া তাঁর যমানায় এমন কোনো বিশেষ ঘটনা ঘটে নি, যা সাধারণ তাবলিগ ও হেদায়েতের অতিরিক্ত উপদেশ ও নসিহত গ্রহণের সাথে সম্পৃক্ত। সুতরাং কুরআন মাজিদ শুধু তাঁর নামই উল্লেখ করেছে; অবস্থা ও ঘটনাবলীর পিছনে পড়ে নি। কেননা কাসাসুল কোরআনের আলোচনাটি কয়েক জায়গায় এসেছে- অতীতকালের উম্মত ও জাতিসমূহের ঘটনা ও সংবাদ বর্ণনা করার মধ্যে কোরআন মাজিদের উদ্দেশ্য শুধু হেদায়েত ও নসিহতের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করা। নতুবা ইতিহাস কোরআনের আলোচ্য বিষয়ও নয়; উদ্দেশ্যও নয়। যেমন কুরআন মাজিদে আল্লাহ পাক বলেন: كَذَلِكَ نَقُصُّ عَلَيْكَ مِنْ أَنْبَاءِ مَا قَدْ سَبَقَ وَقَدْ আَتَيْنَاكَ مِنْ لَدُنَّا ذِكْرًا “(হে পয়গাম্বর)! এরূপে অতীতের বিশেষ ঘটনাগুলি আমি শুনাচ্ছি এবং নিঃসন্দেহ আমি নিজের তরফ থেকে আপনাকে নসিহতের একটি মূল বস্তু দান করেছি।" (সূরা তহা)

لَقَدْ كَانَ فِي قَصَصِهِمْ عِبْرَةٌ لِأُولِي الْأَلْبَابِ "নিঃসন্দেহ সেই নবীদের ঘটনাবলীতে বিবেকসম্পন্ন ও জ্ঞানীদের জন্য রয়েছে শিক্ষা।" (সূরা ইউসুফ)

أَفَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَيَنْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَلَدَارُ الْآخِرَةِ খَيْرٌ لِلَّذِينَ اتَّقَوْا أَفَلَا تَعْقِلُونَ "তারা কি ভূ-পৃষ্ঠে বিচরণ ও ভ্রমণ করে নি? যাতে দেখতে পেত, তাদের পূর্ববর্তী উম্মতদের কি পরিণতি হয়েছে। আর নিঃসন্দেহে পরলোক তাদের জন্য উত্তম যারা পরহেযগার। তারা কি বুঝে না? (সূরা ইউসুফ)

وَكُلًّا نَقُصُّ عَلَيْكَ مِنْ أَنْبَاءِ الرُّسُلِ مَا نُثَبِّتُ بِهِ فُؤَادَكَ وَجَاءَكَ فِي هَذِهِ الْحَقُّ وَمَوْعِظَةٌ وَذِكْرَى لِلْمُؤْمِنِينَ 'আর রাসূলদের এ সকল সংবাদ আমি তোমার কাছে বর্ণনা করছি যার দ্বারা আমি তোমার মনকে স্থির করি আর এতে তোমার কাছে এসেছে সত্য এবং মুমিনদের জন্য উপদেশ ও স্মরণ।' (সূরা হৃদ: ১২০)

ফন্ট সাইজ
15px
17px