📄 রোগের প্রতিষেধক ও আল্লাহর রহমত
‘তুমি তোমার পা দ্বারা আঘাত কর।’ আইয়ুব আ. আল্লাহর এ নির্দেশ মোতাবেক আপন পা দ্বারা মাটিতে আঘাত করলেন। আল্লাহ তাআলা সেখান থেকে একটি ঝর্ণাধারা প্রবাহিত করে দিলেন। যার পানি ছিল সুশীতল। আল্লাহ তাঁকে এ পানি দ্বারা গোসল করতে ও তা পান করতে হুকুম দেন। আইয়ুব আ. তা-ই করলেন। ফলে তার সমস্ত ব্যথা-বেদনা ও তাঁর দেহের প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য সকল রোগ-শোক ও ক্ষত দূর হয়ে গেল। আল্লাহ তাঁকে সু-স্বাস্থ্য দান করেন, তাঁর চেহারাকে সুদর্শন চেহারায় পরিবর্তন করে দেন। এ ছাড়া তাঁকে প্রচুর ধন-সম্পদও দান করেন। এমনকি স্বর্ণের পঙ্গপালও বর্ষণ করেন। তাঁকে আল্লাহ সন্তান-সন্তুতিও প্রদান করেন। কারো কারো মতে আল্লাহ তাআলা হযরত আইয়ুব আ.-এর সন্তানদেরকে জীবিত করে দেন। আর কারো মতে পূর্বের সন্তানদের বিনিময়ে তাঁকে সওয়াব দান করেন এবং তাদের স্থলে সমসংখ্যক নতুন সন্তান দুনিয়ায় দান করেন। আর তাদের সকলকে আল্লাহ কেয়ামতের দিন তাঁর সঙ্গে একত্র করবেন। যাহ্হাক রহ. ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, আল্লাহ আইয়ুব আ.-এর স্ত্রীকে যৌবন ফিরিয়ে দেন এবং স্ত্রীকে পূর্বাপেক্ষা অধিক সুশ্রী করে দেন। এমনকি আরো ২৬ জন পুত্র সন্তান তাঁর গর্ভে জন্মগ্রহণ করে। রোগ থেকে মুক্তি লাভের পর আইয়ুব আ. ৭০ বছর জীবিত ছিলেন। তিনি রোম দেশে বসবাস করতেন। দীনে হানিফ তথা সত্যধর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। এরপর পরবর্তী লোকজন এসে হযরত ইবরাহীম আ.-এর দীনের বিকৃতি ঘটায়।
📄 স্ত্রীকে প্রহারের শপথ পূরণ
‘হে আইয়ুব! তুমি স্ব-হস্তে তৃণশলা ধারণ কর এবং তা দ্বারা স্ত্রীকে প্রহার কর। তবুও কসম ভঙ্গ করো না। আমি আইয়ুবকে ধৈর্যশীল পেয়েছি। কতই না উত্তম বান্দা সে! নিঃসন্দেহে সে ছিল আমার অভিমুখী।’ (সূরা ছোয়াদ: ৪৪) এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে আইয়ুব আ.-এর প্রতি সুদৃষ্টি। তিনি স্ত্রীকে একশ বেত্রাঘাত করার শপথ করেছিলেন। এর কারণ হিসেবে কেউ বলেছেন, স্ত্রী চুল বিক্রি করায় তিনি এ শপথটি করেছিলেন। কেউ বলেছেন, একবার শয়তান নবীর স্ত্রীর কাছে চিকিৎসকের বেশ ধরে আইয়ুব আ.-এর ব্যাধির নির্দিষ্ট ওষুধের বর্ণনা দিয়েছিল। স্ত্রী তাঁর কাছে এসে উক্ত ওষুধের কথা ব্যক্ত করেন। তিনি তখন বুঝতে পারলেন, এটা শয়তানের কাজ। তখন তিনি কসম করেন, স্ত্রীকে একশটি বেত মারবেন। রোগ মুক্তির পর আল্লাহ তাঁকে জানালেন, শস্যের গোছার মতো এক গোছা তৃণ একত্রে বেঁধে একবার স্ত্রীকে মারো। এতে একশটি বেত মারা হয়েছে বলে গণ্য হবে। এতেই কসমের কাফফারা হয়ে যাবে। কসম ভাঙার গুনাহ হবে না। এটা হল মুক্তির সহজ ব্যবস্থা এবং এমন ব্যক্তির কসম থেকে নিষ্কৃতি লাভের উপায়, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে ও তাঁর আনুগত্য করে। বিশেষ করে একজন ধৈর্যশীল সতী-সাধ্বী, সত্যপন্থী নেককার স্ত্রী লোকের ক্ষেত্রে।
📄 ইনতেকাল
ইবনে জারীর রহ. প্রমুখ ইতিহাসবেত্তা লিখেছেন, হযরত আইয়ুব আ. ৯৩ বছর বয়সে ইনতেকাল করেন। কারো মতে তিনি এর চেয়ে বেশিদিন জীবিত ছিলেন। মুজাহিদ রহ. সূত্রে লাইস রহ. বর্ণনা করেন, কেয়ামতের দিন আল্লাহ দলিল হিসেবে বিপদগ্রস্তদের মুকাবিলায় আইয়ুব আ.-কে পেশ করবেন। ইবনে আসাকির রহ.-ও এরূপ বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। মৃত্যুকালে হযরত আইয়ুব আ. তাঁর পুত্র হাওমালকে অসিয়ত করে যান। তার পরে বিশর ইবনে আইয়ুব তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। অনেকের ধারণা মতে এ বিশরই কুরআনে বর্ণিত যুল-কিফল। এদের ধারণা হিসেবে তিনি নবী এবং ৭৫ বছর বয়সে তিনি ইনতেকাল করেন। কিছু লোক আইয়ুব আ.-এর পুত্র বিশরকে যুল-কিফল বা জিম্মাদার অভিধায় অভিহিত হন।
📄 দৃষ্টান্তমূলক উপদেশাবলী
১। আল্লাহ পাকের বান্দাগণের মধ্য হতে আল্লাহ তাআলার সঙ্গে যার যতটুকু সান্নিধ্য আছে, সেই তুলনায়ই তাকে বিপদাপদের ভাট্টিতে দগ্ধ করা হয়। আর যখন তিনি উক্ত দহনের সম্মুখীন হয়ে ধৈর্যসহ্যের সঙ্গে অবিচল থাকেন, তখন সেই বিপদসমূহই তার চরম সান্নিধ্য লাভের কারণ হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন— ‘সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হয় আম্বিয়ায়ে কেরামের, এরপর নেককার মুমিনদের, এরপর ধার্মিকতার স্তর ও শ্রেণী অনুযায়ী।’
২। মান-সম্মান, ধনদৌলত, সচ্ছল ও শান্তিময় অবস্থায় আল্লাহ তাআলার শোকরগুযারী এবং অনুগ্রহের মূল্যায়ন তেমন কোনো কঠিন কাজ নয়। কিন্তু বালা-মুসিবত, দুঃখ-কষ্ট এবং সংকটকালে আল্লাহ তাআলার বিধানের উপর সন্তুষ্ট থেকে অভিযোগের একটি অক্ষরও উচ্চারণ না করা এবং ধৈর্যসহ্যের প্রমাণ দেওয়া অতি কঠিন। সুতরাং যখন আল্লাহর কোনো নেককার বান্দা এরূপ দুরাবস্থায় ধৈর্যসহ্যের আঁচল না ছেড়ে অবিরত সবর ও শোকর প্রকাশ করতে থাকেন, তবে আল্লাহ তাআলার ‘রহমত’ গুণও উদ্বেলিত হয়ে ওঠে এবং এরূপ ব্যক্তির ওপর অনুগ্রহ ও দয়ার বৃষ্টি বর্ষণ করেন। সে আশাতীতরূপে অসীম অনুগ্রহ ও দয়া দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতের সাফল্য লাভ করে। হযরত আইয়ুব আ. এর উজ্জ্বল প্রমাণ।
৩। কোনো অবস্থাতেই মানুষ আল্লাহ তাআলার রহমত থেকে নিরাশ হওয়া উচিত না। কেননা আল্লাহর রহমত থেকে নৈরাশ হওয়া কাফেরের অভ্যাস। তদ্রুপ কেউ যেন মনে না করে, বিপদাপদ শুধু গুনাহের সাজাস্বরূপ এসে থাকে। বরং অনেক সময় তা পরীক্ষাস্বরূপও এসে থাকে। আর সবর ও শোকরকারীর জন্য আল্লাহ পাক রহমতের ভাণ্ডার খুলে দেন। হাদিসে কুদসিতে আছে: আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাগণকে সম্বোধন করে বলেন, ‘বান্দা তার মনে আমার সম্বন্ধে যেরূপ ধারণা পোষণ করে, আমি তার ধারণা পূর্ণ করে দেই।’
৪। স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্কসমূহের মধ্যে খেদমত ও ধৈর্য সর্বাপেক্ষা অধিক প্রিয় ব্যাপার। এক হাদিসে বর্ণিত আছে: শয়তানের কুমন্ত্রণাসমূহের মধ্যে সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট ও ইবলিসের খুবই প্রিয় হল, স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে কুধারণা, মনোমালিন্য, শত্রুতা ও ঘৃণার বীজ বপন করা। তাই সহি হাদিসে ওই স্ত্রীলোককে বেহেশতের সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে, যে স্ত্রীলোক নিজের স্বামীর জন্য নেককার ও খেদমতকারিণী সাব্যস্ত হয়।
৫। আনন্দ ও শান্তির সময় বিনয় ও শোকর এবং দুঃখ-কষ্ট ও বিপদের সময় আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সবর এমন দুটি অমূল্য নেয়ামত, যার কপালে এটি জোটে সে দুনিয়া ও আখেরাতে কখনো বিফল হতে পারে না। আল্লাহ তাআলার সম্মতি ও সন্তোষ সর্বাবস্থায় তার সাথী হয়ে থাকে।