📄 রোগমুক্তি ও হারানো সম্পদ পুনর্লাভ
হযরত আইয়ুব আ. প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাইরে যেতেন। প্রয়োজন শেষ হলে স্ত্রী তাঁর হাত ধরে নিয়ে আসতেন এবং স্ব-স্থানে রাখতেন। একবার স্বামীর কাছে আসতে স্ত্রীর দেরি হয়। এ সময়ে আল্লাহ আইয়ুব আ.-এর কাছে ওহি পাঠালেন : ‘হে আইয়ুব! তোমার পা দ্বারা মাটিতে আঘাত কর। এই তো গোসলের ও পান করার ঠাণ্ডা পানি!’ বেশ কিছু সময় দেরি করে স্ত্রী আজ আইয়ুব আ.-এর কাছে আসলেন ও তাঁকে দেখতে লাগলেন। হযরত আইয়ুব আ. পূর্বের চেয়েও অধিক সুন্দর ও সুস্বাস্থ্যবান হয়েছেন। তিনি এ অবস্থায় স্ত্রীর সম্মুখে আসলেন। স্ত্রী তাকে চিনতে না পেরে বললেন, আল্লাহ তোমাকে বরকতময় করুন! এখানে আল্লাহর নবী রোগগ্রস্ত অবস্থায় অবস্থান করছিলেন, তাঁকে কি তুমি দেখেছ? আল্লাহর কসম! ওই নবী রোগে পড়ার পূর্বে যখন সুস্থ ছিলেন, তখন তাঁর যে চেহারা ছিল সে চেহারার সাথে তোমার চেহারার মতো অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ চেহারার লোক আমি আর কাউকে দেখি নি। হযরত আইয়ুব আ. বললেন, আমিই সেই লোক। হযরত আইয়ুব আ.-এর বাড়িতে দুটি উঠান ছিল। একটি গম মাড়ানোর এবং আরেকটি যবের। আল্লাহ দুই খণ্ড মেঘ পাঠিয়ে দেন। এক খণ্ড গমের উঠানের উপর এসে স্বর্ণ বর্ষণ করে। পর্যাপ্ত বর্ষণের ফলে তা পরিপূর্ণ হয়ে গড়িয়ে যেতে থাকে। অপর খণ্ডটি যবের উঠানের উপর রৌপ্য বর্ষণ করে। তাও পরিপূর্ণ হয়ে গড়িয়ে যেতে থাকে। আল্লাহ তাআলা হযরত আইয়ুব আ.-কে পূর্বের সম্পদ ও সন্তান অবিকল ফিরিয়ে দেন এবং সেই সাথে সমপরিমাণ অতিরিক্ত দান করেন। ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ রহ. বলেন, আল্লাহ তাঁকে ওহির মাধ্যমে জানান: আমি তোমার সন্তানাদি ও ধন-সম্পদ ফিরিয়ে দিয়েছি এবং আরো সমপরিমাণ দান করেছি। এখন এই পানি দ্বারা তুমি গোসল কর। কারণ, এর দ্বারা তুমি আরোগ্য লাভ করবে।
📄 রোগের প্রতিষেধক ও আল্লাহর রহমত
‘তুমি তোমার পা দ্বারা আঘাত কর।’ আইয়ুব আ. আল্লাহর এ নির্দেশ মোতাবেক আপন পা দ্বারা মাটিতে আঘাত করলেন। আল্লাহ তাআলা সেখান থেকে একটি ঝর্ণাধারা প্রবাহিত করে দিলেন। যার পানি ছিল সুশীতল। আল্লাহ তাঁকে এ পানি দ্বারা গোসল করতে ও তা পান করতে হুকুম দেন। আইয়ুব আ. তা-ই করলেন। ফলে তার সমস্ত ব্যথা-বেদনা ও তাঁর দেহের প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য সকল রোগ-শোক ও ক্ষত দূর হয়ে গেল। আল্লাহ তাঁকে সু-স্বাস্থ্য দান করেন, তাঁর চেহারাকে সুদর্শন চেহারায় পরিবর্তন করে দেন। এ ছাড়া তাঁকে প্রচুর ধন-সম্পদও দান করেন। এমনকি স্বর্ণের পঙ্গপালও বর্ষণ করেন। তাঁকে আল্লাহ সন্তান-সন্তুতিও প্রদান করেন। কারো কারো মতে আল্লাহ তাআলা হযরত আইয়ুব আ.-এর সন্তানদেরকে জীবিত করে দেন। আর কারো মতে পূর্বের সন্তানদের বিনিময়ে তাঁকে সওয়াব দান করেন এবং তাদের স্থলে সমসংখ্যক নতুন সন্তান দুনিয়ায় দান করেন। আর তাদের সকলকে আল্লাহ কেয়ামতের দিন তাঁর সঙ্গে একত্র করবেন। যাহ্হাক রহ. ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, আল্লাহ আইয়ুব আ.-এর স্ত্রীকে যৌবন ফিরিয়ে দেন এবং স্ত্রীকে পূর্বাপেক্ষা অধিক সুশ্রী করে দেন। এমনকি আরো ২৬ জন পুত্র সন্তান তাঁর গর্ভে জন্মগ্রহণ করে। রোগ থেকে মুক্তি লাভের পর আইয়ুব আ. ৭০ বছর জীবিত ছিলেন। তিনি রোম দেশে বসবাস করতেন। দীনে হানিফ তথা সত্যধর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। এরপর পরবর্তী লোকজন এসে হযরত ইবরাহীম আ.-এর দীনের বিকৃতি ঘটায়।
📄 স্ত্রীকে প্রহারের শপথ পূরণ
‘হে আইয়ুব! তুমি স্ব-হস্তে তৃণশলা ধারণ কর এবং তা দ্বারা স্ত্রীকে প্রহার কর। তবুও কসম ভঙ্গ করো না। আমি আইয়ুবকে ধৈর্যশীল পেয়েছি। কতই না উত্তম বান্দা সে! নিঃসন্দেহে সে ছিল আমার অভিমুখী।’ (সূরা ছোয়াদ: ৪৪) এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে আইয়ুব আ.-এর প্রতি সুদৃষ্টি। তিনি স্ত্রীকে একশ বেত্রাঘাত করার শপথ করেছিলেন। এর কারণ হিসেবে কেউ বলেছেন, স্ত্রী চুল বিক্রি করায় তিনি এ শপথটি করেছিলেন। কেউ বলেছেন, একবার শয়তান নবীর স্ত্রীর কাছে চিকিৎসকের বেশ ধরে আইয়ুব আ.-এর ব্যাধির নির্দিষ্ট ওষুধের বর্ণনা দিয়েছিল। স্ত্রী তাঁর কাছে এসে উক্ত ওষুধের কথা ব্যক্ত করেন। তিনি তখন বুঝতে পারলেন, এটা শয়তানের কাজ। তখন তিনি কসম করেন, স্ত্রীকে একশটি বেত মারবেন। রোগ মুক্তির পর আল্লাহ তাঁকে জানালেন, শস্যের গোছার মতো এক গোছা তৃণ একত্রে বেঁধে একবার স্ত্রীকে মারো। এতে একশটি বেত মারা হয়েছে বলে গণ্য হবে। এতেই কসমের কাফফারা হয়ে যাবে। কসম ভাঙার গুনাহ হবে না। এটা হল মুক্তির সহজ ব্যবস্থা এবং এমন ব্যক্তির কসম থেকে নিষ্কৃতি লাভের উপায়, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে ও তাঁর আনুগত্য করে। বিশেষ করে একজন ধৈর্যশীল সতী-সাধ্বী, সত্যপন্থী নেককার স্ত্রী লোকের ক্ষেত্রে।
📄 ইনতেকাল
ইবনে জারীর রহ. প্রমুখ ইতিহাসবেত্তা লিখেছেন, হযরত আইয়ুব আ. ৯৩ বছর বয়সে ইনতেকাল করেন। কারো মতে তিনি এর চেয়ে বেশিদিন জীবিত ছিলেন। মুজাহিদ রহ. সূত্রে লাইস রহ. বর্ণনা করেন, কেয়ামতের দিন আল্লাহ দলিল হিসেবে বিপদগ্রস্তদের মুকাবিলায় আইয়ুব আ.-কে পেশ করবেন। ইবনে আসাকির রহ.-ও এরূপ বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। মৃত্যুকালে হযরত আইয়ুব আ. তাঁর পুত্র হাওমালকে অসিয়ত করে যান। তার পরে বিশর ইবনে আইয়ুব তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। অনেকের ধারণা মতে এ বিশরই কুরআনে বর্ণিত যুল-কিফল। এদের ধারণা হিসেবে তিনি নবী এবং ৭৫ বছর বয়সে তিনি ইনতেকাল করেন। কিছু লোক আইয়ুব আ.-এর পুত্র বিশরকে যুল-কিফল বা জিম্মাদার অভিধায় অভিহিত হন।