📄 চুল বিক্রি
কিছুদিন পর লোকজন যখন জানল, এ মহিলাটি আইয়ুব আ.-এর স্ত্রী, তখন আর তারা তাঁকে কাজে নিত না। তাদের ভয় হল, এর কারণে আইয়ুব আ.-এর রোগ হয়তো তাদের মধ্যে সংক্রমিত হবে। কাজেই একবার স্ত্রী কোথাও কাজ খুঁজে না পেয়ে অবশেষে জনৈক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির কন্যার কাছে খুব উন্নতমানের খাদ্যের বিনিময়ে নিজের চুলের দুটি বেনীর একটি বিক্রি করে দেন। উক্ত খাদ্য নিয়ে তিনি স্বামীর কাছে উপস্থিত হন। আইয়ুব আ. জিজ্ঞেস করলেন, এ খাদ্য কোথায় পেয়েছ? স্ত্রী জানালেন, অন্যের কাজ করে এ খাদ্য সংগ্রহ করেছি। পরের দিনও স্ত্রী কোথাও কাজ না পেয়ে অবশিষ্ট বেনীটিও খাদ্যের বিনিময়ে বিক্রি করে দেন। উক্ত খাদ্য আইয়ুব আ.-এর কাছে নিয়ে এলে এবারও তিনি অসন্তুষ্ট হন এবং কসম করেন, কোথা থেকে কিভাবে এ খাদ্য তিনি পেলেন, না বলা পর্যন্ত তিনি তা খাবেন না। তখন স্ত্রী নিজ মাথা থেকে ওড়না সরিয়ে দেখান। আইয়ুব আ. স্ত্রীর মাথা মুণ্ডিত দেখে আল্লাহর কাছে দুআ করেন: ‘হে আমার প্রতিপালক! আমি দুঃখে-কষ্টে পতিত হয়েছি আর আপনি তো সকল দয়ালুদের শ্রেষ্ঠ দয়ালু।’ (সূরা আম্বিয়া: ৮৩)
📄 ভাইদের সামনে সত্যতা প্রকাশ
ইবনে আবি হাতেম রহ. আবদুল্লাহ ইবনে উবায়েদ ইবনে উমায়ের রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আইয়ুব আ.-এর দুই ভাই ছিল। একবার তারা তাদের এ ভাইকে দেখতে আসে। কিন্তু আইয়ুব আ.-এর দেহের দুর্গন্ধের কারণে তারা তাঁর কাছে যেতে সক্ষম হল না; দূরে দাঁড়িয়ে থাকল। তখন একজন অপরজনকে বলল: আইয়ুবের মধ্যে কোনো কল্যাণ আছে বলে যদি আল্লাহ জানতেন, তা হলে তিনি এভাবে তাকে এরূপ কঠিন পরীক্ষায় ফেলতেন না। তাদের এ কথায় তিনি যারপরনাই মর্মাহত হন; এমনটি আর কখনো হন নি। এরপর তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করলেন, “হে আল্লাহ! আপনি যদি জানেন এমন একটি রাতও যায় নি, যে রাত্রে আমি পেট ভরে খানা খেয়েছি আর আমার জানা মতে কোনো ব্যক্তি ক্ষুধার্ত অবস্থায় থেকেছে। তা হলে আমার সত্যতা প্রকাশ করুন।” তখন আকাশ থেকে তাঁর কথার সত্যতা ঘোষণা করা হয় এবং ওই দুই ভাই শ্রবণও করে। তিনি পুনরায় বললেন, “হে আল্লাহ! আপনি যদি জানেন বস্ত্রহীন লোকের খবর পাওয়ায় আমি কখনো দুটি জামা গ্রহণ করি নি, তা হলে আমার সত্যতা প্রকাশ করুন।” তখন আকাশ থেকে তাঁর সত্যতা ঘোষণা করা হয়। দুই ভাই তাও শ্রবণ করেছিল। এরপর তিনি বলেন, “হে আল্লাহ! আপনার ইজ্জতের কসম! -এরপর সিজদায় পড়ে যান এবং বলেন- হে আল্লাহ! আপনার ইজ্জতের কসম! আমার বিপদ দূর না করা পর্যন্ত আমি মাথা উঠাব না।” সত্যই বিপদমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত তিনি আর মাথা উঠান নি।
📄 রোগমুক্তি ও হারানো সম্পদ পুনর্লাভ
হযরত আইয়ুব আ. প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাইরে যেতেন। প্রয়োজন শেষ হলে স্ত্রী তাঁর হাত ধরে নিয়ে আসতেন এবং স্ব-স্থানে রাখতেন। একবার স্বামীর কাছে আসতে স্ত্রীর দেরি হয়। এ সময়ে আল্লাহ আইয়ুব আ.-এর কাছে ওহি পাঠালেন : ‘হে আইয়ুব! তোমার পা দ্বারা মাটিতে আঘাত কর। এই তো গোসলের ও পান করার ঠাণ্ডা পানি!’ বেশ কিছু সময় দেরি করে স্ত্রী আজ আইয়ুব আ.-এর কাছে আসলেন ও তাঁকে দেখতে লাগলেন। হযরত আইয়ুব আ. পূর্বের চেয়েও অধিক সুন্দর ও সুস্বাস্থ্যবান হয়েছেন। তিনি এ অবস্থায় স্ত্রীর সম্মুখে আসলেন। স্ত্রী তাকে চিনতে না পেরে বললেন, আল্লাহ তোমাকে বরকতময় করুন! এখানে আল্লাহর নবী রোগগ্রস্ত অবস্থায় অবস্থান করছিলেন, তাঁকে কি তুমি দেখেছ? আল্লাহর কসম! ওই নবী রোগে পড়ার পূর্বে যখন সুস্থ ছিলেন, তখন তাঁর যে চেহারা ছিল সে চেহারার সাথে তোমার চেহারার মতো অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ চেহারার লোক আমি আর কাউকে দেখি নি। হযরত আইয়ুব আ. বললেন, আমিই সেই লোক। হযরত আইয়ুব আ.-এর বাড়িতে দুটি উঠান ছিল। একটি গম মাড়ানোর এবং আরেকটি যবের। আল্লাহ দুই খণ্ড মেঘ পাঠিয়ে দেন। এক খণ্ড গমের উঠানের উপর এসে স্বর্ণ বর্ষণ করে। পর্যাপ্ত বর্ষণের ফলে তা পরিপূর্ণ হয়ে গড়িয়ে যেতে থাকে। অপর খণ্ডটি যবের উঠানের উপর রৌপ্য বর্ষণ করে। তাও পরিপূর্ণ হয়ে গড়িয়ে যেতে থাকে। আল্লাহ তাআলা হযরত আইয়ুব আ.-কে পূর্বের সম্পদ ও সন্তান অবিকল ফিরিয়ে দেন এবং সেই সাথে সমপরিমাণ অতিরিক্ত দান করেন। ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ রহ. বলেন, আল্লাহ তাঁকে ওহির মাধ্যমে জানান: আমি তোমার সন্তানাদি ও ধন-সম্পদ ফিরিয়ে দিয়েছি এবং আরো সমপরিমাণ দান করেছি। এখন এই পানি দ্বারা তুমি গোসল কর। কারণ, এর দ্বারা তুমি আরোগ্য লাভ করবে।
📄 রোগের প্রতিষেধক ও আল্লাহর রহমত
‘তুমি তোমার পা দ্বারা আঘাত কর।’ আইয়ুব আ. আল্লাহর এ নির্দেশ মোতাবেক আপন পা দ্বারা মাটিতে আঘাত করলেন। আল্লাহ তাআলা সেখান থেকে একটি ঝর্ণাধারা প্রবাহিত করে দিলেন। যার পানি ছিল সুশীতল। আল্লাহ তাঁকে এ পানি দ্বারা গোসল করতে ও তা পান করতে হুকুম দেন। আইয়ুব আ. তা-ই করলেন। ফলে তার সমস্ত ব্যথা-বেদনা ও তাঁর দেহের প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য সকল রোগ-শোক ও ক্ষত দূর হয়ে গেল। আল্লাহ তাঁকে সু-স্বাস্থ্য দান করেন, তাঁর চেহারাকে সুদর্শন চেহারায় পরিবর্তন করে দেন। এ ছাড়া তাঁকে প্রচুর ধন-সম্পদও দান করেন। এমনকি স্বর্ণের পঙ্গপালও বর্ষণ করেন। তাঁকে আল্লাহ সন্তান-সন্তুতিও প্রদান করেন। কারো কারো মতে আল্লাহ তাআলা হযরত আইয়ুব আ.-এর সন্তানদেরকে জীবিত করে দেন। আর কারো মতে পূর্বের সন্তানদের বিনিময়ে তাঁকে সওয়াব দান করেন এবং তাদের স্থলে সমসংখ্যক নতুন সন্তান দুনিয়ায় দান করেন। আর তাদের সকলকে আল্লাহ কেয়ামতের দিন তাঁর সঙ্গে একত্র করবেন। যাহ্হাক রহ. ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, আল্লাহ আইয়ুব আ.-এর স্ত্রীকে যৌবন ফিরিয়ে দেন এবং স্ত্রীকে পূর্বাপেক্ষা অধিক সুশ্রী করে দেন। এমনকি আরো ২৬ জন পুত্র সন্তান তাঁর গর্ভে জন্মগ্রহণ করে। রোগ থেকে মুক্তি লাভের পর আইয়ুব আ. ৭০ বছর জীবিত ছিলেন। তিনি রোম দেশে বসবাস করতেন। দীনে হানিফ তথা সত্যধর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। এরপর পরবর্তী লোকজন এসে হযরত ইবরাহীম আ.-এর দীনের বিকৃতি ঘটায়।