📄 স্ত্রীর স্বামীভক্তি
একমাত্র স্ত্রী ছাড়া অন্য কেউ তার খোঁজ-খবর রাখত না। সুতরাং স্বামীর অধিকার, তার পূর্বের ভালোবাসা ও অনুগ্রহের কথা মনে রেখে স্ত্রী তাঁর সেবায় নিয়োজিত থাকেন। স্ত্রী তাঁর অবস্থার প্রতি লক্ষ রাখতেন। পেশাব-পায়খানায় সাহায্য করতেন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা করতেন। এভাবে স্ত্রীও ক্রমশ দুর্বল হতে থাকেন। অর্থাভাব দেখা দেয়। ফলে তিনি মানুষের বাড়িতে কাজ করে সেই পারিশ্রমিক দ্বারা স্বামীর আহার্য ও ঔষধপত্রের ব্যবস্থা করতে বাধ্য হন। এক সময় স্ত্রীর জন্য সামান্য অর্থও যোগাড় করা কষ্টসাধ্য হয়ে গেল। তবুও তিনি অসীম ধৈর্যের পরিচয় দেন। সম্পদ ও সন্তানাদি হারিয়েছেন, স্বামীর করুণ অবস্থা, অর্থের অভাব, মানুষের সাহায্য-সহানুভূতিও নেই, এ সব প্রতিকূল অবস্থা স্বামী-স্ত্রী উভয়ে অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে মুকাবিলা করেন। অথচ সম্পদ-ঐশ্বর্য, বন্ধু-বান্ধব ইতোপূর্বে সবই তাঁদের ছিল। সহি হাদিসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হয় নবীগণের। তারপর সত্যপন্থী লোকদের। এরপর দীনদারী বা ধার্মিকতার স্তরভেদে পর্যায়ক্রমে এ পরীক্ষা চলে। যদি সে দৃঢ়তার সঙ্গে দীনের আনুগত্য করতে থাকে, তবে তার পরীক্ষাও কঠোরতর হয়।’
📄 পরম ধৈর্য
উল্লিখিত বিপদ-আপদ হযরত আইয়ুব আ.-এর ক্ষেত্রে যতই বৃদ্ধি পেয়েছে ততই তাঁর ধৈর্যসহ্য এবং আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি তাঁর ধৈর্য ও বিপদাপদ পরবর্তীকালে প্রবাদে পরিণত হয়ে যায়। ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ ও অন্য অনেকে ইসরাঈলী ওলামাদের বরাতে হযরত আইয়ুব আ.-এর সম্পদ ও সন্তানাদি নিঃশেষিত হওয়া ও দেহের রোগ সম্পর্কে দীর্ঘ বর্ণনা দান করেছেন। আল্লাহ পাক সেগুলোর বিশুদ্ধতা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত।
📄 রোগব্যাধি
মুজাহিদ রহ. বলেছেন, পৃথিবীতে হযরত আইয়ুব আ.-এরই সর্বপ্রথম বসন্ত রোগ হয়। তবে ঠিক কতদিন তা স্থায়ী হয়েছিল, এ সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত পাওয়া যায়। ওহাবের মতে, তা ছিল তিন বছর- এর কম-বেশি নয়। হযরত আনাস রাযি. বলেন, সাত বছর কয়েক মাস পর্যন্ত তাঁর পরীক্ষা চলে। এ সময়ে তাঁকে বনি ইসরাঈলের একটি আবর্জনাময় স্থানে ফেলে রাখা হয়। বিভিন্ন রকম কীট তাঁর দেহের ওপর দিয়ে চলাচল করত। এরপর আল্লাহ তাআলা তাঁকে এ বিপদ থেকে উদ্ধার করেন। এবং বিপুলভাবে তাকে পুরস্কৃত করেন এবং তাঁর প্রশংসাও করেন। আঠার বছরের কথাও বর্ণিত আছে। সুদ্দী রহ. বলেছেন, আইয়ুব আ.-এর দেহ থেকে গোশত খসে খসে পড়ে। এমনকি তাঁর হাড় ও শিরা ব্যতীত আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। তাঁর স্ত্রী তাঁর দেহের নিচে ছাই বিছিয়ে দিতেন। এ অবস্থা যখন দীর্ঘ দিন ধরে চলতে থাকে, তখন একবার স্ত্রী বললেন : হে আইয়ুব! আপনি যদি আপনার প্রতিপালকের কাছে দুআ করতেন, তা হলে তিনি এ বিপদ থেকে আপনাকে উদ্ধার করতেন। তদুত্তরে আইয়ুব আ. বললেন, আমি সত্তর বছর সুস্থ দেহে জীবন যাপন করেছি। এখন তার জন্যে সত্তর বছর সবর করলেও তা নগণ্যই হবে। স্বামীর মুখে এ কথা শুনে স্ত্রী ঘাবড়ে যান। তখন থেকে তিনি পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মানুষের কাজকর্ম করে আইয়ুব আ.-এর আহার্য্যের বন্দোবস্ত করতেন।
📄 চুল বিক্রি
কিছুদিন পর লোকজন যখন জানল, এ মহিলাটি আইয়ুব আ.-এর স্ত্রী, তখন আর তারা তাঁকে কাজে নিত না। তাদের ভয় হল, এর কারণে আইয়ুব আ.-এর রোগ হয়তো তাদের মধ্যে সংক্রমিত হবে। কাজেই একবার স্ত্রী কোথাও কাজ খুঁজে না পেয়ে অবশেষে জনৈক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির কন্যার কাছে খুব উন্নতমানের খাদ্যের বিনিময়ে নিজের চুলের দুটি বেনীর একটি বিক্রি করে দেন। উক্ত খাদ্য নিয়ে তিনি স্বামীর কাছে উপস্থিত হন। আইয়ুব আ. জিজ্ঞেস করলেন, এ খাদ্য কোথায় পেয়েছ? স্ত্রী জানালেন, অন্যের কাজ করে এ খাদ্য সংগ্রহ করেছি। পরের দিনও স্ত্রী কোথাও কাজ না পেয়ে অবশিষ্ট বেনীটিও খাদ্যের বিনিময়ে বিক্রি করে দেন। উক্ত খাদ্য আইয়ুব আ.-এর কাছে নিয়ে এলে এবারও তিনি অসন্তুষ্ট হন এবং কসম করেন, কোথা থেকে কিভাবে এ খাদ্য তিনি পেলেন, না বলা পর্যন্ত তিনি তা খাবেন না। তখন স্ত্রী নিজ মাথা থেকে ওড়না সরিয়ে দেখান। আইয়ুব আ. স্ত্রীর মাথা মুণ্ডিত দেখে আল্লাহর কাছে দুআ করেন: ‘হে আমার প্রতিপালক! আমি দুঃখে-কষ্টে পতিত হয়েছি আর আপনি তো সকল দয়ালুদের শ্রেষ্ঠ দয়ালু।’ (সূরা আম্বিয়া: ৮৩)