📄 কোরআন মাজিদে হযরত আইয়ুব আ.
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন: ‘এবং স্মরণ কর আইয়ুবের কথা! যখন সে তার প্রতিপ্রতিপালককে আহ্বান করে বলেছিল, আমি দুঃখ-কষ্টে পড়েছি। তুমি তো দয়ালুদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু। তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম। তার দুঃখ-কষ্ট দূরীভূত করে দিলাম। ফিরিয়ে দিলাম তাকে তার পরিবার-পরিজন এবং তাদের সঙ্গে তাদের মতো আরো দিয়েছিলাম আমার বিশেষ রহমতরূপে। আর এটি ইবাদতকারীদের জন্যে উপদেশস্বরূপ।’ (সূরা আম্বিয়া: ৮৩-৮৪)
সূরা ছোয়াদে আল্লাহ বলেন: ‘স্মরণ কর আমার বান্দা আইয়ুবকে! যখন সে তার প্রতিপালককে আহ্বান করে বলেছিল, শয়তান তো আমাকে যন্ত্রণা ও কষ্টে ফেলেছে। আমি তাকে বললাম, তুমি তোমার পা দিয়ে ভূমিতে আঘাত কর! এই তো গোসলের সুশীতল পানি আর পানীয়। আমি তাকে দিলাম তার পরিজনবর্গ ও তাদের মতো আরো আমার অনুগ্রহস্বরূপ। এটি বোধশক্তিসম্পন্ন লোকদের জন্যে উপদেশস্বরূপ। আমি তাকে আদেশ করলাম, এক মুঠো তৃণ লও এবং তা দিয়ে আঘাত কর; শপথ ভঙ্গ করো না। আমি তাকে পেলাম ধৈর্যশীল। কত উত্তম বান্দা সে! সে ছিল আমার অভিমুখী।’ (সূরা ছোয়াদ: ৪১-৪৪)
📄 নবুওয়তের ক্রমধারা
ইবনে আসাকির রহ. কালবি রহ. সূত্রে বর্ণনা করেছেন, সর্বপ্রথম প্রেরিত নবী হযরত ইদরিস আ.। তার পরে নূহ, তারপর ইবরাহীম আ.। তারপর ইসমাইল, তারপর ইসহাক, তারপর ইয়াকুব, তারপর ইউসুফ আ.। তারপর লূত, তারপর হূদ, তারপর সালেহ, তারপর শুআইব, তারপর মূসা ও হারূন, তারপর ইলিয়াস, তারপর আল-ইয়াসা, তারপর উরফী ইবনে সুওয়ায়লিখ ইবনে আফরাইম ইবনে ইউসুফ ইবনে ইয়াকুব আ.। তারপর ইউনুস আ. ইবনে মাত্তা- ইয়াকুবের বংশধর। তারপর আইয়ুব ইবনে যারাহ ইবনে আমুস ইবনে লায়ফারাম ইবনুল ঈস ইবনে ইসহাক ইবনে ইবরাহীম আ.। উক্ত ক্রমধারায় কোনো কোনো নামের ক্ষেত্রে আপত্তি আছে। কেননা প্রসিদ্ধ মতে হুদ ও সালেহ আ.-এর আগমন হযরত নূহ আ.-এর পরে ও ইবরাহীম আ.-এর পূর্বে হয়েছিল।
📄 ধন-সম্পদ ও পরীক্ষা
তাফসিরকারকগণ বলেছেন, হযরত আইয়ুব আ. ছিলেন সেকালের একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি। সকল প্রকার সম্পদের অধিকারী। চতুষ্পদ প্রাণী, গৃহপালিত পশু, দাস-দাসী এবং হাওরান অঞ্চলের বুছায়না এলাকার বিশাল জমির মালিকানা। ইবনে আসাকির রহ. বর্ণনা করেন, হযরত আইয়ুব আ.-এর এ সব সম্পদ ছাড়াও আরো ছিল প্রচুর সন্তান ও পরিবার-পরিজন। পরে এ সব কিছু তাঁর থেকে ছিনিয়ে নিয়ে নানা প্রকার দৈহিক ব্যাধি দ্বারা তাকে পরীক্ষায় ফেলা হয়। শরীরের সর্বাঙ্গে রোগ ছিল। শুধু জিহবা ও হৃৎপিণ্ড ব্যতীত কোনো একটি স্থানও অক্ষত ছিল না। এ দুই অঙ্গ দ্বারা তিনি আল্লাহর যিকির করতেন। এতসব মুসিবত সত্ত্বেও তিনি ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা দেখান। রাত-দিন আল্লাহর যিকিরে রত থাকেন। রোগ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় বন্ধু-বান্ধব, আপনজন তাঁর কাছ থেকে সরে যেতে থাকে। একে একে সবাই তাঁর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অবশেষে তাঁকে শহরের বাইরে এক আবর্জনাময় স্থানে ফেলে রাখা হয়।
📄 স্ত্রীর স্বামীভক্তি
একমাত্র স্ত্রী ছাড়া অন্য কেউ তার খোঁজ-খবর রাখত না। সুতরাং স্বামীর অধিকার, তার পূর্বের ভালোবাসা ও অনুগ্রহের কথা মনে রেখে স্ত্রী তাঁর সেবায় নিয়োজিত থাকেন। স্ত্রী তাঁর অবস্থার প্রতি লক্ষ রাখতেন। পেশাব-পায়খানায় সাহায্য করতেন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা করতেন। এভাবে স্ত্রীও ক্রমশ দুর্বল হতে থাকেন। অর্থাভাব দেখা দেয়। ফলে তিনি মানুষের বাড়িতে কাজ করে সেই পারিশ্রমিক দ্বারা স্বামীর আহার্য ও ঔষধপত্রের ব্যবস্থা করতে বাধ্য হন। এক সময় স্ত্রীর জন্য সামান্য অর্থও যোগাড় করা কষ্টসাধ্য হয়ে গেল। তবুও তিনি অসীম ধৈর্যের পরিচয় দেন। সম্পদ ও সন্তানাদি হারিয়েছেন, স্বামীর করুণ অবস্থা, অর্থের অভাব, মানুষের সাহায্য-সহানুভূতিও নেই, এ সব প্রতিকূল অবস্থা স্বামী-স্ত্রী উভয়ে অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে মুকাবিলা করেন। অথচ সম্পদ-ঐশ্বর্য, বন্ধু-বান্ধব ইতোপূর্বে সবই তাঁদের ছিল। সহি হাদিসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হয় নবীগণের। তারপর সত্যপন্থী লোকদের। এরপর দীনদারী বা ধার্মিকতার স্তরভেদে পর্যায়ক্রমে এ পরীক্ষা চলে। যদি সে দৃঢ়তার সঙ্গে দীনের আনুগত্য করতে থাকে, তবে তার পরীক্ষাও কঠোরতর হয়।’