📄 হযরত আইয়ুব আ.-এর পরিচয়
ইবনে ইসহাক রহ. বলেন, হযরত আইয়ুব আ. ছিলেন রোমের বাসিন্দা। তাঁর বংশধারা হলো: আইয়ুব ইবনে মূস ইবনে যারাহ ইবনুল ঈস ইবনে ইসহাক ইবনে ইবরাহীম খলীল আ.। কেউ কেউ বলেছেন, আইয়ুব ইবনে মূস ইবনে রাবীল ইবনুল ঈস ইবনে ইসহাক ইবনে ইয়াকুব আ.। এ ছাড়া অন্য মতও আছে। ইবনে আসাকির রহ. লিখেছেন, আইয়ুব আ.-এর মা ছিলেন হযরত লূত আ.-এর কন্যা। কেউ কেউ বলেছেন, হযরত আইয়ুব আ.-এর পিতা সেই ঈমানদারদের একজন, যারা হযরত ইবরাহীম আ.-কে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপের দিন ঈমান এনেছিলেন। কিন্তু প্রথম মতই অধিক প্রসিদ্ধ। কেননা তিনি ছিলেন ইবরাহীম আ.-এর বংশধর। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে: ‘আর তার (ইবরাহীমের) বংশধরদের মধ্যে রয়েছে দাউদ, সুলাইমান, আইয়ুব, ইউসুফ, মূসা ও হারুন।’ (সূরা আনআম: ৮৪) সঠিক মতানুসারে এ আয়াতে ‘বংশধর’ বলতে ইবরাহীম আ.-এর বংশধরদের বোঝানো হয়েছে; নূহ আ.-এর বংশধর নয়। হযরত আইয়ুব আ. ছিলেন সেসব নবীদের অন্যতম, যাদের নিকট ওহি পাঠানো হয়েছে বলে কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন: ‘আমি তোমার কাছে ওহি প্রেরণ করেছি, যেমন নূহ ও তার পরবর্তী নবীগণের কাছে প্রেরণ করেছিলাম। ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তার বংশধরগণ, ঈসা, আইয়ুব, হারুন এবং সুলাইমানের কাছে ওহি প্রেরণ করেছিলাম।’ (সূরা নিসা: ১৬৩) সুতরাং বিশুদ্ধ মতে, হযরত আইয়ুব আ. ছিলেন ঈস ইবনে ইসহাক আ.-এর বংশধর। আবার তাঁর স্ত্রীর নামের ব্যাপারেও বিভিন্ন মত পাওয়া যায়। কারো মতে লাইয়া বিনতে ইয়াকুব। কারো মতে রুহমা বা রহিমা বিনত আফরাইম। কারো মতে মানশা বিনতে ইউসুফ ইবনে ইয়াকুব। শেষোক্ত মতই বেশি প্রসিদ্ধ। এ কারণে আমরা এখানে এ মতেরই উল্লেখ করেছি।
📄 কোরআন মাজিদে হযরত আইয়ুব আ.
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন: ‘এবং স্মরণ কর আইয়ুবের কথা! যখন সে তার প্রতিপ্রতিপালককে আহ্বান করে বলেছিল, আমি দুঃখ-কষ্টে পড়েছি। তুমি তো দয়ালুদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু। তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম। তার দুঃখ-কষ্ট দূরীভূত করে দিলাম। ফিরিয়ে দিলাম তাকে তার পরিবার-পরিজন এবং তাদের সঙ্গে তাদের মতো আরো দিয়েছিলাম আমার বিশেষ রহমতরূপে। আর এটি ইবাদতকারীদের জন্যে উপদেশস্বরূপ।’ (সূরা আম্বিয়া: ৮৩-৮৪)
সূরা ছোয়াদে আল্লাহ বলেন: ‘স্মরণ কর আমার বান্দা আইয়ুবকে! যখন সে তার প্রতিপালককে আহ্বান করে বলেছিল, শয়তান তো আমাকে যন্ত্রণা ও কষ্টে ফেলেছে। আমি তাকে বললাম, তুমি তোমার পা দিয়ে ভূমিতে আঘাত কর! এই তো গোসলের সুশীতল পানি আর পানীয়। আমি তাকে দিলাম তার পরিজনবর্গ ও তাদের মতো আরো আমার অনুগ্রহস্বরূপ। এটি বোধশক্তিসম্পন্ন লোকদের জন্যে উপদেশস্বরূপ। আমি তাকে আদেশ করলাম, এক মুঠো তৃণ লও এবং তা দিয়ে আঘাত কর; শপথ ভঙ্গ করো না। আমি তাকে পেলাম ধৈর্যশীল। কত উত্তম বান্দা সে! সে ছিল আমার অভিমুখী।’ (সূরা ছোয়াদ: ৪১-৪৪)
📄 নবুওয়তের ক্রমধারা
ইবনে আসাকির রহ. কালবি রহ. সূত্রে বর্ণনা করেছেন, সর্বপ্রথম প্রেরিত নবী হযরত ইদরিস আ.। তার পরে নূহ, তারপর ইবরাহীম আ.। তারপর ইসমাইল, তারপর ইসহাক, তারপর ইয়াকুব, তারপর ইউসুফ আ.। তারপর লূত, তারপর হূদ, তারপর সালেহ, তারপর শুআইব, তারপর মূসা ও হারূন, তারপর ইলিয়াস, তারপর আল-ইয়াসা, তারপর উরফী ইবনে সুওয়ায়লিখ ইবনে আফরাইম ইবনে ইউসুফ ইবনে ইয়াকুব আ.। তারপর ইউনুস আ. ইবনে মাত্তা- ইয়াকুবের বংশধর। তারপর আইয়ুব ইবনে যারাহ ইবনে আমুস ইবনে লায়ফারাম ইবনুল ঈস ইবনে ইসহাক ইবনে ইবরাহীম আ.। উক্ত ক্রমধারায় কোনো কোনো নামের ক্ষেত্রে আপত্তি আছে। কেননা প্রসিদ্ধ মতে হুদ ও সালেহ আ.-এর আগমন হযরত নূহ আ.-এর পরে ও ইবরাহীম আ.-এর পূর্বে হয়েছিল।
📄 ধন-সম্পদ ও পরীক্ষা
তাফসিরকারকগণ বলেছেন, হযরত আইয়ুব আ. ছিলেন সেকালের একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি। সকল প্রকার সম্পদের অধিকারী। চতুষ্পদ প্রাণী, গৃহপালিত পশু, দাস-দাসী এবং হাওরান অঞ্চলের বুছায়না এলাকার বিশাল জমির মালিকানা। ইবনে আসাকির রহ. বর্ণনা করেন, হযরত আইয়ুব আ.-এর এ সব সম্পদ ছাড়াও আরো ছিল প্রচুর সন্তান ও পরিবার-পরিজন। পরে এ সব কিছু তাঁর থেকে ছিনিয়ে নিয়ে নানা প্রকার দৈহিক ব্যাধি দ্বারা তাকে পরীক্ষায় ফেলা হয়। শরীরের সর্বাঙ্গে রোগ ছিল। শুধু জিহবা ও হৃৎপিণ্ড ব্যতীত কোনো একটি স্থানও অক্ষত ছিল না। এ দুই অঙ্গ দ্বারা তিনি আল্লাহর যিকির করতেন। এতসব মুসিবত সত্ত্বেও তিনি ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা দেখান। রাত-দিন আল্লাহর যিকিরে রত থাকেন। রোগ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় বন্ধু-বান্ধব, আপনজন তাঁর কাছ থেকে সরে যেতে থাকে। একে একে সবাই তাঁর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অবশেষে তাঁকে শহরের বাইরে এক আবর্জনাময় স্থানে ফেলে রাখা হয়।