📄 কওমে শুআইব বা মাদায়েনবাসীর ঘটনা
সূরা হূদের মধ্যে লূত আ.-এর সম্প্রদায়ের ঘটনা বলার পর আল্লাহ তাআলা বলেন:
মাদায়েনবাসীদের নিকট তাদের স্ব-গোত্রীয় শুআইবকে পাঠিয়েছিলাম; সে বলেছিল, 'হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোনো ইলাহ নেই। মাপে ও ওজনে কম করো না। আমি তোমাদেরকে সমৃদ্ধিশালী দেখছি, কিন্তু আমি তোমাদের জন্যে আশংকা করছি এক সর্বগ্রাসী দিনের শাস্তি। হে আমার সম্প্রদায়! ন্যায়-সঙ্গতভাবে মাপবে ও ওজন করবে। লোকদেরকে তাদের প্রাপ্যবস্তু কম দিবে না এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় ঘটাবে না, 'যদি তোমরা মুমিন হও তবে আল্লাহ অনুমোদিত যা বাকি থাকবে তোমাদের জন্যে তা উত্তম; আমি তোমাদের তত্ত্বাবধায়ক নই।' ওরা বলল, 'হে শুআইব! তোমার সালাত কি তোমাকে নির্দেশ দেয়, আমাদের পিতৃ-পুরুষেরা যার ইবাদত করত, আমাদেরকে তা বর্জন করতে হবে এবং আমরা ধন-সম্পদ সম্পর্কে যা করি তাও না? তুমি তো অবশ্যই সহিষ্ণু, সদাচারী।'
সে বলল, 'হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা ভেবে দেখেছ কি, আমি যদি আমার প্রতিপালক-প্রেরিত স্পষ্ট প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকি এবং তিনি যদি তাঁর কাছ থেকে আমাকে উৎকৃষ্ট জীবনোপকরণ দান করে থাকেন, তবে কি করে আমি আমার কর্তব্য হতে বিরত থাকব? আমি তোমাদেরকে যা নিষেধ করি, আমি নিজে তা করতে ইচ্ছা করি না। আমি আমার সাধ্যমত সংস্কার করতে চাই। আমার কার্য-সাধন তো আল্লাহরই সাহায্যে; আমি তাঁরই উপর নির্ভর করি এবং আমি তাঁরই অভিমুখী। 'হে আমার সম্প্রদায়! আমার সাথে বিরোধ যেন কিছুতেই তোমাদেরকে এমন অপরাধ না করায় যাতে তোমাদের উপর তার অনুরূপ বিপদ আপতিত হবে যা আপতিত হয়েছিল নূহের সম্প্রদায়ের উপর, হূদের সম্প্রদায়ের উপর কিংবা সালেহের সম্প্রদায়ের উপর, আর লূতের সম্প্রদায় তো তোমাদের থেকে দূরে নয়। তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর ও তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন কর; আমার প্রতিপালক পরম দয়ালু, প্রেমময়।' তারা বলল, 'হে শুআইব! তুমি যা বল তার অনেক কথা আমরা বুঝি না এবং আমরা তো তোমাকে আমাদের মধ্যে দুর্বলই দেখছি। তোমার স্বজনবর্গ না থাকলে আমরা তোমাকে পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলতাম, আমাদের উপর তুমি শক্তিশালী নও।' সে বলল, 'হে আমার সম্প্রদায়! তোমাদের কাছে কি আমার স্বজনবর্গ আল্লাহর চাইতে অধিক শক্তিশালী? তোমরা তাঁকে সম্পূর্ণ পেছনে ফেলে রেখেছ। তোমরা যা কর আমার প্রতিপালক তা পরিবেষ্টন করে আছেন।
'হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা নিজ নিজ অবস্থায় কাজ করতে থাক, আমিও আমার কাজ করছি; তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে কার উপর আসবে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি এবং কে মিথ্যাবাদী? সুতরাং তোমরা প্রতীক্ষা কর, আমিও তোমাদের সাথে প্রতীক্ষা করছি।' যখন আমার নির্দেশ আসল তখন আমি শুআইব ও তার সঙ্গে যারা ঈমান এনেছিল তাদেরকে আমার অনুগ্রহে রক্ষা করেছিলাম। তারপর যারা সীমালঙ্গন করেছিল মহানাদ তাদেরকে আঘাত করল, ফলে তারা নিজ নিজ ঘরে নতজানু অবস্থায় শেষ হয়ে গেল; যেন তারা সেখানে কখনও বসবাস করে নি। জেনে রেখ, ধ্বংসই ছিল মাদায়েনবাসীদের পরিণাম; যেভাবে ধ্বংস হয়েছিল সামুদ সম্প্রদায়। (সূরা হূদ: ৮৪-৯৫)
সূরা আল-হিজরে লূত আ.-এর সম্প্রদায়ের ঘটনা বর্ণনার পর বলা হয়েছে: (ওয়া ইন কানা আসহাবুল আইকাতি লাজালিমিন। ফানতাক্বামনা মিনহুম অয়া ইন্নাহুমা লাবিইমামিম মুবীন) অর্থাৎ আর আয়কাবাসীরাও তো ছিল সীমালংঘনকারী। সুতরাং আমি ওদেরকে শাস্তি দিয়েছি, এরা উভয়ই তো প্রকাশ্য পথের পাশে অবস্থিত।
সূরা শুআরায় উক্ত ঘটনার পর আল্লাহ বলেন: আইকাবাসীরা রাসূলগণকে অস্বীকার করেছিল, যখন শুআইব ওদেরকে বলেছিল, তোমরা কি সাবধান হবে না? আমি তোমাদের জন্যে এক বিশ্বস্ত রাসূল। সুতরাং আল্লাহকে ভয় কর ও আমার আনুগত্য কর। এর জন্যে আমি তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না। আমার পুরস্কার তো জগতসমূহের প্রতিপালকের কাছেই আছে। মাপে পূর্ণমাত্রায় দেবে; যারা মাপে ঘাটতি করে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না এবং ওজন করবে সঠিক দাঁড়ি-পাল্লায়। লোকদেরকে তাদের প্রাপ্ত বস্তু কম দিবে না এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় ঘটাবে না। এবং ভয় কর তাঁকে, যিনি তোমাদেরকে ও তোমাদের পূর্বে যারা গত হয়েছে তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন।' তারা বলল, তুমি তো জাদুগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত; আমাদের মত একজন মানুষ। আমরা মনে করি, তুমি মিথ্যাবাদীদের অন্যতম। তুমি যদি সত্যবাদী হও, তবে আকাশের এক খণ্ড আমাদের উপর ফেলে দাও। সে বলল, 'আমার প্রতিপালক ভালো জানেন তোমরা যা কর।' তারপর ওরা তাকে প্রত্যাখ্যান করল, পরে ওদেরকে মেঘাচ্ছন্ন দিনের শাস্তি গ্রাস করল। এ তো ছিল এক ভীষণ দিনের শাস্তি। এতে অবশ্যই রয়েছে নিদর্শন, কিন্তু ওদের অধিকাংশই মুমিন নয়। এবং তোমার প্রতিপালক, তিনি তো পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু। (সূরা শুআরা: ১৭৬-১৯১)
(ফাউফুল কাইলা অয়াল মীযানা অয়ালা তাবখাসুন নাসা আশইয়া-আহুম অয়ালা তুফসিদু ফিল আরদি বাদা ইসলাহিহা) অর্থাৎ মাপে ও ওজনে পুরোপুরি দাও। মানুষের প্রাপ্য বস্তু কম দিও না এবং সমাজকে সংস্কারের পর ফিৎনা ফাসাদ সৃষ্টি করো না। (সূরা আরাফ: ৮৫)
এ আয়াতে আল্লাহ তাদেরকে জুলুমের পথ পরিহার করে ইনসাফের পথে চলার নির্দেশ দেন। অন্যথায় তাদেরকে কঠোর শাস্তির ভয় প্রদর্শন করেন। এরপর বলেন: (যালিকুম খইরুল্লাকুম ইন কুনতুম মুমিনীন। অয়ালা তাক্বউদু বিকুল্লি সিরাতিন তূয়িদুন) অর্থাৎ 'তোমরা মুমিন হলে এটাই তোমাদের জন্যে কল্যাণকর এবং ভয় দেখাবার উদ্দেশ্যে প্রতিটি রাস্তায় বসে থেকো না।' অর্থাৎ পথের উপর বসে পথিকদেরকে ভয় দেখিয়ে তাদের সম্পদ ও শুল্ক আদায় করো না।
উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় সাহাবীদের বরাত দিয়ে সুদ্দী রহ. বলেছেন, তারা পথিকদের থেকে তাদের পণ্য দ্রব্যের এক-দশমাংশ টোল আদায় করত। ইসহাক ইবনে বিশর ... ইবনে আব্বাস রাযি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন, শুআইব আ.-এর সম্প্রদায় ছিল সীমালংঘনকারী, বিদ্রোহী। তারা রাস্তার উপরে বসে থাকত 'তাবখাসুন নাসা' অর্থাৎ তারা মানুষের নিকট থেকে তাদের এক-দশমাংশ উসুল করত। এ প্রথা তারাই সর্বপ্রথম চালু করে। (অয়া তাসুদ্দুনা আন সাবীলিল্লাহি মান আমানা বিহি অয়া তাবগু নাহা ইওয়াজা) অর্থাৎ 'আল্লাহর প্রতি যারা ঈমান পোষণ করে তাদেরকে আল্লাহর পথে চলতে বাধা দিও না আর আল্লাহর পথের মধ্যে বক্রতা তালাশ করো না।' আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়ার ডাকাতি ও দীনের ডাকাতি উভয়টা থেকে নিষেধ করে দেন।
(অয়াজকুরু ইয কুনতুম ক্বালীলান ফাকাস্সারাকুম অয়ানযুরু কাইফা কানা আক্বিবাতুল মুফসিদীন) অর্থাৎ 'স্মরণ কর, সেই সময়ের কথা যখন তোমরা সংখ্যায় কম ছিলে। এরপর আল্লাহ তোমাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করে দেন, আর তোমরা লক্ষ্য করে দেখ, ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের পরিণতি কেমন হয়!' (সূরা আ'রাফ: ৮৫-৮৬)
প্রথমে তারা সংখ্যায় কম ছিল, পরে আল্লাহ তাআলাই তাদের বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেন- এই নিয়ামতের কথা তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। এরপর যদি তারা আল্লাহর প্রদর্শিত পথের বিরুদ্ধে যায় তা হলে সে জন্যে যে শান্তি আসবে তার হুমকি দেওয়া হয়।
হে আমার সম্প্রদায়! ন্যায়সঙ্গতভাবে মাপবে ও ওজন করবে। লোকদেরকে তাদের প্রাপ্য বস্তু কম দেবে না এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় ঘটাবে না। যদি তোমরা মুমিন হও, তবে আল্লাহ অনুমোদিত যা বাকি থাকবে তোমাদের জন্যে তাই উত্তম। আমি তোমাদের তত্ত্বাবধায়ক নই। (সূরা হুদ: ৮৪-৮৬)
ইবনে আব্বাস রাযি. ও হাসান বসরী রহ. (বাক্বিয়্যাতুল্লাহি খইরুল্লাকুম)-এর ব্যাখ্যায় বলেছেন : রিযক্বুল্লাহি খইরুম মিন আখযি আমওয়ালিন নাস অর্থাৎ 'আল্লাহ যা কিছু রিযিক তোমাদেরকে দান করেন তা ওই সব সম্পদের তুলনায় অনেক ভালো যা তোমরা মানুষের থেকে জোরপূর্বক আদায় কর।'
ইবনে জারীর রহ. এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন; ওজনে কম দিয়ে মানুষের সম্পদ নেওয়ার চাইতে মাপ ও ওজন সঠিকভাবে পুরোপুরি দেওয়ার পর যা কিছু মুনাফা অবশিষ্ট থাকে, তা-ই তোমাদের জন্যে বহুগুণে উত্তম। ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে এরূপ ব্যাখ্যা বর্ণিত হয়েছে। হাসান বসরী রহ. যে ব্যাখ্যা করেছেন নিম্নের আয়াত তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ : (ক্বুল লা ইয়াসতওয়িল খাবীছু অয়াত তই্যিবু অলাও আজাবাকা কাসরাতুল খাবীছ) অর্থাৎ 'বল, পবিত্র বস্তু ও অপবিত্র বস্তু সমান হয় না, যদিও অপবিত্র বস্তুর আধিক্য তোমার কাছে আকর্ষণীয় হোক না কেন।' অর্থাৎ হালাল জিনিস যদি কমও হয় তবুও তা তোমাদের জন্যে ভালো, হারাম জিনিস থেকে; যদিও তা বেশি হয়। কেন না হালাল জিনিস কম হলেও তা বরকতময়; পক্ষান্তরে হারাম জিনিস বেশি হলেও তা বরকত শূন্য। আল্লাহ বলেছেন: (ইয়ামহাকুল্লাহুর রিবা অইউরবিস সাদাকাত) অর্থাৎ "আল্লাহ সুদকে বিলুপ্ত করেন এবং দান-সদকাকে বৃদ্ধি করেন।"
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: সুদের মাল যতই বেশি হোক না কেন, ক্রমান্বয়ে তা ফুরিয়ে যায়। ইমাম আহমদ রহ. তাঁর মুসনাদে এ হাদিস বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, ক্রয়-বিক্রয়ে ক্রেতা ও বিক্রেতার জন্যে গ্রহণ ও বর্জনের ইখতিয়ার থাকে যতক্ষণ তারা আলাদা হয়ে না যায়। যদি তারা সততার সাথে বেচা-কেনা করে এবং পণ্যের দোষ-গুণ প্রকাশ করে দেয় তা হলে এ ব্যবসায়ে উভয়কে বরকত দান করা হয়। আর যদি তারা পণ্যের দোষ-গুণ গোপন রাখে এবং মিথ্যার আশ্রয় নেয়, তা হলে উভয়ের থেকে এ বেচা-কেনায় বরকত উঠিয়ে নেওয়া হয়। মোটকথা, হালাল মুনাফা কম হলেও তাতে বরকত হয়, কিন্তু হারাম মুনাফা বেশি হলেও তাতে বরকত থাকে না। এ কারণেই নবী শুআইব আ. বলেছিলেন: (বাক্বিয়্যাতুল্লাহি খইরুল্লাকুম ইন কুনতুম মুমিনীন) অর্থাৎ আল্লাহর অনুমোদিত যা-ই বাকি থাকে তা-ই তোমাদের জন্যে উত্তম, যদি তোমরা বিশ্বাসী হও।
আল্লাহর বাণী : (অয়ামা আনা আলাইকুম বিহাফীয) অর্থাৎ 'আমি তোমাদের তত্ত্বাবধায়ক নই' অর্থাৎ তোমাদেরকে আমি যা করার নির্দেশ দিয়েছি তোমরা তা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সওয়াব লাভের উদ্দেশ্যে কর, আমাকে বা অন্যকে দেখাবার জন্যে নয়।
তারা বলল, হে শুআইব! তোমার সালাত কি তোমাকে নির্দেশ দেয়, আমাদের পিতৃ-পুরুষেরা যার ইবাদত করতো আমাদেরকে তা বর্জন করতে হবে এবং আমরা ধন-সম্পদ সম্পর্কে যা করি তাও না? তুমি তো অবশ্যই সহিষ্ণু, সদাচারী। (সূরা হুদ: ৮৭) শুআইব আ.-এর সম্প্রদায় এ কথাটি ঠাট্টা-বিদ্রূপ ও উপহাসস্বরূপ বলেছে। তারা বলেছে, এই যে সালাত তুমি পড়ছ, তা কি তোমাকে আমাদের বিরোধিতা করতে বলে, আমরা কেবল তোমার আল্লাহরই ইবাদত করব এবং আমাদের পূর্ব-পুরুষগণ যাদের ইবাদত করত, তাদেরকে ত্যাগ করে দেব? কিংবা তুমি যেভাবে চাও সেভাবে আমরা আমাদের লেনদেন করব আর যেভাবে চাও না সেভাবে আমাদের পছন্দনীয় লেনদেন, করা ছেড়ে দেব? (ইন্নাকা লা আনতাল হালীমুর রশীদ) অর্থাৎ নিশ্চয় তুমি একজন ধৈর্যশীল, সত্যপন্থী। এ প্রসঙ্গে হযরত ইবনে আব্বাস রাযি., মায়মুন ইবনে মিহরান, ইবনে জুরায়জ, যায়েদ ইবনে আসলাম রাযি. এবং ইবনে জারীর রহ. বলেন, এ উক্তি তারা ঠাট্টা ও বিদ্রূপাত্মকভাবে করেছে।
শুআইব বলল, হে আমার সম্প্রদায়! এ ব্যাপারে তোমরা ভেবে দেখেছ কি, আমি যদি আমার পালনকর্তার সুস্পষ্ট প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকি, আর তিনি যদি আমাকে তাঁর কাছ থেকে উত্তম রিযিক দান করেন, তবে কি করে আমি আমার কর্তব্য থেকে বিরত থাকবো? আমি তোমাদেরকে যা নিষেধ করি, আমি নিজে তা করতে ইচ্ছা করি না। আমি আমার সাধ্যমত সংস্কার করতে চাই। আমার কার্য-সাধন তো আল্লাহরই সাহায্যে। আমি তাঁরই উপর নির্ভর করি এবং আমি তাঁরই অভিমুখী। (সূরা হুদ: ৮৮)
এখানে হযরত শুআইব আ. কোমল ভাষায় কিন্তু সুস্পষ্ট ইংগিতে তাঁর সম্প্রদায়কে সত্যের দিকে দাওয়াত দিচ্ছেন। তিনি বলছেন- তোমরা কি একটু চিন্তা করে দেখেছ, হে মিথ্যাবাদীর দল! (আরায়ইতুম ইন কুনতু আলা বাইয়্যিনাতুম মির রব্বী) অর্থাৎ 'আমি যদি আমার রবের প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকি।' অর্থাৎ আল্লাহর সুস্পষ্ট নির্দেশের উপর, তিনি আমাকে তোমাদের নিকট রাসূলরূপে প্রেরণ করেছেন: (অয়ারযাক্বানী মিনহু রিযক্বান হাসানান) অর্থাৎ 'এবং তাঁর কাছ থেকে আমাকে উত্তম রিযিক দান করেছেন' উত্তম রিযিক অর্থ নবুয়ত ও রিসালাত। অর্থাৎ তোমরা যদি তা বুঝতে না পার, তবে তোমাদের ব্যাপারে আমার আর কি করার আছে? এ কথাটি ঠিক তদ্রূপ যা নূহ আ. তাঁর জাতিকে বলেছিলেন: (অয়ামা উরীদু আন উখালিফাকুম ইলা মা আনহাকুম আনহু) অর্থাৎ 'যে কাজ করতে আমি তোমাদেরকে নিষেধ করি আমি সে কাজ নিজে করতে ইচ্ছা করি না।' অর্থাৎ তোমাদেরকে যে কাজ করতে আদেশ করি সে কাজ সর্বপ্রথম আমিই করি; আর যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করি তা থেকে সর্বপ্রথম আমি-ই বিরত থাকি। বস্তুত পক্ষে এটা একটা উৎকৃষ্ট ও মহৎ গুণ। এর বিপরীত আচরণ অত্যন্ত জঘন্য ও নিকৃষ্ট। বনি ইসরাঈলের শেষ দিকের আলেম ও ধর্মোপদেশদাতারা এই দোষে দুষ্ট ছিলেন। আল্লাহ বলেন: (আতা-মুরুনান নাসা বিলবিররি অয়া তানসওনা আনফুসাকুম অয়ানতুম তাতলুনাল কিতাবা আ-ফালা তাক্বিলুন) অর্থাৎ 'তোমরা কি মানুষকে সৎকর্মের আদেশ দাও এবং নিজেদেরকে বিস্মৃত হও? অথচ তোমরাই তো কিতাব অধ্যয়ন করো। তবে কি তোমরা বুঝ না?' (সূরা বাকারা: ৪৪)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় সহি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে দোযখে নিক্ষেপ করা হবে। তার পেট থেকে নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যাবে এবং তা নিয়ে সে ঘুরপাক খেতে থাকবে, যেমনটি গাধা আটা পেষার চাক্কি নিয়ে চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। দোযখবাসীরা বলবে, তুমি না দুনিয়াতে আমাদেরকে সৎকাজের আদেশ দিতে এবং অসৎকাজে নিষেধ করতে? সে বলবে, হ্যাঁ, আমি সৎকাজের আদেশ করতাম, কিন্তু নিজে তা করতাম না এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করতাম, কিন্তু আমি নিজেই তা করতাম। এ আচরণ নবীদের নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী- পাপিষ্ঠ ও দুর্বৃত্তদের নীতি। পক্ষান্তরে জ্ঞানী-গুণী ওলামা যাঁরা না দেখেই আল্লাহকে ভয় করে চলে, তাঁদের অবস্থা হয় সেই রকম, যেমন নবী শুআইব আ. বলেছেন: (অয়ামা উরীদু আন উখালিফাকুম ইলা মা আনহাকুম আনহু ইন্ উরীদু ইল্লাল ইসলাহা মাসতাতাতু) অর্থাৎ "আমার যাবতীয় কর্মতৎপরতার উদ্দেশ্য হল, সাধ্য অনুযায়ী কথা ও কাজের সংশোধন ও সংস্কার করা। (অয়ামা তাউফীক্বী ইল্লা বিল্লাহি আলাইহি তাওয়াক্কালতু অয়া ইলাইহি উনীব) অর্থাৎ- 'সর্বাবস্থায় আল্লাহই আমাকে সাহায্য ও ক্ষমতা দান করবেন। সকল বিষয়ে তাঁর উপরই আমি ভরসা রাখি এবং সকল ব্যাপারে তাঁর দিকেই আমি প্রত্যাবর্তন করি।' এ হল তারগীব বা উৎসাহ প্রদান। এরপর হযরত শুআইব আ. কিছুটা তারহীব বা ধমকের সুরে বলেন: হে আমার সম্প্রদায়! আমার বিরোধিতা যেন কিছুতেই তোমাদেরকে এমন অপরাধ না করায়, যাতে তোমাদের উপর তার অনুরূপ বিপদ আসবে, যেরূপ বিপদ আপতিত হয়েছিল কওমে নূহ, কওমে হূদ কিংবা কওমে সালেহের উপর আর কওমে লূত তো তোমাদের থেকে খুব দূরে নয়। (সূরা হূদ: ৮৯)
এরপর ভয় ও আগ্রহ সৃষ্টি সমন্বিত আহ্বানস্বরূপ বলেন: (অয়াসতাগফিরু রব্বাকুম ছুম্মা তুবু ইলাইহি ইন্না রব্বী রহীমু অয়াদূদ) অর্থাৎ 'তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, তাঁর কাছে তওবা কর। আমার প্রতিপালক নিশ্চয় দয়ালু প্রেমময়।' (সূরা হৃদ: ৯০) অর্থাৎ তোমরা যেসব অপরাধে জড়িত আছ, তা বর্জন কর এবং দয়াময় প্রেমময় প্রতিপালকের নিকট তওবা কর। কেন না, যে ব্যক্তি তাঁর কাছে তওবা করে, তিনি তার তওবা কবুল করেন। কারণ সন্তানের প্রতি মাতার স্নেহের চেয়ে বান্দাহর প্রতি আল্লাহর দয়া অধিকতর।
তারা বলল, হে শুআইব! তুমি যা বল তার অধিকাংশ আমরা বুঝি না, আমরা তো তোমাকে আমাদের মধ্যে দুর্বল- শক্তিহীন দেখতে পাচ্ছি। (সূরা হূদ: ৯১) ইবনে আব্বাস, সাঈদ ইবনে জুবায়র রাযি. ও সাওরি রহ. বলেছেন, হযরত শুআইব আ.-এর চোখে দৃষ্টিশক্তি ছিল না। মারফু হাদিসে বর্ণিত, আল্লাহর মহব্বতে নবী শুআইব আ. এত অধিক পরিমাণ কান্নাকাটি করেন, তিনি অন্ধ হয়ে যান। আল্লাহ তাঁর দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেন। আল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, হে শুআইব! তোমার কান্নাকাটি কি জাহান্নামের ভয়ে, নাকি জান্নাতের লোভে? শুআইব আ. বলেন বরং আপনার মহব্বতেই কাঁদি। আমি যখন আপনাকে দেখব, তখন আমার প্রতি কি করা হবে তার পরোয়া আমি করি না। আল্লাহ তখন অহির মাধ্যমে জানালেন, হে শুআইব! আমার সাথে তোমার সাক্ষাৎ খুবই আনন্দময় হবে। এ জন্যে আমি ইমরানের পুত্র মূসা কালীমুল্লাহকে তোমার খিদমতে নিয়োগ করেছি।
তোমার আত্মীয়বর্গ না থাকলে আমরা তোমাকে পাথর মেরে হত্যা করতাম। তুমি আমাদের উপর শক্তিশালী নও। (সূরা হৃদ: ৯১) শুআইব আ. বললেন: (ক্বালা ইয়া ক্বাওমি আরহতী আআয্যু আলাইকুম মিনাল্লাহি) অর্থাৎ হে আমার সম্প্রদায়! আমার আত্মীয়-স্বজন কি আল্লাহর চাইতেও তোমাদের উপর অধিক শক্তিশালী? অর্থাৎ তোমরা আমার গোত্র ও স্বজনদেরকে ভয় কর এবং তাদের কারণে আমাকে খাতির করছ, অথচ আল্লাহর পাকড়াওকে ভয় করছ না এবং আল্লাহর রাসূল হওয়ার কারণে আমাকে খাতির করছ না। ফলে প্রমাণিত হচ্ছে, আমার গোত্র ও আত্মীয়-স্বজনই তোমাদের উপর আল্লাহর চাইতে অধিক শক্তিশালী। (অয়াত্তাখাজতুমুহু অয়া-রাআকুম জিহরিইয়ান) অর্থাৎ আর আল্লাহকে তোমরা পশ্চাতে ফেলে রেখেছ অর্থাৎ আল্লাহর দিকে তোমরা পিঠ দিয়ে রেখেছে। (ইন্না রব্বী বিমা তামালূনা মুহীত) অর্থাৎ তোমরা যা-ই কর, আমার প্রতিপালক তা পরিবেষ্টন করে আছেন। অর্থাৎ তোমরা যা কিছু কাজ-কর্ম কর না কেন, সে সব বিষয়ে আল্লাহ পূর্ণভাবে অবগত আছেন। যখন তাঁর কাছে ফিরে যাবে, তখন তিনি এর প্রতিফল দান করবেন।
হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা নিজ নিজ অবস্থার উপর থেকে কাজ কর, আমি আমার কাজ করতে থাকি। অচিরেই জানতে পারবে, আযাব কার উপর আসে, যা তাকে লাঞ্ছিত করে ছাড়বে? এবং আরও জানতে পারবে যে, মিথ্যাবাদী কে? তোমরা অপেক্ষা কর, আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষায় থাকলাম। (সূরা হূদ: ৯৩)
আমি যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছি তাতে যদি তোমাদের কোনো দল বিশ্বাস করে এবং কোনো দল বিশ্বাস না করে, তবে ধৈর্যধারণ কর, যতক্ষণ না আল্লাহ আমাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেন। আর তিনিই শ্রেষ্ঠ মীমাংসাকারী। তার সম্প্রদায়ের দাম্ভিক প্রধানরা বলল, 'হে শুআইব। তোমাকে ও তোমার সাথে যারা বিশ্বাস করেছে তাদেরকে আমাদের জনপদ থেকে বের করে দেবই। অথবা তোমাদেরকে আমাদের ধর্মাদর্শে ফিরে আসতে হবে।' সে বলল, আমরা তা ঘৃণা করলেও? তোমাদের ধর্মাদর্শ থেকে আল্লাহ আমাদেরকে উদ্ধার করার পর যদি আমরা তাতে ফিরে যাই তবে তা আমরা আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করব। আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ ইচ্ছা না করলে আর ওতে ফিরে যাওয়া আমাদের কাজ নয়। সব কিছুই আমাদের প্রতিপালকের জ্ঞানায়ও। আমরা আল্লাহর প্রতি নির্ভর করি; হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ও আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে ন্যায্যভাবে মীমাংসা করে দিন এবং আপনিই মীমাংসাকারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। (সূরা আরাফ: ৮৭-৮৯) এভাবে হযরত শুআইব আ. তাঁর সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করেন। আর আল্লাহর রাসূলদের যারা অস্বীকার করে, অবাধ্য হয় ও বিরুদ্ধাচরণ করে তাদের বিরুদ্ধে রাসূলদের প্রার্থনা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন না। কিন্তু এতদসত্ত্বেও সম্প্রদায়ের লোক যে নীতির উপর ছিল তার উপরই তারা অটল অবিচল হয়ে রইল।
আল্লাহর বাণী: (ফাউখাজাত হুমুর রাজফাতু ফাসবাহু ফী দারিহিম জাছিমিন) অর্থাৎ 'অনন্তর তাদেরকে ভূমিকম্প পাকড়াও করল। ফলে তারা সকালবেলায় ঘরের মধ্যে উপুড় হয়ে পড়ে রইল।' (সূরা আ'রাফ: ৯০-৯১) সূরা আরাফে বলা হয়েছে, ভূমিকম্প তাদেরকে পাকড়াও করেছিল। এক মহাকম্পন তাদের গোটা আবাসভূমিকে সজোরে আঘাত করে। ফলে তাদের দেহ থেকে রূহ উধাও হয়ে যায়। গোটা এলাকার জীব-জন্তর মতো নিশ্চল হয়ে পড়ে। তাদের শবদেহগুলো নিথর হয়ে যত্রতত্র পড়ে থাকে। উক্ত জনগোষ্ঠীর উপর আল্লাহ বিভিন্ন প্রকার আযাব ও শাস্তি নাযিল করেন। যখন তারা বিভিন্ন প্রকার অন্যায় ও জঘন্য পাপাচারে লিপ্ত হল, তখন আল্লাহ তাদের উপর মহাকম্পন পাঠালেন। যার ফলে সকল চলাচল মুহূর্তে বন্ধ হয়ে যায়। বিকট আওয়াজ পাঠান যার ফলে অপর সকল আওয়াজ নীরব হয়ে যায়। আগুনের মেঘ পাঠান, যার লেলিহান শিখা চতুর্দিক থেকে তাদেরকে বেষ্টন করে ফেলে।
বিভিন্ন সূরায় আলোচনার পূর্বাপরের সাথে সামঞ্জস্য রেখে যেখানে যেমন প্রয়োজন আল্লাহ সেখানে ততটুকুই উল্লেখ করেছেন। সূরা আরাফের বক্তব্যে কাফের সর্দাররা আল্লাহর নবী ও তাঁর সাথীদেরকে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে। এলাকা থেকে বহিষ্কারের হুমকি দেয় বা তাদেরকে তাদের পূর্বের কুফরি ধর্ম গ্রহণ করতে হবে। এই পটভূমিতে আল্লাহ বলেন: (ফাউখাজাত হুমুর রাজফাতু ফাসবাহু ফী দারিহিম জাছিমিন) অর্থাৎ 'এরপর ভূমিকম্প তাদেরকে আঘাত করল। ফলে তারা তাদের ঘরের মধ্যে উপুড় হয়ে পড়ে রইল।' এখানে তাদের বহিষ্কারের হুমকি ও ধমকের মোকাবিলায় ভূমিকম্পের কথা এবং ভীতি প্রদর্শনের মোকাবিলায় ভয়ের কথা বলা হয়েছে। সুতরাং পূর্বাপর আলোচনার সাথে সামঞ্জস্য রক্ষিত হয়েছে। অপর দিকে সূরা হূদে বলা হয়েছে- এক বিকট শব্দ তাদেরকে আঘাত করে। ফলে তারা নিজেদের ঘর-বাড়িতে উপুড় হয়ে পড়ে থাকে। আল্লাহ বলেন: (ফাকাজ্জাবূহু ফাউখাজাহুম আযাবু ইয়াওমিয জুল্লাতি ইন্নাহু কানা আযাবা ইয়াওমিন আযীম) অর্থাৎ এরপর তারা তাকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করলো। ফলে তাদেরকে মেঘাচ্ছন্ন দিবসের আযাব পাকড়াও করল। নিশ্চয়ই সেটা ছিল এক ভীষণ দিবসের আযাব। (সূরা শুআরা: ১৮৯)
মুফাসসিরগণ বলেছেন: শুআইব আ.-এর সম্প্রদায় প্রচণ্ড গরমে আক্রান্ত হয়। আল্লাহ সাত দিন পর্যন্ত তাদের ওপর বায়ু প্রবাহ বন্ধ রাখেন। ফলে পানি, ছায়া ও ঝর্ণাধারা তাদের কোনো কাজে আসে নি। তখন তারা ঘর-বাড়ি ছেড়ে উন্মুক্ত প্রান্তরে চলে যায়। এক টুকরো মেঘ এসে তাদেরকে ছায়াদান করে। সম্প্রদায়ের সবাই ঐ মেঘের ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণের উদ্দেশ্যে সমবেত হয়। সকলে যখন সমবেত হল তখন আল্লাহ তাদের উপর অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ও জ্বলন্ত অঙ্গার নিক্ষেপ করেন। গোটা এলাকায় প্রচণ্ড ভূমিকম্প হয় এবং আকাশ থেকে এক ভয়াবহ নাদ আসে। ফলে সকলের প্রাণ বায়ু উড়ে যায়, ঘরবাড়ি উজাড় হয়ে যায়। যারা শুআইব আ.-কে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করেছিল, তারা এভাবে নিশ্চিহ্ন হলো, এখানে যেন তারা কোনো দিনই বসবাস করে নি। যারাই শুআইব আ.-কে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করেছে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হল। পক্ষান্ত রে আল্লাহ শুআইব আ.-কে ও তাঁর সঙ্গের মুমিনদের আযাব থেকে রক্ষা করেন। আল্লাহ বলেন: যখন আমার নির্দেশ এল, তখন আমি শুআইব ও তার সঙ্গী ঈমানদারগণকে আমার অনুগ্রহে রক্ষা করেছিলাম। তারপর যারা সীমালংঘন করেছিল, মহানাদ তাদেরকে আঘাত হানলো। ফলে তারা নিজ নিজ ঘরে উপুড় হয়ে পড়ে রইল। যেন তারা সেখানে কখনও বসবাসই করে নি। জেনে রেখো, ধ্বংসই ছিল মাদায়েনবাসীদের পরিণাম, যেভাবে ধ্বংস হয়েছিল সামুদ সম্প্রদায়। (সূরা হৃদ: ৯৪-৯৬)
সম্প্রদায়ের ধ্বংসের পর হযরত শুআইব আ. দুঃখ করে যে কথা বলেছিলেন সে প্রসঙ্গে আল্লাহর বাণী: 'হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদেরকে আমার প্রতিপালকের পয়গাম পৌঁছিয়ে দিয়েছি এবং তোমাদের উপদেশ দিয়েছি। এখন আমি কাফের সম্প্রদায়ের জন্যে কী করে আক্ষেপ করি।' (সূরা আ'রাফ: ৯৩)
অর্থাৎ তাদের ধ্বংসের পরে তিনি তাদের এলাকা থেকে এই কথা বলে চলে আসেন যে, (ইয়া ক্বাওমি লাক্বাদ আবলাগতু-কুম রিসালাতি রব্বী অয়ানাসাহতু লাকুম) অর্থাৎ হে আমার সম্প্রদায়! আমি আমার প্রতিপালকের পয়গাম পৌঁছিয়ে দিয়েছি এবং তোমাদেরকে উপদেশ দান করেছি। অর্থাৎ, আল্লাহর পয়গাম পৌঁছিয়ে দেওয়ার ও উপদেশ দেওয়ার যে দায়িত্ব আমার ওপর অর্পণ করা হয়েছিল তা আমি পূর্ণরূপে আদায় করেছি। তোমাদের হেদায়েতের জন্যে আমি সাধ্যমত চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমার এ সব প্রচেষ্টা তোমাদের কোনো উপকারে আসে নি। কেন না যে ব্যক্তি ভ্রান্ত পথে চলে আল্লাহ তাকে হেদায়েত করেন না। আর তার কোনো সাহায্যকারীও থাকে না। অতএব, এরপর আমি তোমাদের ব্যাপারে আক্ষেপ করব না।
হাফেয ইবনে আসাকির রহ. তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে হযরত ইবনে আব্বাস রাযি.-এর উক্তি উল্লেখ করেছেন- হযরত শুআইব আ. হযরত ইউসুফ আ.-এর পরবর্তীকালের লোক। ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ রহ. থেকে বর্ণিত, হযরত শুআইব আ. ও তাঁর সঙ্গী মুমিনগণ সকলেই মক্কা শরীফে ইনতিকাল করেন এবং তাঁদের কবর কাবা গৃহের পশ্চিম পাশে দারুন নদওয়া ও দারে বনি সাহমের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত।
📄 শুআইব আ.-এর কবর
হাযরা মাউত নামক স্থানে একটি কবর রয়েছে, যা বিশিষ্ট ও সাধারণ সকল মুসলমানের যেয়ারতের স্থান হয়ে রয়েছে। তথাকার অধিবাসীদের দাবি- এটি হযরত শুআইব আ.-এর মাযার। হযরত শুআইব আ. মাদায়েন ধ্বংস হয়ে গেলে এখানে এসে বসতি করেন। এখানেই তাঁর ইনতেকাল হয়। হাযরা মাউতের বিখ্যাত শহর 'শিউন'-এর পশ্চিম দিকে একটি জায়গা আছে যাকে 'শাবাম' বলে। সেখানে যদি কোনো ভ্রমনকারী 'ওয়াদিয়ে ইবনে আলী'র পথ ধরে উত্তর দিকে চলতে থাকে, তবে উক্ত ওয়াদীর পরে সেই স্থানটি আসে, যেখানে এই কবরটি অবস্থিত। এখানে কোনো বসতি নেই। যারাই এখানে আসে শুধু যিয়ারতের উদ্দেশ্যেই এসে থাকে। আবদুল ওয়াহাব নাজ্জার বলেন, আমার সন্দেহ রয়েছে, এটা হযরত শুআইব আ.-এর কবর কি না। কিন্তু তিনি এই সন্দেহের কোনো কারণ বর্ণনা করেন নি।