📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 শুআইব আ.-এর কওম

📄 শুআইব আ.-এর কওম


হযরত শুআইব আ. মাদায়েনে নবীরূপে প্রেরিত হয়েছিলেন। মাদায়েন কোনো স্থানের নাম নয়; একটি গোত্রের নাম। এ গোত্রের নামানুসারেই তাদের বস্তিটির নাম মাদায়েন বলে বিখ্যাত হয়েছিল। এ গোত্রটি হযরত ইবরাহীম আ.-এর পুত্র মাদইয়ানের বংশ হতে উদ্ভূত। হযরত ইবরাহমী আ.-এর তৃতীয় স্ত্রী কাতুরার গর্ভে মাদইয়ানের জন্ম হয়। এতে হযরত ইবরাহীম আ.-এর এ গোত্র বনি কাতুরা নামে অভিহিত হয়।
"মাদইয়ান তার স্ত্রী পুত্র পরিজনসহ নিজের বৈমাত্রেয় ভাই হযরত ইসামঈল আ.-এর পার্শ্বেই হেজাযে বসবাস করত। এই খান্দানই পরবর্তীকালে একটি বিরাট গোত্র বা গোষ্ঠীর রূপ ধারণ করেছিল। শুআইব আ. যেহেতু এই খান্দান ও গোত্রেরই ছিলেন। সুতরাং তাঁর নবীরূপে প্রেরিত হওয়ার পর হতে এই গোত্রটি "কওমে শুআইব” নামে অভিহিত হতে লাগল।
শুআইব আ.-এর নসবনামায় বিভিন্ন মত দেখতে পাওয়া যায়। কেউ বলেন, শুআইব ইবনে য়াশখার ইবনে লাবায় ইবনে ইয়াকূব। কেউ বলেছেন, শুআয়ব ইবনে নুওয়াব ইবনে আয়ফা ইবনে মাদইয়ান ইবনে ইবরাহীম। কারও মতে, শুআয়ব ইবনে দায়ফুর ইবনে আয়ফা ইবনে ছাবিত ইবনে মাদইয়ান ইবনে ইবরাহীম। এ ছাড়া আরো বিভিন্ন মত রয়েছে।
আবু উমর ইবনে আবদুল বার রহ, 'ইসতিআব' গ্রন্থে সালামা ইবনে সাদ আল আনাযী প্রসঙ্গে লিখেছেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আগমন করেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন। এরপর আনাযা পর্যন্ত তিনি তাঁর বংশ পঞ্জিকাও উল্লেখ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কতই না উত্তম এ আনাযা গোত্র, তারা ছিল নির্যাতিত এবং এরাই সেই সাহায্যপ্রাপ্ত শুআইবের অনুসারী এবং মূসা আ.-এর শ্বশুর গোষ্ঠী। এ বর্ণনা সঠিক হলে প্রমাণিত হয়, হযরত শুআইব মূসা আ.-এর সমগোত্রীয় এবং তিনি আদি আরবদের অন্তর্ভুক্ত। তাঁর কবিলার নাম আনাযা। তবে এরা আনাযা ইবনে আসাদ ইবনে রবিয়া ইবনে নাযার ইবনে মাদ ইবনে আদনান গোত্র নয়। কেন না, এই আনাযা উপরোক্ত আনাযার দীর্ঘকাল পরে এসেছে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
সহি ইবনে হিব্বান গ্রন্থে আমবিয়া ও রসূলগণের বিবরণ অধ্যায়ে হযরত আবু যর রাযি.-এর বর্ণিত একটি হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: আবু যর, নবীদের মধ্যে চারজন নবী আরবের। যথা- হুদ, সালেহ, শুআইব ও তোমাদের নবী।
কোনো কোনো প্রাচীন বিজ্ঞ আলেম হযরত শুআইব আ.-কে 'খতিবুল আম্বিয়া' বলে আখ্যায়িত করেছেন। কেন না, তিনি তাঁর সম্প্রদায়কে ঈমান গ্রহণের জন্যে যে দাওয়াত পেশ করেন তার শব্দ ও ভাষা ছিল অতি উচ্চাঙ্গের এবং বক্তব্য ও উপস্থাপনা ছিল অতি প্রাঞ্জল ও হৃদয়গ্রাহী। ইবনে ইসহাক রহ. ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই হযরত শুআইব আ.-এর উল্লেখ করতেন তখনই তিনি বলতেন : তিনি ছিলেন খতিবুল আম্বিয়া (নবীগণের খতীব)।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 মাদায়েন বা আসহাবে আইকাহ

📄 মাদায়েন বা আসহাবে আইকাহ


মাদায়েনবাসী বা আসহাবে আইকার অবস্থান স্থল সম্পর্কে আবদুল ওয়াহাব নাজ্জার বলেন, এরা মূলকে হেজাযে শামের সঙ্গে সম্মিলিত এমন এক স্থানে থাকত। যার পরিধি আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মরুভূমির পরিধি বরাবর অবস্থিত। কেউ কেউ বলেন, শামের সঙ্গে মিলিত 'মাআন' নামক ভূখণ্ডে বসবাস করত। কুরআন মাজিদ এ গোত্রের বাসভূমি সম্বন্ধে দুইটি কথা জানিয়ে দিয়েছে। ১. তারা ইমামে মুবিনের উপর বসবাস করত। যেমন কোরআনে উল্লেখ আছে : (ওয়া ইন্নাহুমা লা-বি-ইমামিম মুবীন) অর্থাৎ, “কওমে লূত ও কওমে মাদায়েন উভয় কওমই এক বিরাট রাজ সড়কের পার্শ্বে বসবাস করত।"
আরব দেশের ভূগোলে যেই রাজ সড়কটি হেজাযের ব্যবসায়ী কাফেলাগুলিকে শাম, ফিলিস্তিন, ইয়ামান বরং মিসর পর্যন্ত নিয়ে যায় এবং লোহিত সাগরের পূর্ব তীর দিয়ে চলে যেত; কুরআন মাজিদ সেই সড়কটিকে 'ইমামে মুবীন অর্থাৎ, মুক্ত ও পরিষ্কার রাজসড়ক বলছে। কেন না, সাইফ (গ্রীষ্মকাল) এবং শিতা (শীতকাল) উভয় মৌসুমেই কোরাইশ সম্প্রদায়ের ব্যবসায়ী কাফেলাগুলির জন্য এটা বিখ্যাত ও বিরাট বাণিজ্য পথ ছিল। তাদের অত্যধিক যাতায়াতে পথটির স্থলভাগের সীমা জলভাগের সীমারেখার সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে যায়।
'আসহাবে আইকা'কে ঝোপ ঝাড়ের অধিবাসী বলেও অভিহিত হত! আরবি ভাষায় 'আইকা' সবুজ বনের ঝোপ ঝাড়কে বলা হয়। যা সবুজ ও সতেজ বৃক্ষলতার প্রাচুর্যের দরুন বন-জঙ্গলে উৎপন্ন হয়ে থাকে এবং ঝোপের আকৃতি ধারণ করে। এ দুইটি কথা জেনে নেওয়ার পর মাদায়েন গোত্রের বসতির সন্ধান সহজেই জানা যেতে পারে। তা হল মাদায়েন গোত্রটি লোহিত সাগরের পূর্ব তীরে এবং আরব দেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে এমন জায়গায় বসবাস করত যা শামদেশের সাথে সংযুক্ত হিজাজের শেষাংশ বলা যেতে পারে। আর হিজাজবাসীরা শাম, ফিলিস্তিন বরং মিসর পর্যন্ত যাতায়াতকালে 'আসহাবে মাদায়েনের' বস্তির ভগ্নাবশেষগুলি পথে পড়ত যা তাবুকের বিপরীত দিকে অবস্থিত ছিল।
তাফসিরকারকগণ এ সমন্ধে বিভিন্ন প্রকার মত পোষণ করেন 'আছহাবে মাদইয়ান' এবং আসহাবে আইকা' একই গোত্রের দুইটি নাম, না কি এরা দুটি পৃথক পৃথক গোত্র? কারো মতে এরা দুটি পৃথক পৃথক গোত্র। মাদায়েন ছিল একটি সভ্য ও শহরী গোত্র। আর আসহাবে আইকা ছিল গ্রাম্য ও যাযাবর গোত্র। যারা বনে জঙ্গলে বসতি করত। এ কারণে তাদেরকে 'আসহাবে আইকা' অর্থাৎ বন-জঙ্গলের অধিবাসী বলা হয়েছে। এই মতাবলম্বী তাফসিরকারকদের মতে (ওয়া ইন্নাহুমা লা-বি-ইমামিম মুবীন) আয়াতে দ্বিবচনের সর্বনামটির লক্ষ্যস্থলে এ দুইটি গোত্র অর্থাৎ মাদায়েন ও আসহাবে আইকা উদ্দেশ্য; মাদায়েন এবং কওমে লূত নয়।
অন্য তাফসিরকারকগণ গোত্র দুটিকে একই গোত্র সাব্যস্ত করে বলেন, জলবায়ুর পরিচ্ছন্নতা-পবিত্রতা ও নদী-নালার প্রাচুর্য এ স্থানটিকে এতই সরস ও মনোমুগ্ধকর করে দিয়েছিল এবং এখানে ফল, মেওয়া ও সুগন্ধিযুক্ত ফুলের এত বাগবাগিচা ছিল, যদি কেউ বস্তির বাইরে দাঁড়িয়ে তার দৃশ্য অবলোকন করত, তবে তার বোধ হত এটা যেন অতি সুন্দর ও সরস ঘন বৃক্ষরাজির একটি ঝোপ। এ কারণেই কুরআন মাজিদ এটাকে আইকা বলে পরিচয় দিয়েছে। এ তাফসিরকারকগণের মধ্যে হাফেয ইবনে কাসীরের ধারণা হলো, এ বসতিতে 'আইকা' নামে একটি বৃক্ষ ছিল। গোত্রের লোকেরা যেহেতু উক্ত বৃক্ষের পূজা করত; এ সম্পর্কের কারণে মাদায়েন গোত্রকেই আসহাবে আইকা বলা হয়েছে। তা ছাড়া এ সম্বন্ধটি বংশের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল না; বরং ধর্মসংক্রান্ত সম্বন্ধ ছিল। তবে প্রবল অভিমত হলো- মাদায়েন ও আসহাবে আইকা একই গোত্র। যাদেরকে পৈত্রিক সম্পর্কের কারণে মাদায়েন বলা হয়েছে। আর বসত ভূমির স্বাভাবিক ও ভৌগোলিক অবস্থান হিসাবে তারা 'আসহাবে আইকা' নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 সত্যের ডাক

📄 সত্যের ডাক


হযরত শুআইব আ. নিজ কওমের কাছে নবী হিসেবে প্রতি প্রেরিত হয়েছেন। তিনি দেখতে পেলেন, আল্লাহ তাআলার নাফরমানি ও পাপানুষ্ঠান শুধু গুটিকতক লোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং গোটা কওমই ধ্বংসের ঘূর্ণিপাকে আক্রান্ত ও লিপ্ত। তারা নিজেদের অসৎ কর্মে এতই মত্ত রয়েছে, মুহূর্তের জন্যও তাদের এই অনুভব হত না, তাদের কৃতকার্যসমূহ নাফরমানি ও গুনাহের কাজ। বরং তারা তাদের ঐ কার্যসমূহকে গর্বের বিষয় বলে মনে করত। তাদের ভূরিভূরি অসৎকাজ ও নাফরমানির দিকে দৃষ্টিপাত না করলেও কেবল যে সমস্ত মন্দকার্য বিশেষভাবে তাদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। তা হলো- ১. মূর্তিপূজা ও মুশরিকি রীতিনীতি। ২. ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্যে নিজে পূর্ণ মাত্রায় মেপে নেওয়া এবং অপরকে দেওয়ার সময় ওযনে কম দেওয়া। ৩. তারা অন্যের সম্পদ ডাকাতি করত।
কওমসমূহের সাধারণ রীতি অনুসারে প্রকৃতপক্ষে তাদের শান্তি, স্বচ্ছলতা ধন-দৌলতের প্রাচুর্য, জমিন ও বাগ-বাগিচার উৎপাদন শক্তি বা উর্বরতা এবং সতেজতা ও সরসতা তাদের এত গর্বিত করে দিয়েছিল, তারা ঐ সমস্ত বিষয়কে নিজেদের ব্যক্তিগত উত্তরাধিকার এবং বংশগত কৌশল মনে করে বসেছিল। এক মুহূর্তের জন্যও তাদের অন্তরে এ ধারণা উদয় হত না, এ সবকিছুই বিশ্বপালক আল্লাহ তাআলার দান। তা হলে তারা শোকর আদায় করত এবং অবাধ্যতাচরণ থেকে বিরত থাকত। তাদের এই নিশ্চিন্ততা তাদের মধ্যে বিভিন্ন রকমের অসৎ চরিত্রতা এবং নানা প্রকারের দোষ সৃষ্টি করে দিয়েছিল।
অবশেষে আল্লাহ পাকের আত্মমর্যাদাবোধ নাড়া দিয়ে উঠল। আল্লাহ পাকের রীতি অনুসারে তাদেরকে সত্য পথ দেখাবার, পাপানুষ্ঠান ও অসৎ কার্যাবলী হতে রক্ষা করার এবং আমানতদার, পরহেযগার ও চরিত্রবান বানাবার জন্য তাদেরই মধ্য হতে একজনকে মনোনীত করে নবুয়ত ও রিসালত প্রদান করে তাঁকে ইসলামের দাওয়াত প্রদান এবং আল্লাহ পাকের পয়গাম পৌঁছাবার জন্য ইমাম নিযুক্ত করে দিলেন। তিনি হযরত শুআইব আ.। আল্লাহ তাআলার একত্ববাদ এবং শিরকের প্রতি অসন্তোষের আকিদা তো সমস্ত আম্বিয়ামে কেরামের শিক্ষার ভিত্তি ও মূল। যার অংশ হযরত শুআইব আ.-ও প্রাপ্ত হয়েছিলেন। কিন্তু কওমের বিশেষ বিশেষ অসৎ চরিত্রাবলী থেকে বিরত থাকার জন্য সর্তকবাণী এবং তাদেরকে সৎপথে আনয়নের জন্য তিনি এই বিধানের প্রতিও গুরুত্ব প্রদান করলেন, ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যাপারে এ কথার প্রতি সর্বদা লক্ষ্য রাখতে হবে, প্রত্যেকের প্রাপ্য হক প্রত্যেকে পূর্ণ মাত্রায় দিতে হবে। কেন না, পার্থিব কাজ-কারবারে এটা এমন একটি ভিত্তি, যা টলটলায়মান হয়ে পড়লে সর্বপ্রকার যুলুম, পাপানুষ্ঠান, অসৎ কার্যাবলী এবং মারাত্মক দোষসমূহ ও মন্দ চরিত্রাবলীর কারণ হয়ে যায়।
সারকথা, হযরত শুআইব আ.-ও নিজ কওমের অসৎ কার্যাবলী দেখে অত্যন্ত দুঃখ অনুভব করলেন এবং সৎপথ ও হেদায়েত শিক্ষা প্রদান করে কওমকে ঐ সমস্ত মূলনীতির প্রতিই আহবান করলেন, যা আম্বিয়ায়ে কেরামের দাওয়াত ও নসিহতের সারমর্ম। তিনি বললেন, “হে আমার কওম! (মূর্তিপুজা ছেড়ে) আল্লাহ তাআলার ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত আর কোনো বস্তুই ইবাদতের যোগ্য নয়। ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যাপারে ওযন ও মাপ পুরাপুরি এবং সঠিক রাখ। আর মানুষের সাথে কাজে-কারবারে কৃত্রিমতা করো না। গতকাল পর্যন্ত হয়তো তোমরা এ সমস্ত অসৎ চরিত্রতার মন্দ পরিণামের অবস্থা জানতে পারো নি, কিন্তু আজ তোমাদের নিকট আল্লাহ তাআলার প্রমাণ ও নিদর্শন এসে পৌঁছেছে। এখন আর অজ্ঞতা ও না-জানা ক্ষমার যোগ্য হবে না। সত্যকে গ্রহণ কর এবং বাতিল ও মিথ্যা হতে নিবৃত্ত হও। এটাই সফলকাম হওয়ার একমাত্র পথ। আর খোদার যমিনে ফেতনা ফাসাদ ও অনর্থ সৃষ্টি করো না, যখন আল্লাহ তাআলা এতে কল্যাণ ও মঙ্গলের সমস্ত উপকরণ প্রস্তুত করে দিয়েছেন। যদি তোমাদের মধ্যে ঈমান ও বিশ্বাসের সত্যতা বিদ্যমান থাকে তবে বুঝে নাও, এটা কল্যাণ ও মঙ্গলের পথ। আর দেখ, এরূপ কখনও করো না, সত্য প্রচারের পথকে বন্ধ করার জন্য এবং মানুষকে লুণ্ঠন করার জন্য প্রত্যেক পথের উপর গিয়ে বস এবং যে ব্যক্তিই ঈমান আনে তাঁকে আল্লাহর পথ অবলম্বন করার দরুন ধমক দিতে থাক এবং তাকে পুনরায় বিপথগামী করার পিছনে লেগে যাও। হে আমার কওমের লোকেরা! সেই সময়টুকু স্মরণ কর এবং আল্লাহর অনুগ্রহ স্বীকার কর, তোমরা সংখ্যায় খুবই নগণ্য ছিলে। এরপর আল্লাহ তাআলা শান্তি ও নিরাপত্তা দান করে তোমাদের সংখ্যাকে অধিক সংখ্যায় বৃদ্ধি করে দিয়েছেন।
হে আমার কওম! এ কথার প্রতিও চিন্তা কর, যারা আল্লাহর যমীন ফাসাদ বিস্তার করেছে, তাদের পরিণাম কেমন উপদেশমূলক হয়েছে। যদি তোমাদের মধ্য হতে একদল আমার প্রতি ঈমান আনে এবং অন্যদল ঈমান না আনে, তবে ব্যাপারটি শুধু এতটুকুতেই খতম হয়ে যাবে না বরং ধৈর্যের সাথে অপেক্ষা কর, যে পর্যন্ত না আল্লাহ আমাদের মধ্যে শেষ মীমাংসা করে দেন এবং তিনিই উত্তম মীমাংসাকারী।"
হযরত শুআইব আ. নেহায়েত মার্জিতভাষী ও স্থানোচিত বক্তা ছিলেন। তিনি সুমধুরবাণী, সুন্দর সম্ভাষণ, বর্ণনা পদ্ধতি ও বক্তৃতায় অসাধারণ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। এ কারণেই তাফসিরকারকগণ তাঁকে 'খতিবুল আম্বিয়া' উপাধিতে ভূষিত করে থাকেন। অতএব, তিনি নরম ও গরম উভয় প্রকারেই কওমকে হেদায়েত ও নসিহতের এই কথাগুলি বললেন। কিন্তু সেই হতভাগ্য কওমের ওপর এর কোনোরূপ ক্রিয়াই হল না। গুটিকতক দুর্বল লোক ব্যতীত কেউই আল্লাহ পাকের এ পয়গামের প্রতি কর্ণপাত করল না। তারা নিজেরাও পূর্ববৎ অসৎকাজে লিপ্ত রইল এবং অন্যান্য লোকদের পথেও বাধা প্রদান করতে লাগল। তারা পথে পথে বসে থাকত এবং হযরত শুআইব আ.-এর নিকট যাতায়াতকারীদেরকে সত্য গ্রহণে বাঁধা দিত। সুযোগ পেলে জনগণের সম্পদ লুটপাট করত। এত কিছু সত্ত্বেও যদি কোনো সৌভাগ্যবান সত্যের ডাকে সাড়া দিত এবং সত্যকে গ্রহণ করে নিত, তবে তাকে ভয় প্রদর্শন ও ধমকি দিত এবং নানা প্রকারে বিপথগামী করার চেষ্টা করত। কিন্তু এ সমস্ত ব্যাপার সত্ত্বেও হযরত শুআইব আ.-এর সত্যের ডাক সর্বদা অব্যাহত রইল। অতএব, তাদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় লোকেরা, যারা নিজেদের শক্তি ও মর্যাদার জন্য গর্বিত ছিল, হযরত শুআইব আ.-কে বলল, “হে শুআইব! দুইটি বিষয়ের মধ্যে একটি বিষয় অবশ্যই হবে, হয়তো আমরা তোমাকে এবং তোমার প্রতি ঈমান আনয়নকারীদেরকে নিজেদের বস্তি হতে বের করে দিব এবং তোমাদেরকে দেশান্তরিত করে দিব। অথবা তোমাদেরকে পুনরায় আমাদের ধর্মের প্রতি ফিরে আসতে বাধ্য করব।
হযরত শুআইব আ. বললেন, যদি আমরা তোমাদের ধর্মকে মিথ্যা ও বাতিল বলে মনে করি, তবুও আমাদেরকে তা মান্য করতে হবে, এটা তো বড়ই যুলুমের কথা। আর যখন আমাদেরকে আল্লাহ তাআলা তোমাদের এই বাতিল ধর্ম হতে নাজাত প্রদান করেছেন, এরপর যদি আমরা সেই ধর্মেরই দিকে পুনরায় ফিরে যাই, তবে এর অর্থ এই দাঁড়াবে, আমরা মিথ্যা বলে আল্লাহ তাআলার প্রতি অসত্যের অপবাদ আরোপ করলাম। এটা সম্পূর্ণ অসম্ভব। তবে হ্যাঁ, (আমাদের পরওয়ারদিগার) আল্লাহ তাআলার যদি তাই ইচ্ছা হয়, তবে তিনি যা ইচ্ছা তাই করবেন। আমাদের রবের জ্ঞান যাবতীয় বস্তুকে বেষ্টনকারী ও ব্যাপক। আমরা তো শুধু তাঁরই উপর ভরসা রাখব। হে পরওয়ারদিগার! আপনি আমাদের ও আমাদের কওমের মধ্যে সত্যের সাথে মীমাংসা করে দিন। নিঃসন্দেহ, আপনিই উত্তম মীমাংসাকারী।
কওমের নেতৃস্থানীয় লোকেরা যখন হযরত শুআইব আ.-এর মধ্যে এই দৃঢ়তা ও অটুট সংকল্প দেখতে পেল, তখন তারা কথার মোড় ঘুরিয়ে কওমকে সম্বোধন করে বলতে লাগল, সাবধান! তোমরা যদি শুআইবের কথা মান্য কর, তবে তোমরা ধ্বংস ও বিনাশ প্রাপ্ত হবে।
হযরত শুআইব আ. এটাও বললেন- দেখ, আল্লাহ তাআলা আমাকে এই জন্য প্রেরণ করেছেন, যেন আমি আমার সাধ্যানুযায়ী তোমাদেরকে সংশোধন করার চেষ্টা করি। আর আমি যা কিছু বলছি, এটার সত্যতার জন্য আল্লাহ তাআলার প্রমাণ এবং নিদর্শনও পেশ করছি। কিন্তু আফসোস! তোমরা এ স্পষ্ট দলিল-প্রমাণ দেখেও অবাধ্যাচরণ-এবং নাফরমানির উপরই স্থায়ী রয়েছ। অবাধ্যচরণ ও বিরোধিতার কোনো দিক বা অংশই তোমার ত্যাগ করো নি। আমি আমার নসিহত ও হেদায়েতের বিনিময়ে তোমাদের নিকট কোনো পারিশ্রমিকও দাবি করছি না এবং দুনিয়ার কোনো স্বার্থও তোমাদের নিকট চাচ্ছি না। আমার বিনিময় তো আল্লাহ তাআলার নিকট রয়েছে, যদি তোমরা এখনও অমান্য করতেই থাক, তবে আমার আশংকা- পাছে আল্লাহর আযাব এসে তোমাদেরকে ধ্বংস ও বিনষ্ট করে না ফেলে। আল্লাহর ফয়সালা অটল। তা প্রতিরোধ বা খণ্ডন করার সাধ্য কারো নেই।
কওমের সরদার ক্রোধান্বিত হয়ে বলল, তোমার নামায কি আমাদের নিকট এটাই চায়, আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের দেবতার পূজা ত্যাগ করি এবং নিজেদের মাল-দৌলতে আমাদের এই স্বাধীনতা না থাকে, যেরূপ ইচ্ছা লেনদেন করি। যদি আমরা ওযনে কম দেওয়া ছেড়ে দেই এবং মানুষের সঙ্গে কারবারে কম দিয়ে তার ক্ষতি না করি, তবে তো দরিদ্র এবং কাঙ্গাল হয়ে পড়ব! অতএব, এরূপ শিক্ষা প্রদানে তোমাকে কি কেউ সত্যিকারের পথ প্রদর্শক বলে মানতে পারে?
হযরত শুআইব আ. অত্যন্ত মনোব্যথা ও মহব্বতের সাথে বললেন, হে আমার কওম! আমার এই ভয় হচ্ছে, তোমাদের এই বেপরোয়া ভাব এবং আল্লাহ পাকের বিরুদ্ধে নাফরমানি তোমাদেরও সেই পরিণামই করে না দেয়, যা তোমাদের পূর্বে নূহ, হূদ, সালেহ ও লূত আ.-এর কওমগুলির হয়েছিল। এখনো সময় যায় নি। আল্লাহ পাকের সম্মুখে নত হয়ে পড় এবং নিজেদের অসৎকার্যসমূহের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা কর এবং ভবিষ্যতে সর্বদার জন্য ঐ সমস্ত অসৎ কার্য হতে তওবা কর। নিঃসন্দেহ, আমার পরওয়ারদিগার খুবই দয়ালু অত্যন্ত মেহেরবান। তিনি তোমাদের সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন। কওমের সরদাররা এ কথা শুনে জবাব দিল, হে শুআইব! আমাদের বুঝে কিছুই আসে না, তুমি কি বলছ? তুমি আমাদের সকলের চেয়ে বেশি দরিদ্র ও দুর্বল। তোমার কথাগুলি যদি সত্য হত, তবে তোমার যিন্দেগী আমাদের সকলের যিন্দেগীর চেয়ে উত্তম হত। আমরা শুধু তোমার খানদানকে ভয় করছি, অন্যথায় তোমাকে পাথর মেরে হত্যা করে ছাড়তাম, তুমি আমাদের উপর কখনও জয়ী হতে পারতে না।
হযরত শুআইব আ. বললেন, তোমাদের প্রতি আফসোস! তোমাদের জন্য কি খোদার মুকাবিলায় খোদার চেয়ে আমার খানদান অধিক ভয়ের কারণ হচ্ছে? অথচ আমার পরওয়ারদিগার তোমাদের যাবতীয় কাজকে বেষ্টন করে রয়েছেন এবং তিনি সবকিছুই জানেন এবং সবকিছুই দেখছেন। আচ্ছা, যদি তোমরা আমার উপদেশ না মান, তোমরাই জান, তোমরা সেই সমস্ত কাজই করতে থাক, যা করছ, অচিরেই আল্লাহ পাকের মীমাংসা বলে দেবেন, আযাবের উপযোগী কারা? আর কে মিথ্যাবাদী? তোমরাও অপেক্ষা করতে থাক আমিও অপেক্ষা করতে রইলাম।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 আযাবের ধরন

📄 আযাবের ধরন


কুরআন মাজিদ বলে, নাফরমানী এবং অবাধ্যতার প্রতিফলে হযরত শুআইব আ.-এর কওমের উপর দুই প্রকারের আযাব এসে তাদেরকে বেষ্টন করে ফেলল। একটি ভূ-কম্পনের আযাব এবং দ্বিতীয়টি অগ্নিবৃষ্টি। যখন তারা নিশ্চিন্ত মনে নিজ নিজ ঘরে আরাম করছিল, তখন হঠাৎ এক ভয়ঙ্কর ভূ-কম্পন আরম্ভ হল এবং এই ভয়ঙ্কর অবস্থা শেষ হতে না হতেই উপর হতে অগ্নি বর্ষণ আরম্ভ হয়ে গেল। ফল এই দাঁড়াল, সকালবেলা দর্শকরা দেখতে পেল, গত কালের অবাধ্য ও অহঙ্কারী আজ বিদগ্ধ হয়ে উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px