📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 গুরুত্বপূর্ণ চারিত্রিক বিষয়সমূহ

📄 গুরুত্বপূর্ণ চারিত্রিক বিষয়সমূহ


হযরত ইউসুফ আ.-এর এ বিস্ময়কর ও অভিনব ঘটনাবলীর মধ্যে ধী-সম্পন্ন লোকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কতগুলো চারিত্রিক বিষয় নিহিত আছে। আসলে এটি শুধু একটি জীবনীই নয়; ফযিলত ও আখলাকের এমন একটি আশ্চর্য সুন্দর আখ্যান, যার প্রতিটা দিক নসিহত ও জ্ঞানের মণি-মুক্তায় কানায় কানায় পূর্ণ। ঈমানী শক্তি, ধৈর্য, আত্মসংযম, সবর, শোকর, পবিত্রতা, দীনদারী, বিশ্বস্ততা, ক্ষমা, তাবলীগের অনুপ্রেরণা, আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত করার আকুলতা, আত্মসংশোধন ও খোদাভীতির মতো উচ্চপর্যায়ের আখলাক ও মহৎ গুণাবলীর এক দুর্লভ স্বর্ণশৃঙ্খল। যা হযরত ইউসুফ আ. সমূহ ঘটনার পরতে পরতে দেখা যায়। তন্মধ্য হতে নিম্নবর্ণিত কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

১. যদি কোনো ব্যক্তির নিজস্ব প্রকৃতি ও স্বভাব উত্তম হয় এবং তার পরিবেশও পবিত্র নিষ্কলঙ্ক হয়, তবে সেই ব্যক্তির জীবন হবে মহৎ চরিত্রে সুস্পষ্ট; উচ্চস্তরের গুণাবলীতে বিশিষ্ট এবং তিনি হবেন সর্বপ্রকারের মাহাত্ম্য ও বুযুর্গীর ধারক ও বাহক। হযরত ইউসুফ আ.-এর পবিত্র যিন্দেগির উত্তম দৃষ্টান্ত। তিনি ইয়াকুব, ইসহাক এবং ইবরাহীম আ.-এর মতো উচ্চ মর্যাদাশীল নবী ও পয়গাম্বরগণের সন্তান ছিলেন। তিনি প্রতিপালিত হন নবুয়ত ও রিসালতের দোলনায়। শিক্ষাদীক্ষা লাভ করেন নবুয়ত ও রিসালাতের পরিবার-পরিবেশে। তাঁর নিজস্ব নেকপ্রকৃতি এবং স্বভাবগত পবিত্রতা যখন এমনি নির্মল পরিবেশ পেল, তখন তাঁর সমুদয় প্রশংসনীয় স্বভাব-প্রকৃতি ও গুণাবলী প্রদীপ্ত হয়ে উঠল! ফলে তাঁর জীবনের সব অবস্থায় পরহেযগারী, সাধুতা, ধৈর্য-সহ্য, দীনদারী এবং খোদাপ্রেমের এমন উজ্জ্বল বিকাশ হল, যা দেখে মানুষ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল।

২. যদি কোনো ব্যক্তির মধ্যে আল্লাহর প্রতি ঈমান সঠিক ও সুদৃঢ় হয় এবং তাঁর প্রতি তার বিশ্বাস মযবুত ও দৃঢ় হয়, তবে এ পথের সমস্ত জটিলতা ও কঠিনতা তার জন্য সহজ বরং সহজতর হয়ে যায়। সত্য দর্শনের পর সমস্ত বিপদাপদ অতি তুচ্ছ হয়ে যায়। হযরত ইউসুফ আ.-এর জীবনে এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে পরিদৃষ্ট হয়।

৩. পরীক্ষাটা বিপদ-মুসিবত ও ধ্বংসের আকৃতিতেই হোক কিংবা ধন-দৌলত ও রিপুর কামনা-বাসনার সুন্দর উপকরণের আকারেই হোক। সর্বাবস্থায় মানুষের উচিত আল্লাহ পাকের দিকে রুজু করা, আল্লাহর দরবারেই কাকুতি মিনতি করা। যেন তিনি সত্যের ওপর দৃঢ়পদ রাখেন এবং ধৈর্য-সহ্য দান করেন। আযীযে মিসরের বিবি এবং মিসরীয় রমণীদের অসৎ প্ররোচনা এবং তাদের মনষ্কামনা পূর্ণ না করলে জেলে আবদ্ধ করার ধমক, এরপর জেলখানার নানাপ্রকার কষ্ট ইত্যাদি সমস্ত অবস্থায় হযরত ইউসুফ আ.-এর ভরসা, তাঁর দুআ মিনতিসমূহের কেন্দ্রস্থল কেবলমাত্র আল্লাহ তাআলা। তিনি আযীযে মিসরের সম্মুখে আবেদন করেন নি কিছুর। ফেরাউনের দরবারেও না। তিনি মিসরের সুন্দরী রমণীদের সঙ্গেও মন লাগাচ্ছেন না, নিজের প্রভুর সুন্দরী স্ত্রীর সঙ্গেও না। বরং প্রত্যেক ক্ষেত্রে শুধু আল্লাহ তাআলার সাহায্য প্রার্থী হিসেবেই তাকে দেখা যায়। যেমন তিনি বলেছেন: (রব্বি সিজ্নু আহাব্বু ইলাইয়্যা মিম্মা ইয়াদঊনানী ইলাইহি) অর্থাৎ “হে আমার প্রতিপালক! এ রমণীরা আমাকে যেদিকে আহ্বান করছে, এর চেয়ে জেলখানাই আমার নিকট শ্রেয়।" (ক্বালা মাআযাল্লাহি ইন্নি রব্বী আহসানা মাছওয়াইয়্যা ইন্নাহু লা ইউফলিহুজ জালিমুন) অর্থাৎ "আল্লাহর আশ্রয় ভিক্ষা চাচ্ছি। নিঃসন্দেহ তিনি (আযীযে মিসর) আমার মুরব্বি, আমাকে সম্মান ও মর্যাদার সাথে রাখছেন।"

৪. যখন আল্লাহ তাআলার মহব্বত এবং ইশক অন্তরের গভীরে প্রবেশ করে, তখন মানুষের জীবনের সম্পূর্ণ উদ্দেশ্য একমাত্র তিনিই হয়ে যান। তাঁর দীনের দাওয়াত, তাবলীগের ইশক সর্বক্ষণ ধমনীসমূহে ও শিরায় শিরায় ধাবিত হতে থকে। যেমন জেলখানার কঠিন বিপদের সময় নিজের সাথীদের সাথে ইউসুফ আ.-এর সর্বপ্রথম কথা ছিল এটাই- (ইয়া সহিবায়িস সিজনি আ-আরবাবু ম্মুতাফাররিক্বুনা খয়রুন অমিল্লাহুল ওহিদুল ক্বাহহার) অর্থাৎ “হে আমার জেলখানার বন্ধুদ্বয়! পৃথক পৃথক বহু দেবতার উপাসনাই কি ভালো, না-কি এক মহা শক্তিমান আল্লাহর ইবাদত উত্তম?

৫. দীনদারী ও বিশ্বস্ততা এমন একটি নেয়ামত, একে মানুষের ধর্মীয় ও পার্থিব সৌভাগ্যের চাবিকাঠি বলা যেতে পারে। আযীযে মিসরের কাছে হযরত ইউসুফ আ. যেরূপে প্রবেশ করেছিলেন - ঘটনাবলীর বিস্তৃত বিবরণে যেমনটি জানা গেছে- এটা ইউসুফ আ.-এর দীনদারী এবং বিশ্বস্ততারই সুফল ছিল। অর্থাৎ প্রথম তিনি আযীযে মিসরের দৃষ্টিতে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ও প্রিয় হন। তারপর একেবারে সমগ্র মিসর রাজ্যের মালিকই হয়ে বসেন।

৬. আত্মনির্ভশীলতা মানুষের উচ্চ শ্রেণীর গুণাবলীর অন্তর্গত একটি মহৎ গুণ। আলাহ তাআলা যাকে এ দৌলত দান করেন, সে ব্যক্তিই দুনিয়ার সর্বপ্রকার বিপদাপদ ও দুঃখ-কষ্ট অতিক্রম করে দুনিয়া ও আখেরাতের উন্নতি লাভ করতে পারে। আত্মনির্ভশীলতার বিভিন্ন প্রকারের মধ্যে একটি প্রকার হচ্ছে আত্মসম্মানবোধ। যার আত্মসম্মানবোধ নেই, সে মানুষই নয়; একখণ্ড মাংসপিণ্ড মাত্র। হযরত ইউসুফ আ.-এর আত্মসম্মান রক্ষার অবস্থা ছিল এমনই, বহু বছর পরে যখন জেলখানার বন্দিদশা হতে মুক্তির আদেশ প্রাপ্ত হন এবং তৎকালীন বাদশার তরফ হতে সম্মানজনক পয়গাম লাভ করেন, তখন আনন্দ ও খুশির সাথে তৎক্ষণাৎই একে অভিনন্দন জানান নি বরং পরিষ্কার ভাষায় অস্বীকার করে বসেন- "আমি তখন পর্যন্ত জেলখানা হতে বের হব না, যে পর্যন্ত না মীমাংসা হয়ে যায় যে, মিসরীয় রমণীরা ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আমার সাথে যে ব্যবহার করেছে, তার প্রকৃত স্বরূপ কি?" যেমন, কুরআন মাজিদে বর্ণিত রয়েছে: (ফালাম্মা জায়াহুর রসূলু ক্বালারজি ইলা রব্বিকা ফাসআলহু মা বালুন নিসওয়াতিল্লাতি ক্বাত্তানা আইদিয়াহুন্না ইন্না রব্বী বিকাইদিহিন্না আলীম) অর্থাৎ "যখন বাদশার প্রেরিত দূত (মুক্তির আদেশ নিয়ে) তাঁর নিকট আসল, তখন তিনি বললেন: তুমি তোমার প্রভুর নিকট ফিরে যাও এবং তাঁকে জিজ্ঞাসা কর, সেই রমণীদের কি অবস্থা, যারা নিজেদের হাত কেটে ফেলে ছিল?"

৭. সবর একটি অতি উচ্চ মানের স্বভাব এবং বহু মন্দ কাজের জন্য বাধা ও ঢাল স্বরূপ। কুরআন মাজিদে সত্তরেরও বেশি জায়গায় ফযিলতের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আর আল্লাহ তাআলা বহু উচ্চ মর্যাদার মূলসূত্র এ ফযিলতের ওপরই প্রতিষ্ঠিত রেখেছেন। (অয়াজাআলনা মিনহুম আইম্মাতাইঁ ইয়াহদুনা বিআম্রিনা লাম্মা সাবারু অয়াক্বানু বিআয়াতিনা ইউক্বিনুন) অর্থাৎ "আর আমি তাদের মধ্য হতে অনুসরণীয় ও বরেণ্য বানিয়েছি যাঁরা আমার আহকাম প্রচারকারী হয়েছেন, যখন তাঁরা ছবরের ফযিলতরূপী অলঙ্কারে ভূষিত হয়েছেন।" (অতাম্মাত কলিমাতু রব্বিকাল হুসনা আলা বনী ইসরাইলা বিমা সাবারু) অর্থাৎ "আর বনি ইসরাঈলের উপর আপনার রবের উত্তমবাণী পূর্ণ হয়েছে এ কারণে, তারা ধৈর্যধারণকারী ছিল।” (অবাশশিরিস সাবিরীনাল্লাযীনা ইযা আসাবাহুম মুসীবাতুন ক্বালু ইন্না লিল্লাহি অয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন) অর্থাৎ "আর সুসংবাদ দিন সেই ধৈর্যশীলদের, যখন তাদের ওপর কোনো বিপদাপদ অবতীর্ণ হয়, তখন তারা বলে উঠে: ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। নিঃসন্দেহ আমরা আল্লাহ তাআলারই জন্য এবং নিঃসন্দেহ, আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।"

(ফাসবির কামা সাবারু উলুল আযমি মিনার রুসুলি অয়ালা তাসতাজিল্লাহুম) অর্থাৎ "(হে নবী)! আপনি তেমনি সবর করুন, যেমন উচ্চ সংকল্পশালী পয়গম্বরগণ সবর করেছিলেন। (অসতাঈনু বিসসাবরি অয়াসালাতি) অর্থাৎ "আর (আল্লাহ হতে) সাহায্য চাও সবর ও নামায দ্বারা।" রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "সবর ঈমানের অর্ধাংশ।" বায়হাকি শরিফে আছে- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে একবার কেউ ঈমানের সূত্র জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, 'সবর এবং বদান্যতা।' বাস্তবিকভাবে সবর এমন একটি গুণের নাম, যার দ্বারা মানুষ যাবতীয় মন্দ কাজ থেকে নিবৃত্ত থাকতে পারে। খারাপির থেকে বিরত থাকতে পারে। এটি শুধু মানুষেরই বিশেষত্ব। এ গুণটিই মানুষকে অন্যান্য সকল প্রাণী হতে পৃথক করে দিয়েছে।

৮. উত্তম চরিত্রসমূহের মধ্যে 'শোকর'ও একটি উত্তম স্বভাব। কেন না এটা খোদায়ি স্বভাবসমূহের মধ্য হতে একটি অতি উচ্চ স্বভাব। কুরআন মাজিদে বর্ণিত আছে: (অয়াল্লাহু শাকুরুম হালীম) মানুষের গুণাবলীর মধ্যে শোকর এমন গুণের নাম, যার দ্বারা প্রকৃত নেয়ামতদাতার নেয়ামতের স্বীকার করা হয়। তার ওপর আনন্দ ও খুশি প্রকাশ করা হয় এবং সেই নেয়ামতকে নেয়ামতদাতা ও অনুগ্রহকারীর পছন্দনীয় উপায়ে ব্যবহার করা হয়। কুরআন মাজিদে আছে: (ফাজকুরুনী আজকুরকুম অশাকুরুলী অয়ালা তাকফুরুন) অর্থাৎ "অতএব তোমরা আমাকে স্মরণ কর! আমি তোমাদেরকে স্মরণ করব। আর তোমরা আমার (নেয়ামতের) শোকর কর এবং না-শোকরি করো না।" (মায়া ইয়াফআলুল্লাহা বিআযাবিকুম ইন শাকরতুম অয়া আমানতুম অয়াকানাল্লাহু শাকিরান আলীমা) অর্থাৎ "আল্লাহ তোমাদের আযাব দেবেন না, যদি তোমরা তাঁর শোকরকারী এবং তাঁর প্রতি ঈমান আনয়নকারী থাক।" (লাইল লিন শাকরতুম লা আযীদান্নাকুম) অর্থাৎ তোমরা যদি শোকরগুযার হও, তবে আমি (তোমাদের নেয়ামতসমূহ) বাড়িয়ে দেব। কিন্তু আফসোসের বিষয় হল, প্রকৃত শোকরগুযার খুবই কম। যেমন আল্লাহ পাক বলেন: (অয়াক্বালীলুম মিন ইবাদিয়াশ শাকূর) অর্থাৎ "আমার বান্দাগণের মধ্য হতে প্রকৃত শোকরগুযার খুবই অল্প।"

৯. হিংসা-বিদ্বেষের পরিণাম হিংসুক-বিদ্বেষীর জন্যই ক্ষতিকর হয়ে থাকে। যদিও কোনো কোনো সময় হিংসাকৃত ব্যক্তির পার্থিব ক্ষতি হয়ে যাওয়া সম্ভব; কিন্তু হিংসুকের কোনো অবস্থায়ই মঙ্গল হয় না। খাসিরাদ দুনিয়া অয়াল আখিরাহ - “সে দুনিয়া- আখেরাত উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। অবশ্য যদি তওবা করে নেয় এবং হিংসুটে জীবন পরিত্যাগ করে। হযরত ইউসুফ আ.-এর ভাইদের ঘটনাবলী আমাদের চোখের সম্মুখে বিদ্যমান এবং তাদের পরিণামও; কিন্তু অর্ন্তদৃষ্টির জন্য চক্ষু থাকা শর্ত।

১০. সততা, দীনদারি, বিশ্বস্ততা, সবর, শোকর-এর মতো উচ্চস্তরের গুণাবলীসমৃদ্ধ জীবনই প্রকৃত জীবন। যদি মানুষের মধ্যে এ সমস্ত গুণাবলী না থাকে, তবে সে মানুষ নয়। যেমন কুরআন মাজিদে আছে: (উলাইকা কালানআমি বাল হুম আদাল্লু) অর্থাৎ "তারা (অবাধ্য ও নাফরমানরা) পশুতুল্য, বরং (পশুর চেয়ে) আরো অধম।"

১১. হযরত ইউসুফ আ.-এর মহৎ স্বভাব এবং উচ্চস্তরের গুণাবলীর প্রশংসা ও ফযিলতের সর্বাপেক্ষা অধিক গুরুত্বপূর্ণ সেই বাক্যটি, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সম্বন্ধে বলেছেন: (আল কারিম ইব্নুল কারিম ইব্নুল কারিম ইব্নুল কারিম)। ইউসুফ ইবনে ইয়াকুব ইবনে ইসহাক ইবনে ইবরাহীম আ.। অর্থাৎ সেই বংশধারা, যা চার পুরুষ ধরে নবুয়তের বুযুর্গী থেকে ফয়েয লাভ করেছে, তা ইউসুফ ইবনে ইয়াকুব ইবনে ইসহাক ইবনে ইবরাহীম আ.-এর বংশধারা।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 অন্তিমকাল

📄 অন্তিমকাল


হযরত ইউসুফ আ. যখন দেখলেন, তাঁর প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ পরিপূর্ণ হয়েছে। তাঁর আশা-আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়ে গেছে। তখন উপলব্ধি করলেন, এ পৃথিবীতে কোনো কিছুরই স্থায়িত্ব নেই। যা কিছু আছে, সবই ধ্বংস হবে। আর 'পূর্ণতার পরেই আসে ক্ষয়ের পালা'। তখন তিনি আল্লাহর যথাযোগ্য প্রশংসা করলেন। আল্লাহর অনেক অনুগ্রহ ও করুণার কথা স্বীকার করলেন এবং মুসলিম অবস্থায় মৃত্যু দান এবং সৎলোকদের অন্তর্ভুক্ত রাখার জন্য দুআ করলেন। তাঁর এ দুআ ছিল এমন পর্যায়ের, যেমন অন্যান্য সময় দুআর মধ্যে বলা হয়- (আল্লাহুম্মা আহইনা মুসলিমিনা অয়া তাওয়াসানা মুসলিমিন) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাদেরকে মুসলিমরূপে জীবিত রাখুন এবং মুসলিমরূপে মৃত্যু দান করুন! অর্থাৎ, যখন আপনি আমাদের মৃত্যু দেবেন, তখন যেন আমরা মুসলমান থাকি। আবার বলা যায়, তিনি এ দুআ করেছিলেন মৃত্যুশয্যায় থাকা অবস্থায়। যেমনিভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মৃত্যুশয্যায় দোয়া করেছিলেন তাঁর রূহকে ঊর্ধ্বজগতে উঠিয়ে নিতে এবং নবী-রাসূল ও সালিহীনদের অন্তর্ভুক্ত করতে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন: (আল্লাহুম্মা ফির রফিকিল আ'লা) এ দুআটি তিনবার বলার পর তিনি ইনতিকাল করেন।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 ওফাত লাভ

📄 ওফাত লাভ


হযরত ইউসুফ আ. তাঁর জীবনের অধিকাংশ বয়সই মিসরে কাটিয়েছেন। তিনি যখন একশ দশ বছর বয়সে পদার্পণ করেন, তখন তাঁর ইনতেকাল হয়। হযরত ইউসুফ আ. ইনতেকালের আগে আপন খান্দানের লোকদের থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন, তারা যেন তাঁকে মিসরের মাটিতে দাফন না করে। বরং আল্লাহ তাআলার ওয়াদা পূর্ণ হয়ে গেলে বনি ইসরাঈলরা যেন পুনরায় ফিলিস্তিনে (বায়তুল মুকাদ্দাসে) পূর্বপুরুষদের দেশে ফিরে যায়। তারা হাড়গুলো যেন সেখানে নিয়ে মাটির নিচে দাফন করে। সুতরাং তদনুযায়ী তাঁরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন। হযরত ইউসুফ আ.-এর ইনতেকাল হলে তাঁকে মমি করে সিন্দুকের মধ্যে রেখে দেয়। যখন মূসা আ.-এর যুগে বনি ইসরাঈলরা মিসর থেকে বের হয়, তখন সেই সিন্দুকটিকেও সঙ্গে নিয়ে যায়। এবং পূর্বপুরুষদের দেশ ফিলিস্তিনের 'নাবলুসের' অন্তর্গত 'বালতা' গ্রামে নিয়ে গিয়ে দাফন করে। এ কবরটি একটি বৃক্ষের নিচে।

আহলে কিতাবদের মতে মৃত্যুকালে হযরত ইউসুফ আ.-এর বয়স হয়েছিল একশ দশ বছর। আহলে কিতাবদের এ লেখাটি আমি দেখেছি। ইবনে জারীর রহ.-ও তা নকল করেছেন। মুবারক ইবনে ফুযালা হাসানের সূত্রে বর্ণনা করেছেন: ইউসুফ আ.-কে যখন কূপে নিক্ষেপ করা হয়, তখন তাঁর বয়স ছিল সতের বছর। পিতার কাছ থেকে অনুপস্থিত ছিলেন আশি বছর এবং পিতার সাথে মিলনের পরে জীবিত ছিলেন তেইশ বছর। সুতরাং সেমতে মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল (১৭+৮০+২৩) একশ বিশ বছর।

তাওরাতে বর্ণিত আছে: ইউসুফ এবং তাঁর পিতার পরিবারবর্গ মিসরে বসবাস করেছেন। ইউসুফ আ. একশ দশ বছর জীবিত ছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি তাঁর ভাইদের বললেন: আমি মরছি, আল্লাহ নিশ্চয়ই তোমাদেরকে মিসর থেকে সেই স্থানের দিকে নিয়ে যাবেন, যার সম্বন্ধে তিনি ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়াকুব আ.-এর সঙ্গে কসম দিয়ে ওয়াদা করেছেন। ইউসুফ আ. তাদের বললেন, আল্লাহ নিশ্চয়ই তোমাদেরকে স্মরণ করবেন। তোমরা আমার হাড়গুলোকে এখান থেকে আমার হাড়গুলো নিজেদের সঙ্গে নিয়ে যেও।

এরপর ইউসুফ আ. একশ দশ বছর বয়সে পৌঁছে ইনতেকাল করেন। বনি ইসরাঈলগণ মিসরে তাঁর কবরের মধ্যে সুগন্ধিদ্রব্য পূর্ণ করে একটি সিন্দুকের ভিতরে রেখে দেন। মূসা আ. বনি ইসরাঈলকে নিয়ে মিসর থেকে বের হওয়ার সময় ইউসুফ আ.-এর হাড়গুলোকে সঙ্গে নিলেন। কেন না ইউসুফ আ. বনি ইসরাঈলকে কসম দিয়ে বলেছিলেন, আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তোমাদের খবর নেবেন। তোমরা এখান থেকে আমার হাড়গুলো নিজেদের সঙ্গে নিয়ে যেও।”

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 হযরত ইউসুফ আ.-এর কাহিনী সংক্রান্ত মানচিত্র

📄 হযরত ইউসুফ আ.-এর কাহিনী সংক্রান্ত মানচিত্র


শ্বেত সাগর। শিমইরাও জুশান হীপিও কায়রো। দূতন নিকট বাইতে ম হিবরুন ধীরে গুরা কাফেলার পথ। জর্দান নদী জিলআদ বায়তুল লাহম মৃত সাগর। নীল নদ। উত্তর আয়শা সাইনা উপদ্বীপ সুয়েজ খাল সাহারা উপসাগর আকাবা উপসাগর আরব লোহিত সাগর।

টিকাঃ
১। বাইবেলের মতে এ স্থানেই হযরত ইউসুফ কূপে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। ২। এখানে হযরত ইয়াকুবের পৈতৃক সম্পত্তি ছিল। বর্তমানে এর নাম নাবলুস। ৩। এখানে হযরত ইয়াকূব বসবাস করতেন। এর আর এক নাম 'আল-খলীল'। ৪। হযরত ইউসুফ এখানে বনী ইসরাঈলদেরকে পূনর্বাসিত করেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px