📄 একটি জ্ঞাতব্য
(যালিকা লি-ইয়ালামা আন্নী লাম আখুনহু বিল গইবি অয়া আন্নাল্লাহা লা ইয়াহদী কায়দাল খয়িনিন) অর্থাৎ "আমি এটি বলছিলাম, যাতে সে জানতে পারে যে, তার অগোচরে আমি তার বিশ্বাসঘাতকতা করি নি। আর আল্লাহ তাআলা বিশ্বাসঘাতকদের ষড়যন্ত্র সফল করেন না।"
কারো কারো মতে এটা হযরত ইউসুফ আ.-এর কথা। তখন অর্থ হবে: আমি এ বিষয়টি যাঁচাই করতে চাই এ উদ্দেশ্যে, যাতে আযীয জানতে পারে, তার অনুপস্থিতিতে আমি তার সাথে কোনো বিশ্বাসঘাতকতা করি নি। আবার কারো কারো মতে এটা যুলায়খার উক্তি। তখন অর্থ হবে, আমি একথা স্বীকার করছি এ উদ্দেশ্যে, যাতে আমার স্বামী জানতে পারে, আমি মূলত তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতার কোনো কাজ করি নি। এটা অবশ্য তার উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু আমার সাথে কোনো অশ্লীল কাজ সংঘটিত হয় নি। পরবর্তীকালের অনেক ইমামই এই মতকে সমর্থন করেন। তদ্রুপ (অয়ামা উবাররিউ নাফসী ইন্নান নাফসা লাআম্মারাতুম বিসসুয়ি ইল্লা মা রহিমা রব্বী ইন্না রব্বী গফুরুর রহীম) উক্তিটিও কেউ বলেছেন ইউসুফ আ.-এর; আবার কেউ বলেছেন যুলায়খার। তবে এটা যুলায়খার বক্তব্য হওয়াটাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত ও সঙ্গত।
রাজা বলল, ইউসুফকে আমার কাছে নিয়ে এসো। আমি তাকে আমার একান্ত সহচর নিযুক্ত করব। তারপর রাজা যখন তার সাথে কথা বলল, তখন রাজা বলল, আজ তুমি আমাদের কাছে মর্যাদাশালী ও বিশ্বাসভাজন হলে। ইউসুফ আ. বললেন, 'আমাকে দেশের ধন-সম্পদের উপর কর্তৃত্ব প্রদান করুন! আমি বিশ্বস্ত রক্ষক ও সুবিজ্ঞ।' এভাবে ইউসুফ আ.-কে আমি সে দেশে প্রতিষ্ঠিত করলাম। সে সেদেশে যেখানে ইচ্ছা অবস্থান করতে পারত। আমি যাকে ইচ্ছা তার প্রতি দয়া করি; আমি সৎকর্মপরায়ণদের শ্রমফল নষ্ট করি না। যারা মুমিন এবং মুত্তাকী তাদের পরলোকের পুরষ্কারই উত্তম।
📄 ইয়াকুব আ.-এর খান্দান মিসরে
অবশেষে হযরত ইয়াকুব আ. নিজের খান্দানের লোকদেরকে নিয়ে মিসর যাত্রা করলেন। তাওরাতে এ ঘটনাটির বিস্তৃত বিবরণ এভাবে প্রকাশ করা হয়েছে: "আর এ আলোচনাই ফেরাউনের গৃহে শোনা গেল, ইউসুফের ভাই এসেছে এবং এতে ফেরাউন ও তাঁর আমলাগণ খুবই সন্তুষ্ট হল। আর ফেরাউন ইউসুফকে বললেন, তোমার ভাইদেরকে বল- "তোমরা এক কাজ কর, নিজেদের বাহন পশুগুলিকে বোঝাই কর এবং দেশে গিয়ে নিজেদের পিতামাতা ও পরিবারবর্গকে নিয়ে আমার নিকট চলে এসো! আমি তোমদেরকে মিসরের ভালো ভালো বস্তু প্রদান করব। তোমরা এ দেশের হাদিয়া তোহফাসমূহ খাবে। এখন তুমি আদেশপ্রাপ্ত হয়েছ। অতএব তাদের বলো, তোমরা তোমাদের পিতামাতা ও নিজেদের স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে আসো। নিজেদের মালপত্রের জন্য কোনো প্রকার আফসোস করো না। মিসরে আনন্দ তোমাদের কারণেই। ইসরাঈল নিজ পরিবারের সবাইকে মিসরে এলেন। তিনি নিজের পুত্র ও পৌত্রদেরকে, যারা তার সাথে ছিলেন এবং নিজ কন্যাদেরকে, কন্যার কন্যাদেরকে ও সমস্ত বংশধরগণকে নিজের সঙ্গে নিয়ে মিসরে আসলেন। অতএব ইয়াকুবের পরিবারে যারা ছিল, তারা সকলেই মিসরে চলে এলেন। তারা সংখ্যায় ছিলেন সত্তর জন।
হযরত ইউসুফ আ. যখন জানতে পারলেন, তাঁর পিতা খান্দানের সবাইকে নিয়ে মিসরের নিকটে এসে পৌঁছেছেন, তখন তিনি তৎক্ষণাৎ অভ্যর্থনার জন্য বের হলেন। হযরত ইয়াকুব আ. যখন দীর্ঘকাল যাবৎ বিচ্ছিন্ন কলিজার টুকরাকে দর্শন করলেন, তখন তাঁকে টেনে নিয়ে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন। যখন এ আনন্দঘন সাক্ষাৎ হল, তখন হযরত ইউসুফ আ. বুযুর্গ পিতার খেদমতে আরয করলেন: এখন আপনি সম্মান, মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং হেফাযতের সাথে শহরের দিকে তাশরিফ নিয়ে চলুন। তৎকালে মিসরের রাজধানী ছিল রামাসিস। একে বলা হতো 'উৎসবের শহর'। হযরত ইউসুফ আ. বুযুর্গ পিতাকে এবং খান্দানের সমস্ত লোককে অত্যন্ত সাড়ম্বরে শাহি সওয়ারীর উপর বসিয়ে মহা সমারোহে শহরে এনে রাজপ্রাসাদে নামালেন।
এ সমস্ত কাজ শেষ করে তিনি 'আম-দরবারের' অনুষ্ঠান করতে ইচ্ছা করলেন, যেন তাঁর বুযুর্গ পিতা ও খান্দানের সাথে সমগ্র মিসরবাসীর পরিচয় হয়ে যায় এবং দরবারের আমীর-ওমারাগণও তাঁদের মান মর্যাদা সম্বন্ধে অবহিত হয়ে যান। দরবার বসল। সমস্ত রাজকর্মচারীরা নিজ নিজ নির্দিষ্ট আসনে বসে গেলেন। হযরত ইউসুফের আদেশে তাঁর পিতা-মাতাকে রাজসিংহাসনেই স্থান দেওয়া হল এবং খান্দানের অন্যান্য লোকেরা নিজ নিজ মর্যাদানুযায়ী নিচে বসলেন। এ সমস্ত যখন পূর্ণ হয়ে গেল, তখন হযরত ইউসুফ আ. রাজমহল হতে বের হয়ে রাজসিংহাসন অলংকৃত করলেন। তৎক্ষণাৎ সমস্ত দরবারীগণ রাজ্যের প্রথানুযায়ী সিংহাসনের সম্মুখে সম্মান প্রদর্শনসূচক সিজদা করলেন। উপস্থিত অবস্থা দেখে ইউসুফ আ.-এর খান্দানের সকল লোকও অনুরূপভাবে সেজদা করলেন। এটা দেখে ইউসুফ আ.-এর শৈশবকালের স্বপ্নটির কথা স্মরণ হল এবং নিজের পিতাকে সম্বোধন করে বললেন:
وَقَالَ يَا أَبَتِ هٰذَا تَأْوِيلُ رُؤْيَايَ مِنْ قَبْلُ قَدْ جَعَلَهَا رَبِّي حَقًّا ۖ وَقَدْ أَحْسَنَ بِي إِذْ أَخْرَجَنِي مِنَ السِّجْنِ وَجَاءَ بِكُمْ مِنَ الْبَدْوِ مِنْ بَعْدِ أَنْ نَزَغَ الشَّيْطَانُ بَيْنِي وَبَيْنَ إِخْوَتِي ۚ إِنَّ رَبِّي لَطِيفٌ لِمَا يَشَاءُ ۚ إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ
"পিতা! এটা হল সেই স্বপ্নের ব্যাখ্যা, যা দীর্ঘকাল পূর্বে আমি দেখেছিলাম। আমার প্রতিপালক একে বাস্তবায়িত করে দেখালেন। এটা তাঁরই অনুগ্রহ! তিনি আমাকে জেলখানা হতে বের করেছেন। আপনাদের মরুপ্রান্তর হতে আমার নিকট এনে পৌঁছিয়েছেন। এ সবকিছুই হয়েছে তার পরে, যখন শয়তান আমার ও আমার ভাইদের মাঝখানে অনৈক্য সৃষ্টি করে দিয়েছিল। নিঃসন্দেহ আমার পালনকর্তার সে সমস্ত কাজের জন্য, যা তিনি করতে ইচ্ছা করেন উত্তম ব্যবস্থাপক। কেন না তিনি সবকিছুই অবগত আছেন। (এবং নিজের সমুদয় কাজে) মহা প্রজ্ঞাময়।"
হযরত ইউসুফ আ. যখন তাঁর জীবনের ঘটনাগুলোকে বিস্ময়কর ও অভিনবরূপ ঘটে আসতে দেখলেন, এবং প্রতি পদক্ষেপে আল্লাহ তাআলার মহিমা ও প্রজ্ঞার অতুলনীয় বহিঃপ্রকাশ হতে লাগল, তখন এ সব কিছুর শুরু ও সুন্দর সমাপ্তি দেখে আল্লাহ তাআলার শোকর আদায় করলেন-
رَبِّ قَدْ اٰتَیْتَنِیْ مِنَ الْمُلْكِ وَ عَلَّمْتَنِیْ مِنْ تَاْوِیْلِ الْاَحَادِیْثِۚ-فَاطِرَ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِۗ-اَنْتَ وَلِیّٖ فِی الدُّنْیَا وَ الْاٰخِرَةِۚ-تَوَفَّنِیْ مُسْلِمًا وَّ اَلْحِقْنِیْ بِالصّٰلِحِیْنَ
"হে পালনকর্তা! আপনি আমাকে রাজ্য দান করেছেন। আর কথাসমূহের (স্বপ্নের) অর্থ ও ফল বের করাও শিখিয়েছেন। হে আসমান ও জমিনসমূহের সৃষ্টিকর্তা! আপনি আমার কার্যনির্বাহক, দুনিয়াতেও এবং আখেরাতেও। অতএব আমি যখন দুনিয়া হতে [বিদায় নিয়ে] যাব, তখন যেন আপনার ফরমাবরদার অবস্থায় যেতে পারি এবং যেন সেই সমস্ত লোকের অন্তর্ভুক্ত হই, যারা আপনার নেক বান্দা।"
তাওরাতে বর্ণিত আছে, এ ঘটনার পর হযরত ইউসুফ আ.-এর খান্দানের সমস্ত লোকই মিসরে বসবাস করতে থাকেন। কেন না ফেরাউন হযরত ইউসুফ আ.-কে খুব অনুরোধ করে বললেন, "আপনি আপনার খান্দানকে মিসরেই বসবাস করার ব্যবস্থা করে দিন, আমি তাদেরকে খুব উত্তম জমিন দান করব এবং তাদের সর্বপ্রকার সম্মান করব।" এ দেখে হযরত ইউসুফ আ. আপন বুযুর্গ পিতা এবং খান্দানের অন্যান্য সকলকে বুঝিয়ে দিলেন, ফেরাউন যখন আপনাদেরকে মিসরে বসবাস করার জন্য অনুরোধ করবেন এবং জমিন ও স্থান নির্বাচন করার জন্য বলবেন, তখন আপনারা অমুক অংশের জমি চাইবেন এবং বলবেন, যেহেতু আমরা যাযাবর জীবন যাপনে অভ্যস্ত এবং গৃহপালিত পশু চরাতে আগ্রহী, তাই সাধারণ শহুরে জীবন হতে পৃথক থাকাই আমাদের পছন্দনীয়। আর যখন ফেরাউন তোমাদের ডাকবে এবং জিজ্ঞাসা করবে তোমাদের পেশা কি? তখন তোমরা বলো, আপনার গোলামেরা যৌবন হতে আরম্ভ করে আজ পর্যন্ত চতুষ্পদ জন্তু প্রতিপালন ও পশু চরিয়ে আসছে। আমাদের পূর্বপুরুষেরাও তা-ই করতেন। ফেরাউন বলল, তোমরা আনন্দময় জমিনে থাকবে। কেন না মিসরবাসীরা সর্বপ্রকার চতুষ্পদ জন্তুকে ঘৃণা করে।
হযরত ইউসুফ আ.-এর উদ্দেশ্য ছিল, এরূপে মিসরবাসীগণ হতে পৃথক থাকলে বনি ইসরাঈল নিজেদের ধর্মীয় জীবনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে, মূর্তিপূজক মিসরবাসীদের প্রতি ঘৃণা পোষণ করবে। মিসরের অসৎ চরিত্র এবং নিম্নমানের শহরী অভ্যাস ও স্বভাব হতে সুরক্ষিত থাকতে পারবে। সুতরাং নিজেদের সাহসিকতাপূর্ণ যাযাবর জীবনকে কখনো ভুলবে না।
📄 গুরুত্বপূর্ণ চারিত্রিক বিষয়সমূহ
হযরত ইউসুফ আ.-এর এ বিস্ময়কর ও অভিনব ঘটনাবলীর মধ্যে ধী-সম্পন্ন লোকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কতগুলো চারিত্রিক বিষয় নিহিত আছে। আসলে এটি শুধু একটি জীবনীই নয়; ফযিলত ও আখলাকের এমন একটি আশ্চর্য সুন্দর আখ্যান, যার প্রতিটা দিক নসিহত ও জ্ঞানের মণি-মুক্তায় কানায় কানায় পূর্ণ। ঈমানী শক্তি, ধৈর্য, আত্মসংযম, সবর, শোকর, পবিত্রতা, দীনদারী, বিশ্বস্ততা, ক্ষমা, তাবলীগের অনুপ্রেরণা, আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত করার আকুলতা, আত্মসংশোধন ও খোদাভীতির মতো উচ্চপর্যায়ের আখলাক ও মহৎ গুণাবলীর এক দুর্লভ স্বর্ণশৃঙ্খল। যা হযরত ইউসুফ আ. সমূহ ঘটনার পরতে পরতে দেখা যায়। তন্মধ্য হতে নিম্নবর্ণিত কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
১. যদি কোনো ব্যক্তির নিজস্ব প্রকৃতি ও স্বভাব উত্তম হয় এবং তার পরিবেশও পবিত্র নিষ্কলঙ্ক হয়, তবে সেই ব্যক্তির জীবন হবে মহৎ চরিত্রে সুস্পষ্ট; উচ্চস্তরের গুণাবলীতে বিশিষ্ট এবং তিনি হবেন সর্বপ্রকারের মাহাত্ম্য ও বুযুর্গীর ধারক ও বাহক। হযরত ইউসুফ আ.-এর পবিত্র যিন্দেগির উত্তম দৃষ্টান্ত। তিনি ইয়াকুব, ইসহাক এবং ইবরাহীম আ.-এর মতো উচ্চ মর্যাদাশীল নবী ও পয়গাম্বরগণের সন্তান ছিলেন। তিনি প্রতিপালিত হন নবুয়ত ও রিসালতের দোলনায়। শিক্ষাদীক্ষা লাভ করেন নবুয়ত ও রিসালাতের পরিবার-পরিবেশে। তাঁর নিজস্ব নেকপ্রকৃতি এবং স্বভাবগত পবিত্রতা যখন এমনি নির্মল পরিবেশ পেল, তখন তাঁর সমুদয় প্রশংসনীয় স্বভাব-প্রকৃতি ও গুণাবলী প্রদীপ্ত হয়ে উঠল! ফলে তাঁর জীবনের সব অবস্থায় পরহেযগারী, সাধুতা, ধৈর্য-সহ্য, দীনদারী এবং খোদাপ্রেমের এমন উজ্জ্বল বিকাশ হল, যা দেখে মানুষ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল।
২. যদি কোনো ব্যক্তির মধ্যে আল্লাহর প্রতি ঈমান সঠিক ও সুদৃঢ় হয় এবং তাঁর প্রতি তার বিশ্বাস মযবুত ও দৃঢ় হয়, তবে এ পথের সমস্ত জটিলতা ও কঠিনতা তার জন্য সহজ বরং সহজতর হয়ে যায়। সত্য দর্শনের পর সমস্ত বিপদাপদ অতি তুচ্ছ হয়ে যায়। হযরত ইউসুফ আ.-এর জীবনে এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে পরিদৃষ্ট হয়।
৩. পরীক্ষাটা বিপদ-মুসিবত ও ধ্বংসের আকৃতিতেই হোক কিংবা ধন-দৌলত ও রিপুর কামনা-বাসনার সুন্দর উপকরণের আকারেই হোক। সর্বাবস্থায় মানুষের উচিত আল্লাহ পাকের দিকে রুজু করা, আল্লাহর দরবারেই কাকুতি মিনতি করা। যেন তিনি সত্যের ওপর দৃঢ়পদ রাখেন এবং ধৈর্য-সহ্য দান করেন। আযীযে মিসরের বিবি এবং মিসরীয় রমণীদের অসৎ প্ররোচনা এবং তাদের মনষ্কামনা পূর্ণ না করলে জেলে আবদ্ধ করার ধমক, এরপর জেলখানার নানাপ্রকার কষ্ট ইত্যাদি সমস্ত অবস্থায় হযরত ইউসুফ আ.-এর ভরসা, তাঁর দুআ মিনতিসমূহের কেন্দ্রস্থল কেবলমাত্র আল্লাহ তাআলা। তিনি আযীযে মিসরের সম্মুখে আবেদন করেন নি কিছুর। ফেরাউনের দরবারেও না। তিনি মিসরের সুন্দরী রমণীদের সঙ্গেও মন লাগাচ্ছেন না, নিজের প্রভুর সুন্দরী স্ত্রীর সঙ্গেও না। বরং প্রত্যেক ক্ষেত্রে শুধু আল্লাহ তাআলার সাহায্য প্রার্থী হিসেবেই তাকে দেখা যায়। যেমন তিনি বলেছেন: (রব্বি সিজ্নু আহাব্বু ইলাইয়্যা মিম্মা ইয়াদঊনানী ইলাইহি) অর্থাৎ “হে আমার প্রতিপালক! এ রমণীরা আমাকে যেদিকে আহ্বান করছে, এর চেয়ে জেলখানাই আমার নিকট শ্রেয়।" (ক্বালা মাআযাল্লাহি ইন্নি রব্বী আহসানা মাছওয়াইয়্যা ইন্নাহু লা ইউফলিহুজ জালিমুন) অর্থাৎ "আল্লাহর আশ্রয় ভিক্ষা চাচ্ছি। নিঃসন্দেহ তিনি (আযীযে মিসর) আমার মুরব্বি, আমাকে সম্মান ও মর্যাদার সাথে রাখছেন।"
৪. যখন আল্লাহ তাআলার মহব্বত এবং ইশক অন্তরের গভীরে প্রবেশ করে, তখন মানুষের জীবনের সম্পূর্ণ উদ্দেশ্য একমাত্র তিনিই হয়ে যান। তাঁর দীনের দাওয়াত, তাবলীগের ইশক সর্বক্ষণ ধমনীসমূহে ও শিরায় শিরায় ধাবিত হতে থকে। যেমন জেলখানার কঠিন বিপদের সময় নিজের সাথীদের সাথে ইউসুফ আ.-এর সর্বপ্রথম কথা ছিল এটাই- (ইয়া সহিবায়িস সিজনি আ-আরবাবু ম্মুতাফাররিক্বুনা খয়রুন অমিল্লাহুল ওহিদুল ক্বাহহার) অর্থাৎ “হে আমার জেলখানার বন্ধুদ্বয়! পৃথক পৃথক বহু দেবতার উপাসনাই কি ভালো, না-কি এক মহা শক্তিমান আল্লাহর ইবাদত উত্তম?
৫. দীনদারী ও বিশ্বস্ততা এমন একটি নেয়ামত, একে মানুষের ধর্মীয় ও পার্থিব সৌভাগ্যের চাবিকাঠি বলা যেতে পারে। আযীযে মিসরের কাছে হযরত ইউসুফ আ. যেরূপে প্রবেশ করেছিলেন - ঘটনাবলীর বিস্তৃত বিবরণে যেমনটি জানা গেছে- এটা ইউসুফ আ.-এর দীনদারী এবং বিশ্বস্ততারই সুফল ছিল। অর্থাৎ প্রথম তিনি আযীযে মিসরের দৃষ্টিতে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ও প্রিয় হন। তারপর একেবারে সমগ্র মিসর রাজ্যের মালিকই হয়ে বসেন।
৬. আত্মনির্ভশীলতা মানুষের উচ্চ শ্রেণীর গুণাবলীর অন্তর্গত একটি মহৎ গুণ। আলাহ তাআলা যাকে এ দৌলত দান করেন, সে ব্যক্তিই দুনিয়ার সর্বপ্রকার বিপদাপদ ও দুঃখ-কষ্ট অতিক্রম করে দুনিয়া ও আখেরাতের উন্নতি লাভ করতে পারে। আত্মনির্ভশীলতার বিভিন্ন প্রকারের মধ্যে একটি প্রকার হচ্ছে আত্মসম্মানবোধ। যার আত্মসম্মানবোধ নেই, সে মানুষই নয়; একখণ্ড মাংসপিণ্ড মাত্র। হযরত ইউসুফ আ.-এর আত্মসম্মান রক্ষার অবস্থা ছিল এমনই, বহু বছর পরে যখন জেলখানার বন্দিদশা হতে মুক্তির আদেশ প্রাপ্ত হন এবং তৎকালীন বাদশার তরফ হতে সম্মানজনক পয়গাম লাভ করেন, তখন আনন্দ ও খুশির সাথে তৎক্ষণাৎই একে অভিনন্দন জানান নি বরং পরিষ্কার ভাষায় অস্বীকার করে বসেন- "আমি তখন পর্যন্ত জেলখানা হতে বের হব না, যে পর্যন্ত না মীমাংসা হয়ে যায় যে, মিসরীয় রমণীরা ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আমার সাথে যে ব্যবহার করেছে, তার প্রকৃত স্বরূপ কি?" যেমন, কুরআন মাজিদে বর্ণিত রয়েছে: (ফালাম্মা জায়াহুর রসূলু ক্বালারজি ইলা রব্বিকা ফাসআলহু মা বালুন নিসওয়াতিল্লাতি ক্বাত্তানা আইদিয়াহুন্না ইন্না রব্বী বিকাইদিহিন্না আলীম) অর্থাৎ "যখন বাদশার প্রেরিত দূত (মুক্তির আদেশ নিয়ে) তাঁর নিকট আসল, তখন তিনি বললেন: তুমি তোমার প্রভুর নিকট ফিরে যাও এবং তাঁকে জিজ্ঞাসা কর, সেই রমণীদের কি অবস্থা, যারা নিজেদের হাত কেটে ফেলে ছিল?"
৭. সবর একটি অতি উচ্চ মানের স্বভাব এবং বহু মন্দ কাজের জন্য বাধা ও ঢাল স্বরূপ। কুরআন মাজিদে সত্তরেরও বেশি জায়গায় ফযিলতের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আর আল্লাহ তাআলা বহু উচ্চ মর্যাদার মূলসূত্র এ ফযিলতের ওপরই প্রতিষ্ঠিত রেখেছেন। (অয়াজাআলনা মিনহুম আইম্মাতাইঁ ইয়াহদুনা বিআম্রিনা লাম্মা সাবারু অয়াক্বানু বিআয়াতিনা ইউক্বিনুন) অর্থাৎ "আর আমি তাদের মধ্য হতে অনুসরণীয় ও বরেণ্য বানিয়েছি যাঁরা আমার আহকাম প্রচারকারী হয়েছেন, যখন তাঁরা ছবরের ফযিলতরূপী অলঙ্কারে ভূষিত হয়েছেন।" (অতাম্মাত কলিমাতু রব্বিকাল হুসনা আলা বনী ইসরাইলা বিমা সাবারু) অর্থাৎ "আর বনি ইসরাঈলের উপর আপনার রবের উত্তমবাণী পূর্ণ হয়েছে এ কারণে, তারা ধৈর্যধারণকারী ছিল।” (অবাশশিরিস সাবিরীনাল্লাযীনা ইযা আসাবাহুম মুসীবাতুন ক্বালু ইন্না লিল্লাহি অয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন) অর্থাৎ "আর সুসংবাদ দিন সেই ধৈর্যশীলদের, যখন তাদের ওপর কোনো বিপদাপদ অবতীর্ণ হয়, তখন তারা বলে উঠে: ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। নিঃসন্দেহ আমরা আল্লাহ তাআলারই জন্য এবং নিঃসন্দেহ, আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।"
(ফাসবির কামা সাবারু উলুল আযমি মিনার রুসুলি অয়ালা তাসতাজিল্লাহুম) অর্থাৎ "(হে নবী)! আপনি তেমনি সবর করুন, যেমন উচ্চ সংকল্পশালী পয়গম্বরগণ সবর করেছিলেন। (অসতাঈনু বিসসাবরি অয়াসালাতি) অর্থাৎ "আর (আল্লাহ হতে) সাহায্য চাও সবর ও নামায দ্বারা।" রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "সবর ঈমানের অর্ধাংশ।" বায়হাকি শরিফে আছে- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে একবার কেউ ঈমানের সূত্র জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, 'সবর এবং বদান্যতা।' বাস্তবিকভাবে সবর এমন একটি গুণের নাম, যার দ্বারা মানুষ যাবতীয় মন্দ কাজ থেকে নিবৃত্ত থাকতে পারে। খারাপির থেকে বিরত থাকতে পারে। এটি শুধু মানুষেরই বিশেষত্ব। এ গুণটিই মানুষকে অন্যান্য সকল প্রাণী হতে পৃথক করে দিয়েছে।
৮. উত্তম চরিত্রসমূহের মধ্যে 'শোকর'ও একটি উত্তম স্বভাব। কেন না এটা খোদায়ি স্বভাবসমূহের মধ্য হতে একটি অতি উচ্চ স্বভাব। কুরআন মাজিদে বর্ণিত আছে: (অয়াল্লাহু শাকুরুম হালীম) মানুষের গুণাবলীর মধ্যে শোকর এমন গুণের নাম, যার দ্বারা প্রকৃত নেয়ামতদাতার নেয়ামতের স্বীকার করা হয়। তার ওপর আনন্দ ও খুশি প্রকাশ করা হয় এবং সেই নেয়ামতকে নেয়ামতদাতা ও অনুগ্রহকারীর পছন্দনীয় উপায়ে ব্যবহার করা হয়। কুরআন মাজিদে আছে: (ফাজকুরুনী আজকুরকুম অশাকুরুলী অয়ালা তাকফুরুন) অর্থাৎ "অতএব তোমরা আমাকে স্মরণ কর! আমি তোমাদেরকে স্মরণ করব। আর তোমরা আমার (নেয়ামতের) শোকর কর এবং না-শোকরি করো না।" (মায়া ইয়াফআলুল্লাহা বিআযাবিকুম ইন শাকরতুম অয়া আমানতুম অয়াকানাল্লাহু শাকিরান আলীমা) অর্থাৎ "আল্লাহ তোমাদের আযাব দেবেন না, যদি তোমরা তাঁর শোকরকারী এবং তাঁর প্রতি ঈমান আনয়নকারী থাক।" (লাইল লিন শাকরতুম লা আযীদান্নাকুম) অর্থাৎ তোমরা যদি শোকরগুযার হও, তবে আমি (তোমাদের নেয়ামতসমূহ) বাড়িয়ে দেব। কিন্তু আফসোসের বিষয় হল, প্রকৃত শোকরগুযার খুবই কম। যেমন আল্লাহ পাক বলেন: (অয়াক্বালীলুম মিন ইবাদিয়াশ শাকূর) অর্থাৎ "আমার বান্দাগণের মধ্য হতে প্রকৃত শোকরগুযার খুবই অল্প।"
৯. হিংসা-বিদ্বেষের পরিণাম হিংসুক-বিদ্বেষীর জন্যই ক্ষতিকর হয়ে থাকে। যদিও কোনো কোনো সময় হিংসাকৃত ব্যক্তির পার্থিব ক্ষতি হয়ে যাওয়া সম্ভব; কিন্তু হিংসুকের কোনো অবস্থায়ই মঙ্গল হয় না। খাসিরাদ দুনিয়া অয়াল আখিরাহ - “সে দুনিয়া- আখেরাত উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। অবশ্য যদি তওবা করে নেয় এবং হিংসুটে জীবন পরিত্যাগ করে। হযরত ইউসুফ আ.-এর ভাইদের ঘটনাবলী আমাদের চোখের সম্মুখে বিদ্যমান এবং তাদের পরিণামও; কিন্তু অর্ন্তদৃষ্টির জন্য চক্ষু থাকা শর্ত।
১০. সততা, দীনদারি, বিশ্বস্ততা, সবর, শোকর-এর মতো উচ্চস্তরের গুণাবলীসমৃদ্ধ জীবনই প্রকৃত জীবন। যদি মানুষের মধ্যে এ সমস্ত গুণাবলী না থাকে, তবে সে মানুষ নয়। যেমন কুরআন মাজিদে আছে: (উলাইকা কালানআমি বাল হুম আদাল্লু) অর্থাৎ "তারা (অবাধ্য ও নাফরমানরা) পশুতুল্য, বরং (পশুর চেয়ে) আরো অধম।"
১১. হযরত ইউসুফ আ.-এর মহৎ স্বভাব এবং উচ্চস্তরের গুণাবলীর প্রশংসা ও ফযিলতের সর্বাপেক্ষা অধিক গুরুত্বপূর্ণ সেই বাক্যটি, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সম্বন্ধে বলেছেন: (আল কারিম ইব্নুল কারিম ইব্নুল কারিম ইব্নুল কারিম)। ইউসুফ ইবনে ইয়াকুব ইবনে ইসহাক ইবনে ইবরাহীম আ.। অর্থাৎ সেই বংশধারা, যা চার পুরুষ ধরে নবুয়তের বুযুর্গী থেকে ফয়েয লাভ করেছে, তা ইউসুফ ইবনে ইয়াকুব ইবনে ইসহাক ইবনে ইবরাহীম আ.-এর বংশধারা।
📄 অন্তিমকাল
হযরত ইউসুফ আ. যখন দেখলেন, তাঁর প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ পরিপূর্ণ হয়েছে। তাঁর আশা-আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়ে গেছে। তখন উপলব্ধি করলেন, এ পৃথিবীতে কোনো কিছুরই স্থায়িত্ব নেই। যা কিছু আছে, সবই ধ্বংস হবে। আর 'পূর্ণতার পরেই আসে ক্ষয়ের পালা'। তখন তিনি আল্লাহর যথাযোগ্য প্রশংসা করলেন। আল্লাহর অনেক অনুগ্রহ ও করুণার কথা স্বীকার করলেন এবং মুসলিম অবস্থায় মৃত্যু দান এবং সৎলোকদের অন্তর্ভুক্ত রাখার জন্য দুআ করলেন। তাঁর এ দুআ ছিল এমন পর্যায়ের, যেমন অন্যান্য সময় দুআর মধ্যে বলা হয়- (আল্লাহুম্মা আহইনা মুসলিমিনা অয়া তাওয়াসানা মুসলিমিন) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাদেরকে মুসলিমরূপে জীবিত রাখুন এবং মুসলিমরূপে মৃত্যু দান করুন! অর্থাৎ, যখন আপনি আমাদের মৃত্যু দেবেন, তখন যেন আমরা মুসলমান থাকি। আবার বলা যায়, তিনি এ দুআ করেছিলেন মৃত্যুশয্যায় থাকা অবস্থায়। যেমনিভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মৃত্যুশয্যায় দোয়া করেছিলেন তাঁর রূহকে ঊর্ধ্বজগতে উঠিয়ে নিতে এবং নবী-রাসূল ও সালিহীনদের অন্তর্ভুক্ত করতে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন: (আল্লাহুম্মা ফির রফিকিল আ'লা) এ দুআটি তিনবার বলার পর তিনি ইনতিকাল করেন।