📄 কারাগারে হযরত ইউসুফ আ.
ইউসুফ আ.-কে কারাগারে প্রেরণ করা হল। একজন নির্দোষীকে দোষী এবং একজন নিরপরাধ লোককে অপরাধী বানিয়ে দেওয়া হল। যেন আযীযের স্ত্রী অপমান ও দুর্নাম হতে রক্ষা পায় এবং অপরাধীকে 'হে অপরাধী!' বলতে না পারে। এরপর কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে:
ثُمَّ بَدَا لَهُمْ مِنْ بَعْدِ مَا رَأَوُا الْآيَاتِ لَيَسْجُنُنَّهُ حَتَّىٰ حِينٍ (৩৫) وَدَخَلَ مَعَهُ السِّجْنَ فَتَيَانِ ۖ قَالَ أَحَدُهُمَا إِنِّي أَرَانِي أَعْصِرُ خَمْرًا ۖ وَقَالَ الْآخَرُ إِنِّي أَرَانِي أَحْمِلُ فَوْقَ رَأْسِي خُبْزًا تَأْكُلُ الطَّيْرُ مِنْهُ ۖ نَبِّئْنَا بِتَأْوِيلِهِ ۖ إِنَّا نَرَاكَ مِنَ الْمُحْسِنِينَ (৩৬) قَالَ لَا يَأْتِيكُمَا طَعَامٌ تُرْزَقَانِهِ إِلَّا نَبَّأْتُكُمَا بِتَأْوِيلِهِ قَبْلَ أَنْ يَأْتِيَكُمَا ۚ ذٰلِكُمَا مِمَّا عَلَّمَنِي رَبِّي ۚ إِنِّي تَرَكْتُ مِلَّةَ قَوْمٍ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَهُمْ بِالْآخِرَةِ هُمْ كَافِرُونَ (৩৭) وَاتَّبَعْتُ مِلَّةَ آبَائِي إِبْرَاهِيمَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ ۚ مَا كَانَ لَنَا أَنْ نُشْرِكَ بِاللَّهِ مِنْ شَيْءٍ ۚ ذٰلِكَ مِنْ فَضْلِ اللَّهِ عَلَيْنَا وَعَلَى النَّاسِ وَلٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَشْكُرُونَ (৩৮) يَا صَاحِبَيِ السِّجْنِ أَأَرْبَابٌ مُتَفَرِّقُونَ خَيْرٌ أَمِ اللَّهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ (৩৯) مَا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِهِ إِلَّا أَسْمَاءً سَمَّيْتُمُوهَا أَنْتُمْ وَآبَاؤُكُمْ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ بِهَا مِنْ سُلْطَانٍ ۚ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ ۚ أَمَرَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ ۚ ذٰلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ (৪০) يَا صَاحِبَيِ السِّجْنِ أَمَّا أَحَدُكُمَا فَيَسْقِي رَبَّهُ خَمْرًا ۖ وَأَمَّا الْآخَرُ فَيُصْلَبُ فَتَأْكُلُ الطَّيْرُ مِنْ رَأْسِهِ ۚ قُضِيَ الْأَمْرُ الَّذِي فِيهِ تَسْتَفْتِيَانِ
নিদর্শনাবলী দেখার পর তাদের মনে হল, তাকে কিছুকালের জন্য কারারুদ্ধ করতে হবে। তার সাথে দুজন যুবক কারাগারে প্রবেশ করল। ওদের একজন বলল আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি আঙুর নিংড়িয়ে রস বের করছি এবং অপরজন বলল: 'আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি আমার মাথার উপর রুটি বহন করছি এবং পাখি তা থেকে খাচ্ছে। আমাদেরকে তুমি এর তাৎপর্য জানিয়ে দাও, আমরা তোমাকে সৎকর্মপরায়ণ দেখেছি। ইউসুফ বলল: 'তোমাদেরকে যে খাদ্য দেওয়া হয়, তা আসার পূর্বে আমি তোমাদের স্বপ্নের তাৎপর্য জানিয়ে দেব। আমি যা তোমাদের বলব, তা আমার প্রতিপালক আমাকে যা শিক্ষা দিয়েছেন, তা হতে বলব। যে সম্প্রদায় আল্লাহকে বিশ্বাস করে না ও পরলোকে অবিশ্বাসী আমি তাদের মতবাদ বর্জন করেছি। আমি আমার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়াকুবের মতবাদ অনুসরণ করি। আল্লাহর সাথে কোনো বস্তুকে শরিক করা আমাদের কাজ নয়। এটা আমাদের ও সমস্ত মানুষের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। 'হে কারাসঙ্গীরা! ভিন্ন ভিন্ন বহু প্রতিপালক শ্রেয়, না পরাক্রমশালী এক আল্লাহ? তাকে ছেড়ে তোমরা কেবল কতকগুলো নামের ইবাদত করছ, যে নাম তোমাদের পিতৃপুরুষ ও তোমরা রেখেছ, এগুলোর কোনো প্রমাণ আল্লাহ পাঠান নি। বিধান দেওয়ার অধিকার কেবল আল্লাহর। তিনি আদেশ দিয়েছেন অন্য কারও ইবাদত না করতে কেবল তাঁর ব্যতীত। এটাই সরল দীন কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা অবগত নয়। 'হে কারাসঙ্গীদ্বয়! তোমাদের একজনের সম্বন্ধে কথা হলো- একজন তার মনিবকে মদ পান করাবে এবং অপরজন শূলবিদ্ধ হবে। তারপর তার মাথা থেকে পাখি আহার করবে। যে বিষয়ে তোমরা জানতে চেয়েছ, তার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে!
📄 দাওয়াত ও তাবলীগ
ঘটনাক্রমে ইউসুফ আ.-এর সাথে আরো দুজন যুবক জেলখানায় প্রবেশ করল। তাদের মধ্যে একজন বাদশার শরাব পরিবেশনকারী; দ্বিতীয়জন বাদশার পাকশালার দারোগা। একদিন তারা উভয়ে হযরত ইউসুফ আ.-এর খেদমতে হাযির হল। তাদের মধ্যে শরাব পরিবেশক বলল: আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি শরাব প্রস্তুত করার জন্য আঙ্গুর নিংড়িয়ে রস বের করছি। অপরজন বলল: আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমার মাথার উপর রুটির খাঞ্চা রয়েছে; পক্ষীরা তা হতে খাচ্ছে।
হযরত ইউসুফ আ. ছিলেন নবীর পুত্র। ইসলাম প্রচারের রুচি তাঁর স্নায়ুমন্ডলীর সাথে সংমিশ্রিত ছিল। তদুপরি আল্লাহ তাআলা তাঁকেও নবুয়তের জন্য মনোনীত করেছেন। সুতরাং সত্যধর্মের প্রচারই ছিল তাঁর জীবনের মূখ্য উদ্দেশ্য। যদিও জেলখানায় ছিলেন, কিন্তু জীবনের উদ্দেশ্যকে কেমন করে ভুলতে পারেন? আর যদিও বিপদে ও মসিবতে ছিলেন, কিন্তু আল্লাহর বাণী সমুন্নত করাকে ভুলে যাবেন, এটা কি করে সম্ভব হতে পারে? তাই এ সময়টিকে সুবর্ণ সুযোগ মনে করে নম্রতা ও মহব্বতের সাথে তাদের বললেন: নিঃসন্দেহ আল্লাহ তাআলা আমাকে যে সমস্ত বিষয় শিক্ষা দিয়েছেন, তন্মধ্যে এ জ্ঞানটিও তিনি আমাকে দান করেছেন। সুতরাং তোমাদের নিকট তোমাদের নির্ধারিত খাদ্যদ্রব্য আসার আগেই আমি তোমাদের স্বপ্নের ফলাফল বলে দিব; কিন্তু তোমাদেরকে একটি বিশেষ কথা বলছি। তা গভীর মনোযোগের সাথে বুঝতে চেষ্টা কর।
আমি ওই সমস্ত লোকের ধর্ম অবলম্বন করি নি, যারা আল্লাহ তাআলার ওপর ঈমান রাখে না এবং আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে না। আমি আমার পিতা ও পিতামহ ইয়াকুব, ইসহাক ও ইবরাহীম আ.-এর ধর্মের অনুসরণ করছি। আমি কখনো আল্লাহ পাকের সঙ্গে কোনো বস্তুকেই শরিক সাব্যস্ত করতে পারি না। এটা আল্লাহ পাকের একটি অনুগ্রহ, যা তিনি আমার উপর এবং আরো বহু লোকের উপর করেছেন, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এর শোকরগুযারী করে না। বন্ধুগণ! তোমরা কি ভেবে দেখছ, ভিন্ন ভিন্ন বহু মাবুদ হওয়া উত্তম, না একমাত্র সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলাই মাবুদ হওয়া উত্তম? তোমরা তাঁকে ছাড়া আর যাদের ইবাদত করছ, তাদের স্বরূপ এর চেয়ে অধিক কিছুই নয়, তা কয়েকটি নাম মাত্র। যা তোমাদের বাপ-দাদারা মনগড়া স্থির করে নিয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য কখনও কোনো সনদ নাযিল করেন নি। শাসনক্ষমতা তো শুধু আল্লাহ পাকের জন্যই রয়েছে। তিনি হুকুম করেছেন, তাঁকে ছাড়া আর কারো ইবাদত করো না। এটাই সত্য-সরল ধর্ম কিন্তু অধিকাংশ মানুষ নির্বোধ, তারা জানে না।
এরপর তিনি স্বপ্নের ব্যাখ্যা দান করে বলেন: "হে আমার জেলখানার সাথীরা। তোমাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা হলো, তোমাদের দুজনের মধ্যে একজন আপন মনিবকে মদ পান করাবে।" সে লোকটি ছিল সাকী। "আর দ্বিতীয়জনকে শূলে চড়ানো হবে এবং পাখিরা তার মাথা থেকে আহার করবে।” সে ব্যক্তিটি ছিল রুটি প্রস্তুতকারী। “যে বিষয়ে তোমরা জানতে চেয়েছিলে, তার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে।” অর্থাৎ যা বলে দেওয়া হল, তা অবশ্যম্ভাবীরূপে কার্যকর হবে এবং যেভাবে বলা হল সেভাবেই হবে।
সেসময় যে ব্যক্তি সম্পর্কে ইউসুফ আ.-এর ধারণা ছিল মুক্তি পাবে। তাকে তিনি বলে দিলেন, (উযকুরনী ইনদা রব্বিকা) অর্থাৎ তোমার প্রভুর কাছে আমার কথা বলবে। অর্থাৎ আমি যে বিনা অপরাধে জেলখানায় আছি, এ বিষয়ে বাদশার কাছে আলোচনা করবে। এ থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়, উপায় অবলম্বনের চেষ্টা করা বৈধ এবং তা আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়। কিন্তু ওই মুক্তিলাভকারী যে লোকটিকে ইউসুফ আ. এ অনুরোধ করেছিলেন, সে বাদশার কাছে আলোচনা করতে শয়তান তাকে ভুলিয়ে দিল।
তাওরাতে এ প্রসঙ্গে উদ্ধৃত হয়েছে: “তখন ইউসুফ আ. বললেন, এর তাবীর ছিল-মনে কর, এ তিনটি ডাল তিনটি দিন। এখন হতে তিন দিনের মধ্যে বাদশাহ তোমার মোকদ্দমার রায় প্রদান করবেন এবং তোমাকে চাকরির পদ পুনরায় প্রদান করবেন এবং পূর্বে যেমনি তুমি ফেরাউনের শরাব পরিবেশক ছিলে, তদ্রুপ আবার তুমি শরাবের পেয়ালা ফেরাউনের হাতে দেবে। আর যখন তুমি খোশহাল হবে, তখন আমাকে স্মরণ কর এবং জেলখানা থেকে আমার মুক্তির কথা বলো। কেন না কাফেলার লোকেরা ইরানীদের দেশ হতে আমাকে অপহরণ করে নিয়ে এসেছে আর এখানেও আমি এমন কোনো কাজ করে নি, তারা আমাকে এ জেলখানায় আটকে রাখবে।"
📄 ফেরাউনের স্বপ্ন
হযরত ইউসুফ আ. এখনও কারাগারেই আছেন। ইতোমধ্যে সেই যুগের ফেরআউন এক স্বপ্ন দেখল, সাতটি খুব মোটা তাজা স্থূলকায় গাভী আর সাতটি কৃশকায় গাভী। কৃশ ও দুর্বল গাভীগুলি মোট ও স্থূলকায় গাভীগুলিকে গিলে ফেলল। আরও দেখল, সাতটি সতেজ ও সবুজ শস্যের শীষ আর সাতটি শুষ্ক শস্যের শীষ। শুষ্ক শীষগুলি সতেজ শীষগুলিকে খেয়ে ফেলল। বাদশা শয্যাত্যাগ করে অত্যন্ত অস্থির ও বিচলিত হয়ে পড়লেন এবং বিচিত্র ও আশ্চর্যজনক স্বপ্নের জন্য খুব পেরেশান হলেন। তৎক্ষণাৎ দরবারের উপদেষ্টাদের নিকট স্বপ্নটি বর্ণনা করে তার ফলাফল জানতে চাইলেন। দরবারীরাও তা শ্রবণ করে বিচলিত ও অস্থির হয়ে পড়ল। যখন কেউই সামাধান করতে পারল না, তখন নিজেদের অক্ষমতা ও অপারগতা গোপন করার জন্য বলল: বাদশা! এটা স্বপ্ন নয়; মনের বাজে কল্পনা, যার কোনো নির্দিষ্ট অর্থ নেই। আমরা প্রকৃত স্বপ্নের তাবীর তো বলতে পারি, কিন্তু বাজে কল্পনাসমূহের সমাধান দিতে পারি না। বাদশা দরবারীদের এ উত্তরে তৃপ্ত হতে পারলেন না। এমন সময়ে বাদশার শারাব পরিবেশনকারীরর নিজের স্বপ্ন এবং ইউসুফ আ.-এর তাবীরের কথা স্মরণ হল। সে বাদশার খেদমতে আরয করল, একটু অবকাশ দিলে আমি এ স্বপ্নের তাবীর এনে দিতে পারি। আমাকে এখান হতে যেতে অনুমতি দিন। বাদশা অনুমতি পেয়ে তৎক্ষণাৎ জেলখানায় পৌঁছে হযরত ইউসুফ আ.-কে বাদশাহর স্বপ্ন বৃত্তান্ত শুনাল এবং বলল, এর সমাধান দিন। কেন না আপনি সততা ও পবিত্রতার মূর্তপ্রতীক। আপনিই এই স্বপ্নের ফলাফল বলতে পারেন। হয়তো যিনি আমাকে প্রেরণ করেছেন, আমি যখন সঠিক তাবীর নিয়ে তাঁর নিকট প্রত্যাবর্তন করব তখন তিনি আপনার সত্যিকার সম্মান ও মর্যাদা উপলদ্ধি করবেন।
হযরত ইউসুফ আ.-এর পূর্ণ ধৈর্য-সহ্য ও উচ্চ মর্যাদা অনুমান করুন! শরাব পরিবেশককে তিরস্কারও করলেন না এবং বহু বছর পর্যন্ত ভুলে থাকার জন্য ধমকও দিলেন না আর ইলম বিতরণে কার্পণ্যও করলেন না। এরূপও ভাবলেন না, জালেমরা বিনা দোষে আমাকে জেলখানায় আবদ্ধ করে রেখেছে। তারা যদি এ স্বপ্নের সমাধান না পেয়ে ধ্বংস প্রাপ্ত হয়, তা হলে ভালো এই তাদের শাস্তি। না, এরূপ কিছুই করলেন না, তৎক্ষণাৎ স্বপ্নের তাবীর বলে দিলেন এবং নিজের তরফ হতে এ প্রসঙ্গে সঠিক তদবীরও বলে দিলেন এবং শরাব পরিবেশককে পূর্ণরূপে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন:
"এ স্বপ্নের তাবীর এবং এর ভিত্তিতে তোমাদের যা করতে হবে, তা হল, তোমরা একাধারে সাত বছর পর্যন্ত ক্ষেতি-কৃষি করতে থাকবে আর এ সাত বছর তোমাদের স্বচ্ছলতার বছর হবে। ক্ষেতের শস্য কাটার সময় যখন আসবে, তখন তোমাদের সারা বছরে খাদ্যের জন্য যে পরিমাণ শস্য প্রয়োজন, তা পৃথক করে নিবে। অবশিষ্ট শস্যগুলোকে শীষের মধ্যেই রেখে দেবে। তাতে তা কীট ইত্যাদি থেকে সংরক্ষিত থাকবে; নষ্টও হবে না। এ সাত বছরের পরে সাতটি বৎসর আসবে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের ও দুঃখ কষ্টের। তা তোমাদের পূর্ব সঞ্চিত সমস্ত শস্য নিঃশেষ করে দেবে। এরপর আবার একটি বছর আসবে, প্রচুর বৃষ্টিপাত বর্ষিবে। ক্ষেতি-কৃষি বেশ সবুজ এবং সতেজ হবে। লোকে নানা প্রকার ফল ও বীজ থেকে আরক এবং তৈল প্রচুর পরিমাণে বের করবে অর্থাৎ মোটাতাজা গাভীগুলো তাজা শীষগুলো স্বচ্ছল অবস্থার বছর আর দুর্বল ও কৃশ গাভীগুলো এবং শুষ্ক শীষগুলো দুর্ভিক্ষের বৎসর, যা স্বচ্ছলতার বৎসরের উৎপন্ন শস্যসমূহ খেয়ে নিঃশেষ করবে।
মোটকথা, ফেরাউনের উপরিউক্ত স্বপ্নের বর্ণনা দিয়ে কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে:
وَقَالَ الْمَلِكُ إِنِّي أَرَىٰ سَبْعَ بَقَرَاتٍ سِمَانٍ يَأْكُلُهُنَّ سَبْعٌ عِجَافٌ وَسَبْعَ سُنْبُلَاتٍ خُضْرٍ وَأُخَرَ يَابِسَاتٍ ۖ يَا أَيُّهَا الْمَلَأُ أَفْتُونِي فِي رُؤْيَايَ إِنْ كُنْتُمْ لِلرُّؤْيَا تَعْبُرُونَ (৪৩) قَالُوا أَضْغَاثُ أَحْلَامٍ ۖ وَمَا نَحْنُ بِتَأْوِيلِ الْأَحْلَامِ بِعَالِمِينَ (৪৪) وَقَالَ الَّذِي نَجَا مِنْهُمَا وَادَّكَرَ بَعْدَ أُمَّةٍ أَنَا أُنَبِّئُكُمْ بِتَأْوِيلِهِ فَأَرْسِلُونِ (৪৫) يُوسُفُ أَيُّهَا الصِّدِّيقُ أَفْتِنَا فِي سَبْعِ بَقَرَاتٍ سِمَانٍ يَأْكُلُهُنَّ سَبْعٌ عِجَافٌ وَسَبْعِ سُنْبُلَاتٍ خُضْرٍ وَأُخَرَ يَابِسَاتٍ لَعَلِّي أَرْجِعُ إِلَى النَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَعْلَمُونَ (৪৬) قَالَ تَزْرَعُونَ سَبْعَ سِنِينَ دَأَبًا فَمَا حَصَدْتُمْ فَذَرُوهُ فِي سُنْبُلِهِ إِلَّا قَلِيلًا مِمَّا تَأْكُلُونَ (৪৭) ثُمَّ يَأْتِي مِنْ بَعْدِ ذٰلِكَ سَبْعٌ شِدَادٌ يَأْكُلْنَ مَا قَدَّمْتُمْ لَهُنَّ إِلَّا قَلِيلًا مِمَّا تُحْصِنُونَ (৪৮) ثُمَّ يَأْتِي مِنْ بَعْدِ ذٰلِكَ عَامٌ فِيهِ يُغَاثُ النَّاسُ وَفِيهِ يَعْصِرُونَ
রাজা বলল, 'আমি স্বপ্নে দেখলাম, সাতটি স্থূলকায় গাভী ওদেরকে সাতটি শীর্ণকায় গাভী ভক্ষণ করছে এবং দেখলাম সাতটি সবুজ শীষ ও অপর সাতটি শুষ্ক। হে প্রধানগণ! যদি তোমরা স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে পার তবে আমার স্বপ্ন সম্বন্ধে অভিমত দাও।' ওরা বলল, 'এটা অর্থহীন স্বপ্ন এবং আমরা এরূপ স্বপ্ন-ব্যাখ্যায় অভিজ্ঞ নই।' দুজন কারাবন্দির মধ্যে যে মুক্তি পেয়েছিল এবং দীর্ঘকাল পরে যার স্মরণ হল, সে বলল: আমি এর তাৎপর্য তোমাদেরকে জানিয়ে দিব। সুতরাং তোমরা আমাকে পাঠাও। সে বলল, হে ইউসুফ! হে সত্যবাদী! সাতটি স্থূলকায় গাভী, তাদেরকে সাতটি শীর্ণকায় গাভী ভক্ষণ করছে এবং সাতটি সবুজ শীষ ও অপর সাতটি শুষ্ক শীষ সম্বন্ধে তুমি আমাদেরকে ব্যাখ্যা দাও। যাতে আমি তাদের কাছে ফিরে যেতে পারি এবং তারা অবগত হতে পারে। ইউসুফ বলল, 'তোমরা সাত বছর একাধিক্রমে চাষ করবে। তারপর তোমরা যে শস্য সংগ্রহ করবে, তার মধ্যে যে সামান্য পরিমাণ তোমরা ভক্ষণ করবে, তা ব্যতীত সমস্ত শীষ সমেত রেখে দেবে এবং এরপর আসবে সাতটি কঠিন বছর, এ সাত বছর যা পূর্বে সঞ্চয় করে রাখবে লোকে তা খাবে, কেবল সামান্য কিছু যা তোমরা সংরক্ষণ করবে তা ব্যতীত এবং এরপর আসবে এক বছর, সে বছর মানুষের জন্যে প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে এবং সে বছর মানুষ প্রচুর ফলের রস নিংড়াবে।
আহলে কিতাবরা বলেন: বাদশা স্বপ্নে দেখেন, তিনি এক নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছেন। হঠাৎ সেখান থেকে সাতটি মোটাতাজা গাভী উঠে এসে নদী তীরের সবুজ বাগিচায় চরতে শুরু করে। এরপর ওই নদী থেকে আরও সাতটি দুর্বল ও শীর্ণকায় গাভী উঠে এসে পূর্বের গাভীদের সাথে চরতে থাকে। এরপর এ দুর্বল গাভীগুলো মোটাতাজা গাভীদের কাছে গিয়ে সেগুলোকে খেয়ে ফেলে। এ সময় ভয়ে বাদশার ঘুম ভেঙ্গে যায়। কিছুক্ষণ পর বাদশা পুনরায় ঘুমিয়ে পড়েন। এবার আবার স্বপ্নে দেখেন, একটি ধান গাছে সাতটি সবুজ শীষ। আর অপর দিকে আছে সাতটি শুকনো ও শীর্ণ শীষ। শুকনো শীষগুলো সবুজ সতেজ শীষগুলোকে খেয়ে ফেলছে। বাদশা এবারও ভয়ে ভীত হয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠেন। পরে বাদশা পরিষদ ও সভাসদবর্গের কাছে স্বপ্নের বর্ণনা দিয়ে এর ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করলেন। কিন্তু তারা কেউই স্বপ্নের ব্যাখ্যায় পারদর্শী ছিল না। তাই তারা বলল, এটা তো অর্থহীন স্বপ্ন অর্থাৎ এটা হয়ত রাত্রিকালের স্বপ্ন বিভ্রাট। এর কোনো ব্যাখ্যা নেই। এ ছাড়া স্বপ্নের ব্যাখ্যা দানে আমরা পারদর্শীও নই।
এ সময় সেই কয়েদিটির ইউসুফ আ.-এর কথা স্মরণে পড়ল যে কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেছিল এবং যাকে হযরত ইউসুফ আ. অনুরোধ করেছিলেন তাঁর মনিবের নিকট ইউসুফ আ.-এর কথা আলোচনা করতে। কিন্তু এতদিন পর্যন্ত সে ঐ কথা ভুলে গিয়েছিল। আহলে কিতাবদের মতে, "বাদশার কাছে সাকী ইউসুফ আ.-এর আলোচনা করে। বাদশা ইউসুফ আ.-কে দরবারে ডেকে এনে স্বপ্নের বৃত্তান্ত তাঁকে জানান এবং ইউসুফ আ. তার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে শুনান" এটা ভুল। আহলে কিতাবদের পন্ডিত ও রাব্বানীদের মনগড়া কথা। সঠিক সেটাই, যা আল্লাহ কুরআনে বলেছেন। মোটকথা, সাকীর কথার উত্তরে ইউসুফ আ. কোনো শর্ত ছাড়াই এবং আশুমুক্তি কামনা না করেই তাৎক্ষণিকভাবে বাদশার স্বপ্নের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে শুনালেন এবং বলে দিলেন, প্রথম সাত বছর স্বাচ্ছন্দ্যময় হবে এবং তারপরের সাত বছর দুর্ভিক্ষ থাকবে।
সেই সাথে হযরত ইউসুফ আ. সচ্ছলতার সময় ও দুর্ভিক্ষকালে তাদের করণীয় সম্পর্কে পথনির্দেশ দিলেন। তিনি বললেন, প্রথম সাত বছরের ফসলের প্রয়োজনের অতিরিক্ত অংশ শীষসহ সঞ্চয় করে রাখবে। পরের সাত বছরে সঞ্চিত ফসল অল্প অল্প করে খরচ করবে। কেন না এর পরে ফসলের জন্যে বীজ পাওয়া দুষ্কর হতে পারে। এ থেকে হযরত ইউসুফ আ.-এর প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় পাওয়া যায়।
যা হোক! শরাব পরিবেশক বাদশার দরবারে প্রত্যাবর্তন করে এ সমস্ত বিবরণ শুনাল। বাদশা ইতোপূর্বে তার মুখে হযরত ইউসুফ আ.-এর প্রশংসার কয়েকটি বাক্য শুনেছিলেন। স্বপ্নফল বর্ণনার ব্যাপারটি দেখে তাঁর এল্ম, জ্ঞান, বুদ্ধি ও উচ্চমর্যাদা স্বীকার করে নিলেন এবং না দেখা বস্তুকে দেখার আগ্রহী হয়ে বললেন, এমন ব্যক্তিকে আমার নিকট নিয়ে আস। অবস্থা শুনে হযরত ইউসুফ আ. জেলখানা হতে বাইরে আসতে অস্বীকৃতি জানালেন এবং বললেন: এভাবে তো আমি যাওয়ার জন্য প্রস্তুত নই। তুমি তোমার প্রভুর নিকট যাও এবং তাঁকে বল, তিনি যেন এর অনুসন্ধান করেন, সেই স্ত্রীলোকদের কি হয়েছিল, যারা নিজেদের হাত কেটে ফেলেছিল? প্রথমে এ কথা পরিষ্কার হয়ে যাক, তারা কেমন ষড়যন্ত্র ও প্রতারণা করেছিল আর পালনকর্তা তো তাদের ধোঁকাবাজী ও প্রতারণা সম্বন্ধে খুব অবগত রয়েছেন।
হযরত ইউসুফ আ. বিনা দোষে বিনা অপরাধে বহু বছর যাবৎ জেলখানায় আবদ্ধ ছিলেন এবং বিনা কারণে তাঁকে কয়েদ করা হয়েছিল। এখন বাদশা যখন দয়াপরবশ হয়ে তাঁকে মুক্তির সুসংবাদ শুনালেন। তাই উচিত তো ছিল তিনি আনন্দ ও খুশির সাথে জেলখানা হতে বের হয়ে আসবেন; কিন্তু তিনি তদ্রুপ করলেন না বরং অতীত বিষয়ের অনুসন্ধান দাবি করলেন। এর কারণ, হযরত ইউসুফ আ. নবী বংশের সন্তান ছিলেন এবং নিজেও তিনি নিজেও মনোনীত নবী ও পয়গম্বর। সুতরাং আত্মমর্যাদাবোধ এবং আত্মসম্মানের পূর্ণ মাত্রারই অধিকারী। তিনি ভাবলেন, যদি আমি বাদশার এ মেহেরবানির কারণে মুক্ত হয়ে গেলাম, তবে এটা বাদশার মেহেরবানী ও দয়া বলে বিবেচিত হবে। অথচ আমার নির্দোষ ও পবিত্র হওয়া পর্দার অন্তরালে থেকে যাবে। আর এভাবে মুক্ত হলে শুধু আত্মসম্মানেই আঘাত লাগবে না বরং ধর্মের দাওয়াত ও তবলিগের সেই মহা গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যেরও ক্ষতি হবে, যা আমার জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য। অতএব এখনই আসল ব্যাপারটি সম্মুখে উপস্থিত করার এবং সত্য প্রকাশিত হওয়ার উৎকৃষ্ট সময়। যেমন পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে:
وَقَالَ الْمَلِكُ ائْتُونِي بِهِ ۖ فَلَمَّا جَاءَهُ الرَّسُولُ قَالَ ارْجِعْ إِلَىٰ رَبِّكَ فَاسْأَلْهُ مَا بَالُ النِّسْوَةِ اللَّاتِي قَطَّعْنَ أَيْدِيَهُنَّ ۚ إِنَّ رَبِّي بِكَيْدِهِنَّ عَلِيمٌ (৫০) قَالَ مَا خَطْبُكُنَّ إِذْ رَاوَدْتُنَّ يُوسُفَ عَنْ نَفْسِهِ ۚ قُلْنَا حَاشَ لِلَّهِ مَا عَلِمْنَا عَلَيْهِ مِنْ سُوءٍ ۚ قَالَتِ امْرَأَتُ الْعَزِيزِ الْآنَ حَصْحَصَ الْحَقُّ أَنَا رَاوَدْتُهُ عَنْ نَفْسِهِ وَإِنَّهُ لَمِنَ الصَّادِقِينَ (৫১) ذٰلِكَ لِيَعْلَمَ أَنِّي لَمْ أَخُنْهُ بِالْغَيْبِ وَأَنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي كَيْدَ الْخَائِنِينَ (৫২) وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِي ۚ إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّي ۚ إِنَّ رَبِّي غَفُورٌ رَحِيمٌ
রাজা বলল, তোমরা ইউসুফকে আমার নিকট নিয়ে এস। দূত যখন তাঁর নিকট উপস্থিত হল তখন সে বলল: তুমি তোমার প্রভুর নিকট ফিরে যাও এবং তাকে জিজ্ঞেস কর, যে নারীগণ হাত কেটে ফেলেছিল তাদের অবস্থা কী? আমার প্রতিপালক তাদের ছলনা সম্পর্কে সম্যক অবগত। রাজা নারীগণকে বলল, 'যখন তোমরা ইউসুফ থেকে অসৎকর্ম কামনা করেছিলে, তখন তোমাদের কী হয়েছিল! তারা বলল, অদ্ভূত আল্লাহর মাহাত্ম্য! আমরা ওর মধ্যে কোনো দোষ দেখি নি। আযীযের স্ত্রী বলল, এক্ষণে সত্য প্রকাশ হল। আমিই তার থেকে অসৎকর্ম কামনা করেছিলাম; সে তো সত্যবাদী। সে বলল: আমি এটা বলেছিলাম, যাতে সে জানতে পারে, তার অনুপস্থিতিতে আমি তার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করি নি এবং আল্লাহ বিশ্বাসঘাতকদের ষড়যন্ত্র সফল করেন না। সে বলল, আমি আমাকে নির্দোষ মনে করি না। মানুষের মন অবশ্যই মন্দকর্মপ্রবণ। কিন্তু সে নয়, যার প্রতি আমার প্রতিপালক দয়া করেন। আমার প্রতিপালক অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
বুখারী ও মুসলিম শরীফের রেওয়ায়েতে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ঘটনাটির উল্লেখ করে ইউসুফ আ.-এর ধৈর্য ও সহ্যকে খুব প্রশংসা করেছেন এবং চূড়ান্ত পর্যায়ের বিনয়-নম্রতা একে বাড়িয়ে ইরশাদ করেন: (অলাও লাবিছতু ফিস সিজনি মা লাবিছা ইউসুফা লা আজাবতুদ দায়ী) অর্থাৎ "আমি যদি এত দীর্ঘকাল জেলখানায় অবস্থান করতাম, যত দীর্ঘকাল ইউসুফ আ. অবস্থান করেছিলেন, তবে আহবানকারীর ডাক তৎক্ষণাৎ কবুল করে নিতাম।
অত্যন্ত বিস্ময়ের ব্যাপার হল, হযরত ইউসুফ আ. যখন দেখলেন, তাঁর প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ পরিপূর্ণ হয়েছে। তাঁর আশা-আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়ে গেছে। তখন উপলব্ধি করলেন, এ পৃথিবীতে কোনো কিছুরই স্থায়িত্ব নেই। যা কিছু আছে, সবই ধ্বংস হবে। আর 'পূর্ণতার পরেই আসে ক্ষয়ের পালা'। তখন তিনি আল্লাহর যথাযোগ্য প্রশংসা করলেন। আল্লাহর অনেক অনুগ্রহ ও করুণার কথা স্বীকার করলেন এবং মুসলিম অবস্থায় মৃত্যু দান এবং সৎলোকদের অন্তর্ভুক্ত রাখার জন্য দুআ করলেন। তাঁর এ দুআ ছিল এমন পর্যায়ের, যেমন অন্যান্য সময় দুআর মধ্যে বলা হয়- (আল্লাহুম্মা আহইনা মুসলিমিনা অয়া তাওয়াসানা মুসলিমিন) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাদেরকে মুসলিমরূপে জীবিত রাখুন এবং মুসলিমরূপে মৃত্যু দান করুন! অর্থাৎ, যখন আপনি আমাদের মৃত্যু দেবেন, তখন যেন আমরা মুসলমান থাকি। আবার বলা যায়, তিনি এ দুআ করেছিলেন মৃত্যুশয্যায় থাকা অবস্থায়। যেমনিভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মৃত্যুশয্যায় দোয়া করেছিলেন তাঁর রূহকে ঊর্ধ্বজগতে উঠিয়ে নিতে এবং নবী-রাসূল ও সালিহীনদের অন্তর্ভুক্ত করতে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন: (আল্লাহুম্মা ফির রফিকিল আ'লা) এ দুআটি তিনবার বলার পর তিনি ইনতিকাল করেন।
আবার হতে পারে হযরত ইউসুফ আ. শরীর ও দেহের সুস্থ থাকা অবস্থার ওপর ইসলামের সাথে মৃত্যু কামনা করেছিলেন। আর এটা তাদের শরিয়তে বৈধ ছিল। হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত: (মা তামান্না নাবিইয়ুন কাত্তুন মওতা ক্বাবলা ইউসুফ) অর্থাৎ, হযরত ইউসুফ আ.-এর পূর্বে কোনো নবী মৃত্যু কামনা করেন নি। কিন্তু আমাদের শরিয়তে মৃত্যু কামনা করতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে ফিৎনা-ফাসাদের সময় তা জায়েয আছে। যেমন ইমাম আহমদ রহ. হযরত মুআয রাযি.-এর দুআ সম্বলিত হাদিস বর্ণনা করেছেন: (ফাইযা আরাত্তা বিক্বাওমিন ফিতনাতান ফাতাওয়াক্ফানা ইলাইকা গইরা মাফতুনিন) অর্থাৎ "হে আল্লাহ! আপনি যখন কোনো সম্প্রদায়কে পরীক্ষায় ফেলতে চান, তখন ওই পরীক্ষায় আমাকে না ফেলে আপনার কাছেই উঠিয়ে নিয়েন।"
অন্য হাদিসে আছে: হে আদম সন্তান! ফিতনায় জড়িয়ে পড়ার চেয়ে মৃত্যুই তোমার জন্যে শ্রেয়। হযরত মারইয়াম আ. বলেছিলেন: (ইয়া লাইতানী মিত্তু ক্বাবলা হাযা অয়াকুনতু নাসিয়ান মানসিয়া) অর্থাৎ হায়! আমি যদি এর পূর্বে মরে যেতাম এবং মানুষের স্মৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে যেতাম।
স্বাভাবিক অবস্থায় মৃত্যু কামনা সম্পর্কে ইমাম বোখারি ও মুসলিম রহ. তাঁদের সহি গ্রন্থদ্বয়ে হযরত আনাস ইবনে মালিক রাযি.-এর হাদিস বর্ণনা করেছেন। যাতে আছে- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "বিপদে ও দুঃখে পড়ে তোমরা মৃত্যু কামনা করো না। আর যদি একান্ত কামনা করতেই হয় তাহলে বলা উচিত- হে আল্লাহ! যতদিন বেঁচে থাকা আমার জন্যে কল্যাণকর হয়, ততদিন আমাকে জীবিত রাখুন আর মুত্যু যখন আমার জন্যে মঙ্গলময় হয়, তখন আমাকে মুত্যু দান করুন।
অন্যত্র বর্ণিত আছে, (লা ইয়াতামান্নায়্যান্না আহাদুকুমুল মওতা ইম্মাহ মুহসিনান...) অর্থাৎ তোমাদের কেউ যেন মৃত্যু কামনা না করে কেন না বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি যদি নেককার হয়, তা হলে (বেঁচে থাকলে) তার নেকি বেড়ে যাবে। আর যদি সে পাপিষ্ঠ হয়, তা হলে (যদি সে সংযত হয়ে যায়) তার পাপ কমে যাবে। এখানে বলতে মানুষের দেহের রোগ বা অনুরূপ অবস্থা বোঝানো হয়েছে। দীন সম্পর্কীয় নয়। এটা স্পষ্ট, হযরত ইউসুফ আ. তখনই মৃত্যু কামনা করেছিলেন, যখন তিনি মৃত্যুশয্যায় শায়িত বা তার নিকটবর্তী হয়েছিলেন।
আল্লাহর যখন হুকুম হল, তিনি তখন ইউসুফকে কারাগার থেকে বের করে আনার নির্দেশ দিলেন। (অয়াক্বালাল মালিকু ইতুনি বিহি আসতাখলিসহু লিনাফসি) অর্থাৎ রাজা বলল, ইউসুফকে আমার কাছে নিয়ে এসো। আমি তাকে আমার একান্ত সহচর নিযুক্ত করব। তারপর রাজা যখন তার সাথে কথা বলল, তখন রাজা বলল, আজ তুমি আমাদের কাছে মর্যাদাশালী ও বিশ্বাসভাজন হলে। ইউসুফ আ. বললেন, 'আমাকে দেশের ধন-সম্পদের উপর কর্তৃত্ব প্রদান করুন! আমি বিশ্বস্ত রক্ষক ও সুবিজ্ঞ।' এভাবে ইউসুফ আ.-কে আমি সে দেশে প্রতিষ্ঠিত করলাম। সে সেদেশে যেখানে ইচ্ছা অবস্থান করতে পারত। আমি যাকে ইচ্ছা তার প্রতি দয়া করি; আমি সৎকর্মপরায়ণদের শ্রমফল নষ্ট করি না। যারা মুমিন এবং মুত্তাকী তাদের পরলোকের পুরষ্কারই উত্তম।
📄 দীর্ঘ সময় কারাবাসের কারণ
সহি ইবনে হিব্বানে ইউসুফ আ.-এর কারাগারে অধিককাল পর্যন্ত আবদ্ধ থাকার কারণ সম্পর্কে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। হাদিসটি আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: আল্লাহ ইউসুফের প্রতি রহম করুন! তিনি যদি (উযকুরনী ইনদা রব্বিকা) "তোমার প্রভুর কাছে আমার কথা বলবে” কথাটি না বলতেন, তবে তাকে এতদিন কারাগারে থাকতে হত না। আল্লাহ তাআলা হযরত লূত আ.-এর প্রতিও রহম করুন! কারণ, তিনি তাঁর কওমকে বলেছিলেন- তোমাদের মুকাবিলায় আমার যদি আজ শক্তি থাকত কিংবা কোনো শক্ত অবলম্বনের আশ্রয় পেতাম। যেমন ইরশাদ হচ্ছে: (লাও আন্না লী বিকুম কুওয়াতান আও আয়ী ইলা রুকনিন শাদীদ)।
এরপর আল্লাহ যত নবী প্রেরণ করেছেন, তাদেরকে বিপুল সংখ্যক লোক বিশিষ্ট গোত্রেই প্রেরণ করেছেন। কিন্তু এ হাদিসটি এ সনদে মুনকার। তা ছাড়া মুহাম্মদ ইবনে আমর ইবনে আলকামা সমালোচিত রাবী। তাঁর বেশ কিছু একক বর্ণনায় বিভিন্ন রকম দুর্বলতা রয়েছে। বিশেষত এ শব্দগুলো একান্তই মুনকার। ইমাম বুখারী ও মুসলিমের হাদীসও উক্ত হাদীসকে ভুল সাব্যস্ত করে। তাঁর এ সমালোচনা চমৎকার।