📄 আযীযে মিসরের স্ত্রী ও ইউসুফ আ.
ইবনে আতাউল্লাহ সিকান্দারি রহ. বলেছেন: আল্লাহ তাআলার অধিকাংশ অনুগ্রহ ও দয়া বিপদ-আপদের ভিতরে নিহিত থাকে। হযরত ইউসুফ আ.-এর পূর্ণ জীবনটি এ উক্তিটিরই বাস্তবক্ষেত্র। কেন না শৈশবকালের প্রথম বিপদ তাঁকে কেনানের গ্রাম্য জীবন হতে বের করে তাহযিব ও তামাদ্দুনের কেন্দ্রভূমি মিসরের উন্নত ও শ্রেষ্ঠ পরিবারের মালিক বানিয়ে দিল। একেই বলে, দাসত্বের মধ্যে থেকে প্রভুত্ব করা।
এখন দ্বিতীয় ও কঠিন পরীক্ষা আরম্ভ হল। হযরত ইউসুফ আ. তখন পূর্ণ-যৌবনে পদার্পণ করেছিলেন। রূপ-সৌন্দর্যের এমন কোনো দিক ছিল না, যা তার মধ্যে ছিল না। রূপমাধুর্য, কমনীয়তা, উজ্জ্বল মুখমন্ডল ছিল চাঁদের মতো দীপ্তিমান। নিষ্কলুষতা ও লজ্জার আধিক্য সোনায় সোহাগার মতো কাজ করছিল। তদুপরি এক পরিবারে থাকায় আযীযে মিসরের বিবি নিজের হৃদয়কে বশে রাখতে পারলেন না। ইউসুফের রূপশিখার উপর পতঙ্গের মতো কুরবান হতে লাগলেন। কিন্তু ইবরাহীম আ.-এর প্রপৌত্র, ইসহাক ও ইয়াকুব আ.-এর চোখের জ্যোতি, নবী পরিবারের প্রদীপ ও আশা-ভরসা, নবুয়ত পদের জন্য মনোনীত এমন মহাপুরুষ দ্বারা কি করে সম্ভব ছিল অপবিত্র ও অশ্লীল কাজে লিপ্ত হওয়া এবং আযীযের স্ত্রীর অপবিত্র কামনা পূর্ণ করা?
কিন্তু মিসরের সেই স্বাধীনা রমণী যখন দেখল, তার এ রূপে কোনো জাদু ক্রিয়া করছে না, তখন একদিন আত্মহারা হয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়ে অনুরোধ করল, আমার অভিলাষ পূর্ণ কর। হযরত ইউসুফ আ.-এর জন্য এ সময়টুকু মহা পরীক্ষার সময় ছিল। একদিকে রাজ পরিবারের যুবতী রমণী, রূপশিখার আভামণ্ডিত রক্তবর্ণের চেহারা, রূপ ও সাজ-সজ্জার নান্দনিক প্রদর্শনী, প্রেয়সীসুলভ ভাবভঙ্গির দৃষ্টি। আর এদিকে ইউসুফ আ. নিজেও নব যুবক, রূপবান, রূপের মাধুর্য সম্বন্ধে পরিচিত, দরজা বন্ধ, প্রেমের প্রতিদ্বন্দীর ভয় সম্বন্ধে রাণী স্বয়ং জিম্মাদার। কিন্তু এতসব অনুকূল অবস্থা কি ইউসূফ আ.-এর অন্তরে এক মুহূর্তের জন্যেও আযীযে মিসরের বিবির কামাগ্নিতে উনুন যুগিয়ে ছিল?
তাঁর অন্তর কি অশান্ত, অস্থির ও চঞ্চল হয়ে উঠেছিল? তাঁর নফস কি অন্তর জগতে এক মুহূর্তের জন্যও কম্পন সৃষ্টি করেছিল? না, কখনই না বরং তার বিপরীত সেই পবিত্রতা প্রতিমূর্তি, নবুয়তের আমানতদার, আল্লাহ পাকের ওহী অবতীর্ণ হওয়ার স্থল, এমন দুটি চিত্তাকর্ষক ও মযবুত দলিল দ্বারা মিসরের সেই নারীকে বুঝালেন, যা তাঁরই মতো এক ব্যক্তির দ্বারা সম্ভব ছিল, যার শিক্ষা ও প্রতিপালন সরাসরি আল্লাহ পাকের আশ্রয়ে থেকেই হয়েছে। তিনি আযীযে মিসরের স্ত্রীকে উত্তর দিলেন, এটা অসম্ভব। আমি আল্লাহ পাকের আশ্রয় চাই। আমি কি তাঁর নাফরমানি করব, যাঁর মহা প্রতাপশালী নাম “আল্লাহ” এবং তিনি সমগ্র সৃষ্টজগতের মালিক। তা ছাড়া আমি কি আমার সেই মুরুব্বি আযীযে মিসরের আমানতে বিশ্বাসঘাতকতা করব? যিনি আমাকে গোলামরূপে রাখার পরিবর্তে এ সম্মান ও মর্যাদা দান করছেন? যদি আমি এরূপ অশ্লীল কর্ম করি, তবে তো জালিম বলে সাব্যস্ত হবো। আর জালিমদের জন্য কখনো মঙ্গল নেই।
কিন্তু আযীযে মিসরের বিবির ওপর এ নসিহতের কোনোই ক্রিয়া হল না বরং সে নিজের কামনাকে কার্যকর রূপদানের ওপর জেদই ধরল। তখন ইউসুফ আ. আপন রবের প্রত্যক্ষ প্রমাণের প্রতি লক্ষ করে পরিষ্কার ভাষায় তা অস্বীকার করলেন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে:
وَرَاوَدَتْهُ الَّتِي هُوَ فِي بَيْتِهَا عَنْ نَفْسِهِ وَغَلَقَتِ الْأَبْوَابَ وَقَالَتْ هَيْتَ لَكَ ۚ قَالَ مَعَاذَ اللَّهِ ۖ إِنَّهُ رَبِّي أَحْسَنَ مَثْوَايَ ۖ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ (২৩) وَلَقَدْ هَمَّتْ بِهِ ۖ وَهَمَّ بِهَا لَوْلَا أَنْ رَأَىٰ بُرْهَانَ رَبِّهِ ۚ كَذٰلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ ۚ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ
"আর ইউসুফকে ফুসলাল সেই স্ত্রীলোকটি, যার গৃহে তিনি অবস্থান করতেন, নিজের নফসের ব্যাপারে এবং ঘরে দরজাগুলি বন্ধ করে দিল এবং বলতে লাগল, আসো! আমার নিকট আসো। ইউসুফ বললেন, আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি! নিঃসন্দেহ তিনি (আযীযে মিসর) আমার মুরব্বী, যিনি আমাকে সসম্মানে রেখেছেন। নিঃসন্দেহ জালিম লোক মঙ্গল লাভ করতে পারে না। অবশ্য সেই স্ত্রীলোকটি ইউসুফের সঙ্গে অসৎ ইচ্ছা করেছিল আর তিনিও অসদিচ্ছা করতেন যদি আল্লাহ পাকের প্রমাণ না দেখতে পেতেন। এরূপ এ জন্য হয়েছিল, যেন আমি তার থেকে অসৎ ইচ্ছা, ও নির্লজ্জতাকে দূরে রাখি। নিঃসন্দেহ তিনি আমার খাঁটি বান্দাগণের অন্তর্ভুক্ত।” (সূরা ইউসুফ: ২৩-২৪)
কুরআন মাজিদ প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত এ ঘটনায় আযীযে মিসরের বিবির অপবাদ এবং হযরত ইউসুফ আ.-এর পবিত্রতা ও উচ্চ মর্যাদার কথাই বর্ণনা করেছে। আযীযের স্ত্রী ছিলেন অত্যন্ত রূপসী, ঐশ্বর্যশালী এবং উচ্চ সামাজিক মর্যাদার ও যৌবনের অধিকারিণী। তিনি মূল্যবান বাহারি পোশাক পরিধান ও অঙ্গ-সজ্জা করে ইউসুফ আ.-কে আপন কক্ষে রেখে ভবনের সমস্ত দরজা বন্ধ করে তাকে আহ্বান জানান। সর্বোপরি তিনি ছিলেন মন্ত্রীর স্ত্রী।
হযরত ইউসুফ আ. বললেন, “আমি আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করছি! নিঃসন্দেহ তিনি (আযীযে মিসর) আমাকে সম্মানের সাথে রেখেছেন। নিশ্চই জালিমরা মঙ্গল লাভ করতে পারে না।” কিন্তু হযরত ইউসুফ আ.-এর মুখে আল্লাহ তাআলার প্রমাণ শোনার পরেও সে বিরত হল না; নিজের কামনার উপর জেদই করতে লাগল। হযরত ইউসুফ আ. তার কামনাকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করলেন। আল্লাহর প্রমাণের সম্মুখে তার কামনার আদৌ পরোয়া করলেন না। সুতরাং তিনি তার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দরজার দিকে দৌড়ে গেলেন এবং আযীযে মিসরের বিবিও তাঁর পিছনে ছুটল।
যদি হযরত ইউসুফ আ. আল্লাহ তাআলার প্রমাণ লাভ না করতেন, তবে তিনি অসদিচ্ছা করেই ফেলতেন; কিন্তু তিনি সেই বুরহানে রব দেখেছিলেন বলেই অসদিচ্ছা করেন নি। এখানে প্রশ্ন হয়, সেই বুরহানে রব; আল্লাহর প্রমাণ কী ছিল? উত্তর হল- কুরআন মাজিদ তার সময়োচিত, স্থানোচিত মার্জিত এবং অলৌকিক ভাষায় এমনভাবে বিষয়টি বর্ণনা করে দিয়েছে, যার পর আর কোনো প্রশ্নের অবকাশ থাকে না। দরজা বন্ধ করা হলে হযরত ইউসুফ আ. আযীযের বিবিকে যে জবাব দিলেন, এরূপ ক্ষেত্রে এর চেয়ে উত্তম জবাব আর কি হতে পারত! সুতরাং এটাই সেই বুরহানে রব, যা ইউসুফ আ.-কে দান করা হয়েছিল এবং যা ইউসুফ আ.-এর পবিত্রতাকে নিষ্কলঙ্ক রেখেছে।
যা হোক, হযরত ইউসুফ আ. যখন দরজার দিকে দৌড়ালেন, তখন আযীযে মিসরের বিবিও তাঁর পিছনে পিছনে দৌড়াল। দরজা কোনো প্রকারে খুলে গেল, সম্মুখেই দেখতে পেলেন আযীযে মিসর ও স্ত্রীলোকটির চাচাত ভাই দণ্ডায়মান। রমণী ইশকে তখনো অপরিপক্ক ছিল। সুতরাং সে সঠিক অবস্থা বলতে সক্ষম হল না এবং প্রকৃত অবস্থা গোপন করার উদ্দেশ্যে ক্রোধান্বিত হয়ে বলতে লাগল, এমন ব্যক্তির শাস্তি জেলখানা কিংবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি ছাড়া আর কি হতে পারে- যে ব্যক্তি তোমার স্ত্রীর সাথে অসদিচ্ছা পোষণ করে! হযরত ইউসুফ আ. তার প্রবঞ্চনা ও প্রতারণামূলক উক্তি শ্রবণ করে বললেন, এ তো সম্পূর্ণ মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হচ্ছে। প্রকৃত পক্ষে স্বয়ং সে নিজেই আমার সাথে অসদিচ্ছা প্রকাশ করেছিল। কিন্তু আমি কোনোক্রমেই স্বীকার করি নি এবং পালিয়ে ঘর হতে বের হয়ে যেতে চাচ্ছিলাম। সে আমার পিছনে পিছনে দৌড়িয়ে এসেছে এবং সম্মুখে আপনাকে দেখে সে মিথ্যা রচনা করে নিল।
আযীযের বিবির চাচাত ভাই খুব মেধাবী ও বুদ্ধিমান ছিলেন। তিনি বললেন, ইউসুফের জামা দেখতে হবে, যদি তা সম্মুখের দিকে ছেঁড়া হয়ে থাকে, তবে স্ত্রীলোকটি সত্যবাদী, আর যদি পেছন দিকে ছেঁড়া হয়ে থাকে, তবে ইউসুফের কথাই সত্য এবং স্ত্রীলোকটি মিথ্যাবাদিনী। (অয়া শাহিদা শাহিদুম মিন আহলিহা) অর্থাৎ সাক্ষী দিল স্ত্রীলোকটিই পরিবারের এক ব্যক্তি।
অনন্তর পরখ করে দেখা গেল, হযরত ইউসুফ আ.-এর জামাটি পিছনের দিকে ছেঁড়া। সুতরাং আযীযে মিসর প্রকৃত অবস্থা বুঝে ফেললেন। কিন্তু নিজের সম্মান ও মর্যাদার খাতিরে ব্যাপারটির যবনিকা টেনে বললেন, "ইউসুফ তুমিই সত্যবাদী এবং স্ত্রীলোকটির ব্যাপারটা ক্ষমা কর। এ ব্যাপারটিকে এখানেই শেষ করে দাও। এরপর বিবিকে বললেন, এ সমস্ত তোমারই প্রবঞ্চনা ও ধোঁকা। তোমাদের স্ত্রী জাতির প্রতারণা ও প্রবঞ্চনা খুবই জঘন্য। নিঃসন্দেহ তুমিই অপরাধী। সুতরাং তোমার এ কাজের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা কর এবং মাফ চাও। এ প্রসঙ্গে কুরআন মাজিদে ইরশাদ হচ্ছে:
قَالَتْ مَا جَزَاءُ مَنْ أَرَادَ بِأَهْلِكَ سُوءًا إِلَّا أَنْ يُسْجَنَ أَوْ عَذَابٌ أَلِيمٌ (২৫) قَالَ هِيَ رَاوَدَتْنِي عَنْ نَفْسِي ۚ وَشَهِدَ شَاهِدٌ مِنْ أَهْلِهَا إِنْ كَانَ قَمِيصُهُ قُدَّ مِنْ قُبُلٍ فَصَدَقَتْ وَهُوَ مِنَ الْكَاذِبِينَ (২৬) وَإِنْ كَانَ قَمِيصُهُ قُدَّ مِنْ دُبُرٍ فَكَذَبَتْ وَهُوَ مِنَ الصَّادِقِينَ (২৭) فَلَمَّا رَأَىٰ قَمِيصَهُ قُدَّ مِنْ دُبُرٍ قَالَ إِنَّهُ مِنْ كَيْدِ كُنَّ ۖ إِنَّ كَيْدَ كُنَّ عَظِيمٌ (২৮) يُوسُفُ أَعْرِضْ عَنْ هٰذَا ۚ وَاسْتَغْفِرِي لِذَنْبِكِ ۖ إِنَّكِ كُنْتِ مِنَ الْخَاطِئِينَ
"(স্ত্রীলোকটি) বলতে লাগল, সেই ব্যক্তির শাস্তি জেলখানা অথবা যন্ত্রণাদায়ক আযাব ছাড়া আর কি হতে পারে, যে ব্যক্তি তোমার স্ত্রীর সাথে অসৎ কাজের ইচ্ছা পোষণ করে। ইউসুফ আ. বললেন, সেই আমাকে আমার নফস সম্বন্ধে ফুসলাচ্ছিল। আর মীমাংসা করে দিল স্ত্রীলোকটিই পরিবারের এক ব্যক্তি। যদি ইউসুফের জামা সম্মুখের দিক হতে ছেঁড়া থাকে, তবে স্ত্রীলোকটি সত্যবাদিনী এবং ইউসুফ মিথ্যাবাদী আর যদি পিছনের দিক হতে ছেঁড়া থাকে, তবে স্ত্রীলোকটি মিথ্যাবাদিণী এবং ইউসুফ সত্যবাদী। এরপর যখন ইউসূফের জামা দেখা হল, তখন দেখা গেল তা পিছনের দিকে ছেঁড়া। [আযীয] বলল, হে রমণী! নিঃসন্দেহ এটা তোমারই প্রবঞ্চণা ও প্রতারণা। নিঃসন্দেহ তোমাদের প্রতারণা বড়ই জঘন্য। ইউসুফ! তুমি এ ব্যাপারটি ক্ষমা কর আর হে রমণী! তুমি তোমার অপরাধের মাগফেরাত প্রার্থনা কর। নিঃসন্দেহ তুমি অপরাধী।
আযীযে মিসর যদিও অপমানের হাত হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য এ ব্যাপারটিকে এখানেই শেষ করে দিলেন; কিন্তু কথা গোপন রইল না। একে একে রাজবংশের সমস্ত স্ত্রীলোকদের মধ্যে বিষয়টির চর্চা হতে লাগল। সবাই বলাবলি করতে লাগল, আযীযে মিসরের বিবি কত নির্লজ্জ! নিজের গোলামের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে। এত উচ্চ মর্যাদার নারী এবং গোলামের সাথে মেলামেশা! একসময় এ গোপন চর্চার খবর আযীযে মিসরের বিবি পর্যন্তও এসে পৌঁছল। এ সমালোচনা তার নিকট অত্যন্ত কষ্টদায়ক হল। অতএব সে এর প্রতিশোধ নিতে এবং এমন প্রতিশোধ নিতে মনস্থ করল, যাতে যে বিষয়ে তারা আমাকে ভৎর্সনা করছে, তাতেই তাদেরকেও লিপ্ত করে দেওয়া যায়। এ চিন্তা করে একদিন সে রাজবংশের এবং শহরের নেতৃস্থানীয় লোকদের বিবিগণকে দাওয়াত করল। যখন সকলে এসে দস্তরখানে বসল এবং সকলে আহার্য গ্রহণের লক্ষ্যে ছুরি হাতে নিল গোশত-লেবু ইত্যাদি কাটতে, তখন আযীযে মিসরের বিবি ইউসুফকে ঘরের বাইরে আসার জন্য আদেশ করল।
হযরত ইউসুফ আ. প্রভুপত্নীর আদেশে বের হয়ে এলে সব মহিলা ইউসুফ আ.-এর রূপ দেখে হতবাক হয়ে গেল এবং তারা তাঁর উজ্জ্বল চেহারার দীপ্তি ও জ্যোতিতে এত প্রভাবিত হল, নিজের আহার্য বস্তুটি কাটার পরিবর্তে সকলেই ছুরি দ্বারা নিজেদের হাত কেটে ফেলল এবং অজ্ঞাতসারে হঠাৎ বলে উঠল, কে বলে ও মানুষ? আল্লাহর কসম! ও তো নূরের পুতুল এবং বুযুর্গ ফেরেশতা। তা দেখে আযীযে মিসরের বিবি খুবই আনন্দ বোধ করল এবং নিজের সফলতা আর তাদের পরাজয়ের জন্য গর্ব করে বলতে লাগল- ওই তো সেই গোলাম, যার প্রেমাসক্তি নিয়ে তোমরা আমাকে ভর্ৎসনা করে যাচ্ছ। এখন তাকে দেখে তোমাদের এরূপ অবস্থা কেন? বলো! আমার এ প্রেমাসক্তি সঙ্গত, না অসঙ্গত? আর তোমাদের তিরস্কার ঠিক হয়েছে, না বেঠিক? এ প্রসঙ্গে কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে:
وَقَالَ نِسْوَةٌ فِي الْمَدِينَةِ امْرَأَتُ الْعَزِيزِ تُرَاوِدُ فَتَاهَا عَنْ نَفْسِهِ ۖ قَدْ شَغَفَهَا حُبًّا ۖ إِنَّا لَنَرَاهَا فِي ضَلَالٍ مُبِينٍ (৩০) فَلَمَّا سَمِعَتْ بِمَكْرِهِنَّ أَرْسَلَتْ إِلَيْهِنَّ وَأَعْتَدَتْ لَهُنَّ مُتَّكَأً وَآتَتْ كُلَّ وَاحِدَةٍ مِنْهُنَّ سِكِّينًا وَقَالَتِ اخْرُجْ عَلَيْهِنَّ ۖ فَلَمَّا رَأَيْنَهُ أَكْبَرْنَهُ وَقَطَّعْنَ أَيْدِيَهُنَّ وَقُلْنَا حَاشَ لِلَّهِ مَا هٰذَا بَشَرًا إِنْ هٰذَا إِلَّا مَلَكٌ كَرِيمٌ (৩১) قَالَتْ فَذٰلِكُنَّ الَّذِي لُمْتُنَّنِي فِيهِ
"আর নগরীতে মহিলারা বলাবলি করল, আযীযের স্ত্রী তার যুবক গোলাম থেকে অসৎকর্ম কামনা করছে। যুবকের প্রতি গভীর প্রেমে সে আত্মহারা হয়ে পড়েছে। আমাদের ধারণা সে তো প্রকাশ্য মন্দ স্বভাবে পতিত হয়েছে। অনন্তর আযীযে মিসরের বিবি যখন তাদের ষড়যন্ত্রের কথা শুনতে পেল, তখন তাদেরকে ডেকে পাঠাল এবং তাদের জন্যে বিস্তৃত আসনসমূহ সজ্জিত করল এবং (যথারীতি) প্রত্যেককে এক একটি ছুরি প্রদান করল। এরপর ইউসুফকে বলল, তাদের সকলের সম্মুখে বের হয়ে আসো। ইউসুফকে যখন সেই মহিলারা দেখতে পেল, তখন তারা শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করল। তারা নিজেদের হাত কেটে ফেলল। হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, ও তো মানুষ নয়; নিশ্চয়ই কোনো বুযুর্গ ফেরেশতা। বড়ই মর্যাদাশীল ফেরেশতা। আযীযে মিসরের বিবি বলল: তোমরা যাকে দেখলে এ-ই সেই ব্যক্তি, যার সম্বন্ধে তোমরা আমাকে তিরস্কার করছ।"
শহরের নারী সমাজ তথা আমীর, উমারা ও অভিজাত লোকদের স্ত্রী-কন্যারা আযীযের স্ত্রী নিজের ক্রীতদাসের প্রতি প্রেমে আত্মহারা হয়ে প্রবৃত্তি চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে ছলনা করার জন্য তারা তাকে ভর্ৎসনা করছিল; কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে আযীযের স্ত্রী এ ব্যাপারে ছিল নেহায়েত অক্ষম। তাই সে ভর্ৎস্নাকারী ওই মহিলাদের বুঝিয়ে দিতে চাইল, এ যুবক দাসটি তাদের ধারনার ঊর্ধ্বে; সাধারণ যে কোনো যুবকের মতো নয়। সুতরাং সে শহরের মহিলাদের নিমন্ত্রণ করল এবং সকলকে বাড়িতে ডেকে আনল। সে একটি ভোজসভার আয়োজন করল। ভোজসভায় যে-সব খাদ্য-দ্রব্য পরিবেশন করা হয়, তার মধ্যে এমন কিছু দ্রব্য ছিল যা ছুরি দিয়ে কেটে খেতে হয়। যেমন, লেবু ইত্যাদি। উপস্থিত প্রত্যেককে একটি করে ছুরি দেওয়া হল। আযীযের স্ত্রী পূর্বেই ইউসুফ আ.-কে উৎকৃষ্ট পোশাক পরিয়ে প্রস্তুত রেখে ছিলেন। তখন তিনি ছিলেন পূর্ণ যৌবনে দীপ্তিমান। এ অবস্থায় মহিলাটি ইউসুফ আ.-কে তাদের সম্মুখে বেরিয়ে আসার নির্দেশ দিলে তিনি বের হয়ে আসেন।
(ফেল্যাম্মা রায়াইনাহু আকবারনাহু) অর্থাৎ যখন তারা তাকে দেখল, তখন ওরা তার গরিমায় অভিভূত হল। অর্থাৎ তারা ইউসুফ আ.-এর সৌন্দর্য দর্শনে বিস্মিত হয়ে ভাবল, কোনো আদম সন্তান তো এ রকম রূপ-লাবণ্যের অধিকারী হতে পারে না। ইউসুফ আ.-এর সৌন্দর্যের দীপ্তিতে অভিভূত হয়ে তারা চেতনা হারিয়ে ফেলে। এমনকি নিজ হাতের ওই ছুরি দ্বারা নিজেদের হাতই কেটে ফেলে। অথচ যখমের কোনো অনুভূতিই তাদের ছিল না।
এরপর মহিলাটি হযরত ইউসুফ আ.-এর পূতঃচরিত্রের কথা স্বীকার করে বলে: (ওয়ালাক্বাদ রওয়াত্তুহু আন নাফসিহি ফাস্তাসাম) অর্থাৎ "আমি তার থেকে অসৎকর্ম কামনা করেছি; কিন্তু সে নিজেকে পবিত্র রেখেছে অর্থাৎ রক্ষা করেছে"। (ওয়ালাইল্লাম ইয়াফয়াল মা আমুরুহু লাইউসজানান্না অয়ালাইয়াকুনাম মিনাস সগিরিন) অর্থাৎ "এ যদি আমার কথা না শোনে, তবে তাকে কয়েদ করা হবে এবং লাঞ্ছিত করা হবে।"
আযীযে মিসরের বিবি আরো বলল নিঃসন্দেহে আমি তার অন্তরকে নিজের বসে আনতে চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু সে সংযমহীন হয় নি। তদুপরি আমি বলে দিয়েছি, যদি সে শেষ পর্যন্ত কথা মান্য না করে আর আমার বাসনা পূর্ণ না করে, তবে তার করুণ পরিণতি হবে, তাকে জেলখানায় আবদ্ধ করে রাখা হবে এবং সে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হবে। হযরত ইউসুফ আ. যখন এটা শ্রবণ করলেন, তখন দুআর জন্য আল্লাহর দরবারে হাত উঠিয়ে বলতে লাগলেন, "ইয়া আল্লাহ! এ রমণীগুলি আমাকে যে বিষয়ের প্রস্তাব করছে, তার তুলনায় জেলখানায় বাস করাকেই আমি হাজারগুণে শ্রেয় মনে করি। যদি আপনি আমাকে সাহায্য না করেন এবং আমাকে এদের ষড়যন্ত্র হতে রক্ষা না করেন, তবে বিচিত্র নয় যে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ব এবং মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।" ইউসূফ আ.-এর দুআ আল্লাহ তাআলার দরবারে কবুল হল এবং আল্লাহ তাআলা সেই রমণীদের সমস্ত ষড়যন্ত্র ও প্রতারণাকে নস্যাৎ করে দিলেন। এ প্রসঙ্গে কুরআন মাজীদে ইরশাদ হচ্ছে:
قَالَ رَبِّ السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِمَّا يَدْعُونَنِي إِلَيْهِ ۖ وَإِلَّا تَصْرِفْ عَنِّي كَيْدَهُنَّ أَصْبُ إِلَيْهِنَّ وَأَكُنْ مِنَ الْجَاهِلِينَ (৩৩) فَاسْتَجَابَ لَهُ رَبُّهُ فَصَرَفَ عَنْهُ كَيْدَهُنَّ ۚ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
ইউসুফ বললেন, হে আমার পালনকর্তা! এ রমণীরা যে বিষয়ের প্রতি আমাকে আহ্বান করছে, তার তুলনায় জেলখানাই আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়। আপনি যদি তাদের ষড়যন্ত্র থেকে আমাকে উদ্ধার না করেন এবং আমার সাহায্য না করেন, তবে পাছে না আমি তাদের দিকে ঝুঁকে পড়ি এবং মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাই। এরপর তাঁর পালনকর্তা তাঁর দুআ কবুল করলেন এবং তাঁর থেকে তাদের ষড়যন্ত্রকে দূর করে দিলেন। নিঃসন্দেহে তিনিই খুব শ্রবণকারী সবিশেষ জ্ঞাত।
📄 যৌবন লাভের বয়স
কত বছর বয়সে পূর্ণ যৌবন লাভ হয় এ ব্যাপারে আলেমগণের মধ্যে মতভেদ আছে। ইমাম মালেক, রবিয়া, যায়দ ইবনে আসলাম ও শাবী বলেন: পূর্ণ যৌবন প্রাপ্তি বলতে বালেগ হওয়া বুঝায়। সাঈদ ইবনে জুবায়েরের মতে তা ১৮ বছর। ইবনে আব্বাস রাযি. মুজাহিদ ও কাতাদা রহ. এর মতে ৩৩ বছর। হাসান বসরী রহ. এর মতে ৪০ বছর। কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত হাসান বসরী রহ. এর মতকে সমর্থন করে। যেমন- (হাত্তা ইযা বালাগা আশুদ্দাহু ওয়া বালাগা আরবাইনা সানাহ) অর্থাৎ "যখন সে যৌবন প্রাপ্ত হল এবং চল্লিশ বছর বয়সে উপনীত হল। আল্লাহ তাআলা তাঁর দুআ কবুল করেন।”
📄 কারাগারে হযরত ইউসুফ আ.
ইউসুফ আ.-কে কারাগারে প্রেরণ করা হল। একজন নির্দোষীকে দোষী এবং একজন নিরপরাধ লোককে অপরাধী বানিয়ে দেওয়া হল। যেন আযীযের স্ত্রী অপমান ও দুর্নাম হতে রক্ষা পায় এবং অপরাধীকে 'হে অপরাধী!' বলতে না পারে। এরপর কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে:
ثُمَّ بَدَا لَهُمْ مِنْ بَعْدِ مَا رَأَوُا الْآيَاتِ لَيَسْجُنُنَّهُ حَتَّىٰ حِينٍ (৩৫) وَدَخَلَ مَعَهُ السِّجْنَ فَتَيَانِ ۖ قَالَ أَحَدُهُمَا إِنِّي أَرَانِي أَعْصِرُ خَمْرًا ۖ وَقَالَ الْآخَرُ إِنِّي أَرَانِي أَحْمِلُ فَوْقَ رَأْسِي خُبْزًا تَأْكُلُ الطَّيْرُ مِنْهُ ۖ نَبِّئْنَا بِتَأْوِيلِهِ ۖ إِنَّا نَرَاكَ مِنَ الْمُحْسِنِينَ (৩৬) قَالَ لَا يَأْتِيكُمَا طَعَامٌ تُرْزَقَانِهِ إِلَّا نَبَّأْتُكُمَا بِتَأْوِيلِهِ قَبْلَ أَنْ يَأْتِيَكُمَا ۚ ذٰلِكُمَا مِمَّا عَلَّمَنِي رَبِّي ۚ إِنِّي تَرَكْتُ مِلَّةَ قَوْمٍ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَهُمْ بِالْآخِرَةِ هُمْ كَافِرُونَ (৩৭) وَاتَّبَعْتُ مِلَّةَ آبَائِي إِبْرَاهِيمَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ ۚ مَا كَانَ لَنَا أَنْ نُشْرِكَ بِاللَّهِ مِنْ شَيْءٍ ۚ ذٰلِكَ مِنْ فَضْلِ اللَّهِ عَلَيْنَا وَعَلَى النَّاسِ وَلٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَشْكُرُونَ (৩৮) يَا صَاحِبَيِ السِّجْنِ أَأَرْبَابٌ مُتَفَرِّقُونَ خَيْرٌ أَمِ اللَّهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ (৩৯) مَا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِهِ إِلَّا أَسْمَاءً سَمَّيْتُمُوهَا أَنْتُمْ وَآبَاؤُكُمْ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ بِهَا مِنْ سُلْطَانٍ ۚ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ ۚ أَمَرَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ ۚ ذٰلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ (৪০) يَا صَاحِبَيِ السِّجْنِ أَمَّا أَحَدُكُمَا فَيَسْقِي رَبَّهُ خَمْرًا ۖ وَأَمَّا الْآخَرُ فَيُصْلَبُ فَتَأْكُلُ الطَّيْرُ مِنْ رَأْسِهِ ۚ قُضِيَ الْأَمْرُ الَّذِي فِيهِ تَسْتَفْتِيَانِ
নিদর্শনাবলী দেখার পর তাদের মনে হল, তাকে কিছুকালের জন্য কারারুদ্ধ করতে হবে। তার সাথে দুজন যুবক কারাগারে প্রবেশ করল। ওদের একজন বলল আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি আঙুর নিংড়িয়ে রস বের করছি এবং অপরজন বলল: 'আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি আমার মাথার উপর রুটি বহন করছি এবং পাখি তা থেকে খাচ্ছে। আমাদেরকে তুমি এর তাৎপর্য জানিয়ে দাও, আমরা তোমাকে সৎকর্মপরায়ণ দেখেছি। ইউসুফ বলল: 'তোমাদেরকে যে খাদ্য দেওয়া হয়, তা আসার পূর্বে আমি তোমাদের স্বপ্নের তাৎপর্য জানিয়ে দেব। আমি যা তোমাদের বলব, তা আমার প্রতিপালক আমাকে যা শিক্ষা দিয়েছেন, তা হতে বলব। যে সম্প্রদায় আল্লাহকে বিশ্বাস করে না ও পরলোকে অবিশ্বাসী আমি তাদের মতবাদ বর্জন করেছি। আমি আমার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়াকুবের মতবাদ অনুসরণ করি। আল্লাহর সাথে কোনো বস্তুকে শরিক করা আমাদের কাজ নয়। এটা আমাদের ও সমস্ত মানুষের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। 'হে কারাসঙ্গীরা! ভিন্ন ভিন্ন বহু প্রতিপালক শ্রেয়, না পরাক্রমশালী এক আল্লাহ? তাকে ছেড়ে তোমরা কেবল কতকগুলো নামের ইবাদত করছ, যে নাম তোমাদের পিতৃপুরুষ ও তোমরা রেখেছ, এগুলোর কোনো প্রমাণ আল্লাহ পাঠান নি। বিধান দেওয়ার অধিকার কেবল আল্লাহর। তিনি আদেশ দিয়েছেন অন্য কারও ইবাদত না করতে কেবল তাঁর ব্যতীত। এটাই সরল দীন কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা অবগত নয়। 'হে কারাসঙ্গীদ্বয়! তোমাদের একজনের সম্বন্ধে কথা হলো- একজন তার মনিবকে মদ পান করাবে এবং অপরজন শূলবিদ্ধ হবে। তারপর তার মাথা থেকে পাখি আহার করবে। যে বিষয়ে তোমরা জানতে চেয়েছ, তার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে!
📄 দাওয়াত ও তাবলীগ
ঘটনাক্রমে ইউসুফ আ.-এর সাথে আরো দুজন যুবক জেলখানায় প্রবেশ করল। তাদের মধ্যে একজন বাদশার শরাব পরিবেশনকারী; দ্বিতীয়জন বাদশার পাকশালার দারোগা। একদিন তারা উভয়ে হযরত ইউসুফ আ.-এর খেদমতে হাযির হল। তাদের মধ্যে শরাব পরিবেশক বলল: আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি শরাব প্রস্তুত করার জন্য আঙ্গুর নিংড়িয়ে রস বের করছি। অপরজন বলল: আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমার মাথার উপর রুটির খাঞ্চা রয়েছে; পক্ষীরা তা হতে খাচ্ছে।
হযরত ইউসুফ আ. ছিলেন নবীর পুত্র। ইসলাম প্রচারের রুচি তাঁর স্নায়ুমন্ডলীর সাথে সংমিশ্রিত ছিল। তদুপরি আল্লাহ তাআলা তাঁকেও নবুয়তের জন্য মনোনীত করেছেন। সুতরাং সত্যধর্মের প্রচারই ছিল তাঁর জীবনের মূখ্য উদ্দেশ্য। যদিও জেলখানায় ছিলেন, কিন্তু জীবনের উদ্দেশ্যকে কেমন করে ভুলতে পারেন? আর যদিও বিপদে ও মসিবতে ছিলেন, কিন্তু আল্লাহর বাণী সমুন্নত করাকে ভুলে যাবেন, এটা কি করে সম্ভব হতে পারে? তাই এ সময়টিকে সুবর্ণ সুযোগ মনে করে নম্রতা ও মহব্বতের সাথে তাদের বললেন: নিঃসন্দেহ আল্লাহ তাআলা আমাকে যে সমস্ত বিষয় শিক্ষা দিয়েছেন, তন্মধ্যে এ জ্ঞানটিও তিনি আমাকে দান করেছেন। সুতরাং তোমাদের নিকট তোমাদের নির্ধারিত খাদ্যদ্রব্য আসার আগেই আমি তোমাদের স্বপ্নের ফলাফল বলে দিব; কিন্তু তোমাদেরকে একটি বিশেষ কথা বলছি। তা গভীর মনোযোগের সাথে বুঝতে চেষ্টা কর।
আমি ওই সমস্ত লোকের ধর্ম অবলম্বন করি নি, যারা আল্লাহ তাআলার ওপর ঈমান রাখে না এবং আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে না। আমি আমার পিতা ও পিতামহ ইয়াকুব, ইসহাক ও ইবরাহীম আ.-এর ধর্মের অনুসরণ করছি। আমি কখনো আল্লাহ পাকের সঙ্গে কোনো বস্তুকেই শরিক সাব্যস্ত করতে পারি না। এটা আল্লাহ পাকের একটি অনুগ্রহ, যা তিনি আমার উপর এবং আরো বহু লোকের উপর করেছেন, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এর শোকরগুযারী করে না। বন্ধুগণ! তোমরা কি ভেবে দেখছ, ভিন্ন ভিন্ন বহু মাবুদ হওয়া উত্তম, না একমাত্র সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলাই মাবুদ হওয়া উত্তম? তোমরা তাঁকে ছাড়া আর যাদের ইবাদত করছ, তাদের স্বরূপ এর চেয়ে অধিক কিছুই নয়, তা কয়েকটি নাম মাত্র। যা তোমাদের বাপ-দাদারা মনগড়া স্থির করে নিয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য কখনও কোনো সনদ নাযিল করেন নি। শাসনক্ষমতা তো শুধু আল্লাহ পাকের জন্যই রয়েছে। তিনি হুকুম করেছেন, তাঁকে ছাড়া আর কারো ইবাদত করো না। এটাই সত্য-সরল ধর্ম কিন্তু অধিকাংশ মানুষ নির্বোধ, তারা জানে না।
এরপর তিনি স্বপ্নের ব্যাখ্যা দান করে বলেন: "হে আমার জেলখানার সাথীরা। তোমাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা হলো, তোমাদের দুজনের মধ্যে একজন আপন মনিবকে মদ পান করাবে।" সে লোকটি ছিল সাকী। "আর দ্বিতীয়জনকে শূলে চড়ানো হবে এবং পাখিরা তার মাথা থেকে আহার করবে।” সে ব্যক্তিটি ছিল রুটি প্রস্তুতকারী। “যে বিষয়ে তোমরা জানতে চেয়েছিলে, তার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে।” অর্থাৎ যা বলে দেওয়া হল, তা অবশ্যম্ভাবীরূপে কার্যকর হবে এবং যেভাবে বলা হল সেভাবেই হবে।
সেসময় যে ব্যক্তি সম্পর্কে ইউসুফ আ.-এর ধারণা ছিল মুক্তি পাবে। তাকে তিনি বলে দিলেন, (উযকুরনী ইনদা রব্বিকা) অর্থাৎ তোমার প্রভুর কাছে আমার কথা বলবে। অর্থাৎ আমি যে বিনা অপরাধে জেলখানায় আছি, এ বিষয়ে বাদশার কাছে আলোচনা করবে। এ থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়, উপায় অবলম্বনের চেষ্টা করা বৈধ এবং তা আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়। কিন্তু ওই মুক্তিলাভকারী যে লোকটিকে ইউসুফ আ. এ অনুরোধ করেছিলেন, সে বাদশার কাছে আলোচনা করতে শয়তান তাকে ভুলিয়ে দিল।
তাওরাতে এ প্রসঙ্গে উদ্ধৃত হয়েছে: “তখন ইউসুফ আ. বললেন, এর তাবীর ছিল-মনে কর, এ তিনটি ডাল তিনটি দিন। এখন হতে তিন দিনের মধ্যে বাদশাহ তোমার মোকদ্দমার রায় প্রদান করবেন এবং তোমাকে চাকরির পদ পুনরায় প্রদান করবেন এবং পূর্বে যেমনি তুমি ফেরাউনের শরাব পরিবেশক ছিলে, তদ্রুপ আবার তুমি শরাবের পেয়ালা ফেরাউনের হাতে দেবে। আর যখন তুমি খোশহাল হবে, তখন আমাকে স্মরণ কর এবং জেলখানা থেকে আমার মুক্তির কথা বলো। কেন না কাফেলার লোকেরা ইরানীদের দেশ হতে আমাকে অপহরণ করে নিয়ে এসেছে আর এখানেও আমি এমন কোনো কাজ করে নি, তারা আমাকে এ জেলখানায় আটকে রাখবে।"