📄 হযরত ইউসুফ আ.-এর স্বপ্ন এবং তাঁর ভাইদের আচরণ
হযরত ইয়াকুব আ. যেহেতু নিজের আওলাদের মধ্যে হযরত ইউসুফ আ.-কে অত্যন্ত স্নেহ মহব্বত করতেন, তাই তা ভাইদের পক্ষে অসহনীয় ছিল। তাঁরা সর্বক্ষণ কিভাবে হযরত ইয়াকুব আ.-এর অন্তর থেকে এ মহব্বত দূর করা যায় বা ইউসুফ আ.-কেই নিজেদের পথ থেকে সরিয়ে দেয়া যায় এ চিন্তায় লেগে থাকত। তারা ভাবত, তা হলেই সব কিছুর অবসান হয়ে যাবে।
ভাইদের এই হিংসাত্মক মনোভাবের ওপর অতিরিক্ত একটি ইন্ধন পড়ল হযরত ইউসুফ আ.-এর স্বপ্ন। তিনি স্বপ্নে দেখলেন, এগারোটি নক্ষত্র, সূর্য ও চাঁদ তাকে সেজদা করছে। হযরত ইয়াকুব আ. প্রিয়পুত্রের এ স্বপ্ন শুনে কঠোরভাবে তাঁকে নিষেধ করে দিলেন, এ স্বপ্ন পুনর্বার কারো সম্মুখে বর্ণনা করো না। নতুবা তোমার ভাইয়েরা তা শুনে তোমার প্রতি দুর্ব্যবহার আরম্ভ করে দেবে। কেন না শয়তান মানুষের পিছনে লেগেই আছে আর তোমার স্বপ্নের ফল নিতান্ত স্পষ্ট ও পরিষ্কার। কোরআন মাজিদ এ ঘটনাটি বর্ণনা করেছে:
إِذْ قَالَ يُوسُفُ لِأَبِيهِ يَا أَبَتِ إِنِّي رَأَيْتُ أَحَدَ عَشَرَ كَوْكَبًا وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ رَأَيْتُهُمْ لِي سَاجِدِينَ (৪) قَالَ يَا بُنَيَّ لَا تَقْصُصْ رُؤْيَاكَ عَلَى إِخْوَتِكَ فَيَكِيدُوا لَكَ كَيْدًا إِنَّ الشَّيْطَانُ لِلْإِنْسَانِ عَدُوٌّ مُبِينٌ (৫) وَكَذَلِكَ يَجْتَبِيكَ رَبُّكَ وَيُعَلِّمُكَ مِنْ تَأْوِيلِ الْأَحাদিثِ وَيُتِمُّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكَ وَعَلَى آلِ يَعْقُوبَ كَمَا أَتَتَهَا عَلَى أَبَوَيْكَ مِنْ قَبْلُ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْحَاقَ إِنَّ رَبَّكَ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
"যখন ইউসুফ আপন পিতাকে বললেন: পিতা, আমি স্বপ্নে এগারটি নক্ষত্র এবং সূর্য ও চন্দ্রকে দেখলাম, তারা আমাকে সেজদা করছে। তিনি বললেন: বৎস! তুমি তোমার ভাইদেরকে তোমার এ স্বপ্ন শুনিও না। পাছে না তারা তোমার সাথে কোনো ষড়যন্ত্র করে। নিঃসন্দেহ শয়তান মানুষের জন্য প্রকাশ্য শত্রু। আর এরূপে তোমার পালনকর্তা তোমাকে মনোনীত করবেন এবং তোমাকে স্বপ্নফল বর্ণনা শিক্ষা দেবেন। নিজের নেয়ামত তোমার ওপর এবং ইয়াকুবের আওলাদের ওপর পূর্ণ করবেন। যেমন তিনি (নবুয়তের) এ নেয়ামত পূর্ব থেকে তোমার পূর্বপুরুষগণের ওপর পূর্ণ করেছিলেন (অর্থাৎ ইয়াকুব ও ইসহাক আ.-এর ওপর)। নিঃসন্দেহ তোমার পালনকর্তা মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।
পরিশেষে হিংসার আগুন একদিন ইউসুফ আ.-এর ভাইদেরকে ইউসুফ আ.-এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতে বাধ্য করল। সুতরাং সব ভাই মিলে এ "বিষকাটা" সরানোর জন্য শলায় বসল। কুরআন মাজিদে ইরশাদ হচ্ছে:
إِذْ قَالُوا لَيُوسُفُ وَأَخُوهُ أَحَبُّ إِلَى أَبِينَا مِنَّا وَنَحْنُ عُصْبَةٌ إِنَّ أَبَانَا لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ (৮) اقْتُلُوا يُوسُفَ أَوِ اطْرَحُوهُ أَرْضًا يَخْلُ لَكُمْ وَجْهُ أَبِيكُمْ وَتَكُونُوا مِنْ بَعْدِهِ قَوْمًا صَالِحِينَ (৯) قَالَ قَائِلٌ مِنْهُمْ لَا تَقْتُلُوا يُوسُفَ وَأَلْقُوهُ فِي غَيَابَتِ الْجُبِّ يَلْتَقِطْهُ بَعْضُ السَّيَّارَةِ إِنْ كُنتُمْ فَاعِلِينَ
"যখন তারা বলতে লাগল অবশ্যই ইউসুফ এবং তার ভাই (বিনইয়ামিন) আমাদের পিতার অধিক স্নেহভাজন অথচ আমরা তাদের চেয়ে শক্তিশালী। নিঃসন্দেহে আমাদের পিতা প্রকাশ্য ভুলের মধ্যে রয়েছে। হয়তো ইউসুফকে হত্যা করে ফেল অথবা কোনো দূর দেশে নিয়ে ফেলে আসো। যাতে তোমাদের পিতার মনোযোগ তোমাদের প্রতি ঘুরে আসে। এরপর তোমরা নেককার কওম হয়ে থাকো। তাদের মধ্যে হতে একজন বলে উঠল, ইউসুফকে হত্যা করো না। যদি তোমাদের কিছু করতেই হয়, তবে তাঁকে একটি কূপে ফেলে দাও। যেন কোনো পথিক তাঁকে উঠিয়ে নিয়ে যায়।"
উক্ত পরামর্শের পর সকলে একত্র হয়ে হযরত ইয়াকূব আ.-এর কাছে গিয়ে বলল, আপনি ইউসুফকে আমাদের সাথে বাইরে বেড়াতে পাঠান না কেন? আমাদের উপর কি আপনার বিশ্বাস নেই? তাঁর সংরক্ষণের ব্যাপারে আমাদের চেয়ে অধিক হিতাকাঙ্ক্ষী আর কে হতে পারে? এ সম্পর্কে কুরআন মাজিদ বলে:
مَا لَكَ لَا تَأْمَنَّا عَلَىٰ يُوسُفَ وَإِنَّا لَهُ لَنَاصِحُونَ (১১) أَرْسِلْهُ مَعَنَا غَدًا يَرْتَعْ وَيَلْعَبْ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
"(তারা এসে বলল, পিতা!) এর কারণ কি, আপনি ইউসুফের বিষয়ে আমাদের বিশ্বাস করেন না? অথচ আমরা তাঁর হিতাকাঙ্ক্ষী। আগামীকাল তাঁকে আমাদের সঙ্গে প্রেরণ করুন। সে পানাহার করবে এবং খেলাধুলা করবে। নিঃসন্দেহে আমরা তাঁর হেফাযতকারী।”
পুত্ররা পিতার কাছে আবদার করল, তিনি যেন তাদের সাথে ভাই ইউসুফকে যেতে দেন। তাদের উদ্দেশ্য বলল, সে তাদের সাথে পশু চরাবে, খেলাধুলা ও আনন্দ-ফুর্তি করবে। তারা অন্তরে এমন কথা গোপন করে রাখল, যে বিষয়ে আল্লাহ সম্যক অবগত ছিলেন। বৃদ্ধ পিতা তাদেরকে আল্লাহর পক্ষ থেকে উত্তর দিলেন, হে পুত্রগণ! আমার কাছ থেকে সামান্য সময়ের জন্যেও তার বিছিন্ন হওয়া আমাকে বড়ই পীড়া দেয়। এ ছাড়া আমার আরো আশঙ্কা হয়, তোমরা খেলাধুলায় মত্ত হয়ে পড়লে সেই সুযোগে নেকড়ে এসে তাকে খেয়ে ফেলবে। আর তোমরা তা প্রতিহত করতে পারবে না অসতর্ক থাকার কারণে এবং সে-ও পারবে না অল্প বয়স্ক হওয়ার কারণে।
হযরত ইয়াকুব আ. বুঝতে পারলেন, তাদের মনে দুরভিসন্ধি রয়েছে। তারা ইউসুফের অনিষ্ট সাধনের পিছনে লেগেছে। কিন্তু তিনি পরিষ্কার কথায় সে মনোভাব প্রকাশ করলেন না। কেন না তাতে তারা আরো ক্রুদ্ধ হয়ে ইউসুফের সাথে প্রকাশ্য শত্রুতায় প্রবৃত্ত হতে পারে। ভাবলেন, ইশারা-ইঙ্গিতে বললে হয়তো তারা নিজেদের জালিমসুলভ ষড়যন্ত্র হতে বিরত হতে পারে। কাজেই ইঙ্গিতে তাদের সম্মুখে প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ করে দিলেন, বাস্তবিকই আমি ইউসুফ আ. সম্বন্ধে তোমাদের পক্ষ থেকে আশঙ্কা করছি। যেমন কুরআন মাজিদে ইরশাদ হচ্ছে:
قَالَ إِنِّي لَيَحْزُنُنِي أَنْ تَذْهَبُوا بِهِ وَأَخَافُ أَنْ يَأْكُلَهُ الذِّئْبُ وَأَنتُمْ عَنْهُ غَافِلُونَ
"ইয়াকুব আ. বললেন, এ বিষয়টি আমাকে দুঃখিত ও চিন্তান্বিত করছে, তোমরা (নিজেদের সঙ্গে) নিয়ে যাও। আমি আশঙ্কা করছি, নেকড়ে বাঘ এসে তাঁকে খেয়ে ফেলে এবং তোমরা তার থেকে অসতর্ক থাকো।" এ কথা শুনে ইউসুফ আ.-এর ভাইয়েরা সমস্বরে বলে উঠল:
لَئِنْ أَكَلَهُ الذِّئْبُ وَنَحْنُ عُصْبَةٌ إِنَّا إِذًا لَخَاسِرُونَ
"যদি তাঁকে নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলে, অথচ আমরা সকলে শক্তিশালী, তবে তো আমরা সব কিছুই খোয়ালাম।"
মুফাস্সিরীনে কেরাম ও আলেমগণ লেখেন, হযরত ইউসুফ আ. বালক বয়সে একবার স্বপ্নে দেখেন- এগারোটি নক্ষত্র তথা তাঁর এগারো ভাই এবং সূর্য ও চন্দ্র অর্থাৎ তাঁর পিতা-মাতা তাঁকে সেজদা করছেন। স্বপ্ন দেখে তিনি শঙ্কিত হন। ঘুম থেকে জেগে উঠে পিতার কাছে স্বপ্নটি বর্ণনা করেন। পিতা বুঝতে পারলেন, অচিরেই তিনি দুনিয়া ও আখিরাতের উচ্চ মর্যাদায় আসীন হবেন আর তাঁর পিতা-মাতা এবং ভাইগণ হবেন তাঁর অনুগত। পিতা তাঁকে এ স্বপ্নের কথা গোপন রাখতে বলেন এবং তা ভাইদের কাছে বর্ণনা করতে নিষেধ করেন। যাতে তারা হিংসাবশত ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করতে না পারে।
فَلَمَّا ذَهَبُوا بِهِ وَأَجْمَعُوا أَنْ يَجْعَلُوهُ فِي غَيَابَتِ الْجُبِّ وَأَوْحَيْنَا إِلَيْهِ لَتُنَبِّئَنَّهُمْ بِأَمْرِهِمْ هَذَا وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ (১৫) وَجَاءُوا أَبَاهُمْ عِشَاءً يَبْكُونَ (১৬) قَالُوا يَا أَبَانَا إِنَّا ذَهَبْنَا نَسْتَبِقُ وَتَرَكْنَا يُوسُفَ عِنْدَ مَتَاعِنَا فَأَكَلَهُ الذِّئْبُ وَمَا أَنْتَ بِمُؤْمِنٍ لَنَا وَلَوْ كُنَّا صَادِقِينَ (১৭) وَجَاءُوا عَلَى قَمِيصِهِ بِدَمٍ كَذِبٍ قَالَ بَلْ سَوَّلَتْ لَكُمْ أَنْفُسُكُمْ أَمْرًا فَصَبْرٌ جَمِيلٌ وَاللَّهُ الْمُسْتَعَانُ عَلَى مَا تَصِفُونَ
এরপর ওরা যখন তাকে নিয়ে গেল এবং তাকে গভীর কূপে নিক্ষেপ করতে একমত হল, এমতাবস্থায় আমি তাকে জানিয়ে দিলাম, তুমি ওদেরকে ওদের এ কর্মের কথা অবশ্যই বলে দেবে, যখন ওরা তোমাকে চিনবে না। ওরা রাতে কাঁদতে কাঁদতে পিতার নিকট আসল। তারা বলল, হে আমাদের পিতা! আমরা দৌঁড় প্রতিযোগিতা করছিলাম এবং ইউসুফকে আমাদের মালপত্রের কাছে রেখে গিয়েছিলাম, এরপর নেকড়ে বাঘ তাকে খেয়ে ফেলেছে; কিন্তু তুমি তো আমাদেরকে বিশ্বাস করবে না, যদিও আমরা সত্যবাদী। ওরা তার জামায় মিথ্যা রক্ত লেপন করে এনেছিল। সে বলল: না, তোমাদের মন তোমাদের জন্যে একটি কাহিনী সাজিয়ে দিয়েছে। সুতরাং পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়, তোমরা যা বলছ সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যস্থল।
📄 কেনানের কূপ
ইউসুফ আ.-এর ভায়েরা তাকে ময়দানে বেড়ানোর বাহানা দিয়ে নিয়ে গেল। পূর্ব পরামর্শনুযায়ী এমন একটি কূপের মধ্যে তাঁকে ফেলে দিল, যাতে পানি ছিল না; দীর্ঘকাল শুষ্ক অবস্থায় ছিল। আর গৃহ প্রত্যাবর্তনের সময় তাঁর জামাটিতে কোনো জন্তুর রক্ত মাখিয়ে ক্রন্দন করতে করতে হযরত ইয়াকুব আ.-এর নিকট এসে বলল, আব্বা! যদিও আমরা আমাদের সত্যতা আপনাকে বিশ্বাস করানোর জন্য যতই চেষ্টা করি না কেন, আপনি কখনও বিশ্বাস করবেন না। আমরা দৌড় প্রতিযোগিতায় একে অন্যের আগে গন্তব্য স্থানে পৌঁছার চেষ্টায় ব্যস্ত ছিলাম। হঠাৎ একটি নেকড়ে বাঘ এসে ইউসুফকে উঠিয়ে নিয়ে গেল। হযরত ইয়াকুব আ. ইউসুফ আ.-এর জামাটি দেখলেন তাতে রক্ত মাখানো আছে; কিন্তু কোথাও ছেঁড়া ছিল না কিংবা আচলও ফাঁড়া ছিল না। তৎক্ষণাৎ তিনি প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারলেন। কিন্তু ধমক দেওয়া বা তিরস্কার করা, নিন্দ করা, ঘৃণা ও অপদস্থ করার পদ্ধতি অবলম্বনের পরিবর্তে পয়গম্বরসুলভ জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টি, ধৈর্য ও মার্জনার স্বরে বললেন, প্রকৃত অবস্থা গোপন করার চেষ্টা সত্ত্বেও তোমরা এটাকে গোপন করতে পার নি বরং তোমাদের নফস তোমাদের জন্য একটি কথা সাজিয়ে দিয়েছে। এখন ধৈর্যই উত্তম। আর যে কথা তোমরা প্রকাশ করছ, সে বিষয়ে আল্লাহ পাকের নিকটই সাহায্য প্রার্থনা করছি।
📄 হযরত ইউসুফ আ.-এর দাসত্বের জীবন
এখানে পিতা ও পুত্রদের মধ্যে এরূপ কথাবার্তা চলছিল। আর ওদিকে ইউসুফ আ.-এর সঙ্গে একের পর এক ঘটনা ঘটল। হেজাযবাসী ইসমাঈলী খানদানের একটি কাফেলা শাম থেকে সুগন্ধি, মসলা ইত্যাদি বোঝাই করে মিসরে যাচ্ছিল। কূপ দেখে তারা পানির জন্য বালতি ফেলল। ইউসুফ মনে করলেন, হয়তো ভাইদের অন্তরে দয়ার সঞ্চার হয়েছে। কাজেই তিনি বালতি ধরে ঝুলে থাকলেন। বণিকরা বালতি উঠিয়ে ইউসুফ আ.-কে দেখে সজোরে বলে উঠল:
يَا بُشْرَىٰ هَٰذَا غُلَامٌ
"সুসংবাদ! একটি গোলাম হস্তগত হল।"
তাওরাতে বর্ণিত আছে: ইউসুফ আ.-এর ভাইয়েরা ইসমাঈলী কাফেলাকে দেখে পরস্পরে বলাবলি করতে লাগল, ইউসুফকে কূপ থেকে উঠিয়ে এ ব্যবসায়ীদের হাতে বিক্রি করে ফেল। কিন্তু এর পূর্বেই ইসমাঈলীরা তাঁকে বের করে গোলাম বানিয়ে নিয়েছে। আর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রাতবীন যখন কূপের নিকট পৌঁছল এবং দেখল, ইউসুফ আ. সেখানে নেই, তখন ক্রন্দন করতে করতে ফিরে এল। রাতবীনকে এ পরামর্শ দিয়েছিল ইয়াহুদা। রাতবীন আগে থেকেই ভাবছিল, ইউসুফকে কূপ থেকে তুলে চুপিচুপি পিতার হাতে সোর্পদ করে দেবে। এ কারনেই সে ইউসুফকে হত্যা করে ফেলার ঘোর বিরোধিতা করেছিল।
কোনো কোনো মুফাসসির লিখেছেন, ইউসুফ আ.-এর ভাইয়েরা তাকে কূপ থেকে বের করে কাফেলার নিকট বিক্রয় করেছিল। কিন্তু তাদের এ উক্তিটি কুরআন মাজিদ বা তাওরাতের সঙ্গে কোনো মিল নেই। দুনোটির দ্বারা বুঝা যায়, কাফেলার লোকেরা হযরত ইউসুফ আ.-কে গোলাম বানিয়ে নিজেদের পণ্য দ্রব্যাদির সঙ্গে তাঁকেও মিসর নিয়ে যায়।
📄 হযরত ইউসুফ আ. মিসরে
খৃস্টপূর্ব ২ হাজার বছর পূর্বে মিসরকে তাহযিব ও তামাদ্দুনের কেন্দ্রভূমি মনে করা হতো। তথাকার শাসক ছিল আমালেকা গোত্রের 'হিকসুস'। যেসময়ে হযরত ইউসুফ আ. কেনান থেকে যাযাবর জাতির ক্রীতদাস অবস্থায় মিসরে প্রবেশ করলেন, তৎকালে মিসরের রাজধানী ছিল 'রামাসিস' নামক স্থানে। এটা খুব সম্ভব তথায় অবস্থিত ছিল, যেখানে আজ 'ছানা' নামক বস্তিটি আবাদ রয়েছে। ভৌগোলিক বিবরণ হিসাবে এ স্থানটি পূর্বদিকে 'নীল' নদের নিকটে বলে কথিত। 'ফোতিকার' মিসরীয় সেনাবহিনীর প্রধান সেনাপতি, তিনি ছিলেন শাহি খান্দানের জনৈক রঈস লোক। তিনি বেড়াতে বের হয়ে মিসরের বাজারের উপর দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় ইউসুফ আ.-এর উপর তাঁর দৃষ্টি পড়ল। তিনি অতি সাধারণ মূল্যে তাঁকে ক্রয় করে নিলেন।
মিসরীয়রা তৎকালে নিজেদেরকে বিশ্বের সেরা সুসভ্য ও সুশৃঙ্খল জাতি বলে মনে করত। মরুবাসী যাযাবর গোত্রগুলোকে অত্যন্ত হীন ও তুচ্ছ দৃষ্টিতে দেখত। নিজ শহরে তাদের সাথে অস্পৃশ্যের মতো ব্যবহার করত। এ গোত্রগুলোর মধ্যেই একটি গোত্র ইবরাহীমী বংশের স্মৃতিচিহ্ন স্বরূপ কেনানে বসবাস করত। এ অঞ্চলে শহুরে পরিবেশ এবং স্থায়ী অধিবাসের নামচিহ্ন পর্যন্ত ছিল না। শিকারের ওপর তাদের জীবনযাপন নির্ভর করত। খড়ের ছাউনিযুক্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কুটিরে ছিল তাদের বসতি। আর বকরির পাল ছিল তাদের ধন-দৌলত।
এমতাবস্থায় ইউসুফ আ. সম্বন্ধে আল্লাহ তাআলার অভাবনীয় মোয়ামালা দেখুন। একজন গ্রামীণ সে আবার অল্প বয়স্ক গোলাম। তিনি যখন একজন সুসভ্য, প্রতাপশালী ও আড়ম্বরপূর্ণ ধনবান লোকের গৃহে পৌঁছলেন, তখন নিজের নিষ্পাপ জীবন, ধৈর্য ও গাম্ভীর্য এবং বিশ্বস্ততা ও যোগ্যতারূপী পবিত্র গুণাবীলর বদৌলতে, তাঁর প্রভুর চোখের মণি এবং প্রাণের মালিক হয়ে যান। লোকটি তার বিবিকে বলল: “একে সসম্মানে রাখ। বিচিত্র নয়, আমরা তার দ্বারা উপকৃত হব কিংবা আমরা তাকে পুত্ররূপে গ্রহণ করব।"
মোটকথা, ফোতিকার হযরত ইউসুফের সঙ্গে গোলামের মতো ব্যবহার করেন নি বরং নিজের সন্তানের মতো স্নেহসুলভ সম্মান ও মর্যাদার সাথে রাখলেন। বরং নিজের জমিদারী, ধন-দৌলত ও গৃহ জীবনের যাবতীয় দায়িত্ব তাঁকে সোপর্দ করে দিলেন এবং সে সমস্ত বিষয়ের আমানতদার বানিয়ে দিলেন। এ যেন কেনানের একজন পশুপালকের উপর যে অদূর ভবিষ্যতে রাজ্য পরিচালনার ভার অর্পিত হতে যাচ্ছে, তারই সূচনা ছিল। এটা ছিল আল্লাহর বিশেষ রহমত, করুণা ও অনুগ্রহ! এ ব্যবস্থার মাধ্যমে তিনি তাঁকে উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে এবং দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ দান করতে চেয়েছিলেন।
আহলে কিতাবরা বলে, ওই খরিদকারী ছিলেন মিসরের 'আযীয' অর্থাৎ অর্থমন্ত্রী। সে সময় মিসরের বাদশা ছিলেন রাইয়ান ইবনে ওয়ালিদ। তিনি ছিলেন আমালিক বংশোদ্ভূত। ইবনে ইসহাকের মতে আযীযের স্ত্রীর নাম ছিল রাঈল বিনতে রাআঈল। অন্যদের মতে যুলায়খা।
আল্লাহ তাআলা এভাবে হযরত ইউসুফ আ.-কে সে দেশে প্রতিষ্ঠিত করলেন। অর্থাৎ আযীয ও তাঁর স্ত্রীকে ইউসুফ আ.-এর সেবাযত্নে ও সাহায্য-সহযোগিতার জন্য নির্ধারণ করে মিসরের বুকে তাকে প্রতিষ্ঠিত করলেন। তাকে শিক্ষা দিলেন স্বপ্নের ব্যাখ্যা ও তত্ত্বজ্ঞান। আর আল্লাহ তাঁর কার্য-সম্পাদনে অপ্রতিহত। তিনি যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেন, তখন তা বাস্তবায়িত হয়েই থাকে। কেন না তিনি তা বাস্তবায়নের জন্যে এমন উপায় নির্ধারণ করে দেন, যা মানুষের কল্পনার বাইরে।
وَ لَمَّا بَلَغَ اَشُدَّهٗۤ اٰتَیْنٰهُ حُكْمًا وَّ عِلْمًاؕ-وَ كَذٰلِكَ نَجْزِی الْمُحْسِنِیْنَ
সে যখন পূর্ণ যৌবনে উপনীত হল, তখন আমি তাকে হিকমত ও জ্ঞান দান করলাম। আর এভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদের পুরস্কৃত করি।