📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 সংশয় নিরসন

📄 সংশয় নিরসন


ফাবাশশারনাহা বি-ইসহাকা ওয়ামিন ওয়ারায়ের ইসহাকা ইয়াকূব আল্লাহ তাআলার বাণী- এর দ্বারা মুজাহিদ ইবনে কাব আল কুরজি রহ. প্রমুখ দলিল পেশ করে বলেন, যাকে যবেহের হুকুম করা হয়েছিল তিনি হলেন ইসমাঈল আ.। ইসহাক আ. নন। কেন না সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে, তিনি বেঁচে থাকবেন এবং তাঁর ইয়াকুব নামে একজন সন্তানও জন্মগ্রহণ করবে। আর ইয়াকুব শব্দটি عقب শব্দ থেকে নির্গত। যার অর্থ পরে পাওয়া বা পরে আসা।

আহলে কিতাবদের মতে, আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহীম আ.-কে বলেন: তোমার স্ত্রীকে ‘সারী’ ডেকো না, বরং সে হচ্ছে 'সারাহ'। আমি তাকে বরকত দান করব এবং তাকে পুত্র সন্তান দান করব। সে পুত্রকেও বরকতময় করব। তার বংশ থেকে অনেক গোত্র হবে এবং সে বংশে অনেক রাজা-বাদশার জন্ম হবে। একথা শুনে হযরত ইবরাহীম আ. শোকর আদায় করেন। তিনি মনে মনে চিন্তা করে হাসেন এবং বলেন, আমার বয়স যখন একশর উপরে এবং সারাহর বয়স নব্বই; এখন আমাদের সন্তান হবে! আল্লাহ বলেন: হে ইবরাহীম! আমি আমার নিজের কসম করে বলছি, তোমার স্ত্রী সারাহ অবশ্যই পুত্র সন্তান প্রসব করবে। তার নাম হবে ইসহাক। পবিত্র কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে: (ওয়াহাবনা লাহু ইসহাকা অয়া ইয়াকূবা কুল্লাল হাদাইনা) অর্থাৎ আমি তাকে দান করেছি ইসহাক ও ইয়াকুব। প্রত্যেককেই আমি পথ-প্রদর্শন করেছি। (সূরা আনআম: ৮৪)

অন্যত্র বলা হয়েছে: (ফালাম্মাতাযালাহুম অয়ামা ইয়াবুর্দনা মিন দুনিল্লাহি ওয়াহাবনা লাহু ইসহাকা অয়া ইয়াকূব) অর্থাৎ এরপর ইবরাহীম যখন তাদেরকে এবং আল্লাহ ব্যতীত তারা আর যাদের পূজা করত তাদের সবাইকে পরিত্যাগ করল। তখন আমি তাকে দান করলাম ইসহাক ও ইয়াকূব। (সূরা মারইয়াম: ৪৯)

এ আয়াতটি উল্লিখিত অভিমতকে আরো শক্তিশালী করেছে। বুখারী ও মুসলিমের একটি হাদিসও এই মতকে সমর্থন করে। হযরত আবু যর রাযি. বলেন: আমি একদিন জিজ্ঞাস করলাম- আল্লাহর রাসুল, সর্বপ্রথম নির্মিত মসজিদ কোনটি? তিনি বললেন, মসজিদুল হারাম। আমি বললাম, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, মসজিদুল আকসা। আমি বললাম, এ দু মসজিদের নির্মাণের মধ্যে ব্যবধান কত? তিনি বললেন, চল্লিশ বছর। আমি বললাম, এর পরবর্তী মর্যাদাসম্পন্ন মসজিদ কোনটি? তিনি বললেন, এর পরে সব জায়গা সমান। যেখানেই নামাযের সময় হয়, সেখানেই পড়ে নাও। কেন না সকল জায়গাই নামায আদায়ের উপযুক্ত।

আহলে কিতাবদের মতে হযরত ইয়াকুব আ. মসজিদে আকসা নির্মাণ করেন। এর অপর নাম মসজিদে ঈলয়া ও বায়তুল মুকাদ্দাস। এটাও উল্লিখিত হাদিসের বর্ণনার সত্যতার প্রমাণ। এ হিসাবে ইবরাহীম আ. ও ইসমাঈল আ. কর্তৃক মসজিদুল হারাম নির্মাণের চল্লিশ বছর পর ইয়াকুব (যার অপর নাম ইসরাঈল) আ. কর্তৃক মসজিদে আকসা নির্মাণের তথ্য পাওয়া যায়। সাথে সাথে আরো প্রমাণিত হয়, ইবরাহীম আ. ও. ইসমাঈল আ. যখন মসজিদুল হারাম নির্মাণ করেন তখন ইসহাক আ. বর্তমান ছিলেন। কেন না ইবরাহীম আ. যখন দুআ করেছিলেন, তখন বলেছিলেন:

ওয়া ইয ক্বালা ইব্রাহীমু রব্বিজ আল হাযাল বালাদা আমিনাও অয়াজনু্বনী অয়াবানিয়্যা আন নাবুদাল আসনাম (৩৫) রব্বি ইন্নাহুন্না আদলালনা কাছীরাম মিনান নাসি ফামান তাবিআনী ফাইন্নাহু মিন্নী অয়ামান আসানী ফাইন্নাকা গফুরুর রহীম (৩৬) রব্বানা ইন্নী আস্কানতু মিন যুররিয়্যাতী বিঅয়াদিন গইরি যী যারইন ইনদা বাইতিকাল মুহার্রামি রব্বানা লিইউক্বীমুস সালাতা ফাজআল আফইদাতাম মিনান নাসি তাহওয়ী ইলাইহিম অয়ারযুক্বহুম মিনাছ ছামারাতি লাআল্লাহুম ইয়াশকুরুন (৩৭) রব্বানা ইন্নাকা তালামু মা নুখফী অয়ামা নুলিনু অয়ামা ইয়াখফা আলাল্লাহি মিন শাইইন ফিল আরদি অয়ালা ফিস সামা-ই (৩৮) আল হামদু লিল্লা হিল্লাযী ওয়াহাবা লী আলাল কিবারি ইসমাঈলা অয়া ইসহাক্বা ইন্না রব্বী লাসামীউদ দুআ (৩৯) রব্বিজ আলনী মুক্বীমাস সালাতি অয়ামিন যুররিয়্যাতী রব্বানা অয়া তাক্বাব্বাল দুআ (৪০) রব্বানাগ ফিরলী অয়ালি অয়ালিদাইয়্যা অয়ালিল মুমিনিনা ইয়াওমা ইয়াক্বূমুল হিসবা (৪১)

স্মরণ কর! ইবরাহীম যখন বলল- 'হে আমার প্রতিপালক! এই নগরীকে নিরাপদ করো এবং আমাকে ও আমাকে ও আমার পুত্রগণকে প্রতিমা পূজা থেকে দূরে রাখো। হে আমার প্রতিপালক! এ প্রতিমাগুলো বহু মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে। সুতরাং যে আমার অনুসরণ করবে সেই আমার দলভুক্ত, কিন্তু কেউ আমার অবাধ্য হলে তুমি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। হে আমার প্রতিপালক! আমি আমার বংশধরদের কতককে বসবাস করালাম অনুর্বর উপত্যকায় তোমার পবিত্র ঘরের নিকট, হে আমাদের প্রতিপালক! এজন্যে যে, ওরা যেন সালাত কায়েম করে। অতএব তুমি কিছু লোকের অন্তর ওদের প্রতি অনুরাগী করে দাও এবং ফল-ফলাদি দ্বারা ওদের রিযিকের ব্যবস্থা করো, যাতে ওরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি তো জান, যা আমরা গোপন করি এবং যা আমরা প্রকাশ করি; আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর কিছুই আল্লাহর নিকট গোপন থাকে না। প্রশংসা আল্লাহরই প্রাপ্য, যিনি আমাকে আমার বার্ধক্যে ইসমাঈল ও ইসহাককে দান করেছেন। আমার প্রতিপালক অবশ্যই প্রার্থনা শুনে থাকেন। হে আমার প্রতিপালক! আমার দোয়া কবুল করো। হে আমাদের প্রতিপালক! যেদিন হিসাব হবে সেদিন আমাকে আমার পিতামাতাকে এবং মুমিনগণকে ক্ষমা করো! বায়তুল মুকাদ্দাসের নিয়ন্ত্রণভার যখন ইউশা ইবনে নূন আ.-এর ওপর ন্যস্ত হল, তখন তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসের একটি পাথরের উপর এ তাঁবু গম্বুজটি স্থাপন করেন। বনি ইসরাঈলরা এটার দিকে মুখ করে নামায আদায় করত। এরপর যখন তাঁবু গম্বুজটি বিনষ্ট হয়ে যায় তখন তারা গম্বুজের স্থান অর্থাৎ পাথরের দিকেই নামায আদায় করতে লাগল। এ জন্যেই ইউশা আ.-এর পর থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর যুগ পর্যন্ত সমস্ত নবীর কেবলা ছিল এটাই। এমনকি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও হিজরতের পূর্বে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায আদায় করতেন। তবে কাবা শরীফকে সামনে রেখেই তা করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় হিজরত করেন, তখন তাঁকে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায আদায় করার নির্দেশ দেওয়া হয়। ষোল মাস মতান্তরে সতের মাস তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায আদায় করেন। এরপর দ্বিতীয় হিজরির শাবান মাসে আসরের নামাযে মতান্তরে যোহরের সময় ইবরাহীম খলীল আ. কর্তৃক নির্মিত কাবা ঘরের দিকে ফিরে নামায পড়েন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px