📄 হযরত ইসহাক আ.-এর জন্ম
এ প্রসঙ্গে আল্লাহর বাণী:
وَبَشِّرْنَاهُ بِإِسْحَاقَ نَبِيًّا مِنَ الصَّالِحِينَ (১১২) وَبَارَكْنَا عَلَيْهِ وَعَلَى إِسْحَاقَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِهِمَا مُحْسِنٌ وَظَالِمٌ لِنَفْسِهِ مُبِينٌ (১১৩)
"আমি তাকে সুসংবাদ দিয়েছিলাম ইসহাকের, সে ছিল একজন নবী, সৎকর্মপরায়ণদের অন্যতম। আমি তাকে বরকত দান করেছিলাম এবং ইসহাককেও। তাদের বংশধরদের মধ্যে কিছু সৎকর্মপরায়ণ এবং কিছু নিজেদের প্রতি স্পষ্ট অত্যাচারী।" (সূরা সাফফাত: ১১২-১১৩)
মাদায়েন অঞ্চলের অধিবাসী লূত আ.-এর সম্প্রদায়ের কুফরি ও পাপাচারের শাস্তি প্রদানের উদ্দেশ্যে আল্লাহর ফেরেশতাগণ সেখানে যাওয়ার পথে হযরত ইবরাহীম আ. ও সারাহকে আল্লাহ তাআলার এ সুসংবাদ শুনিয়ে যান:
وَلَقَدْ جَاءَتْ رُسُلُنَا إِبْرَاهِيمَ بِالْبُشْرَى قَالُوا سَلَامًا قَالَ سَلَامٌ فَمَا لَبِثَ أَنْ جَاءَ بِعِজْلٍ حَنِينٍ (৬৯) فَلَمَّا রারা আয়দিয়াহুম লা তাসিলু ইলাইহি নাকিরাহুম ওয়া আওজাসা মিনহুম খীফাতান ক্বালু লা তাখাফ ইন্না উরসিলনা ইলা ক্বাওমি লূত (৭০) ওয়ামরাআতুহু ক্বয়িমাতুন ফাদাহিকাত ফাবাশশারনাহা বি-ইসহাকা ওয়ামিন ওয়ারায়ের ইসহাকা ইয়াকূব (৭১) ক্বালাত ইয়া অয়িলাতা আ-আলিদু ওয়া আনা আজুযুন ওয়া হাযা বালী শাইখান ইন্না হাযা লাশাইউন আজীব (৭২) ক্বালু আতাজাবিনা মিন আম্রিল্লাহি রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু আলাইকুম আহলাল বাইতি ইন্নাহু হামীদুম মাজীদ (৭৩)
আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ ইবরাহীম আ.-এর কাছে সুসংবাদ নিয়ে এসেছিল। তারা বলল, 'সালাম'। সেও বলল, 'সালাম'। সে অবিলম্বে এক কাবাব করা বাছুর নিয়ে এলো। সে যখন দেখল, তাদের হাত সেটার দিকে প্রসারিত হচ্ছে না, তখন তাদের অপরিচিত মনে হতে লাগল। এবং তাদের সম্বন্ধে তার মনে ভীতি সঞ্চার হল। তারা বলল, ভয় করো না। আমরা লূত আ.-এর সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হয়েছি। তখন তার স্ত্রী দাঁড়িয়েছিল এবং সে হাসল। তারপর আমি তাকে ইসহাকের ও ইসহাকের পরবর্তী ইয়াকুবের সুসংবাদ দিলাম। সে বলল, কি আশ্চর্য! সন্তানের জননী হব আমি যখন আমি বৃদ্ধা এবং আমার স্বামী বৃদ্ধ! এটি অবশ্যই এক অদ্ভুত ব্যাপার। তারা বলল, আল্লাহর কাজে তুমি বিস্ময় বোধ করছ? হে পরিবারবর্গ! তোমাদের প্রতি রয়েছে আল্লাহর অনুগ্রহ ও কল্যাণ। তিনি প্রশংসিত ও সম্মানিত। (সূরা হুদ: ৬৯-৭৩)
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَنَبِّئُهُمْ عَنْ ضَيْفِ إِبْرَاهِيمَ (৫১) ইয দাখালু আলাইহি ফাক্বালু সালামা ক্বালা ইন্না মিনকুম অয়াজিলুন (৫২) ক্বালু লা তাওজাল ইন্না নুবাক্শিরুকা বিগলামিন আলীম (৫৩) ক্বালা আবাক্শারতুমুনী আলা আন মাস্সানিয়াল কিবারু ফাবিমা তুবাক্শিরুন (৫৪) ক্বালু বাক্শারনাকা বিল হাক্বক্বি ফালা তাকুন মিনাল ক্বানিতীন (৫৫) ক্বালা ওয়ামান ইয়াক্বনাতু মির রহমাতি রব্বিহি ইল্লাদ দয়াল্লুন (৫৬)
এবং ওদের বলো, ইবরাহীমের অতিথিদের কথা, যখন ওরা তার নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, 'সালাম'। তখন সে বলেছিল, 'আমরা তোমাদের আগমনে আতঙ্কিত।' তারা বলল, 'ভয় করো না, আমরা তোমাকে এক জ্ঞানী পুত্রের শুভ সংবাদ দিচ্ছি।' সে বলল, 'তোমরা কি আমাকে শুভ সংবাদ দিচ্ছ আমি বার্ধক্যগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও? তোমরা কি বিষয়ে শুভ সংবাদ দিচ্ছ? ওরা বলল, 'আমরা সত্য সংবাদ দিচ্ছি, সুতরাং তুমি হতাশ হয়ো না।' সে বলল, 'যারা পথভ্রষ্ট তারা ছাড়া আর কে তার প্রতিপালকের অনুগ্রহ হতে হতাশ হয়?' (সূরা হিজর: ৫১-৫৬)
আল্লাহ তাআলার বাণী:
ইয দাখালু আলাইহি ফাক্বালু সালামা ক্বালা সালামুন ক্বাওমুম মুনকারুন (২৫) ফারগা ইলা আহলিহি ফাজায়া বি-ইজলিন সামীন (২৬) ফাক্বররবোহু ইলাইহিম ক্বালা আ-লা তাকুলুন (২৭) ফাউজাসা মিনহুম খীফাতান ক্বালু লা তাখাফ অয়া বাশ্শারুহু বিগলামিন আলীম (২৮) ফাক্ববালাতিম রাআতুহু ফী সর্রাতিন ফাসাক্কাত অজহাহা অয়াক্বালাত আজুযুন আক্বীম (২৯) ক্বালু কাযালিকা ক্বালা রব্বুকি ইন্নাহু হুয়াল হাকীমুল আলীম (৩০)
তোমার নিকট ইবরাহীম আ.-এর সম্মানিত মেহমানদের বৃত্তান্ত এসেছে কি? যখন ওরা তার কাছে উপস্থিত হয়ে বলল, 'সালাম'। উত্তরে সে বলল, 'সালাম'। এরা তো অপরিচিত লোক। তারপর ইবরাহীম আ. তার স্ত্রীর নিকট গেল এবং একটি মাংসল গরুর বাছুর ভাজা অবস্থায় নিয়ে এনে তাদের সামনে রাখল। বলল, 'তোমরা খাচ্ছ না কেন? এতে ওদের সম্পর্কে তার মনে ভীতির সঞ্চার হল। ওরা বলল, 'ভীত হয়ো না। তারপর ওরা তাকে এক জ্ঞানী পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিল। তখন তার স্ত্রী চিৎকার করতে করতে আসল এবং গাল চাপড়িয়ে বলল, এই বৃদ্ধা-বন্ধ্যার সন্তান হবে? তারা বলল, তোমার প্রতিপালক এরূপই বলেছেন, তিনি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ। (সূরা যারিয়াত: ২৪-৩০)
এখানে মেহমান অর্থ ফেরেশতা। যারা মানুষের আকৃতি ধারণ করে এসেছিলেন, এরা সংখ্যায় ছিলেন তিনজন। হযরত জিবরাঈল, মীকাঈল ও ইসরাফীল আ.। হযরত ইবরাহীম আ.-এর বাড়িতে এলে তিনি মেহমানরূপে গণ্য করেন এবং মেহমানদের সাথে যে রকম আচরণ করা হয় সে রকম আচরণ করেন। সুতরাং তিনি তাঁর গোয়ালের সবচেয়ে হৃষ্টপুষ্ট একটি বাছুর ভুনা করে তাদের সামনে পেশ করেন। কিন্তু তিনি আহারের প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ দেখতে পেলেন না। কেন না, ফেরেশতাদের আহারের কোনো প্রয়োজন হয় না। ইবরাহীম আ. তাদেরকে অপরিচিত লোক মনে করলেন। (নাকিতাহুম অয়া আওজাসা মিনহুম খীফাতান ক্বালু লা তাখাফ ইন্না উরসিলনা ইলা ক্বাওমি লূত) অর্থাৎ 'তাদের সম্বন্ধে তার মনে ভীতির সঞ্চার হল। তারা বলল, 'ভীত হয়ো না, আমরা লুতের সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হয়েছি।'
অর্থাৎ তাদেরকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে এ সময় স্ত্রী সারাহ আল্লাহর ক্রোধে লুতের সম্প্রদায়ের শাস্তির কথা শুনে আনন্দিত হন। সারাহ মেহমানদের সামনেই দণ্ডায়মান ছিলেন যেমনি আরব ও অনারবদের মধ্যে নিয়ম প্রচলিত আছে। সারাহ যখন ঐ সংবাদ শুনে হেসে দেন তখন আল্লাহ তাকে সুসংবাদ দেন: (ফাবাশশারনাহা বি-ইসহাকা ওয়ামিন ওয়ারায়ের ইসহাকা ইয়াকূব) অর্থাৎ তারপর আমি তাকে ইসহাকের ও ইসহাকের পরবর্তী ইয়াকুবের সুসংবাদ দিলাম। অর্থাৎ, ফেরেশতারা তাকে এ বিষয়ে সুসংবাদ দেন। (ফাক্ববালাতিম রাআতুহু ফী সর্রাতিন) অর্থাৎ তখন তার স্ত্রী চিৎকার করতে করতে সম্মুখে আসল। (ফাসাক্কাত অজহাহা) অর্থাৎ এবং নিজের গাল চাপড়িয়ে বলতে লাগল। অর্থাৎ যেভাবে মেয়ে লোকেরা অবাক হলে করে থাকে। (ক্বালাত ইয়া অয়িলাতা আ-আলিদু ওয়া আনা আজুযুন ওয়া হাযা বালী শাইখান) অর্থাৎ কী আশ্চর্য! আমি জননী হব, অথচ এখন আমি বৃদ্ধা এবং এই আমার স্বামী বৃদ্ধ! অর্থাৎ আমার-মত একজন বৃদ্ধা ও বন্ধ্যা মহিলা কী করে সন্তান জন্ম দিতে পারে! আর আমার স্বামীও এই বৃদ্ধ! এ অবস্থায় সন্তান হওয়ার সংবাদে তিনি আশ্চর্যবোধ করেন। তাই তিনি বলেন: (ইন্না হাযা লাশাইউন আজীব) অর্থাৎ এটা অবশ্যই এক অদ্ভুত ব্যাপার।
ক্বালু আতাজাবিনা মিন আম্রিল্লাহি রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু আলাইকুম আহলাল বাইতি ইন্নাহু হামীদুম মাজীদ (ওরা বলল, আল্লাহর কাজে আপনি বিস্ময়বোধ করছেন? হে পরিবারবর্গ! তোমাদের প্রতি রয়েছে আল্লাহর অনুগ্রহ ও কল্যাণ। তিনি প্রশংসার অধিকারী ও সম্মানের অধিকারী।) ইবরাহীম আ. এ সুসংবাদ পেয়ে স্ত্রীর খুশির সঙ্গে শরীক হন। এবং স্ত্রীর মনে দৃঢ়তা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে নিজেও আশ্চর্যবোধ করেন। (ক্বালা আ-বাক্শারতুমুনী আলা আন মাস্সানিয়াল কিবারু ফাবিমা তুবাক্শিরুন ক্বালু বাক্শারনাকা বিল হাক্বক্বি ফালা তাকুন মিনাল ক্বানিতীন) অর্থাৎ ইবরাহীম বলল, তোমরা কি আমাকে শুভ সংবাদ দিচ্ছ আমি বার্ধক্যগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও? তোমরা কি বিষয়ে শুভ সংবাদ দিচ্ছ? তারা বলল, আমরা সত্য সংবাদ দিচ্ছি। সুতরাং আপনি হতাশ হবেন না।
এই বাক্য দ্বারা সুসংবাদকে দৃঢ় করা হয়েছে। তারপর ফেরেশতাগণ ইবরাহীম আ. ও সারাহকে এক জ্ঞানী পুত্র সন্তানের (বিগলামিন আলীম) সুসংবাদ দিলেন। অর্থাৎ ইসহাক আ. ও তার ভাইয়ের কথা। ইসমাঈল আ.-কে আল্লাহ বিভিন্ন গুণ ও মর্যাদার অধিকারী বলে কুরআনে উল্লেখ করেছেন। যেমন হালীম বা ধৈর্যশীল। যা তাঁর অবস্থার সাথে খুবই সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাছাড়া ওয়াদাপালনকারী এবং সহনশীল বলেও তাঁর উল্লেখ করা হয়েছে। হযরত ইবরাহীম আ.-এর একশ বছর বয়সকালে এবং ইসমাঈল আ.-এর জন্মের চৌদ্দ বছর পর ইসহাক আ.-এর জন্ম হয়। তাঁর মাতা সারাহকে যখন পুত্র হওয়ার সুসংবাদ দেওয়া হয় তখন তাঁর বয়স ছিল নব্বই বছর। আল্লাহ পাক কুরআনের অনেক আয়াতে ইসহাক আ.-এর প্রশংসা করেছেন। আর হযরত আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত হাদিস রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: একজন সম্মানিত ব্যক্তি, যার পিতাও ছিলেন সম্মানিত, তাঁর পিতাও ছিলেন সম্মানিত এবং তাঁর পিতাও ছিলেন সম্মানিত। তিনি হলেন ইউসূফ ইবনে ইয়াকুব ইবনে ইবরাহীম।
আহলে কিতাবরা বলেন, ইসহাক আ. তাঁর চল্লিশ বছর বয়সে পিতার জীবদ্দশায় রুফাকা বিনতে লাবানকে বিবাহ করেন। রুফাকা ছিলেন বন্ধ্যা। তাই ইসহাক আ. সন্তানের জন্যে আল্লাহর কাছে দুআ করেন। এরপর তার স্ত্রী সন্তান-সম্ভবা হন এবং তিনি জময দুই পুত্র সন্তান প্রসব করেন। তাদের প্রথমজনের নাম রাখা হয় 'ঈসু'। আরবরা যাকে 'ঈস' বলে তাকে। এ ঈস হচ্ছেন রূমের পিতা। দ্বিতীয় সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় তাকে তার ভাইয়ের গোড়ালি আঁকড়ে থাকতে দেখা যায়। এ কারণে তার নাম রাখা হয় ইয়াকুব। কেন না এ শব্দটির মূলধাতু (عقب) অর্থ গোড়ালি বা পশ্চাতে আগমনকারী। তাঁর অপর নাম ইসরাঈল, যার নামে বনি ইসরাঈল বংশের নামকরণ করা হয়েছে। রোগাক্রান্ত হয়ে হযরত ইসহাক আ. একশ আশি বছর বয়সে ইনতিকাল করেন। তাঁর পুত্রদ্বয় ঈস ও ইয়াকুব আ. তাকে তাঁর পিতার পূর্বোল্লেখিত তাদের কেনা জমিতে হযরত ইবরাহীম আ.-এর কবরের পাশে সমাহিত করেন।
📄 সংশয় নিরসন
ফাবাশশারনাহা বি-ইসহাকা ওয়ামিন ওয়ারায়ের ইসহাকা ইয়াকূব আল্লাহ তাআলার বাণী- এর দ্বারা মুজাহিদ ইবনে কাব আল কুরজি রহ. প্রমুখ দলিল পেশ করে বলেন, যাকে যবেহের হুকুম করা হয়েছিল তিনি হলেন ইসমাঈল আ.। ইসহাক আ. নন। কেন না সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে, তিনি বেঁচে থাকবেন এবং তাঁর ইয়াকুব নামে একজন সন্তানও জন্মগ্রহণ করবে। আর ইয়াকুব শব্দটি عقب শব্দ থেকে নির্গত। যার অর্থ পরে পাওয়া বা পরে আসা।
আহলে কিতাবদের মতে, আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহীম আ.-কে বলেন: তোমার স্ত্রীকে ‘সারী’ ডেকো না, বরং সে হচ্ছে 'সারাহ'। আমি তাকে বরকত দান করব এবং তাকে পুত্র সন্তান দান করব। সে পুত্রকেও বরকতময় করব। তার বংশ থেকে অনেক গোত্র হবে এবং সে বংশে অনেক রাজা-বাদশার জন্ম হবে। একথা শুনে হযরত ইবরাহীম আ. শোকর আদায় করেন। তিনি মনে মনে চিন্তা করে হাসেন এবং বলেন, আমার বয়স যখন একশর উপরে এবং সারাহর বয়স নব্বই; এখন আমাদের সন্তান হবে! আল্লাহ বলেন: হে ইবরাহীম! আমি আমার নিজের কসম করে বলছি, তোমার স্ত্রী সারাহ অবশ্যই পুত্র সন্তান প্রসব করবে। তার নাম হবে ইসহাক। পবিত্র কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে: (ওয়াহাবনা লাহু ইসহাকা অয়া ইয়াকূবা কুল্লাল হাদাইনা) অর্থাৎ আমি তাকে দান করেছি ইসহাক ও ইয়াকুব। প্রত্যেককেই আমি পথ-প্রদর্শন করেছি। (সূরা আনআম: ৮৪)
অন্যত্র বলা হয়েছে: (ফালাম্মাতাযালাহুম অয়ামা ইয়াবুর্দনা মিন দুনিল্লাহি ওয়াহাবনা লাহু ইসহাকা অয়া ইয়াকূব) অর্থাৎ এরপর ইবরাহীম যখন তাদেরকে এবং আল্লাহ ব্যতীত তারা আর যাদের পূজা করত তাদের সবাইকে পরিত্যাগ করল। তখন আমি তাকে দান করলাম ইসহাক ও ইয়াকূব। (সূরা মারইয়াম: ৪৯)
এ আয়াতটি উল্লিখিত অভিমতকে আরো শক্তিশালী করেছে। বুখারী ও মুসলিমের একটি হাদিসও এই মতকে সমর্থন করে। হযরত আবু যর রাযি. বলেন: আমি একদিন জিজ্ঞাস করলাম- আল্লাহর রাসুল, সর্বপ্রথম নির্মিত মসজিদ কোনটি? তিনি বললেন, মসজিদুল হারাম। আমি বললাম, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, মসজিদুল আকসা। আমি বললাম, এ দু মসজিদের নির্মাণের মধ্যে ব্যবধান কত? তিনি বললেন, চল্লিশ বছর। আমি বললাম, এর পরবর্তী মর্যাদাসম্পন্ন মসজিদ কোনটি? তিনি বললেন, এর পরে সব জায়গা সমান। যেখানেই নামাযের সময় হয়, সেখানেই পড়ে নাও। কেন না সকল জায়গাই নামায আদায়ের উপযুক্ত।
আহলে কিতাবদের মতে হযরত ইয়াকুব আ. মসজিদে আকসা নির্মাণ করেন। এর অপর নাম মসজিদে ঈলয়া ও বায়তুল মুকাদ্দাস। এটাও উল্লিখিত হাদিসের বর্ণনার সত্যতার প্রমাণ। এ হিসাবে ইবরাহীম আ. ও ইসমাঈল আ. কর্তৃক মসজিদুল হারাম নির্মাণের চল্লিশ বছর পর ইয়াকুব (যার অপর নাম ইসরাঈল) আ. কর্তৃক মসজিদে আকসা নির্মাণের তথ্য পাওয়া যায়। সাথে সাথে আরো প্রমাণিত হয়, ইবরাহীম আ. ও. ইসমাঈল আ. যখন মসজিদুল হারাম নির্মাণ করেন তখন ইসহাক আ. বর্তমান ছিলেন। কেন না ইবরাহীম আ. যখন দুআ করেছিলেন, তখন বলেছিলেন:
ওয়া ইয ক্বালা ইব্রাহীমু রব্বিজ আল হাযাল বালাদা আমিনাও অয়াজনু্বনী অয়াবানিয়্যা আন নাবুদাল আসনাম (৩৫) রব্বি ইন্নাহুন্না আদলালনা কাছীরাম মিনান নাসি ফামান তাবিআনী ফাইন্নাহু মিন্নী অয়ামান আসানী ফাইন্নাকা গফুরুর রহীম (৩৬) রব্বানা ইন্নী আস্কানতু মিন যুররিয়্যাতী বিঅয়াদিন গইরি যী যারইন ইনদা বাইতিকাল মুহার্রামি রব্বানা লিইউক্বীমুস সালাতা ফাজআল আফইদাতাম মিনান নাসি তাহওয়ী ইলাইহিম অয়ারযুক্বহুম মিনাছ ছামারাতি লাআল্লাহুম ইয়াশকুরুন (৩৭) রব্বানা ইন্নাকা তালামু মা নুখফী অয়ামা নুলিনু অয়ামা ইয়াখফা আলাল্লাহি মিন শাইইন ফিল আরদি অয়ালা ফিস সামা-ই (৩৮) আল হামদু লিল্লা হিল্লাযী ওয়াহাবা লী আলাল কিবারি ইসমাঈলা অয়া ইসহাক্বা ইন্না রব্বী লাসামীউদ দুআ (৩৯) রব্বিজ আলনী মুক্বীমাস সালাতি অয়ামিন যুররিয়্যাতী রব্বানা অয়া তাক্বাব্বাল দুআ (৪০) রব্বানাগ ফিরলী অয়ালি অয়ালিদাইয়্যা অয়ালিল মুমিনিনা ইয়াওমা ইয়াক্বূমুল হিসবা (৪১)
স্মরণ কর! ইবরাহীম যখন বলল- 'হে আমার প্রতিপালক! এই নগরীকে নিরাপদ করো এবং আমাকে ও আমাকে ও আমার পুত্রগণকে প্রতিমা পূজা থেকে দূরে রাখো। হে আমার প্রতিপালক! এ প্রতিমাগুলো বহু মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে। সুতরাং যে আমার অনুসরণ করবে সেই আমার দলভুক্ত, কিন্তু কেউ আমার অবাধ্য হলে তুমি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। হে আমার প্রতিপালক! আমি আমার বংশধরদের কতককে বসবাস করালাম অনুর্বর উপত্যকায় তোমার পবিত্র ঘরের নিকট, হে আমাদের প্রতিপালক! এজন্যে যে, ওরা যেন সালাত কায়েম করে। অতএব তুমি কিছু লোকের অন্তর ওদের প্রতি অনুরাগী করে দাও এবং ফল-ফলাদি দ্বারা ওদের রিযিকের ব্যবস্থা করো, যাতে ওরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি তো জান, যা আমরা গোপন করি এবং যা আমরা প্রকাশ করি; আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর কিছুই আল্লাহর নিকট গোপন থাকে না। প্রশংসা আল্লাহরই প্রাপ্য, যিনি আমাকে আমার বার্ধক্যে ইসমাঈল ও ইসহাককে দান করেছেন। আমার প্রতিপালক অবশ্যই প্রার্থনা শুনে থাকেন। হে আমার প্রতিপালক! আমার দোয়া কবুল করো। হে আমাদের প্রতিপালক! যেদিন হিসাব হবে সেদিন আমাকে আমার পিতামাতাকে এবং মুমিনগণকে ক্ষমা করো! বায়তুল মুকাদ্দাসের নিয়ন্ত্রণভার যখন ইউশা ইবনে নূন আ.-এর ওপর ন্যস্ত হল, তখন তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসের একটি পাথরের উপর এ তাঁবু গম্বুজটি স্থাপন করেন। বনি ইসরাঈলরা এটার দিকে মুখ করে নামায আদায় করত। এরপর যখন তাঁবু গম্বুজটি বিনষ্ট হয়ে যায় তখন তারা গম্বুজের স্থান অর্থাৎ পাথরের দিকেই নামায আদায় করতে লাগল। এ জন্যেই ইউশা আ.-এর পর থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর যুগ পর্যন্ত সমস্ত নবীর কেবলা ছিল এটাই। এমনকি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও হিজরতের পূর্বে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায আদায় করতেন। তবে কাবা শরীফকে সামনে রেখেই তা করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় হিজরত করেন, তখন তাঁকে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায আদায় করার নির্দেশ দেওয়া হয়। ষোল মাস মতান্তরে সতের মাস তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায আদায় করেন। এরপর দ্বিতীয় হিজরির শাবান মাসে আসরের নামাযে মতান্তরে যোহরের সময় ইবরাহীম খলীল আ. কর্তৃক নির্মিত কাবা ঘরের দিকে ফিরে নামায পড়েন।