📄 হযরত ইসহাক আ.-এর নামকরণ
হযরত ইসহাক আ. ৮ দিনের বয়সে পৌঁছলে হযরত ইবরাহীম আ. তাঁর খতনা করিয়ে দেন। ইসহাক শব্দের উচ্চারণ يصحك (ইয়াছহাক)। এটি হিব্রু ভাষার শব্দ। এর আরবি অনুবাদ হয় يضحক (ইয়াদহাক) অর্থ হাসছে। আল্লাহর ফেরেশতারা যখন একশ বছর বয়স্ক ইবরাহীম আ.-কে এবং নব্বই বছর বয়স্কা সারাহকে পুত্র সন্তানের সুসংবাদ প্রদান করেছিলেন, তখন হযরত ইবরাহীম আ. এটাকে বিস্ময়কর ব্যাপার মনে করেছিলেন। এবং হযরত সারাহও এটা শুনে হেসে দিলেন। এ কারণেই পুত্রের এই নাম মনোনীত হয়েছে। কিংবা এ কারণে নাম রাখা হয়েছে, ইসহাক আ.-এর জন্ম হযরত সারাহর খুশি ও আনন্দের কারণ হয়েছিল। আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী يضحك (ইয়াদহাকু) ফেলে মুযারের সিগা। আরবদের দস্তুর হলো, তারা ফেলে মুযারের সিগা নাম হিসাবে ব্যবহার করত। যেমন ইয়ারাব, ইয়ামলেক জাতীয় নাম আরবদেশে বেশ প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ।
📄 ইসহাক আ.-এর বিবাহ
কুরআন মাজিদে এ সম্বন্ধে কোনো উল্লেখ নেই। তাওরাতে এ প্রসঙ্গে একটি দীর্ঘ কাহিনি উল্লিখিত আছে। তার সারমর্ম হলো- হযরত ইবরাহীম আ. তাঁর বাঁদির পুত্র ইয়ারাযকে বললেন, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ইসহাকের বিবাহ ফিলিস্তিনের কেনান খানদানের মধ্যে করাব না। আমার ইচ্ছা, নিজের খানদান এবং পিতামহের বংশের মধ্যে বিবাহ করাব। অতএব, তুমি বিয়ের উপকরণ নিয়ে 'ফাদ্দানে আরামে' যাও। আমার ভ্রাতা বতুঈল ইবনে নাহুরের নিকট গিয়ে আমার পয়গাম পৌঁছিয়ে দাও- সে যেন নিজের কন্যার বিবাহ আমার পুত্র ইসহাকের সঙ্গে করিয়ে দেয়। যদি সে সম্মত হয়, তবে তাকে এটাও বলো, আমি ইসহাককে আমার কাছ থেকে দূরে যেতে দিতে চাই না। সুতরাং সে যেন তার কন্যাকে তোমার সাথে রওনা করিয়ে দেয়।
ইয়ারায হযরত ইবরাহীম আ.-এর নির্দেশ অনুযায়ী 'আরাম' অভিমুখে যাত্রা করলেন। বসতির নিকটবর্তী হলে আপন উটটিকে বসালেন। উদ্দেশ্য আগে অবস্থা জেনে নেবেন। ইয়ারায যেখানে উট বসিয়েছিলেন, এর কাছেই হযরত ইবরাহীম আ.-এর ভ্রাতা বতুঈলের খান্দান বসবাস করত। এ সময় ইয়ারায একজন সুশ্রী বালিকা দেখতে পেলেন। সে পানির কলসি ভরে বাড়ির দিকে ফিরছে। ইয়ারায তার কাছে পানি চাইলে সে তাকে পানি পান করাল, তার উটকেও পানি পান করাল। ইয়ারায তার কাছে বতুঈলের ঠিকানা জিজ্ঞাসা করলেন। বালিকাটি বলল, তিনি আমার পিতা। ইয়ারাযকে সে তাদের বাড়িতে অতিথিরূপে নিয়ে গেল। বাড়িতে পৌঁছিয়ে নিজের ভাই লাবানকে সংবাদ দিল। লাবান ইয়ারাযকে অনেক সমাদর করলেন এবং আগমনের কারণ জানতে চাইলেন। ইয়ারায হযরত ইবরাহীম আ.-এর পয়গাম শুনালেন। লাবান এ পয়গামে অসীম আনন্দিত হলেন। তিনি বহু সাজ-সরঞ্জাম সঙ্গে দিয়ে নিজ ভগ্নি 'রাফকা'কে ইয়ারাযের সঙ্গে পাঠিয়ে দিলেন।
📄 হযরত ইসহাক আ.-এর আওলাদ
রাফকার গর্ভে হযরত ইসহাক আ.-এর যমজ দুই পুত্র যথাক্রমে ঈস এবং ইয়াকুব জন্মগ্রহণ করেন। তখন হযরত ইসহাক আ.-এর বয়স ষাট বছর। হযরত ইসহাক, ঈস ও রাফকা হযরত ইয়াকুব আ.কে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। ঈস শিকারী ছিলেন। তিনি বৃদ্ধ মাতা-পিতাকে শিকারের গোশত এনে দিতেন। ইয়াকুব আ. তাঁবুতেই থাকতেন।
একদিন ঈস ক্লান্ত হয়ে এসে ইয়াকুবকে বললেন, আমি ক্লান্ত। শিকারও পাওয়া যায় নি। তোমার খাদ্য মুশুর ও লেপসি থেকে আমাকেও কিছু খেতে দাও। ইয়াকুব বললেন, ফিলিস্তিনবাসীদের দস্তুর হলো, মিরাস শুধু বড় ছেলে পায়। সুতরাং পিতার ওয়ারিস থেকে তুমি যদি সেই অধিকার ত্যাগ করো, তবে আমি তোমাকে খানা খাওয়াব। ঈস বললেন, আমার সেই মিরাসের কোনো পরোয়া নেই, তুমিই ওয়ারিস হয়ো। তখন ইয়াকুব ঈসকে খানা দিলেন।
একবার হযরত ইসহাক আ. (যখন অতি বৃদ্ধ এবং দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছিল) ইচ্ছা করলেন, ঈসকে বরকত প্রদান করবেন। তিনি তাকে বললেন, যাও শিকার করে আনো এবং উত্তম খানা পাকিয়ে আমার সম্মুখে পেশ কর। রাফকা এটা শুনে মনে মনে বললেন, এ বরকত ইয়াকুব প্রাপ্ত হোক। তৎক্ষণাৎ ইয়াকুবকে ডেকে বললেন, তাড়াতাড়ি উত্তম খানা পাকিয়ে তোমার পিতার সম্মুখে হাজির করো এবং বরকতের দুআ চাও। ইয়াকুব নাম না বলে তদ্রুপ করলেন। এবং ইসহাক আ. থেকে বরকতের দুআ লাভ করলেন। অতঃপর ঈস যখন ঘরে এলো, সমস্ত ঘটনা শুনতে পেল। তখন অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হল এবং ইয়াকুবের প্রতি হিংসা পোষণ করতে লাগল। তখন রাফকা ইয়াকুবকে পরামর্শ দিলেন, সে যেন এখান থেকে কিছু দিনের জন্যে মামা লাবানের কাছে চলে যায়। ইয়াকুব তাই করেন। সেখানে গিয়ে কিছুকাল কাটালেন। একাদিক্রমে লাবানের লায়্যা ও রাহিল নামের দুই কন্যাকে বিবাহ করলেন।
এটা ইসরাইলি রেওয়ায়েত। বিষয়বস্তুর প্রেক্ষিতে নির্ভরের অযোগ্য। এতে যে চারিত্রিক জীবন পেশ করা হয়েছে, তা তাওরাতের অন্যান্য বিকৃত বর্ণনাগুলোর মতোই আম্বিয়ায়ে কেরাম এবং তাঁদের খানদানের শানের উপযোগী নয়। এর থেকে এটুকু তথ্য পাওয়া যায়, হযরত ইয়াকুব আ.-এর বিবাহ তাঁর মাতুল বাড়িতে হয়েছিল। তিনি এক দীর্ঘকাল পর্যন্ত সেখানে ছিলেন। আর ঈস তাঁর চাচা ইসমাঈল আ.-এর কাছে চলে গেল। সেখানে তাঁর কন্যা বাসমা বা মুহাল্লাতকে বিবাহ করলেন। এ ছাড়া তিনি আরো কয়েকটি বিবাহ করলেন। এরপর আপন পরিবারবর্গকে নিয়ে সাঈর নামক স্থানে গিয়ে নিজেদের বাসস্থান স্থির করে নিলেন। তিনি এখানে 'আদওয়াম' নামে প্রসিদ্ধি লাভ করলেন। এ কারণে তাঁর বংশধরগণ বনি আদওয়াম নামে প্রসিদ্ধ হলো।
📄 হযরত ইসহাক আ.-এর জন্ম
এ প্রসঙ্গে আল্লাহর বাণী:
وَبَشِّرْنَاهُ بِإِسْحَاقَ نَبِيًّا مِنَ الصَّالِحِينَ (১১২) وَبَارَكْنَا عَلَيْهِ وَعَلَى إِسْحَاقَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِهِمَا مُحْسِنٌ وَظَالِمٌ لِنَفْسِهِ مُبِينٌ (১১৩)
"আমি তাকে সুসংবাদ দিয়েছিলাম ইসহাকের, সে ছিল একজন নবী, সৎকর্মপরায়ণদের অন্যতম। আমি তাকে বরকত দান করেছিলাম এবং ইসহাককেও। তাদের বংশধরদের মধ্যে কিছু সৎকর্মপরায়ণ এবং কিছু নিজেদের প্রতি স্পষ্ট অত্যাচারী।" (সূরা সাফফাত: ১১২-১১৩)
মাদায়েন অঞ্চলের অধিবাসী লূত আ.-এর সম্প্রদায়ের কুফরি ও পাপাচারের শাস্তি প্রদানের উদ্দেশ্যে আল্লাহর ফেরেশতাগণ সেখানে যাওয়ার পথে হযরত ইবরাহীম আ. ও সারাহকে আল্লাহ তাআলার এ সুসংবাদ শুনিয়ে যান:
وَلَقَدْ جَاءَتْ رُسُلُنَا إِبْرَاهِيمَ بِالْبُشْرَى قَالُوا سَلَامًا قَالَ سَلَامٌ فَمَا لَبِثَ أَنْ جَاءَ بِعِজْلٍ حَنِينٍ (৬৯) فَلَمَّا রারা আয়দিয়াহুম লা তাসিলু ইলাইহি নাকিরাহুম ওয়া আওজাসা মিনহুম খীফাতান ক্বালু লা তাখাফ ইন্না উরসিলনা ইলা ক্বাওমি লূত (৭০) ওয়ামরাআতুহু ক্বয়িমাতুন ফাদাহিকাত ফাবাশশারনাহা বি-ইসহাকা ওয়ামিন ওয়ারায়ের ইসহাকা ইয়াকূব (৭১) ক্বালাত ইয়া অয়িলাতা আ-আলিদু ওয়া আনা আজুযুন ওয়া হাযা বালী শাইখান ইন্না হাযা লাশাইউন আজীব (৭২) ক্বালু আতাজাবিনা মিন আম্রিল্লাহি রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু আলাইকুম আহলাল বাইতি ইন্নাহু হামীদুম মাজীদ (৭৩)
আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ ইবরাহীম আ.-এর কাছে সুসংবাদ নিয়ে এসেছিল। তারা বলল, 'সালাম'। সেও বলল, 'সালাম'। সে অবিলম্বে এক কাবাব করা বাছুর নিয়ে এলো। সে যখন দেখল, তাদের হাত সেটার দিকে প্রসারিত হচ্ছে না, তখন তাদের অপরিচিত মনে হতে লাগল। এবং তাদের সম্বন্ধে তার মনে ভীতি সঞ্চার হল। তারা বলল, ভয় করো না। আমরা লূত আ.-এর সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হয়েছি। তখন তার স্ত্রী দাঁড়িয়েছিল এবং সে হাসল। তারপর আমি তাকে ইসহাকের ও ইসহাকের পরবর্তী ইয়াকুবের সুসংবাদ দিলাম। সে বলল, কি আশ্চর্য! সন্তানের জননী হব আমি যখন আমি বৃদ্ধা এবং আমার স্বামী বৃদ্ধ! এটি অবশ্যই এক অদ্ভুত ব্যাপার। তারা বলল, আল্লাহর কাজে তুমি বিস্ময় বোধ করছ? হে পরিবারবর্গ! তোমাদের প্রতি রয়েছে আল্লাহর অনুগ্রহ ও কল্যাণ। তিনি প্রশংসিত ও সম্মানিত। (সূরা হুদ: ৬৯-৭৩)
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَنَبِّئُهُمْ عَنْ ضَيْفِ إِبْرَاهِيمَ (৫১) ইয দাখালু আলাইহি ফাক্বালু সালামা ক্বালা ইন্না মিনকুম অয়াজিলুন (৫২) ক্বালু লা তাওজাল ইন্না নুবাক্শিরুকা বিগলামিন আলীম (৫৩) ক্বালা আবাক্শারতুমুনী আলা আন মাস্সানিয়াল কিবারু ফাবিমা তুবাক্শিরুন (৫৪) ক্বালু বাক্শারনাকা বিল হাক্বক্বি ফালা তাকুন মিনাল ক্বানিতীন (৫৫) ক্বালা ওয়ামান ইয়াক্বনাতু মির রহমাতি রব্বিহি ইল্লাদ দয়াল্লুন (৫৬)
এবং ওদের বলো, ইবরাহীমের অতিথিদের কথা, যখন ওরা তার নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, 'সালাম'। তখন সে বলেছিল, 'আমরা তোমাদের আগমনে আতঙ্কিত।' তারা বলল, 'ভয় করো না, আমরা তোমাকে এক জ্ঞানী পুত্রের শুভ সংবাদ দিচ্ছি।' সে বলল, 'তোমরা কি আমাকে শুভ সংবাদ দিচ্ছ আমি বার্ধক্যগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও? তোমরা কি বিষয়ে শুভ সংবাদ দিচ্ছ? ওরা বলল, 'আমরা সত্য সংবাদ দিচ্ছি, সুতরাং তুমি হতাশ হয়ো না।' সে বলল, 'যারা পথভ্রষ্ট তারা ছাড়া আর কে তার প্রতিপালকের অনুগ্রহ হতে হতাশ হয়?' (সূরা হিজর: ৫১-৫৬)
আল্লাহ তাআলার বাণী:
ইয দাখালু আলাইহি ফাক্বালু সালামা ক্বালা সালামুন ক্বাওমুম মুনকারুন (২৫) ফারগা ইলা আহলিহি ফাজায়া বি-ইজলিন সামীন (২৬) ফাক্বররবোহু ইলাইহিম ক্বালা আ-লা তাকুলুন (২৭) ফাউজাসা মিনহুম খীফাতান ক্বালু লা তাখাফ অয়া বাশ্শারুহু বিগলামিন আলীম (২৮) ফাক্ববালাতিম রাআতুহু ফী সর্রাতিন ফাসাক্কাত অজহাহা অয়াক্বালাত আজুযুন আক্বীম (২৯) ক্বালু কাযালিকা ক্বালা রব্বুকি ইন্নাহু হুয়াল হাকীমুল আলীম (৩০)
তোমার নিকট ইবরাহীম আ.-এর সম্মানিত মেহমানদের বৃত্তান্ত এসেছে কি? যখন ওরা তার কাছে উপস্থিত হয়ে বলল, 'সালাম'। উত্তরে সে বলল, 'সালাম'। এরা তো অপরিচিত লোক। তারপর ইবরাহীম আ. তার স্ত্রীর নিকট গেল এবং একটি মাংসল গরুর বাছুর ভাজা অবস্থায় নিয়ে এনে তাদের সামনে রাখল। বলল, 'তোমরা খাচ্ছ না কেন? এতে ওদের সম্পর্কে তার মনে ভীতির সঞ্চার হল। ওরা বলল, 'ভীত হয়ো না। তারপর ওরা তাকে এক জ্ঞানী পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিল। তখন তার স্ত্রী চিৎকার করতে করতে আসল এবং গাল চাপড়িয়ে বলল, এই বৃদ্ধা-বন্ধ্যার সন্তান হবে? তারা বলল, তোমার প্রতিপালক এরূপই বলেছেন, তিনি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ। (সূরা যারিয়াত: ২৪-৩০)
এখানে মেহমান অর্থ ফেরেশতা। যারা মানুষের আকৃতি ধারণ করে এসেছিলেন, এরা সংখ্যায় ছিলেন তিনজন। হযরত জিবরাঈল, মীকাঈল ও ইসরাফীল আ.। হযরত ইবরাহীম আ.-এর বাড়িতে এলে তিনি মেহমানরূপে গণ্য করেন এবং মেহমানদের সাথে যে রকম আচরণ করা হয় সে রকম আচরণ করেন। সুতরাং তিনি তাঁর গোয়ালের সবচেয়ে হৃষ্টপুষ্ট একটি বাছুর ভুনা করে তাদের সামনে পেশ করেন। কিন্তু তিনি আহারের প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ দেখতে পেলেন না। কেন না, ফেরেশতাদের আহারের কোনো প্রয়োজন হয় না। ইবরাহীম আ. তাদেরকে অপরিচিত লোক মনে করলেন। (নাকিতাহুম অয়া আওজাসা মিনহুম খীফাতান ক্বালু লা তাখাফ ইন্না উরসিলনা ইলা ক্বাওমি লূত) অর্থাৎ 'তাদের সম্বন্ধে তার মনে ভীতির সঞ্চার হল। তারা বলল, 'ভীত হয়ো না, আমরা লুতের সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হয়েছি।'
অর্থাৎ তাদেরকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে এ সময় স্ত্রী সারাহ আল্লাহর ক্রোধে লুতের সম্প্রদায়ের শাস্তির কথা শুনে আনন্দিত হন। সারাহ মেহমানদের সামনেই দণ্ডায়মান ছিলেন যেমনি আরব ও অনারবদের মধ্যে নিয়ম প্রচলিত আছে। সারাহ যখন ঐ সংবাদ শুনে হেসে দেন তখন আল্লাহ তাকে সুসংবাদ দেন: (ফাবাশশারনাহা বি-ইসহাকা ওয়ামিন ওয়ারায়ের ইসহাকা ইয়াকূব) অর্থাৎ তারপর আমি তাকে ইসহাকের ও ইসহাকের পরবর্তী ইয়াকুবের সুসংবাদ দিলাম। অর্থাৎ, ফেরেশতারা তাকে এ বিষয়ে সুসংবাদ দেন। (ফাক্ববালাতিম রাআতুহু ফী সর্রাতিন) অর্থাৎ তখন তার স্ত্রী চিৎকার করতে করতে সম্মুখে আসল। (ফাসাক্কাত অজহাহা) অর্থাৎ এবং নিজের গাল চাপড়িয়ে বলতে লাগল। অর্থাৎ যেভাবে মেয়ে লোকেরা অবাক হলে করে থাকে। (ক্বালাত ইয়া অয়িলাতা আ-আলিদু ওয়া আনা আজুযুন ওয়া হাযা বালী শাইখান) অর্থাৎ কী আশ্চর্য! আমি জননী হব, অথচ এখন আমি বৃদ্ধা এবং এই আমার স্বামী বৃদ্ধ! অর্থাৎ আমার-মত একজন বৃদ্ধা ও বন্ধ্যা মহিলা কী করে সন্তান জন্ম দিতে পারে! আর আমার স্বামীও এই বৃদ্ধ! এ অবস্থায় সন্তান হওয়ার সংবাদে তিনি আশ্চর্যবোধ করেন। তাই তিনি বলেন: (ইন্না হাযা লাশাইউন আজীব) অর্থাৎ এটা অবশ্যই এক অদ্ভুত ব্যাপার।
ক্বালু আতাজাবিনা মিন আম্রিল্লাহি রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু আলাইকুম আহলাল বাইতি ইন্নাহু হামীদুম মাজীদ (ওরা বলল, আল্লাহর কাজে আপনি বিস্ময়বোধ করছেন? হে পরিবারবর্গ! তোমাদের প্রতি রয়েছে আল্লাহর অনুগ্রহ ও কল্যাণ। তিনি প্রশংসার অধিকারী ও সম্মানের অধিকারী।) ইবরাহীম আ. এ সুসংবাদ পেয়ে স্ত্রীর খুশির সঙ্গে শরীক হন। এবং স্ত্রীর মনে দৃঢ়তা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে নিজেও আশ্চর্যবোধ করেন। (ক্বালা আ-বাক্শারতুমুনী আলা আন মাস্সানিয়াল কিবারু ফাবিমা তুবাক্শিরুন ক্বালু বাক্শারনাকা বিল হাক্বক্বি ফালা তাকুন মিনাল ক্বানিতীন) অর্থাৎ ইবরাহীম বলল, তোমরা কি আমাকে শুভ সংবাদ দিচ্ছ আমি বার্ধক্যগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও? তোমরা কি বিষয়ে শুভ সংবাদ দিচ্ছ? তারা বলল, আমরা সত্য সংবাদ দিচ্ছি। সুতরাং আপনি হতাশ হবেন না।
এই বাক্য দ্বারা সুসংবাদকে দৃঢ় করা হয়েছে। তারপর ফেরেশতাগণ ইবরাহীম আ. ও সারাহকে এক জ্ঞানী পুত্র সন্তানের (বিগলামিন আলীম) সুসংবাদ দিলেন। অর্থাৎ ইসহাক আ. ও তার ভাইয়ের কথা। ইসমাঈল আ.-কে আল্লাহ বিভিন্ন গুণ ও মর্যাদার অধিকারী বলে কুরআনে উল্লেখ করেছেন। যেমন হালীম বা ধৈর্যশীল। যা তাঁর অবস্থার সাথে খুবই সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাছাড়া ওয়াদাপালনকারী এবং সহনশীল বলেও তাঁর উল্লেখ করা হয়েছে। হযরত ইবরাহীম আ.-এর একশ বছর বয়সকালে এবং ইসমাঈল আ.-এর জন্মের চৌদ্দ বছর পর ইসহাক আ.-এর জন্ম হয়। তাঁর মাতা সারাহকে যখন পুত্র হওয়ার সুসংবাদ দেওয়া হয় তখন তাঁর বয়স ছিল নব্বই বছর। আল্লাহ পাক কুরআনের অনেক আয়াতে ইসহাক আ.-এর প্রশংসা করেছেন। আর হযরত আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত হাদিস রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: একজন সম্মানিত ব্যক্তি, যার পিতাও ছিলেন সম্মানিত, তাঁর পিতাও ছিলেন সম্মানিত এবং তাঁর পিতাও ছিলেন সম্মানিত। তিনি হলেন ইউসূফ ইবনে ইয়াকুব ইবনে ইবরাহীম।
আহলে কিতাবরা বলেন, ইসহাক আ. তাঁর চল্লিশ বছর বয়সে পিতার জীবদ্দশায় রুফাকা বিনতে লাবানকে বিবাহ করেন। রুফাকা ছিলেন বন্ধ্যা। তাই ইসহাক আ. সন্তানের জন্যে আল্লাহর কাছে দুআ করেন। এরপর তার স্ত্রী সন্তান-সম্ভবা হন এবং তিনি জময দুই পুত্র সন্তান প্রসব করেন। তাদের প্রথমজনের নাম রাখা হয় 'ঈসু'। আরবরা যাকে 'ঈস' বলে তাকে। এ ঈস হচ্ছেন রূমের পিতা। দ্বিতীয় সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় তাকে তার ভাইয়ের গোড়ালি আঁকড়ে থাকতে দেখা যায়। এ কারণে তার নাম রাখা হয় ইয়াকুব। কেন না এ শব্দটির মূলধাতু (عقب) অর্থ গোড়ালি বা পশ্চাতে আগমনকারী। তাঁর অপর নাম ইসরাঈল, যার নামে বনি ইসরাঈল বংশের নামকরণ করা হয়েছে। রোগাক্রান্ত হয়ে হযরত ইসহাক আ. একশ আশি বছর বয়সে ইনতিকাল করেন। তাঁর পুত্রদ্বয় ঈস ও ইয়াকুব আ. তাকে তাঁর পিতার পূর্বোল্লেখিত তাদের কেনা জমিতে হযরত ইবরাহীম আ.-এর কবরের পাশে সমাহিত করেন।