📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 হযরত ইসহাক আ.-এর জন্মবৃত্তান্ত

📄 হযরত ইসহাক আ.-এর জন্মবৃত্তান্ত


হযরত ইবরাহীম আ.-এর বয়স যখন ১০০ বছর এবং তাঁর স্ত্রী হযরত সারার বয়স ৯০ (নব্বই) বছর, এ সময় আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে সুসংবাদ শুনালেন, সারার গর্ভে একটি পুত্র সন্তান জন্মলাভ করবে, তার নাম ইসহাক রেখ। তাওরাত বলে:

"আল্লাহ তাআলা ইবরাহীম আ.-কে বললেন, তোমার স্ত্রীকে 'সারী' বলা হয়, এখন থেকে তাকে আর 'সারী' বলো না; বরং তার নাম 'সারাহ'। আমি তাকে বরকত প্রদান করব। তার গর্ভ থেকেও তোমাকে একটি পুত্র দান করব, নিশ্চয়ই আমি তাকে বরকত দান করবে। কেন না, সে বহু সম্প্রদায়ের মাতা হবে এবং বহু রাজ্যের রাজা তাঁর বংশে জন্ম লাভ করবে।” (তাওরাত)

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَقَدْ جَاءَتْ رُسُلُنَا إِبْرَاهِيمَ بِالْبُشْرَى قَالُوا سَلَامًا قَالَ سَلَامٌ فَمَا لَبِثَ أَنْ جَاءَ بِعِجْلٍ حَنِيدٍ (৬৯) فَلَمَّا رَأَى أَيْدِيَهُمْ لَا تَصِلُ إِلَيْهِ نَكِرَهُمْ وَأَوْجَسَ مِنْهُمْ خِيفَةً قَالُوا لَا تَخَفْ إِنَّا أُرْسِلْنَا إِلَى قَوْمِ لُوطٍ (৭০) وَامْرَأَتُهُ قায়িাতুন ফাদাহিকাত ফাবাশশারনাহা বি-ইসহাকা ওয়ামিন ওয়ারায়ের ইসহাকা ইয়াকূব (৭১) ক্বালাত ইয়া অয়িলাতা আ-আলিদু ওয়া আনা আজুযুন ওয়া হাযা বালী শাইখান ইন্না হাযা লাশাইউন আজীব (৭২) ক্বালু আতাজাবিনা মিন আম্রিল্লাহি রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু আলাইকুম আহলাল বাইতি ইন্নাহু হামীদুম মাজীদ (৭৩)

"নিঃসন্দেহে, আমার দূত (ফেরেশতা) ইবরাহীম আ.-এর নিকট সুসংবাদ নিয়ে আগমন করল, তারা এসে ইবরাহীমকে সালাম করল, ইবরাহীমও সালাম বলল। কিছুক্ষণ পরে ইবরাহীম গরুর বাছুরের ভাজা গোশত মেহমানদের সম্মুখে উপস্থিত করল। যখন সে দেখল, মেহমানদের হাত গোশতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে না, তখন তিনি তাদেরকে অপরিচিত বুঝতে পেরে একটু ভীত হলেন। আগন্তুকরা বললেন, ভয় করবেন না, আমরা লূত আ.-এর কওমকে শাস্তি দেওয়ার জন্য প্রেরিত হয়েছি। আর ইবরাহীম আ.-এর বিবি (সারাহ) দাঁড়িয়ে হাসছিল। তখন আমি তাঁকে ইসহাক এবং তার পরে (তার পুত্র) ইয়াকুবের সুসংবাদ দান করলাম। সারাহ বলল, আমি একজন (নব্বই বছর বয়স্কা) বৃদ্ধা, সন্তান প্রসব করব! আর আমার স্বামীও তো (একশ বছরের) বৃদ্ধ! এটা বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার। ফেরেশতারা বললেন, 'তুমি কি আল্লাহর আদেশের ওপর বিস্ময় প্রকাশ করছ? (হে আহলে বাইত!) তোমাদের প্রতি আল্লাহ তাআলার রহমত ও বরকত বর্ষণ হোক। নিঃসন্দেহ, আল্লাহ পাক সর্বপ্রকারে প্রশংসনীয় এবং অসীম মর্যাদাশালী। (সূরা হুদ: ৬৯-৭৩)

فَأَوْجَسَ مِنْهُمْ خِيفَةً قَالُوا لَا تَخَفْ وَبَشِّرُوهُ بِغُلَامٍ عَلِيمٍ (২৮) فَأَقْبَلَتِ امْرَأَتُهُ فِي صَرَّةٍ فَصَلَّتْ وَجْهَهَا وَقَالَتْ عَجُوزٌ عَقِيمٌ (২৯) قَالُوا كَذَلِكِ قَالَ رَبُّكَ إِنَّهُ هُوَ الْحَكِيمُ الْعَلِيمُ (৩০)

“অতঃপর ইবরাহীম তাদের থেকে ভয় অনুভব করলেন, তারা (ফেরেশতারা) বললেন, ভীত হবেন না এবং তাঁকে সুসংবাদ প্রদান করলেন এক জ্ঞানবান পুত্রের।' অতঃপর ইবরাহীমের স্ত্রী (সারাহ) নেহায়েত বিস্ময় প্রকাশ করতে করতে আগমন করলেন এবং মুখমণ্ডলের ওপর হাত মারতে লাগলেন। বললেন, বন্ধ্যা, বৃদ্ধা! ফেরেশতারা বললেন, তোমার পরওয়ারদিগার এরূপই বলেছেন (সুতরাং হবেও তাই)। তিনি জ্ঞানময় হেকমতওয়ালা।” (আযযারিয়াত: ২৮-৩০)

قَالَ إِنَّا مِنْكُمْ وَجِلُونَ (৫২) قَالُوا لَا تَوْجَلْ إِنَّا نُبَشِّرُكَ بِغُلَامٍ عَلِيمٍ (৫৩) قَالَ أَبَشَّরْتُمُونِي عَلَى أَنْ مَسَّنِيَ الْكِبَرُ فَبِمَ تُبَشِّরُونَ (৫৪) قَالُوا بَشَّرْنَاكَ بِالْحَقِّ فَلَا تَكُنْ مِنَ الْقَانِطِينَ (৫৫) قَالَ وَمَنْ يَقْنَطُ مِنْ رَحْمَةِ رَبِّهِ إِلَّا الضَّالُونَ (৫৬)

"ইবরাহীম বললেন, নিঃসন্দেহ, আমি আপনাদের ভয় করছি। ফেরেশতারা বললেন, আমাদের ভয় করবেন না। আমরা আপনাকে একজন জ্ঞানবান পুত্রের সুসংবাদ দিতে এসেছি। ইবরাহীম বললেন, তোমরা কি এই বার্ধক্যেও (পুত্রের) সুসংবাদ দিতে এসেছ? এ কেমন সুসংবাদ! ফেরেশতারা বললেন, আমরা আপনাকে সত্য বিষয়ের সুসংবাদ দিচ্ছি। আপনি নিরাশ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না। ইবরাহীম বললেন, "পথভ্রষ্ট লোকেরা ছাড়া কেউ নিজের পরওয়ারদেগারের রহমত থেকে নিরাশ হয় না।" (সূরা হিজর: ৫১-৫৫)

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 হযরত ইসহাক আ.-এর নামকরণ

📄 হযরত ইসহাক আ.-এর নামকরণ


হযরত ইসহাক আ. ৮ দিনের বয়সে পৌঁছলে হযরত ইবরাহীম আ. তাঁর খতনা করিয়ে দেন। ইসহাক শব্দের উচ্চারণ يصحك (ইয়াছহাক)। এটি হিব্রু ভাষার শব্দ। এর আরবি অনুবাদ হয় يضحক (ইয়াদহাক) অর্থ হাসছে। আল্লাহর ফেরেশতারা যখন একশ বছর বয়স্ক ইবরাহীম আ.-কে এবং নব্বই বছর বয়স্কা সারাহকে পুত্র সন্তানের সুসংবাদ প্রদান করেছিলেন, তখন হযরত ইবরাহীম আ. এটাকে বিস্ময়কর ব্যাপার মনে করেছিলেন। এবং হযরত সারাহও এটা শুনে হেসে দিলেন। এ কারণেই পুত্রের এই নাম মনোনীত হয়েছে। কিংবা এ কারণে নাম রাখা হয়েছে, ইসহাক আ.-এর জন্ম হযরত সারাহর খুশি ও আনন্দের কারণ হয়েছিল। আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী يضحك (ইয়াদহাকু) ফেলে মুযারের সিগা। আরবদের দস্তুর হলো, তারা ফেলে মুযারের সিগা নাম হিসাবে ব্যবহার করত। যেমন ইয়ারাব, ইয়ামলেক জাতীয় নাম আরবদেশে বেশ প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 ইসহাক আ.-এর বিবাহ

📄 ইসহাক আ.-এর বিবাহ


কুরআন মাজিদে এ সম্বন্ধে কোনো উল্লেখ নেই। তাওরাতে এ প্রসঙ্গে একটি দীর্ঘ কাহিনি উল্লিখিত আছে। তার সারমর্ম হলো- হযরত ইবরাহীম আ. তাঁর বাঁদির পুত্র ইয়ারাযকে বললেন, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ইসহাকের বিবাহ ফিলিস্তিনের কেনান খানদানের মধ্যে করাব না। আমার ইচ্ছা, নিজের খানদান এবং পিতামহের বংশের মধ্যে বিবাহ করাব। অতএব, তুমি বিয়ের উপকরণ নিয়ে 'ফাদ্দানে আরামে' যাও। আমার ভ্রাতা বতুঈল ইবনে নাহুরের নিকট গিয়ে আমার পয়গাম পৌঁছিয়ে দাও- সে যেন নিজের কন্যার বিবাহ আমার পুত্র ইসহাকের সঙ্গে করিয়ে দেয়। যদি সে সম্মত হয়, তবে তাকে এটাও বলো, আমি ইসহাককে আমার কাছ থেকে দূরে যেতে দিতে চাই না। সুতরাং সে যেন তার কন্যাকে তোমার সাথে রওনা করিয়ে দেয়।

ইয়ারায হযরত ইবরাহীম আ.-এর নির্দেশ অনুযায়ী 'আরাম' অভিমুখে যাত্রা করলেন। বসতির নিকটবর্তী হলে আপন উটটিকে বসালেন। উদ্দেশ্য আগে অবস্থা জেনে নেবেন। ইয়ারায যেখানে উট বসিয়েছিলেন, এর কাছেই হযরত ইবরাহীম আ.-এর ভ্রাতা বতুঈলের খান্দান বসবাস করত। এ সময় ইয়ারায একজন সুশ্রী বালিকা দেখতে পেলেন। সে পানির কলসি ভরে বাড়ির দিকে ফিরছে। ইয়ারায তার কাছে পানি চাইলে সে তাকে পানি পান করাল, তার উটকেও পানি পান করাল। ইয়ারায তার কাছে বতুঈলের ঠিকানা জিজ্ঞাসা করলেন। বালিকাটি বলল, তিনি আমার পিতা। ইয়ারাযকে সে তাদের বাড়িতে অতিথিরূপে নিয়ে গেল। বাড়িতে পৌঁছিয়ে নিজের ভাই লাবানকে সংবাদ দিল। লাবান ইয়ারাযকে অনেক সমাদর করলেন এবং আগমনের কারণ জানতে চাইলেন। ইয়ারায হযরত ইবরাহীম আ.-এর পয়গাম শুনালেন। লাবান এ পয়গামে অসীম আনন্দিত হলেন। তিনি বহু সাজ-সরঞ্জাম সঙ্গে দিয়ে নিজ ভগ্নি 'রাফকা'কে ইয়ারাযের সঙ্গে পাঠিয়ে দিলেন।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 হযরত ইসহাক আ.-এর আওলাদ

📄 হযরত ইসহাক আ.-এর আওলাদ


রাফকার গর্ভে হযরত ইসহাক আ.-এর যমজ দুই পুত্র যথাক্রমে ঈস এবং ইয়াকুব জন্মগ্রহণ করেন। তখন হযরত ইসহাক আ.-এর বয়স ষাট বছর। হযরত ইসহাক, ঈস ও রাফকা হযরত ইয়াকুব আ.কে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। ঈস শিকারী ছিলেন। তিনি বৃদ্ধ মাতা-পিতাকে শিকারের গোশত এনে দিতেন। ইয়াকুব আ. তাঁবুতেই থাকতেন।

একদিন ঈস ক্লান্ত হয়ে এসে ইয়াকুবকে বললেন, আমি ক্লান্ত। শিকারও পাওয়া যায় নি। তোমার খাদ্য মুশুর ও লেপসি থেকে আমাকেও কিছু খেতে দাও। ইয়াকুব বললেন, ফিলিস্তিনবাসীদের দস্তুর হলো, মিরাস শুধু বড় ছেলে পায়। সুতরাং পিতার ওয়ারিস থেকে তুমি যদি সেই অধিকার ত্যাগ করো, তবে আমি তোমাকে খানা খাওয়াব। ঈস বললেন, আমার সেই মিরাসের কোনো পরোয়া নেই, তুমিই ওয়ারিস হয়ো। তখন ইয়াকুব ঈসকে খানা দিলেন।

একবার হযরত ইসহাক আ. (যখন অতি বৃদ্ধ এবং দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছিল) ইচ্ছা করলেন, ঈসকে বরকত প্রদান করবেন। তিনি তাকে বললেন, যাও শিকার করে আনো এবং উত্তম খানা পাকিয়ে আমার সম্মুখে পেশ কর। রাফকা এটা শুনে মনে মনে বললেন, এ বরকত ইয়াকুব প্রাপ্ত হোক। তৎক্ষণাৎ ইয়াকুবকে ডেকে বললেন, তাড়াতাড়ি উত্তম খানা পাকিয়ে তোমার পিতার সম্মুখে হাজির করো এবং বরকতের দুআ চাও। ইয়াকুব নাম না বলে তদ্রুপ করলেন। এবং ইসহাক আ. থেকে বরকতের দুআ লাভ করলেন। অতঃপর ঈস যখন ঘরে এলো, সমস্ত ঘটনা শুনতে পেল। তখন অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হল এবং ইয়াকুবের প্রতি হিংসা পোষণ করতে লাগল। তখন রাফকা ইয়াকুবকে পরামর্শ দিলেন, সে যেন এখান থেকে কিছু দিনের জন্যে মামা লাবানের কাছে চলে যায়। ইয়াকুব তাই করেন। সেখানে গিয়ে কিছুকাল কাটালেন। একাদিক্রমে লাবানের লায়্যা ও রাহিল নামের দুই কন্যাকে বিবাহ করলেন।

এটা ইসরাইলি রেওয়ায়েত। বিষয়বস্তুর প্রেক্ষিতে নির্ভরের অযোগ্য। এতে যে চারিত্রিক জীবন পেশ করা হয়েছে, তা তাওরাতের অন্যান্য বিকৃত বর্ণনাগুলোর মতোই আম্বিয়ায়ে কেরাম এবং তাঁদের খানদানের শানের উপযোগী নয়। এর থেকে এটুকু তথ্য পাওয়া যায়, হযরত ইয়াকুব আ.-এর বিবাহ তাঁর মাতুল বাড়িতে হয়েছিল। তিনি এক দীর্ঘকাল পর্যন্ত সেখানে ছিলেন। আর ঈস তাঁর চাচা ইসমাঈল আ.-এর কাছে চলে গেল। সেখানে তাঁর কন্যা বাসমা বা মুহাল্লাতকে বিবাহ করলেন। এ ছাড়া তিনি আরো কয়েকটি বিবাহ করলেন। এরপর আপন পরিবারবর্গকে নিয়ে সাঈর নামক স্থানে গিয়ে নিজেদের বাসস্থান স্থির করে নিলেন। তিনি এখানে 'আদওয়াম' নামে প্রসিদ্ধি লাভ করলেন। এ কারণে তাঁর বংশধরগণ বনি আদওয়াম নামে প্রসিদ্ধ হলো।

ফন্ট সাইজ
15px
17px