📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 হযরত ইসমাঈল আ.

📄 হযরত ইসমাঈল আ.


ইসমাঈল আ.-ই হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহর প্রথম সন্তান। সুতরাং সর্বাবস্থায় তিনিই ছিলেন একক সন্তান। এ সময়ের মধ্যে অন্য কোনো সন্তানের জন্ম হয় নি। আর তাৎপর্যগত দিক থেকে একক এ হিসেবে, পিতা ইবরাহীম আ. শিশু পুত্র ইসমাঈল আ. ও তার মা হাজেরাকে নিয়ে হিজরত করেন। এবং মক্কার ফারান পর্বতের উপত্যকায় উভয়কে নির্বাসিত করেন। তাঁদেরকে যখন তিনি রেখে আসেন তখন তাঁদের সাথে যৎসামান্য পানি ও রসদ ব্যতীত কিছুই ছিল না। এটা তিনি করেছিলেন আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও ভরসা রেখে। আল্লাহ তাআলা আপন অনুগ্রহ ও করুণার দ্বারা তাঁদেরকে বেষ্টন করে নেন। বস্তুত তিনিই প্রকৃত অনুগ্রহকারী, সাহায্যকারী ও অভিভাবক। অতএব, প্রমাণিত হল, হযরত ইসমাঈল আ.-ই বাহ্যিক ও তাৎপর্যগত উভয় দিক থেকে একক সন্তান। কিন্তু কে বুঝবে এই সূক্ষ্ণ তত্ত্ব এবং কে খুলবে এই শক্ত গিট। আল্লাহ যাকে গভীর তত্ত্বজ্ঞান দান করেছেন, তিনিই কেবল এটা উপলব্ধি করতে সক্ষম। আল্লাহ তাআলা হযরত ইসমাঈল আ.-এর বিভিন্ন গুণাগুণের প্রশংসা করেছেন। যেমন: তিনি ছিলেন ধৈর্যশীল, সহনশীল, ওয়াদা পালনকারী, সালাতের হেফাজতকারী। পরিবারবর্গকে সালাত আদায়ের নির্দেশ দানকারী- যাতে তারা আযাব থেকে রক্ষা পায় এবং মহান প্রভুর ইবাদতের দিকে মানুষকে আহবানকারী।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 যাবহে আযিম বা কোরবানি

📄 যাবহে আযিম বা কোরবানি


আল্লাহ পাকের দরবারে সান্নিধ্যপ্রাপ্ত মহাপুরুষের সাথে আল্লাহ পাকের ব্যাপার তদ্রুপ হয় না যেরূপ সাধারণ মানুষের সাথে হয়ে থাকে। তাঁদেরকে পরীক্ষা এবং আযমাইশের কঠিন হতে কঠিনতর ধাপসমূহ অতিক্রম করতে হয়। আর প্রতি পদক্ষেপে আল্লাহর জন্য প্রাণ সোপর্দ করে দেওয়া, আত্মসমর্পণ এবং আল্লাহর আদেশের উপর সম্মতি ও সন্তুষ্টির পরিচয় দিতে হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "আম্বিয়ায়ে কেরামের প্রত্যেকটি দলকে নিজেদের মর্যাদা অনুযায়ী বিভিন্ন প্রকার পরীক্ষা ও কঠিন কষ্টের মধ্যে নিপতিত করা হয়।" ইবরাহীম আ.-ও যেহেতু উচ্চ মর্যাদাশালী নবী ও পয়গাম্বর ছিলেন, এ জন্য তাঁকেও বিভিন্ন পরীক্ষা ও আযমাইশের সম্মুখীন হতে হয়েছে। এবং মর্যাদার উচ্চতার প্রেক্ষিতে প্রতিবারই পরীক্ষায় পূর্ণ সফলকাম প্রমাণিত হয়েছেন।

যখন তাঁকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, তখন যেই ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা এবং আল্লাহর ফয়ছালায় ও নির্ধারিত তকদীরে সন্তুষ্টির পরিচয় দিয়েছেন। যেই দৃঢ়তা ও ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন, সেটি তাঁরই যোগ্য কাজ ছিল। এরপর যখন ইসমাঈল আ. ও হাজেরাকে মক্কার অনাবাদ জঙ্গলে ছেড়ে আসার আদেশ হল, তাও সাধারণ পরীক্ষা ছিল না। তখন আযমাইশ বরং কঠিন আযমাইশের সময় ছিল। বার্ধক্য এবং বুড়ো বয়সের নানাবিধ আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্র, দিবা-রাত্রির দোয়ার ফল এবং পরিবারের আশার আলো ইসমাঈলকে শুধু আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে পানি ও তৃণলতাবিহীন মরুপ্রান্তরে ত্যাগ করে আসছেন। একবার পিছনের দিকে ফিরে তার দিকে তাকাচ্ছেন না, পাছে এমন না হয় যে, পিতৃস্নেহ উথলে ওঠে এবং আল্লাহর আদেশ পালনে কোনো প্রকার ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটে যায়। এই দুইটি পরীক্ষার কঠিন মঞ্জিল অতিক্রম করার পর একটি তৃতীয় পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছে, যা গত দুই পরীক্ষার চেয়েও অধিক পিতৃহৃদয় বিগলনকারী ও হৃদয় বিদারক পরীক্ষা। এটাই একাধারে তিন রাত্রি পর্যন্ত হযরত ইবরাহীম আ. স্বপ্নে দেখছেন। আল্লাহ পাক বলছেন, হে ইবরাহীম! তুমি আমার রাস্তায় তোমার একমাত্র পুত্রকে কুরবানী কর!

আম্বিয়ায়ে কেরামের স্বপ্ন 'সত্য স্বপ্ন' এবং আল্লাহর ওহি হয়ে থাকে। সুতরাং ইবরাহীম আ. সম্মতি ও আত্মসমর্পণের মূর্তিমান প্রতীক হয়ে আল্লাহ পাকের আদেশ যথাসম্ভব জলদি পালনের নিমিত্তে প্রস্তুত হয়ে গেলেন। কিন্তু এই ব্যাপারটি যেহেতু একাকী নিজের ব্যক্তিত্বের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল না; বরং এই পরীক্ষার অন্য একটি অংশ ছিল তাঁর পুত্র, যাকে কুরবানী করার আদেশ করা হয়েছে। সুতরাং পুত্রের নিকট নিজের স্বপ্ন বৃত্তান্ত এবং আল্লাহ পাকের আদেশ বর্ণনা করলেন। পুত্র ছিলেন ইবরাহীম আ.-এর মতো। তৎক্ষণাৎ আত্মসমর্পণের মস্তক অবনত করে দিলেন। বললেন, যদি এটাই আল্লাহ পাকের ইচ্ছা হয়ে থাকে, তবে ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন। এই কথোপকথনের পরে পিতা-পুত্র নিজেদের কুরবানী পেশ করার জন্য মাঠের দিকে রওনা হয়ে গেলেন। পিতা পুত্রের সম্মতি পেয়ে যবাহের জন্তুর মত পুত্রের হাত-পা বেঁধে নিলেন। ছুরি ধার দিলেন এবং পুত্রকে উপুড় করে শোয়ায়ে যবাহ শুরু করেন। তৎক্ষণাৎ ইবরাহীম আ.-এর ওপর আল্লাহর ওহী নাযিল হল : "হে ইবরাহীম! তুমি নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়িত করে দেখিয়েছ। নিঃসন্দেহ, এটি বড় কঠিন পরীক্ষা ছিল। এখন পুত্রকে ছেড়ে দাও এবং তোমার নিকট এই যে দুম্বাটি দাঁড়ান রয়েছে, পুত্রের পরিবর্তে তা যবাই কর। আমি নেককারদেরকে এরূপে বিনিময় প্রদান করে থাকি। ইবরাহীম আ. পেছন দিকে তাকালে দেখতে পেলেন, অদূরে একটি দুম্বা দাঁড়ানো। হযরত ইবরাহীম আ. আল্লাহর শোকর আদায় করে দুম্বাটি যবাহ করলেন। এটাই সেই কুরবানী যা আল্লাহ পাকের দরবারে এমনভাবে কবুল হল, এর স্মৃতিস্বরূপ সর্বদার জন্য ইবরাহীমী ধর্মের প্রতীক সাব্যস্ত হয়ে রইল এবং আজও প্রতি বছর ১০ যিলহজ ইসলামী দুনিয়ায় এটি পালন করা হয়।

কিন্তু এ ঘটনা দ্বারা একথা প্রমাণিত হল না, ইবরাহীম আ.-এর আওলাদের মধ্য হতে কুরবানীর পাত্র কে- হযরত ইসমাঈল না ইসহাক আ.? কুরআন মাজিদ যদিও যবাহকৃত পুত্রের নাম উল্লেখ করে নি, কিন্তু যেভাবে ঘটনাটির আলোচনা করেছে, তাতে অবাধে প্রকাশ পায়, কুরআন মাজিদের ইবারত ইসমঈল আ.-কেই 'যবাহ' অর্থাৎ কুরবানীর পাত্র বলছে। এবং এটিই সঠিক। সূরা সাফফাতে এ ঘটনাকে বর্ণনা করা হয়েছে:

رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ (١٠٠) فَبَشِّرْنَاهُ بِغُلَامٍ حَلِيمٍ (۱۰১) فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانْظُرْ مَاذَا تَرَى قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّابِرِينَ (۱۰২) فَلَمَّا أَسْلَمَا وَتَلَّهُ لِلْجَبِينِ (۱۰۳) وَنَادَيْنَاهُ أَنْ يَا إِبْرَاهِيمُ (١٠٤) قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ (١٠٥) إِنَّ هَذَا لَهُوَ الْبَلَاءُ الْمُبِينُ (١٠٦) وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيمٍ (۱۰৭) وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآخِرِينَ (۱۰۸) سَلَامٌ عَلَى إِبْرَاهِيمَ (۱۰۹) كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ (۱১০) إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُؤْمِنِينَ (۱۱۱) وَبَشِّرْنَاهُ بِإِسْحَاقَ نَبِيًّا مِنَ الصَّالِحِينَ (۱۱۲) وَبَارَكْنَا عَلَيْهِ وَعَلَى إِسْحَاقَ

"আয় পরওয়ারদিগার! আমাকে একটি নেককার পুত্র সন্তান দান করুন। ফলে আমি তাকে এক ধৈর্যশীল বালকের সুসংবাদ দিলাম। এরপর (পুত্র) যখন এমন বয়সে পৌঁছল, পিতার সঙ্গে দৌড়াতে পারে। ইবরাহীম পুত্রকে বলল, বৎস! স্বপ্নে দেখলাম, আমি তোমাকে যবাহ করছি। সুতরাং তুমি ভেবে দেখ, তোমার কেমন মনে হয়। পুত্র বললেন, পিতা! যে বিষয়ে আপনি আদিষ্ট হয়েছেন, তা করে ফেলুন। ইনশাআল্লাহ আমাকে সহিষ্ণু পাবেন। এরপর যখন তাঁরা উভয়ে সম্মত হয়ে আত্মসমর্পণ করলেন এবং পুত্রকে উপুড় করে শোয়ালেন। তখন আমি তাঁকে ডেকে বললাম, ইবরাহীম! তুমি স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করে দেখিয়েছ। নিঃসন্দেহ, আমি নেককারদেরকে এইরূপে বিনিময় দান করে থাকি। অবশ্যই এটা এক প্রকাশ্য পরীক্ষা। আর আমি বিনিময় দান করেছি এক মহান কুরবানী (দুম্বা) দ্বারা। আর আমি ভবিষ্যতের বংশধরদের জন্য তার সম্বন্ধে একথা স্থায়ী রেখে দিলাম, "ইবরাহীমের ওপর শান্তি বর্ষিত হউক।" এইরূপে আমি নেককারদের বিনিময় প্রদান করে থাকি। নিঃসন্দেহ, সে আমার মুমিন বান্দাগণের অন্তর্ভুক্ত। আর আমি তাকে ইসহাকের (জন্মের) সুসংবাদ দিলাম, যিনি নবী হবেন এবং নেককারদের অন্তর্ভুক্ত হবেন। আর আমি বরকত প্রদান করলাম তার উপর এবং ইসহাকের ওপর।" (সূরা সাফফাত: ১০০-১১৩)

এই আয়াতগুলিতে ইবরাহীম আ.-এর দুই পুত্রের সুসংবাদের কথা উল্লেখ রয়েছে। প্রথম পুত্রের নাম নেওয়া হয় নাই, শুধু ধৈর্যশীল বালক বলেই তার মহান কুরবানীর ঘটনার আলোচনা করেছেন এবং এরপর- দ্বিতীয় পুত্রের সুসংবাদ নাম নিয়েই প্রদান করলাম, "আমি তাকে ইসহাকের সুসংবাদ প্রদান করলাম।" আর এটা স্বতঃসিদ্ধ কথা, ইবরাহীম আ.-এর দুই পুত্র ইসমাঈল আ. ও ইসহাক আ.-এর মধ্যে ইসমাঈল আ. বয়সে বড় এবং ইসহাক আ. ছোট। অতএব, শেষের আয়াতে যখন ছোট পুত্রের উল্লেখ নাম নিয়েই করে দেওয়া হল, তখন প্রথম আয়াতে ইসমাঈল ছাড়া আর কার আলোচনা হতে পারে? নিঃসন্দেহে তিনি ইসমাঈল আ., যিনি 'ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে সহিষ্ণু পাবেন' বলে এবং "আর তাঁকে মুখমণ্ডলের উপর শোয়ালেন।" কথাটি প্রকাশ করে এবং "তার পরিবর্তন করে দিলাম এক মহান কুরবানীর জন্তু দুম্বা দ্বারা"-এর সম্মান লাভ করলেন। এতদ্ভিন্ন শুধু কুরআন মাজিদই ইসমাঈলকে 'যবাহের পাত্র' বলে না; বরং তাওরাতের এবারতকে গভীর দৃষ্টিতে পাঠ করলে, তাওরাতও এটাই বলে, ইসমাঈল এবং শুধু ইসমাঈলই 'যবাহের পাত্র'।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 হযরত ইসমাঈল যাবীহুল্লাহ আ.-এর ঘটনা

📄 হযরত ইসমাঈল যাবীহুল্লাহ আ.-এর ঘটনা


আল্লাহ বলেছেন, তাঁর একনিষ্ঠ বন্ধু নবী ইবরাহীম আ. যখন নিজ সম্প্রদায় ও জন্মভূমি ত্যাগ করে যান, তখন তিনি আল্লাহর নিকট একটি নেককার পুত্র সন্তানের দোয়া করলেন। আল্লাহ তাঁকে একজন ধৈর্যশীল পুত্রের সুসংবাদ দান করেন। তিনি হলেন ইসমাঈল আ.। কেননা, তিনিই হলেন প্রথম পুত্র। হযরত ইবরাহীম আ.- এর ৮৬ বছর বয়সে তাঁর জন্ম হয়। এ ব্যাপারে কোনো মতভেদ নেই। (ফেল্যাম্মা বালাগা মা'আহুস সায়্যি) অর্থাৎ 'যখন যুবক হল ও পিতার ন্যায় নিজের কাজকর্ম করার বয়সে পৌঁছল।' মুজাহিদ রহ. এর অর্থ করেছেন: তিনি যখন যুবক হলেন, স্বাধীনভাবে পিতার ন্যায় চেষ্টা-সংগ্রাম ও কাজকর্ম করার উপযোগী হলেন। যখন ইবরাহীম আ. তাঁর স্বপ্ন থেকে বুঝতে পারলেন, আল্লাহ তাঁর পুত্রকে যবেহ করার হুকুম দিয়েছেন। হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে এক মারফু হাদীসে বর্ণিত হয়েছে : রুয়ায়াল আম্বিয়া (নবীদের স্বপ্ন ওহী)। উবায়দ ইবনে উমায়রও এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। এ নির্দেশ ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে ইবরাহীম খলীল আ.-এর প্রতি এক বিরাট পরীক্ষা। কেননা, তিনি এই প্রিয় পুত্রটি পেয়েছিলেন তাঁর বৃদ্ধ বয়সে। তা ছাড়া এ শিশুপুত্র ও তার মাকে এক জনমানবহীন শূন্য প্রান্তরে রেখে এসেছিলেন, যেখানে না ছিল কোনো কৃষি ফসল, না ছিল তরুলতা। ইবরাহীম খলীল আ. আল্লাহর নির্দেশ পালন করলেন। আল্লাহর উপর ভরসা রেখে তাদেরকে সেখানে রেখে আসেন। আল্লাহ তাদেরকে মুক্তির ব্যবস্থা করলেন। এমন উপায়ে পানাহারের ব্যবস্থা করে দিলেন, যা ছিল তাদের ধারণাতীত। এরপর যখন আল্লাহ এই একমাত্র পুত্রধনকে যবেহ করার নির্দেশ দেন, তখন তিনি দ্রুত সে নির্দেশ পালনে এগিয়ে আসেন। ইবরাহীম আ. এ প্রস্তাব তাঁর পুত্রের সামনে পেশ করেন। যাতে এ কঠিন কাজ সহজভাবে ও প্রশান্ত চিত্তে করতে পারেন। চাপ প্রয়োগ করে ও বাধ্য করে যবেহ করার চাইতে এটা ছিল সহজ উপায়। (লালা ইয়া বুনাইয়া ইন্নী আরা ফিল মানামে ইন্নী আদবাহুকা ফানযুর মাযা তারা) ইবরাহীম বলল, 'বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি, তোমাকে আমি যবেহ করছি। এখন তোমার অভিমত কি বল।' ধৈর্যশীল পুত্র পিতার নির্দেশ পালন করার জন্যে খুশি মনে প্রস্তাব গ্রহণ করেন। তিনি বললেন, হে আমার পিতা! আপনি যে ব্যাপারে আদিষ্ট হয়েছেন তা-ই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীলই পাবেন। এ জবাব ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের আন্তরিকতার পরিচায়ক। তিনি পিতার আনুগত্য ও আল্লাহর হুকুম পালনের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন : (ফেল্যাম্মা আসলামা ওয়া তাল্লাহু লিল জাবীন) অর্থাৎ যখন তারা উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করল এবং তার পুত্রকে কাত করে শুইয়ে দিল। এ আয়াতাংশের কয়েকটি অর্থ বলা হয়েছে; (১) তাঁরা উভয়ে আল্লাহর হুকুম পালনের উদ্দেশ্যে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন ও মনোবল দৃঢ় করেন। (২) এখানে পূর্বের কাজ পরে ও পরের কাজ পূর্বে বলা হয়েছে। অর্থাৎ পিতা ইবরাহীম আ. পুত্র ইসমাঈল আ.-কে উপুড় করে শোয়ালেন। (৩) ইবরাহীম আ. পুত্রকে উপুড় করে শোয়ান এ জন্য, যবেহ করার সময় তাঁর চেহারার উপর যাতে দৃষ্টি না পড়ে। ইবনে আব্বাস রাযি. মুজাহিদ, সাঈদ ইবনে জুবায়ের, কাতাদা ও যাহহাক রহ. এ মত পোষণ করেন। (৪) লম্বাভাবে চিৎ করে শায়িত করান, যেমন পণ্ড যবেহ করার সময় শায়িত করানো হয়। এ অবস্থায় কপালের এক অংশ মাটির সাথে লেগে থাকে। ইবরাহীম আ. যবেহ করার জন্য বিসমিল্লাহ ও আল্লাহু আকবার বলেন। আর পুত্র মৃত্যুর জন্যে কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করেন। সুদ্‌দী রহ. প্রমুখ বলেছেন, হযরত ইবরাহীম আ. গলায় ছুরি চালান কিন্তু তাতে বিন্দুমাত্রও কাটল না। কেউ বলেছেন, গলার নিচে তামার পাত রাখা হয়েছিল। কিন্তু তাতেও কাটা যায় নি। আল্লাহই সম্যক অবগত। (আই ইয়া ইবরাহিম কাদ সাদ্দাক্তার রুয়ায়া) অর্থাৎ ইবরাহীম! তুমি স্বপ্নকে সত্যই পালন করলে; তোমাকে পরীক্ষা করার উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়েছে। তুমি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছ। আল্লাহর নির্দেশ পালন করার জন্যে তোমার আগ্রহ ও আনুগত্য প্রমাণিত হয়েছে। তুমি পুত্রকে কুরবানীর জন্যে পেশ করেছ। যেমন ইতিপূর্বে তুমি আগুনে নিজের দেহকে সমর্পণ করেছিলে এবং মেহমানদের জন্যে প্রচুর অর্থ-সম্পদ ব্যয় করেছিলে। আল্লাহ তাআলা বলেন : (ইন্না হাযা লাহুয়াল বালাউল মুবীন) অর্থাৎ নিশ্চয়ই এ ছিল স্পষ্ট পরীক্ষা। আল্লাহর বাণী: (ওয়াফাদাইনাহু বিজিবহিন আযিম) অর্থাৎ আমি তাকে মুক্তি দিলাম এক মহান কুরবানীর বিনিময়ে। অর্থাৎ একটি সহজ বিনিময় দ্বারা আমি ইবরাহীম আ.-এর পুত্রকে যবেহ করা থেকে মুক্ত করে দিলাম। অধিকাংশ আলেমের মতে, এ বিনিময়টি ছিল শিং বিশিষ্ট একটি সাদা দুম্বা- যাকে ইবরাহীম আ. ছাবীর পর্বতে একটি বাবলা বৃক্ষে বাঁধা অবস্থায় দেখতে পেয়েছিলেন। ইমাম ছাওরী রহ. ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, ঐ দুম্বাটি জান্নাতে চল্লিশ বছর পর্যন্ত বিচরণ করেছিল। সাঈদ ইবনে জুবায়র রাযি. বলেছেন: দুম্বাটি জান্নাতে চরে বেড়াত। এক সময়ে এটা ছাবীর পর্বত ভেদ করে বের হয়ে আসে। তার শরীরে ছিল লাল বর্ণের পশম। ইবনে আব্বাস রাযি. সূত্রে বর্ণিত, শিংযুক্ত একটি দুম্বা ছাবীর পাহাড় থেকে নেমে ইবরাহীম আ.-এর নিকট হেঁটে আসে এবং ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে ডাকতে থাকে। ইবরাহীম আ. তাকে ধরে যবেহ করেন। এই দুম্বাটি হযরত আদম আ.-এর পুত্র হাবিলও কুরবানী করেছিলেন এবং আল্লাহ তা কবুলও করেছিলেন। ইবনে আবী হাতিম রহ. এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। কুরআনে একে 'মহান যবেহ' বলা হয়েছে এবং 'সুস্পষ্ট পরীক্ষা' বলে উল্লেখ করা হয়েছে। হাদীসে দুম্বার কথা বর্ণিত হয়েছে। ইমাম আহমদ রহ. সাফিয়া বিনতে শায়রা রাযি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, বনি সুলাইমের এক মহিলা আমাকে বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উসমান ইবনে তালহাকে ডেকে পাঠান। বর্ণনাকারী উসমান রাযি. কে জিজ্ঞেস করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনাকে কেন সংবাদ দিয়েছিলেন? উসমান রাযি. বললেন, আমি যখন কাবা ঘরে প্রবেশ করি তখন সেই দুম্বার দুটি শিং দেখতে পাই। এটা ঢেকে রাখার জন্যে তোমাকে বলতে আমি ভুলে যাই। তখন তিনি শিং দুটি ঢেকে দেন। কেননা, আল্লাহর ঘরে এমন কিছু থাকা উচিত নয় যা মুসল্লিদের একাগ্রতা বিনষ্ট করে। সুফিয়ান রাযি. বলেছেন, ইবরাহীম আ.-এর দুম্বার শিং দুটি সর্বদা কাবা ঘরে সংরক্ষিত ছিল। যখন খানায়ে কাবায় আগুন লেগে যায় তখন শিং দুটি পুড়ে ভস্ম হয়ে যায়। ইবনে আব্বাস রাযি. সূত্রে বর্ণিত দুম্বাটির মাথা সর্বদা কাবার মীযাবে (কার্ণিশে) ঝুলান থাকত এবং রৌদ্রে তা শুকিয়ে যায়। কেননা, তিনিই মক্কায় বসবাস করতেন। হযরত ইসহাক আ. শিশুকালে মক্কায় এসেছিলেন কিনা আমাদের জানা নেই। আল্লাহই উত্তমরূপে অবগত। কুরআন থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, বরং বলা যায় এ উদ্দেশ্যেই আয়াত নাযিল হয়েছে, ইসমাঈল আ.-ই যাবীহুল্লাহ। কেননা, আল্লাহ কুরআনে প্রথমে যাবিহ-এর ঘটনা উল্লেখ করে পরে বলেছেন: (ওয়াবাশশারনাহু বি-ইসহাকা নাবিয়্যান মিনাস সালিহীন) অর্থাৎ আমি ইবরাহীমকে ইসহাকের সুসংবাদ দিলাম। সে ছিল নবী, সৎকর্মশীলদের একজন। বাক্যটিতে যারা একে ১র্চ বলেছেন, তাদের এরূপ ব্যাখ্যা মনগড়া। ইসহাক আ.- কে যাবীহুল্লাহ বলা ইহুদি চক্রান্ত ছাড়া আর কিছু নয়। তারা তাদের কিতাবে এ স্থানে নিঃসন্দেহে বিকৃত করেছে। তাদের মতে, আল্লাহ ইবরাহীম আ.-কে আদেশ করেন তাঁর একক ও প্রথম পুত্র ইসহাককে যবেহ করতে। ইসহাক শব্দটি এখানে জোর করে ঢুকানো হয়েছে। যা মিথ্যা ও কাল্পনিক। কেননা, ইসহাক আ. একক পুত্রও নন, প্রথম পুত্রও নন। বরং একক ও প্রথম পুত্র ছিলেন ইসমাঈল আ.। ইহুদিরা আরব মুসলমানদের প্রতি হিংসার বশবর্তী হয়ে এমনটি করেছে। কারণ ইসমাঈল আ. হলেন আরবদের পিতৃপুরুষ- যারা হিজাযের অধিবাসী এবং যাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জন্মগ্রহণ করেন। পক্ষান্তরে, ইসহাক আ. হলেন ইয়াকুব আ.- এর পিতা। ইয়াকুব আ.-কে ইসরাঈলও বলা হত। বনি ইসরাঈলরা তাঁর দিকেই নিজেদের সম্পর্কিত করে থাকে। তারা আরবদের এই গৌরব নিজেদের পক্ষে নিতে চেয়েছিল। এ উদ্দেশ্যে তারা আল্লাহর কালাম পরিবর্তন করে এবং মিথ্যা ও বাতিল কথার অনুপ্রবেশ ঘটায়। কিন্তু তারা বুঝল না, সম্মান ও মর্যাদার চাবিকাঠি আল্লাহর হাতে, তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে দান করেন। প্রাচীন আলেমদের একটি দল ইসহাক আ.-কে যাবীহুল্লাহ বলেছেন। তারা এ মত গ্রহণ করেছেন সম্ভবত কাব আহবারের বর্ণনা থেকে, কিংবা আহলে কিতাবদের সহিফা থেকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এ ব্যাপারে কোনো সহি হাদিস বর্ণিত হয় নি। সুতরাং এসব মতামতের দ্বারা আমরা কুরআনের স্পষ্ট বর্ণনাকে ত্যাগ করতে পারি না। কুরআনের বর্ণনা থেকে ইসহাক আ.-কে যাবীহুল্লাহ বলার কোনোই অবকাশ নেই। বরং কুরআন থেকে যা বোঝা যায়- কুরআনের উক্তি ও সুস্পষ্ট বর্ণনা এই, তিনি হলেন ইসমাঈল আ.। মুহাম্মদ ইবনে কাব আল কুরাজি রহ. এ প্রসঙ্গে একটি সুন্দর যুক্তি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যাবীহুল্লাহ হযরত ইসমাঈল আ.; ইসহাক আ. নয়। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেছেন: (ফাবাশশারনাহা বি-ইসহাকা ওয়ামিন ওয়ারায়ে ইসহাকা ইয়াকূব) অর্থাৎ আমি ইবরাহীমের স্ত্রী সারাহকে ইসহাকের এবং ইসহাকের পরে ইয়াকুবের জন্মের সুসংবাদ দিলাম। এখানে ইসহাকের জন্ম হওয়ার এবং তার থেকে পুত্র ইয়াকুবের জন্ম হওয়ার সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই সাথে যদি ইয়াকুব আ.-এর জন্মের পূর্বেই ইসহাক আ.-কে বাল্যকালে যবেহের নির্দেশও দেওয়া হয়, তবে পূর্বের সুসংবাদ আর এ সুসংবাদ থাকে কি করে? বরং এটা হয়ে যায় সুসংবাদের বিপরীত। ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে দুটি মত বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্যে একটি মত উপরের অনুরূপ। কিন্তু তাঁর সঠিক মত ও অধিকাংশ সাহাবা, তাবিঈ ও আলিমদের মতে হযরত ইসমাঈল আ.-ই যাবীহুল্লাহ। মুজাহিদ, সাঈদ, শাবী, ইউসুফ ইবনে মাহরান, আতা প্রমুখ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি হলেন ইসমাঈল আ.। ইবনে জারীর রহ. আতা ইবনে আবি রবাহ রহ.-এর সূত্রে ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেছেন, যার পরিবর্তে দুম্বা যবেহ হয়েছে তিনি হযরত ইসমাঈল আ.। অথচ ইহুদিরা বলে থাকে ইসহাক আ.-এর কথা। এটা তারা মিথ্যা বলে। ইমাম আহমদের পুত্র আবদুল্লাহ রহ. বলেছেন, আমার পিতার মত হলো, যাবীহুল্লাহ হযরত ইসমাঈল আ.। ইবনে আবী হাতিম রহ. বলেন, আমি আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করেছি, যাবীহুল্লাহ.কে? তিনি বলেছেন, যথার্থ কথা হল- তিনি হযরত ইসমাঈল আ.। ইবনে আবী হাতিম রহ. বলেন: হযরত আলী, ইবনে ওমর, আবু হোরায়রা রাযি, আবুত-তুফায়ল, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব, সাঈদ ইবনে জুবায়র, হাসান, মুজাহিদ, শাবী, মুহাম্মদ ইবনে কাব, আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে আলী ও আবু সালেহ সকলেই বলেছেন- যাবীহুল্লাহ হযরত ইসমাঈল আ.। ইমাম বগবী রহ.-ও উপরোক্ত মত রাবী ইবনে আনাস রাযি., কালবী ও আবু আমর ইবনে আলা রাযি. থেকে বর্ণনা করেছেন। হযরত মুআবিয়া রাযি. থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে সম্বোধন করল এভাবে - ইয়া ইবনা যিয যাবিহাতাইন (হে দুই যাবীহার পুত্র!) একথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হেসে দিলেন। উমর ইবনে আবদুল আযীয রহ. ও মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক রহ.-ও এই কথা বলেছেন। হাসান বসরী রহ. বলেন, এ বর্ণনায় কোনো সন্দেহ নেই। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক মুহাম্মদ ইবনে কাব সূত্রে বর্ণনা করেন- তিনি বলেন, উমর ইবনে আবদুল আযীয রহ. যখন খলিফা, তখন আমি সিরিয়ায় ছিলাম। আমি ইসমাঈল আ. যাবীহুল্লাহ হওয়ার পক্ষে খলিফার নিকট দলিল স্বরূপ এই আয়াত পেশ করলাম: (ফাবাশশারনাহা বি-ইসহাকা ওয়ামিন ওয়ারায়ে ইসহাকা ইয়াকূব)। তখন খলিফা উমর ইবনে আবদুল আযীয রহ. বললেন, এটা তো একটা চমৎকার দলীল, এ দিকটা আমি লক্ষ করি নি। এখন দেখছি তুমি যা বলছ তাই সঠিক। এরপর খলিফা সিরিয়ায় বসবাসকারী এক লোককে ডেকে আনতে বলেন। ওই লোকটি পূর্বে ইহুদি ছিল। পরে ইসলাম গ্রহণ করে এবং একজন ভালো মুসলমান হয়। লোকটি ইহুদি সম্প্রদায়ের আলিম ছিল। খলিফা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ইবরাহীম আ.-এর দুই পুত্রের মধ্যে কোন্ পুত্রকে যবেহ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সে বলল, আল্লাহর শপথ ইসমাঈল আ.-কে। আমীরুল মুমিনীন! ইহুদিরা একথা ভালোরূপেই জানে। কিন্তু তারা আরবদের প্রতি হিংসার বশবর্তী হয়ে এমনটি করেছে। কারণ ইসমাঈল আ. হলেন আরবদের পিতৃপুরুষ- যারা হিজাযের অধিবাসী এবং যাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জন্মগ্রহণ করেন। পক্ষান্তরে, ইসহাক আ. হলেন ইয়াকুব আ.- এর পিতা। ইয়াকুব আ.-কে ইসরাঈলও বলা হত। বনি ইসরাঈলরা তাঁর দিকেই নিজেদের সম্পর্কিত করে থাকে। তারা আরবদের এই গৌরব নিজেদের পক্ষে নিতে চেয়েছিল। এ উদ্দেশ্যে তারা আল্লাহর কালাম পরিবর্তন করে এবং মিথ্যা ও বাতিল কথার অনুপ্রবেশ ঘটায়। কিন্তু তারা বুঝল না, সম্মান ও মর্যাদার চাবিকাঠি আল্লাহর হাতে, তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে দান করেন।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 কাবা গৃহ নির্মাণ

📄 কাবা গৃহ নির্মাণ


হযরত ইবরাহীম আ. যদিও ফিলিস্তিনে অবস্থান করতেন, কিন্তু সর্বদা ইসমাঈল আ. ও হাজেরাকে দেখবার জন্য মক্কায় আগমন করতেন। এ সময়ের ভেতরে হযরত ইবরাহীম আ.-এর প্রতি আল্লাহ তাআলার আদেশ হল, বাইতুল্লাহ নির্মাণ কর। হযরত ইবরাহীম আ. হযরত ইসমাঈল আ.-এর সাথে আলোচনা করে পিতা-পুত্র মিলে বাইতুল্লাহর নির্মাণ কাজ শুরু করে দিলেন। হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. ফাতহুল বারী কিতাবে (৮/১৩৮) একটি রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেছেন। যাতে প্রকাশ পায়, বাইতুল্লাহ শরীফের সর্বপ্রথম ভিত্তি হযরত আদম আ.-এর হাতে স্থাপিত হয়েছিল। ফেরেশতারা তাঁকে সেই স্থানটি দেখিয়ে দিয়েছিলেন, যেখানে কাবাগৃহ নির্মিত হওয়ার ছিল। কিন্তু হাজার হাজার বৎসরের ঘটনাবলী বহুকাল পূর্বে তা নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল। অবশ্য হযরত ইবরাহীম আ.-এর কালে নিশ্চিহ্ন গৃহটি একটি টিলা কিংবা মাটির ঢিপির আকারে বিদ্যমান ছিল। আল্লাহ পাক অহির মাধ্যমে ইবরাহীম আ.-কে বাইতুল্লাহর স্থান জানিয়ে দিলেন। তিনি হযরত ইসমাঈল আ.-এর সহায়তায় তা খুঁড়তে শুরু করেন। পূর্ব নির্মাণের ভিত্তিমূল দৃষ্ট হতে লাগল। সেই ভিত্তিমূলের ওপরই ইবরাহীম আ. কর্তৃক বাইতুল্লাহ নির্মিত হল। কিন্তু কুরআন মাজিদ বাইতুল্লাহ নির্মাণের ব্যাপারটি হযরত ইবরাহীম আ. হতেই আরম্ভ করেছে এবং এর পূর্ববর্তী অবস্থার কোনো আলোচনা করে নি। কুরআন মাজিদ বলে: (ইন্না আউওয়ালা বাইতিন উদিয়া লিন্নাসি...) অর্থাৎ নিঃসন্দেহ, সর্বপ্রথম ঘরটি যা (আল্লাহ পাকের স্মরণ করার উদ্দেশ্যে) মানুষের জন্য নির্মিত হয়েছে, তা সেই ঘর যা মক্কায় অবস্থিত। এটি আপাদমস্তক বরকতময়। আর দুনিয়াবাসীদের জন্য হেদায়ত।

এবারকার নির্মাণের এই বুযুর্গী রয়েছে, ইবরাহীম আ.-এর ন্যায় আল্লাহর দোস্ত, অতি উচ্চ মর্যাদাশালী পয়গম্বর এর রাজমিস্ত্রী। আর ইসমাঈল আ.-এর ন্যায় নবী এবং আল্লাহর যাবীহ (আল্লাহর নামে কুরবানীর জন্য উৎসর্গিত) এর যোগালদার। পিতা-পুত্র উভয়ে সর্বদা এর নির্মাণ কার্যে রত। যখন এর দেওয়ালগুলো গাঁথতে গাঁথতে উপরে উঠয়া গেল এবং বুযুর্গ পিতার হস্ত উপরে গাঁথতে অক্ষম হয়ে গেল তখন আল্লাহ পাকের নির্দেশ অনুসারে একখণ্ড প্রস্তরকে 'ভারবাহী' বানানো হলো। হযরত ইসমাঈল আ. এটি নিজের হাতে ধরে রাখতেন এবং হযরত ইবরাহীম আ.-এর ওপর আরোহণ করে গেঁথে যেতেন। এই সেই স্মৃতিচিহ্ন যা আজ মাকামে ইবরাহীম নামে পরিচিত। যখন নির্মাণ কার্য এই সীমায় পৌঁছল যেখানে বর্তমানে হাজরে আসওয়াদ (কৃষ্ণপাথর) লাগানো রয়েছে, তখন জিবরাইল আ. হযরত ইবরাহীম আ.-কে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলেন এবং নিকটস্থ একটি পাহাড় হতে হাজরে আসওয়াদকে, যা বেহেশত হতে আনা পাথর বলে কথিত, সুরক্ষিত অবস্থায় বের করে তার সম্মুখে রেখে দিলেন, যেন যথাস্থানে স্থাপন করা যায়।

'বাইতুল্লাহ'- আল্লাহর ঘর যখন নির্মিত হয়ে গেল, তখন আল্লাহ পাক হযরত ইবরাহীম আ.-কে বললেন: এটি ইবরাহীমী ধর্মের কেবলা এবং আমার সম্মুখে মস্তক অবনত করার প্রতীক। সুতরাং একে তাওহিদ তথা একত্ববাদের কেন্দ্র সাব্যস্ত করা হল। তখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল আ. দুআ করলেন, আল্লাহ তাআলা যেন তাদেরকে এবং তাদের সন্তানদেরকে নামায কায়েম করা ও যাকাত প্রদান করার হেদায়ত দান করেন। এর ওপর দৃঢ়তা ও স্থায়িত্বও দান করেন। আর তাদের জন্য নানাবিধ ফল, মেওয়া ও রিযিকের বরকত দান করেন। আর সমগ্র বিশ্বের দিক দিগন্তের বাসিন্দাগণ হতে হেদায়েতপ্রাপ্তদের দলকে এদিকে আকৃষ্ট করে দেন। যেন তারা দূর-দূরান্ত থেকে এসে হজের আহকাম আদায় করে এবং হেদায়ত ও সৎপথ প্রাপ্তির এই কেন্দ্রস্থলে একত্র হয়ে নিজেদের জীবনের সৌভাগ্য লাভ করে।

কুরআন মাজিদ বাইতুল্লাহ শরীফ নির্মাণকালে হযরত ইবরাহীম ও ইসমাঈল আ.-এর মুনাজাত, নামায কায়েম করা ও হজের করণীয় কাজগুলো সম্পন্ন করার জন্য আগ্রহ ও আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ এবং বাইতুল্লাহ তাওহীদের কেন্দ্রস্থল হওয়ার ঘোষণা স্থানে স্থানে উল্লেখ করেছে। এবং নতুন নতুন ভঙ্গীতে এর মহত্ত্ব ও উচ্চ মর্যাদাকে নিম্নোক্ত আয়াতগুলোতে ব্যক্ত করেছে: (ইন্না আউওয়ালা বাইতিন উদিয়া লিন্নাসি লালাল্লাযী বি-বাক্কাতাহ মুবারাকান ওয়া হুদান লিল আলামিন) অর্থাৎ নিঃসন্দেহ, সর্বপ্রথম ঘর, যা মানুষের জন্য বানানো হয়েছে, তা এটিই যা মক্কায় অবস্থিত, বরকতময় এবং সমস্ত মানুষের জন্য হেদায়তের উৎস। (ফিহি আয়াতুন বাইয়্যিনাতুন মাক্বামু ইবরাহিম...) অর্থাৎ সত্য ধর্মের উজ্জ্বল নিদর্শনসমূহ, তন্মধ্যে মাকামে ইবরাহীম অন্যতম। আর যে কেউ এর সীমায় প্রবেশ করে সে নিরাপত্তা ও হেফাযতের মধ্যে এসে যায়। আর আল্লাহর তরফ হতে মানুষের জন্য এই বিষয়টি অবশ্য কর্তব্য হয়েছে, যদি সেই ঘর পর্যন্ত পৌঁছার সামর্থ্য প্রাপ্ত হয়, সে যেন হজ করে। এতকিছু সত্ত্বেও যে কেউ (এ সত্যকে) অবিশ্বাস করে, তবে স্মরণ রেখো, আল্লাহ পাকের সত্তা সারা দুনিয়া হতে অমুখাপেক্ষী। (সূরা আলে ইমরান: ৯৬-৯৭)

(ওয়া ইয জাআলনাল বাইতা মাছাবাতাল লিন্নাসি ওয়া আমনান...) অর্থাৎ আর (দেখ,) যখন আমি (মক্কার) সেই ঘরটিকে (কাবাগৃহকে) মানুষের সমবেত হওয়ার কেন্দ্রস্থল ও নিরাপত্তার স্থান সাব্যস্ত করলাম এবং আদেশ করলাম, মাকামে ইবরাহীমকে যেন (চিরকালের) নামাযের স্থান করা হয়। আর আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করলাম, আমার নামে যে ঘর নির্মাণ করা হয়েছে তা তার তাওয়াফকারী, তার মধ্যে ইবাদতকারী এবং রুকু ও সেজদাকারীদের জন্য (সর্বদা) পবিত্র রেখো। আর যখন ইবরাহীম আল্লাহর দরবারে দোয়া করল- পরওয়ারদিগার! এই স্থানটিকে শান্তি ও নিরাপত্তার একটি শহর করে দিন। নিজ দয়া ও অনুগ্রহে এরূপ করে দিন, যেন এখানকার অধিবাসীদের মধ্যে যারা আপনার ও এবং কেয়ামত দিবসের উপর ঈমান আনয়নকারী হয়, তাদের জীবিকার জন্য সর্বপ্রকারের উৎপন্ন শস্যাদি সংগৃহীত হয়ে যায়। এই দোয়ার জবাবে আল্লাহ পাক বলেছিলেন, (তোমার দোয়া মনযুর করা হল এবং এখানকার অধিবাসীদের মধ্য হতে) যে কুফরি এখতিয়ার করবে, তাদেরও আমি উপভোগ করতে দিব। অবশ্য এই উপভোগ অতি অল্পকালের জন্য হবে। কেননা, পরিশেষে তাকে (কর্মফল ভোগ করার জন্য) বাধ্য হয়ে দোযখে যেতে হবে। আর (দেখ, তা কেমন আযিমুশশান এবং বিপ্লবের সময় ছিল), 'যখন ইবরাহীম আ. কাবাগৃহের বুনিয়াদ উন্নত করছিলেন এবং ইসমাঈল আ. তাঁর সাথে অংশ গ্রহণ করেছিলেন, 'যখন তারা এই দোয়া করেছিলেন: (রব্বানা তাক্বাব্বাল মিন্না ইন্নাকা আনতাস সামিউল আলিম) অর্থাৎ হে আমাদের পরওয়ারদিগার! আমাদের এই কাজটি কবুল করে নিন। নিঃসন্দেহ, আপনিই (দুআসমূহ) শ্রবণকারী এবং পরিজ্ঞাত। হে পরওয়ারদিগার! আপনি (নিজ দয়া ও অনুগ্রহে) আমাদেরকে এমন তাওফিক দান করুন, 'যেন আমরা সত্যিকারের মুসলিম (অর্থাৎ আপনার হুকুমের অনুগত) হয়ে যাই। হে খোদা! আমাদেরকে আপনার এবাদতের (সঠিক) পন্থা বলে দিন, আর আমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করুন। নিঃসন্দেহ, আপনিই একমাত্র সত্তা, যিনি স্বীয় রহমতে ক্ষমা করে থাকেন। যাঁর 'রাহিম' সুলভ ক্ষমার কোনো সীমা নাই। আর হে আমাদের পরওয়ারদিগার! (নিজ দয়ায় ও অনুগ্রহে) এই জনপদের অধিবাসীদের মধ্যে আপনার এমন একজন রাসূল প্রেরণ করুন, তিনি যেন তাদেরই মধ্য হতে হন, তিনি আপনার আয়াতসমূহ পাঠ করে লোকদেরকে শুনান, তাদেরকে কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেন, আর নিজের পয়গম্বর সুলভ শিক্ষা ও উপদেশ দ্বারা তাদের অন্তরসমূহকে পরিষ্কার ও মার্জিত করে দেন। হে পরওয়ারদিগার! নিঃসন্দেহ, আপনার সত্তাই হেকমতওয়ালা, সর্বজয়ী।" (সূরা বাকারা: ১২৫-১২৯)

(ওয়া ইয বাউয়ানা লি-ইবরাহিমা মাকানাল বাইতি আন লা তুশরিক বি শাইয়ান...) অর্থাৎ আর (সেই সময়টুকু স্মরণ করুন) যখন আমি ইবরাহীমের জন্য কাবাগৃহের সঠিক স্থান নির্ধারণ করে দিলাম। (এবং আদেশ করলাম) আমার সাথে কোনো বস্তুকে শরীক সাব্যস্ত করো না এবং আমার এই ঘরটিকে ঐ সমস্ত লোকের জন্য পবিত্র রাখ, যারা তাওয়াফকারী হয়, ইবাদতে খুব তৎপর হয়, রুকু ও সেজদায় মস্তক অবনতকারী হয় এবং (আদেশ করলাম), লোকদের মধ্যে হজের ঘোষণা করে দাও, তারা যেন হজ করে। (সূরা-হজ: ২৬-৩৩)

কাবাঘর বায়তুল মামূরের সোজা নিচে যমীনে অবস্থিত। আল্লাহ ইবরাহীম আ.-কে পৃথিবীর অধিবাসীদের জন্যে একটি ঘর নির্মাণ করতে আদেশ দেন, যেমনি আকাশের ফেরেশতাদের জন্যে ইবাদতখানা রয়েছে, আল্লাহ তাঁকে সে স্থান দেখিয়ে দেন। আকাশ ও যমীন সৃষ্টির পর থেকেই এই স্থানটিকে উক্ত ঘরের জন্যে নির্দিষ্ট করে রাখা হয়েছিল। কাবার দেওয়াল যখন ইবরাহীম আ.-এর চেয়ে উঁচু হয়ে যায়, তখন পুত্র ইসমাঈল আ. এ প্রসিদ্ধ পাথরখানা এনে পিতার পায়ের নিচে স্থাপন করেন, যাতে তার উপর দাঁড়িয়ে দেওয়াল উঁচু করতে পারেন। এ পাথরটি সেই প্রাচীনকাল থেকে হযরত ওমর রাযি.-এর খেলাফতকাল পর্যন্ত কাবার দেওয়াল সংলগ্ন ছিল। তিনি এটাকে কাবা ঘর থেকে কিছু পিছিয়ে দেন। ইসলামি যুগ পর্যন্ত ঐ পাথরের উপর হযরত ইবরাহীম আ.-এর পায়ের দাগ অবশিষ্ট ছিল। হযরত ইবরাহীম আ. আল্লাহর কাছে তাদের মধ্যে একজন রাসূল প্রেরণ করার জন্যে দুআ করেন। আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করেন। তিনি তাদের মধ্য থেকে রাসূল প্রেরণ করেন। যিনি ছিলেন সর্বশেষ নবী। সকল নবীর মধ্যে এটা ছিল তাঁর একক বৈশিষ্ট্য। এ কারণে হযরত ইবরাহীম আ. যখন দুনিয়াবাসীর জন্যে কাবা নির্মাণ করেন, তখন তা সম্মান ও মর্যাদায় সপ্তম আকাশের অধিবাসী ফেরেশতাগণের কাবা বায়তুল মামুরের সমমর্যাদা লাভ করে। বায়তুল মামুরে প্রত্যহ সত্তর হাজার ফেরেশতা ইবাদত করে থাকেন। আল্লাহ যখন ইবরাহীম আ. ও ইসমাঈল আ.-কে কাবা নির্মাণের আদেশ করেন, তখন তাঁরা কাবার স্থানটি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। আল্লাহ তখন খাজুজ নামক একটি বায়ু প্রেরণ করেন। সে বায়ু প্রাচীন কাবার স্থানটি আবর্জনামুক্ত করে দেয়। তখন ইবরাহীম আ. ও ইসমাঈল আ. তা অনুসরণ করে কোদাল দ্বারা মাটি খুঁড়ে সেখানে ভিত্তি স্থাপন করেন। হযরত ইবরাহীম আ. ইসমাঈল আ.-কে বললেন, প্রিয় বৎস! এখন তুমি আমার জন্যে ভারতবর্ষ থেকে 'হাজরে আসওয়াদ' নিয়ে এস। মূলত এটা ছিল শুভ্র ইয়াকুত পাথর। হযরত আদম আ. এ পাথরসহ জান্নাত থেকে অবতরণ করেন। মানুষের পাপ স্পর্শে এটা কালো হয়ে যায়। ইসমাঈল আ. একটি পাথর নিয়ে পিতার নিকট এসে উক্ত হাজরে আসওয়াদকে রুকনে কাবার নিকট দেখতে পান। হযরত ইবরাহীম খলীল আ.-এর তৈরি কাবা দীর্ঘকাল যাবত অক্ষত থাকে। পরবর্তীকালে কুরায়েশরা ঘরটি পুনঃনির্মাণ করে। তখন ঘরের উত্তর দিক থেকে যেদিকে শাম দেশ অবস্থিত, হযরত ইবরহীম আ.-এর ভিত্তি থেকে কিছুটা কমিয়ে দেওয়া হয়, বর্তমানে সেই অবস্থার উপরেই কাবাঘর আছে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px