📄 খতনা
তাওরাতপন্থীরা বলেন, আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহীম আ.-কে পুত্র ইসমাঈলসহ সবাইকে খতনার নির্দেশ দেন। তিনি এ নির্দেশ পালন করেন। অন্যদেরও খতনা করান। এ সময় ইবরাহীম আ.-এর বয়স হয়েছিল নিরানব্বই বছর এবং ইসমাঈল আ.-এর বয়স ছিল তের বছর। খতনা করাটা ছিল আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে। এতে প্রতীয়মান হয়, অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হিসেবেই তিনি তা পালন করেন। এ কারণেই ওলামায়ে কেরাম খতনা করা ওয়াজিব বলেছেন। এ মতই সঠিক। বুখারী শরীফে আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ইবরাহীম আ. আশি বছর বয়সে (ছুঁতারের) বাইসের সাহায্যে নিজের খতনা করেন। আবদুর রহমান ইবনে ইসহাক, আজলান, মুহাম্মদ ইবনে আমর ও ইমাম মুসলিম ভিন্ন ভিন্ন সনদে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। উক্ত বর্ণনায় ব্যবহৃত 'কুদূম' শব্দটির অর্থ, ধারাল অস্ত্র। কেউ কেউ এটি একটি স্থানের নাম বলেছেন। এ সব হাদিসের শব্দের মধ্যে কিছু কিছু পার্থক্য আছে। ইবনে হিব্বান রহ. আবু হোরায়রা রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : ইবরাহীম আ. একশ বিশ বছর বয়সে খতনা করেন। এর পরও আশি বছর জীবিত থাকেন। এসব বর্ণনায় ইসমাঈল আ.-কে 'যাবীহ' বলে উল্লেখ করা হয় নি। এবং এতে ইবরাহীম আ.-এর তিনবার আগমনের কথা বলা হয়েছে।
📄 হযরত ইসমাঈল আ.
ইসমাঈল আ.-ই হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহর প্রথম সন্তান। সুতরাং সর্বাবস্থায় তিনিই ছিলেন একক সন্তান। এ সময়ের মধ্যে অন্য কোনো সন্তানের জন্ম হয় নি। আর তাৎপর্যগত দিক থেকে একক এ হিসেবে, পিতা ইবরাহীম আ. শিশু পুত্র ইসমাঈল আ. ও তার মা হাজেরাকে নিয়ে হিজরত করেন। এবং মক্কার ফারান পর্বতের উপত্যকায় উভয়কে নির্বাসিত করেন। তাঁদেরকে যখন তিনি রেখে আসেন তখন তাঁদের সাথে যৎসামান্য পানি ও রসদ ব্যতীত কিছুই ছিল না। এটা তিনি করেছিলেন আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও ভরসা রেখে। আল্লাহ তাআলা আপন অনুগ্রহ ও করুণার দ্বারা তাঁদেরকে বেষ্টন করে নেন। বস্তুত তিনিই প্রকৃত অনুগ্রহকারী, সাহায্যকারী ও অভিভাবক। অতএব, প্রমাণিত হল, হযরত ইসমাঈল আ.-ই বাহ্যিক ও তাৎপর্যগত উভয় দিক থেকে একক সন্তান। কিন্তু কে বুঝবে এই সূক্ষ্ণ তত্ত্ব এবং কে খুলবে এই শক্ত গিট। আল্লাহ যাকে গভীর তত্ত্বজ্ঞান দান করেছেন, তিনিই কেবল এটা উপলব্ধি করতে সক্ষম। আল্লাহ তাআলা হযরত ইসমাঈল আ.-এর বিভিন্ন গুণাগুণের প্রশংসা করেছেন। যেমন: তিনি ছিলেন ধৈর্যশীল, সহনশীল, ওয়াদা পালনকারী, সালাতের হেফাজতকারী। পরিবারবর্গকে সালাত আদায়ের নির্দেশ দানকারী- যাতে তারা আযাব থেকে রক্ষা পায় এবং মহান প্রভুর ইবাদতের দিকে মানুষকে আহবানকারী।
📄 যাবহে আযিম বা কোরবানি
আল্লাহ পাকের দরবারে সান্নিধ্যপ্রাপ্ত মহাপুরুষের সাথে আল্লাহ পাকের ব্যাপার তদ্রুপ হয় না যেরূপ সাধারণ মানুষের সাথে হয়ে থাকে। তাঁদেরকে পরীক্ষা এবং আযমাইশের কঠিন হতে কঠিনতর ধাপসমূহ অতিক্রম করতে হয়। আর প্রতি পদক্ষেপে আল্লাহর জন্য প্রাণ সোপর্দ করে দেওয়া, আত্মসমর্পণ এবং আল্লাহর আদেশের উপর সম্মতি ও সন্তুষ্টির পরিচয় দিতে হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "আম্বিয়ায়ে কেরামের প্রত্যেকটি দলকে নিজেদের মর্যাদা অনুযায়ী বিভিন্ন প্রকার পরীক্ষা ও কঠিন কষ্টের মধ্যে নিপতিত করা হয়।" ইবরাহীম আ.-ও যেহেতু উচ্চ মর্যাদাশালী নবী ও পয়গাম্বর ছিলেন, এ জন্য তাঁকেও বিভিন্ন পরীক্ষা ও আযমাইশের সম্মুখীন হতে হয়েছে। এবং মর্যাদার উচ্চতার প্রেক্ষিতে প্রতিবারই পরীক্ষায় পূর্ণ সফলকাম প্রমাণিত হয়েছেন।
যখন তাঁকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, তখন যেই ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা এবং আল্লাহর ফয়ছালায় ও নির্ধারিত তকদীরে সন্তুষ্টির পরিচয় দিয়েছেন। যেই দৃঢ়তা ও ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন, সেটি তাঁরই যোগ্য কাজ ছিল। এরপর যখন ইসমাঈল আ. ও হাজেরাকে মক্কার অনাবাদ জঙ্গলে ছেড়ে আসার আদেশ হল, তাও সাধারণ পরীক্ষা ছিল না। তখন আযমাইশ বরং কঠিন আযমাইশের সময় ছিল। বার্ধক্য এবং বুড়ো বয়সের নানাবিধ আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্র, দিবা-রাত্রির দোয়ার ফল এবং পরিবারের আশার আলো ইসমাঈলকে শুধু আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে পানি ও তৃণলতাবিহীন মরুপ্রান্তরে ত্যাগ করে আসছেন। একবার পিছনের দিকে ফিরে তার দিকে তাকাচ্ছেন না, পাছে এমন না হয় যে, পিতৃস্নেহ উথলে ওঠে এবং আল্লাহর আদেশ পালনে কোনো প্রকার ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটে যায়। এই দুইটি পরীক্ষার কঠিন মঞ্জিল অতিক্রম করার পর একটি তৃতীয় পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছে, যা গত দুই পরীক্ষার চেয়েও অধিক পিতৃহৃদয় বিগলনকারী ও হৃদয় বিদারক পরীক্ষা। এটাই একাধারে তিন রাত্রি পর্যন্ত হযরত ইবরাহীম আ. স্বপ্নে দেখছেন। আল্লাহ পাক বলছেন, হে ইবরাহীম! তুমি আমার রাস্তায় তোমার একমাত্র পুত্রকে কুরবানী কর!
আম্বিয়ায়ে কেরামের স্বপ্ন 'সত্য স্বপ্ন' এবং আল্লাহর ওহি হয়ে থাকে। সুতরাং ইবরাহীম আ. সম্মতি ও আত্মসমর্পণের মূর্তিমান প্রতীক হয়ে আল্লাহ পাকের আদেশ যথাসম্ভব জলদি পালনের নিমিত্তে প্রস্তুত হয়ে গেলেন। কিন্তু এই ব্যাপারটি যেহেতু একাকী নিজের ব্যক্তিত্বের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল না; বরং এই পরীক্ষার অন্য একটি অংশ ছিল তাঁর পুত্র, যাকে কুরবানী করার আদেশ করা হয়েছে। সুতরাং পুত্রের নিকট নিজের স্বপ্ন বৃত্তান্ত এবং আল্লাহ পাকের আদেশ বর্ণনা করলেন। পুত্র ছিলেন ইবরাহীম আ.-এর মতো। তৎক্ষণাৎ আত্মসমর্পণের মস্তক অবনত করে দিলেন। বললেন, যদি এটাই আল্লাহ পাকের ইচ্ছা হয়ে থাকে, তবে ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন। এই কথোপকথনের পরে পিতা-পুত্র নিজেদের কুরবানী পেশ করার জন্য মাঠের দিকে রওনা হয়ে গেলেন। পিতা পুত্রের সম্মতি পেয়ে যবাহের জন্তুর মত পুত্রের হাত-পা বেঁধে নিলেন। ছুরি ধার দিলেন এবং পুত্রকে উপুড় করে শোয়ায়ে যবাহ শুরু করেন। তৎক্ষণাৎ ইবরাহীম আ.-এর ওপর আল্লাহর ওহী নাযিল হল : "হে ইবরাহীম! তুমি নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়িত করে দেখিয়েছ। নিঃসন্দেহ, এটি বড় কঠিন পরীক্ষা ছিল। এখন পুত্রকে ছেড়ে দাও এবং তোমার নিকট এই যে দুম্বাটি দাঁড়ান রয়েছে, পুত্রের পরিবর্তে তা যবাই কর। আমি নেককারদেরকে এরূপে বিনিময় প্রদান করে থাকি। ইবরাহীম আ. পেছন দিকে তাকালে দেখতে পেলেন, অদূরে একটি দুম্বা দাঁড়ানো। হযরত ইবরাহীম আ. আল্লাহর শোকর আদায় করে দুম্বাটি যবাহ করলেন। এটাই সেই কুরবানী যা আল্লাহ পাকের দরবারে এমনভাবে কবুল হল, এর স্মৃতিস্বরূপ সর্বদার জন্য ইবরাহীমী ধর্মের প্রতীক সাব্যস্ত হয়ে রইল এবং আজও প্রতি বছর ১০ যিলহজ ইসলামী দুনিয়ায় এটি পালন করা হয়।
কিন্তু এ ঘটনা দ্বারা একথা প্রমাণিত হল না, ইবরাহীম আ.-এর আওলাদের মধ্য হতে কুরবানীর পাত্র কে- হযরত ইসমাঈল না ইসহাক আ.? কুরআন মাজিদ যদিও যবাহকৃত পুত্রের নাম উল্লেখ করে নি, কিন্তু যেভাবে ঘটনাটির আলোচনা করেছে, তাতে অবাধে প্রকাশ পায়, কুরআন মাজিদের ইবারত ইসমঈল আ.-কেই 'যবাহ' অর্থাৎ কুরবানীর পাত্র বলছে। এবং এটিই সঠিক। সূরা সাফফাতে এ ঘটনাকে বর্ণনা করা হয়েছে:
رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ (١٠٠) فَبَشِّرْنَاهُ بِغُلَامٍ حَلِيمٍ (۱۰১) فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانْظُرْ مَاذَا تَرَى قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّابِرِينَ (۱۰২) فَلَمَّا أَسْلَمَا وَتَلَّهُ لِلْجَبِينِ (۱۰۳) وَنَادَيْنَاهُ أَنْ يَا إِبْرَاهِيمُ (١٠٤) قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ (١٠٥) إِنَّ هَذَا لَهُوَ الْبَلَاءُ الْمُبِينُ (١٠٦) وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيمٍ (۱۰৭) وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآخِرِينَ (۱۰۸) سَلَامٌ عَلَى إِبْرَاهِيمَ (۱۰۹) كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ (۱১০) إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُؤْمِنِينَ (۱۱۱) وَبَشِّرْنَاهُ بِإِسْحَاقَ نَبِيًّا مِنَ الصَّالِحِينَ (۱۱۲) وَبَارَكْنَا عَلَيْهِ وَعَلَى إِسْحَاقَ
"আয় পরওয়ারদিগার! আমাকে একটি নেককার পুত্র সন্তান দান করুন। ফলে আমি তাকে এক ধৈর্যশীল বালকের সুসংবাদ দিলাম। এরপর (পুত্র) যখন এমন বয়সে পৌঁছল, পিতার সঙ্গে দৌড়াতে পারে। ইবরাহীম পুত্রকে বলল, বৎস! স্বপ্নে দেখলাম, আমি তোমাকে যবাহ করছি। সুতরাং তুমি ভেবে দেখ, তোমার কেমন মনে হয়। পুত্র বললেন, পিতা! যে বিষয়ে আপনি আদিষ্ট হয়েছেন, তা করে ফেলুন। ইনশাআল্লাহ আমাকে সহিষ্ণু পাবেন। এরপর যখন তাঁরা উভয়ে সম্মত হয়ে আত্মসমর্পণ করলেন এবং পুত্রকে উপুড় করে শোয়ালেন। তখন আমি তাঁকে ডেকে বললাম, ইবরাহীম! তুমি স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করে দেখিয়েছ। নিঃসন্দেহ, আমি নেককারদেরকে এইরূপে বিনিময় দান করে থাকি। অবশ্যই এটা এক প্রকাশ্য পরীক্ষা। আর আমি বিনিময় দান করেছি এক মহান কুরবানী (দুম্বা) দ্বারা। আর আমি ভবিষ্যতের বংশধরদের জন্য তার সম্বন্ধে একথা স্থায়ী রেখে দিলাম, "ইবরাহীমের ওপর শান্তি বর্ষিত হউক।" এইরূপে আমি নেককারদের বিনিময় প্রদান করে থাকি। নিঃসন্দেহ, সে আমার মুমিন বান্দাগণের অন্তর্ভুক্ত। আর আমি তাকে ইসহাকের (জন্মের) সুসংবাদ দিলাম, যিনি নবী হবেন এবং নেককারদের অন্তর্ভুক্ত হবেন। আর আমি বরকত প্রদান করলাম তার উপর এবং ইসহাকের ওপর।" (সূরা সাফফাত: ১০০-১১৩)
এই আয়াতগুলিতে ইবরাহীম আ.-এর দুই পুত্রের সুসংবাদের কথা উল্লেখ রয়েছে। প্রথম পুত্রের নাম নেওয়া হয় নাই, শুধু ধৈর্যশীল বালক বলেই তার মহান কুরবানীর ঘটনার আলোচনা করেছেন এবং এরপর- দ্বিতীয় পুত্রের সুসংবাদ নাম নিয়েই প্রদান করলাম, "আমি তাকে ইসহাকের সুসংবাদ প্রদান করলাম।" আর এটা স্বতঃসিদ্ধ কথা, ইবরাহীম আ.-এর দুই পুত্র ইসমাঈল আ. ও ইসহাক আ.-এর মধ্যে ইসমাঈল আ. বয়সে বড় এবং ইসহাক আ. ছোট। অতএব, শেষের আয়াতে যখন ছোট পুত্রের উল্লেখ নাম নিয়েই করে দেওয়া হল, তখন প্রথম আয়াতে ইসমাঈল ছাড়া আর কার আলোচনা হতে পারে? নিঃসন্দেহে তিনি ইসমাঈল আ., যিনি 'ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে সহিষ্ণু পাবেন' বলে এবং "আর তাঁকে মুখমণ্ডলের উপর শোয়ালেন।" কথাটি প্রকাশ করে এবং "তার পরিবর্তন করে দিলাম এক মহান কুরবানীর জন্তু দুম্বা দ্বারা"-এর সম্মান লাভ করলেন। এতদ্ভিন্ন শুধু কুরআন মাজিদই ইসমাঈলকে 'যবাহের পাত্র' বলে না; বরং তাওরাতের এবারতকে গভীর দৃষ্টিতে পাঠ করলে, তাওরাতও এটাই বলে, ইসমাঈল এবং শুধু ইসমাঈলই 'যবাহের পাত্র'।
📄 হযরত ইসমাঈল যাবীহুল্লাহ আ.-এর ঘটনা
আল্লাহ বলেছেন, তাঁর একনিষ্ঠ বন্ধু নবী ইবরাহীম আ. যখন নিজ সম্প্রদায় ও জন্মভূমি ত্যাগ করে যান, তখন তিনি আল্লাহর নিকট একটি নেককার পুত্র সন্তানের দোয়া করলেন। আল্লাহ তাঁকে একজন ধৈর্যশীল পুত্রের সুসংবাদ দান করেন। তিনি হলেন ইসমাঈল আ.। কেননা, তিনিই হলেন প্রথম পুত্র। হযরত ইবরাহীম আ.- এর ৮৬ বছর বয়সে তাঁর জন্ম হয়। এ ব্যাপারে কোনো মতভেদ নেই। (ফেল্যাম্মা বালাগা মা'আহুস সায়্যি) অর্থাৎ 'যখন যুবক হল ও পিতার ন্যায় নিজের কাজকর্ম করার বয়সে পৌঁছল।' মুজাহিদ রহ. এর অর্থ করেছেন: তিনি যখন যুবক হলেন, স্বাধীনভাবে পিতার ন্যায় চেষ্টা-সংগ্রাম ও কাজকর্ম করার উপযোগী হলেন। যখন ইবরাহীম আ. তাঁর স্বপ্ন থেকে বুঝতে পারলেন, আল্লাহ তাঁর পুত্রকে যবেহ করার হুকুম দিয়েছেন। হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে এক মারফু হাদীসে বর্ণিত হয়েছে : রুয়ায়াল আম্বিয়া (নবীদের স্বপ্ন ওহী)। উবায়দ ইবনে উমায়রও এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। এ নির্দেশ ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে ইবরাহীম খলীল আ.-এর প্রতি এক বিরাট পরীক্ষা। কেননা, তিনি এই প্রিয় পুত্রটি পেয়েছিলেন তাঁর বৃদ্ধ বয়সে। তা ছাড়া এ শিশুপুত্র ও তার মাকে এক জনমানবহীন শূন্য প্রান্তরে রেখে এসেছিলেন, যেখানে না ছিল কোনো কৃষি ফসল, না ছিল তরুলতা। ইবরাহীম খলীল আ. আল্লাহর নির্দেশ পালন করলেন। আল্লাহর উপর ভরসা রেখে তাদেরকে সেখানে রেখে আসেন। আল্লাহ তাদেরকে মুক্তির ব্যবস্থা করলেন। এমন উপায়ে পানাহারের ব্যবস্থা করে দিলেন, যা ছিল তাদের ধারণাতীত। এরপর যখন আল্লাহ এই একমাত্র পুত্রধনকে যবেহ করার নির্দেশ দেন, তখন তিনি দ্রুত সে নির্দেশ পালনে এগিয়ে আসেন। ইবরাহীম আ. এ প্রস্তাব তাঁর পুত্রের সামনে পেশ করেন। যাতে এ কঠিন কাজ সহজভাবে ও প্রশান্ত চিত্তে করতে পারেন। চাপ প্রয়োগ করে ও বাধ্য করে যবেহ করার চাইতে এটা ছিল সহজ উপায়। (লালা ইয়া বুনাইয়া ইন্নী আরা ফিল মানামে ইন্নী আদবাহুকা ফানযুর মাযা তারা) ইবরাহীম বলল, 'বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি, তোমাকে আমি যবেহ করছি। এখন তোমার অভিমত কি বল।' ধৈর্যশীল পুত্র পিতার নির্দেশ পালন করার জন্যে খুশি মনে প্রস্তাব গ্রহণ করেন। তিনি বললেন, হে আমার পিতা! আপনি যে ব্যাপারে আদিষ্ট হয়েছেন তা-ই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীলই পাবেন। এ জবাব ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের আন্তরিকতার পরিচায়ক। তিনি পিতার আনুগত্য ও আল্লাহর হুকুম পালনের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন : (ফেল্যাম্মা আসলামা ওয়া তাল্লাহু লিল জাবীন) অর্থাৎ যখন তারা উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করল এবং তার পুত্রকে কাত করে শুইয়ে দিল। এ আয়াতাংশের কয়েকটি অর্থ বলা হয়েছে; (১) তাঁরা উভয়ে আল্লাহর হুকুম পালনের উদ্দেশ্যে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন ও মনোবল দৃঢ় করেন। (২) এখানে পূর্বের কাজ পরে ও পরের কাজ পূর্বে বলা হয়েছে। অর্থাৎ পিতা ইবরাহীম আ. পুত্র ইসমাঈল আ.-কে উপুড় করে শোয়ালেন। (৩) ইবরাহীম আ. পুত্রকে উপুড় করে শোয়ান এ জন্য, যবেহ করার সময় তাঁর চেহারার উপর যাতে দৃষ্টি না পড়ে। ইবনে আব্বাস রাযি. মুজাহিদ, সাঈদ ইবনে জুবায়ের, কাতাদা ও যাহহাক রহ. এ মত পোষণ করেন। (৪) লম্বাভাবে চিৎ করে শায়িত করান, যেমন পণ্ড যবেহ করার সময় শায়িত করানো হয়। এ অবস্থায় কপালের এক অংশ মাটির সাথে লেগে থাকে। ইবরাহীম আ. যবেহ করার জন্য বিসমিল্লাহ ও আল্লাহু আকবার বলেন। আর পুত্র মৃত্যুর জন্যে কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করেন। সুদ্দী রহ. প্রমুখ বলেছেন, হযরত ইবরাহীম আ. গলায় ছুরি চালান কিন্তু তাতে বিন্দুমাত্রও কাটল না। কেউ বলেছেন, গলার নিচে তামার পাত রাখা হয়েছিল। কিন্তু তাতেও কাটা যায় নি। আল্লাহই সম্যক অবগত। (আই ইয়া ইবরাহিম কাদ সাদ্দাক্তার রুয়ায়া) অর্থাৎ ইবরাহীম! তুমি স্বপ্নকে সত্যই পালন করলে; তোমাকে পরীক্ষা করার উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়েছে। তুমি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছ। আল্লাহর নির্দেশ পালন করার জন্যে তোমার আগ্রহ ও আনুগত্য প্রমাণিত হয়েছে। তুমি পুত্রকে কুরবানীর জন্যে পেশ করেছ। যেমন ইতিপূর্বে তুমি আগুনে নিজের দেহকে সমর্পণ করেছিলে এবং মেহমানদের জন্যে প্রচুর অর্থ-সম্পদ ব্যয় করেছিলে। আল্লাহ তাআলা বলেন : (ইন্না হাযা লাহুয়াল বালাউল মুবীন) অর্থাৎ নিশ্চয়ই এ ছিল স্পষ্ট পরীক্ষা। আল্লাহর বাণী: (ওয়াফাদাইনাহু বিজিবহিন আযিম) অর্থাৎ আমি তাকে মুক্তি দিলাম এক মহান কুরবানীর বিনিময়ে। অর্থাৎ একটি সহজ বিনিময় দ্বারা আমি ইবরাহীম আ.-এর পুত্রকে যবেহ করা থেকে মুক্ত করে দিলাম। অধিকাংশ আলেমের মতে, এ বিনিময়টি ছিল শিং বিশিষ্ট একটি সাদা দুম্বা- যাকে ইবরাহীম আ. ছাবীর পর্বতে একটি বাবলা বৃক্ষে বাঁধা অবস্থায় দেখতে পেয়েছিলেন। ইমাম ছাওরী রহ. ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, ঐ দুম্বাটি জান্নাতে চল্লিশ বছর পর্যন্ত বিচরণ করেছিল। সাঈদ ইবনে জুবায়র রাযি. বলেছেন: দুম্বাটি জান্নাতে চরে বেড়াত। এক সময়ে এটা ছাবীর পর্বত ভেদ করে বের হয়ে আসে। তার শরীরে ছিল লাল বর্ণের পশম। ইবনে আব্বাস রাযি. সূত্রে বর্ণিত, শিংযুক্ত একটি দুম্বা ছাবীর পাহাড় থেকে নেমে ইবরাহীম আ.-এর নিকট হেঁটে আসে এবং ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে ডাকতে থাকে। ইবরাহীম আ. তাকে ধরে যবেহ করেন। এই দুম্বাটি হযরত আদম আ.-এর পুত্র হাবিলও কুরবানী করেছিলেন এবং আল্লাহ তা কবুলও করেছিলেন। ইবনে আবী হাতিম রহ. এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। কুরআনে একে 'মহান যবেহ' বলা হয়েছে এবং 'সুস্পষ্ট পরীক্ষা' বলে উল্লেখ করা হয়েছে। হাদীসে দুম্বার কথা বর্ণিত হয়েছে। ইমাম আহমদ রহ. সাফিয়া বিনতে শায়রা রাযি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, বনি সুলাইমের এক মহিলা আমাকে বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উসমান ইবনে তালহাকে ডেকে পাঠান। বর্ণনাকারী উসমান রাযি. কে জিজ্ঞেস করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনাকে কেন সংবাদ দিয়েছিলেন? উসমান রাযি. বললেন, আমি যখন কাবা ঘরে প্রবেশ করি তখন সেই দুম্বার দুটি শিং দেখতে পাই। এটা ঢেকে রাখার জন্যে তোমাকে বলতে আমি ভুলে যাই। তখন তিনি শিং দুটি ঢেকে দেন। কেননা, আল্লাহর ঘরে এমন কিছু থাকা উচিত নয় যা মুসল্লিদের একাগ্রতা বিনষ্ট করে। সুফিয়ান রাযি. বলেছেন, ইবরাহীম আ.-এর দুম্বার শিং দুটি সর্বদা কাবা ঘরে সংরক্ষিত ছিল। যখন খানায়ে কাবায় আগুন লেগে যায় তখন শিং দুটি পুড়ে ভস্ম হয়ে যায়। ইবনে আব্বাস রাযি. সূত্রে বর্ণিত দুম্বাটির মাথা সর্বদা কাবার মীযাবে (কার্ণিশে) ঝুলান থাকত এবং রৌদ্রে তা শুকিয়ে যায়। কেননা, তিনিই মক্কায় বসবাস করতেন। হযরত ইসহাক আ. শিশুকালে মক্কায় এসেছিলেন কিনা আমাদের জানা নেই। আল্লাহই উত্তমরূপে অবগত। কুরআন থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, বরং বলা যায় এ উদ্দেশ্যেই আয়াত নাযিল হয়েছে, ইসমাঈল আ.-ই যাবীহুল্লাহ। কেননা, আল্লাহ কুরআনে প্রথমে যাবিহ-এর ঘটনা উল্লেখ করে পরে বলেছেন: (ওয়াবাশশারনাহু বি-ইসহাকা নাবিয়্যান মিনাস সালিহীন) অর্থাৎ আমি ইবরাহীমকে ইসহাকের সুসংবাদ দিলাম। সে ছিল নবী, সৎকর্মশীলদের একজন। বাক্যটিতে যারা একে ১র্চ বলেছেন, তাদের এরূপ ব্যাখ্যা মনগড়া। ইসহাক আ.- কে যাবীহুল্লাহ বলা ইহুদি চক্রান্ত ছাড়া আর কিছু নয়। তারা তাদের কিতাবে এ স্থানে নিঃসন্দেহে বিকৃত করেছে। তাদের মতে, আল্লাহ ইবরাহীম আ.-কে আদেশ করেন তাঁর একক ও প্রথম পুত্র ইসহাককে যবেহ করতে। ইসহাক শব্দটি এখানে জোর করে ঢুকানো হয়েছে। যা মিথ্যা ও কাল্পনিক। কেননা, ইসহাক আ. একক পুত্রও নন, প্রথম পুত্রও নন। বরং একক ও প্রথম পুত্র ছিলেন ইসমাঈল আ.। ইহুদিরা আরব মুসলমানদের প্রতি হিংসার বশবর্তী হয়ে এমনটি করেছে। কারণ ইসমাঈল আ. হলেন আরবদের পিতৃপুরুষ- যারা হিজাযের অধিবাসী এবং যাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জন্মগ্রহণ করেন। পক্ষান্তরে, ইসহাক আ. হলেন ইয়াকুব আ.- এর পিতা। ইয়াকুব আ.-কে ইসরাঈলও বলা হত। বনি ইসরাঈলরা তাঁর দিকেই নিজেদের সম্পর্কিত করে থাকে। তারা আরবদের এই গৌরব নিজেদের পক্ষে নিতে চেয়েছিল। এ উদ্দেশ্যে তারা আল্লাহর কালাম পরিবর্তন করে এবং মিথ্যা ও বাতিল কথার অনুপ্রবেশ ঘটায়। কিন্তু তারা বুঝল না, সম্মান ও মর্যাদার চাবিকাঠি আল্লাহর হাতে, তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে দান করেন। প্রাচীন আলেমদের একটি দল ইসহাক আ.-কে যাবীহুল্লাহ বলেছেন। তারা এ মত গ্রহণ করেছেন সম্ভবত কাব আহবারের বর্ণনা থেকে, কিংবা আহলে কিতাবদের সহিফা থেকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এ ব্যাপারে কোনো সহি হাদিস বর্ণিত হয় নি। সুতরাং এসব মতামতের দ্বারা আমরা কুরআনের স্পষ্ট বর্ণনাকে ত্যাগ করতে পারি না। কুরআনের বর্ণনা থেকে ইসহাক আ.-কে যাবীহুল্লাহ বলার কোনোই অবকাশ নেই। বরং কুরআন থেকে যা বোঝা যায়- কুরআনের উক্তি ও সুস্পষ্ট বর্ণনা এই, তিনি হলেন ইসমাঈল আ.। মুহাম্মদ ইবনে কাব আল কুরাজি রহ. এ প্রসঙ্গে একটি সুন্দর যুক্তি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যাবীহুল্লাহ হযরত ইসমাঈল আ.; ইসহাক আ. নয়। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেছেন: (ফাবাশশারনাহা বি-ইসহাকা ওয়ামিন ওয়ারায়ে ইসহাকা ইয়াকূব) অর্থাৎ আমি ইবরাহীমের স্ত্রী সারাহকে ইসহাকের এবং ইসহাকের পরে ইয়াকুবের জন্মের সুসংবাদ দিলাম। এখানে ইসহাকের জন্ম হওয়ার এবং তার থেকে পুত্র ইয়াকুবের জন্ম হওয়ার সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই সাথে যদি ইয়াকুব আ.-এর জন্মের পূর্বেই ইসহাক আ.-কে বাল্যকালে যবেহের নির্দেশও দেওয়া হয়, তবে পূর্বের সুসংবাদ আর এ সুসংবাদ থাকে কি করে? বরং এটা হয়ে যায় সুসংবাদের বিপরীত। ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে দুটি মত বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্যে একটি মত উপরের অনুরূপ। কিন্তু তাঁর সঠিক মত ও অধিকাংশ সাহাবা, তাবিঈ ও আলিমদের মতে হযরত ইসমাঈল আ.-ই যাবীহুল্লাহ। মুজাহিদ, সাঈদ, শাবী, ইউসুফ ইবনে মাহরান, আতা প্রমুখ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি হলেন ইসমাঈল আ.। ইবনে জারীর রহ. আতা ইবনে আবি রবাহ রহ.-এর সূত্রে ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেছেন, যার পরিবর্তে দুম্বা যবেহ হয়েছে তিনি হযরত ইসমাঈল আ.। অথচ ইহুদিরা বলে থাকে ইসহাক আ.-এর কথা। এটা তারা মিথ্যা বলে। ইমাম আহমদের পুত্র আবদুল্লাহ রহ. বলেছেন, আমার পিতার মত হলো, যাবীহুল্লাহ হযরত ইসমাঈল আ.। ইবনে আবী হাতিম রহ. বলেন, আমি আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করেছি, যাবীহুল্লাহ.কে? তিনি বলেছেন, যথার্থ কথা হল- তিনি হযরত ইসমাঈল আ.। ইবনে আবী হাতিম রহ. বলেন: হযরত আলী, ইবনে ওমর, আবু হোরায়রা রাযি, আবুত-তুফায়ল, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব, সাঈদ ইবনে জুবায়র, হাসান, মুজাহিদ, শাবী, মুহাম্মদ ইবনে কাব, আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে আলী ও আবু সালেহ সকলেই বলেছেন- যাবীহুল্লাহ হযরত ইসমাঈল আ.। ইমাম বগবী রহ.-ও উপরোক্ত মত রাবী ইবনে আনাস রাযি., কালবী ও আবু আমর ইবনে আলা রাযি. থেকে বর্ণনা করেছেন। হযরত মুআবিয়া রাযি. থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে সম্বোধন করল এভাবে - ইয়া ইবনা যিয যাবিহাতাইন (হে দুই যাবীহার পুত্র!) একথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হেসে দিলেন। উমর ইবনে আবদুল আযীয রহ. ও মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক রহ.-ও এই কথা বলেছেন। হাসান বসরী রহ. বলেন, এ বর্ণনায় কোনো সন্দেহ নেই। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক মুহাম্মদ ইবনে কাব সূত্রে বর্ণনা করেন- তিনি বলেন, উমর ইবনে আবদুল আযীয রহ. যখন খলিফা, তখন আমি সিরিয়ায় ছিলাম। আমি ইসমাঈল আ. যাবীহুল্লাহ হওয়ার পক্ষে খলিফার নিকট দলিল স্বরূপ এই আয়াত পেশ করলাম: (ফাবাশশারনাহা বি-ইসহাকা ওয়ামিন ওয়ারায়ে ইসহাকা ইয়াকূব)। তখন খলিফা উমর ইবনে আবদুল আযীয রহ. বললেন, এটা তো একটা চমৎকার দলীল, এ দিকটা আমি লক্ষ করি নি। এখন দেখছি তুমি যা বলছ তাই সঠিক। এরপর খলিফা সিরিয়ায় বসবাসকারী এক লোককে ডেকে আনতে বলেন। ওই লোকটি পূর্বে ইহুদি ছিল। পরে ইসলাম গ্রহণ করে এবং একজন ভালো মুসলমান হয়। লোকটি ইহুদি সম্প্রদায়ের আলিম ছিল। খলিফা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ইবরাহীম আ.-এর দুই পুত্রের মধ্যে কোন্ পুত্রকে যবেহ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সে বলল, আল্লাহর শপথ ইসমাঈল আ.-কে। আমীরুল মুমিনীন! ইহুদিরা একথা ভালোরূপেই জানে। কিন্তু তারা আরবদের প্রতি হিংসার বশবর্তী হয়ে এমনটি করেছে। কারণ ইসমাঈল আ. হলেন আরবদের পিতৃপুরুষ- যারা হিজাযের অধিবাসী এবং যাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জন্মগ্রহণ করেন। পক্ষান্তরে, ইসহাক আ. হলেন ইয়াকুব আ.- এর পিতা। ইয়াকুব আ.-কে ইসরাঈলও বলা হত। বনি ইসরাঈলরা তাঁর দিকেই নিজেদের সম্পর্কিত করে থাকে। তারা আরবদের এই গৌরব নিজেদের পক্ষে নিতে চেয়েছিল। এ উদ্দেশ্যে তারা আল্লাহর কালাম পরিবর্তন করে এবং মিথ্যা ও বাতিল কথার অনুপ্রবেশ ঘটায়। কিন্তু তারা বুঝল না, সম্মান ও মর্যাদার চাবিকাঠি আল্লাহর হাতে, তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে দান করেন।