📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 সাদুম ও মৃতসাগর

📄 সাদুম ও মৃতসাগর


ওর্দুনের [জর্দানের] যে অঞ্চলে বর্তমানে বাহরে মাইয়্যেত [মৃত সাগর] বা বাহরে লুত অবস্থিত, এখানেই সাদুম ও আমুরা গোত্রদ্বয়ের বস্তিগুলো বিদ্যমান ছিল। এর নিকটবর্তী এলাকার বাসিন্দাগণের বিশ্বাস হল, বর্তমানে সমুদ্ররূপে পরিদৃষ্ট এই সম্পূর্ণ অঞ্চলটি কোনো এককালে শুষ্কভূমি ছিল এবং সেখানে শহর বিদ্যমান ছিল। সামুদ এবং আমুরা সম্প্রদায়গুলোর বসতি ছিল, এই স্থানেই প্রথম হতেই এটা সমুদ্র ছিল না। বরং যখন লূত সম্প্রদায়ের উপর আল্লাহর আযাব আসল এবং সেই ভূ-খণ্ডকে উল্টিয়ে দেওয়া হল এবং ভীষণ ভূমিকম্প আসল, তখন এই ভূখণ্ড চারশ মিটার সমুদ্রের নিচে চলে যায় এবং পানি উপরে উথলিয়ে উঠে, তখন থেকে তা সমুদ্ররূপ ধারণ করে। এজন্য এর নাম মৃত সাগর ও বাহরে লূত হয়েছে। এই বিশ্বাস ঠিক হোক বা ভুল হোক, সর্বাবস্থায় সত্য কথা হল, এই মৃত সাগরের তীরেই সেই ঘটনাটি ঘটেছিল, যা "লূত সম্প্রদায়ের আযাব" নামে অভিহিত। দীর্ঘ দুই বছরের ভূতত্ত্বানুসন্ধান মৃত সাগরের তীরে লূত সম্প্রদায়ের বস্তিসম্মূহের কিছু কিছু ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করে এই জ্ঞান ও বিশ্বাসের সম্মুখে আত্মসমর্পণ করেছেন।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 লুত আ.-এর জাতি

📄 লুত আ.-এর জাতি


লুত আ. সাদুম এলাকায় এসে বসবাস আরম্ভ করল। তারা দেখতে পেল, এখানকার অধিবাসীরা অশ্লীল ও নাফরমানিমূলক কাজে এমনভাবে লিপ্ত যার থেকে সর্বরক্ষক আল্লাহ পাকের দরবারে আশ্রয় কামনা করি। দুনিয়ার এমন কোনো মন্দ কার্য নেই, যা তাদের মধ্যে ছিল না এবং এমন কোনো ভালো কাজ নেই, যা তাদের মধ্যে পাওয়া যেত। দুনিয়ার সকল অবাধ্য, নাফরমান, হীনস্বভাব ও মন্দচরিত্র জাতিগুলোর সমস্ত দোষ এবং অশ্লীল কার্যকলাপ ছাড়াও এ জাতি একটি কলুষিত কাজের আবিষ্কার করেছিল। নিজেদের কামরিপু চরিতার্থ করার জন্য তারা এমনি কুকর্মের উদ্ভাবন করেছিল, তখন পর্যন্ত যার প্রচলন কোথাও কোনো জাতির মধ্যে ছিল না। এ হতভাগ্য জাতির সেই কুকর্মটি লাওয়াতাত নামে খ্যাত। অধিকন্তু তারা নিজেদের এই নির্লজ্জ কুকর্মকে কোনো দোষ মনে করত না বরং প্রকাশ্যভাবে গর্বের সাথে এটা করত। কুরআন পাকে আছে:

ওয়া লূতওয়ান ইজ ক্বলা লিক্বাওমিহী আতা'তূনাল ফা-হিশাতা মা সাবাক্বাকুম বিহা মিন আহাদীম মিনাল আলামীন (৮০) ইন্নাকুম লাতা'তূনাল রিজা-লা শাহওয়াতাম মিন দুনিন নিসা-ই বাল আন্তুম ক্বাওমুম মুসরিফুন (৮১)

আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার বলেন, আমি হিব্রু ভাষার একটি সাহিত্য পুস্তকে তাদের কতিপয় অপকর্মের অবস্থা পাঠ করেছি। তার সারমর্ম হল, সাদুমবাসীদের অভ্যাস ছিল, বহিরাগত ব্যবসায়ী ও বণিকদের পণ্যদ্রব্যকে এক নতুন ও অভিনব পদ্ধতিতে লুণ্ঠন করে নিত। তাদের পদ্ধতি ছিল, বিদেশ হতে কোনো বণিক সাদুমে এসে অবতরণ করলে, তারা মাল দেখার বাহানায় প্রত্যেক ব্যক্তি অল্প অল্প পরিমাণ হাতে উঠিয়ে নিত এবং ঘরে চলে যেত। নিরীহ বণিক বেচারা অস্থির ও পেরেশান হয়ে বসে থাকত। এরপর সে যদি তার পণ্যদ্রব্য খোয়া যাওয়ার অভিযোগ করত এবং কান্নাকাটি আরম্ভ করত, তবে সেই লুণ্ঠনকারীদের মধ্যে দু'-এক জন এসে লুণ্ঠনকৃত দু'-একটি বস্তু দেখিয়ে বলত, ভাই! আমি তো মাত্র এটা নিয়েছিলাম। নাও, এই তোমার মাল। সে ব্যক্তি ভারাক্রান্ত মনে বলত, আমি এটা নিয়ে কি করব? যেখানে আমার সমুদয় মালই লুণ্ঠন হয়েছে, সেখানে এটাও যাক। যাও, এটা তুমিই নিয়ে যাও। এরপর অন্য একজন এসে মামুলি কোনো বস্তু দেখিয়ে তেমনি কথা বলত, যেকথা পূর্বোক্ত ব্যক্তি বলেছে। আর বণিক ব্যক্তিও নেহাৎ ভারাক্রান্ত হয়ে ক্রোধে তাকেও তা-ই বলে দিত। এরূপে বেচারার সম্পূর্ণ মালই লুট করে নিত এবং সওদাগরকে নিঃস্ব করে ভাগিয়ে দিত।

কিতাবটিতে একটি বিচিত্র কাহিনীও উদ্ধৃত আছে। একবার হযরত ইবরাহীম আ. ও হযরত সারাহ এর বাঁদীর পুত্র ইয়ারাযকে সাদুমে পাঠালেন। তিনি যখন বস্তির নিকটে পৌঁছলেন, তখন তাঁকে বিদেশী মনে করে জনৈক সাদুমী তাঁর মাথায় এক খণ্ড প্রস্তর ছুঁড়ে মারল। ইয়ারাযের মাথা থেকে রক্ত ছুটল। তখন সাদুমী ব্যক্তি অগ্রসর হয়ে বলল: আমার প্রস্তরাঘাতে এই যে তোমার মস্তক লালবর্ণ ধারণ করেছে, কাজেই আমাকে তুমি এর বিনিময় দাও। তার এই দাবির জন্য টেনে তাঁকে সাদুমের আদালতে নিয়ে যায়। সাদুমের বিচারক বাদীর জবানবন্দী শুনে বলল, নিশ্চয়ই ইয়ারায সাদুমীকে তার পাথর মারার পারিশ্রমিক দিতে হবে। এটা শুনে ইয়ারায রাগান্বিত হলেন এবং এক খণ্ড পাথর নিয়ে সজোরে বিচারকের মাথায় ছুড়ে মারলেন। এরপর বললেন, এই পাথর মারার জন্য আমি তোমার নিকট পারিশ্রমিক পাওনা হলাম, তা তুমি এই সাদুমীকে দিয়ে দাও। এতটুকু বলেই তিনি সেখান থেকে চলে আসেন।

এ ঘটনা সত্য হোক বা মিথ্যা, এতে প্রতীয়মান হয়, সাদুমবাসীরা ইত্যাকার জুলুম-অন্যায়, অশ্লীল কাজ, নির্লজ্জতা, অসৎচরিত্র এবং নানা প্রকার জঘন্য কাজে লিপ্ত ছিল। তাই সেকালের লোকেরা এ জাতীয় ঘটনাকে তাদের দিকেই সম্বন্ধ করত। হযরত ইবরাহীম আ.-এর জীবদ্দশায় যে-সব বড় বড় ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, তন্মধ্যে লূত আ.-এর সম্প্রদায়ের ঘটনা ও তাদের উপর আল্লাহর আযাবের ঘটনা অন্যতম। ঘটনাটি নিম্নরূপ:

হযরত লূত আ. ছিলেন হারান ইবনে তারেখ এর পুত্র। এই তারেখকেই আযরও বলা হত। যেমনটি পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। হযরত লূত আ. ছিলেন হযরত ইবরাহীম আ.-এর ভাতিজা। ইবরাহীম আ. ছিলেন তিন ভাই। তাঁর দুই ভাইয়ের নাম হারান ও নাজুর। হারানের বংশধরকে বনু হারান বলা হয়। কিন্তু আহলে কিতাবদের ইতিহাস এ মতকে সমর্থন করে না। হযরত লূত আ. চাচা ইবরাহীম খলীল আ.-এর নির্দেশক্রমে গওর যাগার অঞ্চলে সাদুম শহরে চলে যান। এটা ছিল ওই অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র। অনেক গ্রাম, মহল্লা ও ক্ষেত-খামার এবং ব্যবসাকেন্দ্র এ শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত ছিল। এখানকার অধিবাসীরা ছিল দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট, পাপাসক্ত, দুশ্চরিত্র, সঙ্কীর্ণমনা ও জঘন্য কাফের। তারা দস্যুবৃত্তি করত। প্রকাশ্যে অশ্লীল ও বেহায়াপনা কাজ করত। কোনো পাপ থেকেই তারা বিরত থাকত না। অতি নিকৃষ্ট ছিল তাদের কাজ-কারবার। তারা এমন একটি অশ্লীল কাজের জন্ম দেয়, যা ইতোপূর্বে কোনো আদম সন্তান করে নি। তারা নারীদেরকে ত্যাগ করে সমকামিতায় লিপ্ত হতো। হযরত লূত আ. তাদেরকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান জানান এবং এ সব ঘৃণিত অভ্যাস, অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা ত্যাগ করতে বলেন। কিন্তু তারা তাদের ভ্রান্তি, বিদ্রোহ, পাপ ও কুফরের প্রতি অবিচল থাকে। ফলে আল্লাহ তাদের উপর এমন কঠিন আযাব নাযিল করলেন, যা ফেরানোর সাধ্য কারোরই থাকে না। এ শাস্তি ছিল তাদের ধারণা ও কল্পনাতীত। আল্লাহ তাদেরকে সমূলে বিনাশ করে দিলেন। বিবেকবানদের জন্যে এটা শিক্ষনীয় উপাখ্যান হয়ে থাকল। এ কারণেই আল্লাহ তাঁর মহাগ্রন্থ আল- কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এ ঘটনার উল্লেখ করেছেন।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 হযরত লুত আ. সম্পর্কে আল-কোরআন

📄 হযরত লুত আ. সম্পর্কে আল-কোরআন


১. এবং লূতকে পাঠিয়েছিলাম। সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, 'তোমরা এমন কুকর্ম করছ, যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বে কেউ করে নি; তোমরা তো কামতৃপ্তির জন্যে নারীদের ছেড়ে পুরুষের কাছে গমন কর। নিশ্চয় তোমরা সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়।' উত্তরে তার সম্প্রদায় শুধু বলল, 'এদেরকে তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও। এরা তো এমন লোক, যারা অতি পবিত্র হতে চায়।' তারপর তাকে ও তার স্ত্রী ব্যতীত তার পরিজনদেরকে উদ্ধার করেছিলাম। তার স্ত্রী ছিল পিছনে থেকে যাওয়া লোকদের অন্তর্ভুক্ত। তাদের উপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম। সুতরাং অপরাধীদের পরিণাম কি হয়েছিল তা লক্ষ কর! (সূরা আরাফ: ৮০-৮৪)

২. আর অবশ্যই আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ সুসংবাদসহ ইবরাহীম আ.-এর নিকট আসল। তারা বলল, 'সালাম'। সেও বলল, 'সালাম'। সে অবিলম্বে এক ভুনা করা বাছুর আনল। সে যখন দেখল, তাদের হাত সেটির দিকে প্রসারিত হচ্ছে না, তখন তাদেরকে অবাঞ্ছিত মনে করল এবং তাদের সম্বন্ধে তার মনে ভীতি সঞ্চার হল। তারা বলল, 'ভয় করো না, আমরা লুতের জাতির প্রতি প্রেরিত হয়েছি। তখন তার স্ত্রী দাঁড়িয়েছিল এবং সে হাসল। তারপর আমি তাকে ইসহাকের ও ইসহাকের পরবর্তী ইয়াকুবের সুসংবাদ দিলাম। সে বলল, 'কি আশ্চর্য! সন্তানের মা হব আমি যখন বৃদ্ধা এবং এই আমার স্বামী বৃদ্ধ! এটা অবশ্যই এক অদ্ভুত ব্যাপার। তারা বলল, 'আল্লাহর কাজে তুমি বিস্ময় বোধ করছ? হে পরিবারবর্গ! তোমাদের প্রতি রয়েছে আল্লাহর অনুগ্রহ ও কল্যাণ। তিনি নিশ্চয় প্রশংসিত ও মহিমাময়।

তারপর যখন ইবরাহীম আ.-এর ভীতি দূরীভূত হল এবং তার নিকট সুসংবাদ আসল, তখন সে লুতের সম্প্রদায়ের সম্বন্ধে আমার সাথে বাদানুবাদ করতে লাগল। ইবরাহীম আ. তো অবশ্যই সহনশীল। কোমল-হৃদয়, সতত আল্লাহ অভিমুখী। হে ইবরাহীম! এ থেকে বিরত হও। তোমার প্রতিপালকের বিধান এসে পড়েছে। ওদের প্রতি তো আসবে শাস্তি, যা অনিবার্য এবং যখন আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ লুতের নিকট আসল, তখন তাদের আগমনে সে বিষণ্ণ হল এবং নিজেকে তাদের রক্ষায় অসমর্থ মনে করল এবং বলল, 'এটি নিদারুণ দিন' তার সম্প্রদায় তার নিকট উদভ্রান্ত হয়ে ছুটে আসল এবং পূর্ব থেকে তারা কুকর্মে লিপ্ত ছিল।

সে বলল, 'হে আমার সম্প্রদায়! এরা আমার কন্যা, তোমাদের জন্যে এরা পবিত্র। সুতরাং আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার মেহমানদের প্রতি অন্যায় আচরণ করে আমাকে হেয় কর না। তোমাদের মধ্যে কি কোনো ভালো মানুষ নেই? তারা বলল, 'তুমি তো জান, তোমার কন্যাদেরকে আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই, আমরা কি চাই তা তুমি জানই।' সে বলল, তোমাদের উপর যদি আমার শক্তি থাকত অথবা যদি আমি পারতাম কোনো শক্তিশালী আশ্রয়! তারা বলল, হে লুত! আমরা তোমার প্রতিপালক প্রেরিত ফেরেশতা। ওরা কখনই তোমার নিকট পৌঁছতে পারবে না। সুতরাং তুমি রাতের কোনো একসময়ে তোমার পরিবারবর্গসহ বের হয়ে পড় এবং তোমাদের মধ্যে কেউ পেছন দিকে তাকাবে না, তোমার স্ত্রী ব্যতীত। ওদের যা ঘটবে তারও তাই ঘটবে। প্রভাত ওদের জন্যে নির্ধারিতকাল। প্রভাত কি নিকটবর্তী নয়? তারপর যখন আমার আদেশ আসল, তখন আমি জনপদকে উল্টিয়ে দিলাম এবং তাদের উপর ক্রমাগত বর্ষণ করলাম পাথর-কঙ্কর, যা তোমার প্রতিপালকের কাছে চিহ্নিত ছিল। এটি জালিমদের থেকে দূরে নয়। (সূরা হৃদ : ৬৯-৮৩)

৩. এবং ওদেরকে বল, ইবরাহীমের অতিথিদের কথা। যখন ওরা তার কাছে উপস্থিত হয়ে বলল, 'সালাম'। তখন সে বলেছিল, 'আমরা তোমাদের আগমনে আতঙ্কিত।' ওরা বলল, 'ভয় করো না,। আমরা তোমাকে এক জ্ঞানী পুত্রের শুভ সংবাদ দিচ্ছি।' সে বলল, তোমরা কি আমাকে শুভ সংবাদ দিচ্ছ আমি বার্ধক্যগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও? ওরা বলল, 'আমরা সত্য সংবাদ দিচ্ছি। সুতরাং তুমি হতাশ হয়ো না।' সে বলল, যারা পথভ্রষ্ট তারা ব্যতীত আর কে তার প্রতিপালকের অনুগ্রহ হতে হতাশ হয়? সে বলল, 'হে প্রেরিতগণ! তোমাদের আর বিশেষ কি কাজ আছে? ওরা বলল, 'আমাদেরকে এক অপরাধী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে প্রেরণ করা হয়েছে, তবে লূতের পরিবারবর্গের বিরুদ্ধে নয়; আমরা অবশ্যই ওদের সকলকে রক্ষা করব। কিন্তু তার স্ত্রীকে নয়। আমরা স্থির করেছি যে, 'সে অবশ্যই পিছনে রয়ে যাওয়া লোকদের অন্তর্ভুক্ত।

ফেরেশতাগণ যখন লূত পরিবারের কাছে আসল, তখন লূত বলল: তোমরা তো অপরিচিত লোক। তারা বলল, 'না, বরং ওরা যে বিষয়ে সন্দিহান ছিল, আমরা তোমার নিকট তাই নিয়ে এসেছি। আমরা তোমার কাছে সত্য সংবাদ নিয়ে এসেছি এবং অবশ্যই আমরা সত্যবাদী। সুতরাং তুমি রাতের কোনো একসময়ে তোমার পরিবারবর্গসহ বের হয়ে পড় এবং তুমি তাদের পশ্চাদানুসরণ কর এবং তোমাদের মধ্যে কেউ যেন পেছন দিকে না তাকায়। তোমাদেরকে যেখানে যেতে বলা হচ্ছে তোমরা সেখানে চলে যাও। আমি তাকে এ বিষয়ে প্রত্যাদেশ দিলাম যে, প্রত্যুষে ওদেরকে সমূলে বিনাশ করা হবে।

নগরবাসী উল্লাসিত হয়ে উপস্থিত হল। সে বলল, 'ওরা আমার অতিথি! সুতরাং তোমরা আমাকে বে-ইজ্জত করো না। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর ও আমাকে হেয় কর না।' তারা বলল, 'আমরা কি দুনিয়াশুদ্ধ লোককে আশ্রয় দিতে তোমাকে নিষেধ করি নি? লূত বলল, একান্তই যদি তোমরা কিছু করতে চাও, তবে আমার এই কন্যাগণ রয়েছে। তোমার জীবনের শপথ! ওরা তো মত্ততায় বিমূঢ় হয়েছে। তারপর সূর্যোদয়ের সময় মহানাদ তাদের আঘাত করল এবং আমি জনপদকে উল্টিয়ে উপর-নিচ করে দিলাম এবং ওদের উপর প্রস্তর-কঙ্কর বর্ষণ করলাম। অবশ্যই এতে নিদর্শন রয়েছে পর্যবেক্ষণ শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য। তা লোক চলাচলের পথের পাশে এখনও বিদ্যমান। অবশ্যই এতে মুমিনদের জন্যে রয়েছে নিদর্শন। (সূরা হিজর: ৫১-৭৭)

৪. লূতের সম্প্রদায় রাসূলগণকে অস্বীকার করেছিল। যখন ওদের ভাই লূত ওদেরকে বলল, তোমরা কি সাবধান হবে না? আমি তো তোমাদের জন্য এক বিশ্বস্ত রাসূল। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। আমি এর জন্যে তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না। আমার পুরস্কার তো জগতসমূহের প্রতিপালকের কাছেই আছে। সৃষ্টির মধ্যে তোমরা তো কেবল পুরুষের সাথেই উপগত হও এবং তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্যে যে স্ত্রীলোক সৃষ্টি করেছেন, তাদেরকে তোমরা বর্জন করে থাক। বরং তোমরা তো সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়। ওরা বলল, 'হে লূত! তুমি যদি নিবৃত্ত না হও, তবে অবশ্যই তুমি নির্বাসিত হবে।'

লূত বলল, 'আমি তোমাদের এ কাজকে ঘৃণা করি।' হে আমার প্রতিপালক! 'আমাকে এবং আমার পরিবার-পরিজনকে ওরা যা করে, তা থেকে রক্ষা কর।' এরপর আমি তাকে এবং তার পরিবার-পরিজন সকলকে রক্ষা করলাম এক বৃদ্ধা ব্যতীত- যে ছিল পিছনে রয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত। তারপর অপর সকলকে ধ্বংস করলাম। তাদের উপর শাস্তিমূলক বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম। তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছিল। তাদের জন্যে এই বৃষ্টি ছিল কত নিকৃষ্ট! এতে অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে। কিন্তু ওদের অধিকাংশই মুমিন নয়। তোমার প্রতিপালক, তিনি তো পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু। (সূরা শুআরা: ১৬০-১৭৫)

৫. স্মরণ কর! লূতের কথা সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, তোমরা জেনেশুনে কেন অশ্লীল কাজ করছ? অথচ তোমরা এর পরিণতি অবগত। তোমরা কি কাম-তৃপ্তির জন্যে নারীকে ছেড়ে পুরুষে উপগত হবে? তোমরা তো এক অজ্ঞ সম্প্রদায়। উত্তরে তার সম্প্রদায় শুধু বলল, লূত পরিবারকে তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও। এরা তো এমন লোক, যারা পবিত্র সাজতে চায়। তারপর তাকে ও তার পরিবারবর্গকে উদ্ধার করলাম, তার স্ত্রী ব্যতীত। তাকে করেছিলাম ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত। তাদের উপর ভয়ঙ্কর বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম; যাদের ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছিল, তাদের জন্য এই বর্ষণ ছিল কত মারাত্মক! (সূরা নামল: ৫৪-৫৮)

৬. স্মরণ কর লূতের কথা, সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিল 'তোমরা তো এমন অশ্লীল কাজ করছ, যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বে কেউ করে নি। তোমরাই তো পুরুষে উপগত হচ্ছ! তোমরাই তো রাহাজানি করে থাক এবং তোমরাই তো নিজেদের মজলিসে প্রকাশ্যে ঘৃণ্য কাজ করে থাক।" উত্তরে তার সম্প্রদায় শুধু এই বলল, 'আমাদের উপর আল্লাহর শাস্তি নিয়ে এসো যদি তুমি সত্যবাদী হও।' সে বলল, 'হে আমার প্রতিপালক! বিপর্যয় সৃষ্টিকারী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য কর।' যখন আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ সুসংবাদসহ ইবরাহীম আ.-এর কাছে আসল, তারা বলেছিল: আমরা এই জনপদের অধিবাসীদেরকে ধ্বংস করব। এর অধিবাসীরা তো জালিম। ইবরাহীম আ. বলল, এই জনপদে তো লূত আ. রয়েছে। তারা বলল, 'সেখানে কারা আছে তা আমরা ভালো জানি। আমরা তো লূতকে ও তার পরিবার-পরিজনবর্গকে রক্ষা করবই, তবে তার স্ত্রী ব্যতীত। সে তো পিছনে রয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত।

এবং যখন আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ লূতের কাছে আসল, তখন তাদের জন্যে সে বিষণ্ণ হয়ে পড়ল এবং নিজকে রক্ষায় অসমর্থ মনে করল। তারা বলল: ভয় করো না, দুঃখও কর না। আমরা তোমাকে ও তোমার পরিজনবর্গকে রক্ষা করব, তোমার স্ত্রী ব্যতীত। সে তো পিছনে রয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত। আমরা এই জনপদবাসীদের উপর আকাশ থেকে শাস্তি নাযিল করব। কারণ, তারা পাপাচার করেছিল। আমি বোধশক্তি সম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্যে এতে একটি স্পষ্ট নিদর্শন রেখেছি। (সূরা আনকাবূত: ২৮-৩৫)

৭. লূতও ছিল রাসূলগণের একজন। আমি তাকে ও তার পরিবারের সকলকে উদ্ধার করেছিলাম এক বৃদ্ধা ব্যতীত, সে ছিল পেছনে রয়ে যাওয়া লোকদের অন্তর্ভুক্ত। তারপর অবশিষ্টদেরকে আমি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করেছিলাম। তোমরা তো ওদের ধ্বংসাবশেষগুলো অতিক্রম করে থাক সকাল-সন্ধ্যায়। তবুও কি তোমরা অনুধাবন করবে না? (সূরা সাফফাত: ১৩৩-১৩৮)

৮. ইবরাহীম আ. বললেন, 'হে ফেরেশতাগণ! তোমাদের বিশেষ কাজ কী? ওরা বলল, 'আমাদেরকে এক অপরাধী সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরণ করা হয়েছে, ওদের উপর নিক্ষেপ করার জন্যে মাটির শক্ত ঢিল, যা সীমালঙ্ঘনকারীদের জন্যে চিহ্নিত, তোমার প্রতিপালকের কাছ থেকে। সেখানে যে-সব মুমিন ছিল আমি তাদেরকে উদ্ধার করেছিলাম এবং সেখানে একটি পরিবার ব্যতীত কোনো আত্মসমর্পণকারী আমি পাই নি, যারা কঠিন শাস্তিকে ভয় করে, আমি তাদের জন্যে তাতে একটি নিদর্শন রেখেছি। (সূরা যারিয়াত: ৩১-৩৭)

৯. লূত সম্প্রদায় প্রত্যাখ্যান করেছিল সতর্ককারীদেরকে, আমি ওদের উপর পাঠিয়েছিলাম পাথরবাহী প্রচণ্ড ঝড়। কিন্তু লূত পরিবারের উপর নয়। তাদেরকে আমি উদ্ধার করেছিলাম রাতের শেষাংশে আমার বিশেষ অনুগ্রহ স্বরূপ; যারা কৃতজ্ঞ আমি তাদেরকে এভাবেই পুরস্কৃত করে থাকি। লূত ওদেরকে সতর্ক করেছিল আমার কঠোর শাস্তি সম্পর্কে; কিন্তু ওরা সতর্কবাণী সম্বন্ধে বিতণ্ডা শুরু করল। ওরা লূতের কাছ থেকে তার মেহমানদেরকে দাবি করল। তখন আমি ওদের দৃষ্টিশক্তি লোপ করে দিলাম এবং আমি বললাম, 'আস্বাদন কর আমার শাস্তি এবং সতর্কবাণীর পরিণাম। ভোরে বিরামহীন শাস্তি তাদেরকে আঘাত করল এবং আমি বললাম, আস্বাদন কর আমার শাস্তি এবং পরিণাম। আমি কুরাআন সহজ করে দিয়েছি উপদেশ গ্রহণের জন্যে। অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি? (সূরা কামার: ৩৩-৪০)

তাফসীর গ্রন্থে এ সূরার যথাস্থানে এই ঘটনার বিশদ বিবরণ রয়েছে। আল্লাহ তাআলা এভাবেই হযরত লূত আ. ও তাঁর সম্প্রদায়ের ঘটনা কুরআনের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করেছেন। কওমে নূহ, কওমে আদ ও কওমে সামুদ-এর আলোচনায়ও সেসব উল্লেখ আছে। এখন আমরা তাদের কর্মনীতি ও পরিণতি সম্পর্কে কুরআন, হাদীস ও ইতিহাসে বর্ণিত বিষয়াবলী নিয়ে আলোচনা করব। আল্লাহই একমাত্র সাহায্যকারী।

প্রথম কথা হল, হযরত লূত আ. তাঁর সম্প্রদায়কে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান জানান। সেসব অশ্লীল কাজ করতে নিষেধ করেন, যার উল্লেখ স্বয়ং আল্লাহ তাআলা করেছেন। কিন্তু একজন লোকও তার আহ্বানে সাড়া দেয় নি এবং তার উপর ঈমান আনে নি। নিষিদ্ধ কর্ম থেকে কেউ বিরত থাকে নি বরং তারা স্বঅবস্থায় অনড় থাকে। নিজেদের ভ্রষ্টতা ও মূর্খতা থেকে মোটেও বিরত হয় নি। এমনকি তার তারা রাসূলকে তাদের সমাজ থেকে বহিষ্কার করার উদ্যোগ গ্রহণ করে।

তাদের রাসূল যখন তাদেরকে উপদেশ দেন, তখন তারা বিবেকহীনভাবে একই উত্তর দিতে থাকে- তোমার লূত পরিবারকে তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও। কেননা তারা এমন মানুষ, যারা পাক-পবিত্র সাজতে চায়। এ কথার মধ্য দিয়ে তারা লূত পরিবারের নিন্দা করতে গিয়ে নিজেদের চরম শত্রুতা ও ঘৃণা প্রকাশ করে। কিন্তু আল্লাহ হযরত লূত আ.-কে ও তাঁর পরিবারবর্গকে পবিত্র রাখলেন এবং সসম্মানে সেখান থেকে মুক্ত করে আনেন, তবে তার স্ত্রীকে নয়। আর তাঁর সম্প্রদায়ের সবাইকে আপন বাসভূমিতে চিরস্থায়ী করে দিলেন, দুর্গন্ধময় সমুদ্র তরঙ্গের আঘাতে লীন করে। যা ছিল প্রকৃতপক্ষে উত্তপ্ত আগুন ও তাপ প্রবাহ এবং তার পানি তিক্ত ও লবণাক্ত।

তারা নবীকে এরূপ উত্তর তখনই দিয়েছে, যখন তিনি তাদেরকে ইতোপূর্বে বিশ্বের কোনো লোক করে নি, এমনই জঘন্য পাপ ও চরম অশ্লীলতা থেকে নিবৃত্ত থাকতে বলেছেন। এ কারণেই তারা বিশ্ববাসীর জন্যে উদাহরণ ও শিক্ষাপ্রদ হয়ে রয়েছে। এ পাপকর্ম ছাড়াও তারা ছিনতাই, রাহাজানি করত। পথচারীদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করত। প্রকাশ্য মজলিসে বিভিন্ন নির্লজ্জ কথা ও কাজে লিপ্ত হত। যেমন সশব্দে বায়ু ত্যাগ করা। এতে কোনো লজ্জা বোধ করত না। অনেক সময় বড় বড় জঘন্য কাজও করত। কোনো উপদেশদানকারীর উপদেশ ও জ্ঞানী লোকের পরামর্শের প্রতি বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ করত না। এ জাতীয় কাজের মাধ্যমে তারা চতুষ্পদ জন্তুর মতো বরং তার চেয়েও নিকৃষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তারা তাদের বর্তমান কাজ থেকে বিরত থাকে নি, বিগত পাপ থেকে অনুশোচনা করে নি এবং ভবিষ্যতে আত্মসংশোধনের ইচ্ছাও করে নি। ফলে আল্লাহ তাদেরকে শক্ত হাতে পাকড়াও করলেন। তারা যখন হযরত লূত আ.-কে বলেছিল:

ইতিনা বিআজাবিল্লাহি ইন কুন্তুম মিনাস সালিহীন

"তুমি সত্যবাদী হয়ে থাকলে আমাদের জন্যে আল্লাহর আযাব নিয়ে এস!" অর্থাৎ নবী তাদের যে কঠিন আযাবের ভয় দেখাচ্ছিলেন, তারা সেই আযাব কামনা করছিল এবং ভয়াবহ শাস্তির আবেদন জানাচ্ছিল। তখন দয়ালু নবী নিরূপায় হয়ে তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানান। তিনি বিশ্ব প্রভু ও রাসূলগণের ইলাহ- এর নিকট অনাচারী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাহায্য কামনা করেন। ফলে নবীর মর্যাদাহানিতে আল্লাহর ক্রোধের উদ্রেক হয়। নবীর ক্রোধের জন্যে আল্লাহ ক্রোধান্বিত হন। অবশেষে নবীর দোয়া কবুল করেন এবং তাঁর প্রার্থিত বস্তু দান করেন। প্রেরণ করেন আপন দূত ও ফেরেশতাগণকে। তারা আল্লাহর খলীল ইবরাহীম আ.-এর কাছে আগমন করেন। তাকে এক জ্ঞানী পুত্রের সুসংবাদ দেন এবং তারা যে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নিয়ে এসেছেন, সে বিষয়টিও তাঁকে জানান।

ইবরাহীম আ. বলল, হে ফেরেশতাগণ! আপনাদের আগমনের উদ্দেশ্য কী? তারা বলল, আমরা এক অপরাধী সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হয়েছি। যাতে তাদের উপর শক্ত ঢিলা নিক্ষেপ করি, যা সীমালঙ্ঘনকারীদের শাস্তি দেওয়ার জন্যে, আপনার প্রতিপালকের কাছে চিহ্নিত রয়েছে। আল্লাহ বলেন:

ফালাম্মা যাহাবা আন ইবরাহীমার রউউ ওয়া জায়াতহুল বুশরা ইউজাদিলুনা ফী কওমি লূত (৭৪) ইন্না ইবরাহীমা লাহালীমুন আওওয়াহুম মুনীব (৭৫) ইয়া ইবরাহীমু আরিদ আন হাজা ইন্নাহু কদ জায়া আমরু রব্বিকা ওয়া ইন্নাহুম আতিহিম আজাবুন গইরু মরদুদ (৭৬)

"যখন ইবরাহীম আ.-এর ভীতি দূর হল ও সুসংবাদ জানান হল, তখন সে লুতের প্রসঙ্গ নিয়ে আমার সাথে বিতর্ক করা আরম্ভ করল"। কেননা ইবরাহীম আ. আশা করেছিলেন যে, তারা খারাপ পথ পরিহার করে ইসলামের দিকে প্রত্যাবর্তন করবে। "নিশ্চয়ই ইবরাহীম আ. বড়ই ধৈর্যশীল, কোমলহৃদয় ও একনিষ্ঠ ইবাদতকারী। হে ইবরাহীম! এ জাতীয় কথাবার্তা থেকে বিরত থাক। তোমার পালনকর্তার নির্দেশ এসে গেছে এবং তাদের উপর সে আযাব অবশ্যই পতিত হবে।"

অর্থাৎ এ প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে অন্য প্রসঙ্গে কথা বল। কেননা, তাদের ধ্বংস ও নির্মূল করার আদেশ চূড়ান্ত হয়ে গেছে। তোমার পালনকর্তার নির্দেশ এসে গেছে। অর্থাৎ এ ব্যাপারে নির্দেশ হয়ে গেছে। তাঁর এ নির্দেশ ও শাস্তি ফেরানোর ও প্রতিহত করার সাধ্য কারও নেই। এ নির্দেশ অপ্রতিরোধ্যভাবে আসবেই। (সূরা হুদ: ৭৪-৭৬)

সাঈদ ইবনে জুবায়ের, সুদ্দী কাতাদা ও মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক রহ. উল্লেখ করেছেন যে, হযরত ইবরাহীম আ. ফেরেশতাদেরকে বলেছিলেন: আপনারা কি এমন কোনো জনপদ ধ্বংস করবেন, যেখানে তিন শ মুমিন রয়েছে? তারা বললেন, না। তিনি বললেন, যদি দু শ থাকে? তারা বললেন, না। ইবরাহীম আ. বললেন, যদি চল্লিশ জন মুমিন থাকে? তারা বললেন, না। তিনি বললেন, যদি চৌদ্দজন মুমিন থাকে? তারা বললেন, তবুও না।

ইবনে ইসহাক লিখেছেন: এমনকি ইবরাহীম আ. বলেছিলেন: যদি একজন মুমিন থাকে, তবে সেই জনপদ ধ্বংস করার ব্যাপারে আপনাদের অভিমত কি? জবাবে তারা বললেন, তবুও ধ্বংস করা হবে না। তখন তিনি বললেন, সেখানে তো লূত রয়েছে। তারা বলল, ক্বলূ নাহনু আলামু বিমা ফীহা -সেখানে কে আছে, তা আমাদের ভালো জানি।

আহলে কিতাবদের বর্ণনায় এসেছে, ইবরাহীম আ. বলেছিলেন: হে আল্লাহ! লূত সম্প্রদায়ের মধ্যে পঞ্চাশজন সৎকর্মশীল লোক থাকলেও কি আপনি তাদেরকে ধ্বংস করবেন? এভাবে উভয়ের কথোপকথন দশজন পর্যন্ত নেমে আসে। আল্লাহ বলেন, তাদের মধ্যে দশজন সৎকর্মশীল লোক থাকলেও আমি তাদেরকে ধ্বংস করব না। আল্লাহর বাণী:

ওয়ালাম্মা জায়াত রুসুলুনা লূতওয়ান সীআ বিহিতম ওয়া দ্বাক্বা বিহিম যারআও ওয়া ক্বলা হাজা ইয়াওমুন আসীব (৭৭)
আর যখন আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ লূতের কাছে আগমন করল, ...।" (সূরা হুদ: ৭৭)

মুফাসসিরগণ বলেছেন, এই ফেরেশতাগণ ছিলেন জিবরাঈল, মীকাঈল ও ইসরাফীল আ.। তাঁরা ইবরাহীম আ.-এর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসেন এবং সাদুম শহরে এসে উপস্থিত হন। লূত আ.-এর সম্প্রদায়ের পরীক্ষাস্বরূপ এবং তাদের শাস্তিযোগ্য হওয়ার চূড়ান্ত প্রমাণস্বরূপ তাঁরা সুদর্শন তরুণ বেশে হাযির হন। হযরত লূত আ. তাদের দেখে অতিথি মনে করেন। তখন ছিল সূর্য ডোবার সময়। হযরত লূত আ. তাদের দেখে ভীত হলেন। মনে মনে ভাবলেন, যদি তিনি আতিথ্য প্রদান না করেন, তবে অন্য কেউ তা করবে। তিনি তাদেরকে মানুষই ভাবলেন। দুশ্চিন্তা তাঁকে ঘিরে ধরল। তিনি বললেন, আজ একটা বড় কঠিন দিন।

ইবনে আব্বাস রাযি. সূত্রে মুজাহিদ, কাতাদা ও মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক রহ. হযরত লূত আ.-এর এ কঠিন পরীক্ষার বর্ণনা দিয়েছেন। হযরত লূত আ. অন্যান্য সময়ে তাঁর সম্প্রদায়কে নিজের মেহমানদের কাছে ঘেঁষতে নিষেধ করতেন। এ কারণে তারা লূত আ.-এর উপর শর্ত আরোপ করেছিল, তিনি যেন নিজের বাড়িতে কাউকে মেহমান হিসেবে না রাখেন। কিন্তু সেদিন তিনি এমন লোকদেরকেই মেহমানরূপে দেখতে পেলেন, যাদেরকে সরিয়ে দেওয়ার উপায়ও ছিল না।

কাতাদা রহ. বলেন, হযরত লুত আ. নিজের ক্ষেতে কাজ করছিলেন। এমন সময় মেহমানগণ তাঁর কাছে উপস্থিত হন এবং তাঁর বাড়িতে মেহমান হওয়ার আবেদন জানান। তিনি তা প্রত্যাখ্যান করতে লজ্জাবোধ করেন এবং সেখান থেকে তাঁদেরকে সাথে নিয়ে রওনা হন ও তাঁদের আগে আগে হাঁটতে থাকেন। তাঁদের সাথে তিনি এমন ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলতে থাকেন, যাতে তাঁরা এ জনপদ ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যান। হযরত লূত আ. তাঁদেরকে বললেন, হে ভাইয়েরা! এ জনপদের লোকের চেয়ে নিকৃষ্ট ও দুশ্চরিত্র লোক ধরাপৃষ্ঠে আর আছে কি-না আমার জানা নেই। কিছুদূর অগ্রসহ হয়ে তিনি আবার এ কথা উল্লেখ করেন। এভাবে চারবার তাঁদেরকে কথাটি বলেন। কাতাদা রহ. বলেন: ফেরেশতাগণ এ ব্যাপারে আদিষ্ট ছিলেন, যতক্ষণ নবী তাঁর সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য না দিবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁরা যেন তাদেরকে ধ্বংস না করেন।

সুদ্দী রহ. বলেন, ফেরেশতাগণ ইবরাহীম আ.-এর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে লুতের সম্প্রদায়ের উদ্দেশে রওনা হন। দুপুর বেলা তাঁরা সেখানে পৌঁছেন। সাদুম নদীর তীরে উপস্থিত হলে হযরত লূত আ.-এর এক মেয়ের সাথে তাঁদের দেখা হয়। বাড়িতে পানি নেওয়ার জন্যে সে এখানে এসেছিল। লূত আ.-এর ছিল দুই কন্যা। বড়জনের নাম রায়চা এবং ছোট জনের নাম যারাতা। মেয়েটিকে তাঁরা বললেন, এখানে মেহমান হওয়া যায় এমন কারও বাড়ি আছে কি? মেয়েটি বললেন, আপনারা এখানে অপেক্ষা করুন! আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত জনপদে প্রবেশ করবেন না। নিজের সম্প্রদায়ের ব্যাপারে মেয়েটির অন্তরে লোকগুলোর প্রতি করুণার উদ্রেক হয়। বাড়ি এসে মেয়েটি পিতাকে সম্বোর্ডন করে বললেন: পিতা নগর তোরণে কয়েকজন তরুণ আপনার অপেক্ষায় আছেন। তাঁদের মতো সুদর্শন লোক আমি কখনও দেখি নি। আপনার সম্প্রদায়ের লোকেরা তাদেরকে না লাঞ্ছিত করে! ইতঃপূর্বে সম্প্রদায়ের লোকজন হযরত লূত আ.- কে কোনো পুরুষ লোককে মেহমান রাখতে নিষেধ করে দিয়েছিল।

যা হোক! হযরত লূত আ. তাঁদেরকে নিজ বাড়িতে নিয়ে আসেন এবং নিজের পরিবারবর্গের লোকজন ছাড়া আর কেউ বিষয়টি জানতে পারে নি। কিন্তু লুতের স্ত্রী বাড়ি থেকে বের হয়ে জনপদের লোকদের কাছে খবরটি পৌঁছিয়ে দেয়। সে জানিয়ে দেয়, লুতের বাড়িতে এমন কতিপয় সুশ্রী তরুণ এসেছে, যাদের মতো সুন্দর-সুঠাম লোক আর হয় না। তখন লোকজন খুশিতে লূত আ.-এর বাড়ির দিকে ছুটে আসে। আল্লাহর বাণী:

ওয়া মিন ক্ববলু কানূ ইয়ামালুনাস সায়্যিআত "ইতোপূর্বে তারা বিভিন্ন রকম পাপকর্মে লিপ্ত ছিল।" অর্থাৎ বহু বড় বড় গুনাহর সাথে এ জঘন্য পাপ কাজও তারা করত।

কলা ইয়া কওমি হাউলাই বানাতী হুন্না আতহারু লাকুম
সে বলল, 'হে আমার সম্প্রদায়! এরা আমার কন্যা, তোমাদের জন্যে এরা পবিত্র।' এ কথা দ্বারা হযরত লূত আ. তাঁর ধর্মীয় ও দীনী কন্যাদের অর্থাৎ তাদের স্ত্রীদের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। কেননা নবীগণ তাদের উম্মতের জন্যে পিতৃতুল্য। আল্লাহ তাআলা বলেন:

আননাবিয়্যু আওলা বিল মুমিনিনা মিন আনফুসিহিম ওয়া আযওয়াজুহূ উম্মাহাতুহুম
নবী মুমিনদের জন্যে তাদের নিজেদের চেয়েও ঘনিষ্ঠতর আর তাঁর স্ত্রীগণ মুমিনদের মা।

কোনো কোনো সাহাবা ও আলেমের মতে নবী মুমিনদের পিতা। তা ছাড়া তেমনি একটি আয়াতে আছে: আতা'তূনাল জুকরানা মিনাল আলামীন (১৬৫) ওয়া তাযারূনা মা খালাক্বা লাকুম রব্বুকুম মিন আযওয়াজিকুম বাল আন্তুম কওমুন আদূন (১৬৬)

"তোমরা বিশ্বের পুরুষদের কাছে গমন করছ। আর তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্যে যে স্ত্রীকুল সৃষ্টি করেছেন, তাদেরকে পরিত্যাগ করছ! বরং তোমরা এক সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়।"

মুজাহিদ, সাঈদ ইবনে জুবায়র, রাবী ইবনে আনাস, কাতাদা, সুদ্দী ও মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক রহ. আয়াতের অনুরূপ ব্যাখ্যাই করেছেন আর এ ব্যাখ্যাই সঠিক। দ্বিতীয় মতটি অর্থাৎ তাঁর নিজের কন্যাগণ হওয়া ভুল। এটা আহলে কিতাবদের গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত। আর তাদের কিতাবে অনেক বিকৃতি ঘটেছে।

এ ছাড়া তাদের আরেকটি ভুল উক্তি হল, ফেরেশতারা সংখ্যায় ছিলেন দুজন এবং রাত্রে তাঁরা লূত আ.-এর বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া করেন। তদুপরি আহলে কিতাবগণ এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনেক অদ্ভুত মিথ্যা উপখ্যান উদ্ধৃত করেছে। আল্লাহর বাণী: ফাত্তাকুল্লাহ ওয়া লা তুখজুন ফী দইফী আলায়সা মিনকুম রজলুর রশীদ (৭৮)

'অতএব আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার মেহমানদের প্রতি অন্যায় আচরণ করে আমাকে হেয় কর না। তোমাদের মধ্যে কি কোনো ভালো মানুষ নেই?'

হযরত লূত আ. নিজ জাতিকে অশ্লীল কাজ থেকে বারণ করেছেন। তিনি এ সাক্ষ্যও দিচ্ছেন, তাদের সমাজের একজন লোকও সুস্থ রুচির বা ভালো স্বভাবের ছিল না বরং সমাজের সমস্ত লোকই ছিল নির্বোধ, জঘন্য পাপাসক্ত ও নিরেট কাফির। ফেরেশতাগণও চাচ্ছিলেন, সম্প্রদায় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার পূর্বেই নবীর কাছ থেকে তাদের সম্পর্কে তাঁরা কিছু শুনত। কিন্তু সম্প্রদায়ের অভিশপ্ত লোকেরা নবীর উত্তম কথার উত্তরে চরম ঘৃণ্য জবাবই দিল- লাক্কদ আিলমতা মা লানা ফী বানাতিকা মিন হাক্কিও ওয়া ইন্নাকা লাতালামু মা নুরীদের

আপনি ভালো করেই জানেন, আপনার কন্যাদের দিয়ে আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই। আপনি এও জানেন, আমরা কি চাচ্ছি।

তারা বলল: হে লূত! আপনি অবগত আছেন, স্ত্রীদের প্রতি আমাদের কোনো আকর্ষণ নেই। আমাদের উদ্দেশ্য কী, তা আপনি ভালো করেই জানেন। নবীকে উদ্দেশ্য করে তারা এরূপ ঘৃণিত ভাষা ব্যবহার করতে সেই আল্লাহকে একটুও ভয় পায় নি, যিনি কঠিন শাস্তিদাতা। এ কারণে হযরত লূত আ. তাদেরকে বলেছিলেন: লাও আন্না লী বিকুম ক্বুউওয়াতান আও আবী ইলা রুকনিন শাদীদ

অর্থাৎ, হযরত লূত আ. কামনা করেছিলেন সম্প্রদায়কে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা যদি তাঁর থাকত অথবা তাঁকে সাহায্যকারী ধনবল বা জনবল যদি থাকত, তা হলে তাদের অন্যায় দাবির উপযুক্ত শাস্তি তিনি দিতে পারতেন।

ইমাম যুহরী রহ. আবু হোরায়রা রাযি.-এর সূত্রে মারফুরূপে হাদীস বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: সন্দেহ প্রকাশের ব্যাপারে আমরা ইবরাহীম আ.-এর চাইতে বেশি হকদার। আল্লাহ লূত আ.-এর উপর রহম করুন। কেননা তিনি শক্তিশালী অবলম্বনের আশ্রয় প্রার্থনা করেছিলেন। আমি যদি হযরত ইউসুফ আ.-এর মতো এমনই সু-দীর্ঘকাল জেলখানায় অবস্থান করতাম, তবে আমি অবশ্যই আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিতাম।

এ হাদীসখানা আবুয যিনাদ ভিন্ন সূত্রেও বর্ণনা করেছেন আর মুহাম্মদ ইবনে আমর রহ. আবু হোরায়রা রাযি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন, আল্লাহ লূত আ.-এর উপর রহমত বর্ষণ করুন। কেননা তিনি শক্তিশালী অবলম্বন অর্থাৎ আল্লাহর নিকট আশ্রয় কামনা করেছিলেন। এরপর থেকে আল্লাহ যত নবী প্রেরণ করেছেন, তাঁদেরকে নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী করে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর বাণী : ওয়া জায়া আহলুল মাদীনাতি ইয়াস্তাবশিরুন (৬৭) কলা ইন্না হাউলাই দইফী ফালা তাফজাহুন (৬৮) ওয়াত্তাকুল্লাহা ওয়া লা তুখজুন (৬৯) কলু আওয়ালাম নানহাকা আনিল আলামীন (৭০) কলা হাউলাই বানাতী ইন কুন্তুম ফািইলীন (৭১)

হযরত লূত আ. সম্প্রদায়ের লোকজনকে তাদের স্ত্রীদের কাছে যেতে আদেশ দেন এবং তাদের কু-অভ্যাসের উপর অবিচল থাকার মন্দ পরিণতির কথা জানিয়ে দেন, অচিরেই যা তাদের উপর পতিত হবে। কিন্তু কোনো কিছুতেই তারা নিবৃত্ত হল না বরং নবী যতই তাদের উপদেশ দেন, তারা ততই উত্তেজিত হয়ে মেহমানদের কাছে পৌঁছার চেষ্টা করে। কিন্তু রাতের শেষে তাকদীর তাদেরকে কোথায় পৌঁছিয়ে দিবে, তা তাদের আদৌ জানা ছিল না। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবনের কসম করে বলেন: লাআমরুকা ইন্নাহুম লাফী সাকরাতিহিম ইয়ামাহুন তোমার জীবনের শপথ! ওরা তো মত্ততায় বিমূঢ় হয়েছে।

আল্লাহর বাণী: ওয়ালাককদ আনযারাহুম বাতশাতানা ফাতামারও বিন নুযুর (৩৬) ওয়ালাক্কদ রাওয়াদূহু আন দইফিহী ফাতামাসনা আইয়ুনাহুম ফাজুক্কু আজাবী ওয়া নুযুর (৩৭) ওয়ালাক্কদ সাববাহাহুম বুকরাতান আজাবুম মুস্তাক্বির (৩৮)

“লূত আ. ওদেরকে আমার কঠোর শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করেছিল। কিন্তু ওরা সতর্কবাণী সম্বন্ধে বিতণ্ডা শুরু করল। তারা লূতের কাছ থেকে তার মেহমানদেরকে দাবি করল। তখন আমি ওদের দৃষ্টিশক্তি লোপ করে দিলাম এবং আমি বললাম, আস্বাদন কর আমার শাস্তি এবং সতর্কবাণীর পরিণাম। প্রত্যুষে বিরামহীন শাস্তি তাদেরকে আঘাত করল।"

আলেমগণ বলেন: হযরত লূত আ. তাঁর সম্প্রদায়কে তাঁর ঘরে প্রবেশ করতে নিষেধ করেন এবং তাদেরকে বাধা দেন। ঘরের দরজা বন্ধ ছিল। তারা তা খুলে ভিতরে প্রবেশ করতে উদ্যত হল। আর হযরত লূত আ. দরজার বাইরে থেকে তাদেরকে উপদেশ দিতে এবং ভিতরে যেতে বারণ করতে থাকেন। উভয় পক্ষের মধ্যে বাদানুবাদ চলতে থাকে। অবস্থা যখন চরমে গিয়ে পৌঁছাল এবং ঘটনা লূত আ.-এর নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার উপক্রম হল, তখন তিনি বললেন: তোমাদের প্রতিহত করার শক্তি যদি আমার থাকত অথবা কোনো শক্তিশালী অবলম্বনের আশ্রয় নিতে পারতাম, তবে তোমাদেরকে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করতাম। এ সময় ফেরেশতাগণ বললেন,

ইয়া লূতও ইন্না রুসুলু রব্বিকা লাই ইয়াসিলূ ইলাইক "হে লূত! আমরা তোমার প্রতিপালক প্রেরিত ফেরেশতা। ওরা কখনই তোমার কাছে পৌঁছুতে পারবে না।"

মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেন, জিবরাঈল আ. ঘর থেকে বেরিয়ে তাদের সম্মুখে আসেন এবং নিজ ডানার এক প্রান্ত দ্বারা হালকাভাবে তাদের চেহারায় আঘাত করেন। ফলে তাদের দৃষ্টিশক্তি লোপ পেয়ে যায়। কেউ কেউ বলেছেন, তাদের চোখ সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এমনকি চেহারায় চোখের কোনো চিহ্নই অবশিষ্ট থাকে নি। তারপর তারা দেয়াল হাতড়িয়ে কোনোমতে সেখান থেকে ফিরে গেল। সেইসঙ্গে আল্লাহর নবী লূত আ.-কে ধমক দিতে দিতে বলতে থাকে, কাল সকালে আমাদের ও তোমার মধ্যে বোঝাপড়া হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

ওয়ালাক্কদ রাওয়াদূহু আন দইফিহী ফাতামাসনা আইয়ুনাহুম ফাজুক্কু আজাবী ওয়া নুযুর (৩৭) ওয়ালাক্কদ সাববাহাহুম বুকরাতান আজাবুম মুস্তাক্বির
"ওরা লূত আ.-এর কাছ থেকে তার মেহমানদেরকে দাবি করল। তখন আমি তাদের দৃষ্টিশক্তি লোপ করে দিলাম এবং আমি বললাম, এখন আমার শাস্তি ও সর্তকবাণীর পরিণাম আস্বাদন কর। প্রত্যুষে বিরামহীন শাস্তি তাদের উপর আঘাত হানল।"

ফেরেশতাগণ হযরত লূত আ.-এর কাছে দুটি প্রস্তাব পেশ করেন। (১) পরিবার- পরিজন নিয়ে রাতের শেষে রওনা হয়ে যাবেন। (২) কেউ পিছনের দিকে ফিরে তাকাবেন না। অর্থাৎ সম্প্রদায়ের উপর যখন আযাব পতিত হবে এবং আযাবের শব্দ শোনা যাবে, তখন কেউ যেন পশ্চাতে ফিরে না তাকায়। ফেরেশতাগণ আরও জানান, তিনি যেন সকলের পিছনে থেকে সবাইকে পরিচালনা করেন। কুরআনের ইল্লা আমরাআতাকা -এই বাক্যাংশের দুটি অর্থ হতে পারে। যথা-

বি ক্বিতািম মিনাল লাইলি ওয়া লা ইয়ালতাফিত মিনকুম আহাদুন ইল্লা আমরাআতাকা ইন্নাহূ মুসীবুহা মা আসাবাহুম

(১) যাওয়ার সময় তোমার স্ত্রীকে সাথে নিবে না। এ অবস্থায় আমরাআতাকা এর ওপর যবর দিয়ে পড়তে হবে এবং ফাসরি বিআহলিকা থেকে সে ব্যতিক্রমভুক্ত হবে।
(২) যাওয়ার পথে দলের কেউ পিছনের দিকে তাকাবে না; কিন্তু কেবল তোমার স্ত্রীই এ নির্দেশ অমান্য করে পিছনের দিকে তাকাবে। ফলে সম্প্রদায়ের উপর যে আযাব অত্যাসন্ন, ওই আযাবে সে-ও গ্রেফতার হবে। এ অবস্থায় ওয়া লা ইয়ালতাফিত মিনকুম আহাদুন আমরাআতুন থেকে মুসতাসনা (ব্যতিক্রমভুক্ত) হবে। পেশ যুক্ত পাঠ (আমরাআতুন) এ অর্থকে সমর্থন করে। কিন্তু প্রথম অর্থই অধিকতর স্পষ্ট।

সুহায়লী বলেন, লুত আ.-এর স্ত্রীর নাম ওয়ালিহা। আর নূহ আ.-এর স্ত্রীর নাম ওয়ালিগা। আগন্তুক ফেরেশতাগণ ওইসব বিদ্রোহী পাপিষ্ঠ, সীমালঙ্ঘনকারী নির্বোধ অভিশপ্ত সম্প্রদায়কে ধ্বংস করা হবে মর্মে সুসংবাদ শোনান লূত আ.-কে, যারা পরবর্তী যুগের লোকদের জন্যে দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। আল্লাহর বাণী:

ইন্না মাও ইদাহুমুস সুবহা আলায়সাস সুবহু বি ক্বরীব (৮১) "তাদের প্রতিশ্রুত সময় প্রভাতকাল। আর প্রভাতকাল খুব নিকটে নয় কি?"

হযরত লূত আ. নিজ পরিবারবর্গ নিয়ে বের হয়ে আসেন। পরিবারবর্গ বলতে তাঁর দুটি মাত্র কন্যাই ছিল। সম্প্রদায়ের অন্য কোনো একটি লোকও তার সাথে আসে নি। কেউ কেউ বলেছেন, তার স্ত্রীও একই সাথে বের হয়েছিল। কিন্তু সঠিক খবর আল্লাহই ভালো জানেন। তাঁরা যখন সে এলাকা অতিক্রম করে চলে আসেন এবং সূর্য উদিত হয়, তখন আল্লাহর অলঙ্ঘনীয় নির্দেশ ও অপ্রতিরোধ্য আযাব তাদের উপর নেমে আসে। আহলে কিতাবদের মতে ফেরেশতাগণ হযরত লূত আ.-কে তথায় অবস্থিত একটি পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে বলেন। কিন্তু হযরত লূত আ.-এর নিকট তা অত্যন্ত দুঃসাধ্য বলে মনে হয়। তাই তিনি নিকটবর্তী কোনো গ্রামে চলে যাওয়ার প্রস্তাব করেন। ফেরেশতাগণ বললেন, তাই করুন। গ্রামে পৌঁছে সেখানে স্থিত হওয়া পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করব এবং তারপরই আমরা আযাব অবতীর্ণ করব। আহলে কিতাবগণ বলেন, সে মতে হযরত লূত আ. গওরযাগর নামক একটি ছোট গ্রামে চলে যান আর সূর্যোদয়ের সাথে সাথে তাঁর অবাধ্য জাতির উপর আল্লাহর আযাব নেমে আসে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

ফালাম্মা জায়া আমরুনা জাআলনা আলিয়াহা সাফিলাহা ওয়া আমতারনা আলাইহা হিজারতাম মিন সিজ্জীলিম মানদূদ (৮২) মুসাউওয়ামাতান ইনদা রব্বিকা ওয়া মা হিয়া মিনাজ জোয়ালিমীনা বি বাঈদ (৮৩)

"তারপর যখন আমার আদেশ আসল, তখন আমি জনপদকে উল্টিয়ে দিলাম এবং ওদের উপর ক্রমাগত বর্ষণ করলাম পাথর-কঙ্কর, যা তোমার প্রতিপালকের কাছে চিহ্নিত ছিল। এটি জালিমদের থেকে দূরে নয়।"

মুফাসসিরগণ বলেন, হযরত জিবরাঈল আ. আপন ডানার এক প্রান্ত দিয়ে লূত সম্প্রদায়ের আবাসভূমি গভীর নিচ থেকে উপড়ে দেন। মোট সাতটি নগরে তারা বসবাস করত। কারও মতে তাদের সংখ্যা চারশ' কারও মতে চার হাজার। সে এলাকার সমস্ত মানুষ, জীব-জন্তু, ঘরবাড়ি ও ধন-সম্পদ যা কিছু ছিল সব কিছুসহ উঠিয়ে নেওয়া হয়। উপরে আকাশের সীমানা পর্যন্ত উত্তোলন করা হয়। আসমানের এত কাছে নিয়ে যাওয়া হয় যে, সেখানকার ফেরেশতাগণ মোরগের ডাক ও কুকুরের ঘেউ আওয়াজ পর্যন্ত শুনতে পান। তারপর সেখান থেকে উল্টিয়ে নিচে নিক্ষেপ করা হয়।

মুজাহিদ রহ. বলেন: সর্বপ্রথম যা নিচে এসে পতিত হয়, তা হল তাদের উঁচু অট্টালিকাসমূহ (ওয়া আমতারনা আলাইহা হিজারতাম মিন সিজ্জীল) তাদের উপর পাথর বর্ষণ করলাম। সিজ্জীল ফারসী শব্দ, একে আরবিতে রূপান্তর করা হয়েছে। অর্থ, অত্যধিক শক্ত ও কঠিন। মানদূদ অর্থ, ক্রমাগত। অর্থাৎ আকাশ থেকে একের পর এক যা তাদের উপর আসতে থাকে। মুসাউওয়ামাহ অর্থ, চিহ্নিত। প্রতিটি পাথরের গায়ে সেই ব্যক্তির নাম লেখা ছিল, যার উপর তা পতিত হওয়ার জন্যে নির্ধারিত ছিল। আল্লাহ তাআলা বলেছেন : (মুসাউওয়ামাতান ইনদা রব্বিকা লিল মুসরিফীন) তোমার প্রতিপালকের নিকট চিহ্নিত যা সীমালঙ্ঘনকারীদের জন্যে নির্ধারিত। আল্লাহর বাণী:

ওয়া আমতারনা আলাইহিম মাতারান ফাসায়া মাতারুল মুনযারীন তাদের উপর শাস্তিমূলক বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম। যাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছিল, তাদের জন্যে এ বৃষ্টি কতই না নিকৃষ্ট।

আল্লাহর বাণী: ওয়াল মুতফিকাতা আহওয়া (৫৩) ফাগাশশাহা মা গাশশা উৎপাটিত আবাসভূমিকে উল্টিয়ে নিক্ষেপ করেছিলেন। তারপর তা আচ্ছন্ন করে ফেলল কী সর্বগ্রাসী শাস্তি!

অর্থাৎ আল্লাহ সেই জনপদের ভূখণ্ডকে উপরে তুলে নিচের অংশকে উপরে ও উপরের অংশকে নিচে করে উল্টিয়ে দেন। তারপর শক্ত পাথর-কঙ্কর বর্ষণ করেন অবিরামভাবে, যা তাদের সবাইকে ছেঁয়ে ফেলে। প্রতিটি পাথরের ওপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম লেখা ছিল। এ পাথরগুলো উক্ত জনপদে উপস্থিত সকলের উপর পতিত হয়। অনুরূপ যারা তখন সেখানে অনুপস্থিত ছিল অর্থাৎ মুসাফির, পথিক ও দূরে অবস্থানকারী সকলের উপরই তা পতিত হয়।

কথিত আছে, হযরত লূত আ.-এর স্ত্রী তার সম্প্রদায়ের লোকদের সাথে থেকে যায়। আরেক মতে সে তার স্বামী ও দুই কন্যার সাথে বেরিয়ে যায়। কিন্তু যখন সে আযাব ও শহর ধ্বংস হওয়ার শব্দ শুনতে পায়, তখন সে পিছনে সম্প্রদায়ের দিকে ফিরে তাকায় এবং আগে-পরের আল্লাহর সকল নির্দেশ অমান্য করে। 'হায়! আমার সম্প্রদায়' বলে সে বিলাপ করতে থাকে। তখন ওপর থেকে একটি পাথর এসে তার মাথায় পড়ে এবং তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলে। এভাবে সে নিজ সম্প্রদায়ের ভাগ্যের সাথে একীভূত হয়ে যায়। কারণ, সে ছিল তার সম্প্রদায়ের ধর্মে বিশ্বাসী; তাদের সংবাদ সরবরাহকারিণী। হযরত লূত আ.-এর বাড়িতে মেহমান আসলে সম্প্রদায়ের লোকদের কাছে সে সংবাদ পৌছিয়ে দিত। আল্লাহ তাআলা বলেন:

জরাবাল্লাহু মাছালাল লিল্লাজিনা কাফারুমরাআতা নূহিও ওমরাআতা লূত কানাতা তাহতা আবদাইনি মিন ইবাদিনা সালিহায়নি ফাখানাতাহুমা ফালাম ইয়ুগনিয়া আনহুমা মিনাল্লাহি শাইয়াও ওয়া ক্বিলাদখুলান নারা মাআদ দাখিলীন "আল্লাহ কাফেরদের জন্যে নূহ ও লূতের স্ত্রীকে দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন। ওরা ছিল আমার বান্দাগণের মধ্যে দুজন সৎকর্মপরায়ণ বান্দার অধীন। কিন্তু ওরা তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। ফলে নূহ ও লূত তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি থেকে কিছু মাত্র রক্ষা করতে পারল না। তাই ওদেরকে বলা হল, জাহান্নামে প্রবেশকারীদের সাথে তোমরাও ওতে প্রবেশ কর।"

অর্থাৎ তারা নবীদের সাথে দীনের ব্যাপারে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল; নবীর দীন গ্রহণ করে নি। এখানে প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্য কোনো অর্থকে নির্ধারণ করা হয় নি। হযরত ইবনে আব্বাস রাযি.-সহ অন্যান্য প্রবীণ ও পরবর্তীকালের ইমাম ও মুফাসসিরগণ এ কথাই বলেছেন। 'ইফকের ঘটনায় কতিপয় ব্যক্তি হযরত আয়েশা রাযি. এর প্রতি অপবাদ দিলে আল্লাহ তাআলা আয়েশা রাযি.-এর পবিত্রতা ঘোষণা করে যে আয়াত নাযিল করেন, তাতে ওইসব মুমিন লোকদেরকে কঠোরভাবে সর্তক করেন। আল্লাহর বাণী:

ইজ তালাক্কওনাু বিল সিনািতকুম ওয়া তাক্বলূনা বিআফওয়ািকুম মা লাইসা লাকুম বিহী ইলমুও ওয়া তাহসাবুনাু হাইয়্যিনাও ওয়া হুয়া ইনদাল্লাহি আজীম (১৫) ওয়ালাওলা ইজ সামিতুমূহু কুলতুম মা ইয়াকুনু লানা আন নাতাকাল্লামা বি হাজা সুবহানাকা হাজা বুহতানুন আজীম (১৬)

"যখন তোমরা মুখে মুখে এ কথা ছড়াচ্ছিলে এবং এমন বিষয় মুখে উচ্চারণ করছিলে, যার কোনো জ্ঞান তোমাদের ছিল না আর তোমরা একে হালকা বিষয় মনে করছিলে- যদিও আল্লাহর কাছে এটা ছিল গুরুতর; তোমরা যখন এ কথা শুনলে, তখন কেন বললে না 'এ বিষয়ে বলাবলি করা আমাদের উচিত নয়'! আল্লাহ পবিত্র মহান। এ তো এক গুরুতর অপবাদ। (সূরা নূর: ১৫-১৬) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনার নবীর স্ত্রী এ দোষে জড়িত হবে, এ থেকে আপনি পবিত্র।

ওয়া মা হিয়া মিনাজ জোয়ালিমীনা বিবাঈদ (এটি জালিমদের থেকে বেশি দূরে নয়) অর্থাৎ এ শাস্তি বেশি দূরে নয় সেসব লোকদের থেকে, যারা লূত আ.-এর সম্প্রদায়ের মতো কুকর্মে লিপ্ত হবে। এ কারণে কোনো কোনো আলেম বলেছেন, পুরুষের সাথে সমকামিতায় লিপ্ত ব্যক্তিকে 'রজম' বা পাথর নিক্ষেপে হত্যা করা হবে, চাই সে বিবাহিত হোক কিংবা অবিবাহিত। ইমাম শাফিঈ, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. প্রমুখ ইমাম এ মত পোষণ করেন। তাঁরা সেই হাদীস দ্বারাও দলীল প্রদান করেন, যা ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে মুসনাদে আহমদ ও সুনান গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে। তাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: এমন কোনো লোক যদি তোমরা পাও, যে লূত আ.-এর সম্প্রদায়ের অনুরূপ পাপ কাজে লিপ্ত, তখন সংশ্লিষ্ট উভয় ব্যক্তিকেই হত্যা কর। ইমাম আবু হানিফা রহ. বলেন, পুরুষের সাথে সমকামীকে পাহাড়ের ওপর থেকে নিচে ফেলে দিয়ে তার ওপর পাথর নিক্ষেপ করতে হবে, যেভাবে লূতের সম্প্রদায়ের সাথে করা হয়েছিল। তিনি দলীলরূপে নিম্নোক্ত আয়াত পেশ করেছেন :

ওয়া মা হিয়া মিনাজ জোয়ালিমীনা বিবাঈদ (এটা জালিমদের থেকে বেশি দূরে নয়!)

আল্লাহ তাআলা লূত আ.-এর সম্প্রদায়ের গোটা এলাকাকে দুর্গন্ধময় সমুদ্রে পরিণত করেন। ওই সমুদ্রের পানি ও সমুদ্রের পার্শ্ববর্তী এলাকার মাটি ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী। এভাবে স্মরণীয় বিধ্বস্ত এলাকাটি পরবর্তীকালের সেসব মানুষের জন্যে শিক্ষণীয় ও উপদেশ বস্তুতে পরিণত হয়েছে, যারা আল্লাহর অবাধ্য হয়, রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে প্রবৃত্তির অনুসরণ করে ও আপন মনিবের নাফরমানী করে। এ ঘটনায় আরো প্রমাণ হয়, আল্লাহ তাঁর মুমিন বান্দাদেরকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেন এবং তাদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে নিয়ে আসেন। আল্লাহর বাণী :

ফাআখাজাতহুমুস সাবহাতু মুশরিক্বীন (৭৩) ফাজাআলনা আলিয়াহা সাফিলাহা ওয়া আমতারনা আলাইহিম হিজারতাম মিন সিজ্জীল (৭৪) ইন্না ফী যাালিকা লাআইয়াাতিল লিল মুতাওয়াসসিমীন (৭৫) ওয়া ইন্নাহা লাবী সাবীলিম মুক্বীম (৭৬) ইন্না ফী যাালিকা লাআইয়াাতাল লিল মুমিনীন

মুতাওয়াসসিমীন বলা হয় সেসব লোকদেরকে, যারা দূরদর্শী হয়ে থাকে। এখানে দূরদর্শিতার অর্থ হল, এ জনপদটি ও তার বাসিন্দারা আবাদ হওয়া সত্ত্বেও কিভাবে আল্লাহ তা ধ্বংস ও বিধ্বস্ত করে দিলেন, এ বিষয়ে চিন্তা করা। তিরমিযি প্রভৃতি হাদীসগ্রন্থে মারফুরূপে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

"ইত্তাকু ফিরাাসাতাল মু'মিনী ফায়িন্নাহূ ইয়ানজুরু বি নূরিল্লাহ"
মুমিনের দূরদর্শিতাকে তোমরা সমীহ করবে। কেননা সে আল্লাহপ্রদত্ত নূরের সাহায্যে দেখতে পায়।

একথা বলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিম্নোক্ত আয়াত তিলাওয়াত করেন : ইন্না ফী যাালিকা লাআইয়াাতিল লিল মুতাওয়াসসিমীন (দূরদর্শী মুমিনদের জন্যে এতে নিদর্শন রয়েছে।) আল্লাহর বাণী : ওয়া ইন্নাহা লাবী সাবীলিম মুক্বীম (পথের পাশে তা এখনও বিদ্যমান) অর্থাৎ যাতায়াতের চালু পথে ওই জনপদের ধ্বংসাবশেষ এখনো বিদ্যমান রয়েছে। যেমন অপর আয়াতে বলা হয়েছে:

ওয়া ইন্নাকুম লা তামুররূনা আলাইহিম মুসব্বিহীন (১৩৭) ওয়া বিল লাইিল আফালা তাআক্বিলূন (১৩৮) "তোমরা তো তাদের ধ্বংসাবশেষগুলো সকাল-সন্ধ্যায় অতিক্রম করে থাক। তবুও কি তোমরা অনুধাবন করবে না?"

অপর আয়াতে আল্লাহ বলেন: ওয়ালাক্কদ তারাকনা মিনহা আয়াতাম বাইয়্যিনাতাল লিক্বাওমি ইয়াক্বিলূন বোধশক্তিসম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্যে আমি এতে একটি স্পষ্ট নিদর্শন রেখেছি।

আল্লাহর বাণী: ফাআখরাজনা মান কানা ফীহা মিনাল মুমিনীন (৩৫) ফামা ওয়াজাদনা ফীহা গইরা বাইতিম মিনাল মুসলিমীন (৩৬) ওয়া তারাকনা ফীহা আয়াতাল লিল্লাজিনা ইয়াখাফূনাল আজাবাল আলীম (৩৭)

অর্থাৎ লূত আ.-এর সম্প্রদায়ের জনপদটিকে আমি শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণের জন্যে রেখে দিয়েছি সেসব লোকের জন্যে, যারা আখেরাতের আযাবকে ভয় করে। না দেখেই আল্লাহকে ভয় করে, মহান প্রতিপালকের সম্মুখে দণ্ডায়মান হওয়ার ব্যাপারে ভীত সন্ত্রস্ত থাকে, প্রবৃত্তি পরায়ণতা থেকে বিরত থাকে, আল্লাহর নিষিদ্ধ জিনিস থেকে দূরে থাকে, তাঁর নাফরমানী থেকে বেঁচে থাকে এবং লূত আ.-এর সম্প্রদায়ের মতো হওয়ার ব্যাপারে অন্তরে ভয় রাখে। কেননা মান তাশাব্বাহা বি ক্বাওমিন ফাহুওয়া মিনহুম অর্থাৎ যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাথে সাদৃশ্য রাখে, সে তাদের দলভুক্ত। সকল ব্যাপারে পূর্ণ সাদৃশ্য হতে হবে এমন কোনো কথা নেই বরং কোনো কোনো ব্যাপারে সাদৃশ্য থাকলেই হয়। যেমন কেউ কেউ বলেছেন: তোমরা যদি সম্পূর্ণরূপে কওমে লূত না হয়ে থাক, তবে কওমে লূত তোমাদের থেকে খুব বেশি ভিন্ন নয়। অতএব যে লোক জ্ঞানী, বুদ্ধিমান ও আল্লাহভীরু, সে আল্লাহর যাবতীয় নির্দেশ মেনে চলবে এবং রাসূলের আদর্শকে অনুসরণ করবে; অবশ্যই সে হালাল স্ত্রী ও যুদ্ধবন্দী দাসী কেবল ভোগ করবে। শয়তানের পথে চলতে সে ভয় পাবে। অন্যথায় সে শাস্তি পাওয়ার যোগ্য হবে এবং নিম্নোক্ত আয়াতের আওতাভুক্ত হয়ে যাবে-

ওয়া মা হিয়া মিনাজ জোয়ালিমীনা বিবাঈদ (জালিমদের থেকে তা বেশি দূরে নয়।)

উল্লেখ্য, ওপরে উল্লিখিত আয়াতসমূহে হযরত লূত আ.-এর এ বাক্যগুলি রয়েছে: হাউলাই বানাতী হুন্না আতহারু লাকুম। হাউলাই বানাতী ইন কুন্তুম ফািইলীন
"এই আমার কন্যাগণ বিদ্যমান রয়েছে, তারা তোমাদের জন্য পবিত্র।"
"এই আমার কন্যাসমূহ বিদ্যমান রয়েছে, (তাদের প্রতি লক্ষ কর) যদি তোমাদের কিছু (কামরিপু চরিতার্থ) করতে হয়।”

অর্থাৎ হযরত লূত আ. কওমের কোলাহল এবং মেহমানদেরকে তাদের হাতে সোর্পদ করে দেওয়ার দাবিতে অপারগ হয়ে একথা বলেছেন, “তোমরা এ মেহমানদেরকে বিরক্ত কর না। যদি নফসের স্বাভাবিক কামনা পূর্ণ করতে চাও, তবে এই আমার কন্যাগণ বিদ্যমান রয়েছে; এরা তোমাদের জন্য পবিত্র।” একথার অর্থ কি? একজন নিষ্পাপ ও মর্যাদাশালী মানুষ, তিনি আবার নিষ্পাপ কন্যাদেরকে এমন নির্লজ্জ অপবিত্র স্বভাব মানুষদের সম্মুখে পেশ করেছেন? এই প্রশ্নের জবাবে বিজ্ঞ উলামায়ে কেরাম কয়েকটি জবাব দিয়েছেন:

(ক) হযরত লূত আ. ছিলে একজন নবী আর প্রত্যেক নবীই নিজ নিজ সম্প্রদায়ের পিতা হয়ে থাকেন। কওম মুসলমান হয়ে তাঁর অনুসারী হোক কিংবা তাঁকে অবিশ্বাস করে তাঁর থেকে বিমুখ এবং তাঁর অবাধ্যই থাকুক, উভয় অবস্থায়ই তারা সকলে তাঁর উম্মতের অন্তর্ভুক্ত। যদিও বিশ্বাসী অনুসরণকারীরা উম্মতে ইজাবত এবং অবিশ্বাসকারীরা উম্মতে দাওয়াত নামে অভিহিত হয়ে থাকে। এ কারণে সমস্ত উম্মতবৃন্দ আম্বিয়ায়ে কেরামের আওলাদ হয়ে থাকে। নবী ও রাসূল তাদের রূহানী আধ্যাত্মিক পিতা।

সুতরাং হযরত লূত আ.-এর উদ্দেশ্য ছিল, হতভাগার দল! তোমাদের ঘরে ঘরে এইতো আমার কন্যা তোমাদের জীবনসঙ্গিনী রয়েছে এবং তোমাদের জন্য হালাল। তবে তোমরা তাদেরকে ছেড়ে এই অভিশপ্ত কুকর্মে আসক্ত হচ্ছ কেন? এরূপ কর না। নাউযুবিল্লাহ, তাঁর উদ্দেশ্য এরূপ ছিল না, তিনি নিজের ঔরসজাত কন্যাদেরকে তাদের সম্মুখে পেশ করছেন!

(খ) তাওরাত এবং অন্যান্য রেওয়ায়ত দ্বারা জানা যায়, মাত্র তিনজন ফেরেশতাই হযরত ইবরাহীম আ.-কে ইসহাকের সুসংবাদ প্রদান করে লূত-সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার জন্য এসেছিল। সুতরাং মাত্র তিনজনের উদ্দেশ্যে পূর্ণ বস্তির সমস্ত লোক কামাতুর হয়ে দৌড়িয়ে আসা, যাদের সংখ্যা ছিল হাজার হাজার এটা অসম্ভব কথা বরং আসল কথা হল, সেই কওমের দুজন সর্দার ছিল। তারা দুজনেই লূত আ.-এর মেহমানদের তলব করেছিল। কওমের অবশিষ্ট লোকেরা নিজেদের সর্দারদের এই অশ্লীল কাজের সাহায্যার্থে এসে সমবেত হয়েছিল। আর যেহেতু হযরত লূত আ.-এর দুটি কন্যা ছিল অবিবাহিতা, তাই তিনি উক্ত দুই সর্দারদেরকে বুঝালেন, তোমরা তোমাদের এই অপবিত্র ও মন্দ দাবি হতে বিরত হও এবং আমি আমার কন্যা দুটিকে তোমাদের বিবাহ বন্ধনে দান করতে প্রস্তুত আছি। কিন্তু তারা পরিষ্কার অস্বীকার করল এবং বলল, লূত! তুমি জান যে, নারীদের প্রতি আমাদের আগ্রহ নাই।

(গ) হযরত লূত আ. নিঃসন্দেহে এই বাক্যটি নিজের কন্যাদের সম্বন্ধেই বলেছিলেন; কিন্তু এটা সেই বুযুর্গের কথার মতো ছিল, যিনি কোনো উৎপীড়িত ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে উৎপীড়িত হতে দেখে উৎপীড়নকারীকে বললেন: একে মের না! এর পরিবর্তে আমাকে মার। অথচ তিনি খুব ভালো করেই জানেন, সে কখনো এমন দুঃসাহস করবে না। কেননা সে তার চেয়ে কনিষ্ঠ কিংবা তাঁর অধীনস্থ। অতএব যেমনি ওই বুযুর্গের উদ্দেশ্য ছিল, জালিম উৎপীড়নকারীকে লজ্জা দেওয়া, তেমনিভাবে হযরত লূত আ.-ও তাদেরকে লজ্জা দেওয়ার জন্য এবং মন্দ কর্মের ওপর লজ্জিত ও অনুতপ্ত করার জন্য এই বাক্যটি বলেছিলেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, এই হতভাগারা এদিকে আগ্রহও করবে না এবং কার্যতও এরূপ করবে না। ইমাম রাযী, ইস্পাহানী ও আবুস সউদ এ ব্যাখ্যাটিকে পছন্দ করেছেন। আর আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার মিসরীর মতও এটাই। কারো কারো মতে প্রথম মতটিই সুন্দর।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 কয়েকটি উপদেশমূলক দৃষ্টান্ত

📄 কয়েকটি উপদেশমূলক দৃষ্টান্ত


১। মানুষ যখন জ্ঞান ও বিশ্বাসের আলোকে কোনো আকিদা কায়েম করে নেয় আর তা তার অন্তরে বসে তার আত্মার সাথে মিশে যায় এবং তার সীনার মধ্যে প্রস্তরাঙ্কনের মতো দৃঢ়ভাবে অঙ্কিত হয়ে যায়, তখন তার চিন্তা ও কল্পনা, তার ভাবনা ও বিচার এবং তাতে তার মগ্নতা এমনই শক্তিশালী ও সুদৃঢ় হয়ে যায় যে, বিশ্বের কোনো আকস্মিক ঘটনা, কোনো নিদারুন কঠিন বিপদও তাকে তার স্থান হতে একবিন্দু সরাতে পারে না। সে তার জন্য নিশ্চিন্ত মনে আগুনে লাফিয়ে পড়ে, বিনা দ্বিধায় সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং নির্ভয়ে শূলিকাষ্ঠে চড়ে প্রাণ বিসর্জন দেয়। হযরত ইবরাহীম আ.-এর দৃঢ় সংকল্প ও অটলতা এমনই একটি জীবন্ত ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

২। সত্যকে রক্ষা করার জন্য এমন প্রমাণ পেশ করা উচিত, যা শত্রু এবং মিথ্যার পূজকের অন্তরের অন্তঃস্থলে পৌঁছে যায় এবং সে মুখে যদিও সত্যকে স্বীকার না করে; কিন্তু তার অন্তর সত্যকে স্বীকার করতে বাধ্য হয় বরং কোনো কোনো সময় মুখেও ইচ্ছার বিরুদ্ধে সত্য ঘোষণা না করে পারে না। কুরআন মাজীদের আয়াত: ওয়া জাদিলহুম বিল্লাতী হিয়া আহসান “অর্থাৎ বিতর্ক কর উত্তমরূপে” এই অমূল্য তথ্যেরই ঘোষণা করছে।

৩। পয়গম্বর ও রাসূলদের নীতি হল, তারা ঝগড়া ও বিতর্কে তর্কশাস্ত্রের পথে চলেন না। তাদের দলিল ও প্রমাণসমূহের ভিত্তি উপলব্ধি ও চাক্ষুস দর্শনের উপর হয়ে থাকে; কিন্তু সহজবোধ্য যুক্তির ওপর। হযরত ইবরাহীম আ.-এর কওমের সর্বসাধারণের সাথে মূর্তিপূজা ও নক্ষত্রপূজা সম্পর্কিত বিতর্ক এবং নমরূদের সাথে বিতর্ক এর স্পষ্ট ও উজ্জ্বল প্রমাণ।

৪। কোনো সত্য বিষয়কে প্রমাণিত করার জন্য দলীলের মধ্যে বিরোধী পক্ষের ভ্রান্ত আকিদাকে কাল্পনিকভাবে মেনে নেওয়া মিথ্যা বা সেই ভ্রান্ত আকীদা স্বীকার করা নয় বরং তা "শত্রু পক্ষকে পরাভূত করার জন্য সাময়িকভাবে বাতেলকে মেনে নেওয়া" কিংবা 'মাআরীয' বা 'পরোক্ষ ইঙ্গিত' বলা হয়। এরূপ প্রমাণ উপস্থাপন প্রতিপক্ষকে নিজের ভুল স্বীকার করতে বাধ্য করে। হযরত ইবরাহীম আ. সর্বসাধারণের সাথে বিতর্কের ক্ষেত্রে প্রমাণের এই দিকটাই অবলম্বন করেছিলেন, যা মূর্তিপূজকদেরকে স্বীকার করতে বাধ্য করেছিলেন, মূর্তি কোনো অবস্থায়ই শোনেও না জবাবও দিতে পারে না।

৫। যদি কোনো মুসলামানের পিতা-মাতা উভয়েই মুশরিক হয় এবং কোনোক্রমেই শিরক হতে বিরত না হয়, তবে তাদের মুশরেকি জীবন হতে অসন্তুষ্ট এবং পৃথক থেকেও তাদের সাথে দুনিয়াবী কাজ-কারবারে ও আচরণ এবং আখেরাতের উপদেশ ও নসিহত সম্মান ও ইজ্জতের সাথে করা উচিত। কঠোর ও কর্কশ ভাষা ব্যবহার করা অনুচিত। হযরত ইবরাহীম আ.-এর ব্যবহার তাঁর পিতা আযরের সাথে এবং হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কর্মপদ্ধতি চাচা আবু তালেবের সঙ্গে এ বিষয়ে অকাট্য প্রমাণ।

৬। যদি মুমিনের অন্তর বিশুদ্ধ আকিদার উপর নিশ্চিন্তে একইসাথে মুখ ও অন্তরে পূর্ণ ঈমান রাখে, কিন্তু চাক্ষুস জ্ঞান লাভের জন্য কিংবা যথার্থ বিশ্বাসের স্তরে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে কোনো ঈমান বা বিশ্বাসের মাসআলায়ও প্রশ্ন করে অন্তরের তৃপ্তি অন্বষণকারী হয়, তবে এই অন্বেষণ সন্দেহ এবং কুফর নয় বরং প্রকৃত ঈমান। হযরত ইবরাহীম আ.-এর জবাব ওয়া লাকিল লিতাতমাইন ক্বলবী বাক্যটি দ্বারা এই গূঢ়তত্ত্ব পরিষ্কার হয়ে যায়।

৭। দস্তরখানের সম্প্রসারণ যদি রিয়াকারী ও লোক দেখানোর জন্য না হয় এবং প্রকৃতির চাহিদা মাফিক অতিথি সেবায় অন্তরে আনন্দ বোধ হয়, তবে এ দানশীলতায় খুবই ফযিলত থাকে এবং তা বদান্যতা নামে অভিহিত হয়। এই মহৎ গুণটি হযরত ইবরাহীম আ.-এর আত্মার সাথে মিশে গিয়েছিল; এটা ছিল তাঁর প্রকৃতিগত গুণ। অতিথি আপ্যায়ন, দস্তরখানের সম্প্রসারণ, আগন্তুক অতিথিদের সম্মান প্রদর্শন এ জাতীয় গুণগুলি হযরত ইবরাহীম আ.-এর মধ্যে উচ্চস্তরের দৃষ্টান্ত হয়ে গিয়েছিল। কোনো কোনো কিতাবে হযরত ইবরাহীম আ.-এর অতিথি সেবার বর্ণনা প্রসঙ্গে একটি চমৎকার ঘটনা উল্লেখ আছে। একবার নিজের সাধারণ অভ্যাস অনুযায়ী হযরত ইবরাহীম আ.-কোনো অতিথি আগমনের অপেক্ষায় ময়দানে দণ্ডায়মান ছিলেন। কেননা মেহমান ব্যতীত তাঁর দস্তরখানও বিছানো হত না; তিনি আহারও গ্রহণ করতেন না। এমন সময় সামনের দিকে একজন অতি দুর্বল বৃদ্ধ লোককে দেখা গেল। যার কোমর বাঁকা হয়ে গিয়েছিল। সে লাঠির উপর ভর করে অনেক কষ্টে পথ চলছিল। ইবরাহীম আ. সম্মুখে অগ্রসর হলেন এবং আনন্দের সাথে তাকে সাহায্য করে গৃহে নিয়ে আসলেন।

দস্তরখান বিছানো হল। খাদ্যদ্রব্য সাজানো হল। আহার পর্ব সমাপ্ত হলে হযরত ইবরাহীম আ. বললেন, সেই একক আল্লাহর শোকর আদায় কর, যিনি আমাদেরকে এ সমস্ত নেয়ামত দান করেছেন। বৃদ্ধ লোকটি রাগান্বিত হয়ে বলল: আমি জানি না, তোমার একক আল্লাহ কে? আমি আমার মাবুদের (মূর্তির) শোকর আদায় করে থাকি। যা আমার গৃহে রক্ষিত রয়েছে। এ উত্তরটি হযরত ইবরাহীম আ.-এর মনে খুব কষ্ট দিল। তিনি তৎক্ষণাৎ তাকে ঘর হতে বের করে দিলেন। কিন্তু একটু পরেই হযরত ইবরাহীম আ.-এর অন্তরে নিজের এই অশোভনীয় কাজের জন্য অনুশোচনা উদয় হলে তিনি ভাবলেন, যেই একক আল্লাহর শোকর আমি এই লোকটির দ্বারা আদায় করাতে চেয়েছিলাম, তাঁর মহিমা তো এতই, তিনি এ বৃদ্ধকে তার এই সুদীর্ঘ আয়ুষ্কালব্যাপী অনবরত নানাবিধ নেয়ামত প্রদান করে আসছেন; তার মূর্তিপূজা ও কুফরের কারণে তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে এক বেলার জন্যও তার ওপর নিজের রিযিকের দরজা বন্ধ করেন নি। তবে আমার কী অধিকার ছিল, আমার কথা অমান্য করা এবং আল্লাহর বাণী কবুল না করার দরুন রাগান্বিত হয়ে আমি তাকে ঘর থেকে বের করে দিলাম।

ঘটনাটি ঐতিহাসিক দিক থেকে গ্রহণযোগ্য হোক বা না হোক; কিন্তু তা এ সত্যটিই প্রমাণ করছে, হযরত ইবরাহীম আ.-এর বদান্যতা তার উচ্চ সীমায় গিয়ে পৌঁছেছিল। হয়ে গিয়েছিল মানুষের মুখে প্রবাদ বাক্যস্বরূপ। নিঃসন্দেহ তাঁর এ চিন্তা সত্যের পয়গাম এবং ইসলামের দাওয়াতের সর্বোৎকৃষ্ট আদর্শ।

৮। আল্লাহ তাআলা যে সমস্ত মহাপুরুষকে নিজের সত্য প্রচারের জন্য নির্বাচন করে থাকেন তাঁদের সম্মুখে আল্লাহর মহব্বত এবং সততা ব্যতীত অন্য কোনো বস্তু বাকি থাকে না। এ কারণে প্রথম হতেই তাঁদের মধ্যে এই যোগ্যতা প্রদান করা হয়, তাঁরা শৈশবকাল হতেই নিজেদের সমসাময়িকদের মধ্যে বিশিষ্ট ও উজ্জ্বলরূপে পরিদৃষ্ট হন এবং আল্লাহর রাস্তায় সকল পরীক্ষায় আনন্দের সাথে চরম ধৈর্য-সহ্য ও সন্তুষ্টির উত্তম আদর্শ প্রদর্শন করেন। হযরত ইসমাঈল আ.-এর ঘটনাটি এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ ও নেহায়েত শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত।

৯। হযরত লূত আ. যদিও হযরত ইবরাহীম আ.-এর ভ্রাতুষ্পুত্র ছিলেন এবং তাঁর অনুগামীও ছিলেন, সেইসঙ্গে আবার নবুয়তও লাভ করেছিলেন। তাঁকে আল্লাহ পাকের দূত করা হয়েছিল। সুতরাং সাদুম ও আমুরায় সর্বপ্রকারের বিপদ এবং বিদেশে শত্রুদের কবলে নানা প্রকার কষ্ট ভোগ সত্ত্বেও তিনি ধৈর্য ও দৃঢ়তার সাথে কাজ করেছেন। নিজের বুযুর্গ চাচা ও খানদানের সাহায্য চাওয়ার পরিবর্তে শুধু আল্লাহরই ওপর ভরসা রাখতেন। তাঁর আদেশসমূহের সামনে আনুগত্যের প্রমাণ দিয়েছেন। এটাই সান্নিধ্যপ্রাপ্ত আম্বিয়ায়ে কেরামের সম্মান।

ফন্ট সাইজ
15px
17px