📄 হযরত ইবরাহীম আ. ও হযরত ইসমাঈল আ.-এর দু'আ
যখন দেয়াল উঁচু হয়ে গেল, তখন ইসমাঈল আ. ‘মাকামে ইবরাহীম’ নামে প্রসিদ্ধ পাথরটি আনলেন এবং সেখানে রাখলেন। ইবরাহীম আ. এর ওপর দাঁড়িয়ে ইমারত তৈরি করতে লাগলেন আর ইসমাঈল আ. তাঁকে পাথর জোগান দিতে থাকেন। এ সময় তাঁরা উভয়ে নিম্নের দোয়াটি পাঠ করেন:
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
হে আমাদের রব! আমাদের থেকে এ কাজ কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সবকিছু শোনেন ও জানেন। (সূরা বাকারা: ১২৭)
এভাবে তারা দুজনে কাবাঘর নির্মাণ কাজ শেষ করেন এবং কাজ শেষে ঘরের চারদিকে তাওয়াফ করেন এবং উক্ত দুআ পাঠ করেন। ইমাম বুখারী রহ. ইবনে আব্বাস রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন: যখন ইবরাহীম আ. ও তাঁর স্ত্রী সারাহর মধ্যে যা ঘটার ঘটে গেল, তখন তিনি ইসমাঈল আ. ও তাঁর মাকে নিয়ে বের হয়ে যান। তাদের সাথে পানি ভর্তি একটি মশক ছিল।
তারপর ইমাম বুখারী রহ. পূর্বোল্লিখিত ঘটনার অনুরূপ বিবরণ দেন। হাদিসটি ইবনে আব্বাসের উক্তি। এর কিছু অংশ ‘মারফু’ আর কিছু ‘গরীব’ পর্যায়ের। ইবনে আব্বাস রাযি. সম্ভবত ইসরাঈলী বর্ণনা থেকে এগুলো সংগ্রহ করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখ আছে, ইসমাঈল আ. ঐ সময় দুগ্ধপোষ্য শিশু ছিলেন।
তাওরাতপন্থীরা বলেন, আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহীম আ.-কে পুত্র ইসমাঈলসহ সবাইকে খতনার নির্দেশ দেন। তিনি এ নির্দেশ পালন করেন। অন্যদেরও খতনা করান। এ সময় ইবরাহীম আ.-এর বয়স হয়েছিল নিরানব্বই বছর এবং ইসমাঈল আ.-এর বয়স ছিল তের বছর। খতনা করাটা ছিল আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে। এতে প্রতীয়মান হয়, অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হিসেবেই তিনি তা পালন করেন। এ কারণেই ওলামায়ে কেরাম খতনা করা ওয়াজিব বলেছেন। এ মতই সঠিক।
বুখারী শরীফে আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ইবরাহীম আ. আশি বছর বয়সে (ছুঁতারের) বাইসের সাহায্যে নিজের খতনা করেন। আবদুর রহমান ইবনে ইসহাক, আজলান, মুহাম্মদ ইবনে আমর ও ইমাম মুসলিম ভিন্ন ভিন্ন সনদে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। উক্ত বর্ণনায় ব্যবহৃত 'কুদূম' শব্দটির অর্থ, ধারাল অস্ত্র। কেউ কেউ এটি একটি স্থানের নাম বলেছেন।
এ সব হাদিসের শব্দের মধ্যে কিছু কিছু পার্থক্য আছে। ইবনে হিব্বান রহ. আবু হোরায়রা রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : ইবরাহীম আ. একশ বিশ বছর বয়সে খতনা করেন। এর পরও আশি বছর জীবিত থাকেন। এসব বর্ণনায় ইসমাঈল আ.-কে 'যাবীহ' বলে উল্লেখ করা হয় নি। এবং এতে ইবরাহীম আ.-এর তিনবার আগমনের কথা বলা হয়েছে।
প্রথমবার আগমন করেন, যখন হাজেরার মৃত্যু হয় ও ইসমাঈল আ. বিবাহ করেন। শিশুকালে রেখে আসার পর থেকে ইসমাঈল আ.-এর বিবাহ করা পর্যন্ত তিনি আর তাদের খোঁজ-খবর নেন নি। বলা হয়ে থাকে যে, সফরকালে ইবরাহীম আ.-এর জন্যে জমিনের দূরত্ব সঙ্কুচিত হয়ে যেত। কেউ কেউ বলেছেন, তিনি যখন আসতেন তখন বিদ্যুতের গতিসম্পন্ন বাহন বোরাকে চড়ে আসতেন। এ যদি হয়, তা হলে হযরত ইবরাহীম আ. তাদের সংবাদ না নিয়ে কিভাবে দূরে পড়ে থাকতে পারেন? অথচ নিজের পরিজনের সংবাদ রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বিশেষ করে যে অবস্থায় তাদের রেখে এসেছিলেন। এসব ঘটনার কিছু অংশ ইসরাঈলী বর্ণনা থেকে নেওয়া। অবশ্য কিছু আছে মারফু হাদিস থেকে। এতে 'যাবীহ'-এর ঘটনার উল্লেখ নেই। কিন্তু তাফসিরের মধ্যে সূরা সাফফাতে আমরা দলিলসহ উল্লেখ করেছি, 'যাবীহ হলেন হযরত ইসমাঈল আ.।
যখন দেয়াল উঁচু হয়ে গেল, তখন ইসমাঈল আ. ‘মাকামে ইবরাহীম’ নামে প্রসিদ্ধ পাথরটি আনলেন এবং সেখানে রাখলেন। ইবরাহীম আ. এর ওপর দাঁড়িয়ে ইমারত তৈরি করতে লাগলেন আর ইসমাঈল আ. তাঁকে পাথর জোগান দিতে থাকেন। এ সময় তাঁরা উভয়ে নিম্নের দোয়াটি পাঠ করেন:
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
হে আমাদের রব! আমাদের থেকে এ কাজ কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সবকিছু শোনেন ও জানেন। (সূরা বাকারা: ১২৭)
এভাবে তারা দুজনে কাবাঘর নির্মাণ কাজ শেষ করেন এবং কাজ শেষে ঘরের চারদিকে তাওয়াফ করেন এবং উক্ত দুআ পাঠ করেন। ইমাম বুখারী রহ. ইবনে আব্বাস রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন: যখন ইবরাহীম আ. ও তাঁর স্ত্রী সারাহর মধ্যে যা ঘটার ঘটে গেল, তখন তিনি ইসমাঈল আ. ও তাঁর মাকে নিয়ে বের হয়ে যান। তাদের সাথে পানি ভর্তি একটি মশক ছিল।
তারপর ইমাম বুখারী রহ. পূর্বোল্লিখিত ঘটনার অনুরূপ বিবরণ দেন। হাদিসটি ইবনে আব্বাসের উক্তি। এর কিছু অংশ ‘মারফু’ আর কিছু ‘গরীব’ পর্যায়ের। ইবনে আব্বাস রাযি. সম্ভবত ইসরাঈলী বর্ণনা থেকে এগুলো সংগ্রহ করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখ আছে, ইসমাঈল আ. ঐ সময় দুগ্ধপোষ্য শিশু ছিলেন।
তাওরাতপন্থীরা বলেন, আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহীম আ.-কে পুত্র ইসমাঈলসহ সবাইকে খতনার নির্দেশ দেন। তিনি এ নির্দেশ পালন করেন। অন্যদেরও খতনা করান। এ সময় ইবরাহীম আ.-এর বয়স হয়েছিল নিরানব্বই বছর এবং ইসমাঈল আ.-এর বয়স ছিল তের বছর। খতনা করাটা ছিল আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে। এতে প্রতীয়মান হয়, অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হিসেবেই তিনি তা পালন করেন। এ কারণেই ওলামায়ে কেরাম খতনা করা ওয়াজিব বলেছেন। এ মতই সঠিক।
বুখারী শরীফে আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ইবরাহীম আ. আশি বছর বয়সে (ছুঁতারের) বাইসের সাহায্যে নিজের খতনা করেন। আবদুর রহমান ইবনে ইসহাক, আজলান, মুহাম্মদ ইবনে আমর ও ইমাম মুসলিম ভিন্ন ভিন্ন সনদে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। উক্ত বর্ণনায় ব্যবহৃত 'কুদূম' শব্দটির অর্থ, ধারাল অস্ত্র। কেউ কেউ এটি একটি স্থানের নাম বলেছেন।
এ সব হাদিসের শব্দের মধ্যে কিছু কিছু পার্থক্য আছে। ইবনে হিব্বান রহ. আবু হোরায়রা রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : ইবরাহীম আ. একশ বিশ বছর বয়সে খতনা করেন। এর পরও আশি বছর জীবিত থাকেন। এসব বর্ণনায় ইসমাঈল আ.-কে 'যাবীহ' বলে উল্লেখ করা হয় নি। এবং এতে ইবরাহীম আ.-এর তিনবার আগমনের কথা বলা হয়েছে।
প্রথমবার আগমন করেন, যখন হাজেরার মৃত্যু হয় ও ইসমাঈল আ. বিবাহ করেন। শিশুকালে রেখে আসার পর থেকে ইসমাঈল আ.-এর বিবাহ করা পর্যন্ত তিনি আর তাদের খোঁজ-খবর নেন নি। বলা হয়ে থাকে যে, সফরকালে ইবরাহীম আ.-এর জন্যে জমিনের দূরত্ব সঙ্কুচিত হয়ে যেত। কেউ কেউ বলেছেন, তিনি যখন আসতেন তখন বিদ্যুতের গতিসম্পন্ন বাহন বোরাকে চড়ে আসতেন। এ যদি হয়, তা হলে হযরত ইবরাহীম আ. তাদের সংবাদ না নিয়ে কিভাবে দূরে পড়ে থাকতে পারেন? অথচ নিজের পরিজনের সংবাদ রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বিশেষ করে যে অবস্থায় তাদের রেখে এসেছিলেন। এসব ঘটনার কিছু অংশ ইসরাঈলী বর্ণনা থেকে নেওয়া। অবশ্য কিছু আছে মারফু হাদিস থেকে। এতে 'যাবীহ'-এর ঘটনার উল্লেখ নেই। কিন্তু তাফসিরের মধ্যে সূরা সাফফাতে আমরা দলিলসহ উল্লেখ করেছি, 'যাবীহ হলেন হযরত ইসমাঈল আ.।
📄 হযরত ইবরাহীম আ.-এর হাক্কুল ইয়াকীনের অন্বেষণ
মধ্যস্থলে যেহেতু হযরত ইসমাঈল আ. ও হযরত ইসহাক আ.-এর আলোচনা চলে এসেছিল, তাই তাঁদের দুজনের ঘটনাবলী বর্ণনা করে দেওয়া সঙ্গত মনে হল। যাতে ঘটনার ধারাবাহিকতায় রক্ষা হয়। এতদ্ভিন্ন এই ঘটনাগুলিও হযরত ইবরাহীম আ.-এরই যিন্দেগীর সাথে সংশ্লিষ্ট। সুতরাং তার উল্লেখ উপযুক্ত ক্ষেত্রেই হয়েছে। এখন হযরত ইবরাহীম আ.-এর জীবনের অবশিষ্ট অবস্থাবলীর প্রতি মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে।
বস্তুসমূহের স্বরূপ বা মূল তথ্যের অন্বেষণ ও অনুসন্ধান হযরত ইবরাহীম আ.-এর স্বভাবগত রুচি ছিল। তিনি প্রত্যেক বস্তুর তথ্য পর্যন্ত পৌঁছতে চেষ্টা করাকে নিজের জীবনের বিশেষ উদ্দেশ্য মনে করতেন। যাতে তার তথ্যাবলীর দ্বারা একমাত্র সত্তা আল্লাহ সুমহান সত্তা, তাঁর একত্ব এবং তাঁর অসীম ক্ষমতা সম্বন্ধে দিব্য বিশ্বাস লাভের পর বাস্তব বিশ্বাস লাভ করতে পারেন।
হযরত ইবরাহীম আ. পিতা আযর, কওম ও নমরূদের সঙ্গে বিতর্ক করার সময়ে তাঁর এই স্বভাবগত রুচির ভালোরূপে পরিচয় পাওয়া যায়। এ কারণে হযরত ইবরাহীম আ. "মৃত্যুর পর জীবিত হওয়া" সম্বন্ধে আল্লাহ পাকের দরবারে প্রার্থনা জানালেন, "আপনি কেমন করে মৃতদেরকে জীবন দান করবেন, দয়া করে আমাকে একটু দেখিয়ে দিন।” আল্লাহ তাআলা ইবরাহীম আ.-কে বললেন, হে ইবরাহীম! তুমি কি এই বিষয়টির ওপর ঈমান এবং দৃঢ় বিশ্বাস রাখ না? ইবরাহীম আ. তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলেন, কেন রাখব না? আমি নিঃসঙ্কোচে এর ওপর ঈমান রাখছি। কিন্তু আমার এই প্রার্থনা ঈমান ও ইয়াকীনের বিরোধী এই জন্যে নয়, আমি দৃঢ় জ্ঞানমূলক দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে সাথে দিব্য বিশ্বাস এবং বাস্তব বিশ্বাসের প্রার্থী। আমার আকাঙ্ক্ষা, আমাকে দিব্য চক্ষে দেখিয়ে দিন।
মৃত্যুর পরে জীবিত হওয়ার আকৃতি এবং রূপ কী হবে? তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, আচ্ছা যদি তুমি চাক্ষুষ দেখতে চাও, তবে কয়েকটি পাখি আনয়ন কর এবং তাদেরকে খণ্ড খণ্ড করে সামনের পাহাড়ের ওপর রেখে আসো। এরপর দূরে দাঁড়িয়ে তাদেরকে ডাক। হযরত ইবরাহীম আ. তা-ই করলেন। এরপর ইবরাহীম আ. যখন তাদেরকে ডাকলেন, তখন তাদের দেহের খণ্ডগুলি পৃথক পৃথকভাবে তৎক্ষণাৎ নিজেদের আকৃতিতে এসে গেল এবং জীবিত হয়ে হযরত ইবরাহীম আ.-এর নিকট উড়ে চলে আসল। কুরআন মাজীদের সূরা বাকারায় এ ঘটনাটি নিম্নরূপে বর্ণনা করা হয়েছে:
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ أَرِنِي كَيْفَ تُحْيِ الْمَوْتَى قَالَ أَوَلَمْ تُؤْمِنْ قَالَ بَلَى وَلَكِنْ لِيَطْمَئِنَّ قَلْبِي قَالَ فَخُذْ أَرْبَعَةً مِنَ الطَّيْرِ فَصُرُهُنَّ إِلَيْكَ ثُمَّ اجْعَلْ عَلَى كُلِّ جَبَلٍ مِنْهُنَّ جُزْءًا ثُمَّ ادْعُهُنَّ يَأْتِينَكَ سَعْيًا وَاعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
“(স্মরণ করুন) যখন ইবরাহীম বললেন, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে দেখান, আপনি কিভাবে মৃতদিগকে জীবিত করেন? আল্লাহ পাক বললেন, তুমি কি (এ বিষয়ের ওপর) ঈমান রাখ না? ইবরাহীম বললেন, কেন রাখব না? কিন্তু আমার মনের তৃপ্তি চাচ্ছি। আল্লাহ বললেন, তবে চারটি পক্ষী লও এবং এদেরকে খণ্ড খণ্ড করে নিকটস্থ পাহাড়গুলির ওপর তাদের এক এক খণ্ড রেখে দাও। এরপর তাদেরকে ডাক, তারা দৌড়িয়ে তোমার নিকটে চলে আসবে। আর তুমি জেনে রাখ, আল্লাহ তাআলা মহাশক্তিমান প্রজ্ঞাময়।" (সূরা বাকারা: ২৬০)
মধ্যস্থলে যেহেতু হযরত ইসমাঈল আ. ও হযরত ইসহাক আ.-এর আলোচনা চলে এসেছিল, তাই তাঁদের দুজনের ঘটনাবলী বর্ণনা করে দেওয়া সঙ্গত মনে হল। যাতে ঘটনার ধারাবাহিকতায় রক্ষা হয়। এতদ্ভিন্ন এই ঘটনাগুলিও হযরত ইবরাহীম আ.-এরই যিন্দেগীর সাথে সংশ্লিষ্ট। সুতরাং তার উল্লেখ উপযুক্ত ক্ষেত্রেই হয়েছে। এখন হযরত ইবরাহীম আ.-এর জীবনের অবশিষ্ট অবস্থাবলীর প্রতি মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে।
বস্তুসমূহের স্বরূপ বা মূল তথ্যের অন্বেষণ ও অনুসন্ধান হযরত ইবরাহীম আ.-এর স্বভাবগত রুচি ছিল। তিনি প্রত্যেক বস্তুর তথ্য পর্যন্ত পৌঁছতে চেষ্টা করাকে নিজের জীবনের বিশেষ উদ্দেশ্য মনে করতেন। যাতে তার তথ্যাবলীর দ্বারা একমাত্র সত্তা আল্লাহ সুমহান সত্তা, তাঁর একত্ব এবং তাঁর অসীম ক্ষমতা সম্বন্ধে দিব্য বিশ্বাস লাভের পর বাস্তব বিশ্বাস লাভ করতে পারেন।
হযরত ইবরাহীম আ. পিতা আযর, কওম ও নমরূদের সঙ্গে বিতর্ক করার সময়ে তাঁর এই স্বভাবগত রুচির ভালোরূপে পরিচয় পাওয়া যায়। এ কারণে হযরত ইবরাহীম আ. "মৃত্যুর পর জীবিত হওয়া" সম্বন্ধে আল্লাহ পাকের দরবারে প্রার্থনা জানালেন, "আপনি কেমন করে মৃতদেরকে জীবন দান করবেন, দয়া করে আমাকে একটু দেখিয়ে দিন।” আল্লাহ তাআলা ইবরাহীম আ.-কে বললেন, হে ইবরাহীম! তুমি কি এই বিষয়টির ওপর ঈমান এবং দৃঢ় বিশ্বাস রাখ না? ইবরাহীম আ. তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলেন, কেন রাখব না? আমি নিঃসঙ্কোচে এর ওপর ঈমান রাখছি। কিন্তু আমার এই প্রার্থনা ঈমান ও ইয়াকীনের বিরোধী এই জন্যে নয়, আমি দৃঢ় জ্ঞানমূলক দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে সাথে দিব্য বিশ্বাস এবং বাস্তব বিশ্বাসের প্রার্থী। আমার আকাঙ্ক্ষা, আমাকে দিব্য চক্ষে দেখিয়ে দিন।
মৃত্যুর পরে জীবিত হওয়ার আকৃতি এবং রূপ কী হবে? তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, আচ্ছা যদি তুমি চাক্ষুষ দেখতে চাও, তবে কয়েকটি পাখি আনয়ন কর এবং তাদেরকে খণ্ড খণ্ড করে সামনের পাহাড়ের ওপর রেখে আসো। এরপর দূরে দাঁড়িয়ে তাদেরকে ডাক। হযরত ইবরাহীম আ. তা-ই করলেন। এরপর ইবরাহীম আ. যখন তাদেরকে ডাকলেন, তখন তাদের দেহের খণ্ডগুলি পৃথক পৃথকভাবে তৎক্ষণাৎ নিজেদের আকৃতিতে এসে গেল এবং জীবিত হয়ে হযরত ইবরাহীম আ.-এর নিকট উড়ে চলে আসল। কুরআন মাজীদের সূরা বাকারায় এ ঘটনাটি নিম্নরূপে বর্ণনা করা হয়েছে:
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ أَرِنِي كَيْفَ تُحْيِ الْمَوْتَى قَالَ أَوَلَمْ تُؤْمِنْ قَالَ بَلَى وَلَكِنْ لِيَطْمَئِنَّ قَلْبِي قَالَ فَخُذْ أَرْبَعَةً مِنَ الطَّيْرِ فَصُرُهُنَّ إِلَيْكَ ثُمَّ اجْعَلْ عَلَى كُلِّ جَبَلٍ مِنْهُنَّ جُزْءًا ثُمَّ ادْعُهُنَّ يَأْتِينَكَ سَعْيًا وَاعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
“(স্মরণ করুন) যখন ইবরাহীম বললেন, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে দেখান, আপনি কিভাবে মৃতদিগকে জীবিত করেন? আল্লাহ পাক বললেন, তুমি কি (এ বিষয়ের ওপর) ঈমান রাখ না? ইবরাহীম বললেন, কেন রাখব না? কিন্তু আমার মনের তৃপ্তি চাচ্ছি। আল্লাহ বললেন, তবে চারটি পক্ষী লও এবং এদেরকে খণ্ড খণ্ড করে নিকটস্থ পাহাড়গুলির ওপর তাদের এক এক খণ্ড রেখে দাও। এরপর তাদেরকে ডাক, তারা দৌড়িয়ে তোমার নিকটে চলে আসবে। আর তুমি জেনে রাখ, আল্লাহ তাআলা মহাশক্তিমান প্রজ্ঞাময়।" (সূরা বাকারা: ২৬০)
📄 বনি কাতুরা
হযরত ইবরাহীম আ. হযরত সারাহ ও হযরত হাজেরা ছাড়াও অন্য এক বিবাহ করেছিলেন। সেই বিবির নাম ছিল কাতুরা। তাঁর গর্ভ হতে হযরত ইবরাহীম আ.-এর ছয় পুত্র জন্মগ্রহণ করেছিল।
"আর ইবরাহীম আ. আরেকটি বিবাহ করেছিলেন। তাঁর নাম কাতুরা। তাঁর গর্ভ হতে যামরান, ইয়াকসান, মাদ্দান, মাদইয়ান, ইয়াশবাক এবং শাওহা জন্মগ্রহণ করেন। ইয়াকসানের ঔরসে দুই পুত্র ছাবা ও দুওয়া জন্মগ্রহণ করেন। তাদের সন্তান ছিল আসূরী, লাতুসী ও লুওয়াই। আর মাদায়েনের সন্তান ছিল আইফা, গাফার, খায়ুক, আবীদা ও দাআ। এরা ছিলেন বনি কাতুরা বংশের।" (তাওরাত)
হযরত ইবরাহীম আ. হযরত সারাহ ও হযরত হাজেরা ছাড়াও অন্য এক বিবাহ করেছিলেন। সেই বিবির নাম ছিল কাতুরা। তাঁর গর্ভ হতে হযরত ইবরাহীম আ.-এর ছয় পুত্র জন্মগ্রহণ করেছিল।
"আর ইবরাহীম আ. আরেকটি বিবাহ করেছিলেন। তাঁর নাম কাতুরা। তাঁর গর্ভ হতে যামরান, ইয়াকসান, মাদ্দান, মাদইয়ান, ইয়াশবাক এবং শাওহা জন্মগ্রহণ করেন। ইয়াকসানের ঔরসে দুই পুত্র ছাবা ও দুওয়া জন্মগ্রহণ করেন। তাদের সন্তান ছিল আসূরী, লাতুসী ও লুওয়াই। আর মাদায়েনের সন্তান ছিল আইফা, গাফার, খায়ুক, আবীদা ও দাআ। এরা ছিলেন বনি কাতুরা বংশের।" (তাওরাত)
📄 হযরত ইবরাহীম আ.-এর প্রশংসা
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذِ ابْتَلَى إِبْرَاهِيمَ رَبُّهُ بِكَلِمَاتٍ فَأَتَمَّهُنَّ قَالَ إِنِّي جَاعِلُكَ لِلنَّاسِ إِمَامًا قَالَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي قَالَ لَا يَنَالُ عَهْدِي الظَّالِمِينَ
"স্মরণ কর, যখন ইবরাহীম আ.-কে তাঁর প্রতিপালক কয়েকটি কথা দ্বারা পরীক্ষা করেছিলেন এবং সেগুলো সে পূর্ণ করেছিল। আল্লাহ বললেন, আমি তোমাকে মানবজাতির নেতা করছি। সে বলল, আমার বংশধরগণের মধ্য হতেও? আল্লাহ বললেন, আমার প্রতিশ্রুতি জালিমদের প্রতি প্রযোজ্য নয়।" (সূরা বাকারা: ১২৪)
আল্লাহ হযরত ইবরাহীম আ.-কে যেসব কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছিলেন। তিনি সেসব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর আল্লাহ তাঁকে মানব নেতৃত্ব দান করেন। যাতে তারা তাঁর অনুকরণ ও অনুসরণ করতে পারে। ইবরাহীম আ. এ নিয়ামত তাঁর পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে অব্যাহত রাখার জন্যে আল্লাহর নিকট দোয়া করেন। আল্লাহ তাঁর প্রার্থনা শোনেন এবং জানিয়ে দেন, তাঁকে যে নেতৃত্ব দেওয়া হল, তা জালিমরা লাভ করতে পারবে না। এটা কেবল তাঁর সন্তানদের মধ্যে আলিম ও সৎকর্মশীলদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَجَعَلْنَا فِي ذُرِّيَّتِهِ النُّبُوَّةَ وَالْكِتَابَ وَآتَيْنَاهُ أَجْرَهُ فِي الدُّنْيَا وَإِنَّهُ فِي الْآخِرَةِ لَمِنَ الصَّالِحِينَ
আমি ইবরাহীমকে দান করলাম ইসহাক ও ইয়াকুব এবং তার বংশধরদের জন্যে স্থির করলাম নবুয়ত ও কিতাব, আমি তাকে দুনিয়ায় পুরস্কৃত করেছিলাম। আখিরাতেও সে নিশ্চয়ই সৎকর্মশীলদের অন্যতম হবে। (সূরা আন-কাবুত: ২৭)
আল্লাহর বাণী:
وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ كَلَّا هَدَيْنَا وَنُوحًا هَدَيْنَا مِنْ قَبْلُ وَمِنْ ذُرِّيَّতِهِ دَاوُودَ وَسُلَيْمَانَ وَأَيُّوبَ وَيُوسُفَ وَمُوسَى وَهَارُونَ وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ (٨٤) وَزَكَرِيَّا وَيَحْيَى وَعِيسَى وَإِلْيَاسَ كُلٌّ مِنَ الصَّالِحِينَ (٨٥) وَإِسْمَاعِيلَ وَالْيَسَعَ وَيُونُসَ وَلُوطًا وَكُلًّا فَضَّلْنَا عَلَى الْعَالَمِينَ (٨٦) وَمِنْ آبَائِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ وَإِخْوَانِهِمْ وَاجْتَبَيْنَاهُمْ وَهَدَيْنَاهُمْ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ (৮৭)
এবং তাকে দান করেছিলাম ইসহাক ও ইয়াকুব- তাদের প্রত্যেককে সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম; পূর্বে নূহকেও সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম এবং তার বংশধর দাউদ, সুলাইমান, আইয়ুব, ইউসুফ, মূসা ও হারূনকেও। আর এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করি এবং যাকারিয়া, ইয়াহইয়া, ঈসা এবং ইলয়াসকেও; আর এভাবেই সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম, এরা সকলেই ছিলেন নেককার। আরও সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম ইসমাঈল, আলইয়াসাআ, ইউনুস ও লূতকে এবং শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছিলাম বিশ্বজগতের ওপর প্রত্যেককে এবং এদের পিতৃপুরুষ, বংশধর এবং ভ্রাতৃবৃন্দের কতককে, তাদেরকে মনোনীত করেছিলাম এবং সরল পথে পরিচালিত করেছিলাম। (সূরা আনআম: ৮৪-৮৭)
প্রসিদ্ধ মতে (وَمِنْ ذُرِّيَّتِهِ) (তাঁর বংশধরদের) বলতে এখানে হযরত ইবরাহীম আ.-কে বুঝান হয়েছে। হযরত লূত আ. যদিও হযরত ইবরাহীম আ.-এর ভাতিজা তবুও অন্যদের প্রাধান্য হেতু তাঁকেও বংশধর হিসাবে বলা হয়েছে। অপর একদল আলিমের মতে 'তাঁর' বলতে হযরত নূহ আ.-কে বুঝান হয়েছে। পূর্বে আমরা নূহ আ.-এর আলোচনায় এ বিষয়ের উল্লেখ করেছি। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
আল্লাহর বাণী: وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحًا وَإِبْرَاهِيمَ وَجَعَلْنَا فِي ذُرِّيَّতِهِمَا النُّবُوَّةَ وَالْكِتَابَ فَمِنْهُمْ مُهْتَدٍ وَكَথিরুন مِنْهُمْ فَاسِقُونَ
আমি নূহ এবং ইবরাহীমকে রাসূলরূপে প্রেরণ করেছিলাম এবং তাদের বংশধরগণের জন্যে স্থির করেছিলাম নবুওয়াত ও কিতাব। (সূরা হাদিদ: ২৬)
হযরত ইবরাহীম আ.-এর পরে আসমান থেকে যত কিতাব যত নবীর ওপর নাযিল হয়েছে, তাঁরা সকলেই নিশ্চিতভাবে তাঁর বংশধরদের অন্তর্ভুক্ত। এটা এমন একটা সম্মান, যার কোনো তুলনা হয় না। এমন একটা সুমহান মর্যাদা যার তুল্য আর কিছুই নেই। কারণ, হযরত ইবরাহীম আ.-এর ঔরসে দুই মহান পুত্র-সন্তানের জন্ম হয়। হাজেরার গর্ভে ইসমাঈল আ. এবং সারাহর গর্ভে ইসহাক আ.। ইসহাক আ.-এর পুত্র ইয়াকুব আ.। তাঁর অপর নাম ছিল ইসরাঈল। পরবর্তী বংশে এত বিপুল সংখ্যক নবীর আগমন ঘটে, যাদের সঠিক সংখ্যা তাঁদেরকে প্রেরণকারী আল্লাহ ব্যতীত আর কেউই জানেন না।
অব্যাহতভাবে এ বংশেই নবী-রাসূলগণ আসতে থাকেন এবং হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম আ. পর্যন্ত পৌঁছে সে ধারার সমাপ্তি ঘটে। অর্থাৎ ঈসা ইবনে মারইয়াম আ. ইসরাঈল বংশের শেষ নবী। অপরদিকে হযরত ইসমাঈল আ.-এর সন্তানগণ আরবের বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত হয়ে আরবভূমিতেই বসবাস করতে থাকেন। তাঁর সন্তানদের মধ্যে সর্বশেষ নবী খাতামুল আম্বিয়া, বনী আদমের শ্রেষ্ঠ সন্তান, দুনিয়া ও আখিরাতের গৌরব নবী মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশিম আল কুরায়শী আল মক্কী ওয়াল মাদানী ছাড়া অন্য কোনো নবীর আগমন ঘটে নি। তিনিই হলেন সেই মহামানব যাঁর দ্বারা সমগ্র মানবজাতি গৌরবান্বিত। আদি-অন্ত সকল মানুষের ঈর্ষার পাত্র। সহি মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: سَأَقُومُ مَقَامًا يَرْغَبُ إِلَيَّ الْخَلْقُ كُلُّهُمْ ، حَتَّى إِبْرَاهِيمُ
"আমি এমন এক মর্যাদাপূর্ণ স্থানে প্রতিষ্ঠিত হব, আমার কাছে পৌঁছার জন্যে প্রত্যেকেই লালায়িত হবে; এমনকি ইবরাহীম আ.-ও।"
এ বাক্যের দ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রকারান্তরে হযরত ইবরাহীম আ.-এর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এ থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরে অন্য সব মানুষের মধ্যে দুনিয়া ও আখিরাতে হযরত ইবরাহীম আ.-ই শ্রেষ্ঠ মানুষ ও সম্মানিত পুরুষ।
ইমাম বোখারি রহ. হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাসান রাযি.-কে কোলে নিয়ে বলতেন: আমি তোমাদের দুই ভাইয়ের জন্যে সেরূপ আশ্রয় চাই, যেরূপ আশ্রয় চেয়েছিলেন তোমাদের আদি পিতা ইবরাহীম আ. ইসমাঈল ও ইসহাকের জন্যে। আমি আশ্রয় চাই আল্লাহর পরিপূর্ণ কালাম দ্বারা প্রত্যেক শয়তান ও বিষাক্ত সরীসৃপ থেকে এবং প্রত্যেক ক্ষতিকর চোখের দৃষ্টি থেকে। সুনান হাদিসের গ্রন্থকারগণও মানসূর রহ. সূত্রে এ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذِ ابْتَلَى إِبْرَاهِيمَ رَبُّهُ بِكَلِمَاتٍ فَأَتَمَّهُنَّ قَالَ إِنِّي جَاعِلُكَ لِلنَّاسِ إِمَامًا قَالَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي قَالَ لَا يَنَالُ عَهْدِي الظَّالِمِينَ
"স্মরণ কর, যখন ইবরাহীম আ.-কে তাঁর প্রতিপালক কয়েকটি কথা দ্বারা পরীক্ষা করেছিলেন এবং সেগুলো সে পূর্ণ করেছিল। আল্লাহ বললেন, আমি তোমাকে মানবজাতির নেতা করছি। সে বলল, আমার বংশধরগণের মধ্য হতেও? আল্লাহ বললেন, আমার প্রতিশ্রুতি জালিমদের প্রতি প্রযোজ্য নয়।" (সূরা বাকারা: ১২৪)
আল্লাহ হযরত ইবরাহীম আ.-কে যেসব কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছিলেন। তিনি সেসব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর আল্লাহ তাঁকে মানব নেতৃত্ব দান করেন। যাতে তারা তাঁর অনুকরণ ও অনুসরণ করতে পারে। ইবরাহীম আ. এ নিয়ামত তাঁর পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে অব্যাহত রাখার জন্যে আল্লাহর নিকট দোয়া করেন। আল্লাহ তাঁর প্রার্থনা শোনেন এবং জানিয়ে দেন, তাঁকে যে নেতৃত্ব দেওয়া হল, তা জালিমরা লাভ করতে পারবে না। এটা কেবল তাঁর সন্তানদের মধ্যে আলিম ও সৎকর্মশীলদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَجَعَلْنَا فِي ذُرِّيَّتِهِ النُّبُوَّةَ وَالْكِتَابَ وَآتَيْنَاهُ أَجْرَهُ فِي الدُّنْيَا وَإِنَّهُ فِي الْآخِرَةِ لَمِنَ الصَّالِحِينَ
আমি ইবরাহীমকে দান করলাম ইসহাক ও ইয়াকুব এবং তার বংশধরদের জন্যে স্থির করলাম নবুয়ত ও কিতাব, আমি তাকে দুনিয়ায় পুরস্কৃত করেছিলাম। আখিরাতেও সে নিশ্চয়ই সৎকর্মশীলদের অন্যতম হবে। (সূরা আন-কাবুত: ২৭)
আল্লাহর বাণী:
وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ كَلَّا هَدَيْنَا وَنُوحًا هَدَيْنَا مِنْ قَبْلُ وَمِنْ ذُرِّيَّতِهِ دَاوُودَ وَسُلَيْمَانَ وَأَيُّوبَ وَيُوسُفَ وَمُوسَى وَهَارُونَ وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ (٨٤) وَزَكَرِيَّا وَيَحْيَى وَعِيسَى وَإِلْيَاسَ كُلٌّ مِنَ الصَّالِحِينَ (٨٥) وَإِسْمَاعِيلَ وَالْيَسَعَ وَيُونُসَ وَلُوطًا وَكُلًّا فَضَّلْنَا عَلَى الْعَالَمِينَ (٨٦) وَمِنْ آبَائِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ وَإِخْوَانِهِمْ وَاجْتَبَيْنَاهُمْ وَهَدَيْنَاهُمْ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ (৮৭)
এবং তাকে দান করেছিলাম ইসহাক ও ইয়াকুব- তাদের প্রত্যেককে সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম; পূর্বে নূহকেও সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম এবং তার বংশধর দাউদ, সুলাইমান, আইয়ুব, ইউসুফ, মূসা ও হারূনকেও। আর এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করি এবং যাকারিয়া, ইয়াহইয়া, ঈসা এবং ইলয়াসকেও; আর এভাবেই সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম, এরা সকলেই ছিলেন নেককার। আরও সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম ইসমাঈল, আলইয়াসাআ, ইউনুস ও লূতকে এবং শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছিলাম বিশ্বজগতের ওপর প্রত্যেককে এবং এদের পিতৃপুরুষ, বংশধর এবং ভ্রাতৃবৃন্দের কতককে, তাদেরকে মনোনীত করেছিলাম এবং সরল পথে পরিচালিত করেছিলাম। (সূরা আনআম: ৮৪-৮৭)
প্রসিদ্ধ মতে (وَمِنْ ذُرِّيَّتِهِ) (তাঁর বংশধরদের) বলতে এখানে হযরত ইবরাহীম আ.-কে বুঝান হয়েছে। হযরত লূত আ. যদিও হযরত ইবরাহীম আ.-এর ভাতিজা তবুও অন্যদের প্রাধান্য হেতু তাঁকেও বংশধর হিসাবে বলা হয়েছে। অপর একদল আলিমের মতে 'তাঁর' বলতে হযরত নূহ আ.-কে বুঝান হয়েছে। পূর্বে আমরা নূহ আ.-এর আলোচনায় এ বিষয়ের উল্লেখ করেছি। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
আল্লাহর বাণী: وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحًا وَإِبْرَاهِيمَ وَجَعَلْنَا فِي ذُرِّيَّতِهِمَا النُّবُوَّةَ وَالْكِتَابَ فَمِنْهُمْ مُهْتَدٍ وَكَথিরুন مِنْهُمْ فَاسِقُونَ
আমি নূহ এবং ইবরাহীমকে রাসূলরূপে প্রেরণ করেছিলাম এবং তাদের বংশধরগণের জন্যে স্থির করেছিলাম নবুওয়াত ও কিতাব। (সূরা হাদিদ: ২৬)
হযরত ইবরাহীম আ.-এর পরে আসমান থেকে যত কিতাব যত নবীর ওপর নাযিল হয়েছে, তাঁরা সকলেই নিশ্চিতভাবে তাঁর বংশধরদের অন্তর্ভুক্ত। এটা এমন একটা সম্মান, যার কোনো তুলনা হয় না। এমন একটা সুমহান মর্যাদা যার তুল্য আর কিছুই নেই। কারণ, হযরত ইবরাহীম আ.-এর ঔরসে দুই মহান পুত্র-সন্তানের জন্ম হয়। হাজেরার গর্ভে ইসমাঈল আ. এবং সারাহর গর্ভে ইসহাক আ.। ইসহাক আ.-এর পুত্র ইয়াকুব আ.। তাঁর অপর নাম ছিল ইসরাঈল। পরবর্তী বংশে এত বিপুল সংখ্যক নবীর আগমন ঘটে, যাদের সঠিক সংখ্যা তাঁদেরকে প্রেরণকারী আল্লাহ ব্যতীত আর কেউই জানেন না।
অব্যাহতভাবে এ বংশেই নবী-রাসূলগণ আসতে থাকেন এবং হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম আ. পর্যন্ত পৌঁছে সে ধারার সমাপ্তি ঘটে। অর্থাৎ ঈসা ইবনে মারইয়াম আ. ইসরাঈল বংশের শেষ নবী। অপরদিকে হযরত ইসমাঈল আ.-এর সন্তানগণ আরবের বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত হয়ে আরবভূমিতেই বসবাস করতে থাকেন। তাঁর সন্তানদের মধ্যে সর্বশেষ নবী খাতামুল আম্বিয়া, বনী আদমের শ্রেষ্ঠ সন্তান, দুনিয়া ও আখিরাতের গৌরব নবী মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশিম আল কুরায়শী আল মক্কী ওয়াল মাদানী ছাড়া অন্য কোনো নবীর আগমন ঘটে নি। তিনিই হলেন সেই মহামানব যাঁর দ্বারা সমগ্র মানবজাতি গৌরবান্বিত। আদি-অন্ত সকল মানুষের ঈর্ষার পাত্র। সহি মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: سَأَقُومُ مَقَامًا يَرْغَبُ إِلَيَّ الْخَلْقُ كُلُّهُمْ ، حَتَّى إِبْرَاهِيمُ
"আমি এমন এক মর্যাদাপূর্ণ স্থানে প্রতিষ্ঠিত হব, আমার কাছে পৌঁছার জন্যে প্রত্যেকেই লালায়িত হবে; এমনকি ইবরাহীম আ.-ও।"
এ বাক্যের দ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রকারান্তরে হযরত ইবরাহীম আ.-এর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এ থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরে অন্য সব মানুষের মধ্যে দুনিয়া ও আখিরাতে হযরত ইবরাহীম আ.-ই শ্রেষ্ঠ মানুষ ও সম্মানিত পুরুষ।
ইমাম বোখারি রহ. হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাসান রাযি.-কে কোলে নিয়ে বলতেন: আমি তোমাদের দুই ভাইয়ের জন্যে সেরূপ আশ্রয় চাই, যেরূপ আশ্রয় চেয়েছিলেন তোমাদের আদি পিতা ইবরাহীম আ. ইসমাঈল ও ইসহাকের জন্যে। আমি আশ্রয় চাই আল্লাহর পরিপূর্ণ কালাম দ্বারা প্রত্যেক শয়তান ও বিষাক্ত সরীসৃপ থেকে এবং প্রত্যেক ক্ষতিকর চোখের দৃষ্টি থেকে। সুনান হাদিসের গ্রন্থকারগণও মানসূর রহ. সূত্রে এ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন।