📘 কাসাসুল আম্বিয়া > 📄 হাজেরার গর্ভে ইসমাঈল আ.-এর জন্ম

📄 হাজেরার গর্ভে ইসমাঈল আ.-এর জন্ম


আহলে কিতাবদের বর্ণনা মতে হযরত ইবরাহীম আ. আল্লাহর নিকট সুসন্তানের জন্য দুআ করেন। আল্লাহ তাঁকে এ বিষয়ে সুসংবাদ দানও করেন। কিন্তু এরপর বায়তুল মুকাদ্দাসে তাঁর বিশটি বছর অতিবাহিত হয়ে যায়। এ সময় একদিন সারাহ হযরত ইবরাহীম আ.-কে বললেন, আমাকে তো আল্লাহ সন্তান থেকে বঞ্চিত রেখেছেন। সুতরাং আপনি আমার বাঁদীর সাথে মিলিত হন। তার গর্ভে আল্লাহ আমাকে একটা সন্তান দিতেও পারেন। সারাহ হাজেরাকে ইবরাহীমের জন্যে হেবা করে দিলে ইবরাহীম আ. তাঁর সাথে মিলিত হন। তাতে হাজেরা সন্তান-সম্ভবা হন।

এতে আহলে কিতাবগণ বর্ণনা করে থাকেন, হাজেরা অনেকটা গৌরববোধ করেন এবং আপন মনিব সারাহর তুলনায় নিজেকে ভাগ্যবতী বলে মনে করতে থাকেন। সারাহর মধ্যে আত্মমর্যাদা বোধ জাগ্রত হয়। তিনি এ সম্পর্কে ইবরাহীম আ.-এর নিকট অভিযোগ করেন। জবাবে ইবরাহীম আ. বললেন, "তার ব্যাপারে তুমি যে কোনো পদক্ষেপ নিতে চাও নিতে পার।” এতে হাজেরা শঙ্কিত হয়ে পলায়ন করেন এবং অদূরেই এক কূপের নিকটে অবতরণ করেন। সেখানে জনৈক ফেরেশতা তাঁকে বলে দেন, তুমি ভয় পেয় না; যে সন্তান তুমি ধারণ করেছ, আল্লাহ তাকে গৌরবময় করবেন।

ফেরেশতা তাঁকে বাড়িতে ফিরে যেতে বলেন এবং সুসংবাদ দেন, তুমি পুত্র-সন্তান প্রসব করবে। তাঁর নাম রাখবে ইসমাঈল। সে হবে এক অনন্য সাধারণ ব্যক্তিত্ব। সকল লোকের উপর তাঁর প্রভাব থাকবে এবং অন্য সবাই তাঁর দ্বারা শক্তির প্রেরণা পাবে। সে তার ভাইদের কর্তৃত্বাধীন সমস্ত এলাকার অধিকারী হবে। এসব শুনে হাজেরা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন। এই সুসংবাদ হযরত ইবরাহীম আ.-এর অধঃস্তন সন্তান মুহাম্মদ এর ক্ষেত্রে পূর্ণমাত্রায় প্রযোজ্য। কেননা গোটা আরব জাতি তার দ্বারা গৌরবের অধিকারী হয়। পূর্ব-পশ্চিমের সমস্ত এলাকায় তাঁর আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁকে আল্লাহ এমন উন্নত ও কল্যাণকর শিক্ষা এবং সৎকর্ম-কুশলতা দান করেন, যা পূর্বে কোনো উম্মতকেই দেওয়া হয়নি। আরব জাতির এ মর্যদা পাওয়ার কারণ হচ্ছে, তাদের রাসূলের মর্যাদা যিনি হচ্ছেন নবীকুল শিরোমণি। তাঁর রিসালাত হচ্ছে বরকতময়। তিনি হচ্ছেন সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্যে রাসূল। তাঁর আনীত আদর্শ হচ্ছে পুণ্যতম আদর্শ।

হাজেরা ঘরে ফেরার পর হযরত ইসমাঈল আ. ভূমিষ্ঠ হন। এ সময় ইবরাহীম আ.-এর বয়স হয়েছিল ছিয়াশি বছর। এটা হচ্ছে ইসহাক আ.-এর জন্মের তের বছর পূর্বের ঘটনা। ইসমাঈল আ.-এর জন্মের পর আল্লাহ হযরত ইবরাহীম আ.-কে সারাহর গর্ভে ইসহাক নামের সন্তান জন্মের সুসংবাদ দেন।

ইবরাহীম আ. তখন আল্লাহর উদ্দেশে শোকরানা সিজদা আদায় করেন। আল্লাহ তাঁকে জানান, আমি তোমার দুআ ইসমাঈলের পক্ষে কবুল করেছি। তাকে বরকত দান করেছি। তাঁর বংশের বিস্তৃতি দান করেছি। তার সন্তানদের মধ্য থেকে বারো জন প্রধানের জন্ম হবে। তাঁকে আমি বিরাট সম্প্রদায়ের প্রধান করব। এটাও এই উম্মতের জন্যে একটা সুসংবাদ। বারো জন প্রধান হলেন সেই বারজন খলিফায়ে রাশেদা যাঁদের কথা জাবির ইবনে সামুরা রাযি.-এর সূত্রে বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'বারো জন আমীর হবে।'

জাবির রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরপর একটা শব্দ বলেছেন, কিন্তু আমি তা বুঝতে পারি নি। তাই সে সম্পর্কে আমার পিতার কাছে জিজ্ঞাসা করি। তিনি বললেন, রাসূলের সে শব্দটি হল কুল্লুহুম মিন ক্বুরাইশ অর্থাৎ 'তারা সবাই হবেন কুরায়শ গোত্রের লোক।' বুখারী ও মুসলিম এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। অপর এক বর্ণনায় আছে:

লা ইয়াযালু হাজাল আমরু কাইমান হাত্তা ইয়াকুনানা ইছনা আশারা খলীফাতান কুল্লুহুম মিন ক্বুরাইশ

অর্থাৎ এই খিলাফত বারো জন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত বা শক্তিশালী থাকবে; এরা সবাই হবে কুরাইশ গোত্রের লোক। উক্ত বারজনের মধ্যে চারজন হলেন প্রথম চার খলিফা আবু বকর রাযি. উমর রাযি. উসমান ও আলী রাযি.। একজন উমর ইবনে আবদুল আযীয রহ. কতিপয় বনি আব্বসীয় খলীফা। বারজন খলিফা ধারাবাহিকভাবে হতে হবে এমন কোনো কথা নাই। বরং যে কোনোভাবে বারো জনের বিদ্যমান হওয়াটাই জরুরি। উল্লিখিত বারো জন ইমাম রাফিজী সম্প্রদায়ের কথিত 'বারো ইমাম' নয়। যাদের প্রথম জন আলী ইবনে তালিব রাযি. আর শেষ ইমাম মুহাম্মদ ইবনে হাসান আসকারী। এই শেষোক্ত ইমামের ব্যাপারে তাদের বিশ্বাস হচ্ছে, তিনি সামেরার একটি ভূগর্ভস্থ প্রকোষ্ঠ থেকে বের হয়ে আসবেন। এরা তার প্রতীক্ষায় আছে।

কেননা, এ ইমামগণ হযরত আলী রাযি. ও তাঁর পুত্র হাসান ইবনে আলী অপেক্ষা অধিকতর কল্যাণকামী হতে পারেন না। বিশেষ করে যখন স্বয়ং হাসান ইবনে আলী রাযি. যুদ্ধ পরিত্যাগ করে হযরত মুআবিয়া রাযি. এর অনুকুলে খেলাফত ত্যাগ করেন। যার ফলে ফিৎনার আগুন নির্বাপিত হয়। মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক গৃহযুদ্ধ বন্ধ হয়। অবশিষ্ট ইমামগণ তো অন্যদের শাসনাধীন ছিলেন। উম্মতের উপরে কোনো বিষয়েই তাঁদের কোনো আধিপত্য ছিল না। সামিরার ভূগর্ভস্থিত প্রকোষ্ঠ সম্পর্কে রাফিজীদের যে বিশ্বাস তা নিতান্ত অবাস্তব কল্পনা ও হেঁয়ালী ছাড়া আর কিছুই নয়। এর কোনো ভিত্তি নেই।

হাজেরার গর্ভে ইসমাঈল আ.-এর জন্ম হলে সারাহর ঈর্ষা পায়। তিনি হযরত ইবরাহীম আ.-এর নিকট আবেদন জানান, যাতে হাজেরাকে তার চোখের আড়াল করে দেন। সুতরাং ইবরাহীম আ. হাজেরা ও তাঁর পুত্রকে নিয়ে বের হয়ে পড়েন এবং মক্কায় নিয়ে রাখেন। বলা হয়ে থাকে যে, ইসমাঈল আ. তখন দুধের শিশু ছিলেন।

ইবরাহীম আ. যখন তাদেরকে সেখানে রেখে ফিরে আসার জন্যে উদ্যত হলেন, তখন হাজেরা উঠে তার কাপড় জড়িয়ে ধরে বললেন, আমাদেরকে এখানে খাদ্য-রসদহীন অবস্থায় রেখে কোথায় যাচ্ছেন? ইবরাহীম আ.-কোনো উত্তর দিলেন না। বারবার পীড়াপীড়ি করা সত্ত্বেও তিনি যখন জওয়াব দিলেন না, তখন হাজেরা জিজ্ঞেস করলেন : 'আল্লাহ কি এরূপ করতে আপনাকে আদেশ করেছেন?' ইবরাহীম আ. বললেন, হ্যাঁ। হাজেরা বললেন : 'তা হলে আর কোনো ভয় নেই। তিনি আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না।'

শায়খ আবু মুহাম্মদ ইবনে আবি যায়েদ রহ, 'নাওয়াদির' কিতাবে লিখেছেন: সারাহ হাজেরার ওপর ক্রদ্ধ হয়ে কসম করলেন, তিনি তাঁর তিনটি অঙ্গ ছেদন করবেন। ইবরাহীম আ. বললেন, দুটি কান ছিদ্র করে দাও ও খাৎনা করিয়ে দাও এবং কসম থেকে মুক্ত হয়ে যাও। সুহায়লী বলেছেন: 'হাজেরাই সর্বপ্রথম নারী, যার খাৎনা করা হয়েছিল, সর্বপ্রথম যার উভয় কান ছিদ্র করা হয়। এবং তিনিই সর্বপ্রথম দীর্ঘ আঁচল ব্যবহার করেন।"

📘 কাসাসুল আম্বিয়া > 📄 মক্কায় হিজরত ও কাবা গৃহ নির্মাণ

📄 মক্কায় হিজরত ও কাবা গৃহ নির্মাণ


ইমাম বুখারী রহ. ইবনে আব্বাস রাযি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন : নারী জাতি সর্বপ্রথম কোমরবন্দ ব্যবহার শিখে ইসমাঈল আ.-এর মায়ের থেকে। হাজেরা কোমরবন্দ ব্যবহার করতেন সারাহর দৃষ্টি থেকে নিজের পদচিহ্ন গোপন রাখার জন্যে।

হযরত ইবরাহীম আ. হাজেরা ও ইসমাঈল আ.কে নিয়ে যখন মক্কায় যান, হাজেরা তখন তাঁর শিশুপুত্রকে দুধ পান করাতেন। মসজিদে হারামের উঁচু অংশে বায়তুল্লাহর কাছে যমযম কূপের নিকটে অবস্থিত একটি বড় গাছের নিচে তিনি তাঁদেরকে রেখে আসেন। মক্কায় তখন না ছিল কোনো মানুষ, না ছিল কোনো পানি। এখানেই তিনি তাঁদেরকে রেখে এলেন। একটি থলের মধ্যে কিছু খেজুর ও একটি মশকে কিছু পানিও রাখলেন।

তারপর ইবরাহীম আ. যেদিক থেকে এসেছিলেন, সেদিকে ফিরে চললেন। হাজেরাও তাঁর পিছু পিছু ছুটে যান এবং জিজ্ঞেস করেন : 'আমাদেরকে এই শূন্য প্রান্তরে রেখে কোথায় যাচ্ছেন? যেখানে নেই কোনো মানুষজন, নেই কোনো খাদ্য-পানীয়।' হাজেরা বারবার একথা বলা সত্ত্বেও ইবরাহীম আ. তাঁর দিকে ফিরে তাকালেন না। তখন হাজেরা জিজ্ঞেস করলেন : 'আল্লাহ কি এরকম করতে আপনাকে আদেশ করেছেন?' ইবরাহীম আ. বললেন, 'হ্যাঁ'। হাজেরা বললেন : 'তা হলে আল্লাহ আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না।' একথা বলে হাজেরা ফিরে আসলেন এবং ইবরাহীম আ.ও চলে গেলেন। যখন তিনি 'ছানিয়া' (গিরিপথ) পর্যন্ত পৌঁছলেন, যেখান থেকে তাঁকে আর দেখা যাচ্ছিল না। তখন তিনি কাবামুখী হয়ে দাঁড়ালেন। দু হাত তুলে এ দোয়া করলেন:

رَبَّنَا إِنِّي أَسْكَنْتُ مِنْ ذُرِّيَّتِي بِوَادٍ غَيْرِ ذِي زَرْعٍ عِنْدَ بَيْتِكَ الْمُحَرَّمِ رَبَّنَا لِيُقِيمُوا الصَّلَاةَ فَاجْعَلْ أَفْئِدَةً مِنَ النَّاسِ تَهْوِي إِلَيْهِمْ وَارْزُقْهُمْ مِنَ الثَّمَرَاتِ لَعَلَّهُمْ يَشْكُرُونَ

'হে আমার প্রতিপালক! আমি আমার বংশধরদের কতককে বসবাস করালাম অনুর্বর উপত্যকায় তোমার পবিত্র ঘরের নিকট। হে আমাদের প্রতিপালক! তারা যেন সালাত কায়েম করে। অতএব, তুমি কিছু লোকের অন্তর তাদের দিকে অনুরাগী করে দাও এবং ফলাদি দ্বারা ওদের জীবিকার ব্যবস্থা করে দাও। যাতে ওরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।' (সূরা ইবরাহীম: ৩৭)

হাজেরা ইসমাঈল আ.-কে স্তনের দুধ পান করাতেন। নিজে মশকের পানি পান করতেন। শেষে মশকের পানি ফুরিয়ে গেলে মা ও শিশু উভয়ে পিপাসায় কাতর হয়ে পড়েন। শিশুর দিকে তাকিয়ে দেখেন, পিপাসায় তার বুক ধড়ফর করছে। শিশু পুত্রের এ করুণ অবস্থা দেখে সহ্য করতে না পেরে মা সেখান থেকে উঠে গেলেন এবং নিকটবর্তী সাফা পর্বতে আরোহণ করলেন। সেখান থেকে প্রান্তরটির দিকে তাকিয়ে কাউকে দেখা যায় কি না লক্ষ করলেন। কিন্তু কাউকেই দেখতে পেলেন না।

তারপর সাফা পর্বত থেকে হাজেরা নেমে নিম্ন ভূমিতে চলে আসলে তিনি তাঁর জামার আঁচল একদিকে উঠিয়ে ক্লান্ত-শ্রান্ত ব্যক্তির মত ছুটে চললেন। নিচু ভূমি পাড়ি দিয়ে তিনি মারওয়া পাহাড়ে উঠেন। চতুর্দিকে চোখ বুলিয়ে দেখতে লাগলেন, কাউকে দেখা যায় কি না। কিন্তু কাউকেই দেখতে পেলেন না। এভাবে তিনি সাতবার আসা-যাওয়া করেন। ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, এ জন্যেই লোকজন হজ ও উমরায় উভয় পাহাড়ের মাঝে সাতবার সাঈ করে থাকেন। মারওয়া পাহাড়ে উঠে তিনি একটি আওয়াজ শুনতে পান। তিনি তখন নিজেকে লক্ষ করে বলেন: চুপ কর! তারপর কান পেতে পুনরায় ওই একই আওয়াজ শুনতে পেলেন। হাজেরা তখন বললেন: তোমার আওয়াজ শুনেছি, যদি সাহায্য করতে পার, তবে সাহায্য কর! এমন সময় তিনি দেখতে পেলেন, কূপের স্থানে একজন ফেরেশতা দাঁড়িয়ে আছেন। ফেরেশতা নিজের পায়ের গোড়ালি দ্বারা কিংবা তার ডানা দ্বারা মাটিতে আঘাত করতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত পানি বের হয়ে আসে। তখন হাজেরা এর চারপাশে আপন হাত দ্বারা বাঁধ দিয়ে হাউজের মতো করে দিলেন এবং আঁজলা ভরে মশকে পানি তোলার পরও উপচে পড়তে লাগল।

ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ইসমাঈল আ.-এর মাকে আল্লাহ রহম করুন। যদি তিনি যমযমকে বাঁধ না দিয়ে এভাবে ছেড়ে দিতেন কিংবা তিনি বলেছেন: যদি তিনি আঁজলা ভরে পানি মশকে জমা না করতেন, তা হলে যমযম একটি কূপ না হয়ে প্রবহমান ঝর্ণায় পরিণত হত। তারপর হাজেরা পানি পান করলেন এবং শিশুপুত্রকে দুধ পান করালেন। ফেরেশতা তাকে বললেন, আপনি ধ্বংসের কোনো আশঙ্কা করবেন না। কেননা এখানেই আল্লাহর ঘর রয়েছে। এই শিশু ও তাঁর পিতা ঘরটি পুনরায় নির্মাণ করবেন।

ওই সময় বায়তুল্লাহর চেয়ে উঁচু কিছু টিলা ছিল। বন্যার পানির ফলে তার ডান ও বা দিকে ভাঙন ধরেছিল। হাজেরা সেখানে দিনযাপন করছিলেন। শেষে জুরহুম গোত্রের (ইয়েমেন দেশীয়) একদল লোক তাঁদের কাছ দিয়ে অতিক্রম করছিল। অথবা জুরহুম পরিবারের কিছু লোক ওই পথ ধরে এদিকে আসছিল। তারা মক্কার নিচু ভূমিতে অবতরণ করল এবং তারা দেখতে পেল, একটা পাখি চক্রাকারে উড়ছে।

তখন তারা বলাবলি করল, নিশ্চয় এ পাখিটি পানির ওপরই উড়ছে। অথচ আমরা এ উপত্যকায় বহুদিন কাটিয়েছি, এখানে কোনো পানি ছিল না। তখন তারা একজন কি দু'জন মশকধারী লোক সেখানে পাঠাল। তারা সেখানে গিয়ে পানি দেখতে পেল। ফিরে এসে সবাইকে পানির সংবাদ দিল। সংবাদ পেয়ে সবাই সেদিকে অগ্রসর হল। ইসমাঈল আ.-এর মা ওই সময় পানির নিকট বসা ছিলেন। তারা তাঁর নিকটবর্তী স্থানে বসবাস করার অনুমতি চাইল। হাজেরা বললেন, থাকতে পার। তবে এ পানির উপর তোমাদের কোনো অধিকার থাকবে না। তারা তা মেনে নিল।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: এ ঘটনা ইসমাঈল আ.-এর মাকে একটি সুযোগ এনে দিল। তিনিও জনমানুষের উপস্থিতি চাচ্ছিলেন। এরপর তারা সেখানে বসতি স্থাপন করল এবং তাদের পরিবার-পরিজনের কাছেও সংবাদ পাঠাল। তারাও এসে তাদের সাথে বসবাস করতে লাগল। পরিশেষে সেখানে তাদের কয়েকটি পরিবারের বসতি স্থাপিত হল।

এদিকে ইসমাঈল আ. যৌবনে উপনীত হলেন এবং তাদের থেকে আরবি ভাষা শিখলেন। যৌবনে পৌঁছে তিনি তাদের কাছে আকর্ষণীয় ও প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলেন। যখন তিনি পূর্ণ যৌবন লাভ করলেন তখন তারা তাঁর সঙ্গে তাদেরই একটি মেয়েকে বিবাহ দিল। এরই মধ্যে ইসমাঈল আ.-এর মা হাজেরার ইনতেকাল করেন। ইসমাঈল আ.-এর বিবাহের পর ইবরাহীম আ. তাঁর পরিবারকে দেখার জন্যে এখানে আসেন। কিন্তু ইসমাঈল আ.কে পেলেন না।

তখন তার স্ত্রীকে তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। স্ত্রী জানালেন, তিনি আমাদের জীবিকার খোঁজে বেরিয়ে গেছেন। তখন তিনি তাদের জীবনযাত্রা ও অবস্থা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলেন। সে জানায়, আমরা অতি কষ্টে, অভাব-অনটনে আছি। সে তাঁর কাছে নিজেদের দুর্দশার অভিযোগ করল। তখন ইবরাহীম আ. বললেন, তোমার স্বামী বাড়ি ফিরে এলে আমার সালাম জানাবে এবং তাঁকে দরজার চৌকাঠ বদলে ফেলতে বলবে।

ইসমাঈল আ. বাড়ি ফিরে এলে তিনি যেন কিছু একটা ঘটনার আভাস পেলেন। স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের কাছে কি কোনো লোক এসেছিল? স্ত্রী বলল, হ্যাঁ! এই এই আকৃতির একজন বৃদ্ধ লোক এসেছিলেন। তিনি আপনার সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। আমি তা জানিয়েছি। আমাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমি বলেছি, আমরা খুব কষ্টে ও অভাবে আছি। ইসমাঈল আ. জিজ্ঞেস করলেন, তিনি তোমাকে কোনো উপদেশ দিয়েছেন কি? স্ত্রী বলল: হ্যাঁ, আপনাকে তাঁর সালাম জানাতে বলেছেন এবং আপনাকে দরজার চৌকাঠ বদলাতে বলেছেন। ইসমাঈল আ. বললেন, তিনি আমার পিতা। তোমাকে ত্যাগ করার জন্যে আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং তুমি তোমার আপনজনদের কাছে চলে যাও। তখন তিনি স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিলেন এবং জুরহুম গোত্রের অন্য এক মহিলাকে বিবাহ করেন। ইবরাহীম আ. দীর্ঘদিন পর্যন্ত দূরেই রইলেন। তারপর হযরত ইবরাহীম আ. তাদের পুনরায় দেখতে এলেন। কিন্তু এবারও তিনি ইসমাঈল আ.-কে বাড়িতে পেলেন না। পুত্রবধূকে জিজ্ঞেস করলে জানালেন, 'তিনি আমাদের জীবিকার অন্বেষণে বাইরে গেছেন।'

ইবরাহীম আ. বললেন, তোমরা কেমন আছ? তোমাদের জীবনযাত্রার অবস্থা কেমন? জবাবে পুত্রবধূ বললেন: আলহামদুলিল্লাহ, আমরা ভালো আছি। সুখে আছি। ইবরাহীম আ. জিজ্ঞেস করলেন, সাধারণত তোমাদের খাদ্য কী? তিনি বললেন: গোশত। পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন: তোমাদের পানীয় কি? তিনি বললেন, পানি। ইবরাহীম আ. দোয়া করলেন, 'হে আল্লাহ! এদের গোশত ও পানিতে বরকত দান করুন।'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ওই সময় তাদের ওখানে খাদ্যশস্য উৎপাদিত হত না। যদি হত তা হলে তিনি তাদের জন্য সে বিষয়েও দোয়া করতেন। বর্ণনাকারী বলেন, মক্কা ব্যতীত অন্য কোথাও কেউ শুধু গোশত ও পানি দ্বারা জীবন ধারণ করতে পারে না। কেননা শুধু গোশত ও পানি জীবন যাপনের জন্য যথেষ্ট হতে পারে না। ইবরাহীম আ. বললেন, তোমার স্বামী যখন বাড়িতে আসবে, তখন আমার সালাম জানাবে এবং দরজার চৌকাঠ অপরিবর্তিত রাখতে বলবে।

ইসমাঈল আ. যখন বাড়িতে আসলেন, তখন স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের নিকট কেউ এসেছিল কি? স্ত্রী বললেন: হ্যাঁ, একজন সুন্দর আকৃতির বৃদ্ধলোক এসেছিলেন। স্ত্রী আগন্তুকের প্রশংসা করলেন। তিনি আপনার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করেছেন। আমি তাঁকে আপনার সংবাদ জানিয়েছি। তিনি আমাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কেও জানতে চেয়েছেন। আমি জানিয়েছি, আমরা ভালো আছি।

ইসমাঈল আ. বললেন, তিনি কি তোমাকে আর কোনো উপদেশ দিয়েছেন? স্ত্রী বললেন: হ্যাঁ, তিনি আপনাকে সালাম জানিয়েছেন এবং আপনার দরজার চৌকাঠ ঠিক রাখতে বলেছেন। ইসমাঈল আ. বললেন, তিনি আমার পিতা। তোমাকে স্ত্রীরূপে বহাল রাখতে আদেশ করেছেন।

পুনরায় ইবরাহীম আ. এদের থেকে দীর্ঘদিন পর্যন্ত দূরেই থাকলেন। তারপর ইবরাহীম আ. পুনরায় তথায় আসলেন। দেখলেন, ইসমাঈল যমযম কূপের নিকটে বিরাট এক বৃক্ষের নিচে বসে তীর চাঁছছিলেন। পিতাকে দেখে তিনি তাঁর দিকে এগিয়ে আসলেন। এরপর উভয়ে এমনভাবে পরস্পরকে আলিঙ্গন করলেন, যেমন সাধারণত পিতাপুত্রের মধ্যে হয়ে থাকে। ইবরাহীম আ. বললেন: ইসমাঈল, আল্লাহ আমাকে একটি কাজের আদেশ করেছেন। ইসমাঈল আ. বললেন, আল্লাহ যে আদেশ করেছেন তা বাস্তবায়িত করুন। ইবরাহীম আ. বললেন, তুমি আমাকে সাহায্য করবে? ইসমাঈল আ. বললেন: নিশ্চয়ই আমি আপনাকে সাহায্য করব। ইবরাহীম আ. পার্শ্বে অবস্থিত উঁচু ঢিবির দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, আল্লাহ আমাকে এ স্থানটি ঘিরে একটি ঘর নির্মাণের আদেশ দিয়েছেন। তখন তাঁরা উভয়ে কাবা ঘরের দেয়াল উঠাতে লেগে গেলেন। ইসমাঈল আ. পাথর আনতেন ও ইবরাহীম আ. গাঁথুনী দিতেন।

ইমাম বুখারী রহ. ইবনে আব্বাস রাযি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন : নারী জাতি সর্বপ্রথম কোমরবন্দ ব্যবহার শিখে ইসমাঈল আ.-এর মায়ের থেকে। হাজেরা কোমরবন্দ ব্যবহার করতেন সারাহর দৃষ্টি থেকে নিজের পদচিহ্ন গোপন রাখার জন্যে।

হযরত ইবরাহীম আ. হাজেরা ও ইসমাঈল আ.কে নিয়ে যখন মক্কায় যান, হাজেরা তখন তাঁর শিশুপুত্রকে দুধ পান করাতেন। মসজিদে হারামের উঁচু অংশে বায়তুল্লাহর কাছে যমযম কূপের নিকটে অবস্থিত একটি বড় গাছের নিচে তিনি তাঁদেরকে রেখে আসেন। মক্কায় তখন না ছিল কোনো মানুষ, না ছিল কোনো পানি। এখানেই তিনি তাঁদেরকে রেখে এলেন। একটি থলের মধ্যে কিছু খেজুর ও একটি মশকে কিছু পানিও রাখলেন।

তারপর ইবরাহীম আ. যেদিক থেকে এসেছিলেন, সেদিকে ফিরে চললেন। হাজেরাও তাঁর পিছু পিছু ছুটে যান এবং জিজ্ঞেস করেন : 'আমাদেরকে এই শূন্য প্রান্তরে রেখে কোথায় যাচ্ছেন? যেখানে নেই কোনো মানুষজন, নেই কোনো খাদ্য-পানীয়।' হাজেরা বারবার একথা বলা সত্ত্বেও ইবরাহীম আ. তাঁর দিকে ফিরে তাকালেন না। তখন হাজেরা জিজ্ঞেস করলেন : 'আল্লাহ কি এরকম করতে আপনাকে আদেশ করেছেন?' ইবরাহীম আ. বললেন, 'হ্যাঁ'। হাজেরা বললেন : 'তা হলে আল্লাহ আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না।' একথা বলে হাজেরা ফিরে আসলেন এবং ইবরাহীম আ.ও চলে গেলেন। যখন তিনি 'ছানিয়া' (গিরিপথ) পর্যন্ত পৌঁছলেন, যেখান থেকে তাঁকে আর দেখা যাচ্ছিল না। তখন তিনি কাবামুখী হয়ে দাঁড়ালেন। দু হাত তুলে এ দোয়া করলেন:

رَبَّنَا إِنِّي أَسْكَنْتُ مِنْ ذُرِّيَّتِي بِوَادٍ غَيْرِ ذِي زَرْعٍ عِنْدَ بَيْتِكَ الْمُحَرَّمِ رَبَّنَا لِيُقِيمُوا الصَّلَاةَ فَاجْعَلْ أَفْئِدَةً مِنَ النَّاسِ تَهْوِي إِلَيْهِمْ وَارْزُقْهُمْ مِنَ الثَّمَرَاتِ لَعَلَّهُمْ يَشْكُرُونَ

'হে আমার প্রতিপালক! আমি আমার বংশধরদের কতককে বসবাস করালাম অনুর্বর উপত্যকায় তোমার পবিত্র ঘরের নিকট। হে আমাদের প্রতিপালক! তারা যেন সালাত কায়েম করে। অতএব, তুমি কিছু লোকের অন্তর তাদের দিকে অনুরাগী করে দাও এবং ফলাদি দ্বারা ওদের জীবিকার ব্যবস্থা করে দাও। যাতে ওরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।' (সূরা ইবরাহীম: ৩৭)

হাজেরা ইসমাঈল আ.-কে স্তনের দুধ পান করাতেন। নিজে মশকের পানি পান করতেন। শেষে মশকের পানি ফুরিয়ে গেলে মা ও শিশু উভয়ে পিপাসায় কাতর হয়ে পড়েন। শিশুর দিকে তাকিয়ে দেখেন, পিপাসায় তার বুক ধড়ফর করছে। শিশু পুত্রের এ করুণ অবস্থা দেখে সহ্য করতে না পেরে মা সেখান থেকে উঠে গেলেন এবং নিকটবর্তী সাফা পর্বতে আরোহণ করলেন। সেখান থেকে প্রান্তরটির দিকে তাকিয়ে কাউকে দেখা যায় কি না লক্ষ করলেন। কিন্তু কাউকেই দেখতে পেলেন না।

তারপর সাফা পর্বত থেকে হাজেরা নেমে নিম্ন ভূমিতে চলে আসলে তিনি তাঁর জামার আঁচল একদিকে উঠিয়ে ক্লান্ত-শ্রান্ত ব্যক্তির মত ছুটে চললেন। নিচু ভূমি পাড়ি দিয়ে তিনি মারওয়া পাহাড়ে উঠেন। চতুর্দিকে চোখ বুলিয়ে দেখতে লাগলেন, কাউকে দেখা যায় কি না। কিন্তু কাউকেই দেখতে পেলেন না। এভাবে তিনি সাতবার আসা-যাওয়া করেন। ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, এ জন্যেই লোকজন হজ ও উমরায় উভয় পাহাড়ের মাঝে সাতবার সাঈ করে থাকেন। মারওয়া পাহাড়ে উঠে তিনি একটি আওয়াজ শুনতে পান। তিনি তখন নিজেকে লক্ষ করে বলেন: চুপ কর! তারপর কান পেতে পুনরায় ওই একই আওয়াজ শুনতে পেলেন। হাজেরা তখন বললেন: তোমার আওয়াজ শুনেছি, যদি সাহায্য করতে পার, তবে সাহায্য কর! এমন সময় তিনি দেখতে পেলেন, কূপের স্থানে একজন ফেরেশতা দাঁড়িয়ে আছেন। ফেরেশতা নিজের পায়ের গোড়ালি দ্বারা কিংবা তার ডানা দ্বারা মাটিতে আঘাত করতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত পানি বের হয়ে আসে। তখন হাজেরা এর চারপাশে আপন হাত দ্বারা বাঁধ দিয়ে হাউজের মতো করে দিলেন এবং আঁজলা ভরে মশকে পানি তোলার পরও উপচে পড়তে লাগল।

ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ইসমাঈল আ.-এর মাকে আল্লাহ রহম করুন। যদি তিনি যমযমকে বাঁধ না দিয়ে এভাবে ছেড়ে দিতেন কিংবা তিনি বলেছেন: যদি তিনি আঁজলা ভরে পানি মশকে জমা না করতেন, তা হলে যমযম একটি কূপ না হয়ে প্রবহমান ঝর্ণায় পরিণত হত। তারপর হাজেরা পানি পান করলেন এবং শিশুপুত্রকে দুধ পান করালেন। ফেরেশতা তাকে বললেন, আপনি ধ্বংসের কোনো আশঙ্কা করবেন না। কেননা এখানেই আল্লাহর ঘর রয়েছে। এই শিশু ও তাঁর পিতা ঘরটি পুনরায় নির্মাণ করবেন।

ওই সময় বায়তুল্লাহর চেয়ে উঁচু কিছু টিলা ছিল। বন্যার পানির ফলে তার ডান ও বা দিকে ভাঙন ধরেছিল। হাজেরা সেখানে দিনযাপন করছিলেন। শেষে জুরহুম গোত্রের (ইয়েমেন দেশীয়) একদল লোক তাঁদের কাছ দিয়ে অতিক্রম করছিল। অথবা জুরহুম পরিবারের কিছু লোক ওই পথ ধরে এদিকে আসছিল। তারা মক্কার নিচু ভূমিতে অবতরণ করল এবং তারা দেখতে পেল, একটা পাখি চক্রাকারে উড়ছে।

তখন তারা বলাবলি করল, নিশ্চয় এ পাখিটি পানির ওপরই উড়ছে। অথচ আমরা এ উপত্যকায় বহুদিন কাটিয়েছি, এখানে কোনো পানি ছিল না। তখন তারা একজন কি দু'জন মশকধারী লোক সেখানে পাঠাল। তারা সেখানে গিয়ে পানি দেখতে পেল। ফিরে এসে সবাইকে পানির সংবাদ দিল। সংবাদ পেয়ে সবাই সেদিকে অগ্রসর হল। ইসমাঈল আ.-এর মা ওই সময় পানির নিকট বসা ছিলেন। তারা তাঁর নিকটবর্তী স্থানে বসবাস করার অনুমতি চাইল। হাজেরা বললেন, থাকতে পার। তবে এ পানির উপর তোমাদের কোনো অধিকার থাকবে না। তারা তা মেনে নিল।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: এ ঘটনা ইসমাঈল আ.-এর মাকে একটি সুযোগ এনে দিল। তিনিও জনমানুষের উপস্থিতি চাচ্ছিলেন। এরপর তারা সেখানে বসতি স্থাপন করল এবং তাদের পরিবার-পরিজনের কাছেও সংবাদ পাঠাল। তারাও এসে তাদের সাথে বসবাস করতে লাগল। পরিশেষে সেখানে তাদের কয়েকটি পরিবারের বসতি স্থাপিত হল।

এদিকে ইসমাঈল আ. যৌবনে উপনীত হলেন এবং তাদের থেকে আরবি ভাষা শিখলেন। যৌবনে পৌঁছে তিনি তাদের কাছে আকর্ষণীয় ও প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলেন। যখন তিনি পূর্ণ যৌবন লাভ করলেন তখন তারা তাঁর সঙ্গে তাদেরই একটি মেয়েকে বিবাহ দিল। এরই মধ্যে ইসমাঈল আ.-এর মা হাজেরার ইনতেকাল করেন। ইসমাঈল আ.-এর বিবাহের পর ইবরাহীম আ. তাঁর পরিবারকে দেখার জন্যে এখানে আসেন। কিন্তু ইসমাঈল আ.কে পেলেন না।

তখন তার স্ত্রীকে তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। স্ত্রী জানালেন, তিনি আমাদের জীবিকার খোঁজে বেরিয়ে গেছেন। তখন তিনি তাদের জীবনযাত্রা ও অবস্থা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলেন। সে জানায়, আমরা অতি কষ্টে, অভাব-অনটনে আছি। সে তাঁর কাছে নিজেদের দুর্দশার অভিযোগ করল। তখন ইবরাহীম আ. বললেন, তোমার স্বামী বাড়ি ফিরে এলে আমার সালাম জানাবে এবং তাঁকে দরজার চৌকাঠ বদলে ফেলতে বলবে।

ইসমাঈল আ. বাড়ি ফিরে এলে তিনি যেন কিছু একটা ঘটনার আভাস পেলেন। স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের কাছে কি কোনো লোক এসেছিল? স্ত্রী বলল, হ্যাঁ! এই এই আকৃতির একজন বৃদ্ধ লোক এসেছিলেন। তিনি আপনার সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। আমি তা জানিয়েছি। আমাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমি বলেছি, আমরা খুব কষ্টে ও অভাবে আছি। ইসমাঈল আ. জিজ্ঞেস করলেন, তিনি তোমাকে কোনো উপদেশ দিয়েছেন কি? স্ত্রী বলল: হ্যাঁ, আপনাকে তাঁর সালাম জানাতে বলেছেন এবং আপনাকে দরজার চৌকাঠ বদলাতে বলেছেন। ইসমাঈল আ. বললেন, তিনি আমার পিতা। তোমাকে ত্যাগ করার জন্যে আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং তুমি তোমার আপনজনদের কাছে চলে যাও। তখন তিনি স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিলেন এবং জুরহুম গোত্রের অন্য এক মহিলাকে বিবাহ করেন। ইবরাহীম আ. দীর্ঘদিন পর্যন্ত দূরেই রইলেন। তারপর হযরত ইবরাহীম আ. তাদের পুনরায় দেখতে এলেন। কিন্তু এবারও তিনি ইসমাঈল আ.-কে বাড়িতে পেলেন না। পুত্রবধূকে জিজ্ঞেস করলে জানালেন, 'তিনি আমাদের জীবিকার অন্বেষণে বাইরে গেছেন।'

ইবরাহীম আ. বললেন, তোমরা কেমন আছ? তোমাদের জীবনযাত্রার অবস্থা কেমন? জবাবে পুত্রবধূ বললেন: আলহামদুলিল্লাহ, আমরা ভালো আছি। সুখে আছি। ইবরাহীম আ. জিজ্ঞেস করলেন, সাধারণত তোমাদের খাদ্য কী? তিনি বললেন: গোশত। পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন: তোমাদের পানীয় কি? তিনি বললেন, পানি। ইবরাহীম আ. দোয়া করলেন, 'হে আল্লাহ! এদের গোশত ও পানিতে বরকত দান করুন।'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ওই সময় তাদের ওখানে খাদ্যশস্য উৎপাদিত হত না। যদি হত তা হলে তিনি তাদের জন্য সে বিষয়েও দোয়া করতেন। বর্ণনাকারী বলেন, মক্কা ব্যতীত অন্য কোথাও কেউ শুধু গোশত ও পানি দ্বারা জীবন ধারণ করতে পারে না। কেননা শুধু গোশত ও পানি জীবন যাপনের জন্য যথেষ্ট হতে পারে না। ইবরাহীম আ. বললেন, তোমার স্বামী যখন বাড়িতে আসবে, তখন আমার সালাম জানাবে এবং দরজার চৌকাঠ অপরিবর্তিত রাখতে বলবে।

ইসমাঈল আ. যখন বাড়িতে আসলেন, তখন স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের নিকট কেউ এসেছিল কি? স্ত্রী বললেন: হ্যাঁ, একজন সুন্দর আকৃতির বৃদ্ধলোক এসেছিলেন। স্ত্রী আগন্তুকের প্রশংসা করলেন। তিনি আপনার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করেছেন। আমি তাঁকে আপনার সংবাদ জানিয়েছি। তিনি আমাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কেও জানতে চেয়েছেন। আমি জানিয়েছি, আমরা ভালো আছি।

ইসমাঈল আ. বললেন, তিনি কি তোমাকে আর কোনো উপদেশ দিয়েছেন? স্ত্রী বললেন: হ্যাঁ, তিনি আপনাকে সালাম জানিয়েছেন এবং আপনার দরজার চৌকাঠ ঠিক রাখতে বলেছেন। ইসমাঈল আ. বললেন, তিনি আমার পিতা। তোমাকে স্ত্রীরূপে বহাল রাখতে আদেশ করেছেন।

পুনরায় ইবরাহীম আ. এদের থেকে দীর্ঘদিন পর্যন্ত দূরেই থাকলেন। তারপর ইবরাহীম আ. পুনরায় তথায় আসলেন। দেখলেন, ইসমাঈল যমযম কূপের নিকটে বিরাট এক বৃক্ষের নিচে বসে তীর চাঁছছিলেন। পিতাকে দেখে তিনি তাঁর দিকে এগিয়ে আসলেন। এরপর উভয়ে এমনভাবে পরস্পরকে আলিঙ্গন করলেন, যেমন সাধারণত পিতাপুত্রের মধ্যে হয়ে থাকে। ইবরাহীম আ. বললেন: ইসমাঈল, আল্লাহ আমাকে একটি কাজের আদেশ করেছেন। ইসমাঈল আ. বললেন, আল্লাহ যে আদেশ করেছেন তা বাস্তবায়িত করুন। ইবরাহীম আ. বললেন, তুমি আমাকে সাহায্য করবে? ইসমাঈল আ. বললেন: নিশ্চয়ই আমি আপনাকে সাহায্য করব। ইবরাহীম আ. পার্শ্বে অবস্থিত উঁচু ঢিবির দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, আল্লাহ আমাকে এ স্থানটি ঘিরে একটি ঘর নির্মাণের আদেশ দিয়েছেন। তখন তাঁরা উভয়ে কাবা ঘরের দেয়াল উঠাতে লেগে গেলেন। ইসমাঈল আ. পাথর আনতেন ও ইবরাহীম আ. গাঁথুনী দিতেন।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া > 📄 হযরত ইবরাহীম আ. ও হযরত ইসমাঈল আ.-এর দু'আ

📄 হযরত ইবরাহীম আ. ও হযরত ইসমাঈল আ.-এর দু'আ


যখন দেয়াল উঁচু হয়ে গেল, তখন ইসমাঈল আ. ‘মাকামে ইবরাহীম’ নামে প্রসিদ্ধ পাথরটি আনলেন এবং সেখানে রাখলেন। ইবরাহীম আ. এর ওপর দাঁড়িয়ে ইমারত তৈরি করতে লাগলেন আর ইসমাঈল আ. তাঁকে পাথর জোগান দিতে থাকেন। এ সময় তাঁরা উভয়ে নিম্নের দোয়াটি পাঠ করেন:

رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ

হে আমাদের রব! আমাদের থেকে এ কাজ কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সবকিছু শোনেন ও জানেন। (সূরা বাকারা: ১২৭)

এভাবে তারা দুজনে কাবাঘর নির্মাণ কাজ শেষ করেন এবং কাজ শেষে ঘরের চারদিকে তাওয়াফ করেন এবং উক্ত দুআ পাঠ করেন। ইমাম বুখারী রহ. ইবনে আব্বাস রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন: যখন ইবরাহীম আ. ও তাঁর স্ত্রী সারাহর মধ্যে যা ঘটার ঘটে গেল, তখন তিনি ইসমাঈল আ. ও তাঁর মাকে নিয়ে বের হয়ে যান। তাদের সাথে পানি ভর্তি একটি মশক ছিল।

তারপর ইমাম বুখারী রহ. পূর্বোল্লিখিত ঘটনার অনুরূপ বিবরণ দেন। হাদিসটি ইবনে আব্বাসের উক্তি। এর কিছু অংশ ‘মারফু’ আর কিছু ‘গরীব’ পর্যায়ের। ইবনে আব্বাস রাযি. সম্ভবত ইসরাঈলী বর্ণনা থেকে এগুলো সংগ্রহ করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখ আছে, ইসমাঈল আ. ঐ সময় দুগ্ধপোষ্য শিশু ছিলেন।

তাওরাতপন্থীরা বলেন, আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহীম আ.-কে পুত্র ইসমাঈলসহ সবাইকে খতনার নির্দেশ দেন। তিনি এ নির্দেশ পালন করেন। অন্যদেরও খতনা করান। এ সময় ইবরাহীম আ.-এর বয়স হয়েছিল নিরানব্বই বছর এবং ইসমাঈল আ.-এর বয়স ছিল তের বছর। খতনা করাটা ছিল আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে। এতে প্রতীয়মান হয়, অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হিসেবেই তিনি তা পালন করেন। এ কারণেই ওলামায়ে কেরাম খতনা করা ওয়াজিব বলেছেন। এ মতই সঠিক।

বুখারী শরীফে আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ইবরাহীম আ. আশি বছর বয়সে (ছুঁতারের) বাইসের সাহায্যে নিজের খতনা করেন। আবদুর রহমান ইবনে ইসহাক, আজলান, মুহাম্মদ ইবনে আমর ও ইমাম মুসলিম ভিন্ন ভিন্ন সনদে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। উক্ত বর্ণনায় ব্যবহৃত 'কুদূম' শব্দটির অর্থ, ধারাল অস্ত্র। কেউ কেউ এটি একটি স্থানের নাম বলেছেন।

এ সব হাদিসের শব্দের মধ্যে কিছু কিছু পার্থক্য আছে। ইবনে হিব্বান রহ. আবু হোরায়রা রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : ইবরাহীম আ. একশ বিশ বছর বয়সে খতনা করেন। এর পরও আশি বছর জীবিত থাকেন। এসব বর্ণনায় ইসমাঈল আ.-কে 'যাবীহ' বলে উল্লেখ করা হয় নি। এবং এতে ইবরাহীম আ.-এর তিনবার আগমনের কথা বলা হয়েছে।

প্রথমবার আগমন করেন, যখন হাজেরার মৃত্যু হয় ও ইসমাঈল আ. বিবাহ করেন। শিশুকালে রেখে আসার পর থেকে ইসমাঈল আ.-এর বিবাহ করা পর্যন্ত তিনি আর তাদের খোঁজ-খবর নেন নি। বলা হয়ে থাকে যে, সফরকালে ইবরাহীম আ.-এর জন্যে জমিনের দূরত্ব সঙ্কুচিত হয়ে যেত। কেউ কেউ বলেছেন, তিনি যখন আসতেন তখন বিদ্যুতের গতিসম্পন্ন বাহন বোরাকে চড়ে আসতেন। এ যদি হয়, তা হলে হযরত ইবরাহীম আ. তাদের সংবাদ না নিয়ে কিভাবে দূরে পড়ে থাকতে পারেন? অথচ নিজের পরিজনের সংবাদ রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বিশেষ করে যে অবস্থায় তাদের রেখে এসেছিলেন। এসব ঘটনার কিছু অংশ ইসরাঈলী বর্ণনা থেকে নেওয়া। অবশ্য কিছু আছে মারফু হাদিস থেকে। এতে 'যাবীহ'-এর ঘটনার উল্লেখ নেই। কিন্তু তাফসিরের মধ্যে সূরা সাফফাতে আমরা দলিলসহ উল্লেখ করেছি, 'যাবীহ হলেন হযরত ইসমাঈল আ.।

যখন দেয়াল উঁচু হয়ে গেল, তখন ইসমাঈল আ. ‘মাকামে ইবরাহীম’ নামে প্রসিদ্ধ পাথরটি আনলেন এবং সেখানে রাখলেন। ইবরাহীম আ. এর ওপর দাঁড়িয়ে ইমারত তৈরি করতে লাগলেন আর ইসমাঈল আ. তাঁকে পাথর জোগান দিতে থাকেন। এ সময় তাঁরা উভয়ে নিম্নের দোয়াটি পাঠ করেন:

رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ

হে আমাদের রব! আমাদের থেকে এ কাজ কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সবকিছু শোনেন ও জানেন। (সূরা বাকারা: ১২৭)

এভাবে তারা দুজনে কাবাঘর নির্মাণ কাজ শেষ করেন এবং কাজ শেষে ঘরের চারদিকে তাওয়াফ করেন এবং উক্ত দুআ পাঠ করেন। ইমাম বুখারী রহ. ইবনে আব্বাস রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন: যখন ইবরাহীম আ. ও তাঁর স্ত্রী সারাহর মধ্যে যা ঘটার ঘটে গেল, তখন তিনি ইসমাঈল আ. ও তাঁর মাকে নিয়ে বের হয়ে যান। তাদের সাথে পানি ভর্তি একটি মশক ছিল।

তারপর ইমাম বুখারী রহ. পূর্বোল্লিখিত ঘটনার অনুরূপ বিবরণ দেন। হাদিসটি ইবনে আব্বাসের উক্তি। এর কিছু অংশ ‘মারফু’ আর কিছু ‘গরীব’ পর্যায়ের। ইবনে আব্বাস রাযি. সম্ভবত ইসরাঈলী বর্ণনা থেকে এগুলো সংগ্রহ করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখ আছে, ইসমাঈল আ. ঐ সময় দুগ্ধপোষ্য শিশু ছিলেন।

তাওরাতপন্থীরা বলেন, আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহীম আ.-কে পুত্র ইসমাঈলসহ সবাইকে খতনার নির্দেশ দেন। তিনি এ নির্দেশ পালন করেন। অন্যদেরও খতনা করান। এ সময় ইবরাহীম আ.-এর বয়স হয়েছিল নিরানব্বই বছর এবং ইসমাঈল আ.-এর বয়স ছিল তের বছর। খতনা করাটা ছিল আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে। এতে প্রতীয়মান হয়, অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হিসেবেই তিনি তা পালন করেন। এ কারণেই ওলামায়ে কেরাম খতনা করা ওয়াজিব বলেছেন। এ মতই সঠিক।

বুখারী শরীফে আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ইবরাহীম আ. আশি বছর বয়সে (ছুঁতারের) বাইসের সাহায্যে নিজের খতনা করেন। আবদুর রহমান ইবনে ইসহাক, আজলান, মুহাম্মদ ইবনে আমর ও ইমাম মুসলিম ভিন্ন ভিন্ন সনদে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। উক্ত বর্ণনায় ব্যবহৃত 'কুদূম' শব্দটির অর্থ, ধারাল অস্ত্র। কেউ কেউ এটি একটি স্থানের নাম বলেছেন।

এ সব হাদিসের শব্দের মধ্যে কিছু কিছু পার্থক্য আছে। ইবনে হিব্বান রহ. আবু হোরায়রা রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : ইবরাহীম আ. একশ বিশ বছর বয়সে খতনা করেন। এর পরও আশি বছর জীবিত থাকেন। এসব বর্ণনায় ইসমাঈল আ.-কে 'যাবীহ' বলে উল্লেখ করা হয় নি। এবং এতে ইবরাহীম আ.-এর তিনবার আগমনের কথা বলা হয়েছে।

প্রথমবার আগমন করেন, যখন হাজেরার মৃত্যু হয় ও ইসমাঈল আ. বিবাহ করেন। শিশুকালে রেখে আসার পর থেকে ইসমাঈল আ.-এর বিবাহ করা পর্যন্ত তিনি আর তাদের খোঁজ-খবর নেন নি। বলা হয়ে থাকে যে, সফরকালে ইবরাহীম আ.-এর জন্যে জমিনের দূরত্ব সঙ্কুচিত হয়ে যেত। কেউ কেউ বলেছেন, তিনি যখন আসতেন তখন বিদ্যুতের গতিসম্পন্ন বাহন বোরাকে চড়ে আসতেন। এ যদি হয়, তা হলে হযরত ইবরাহীম আ. তাদের সংবাদ না নিয়ে কিভাবে দূরে পড়ে থাকতে পারেন? অথচ নিজের পরিজনের সংবাদ রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বিশেষ করে যে অবস্থায় তাদের রেখে এসেছিলেন। এসব ঘটনার কিছু অংশ ইসরাঈলী বর্ণনা থেকে নেওয়া। অবশ্য কিছু আছে মারফু হাদিস থেকে। এতে 'যাবীহ'-এর ঘটনার উল্লেখ নেই। কিন্তু তাফসিরের মধ্যে সূরা সাফফাতে আমরা দলিলসহ উল্লেখ করেছি, 'যাবীহ হলেন হযরত ইসমাঈল আ.।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া > 📄 হযরত ইবরাহীম আ.-এর হাক্কুল ইয়াকীনের অন্বেষণ

📄 হযরত ইবরাহীম আ.-এর হাক্কুল ইয়াকীনের অন্বেষণ


মধ্যস্থলে যেহেতু হযরত ইসমাঈল আ. ও হযরত ইসহাক আ.-এর আলোচনা চলে এসেছিল, তাই তাঁদের দুজনের ঘটনাবলী বর্ণনা করে দেওয়া সঙ্গত মনে হল। যাতে ঘটনার ধারাবাহিকতায় রক্ষা হয়। এতদ্ভিন্ন এই ঘটনাগুলিও হযরত ইবরাহীম আ.-এরই যিন্দেগীর সাথে সংশ্লিষ্ট। সুতরাং তার উল্লেখ উপযুক্ত ক্ষেত্রেই হয়েছে। এখন হযরত ইবরাহীম আ.-এর জীবনের অবশিষ্ট অবস্থাবলীর প্রতি মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে।

বস্তুসমূহের স্বরূপ বা মূল তথ্যের অন্বেষণ ও অনুসন্ধান হযরত ইবরাহীম আ.-এর স্বভাবগত রুচি ছিল। তিনি প্রত্যেক বস্তুর তথ্য পর্যন্ত পৌঁছতে চেষ্টা করাকে নিজের জীবনের বিশেষ উদ্দেশ্য মনে করতেন। যাতে তার তথ্যাবলীর দ্বারা একমাত্র সত্তা আল্লাহ সুমহান সত্তা, তাঁর একত্ব এবং তাঁর অসীম ক্ষমতা সম্বন্ধে দিব্য বিশ্বাস লাভের পর বাস্তব বিশ্বাস লাভ করতে পারেন।

হযরত ইবরাহীম আ. পিতা আযর, কওম ও নমরূদের সঙ্গে বিতর্ক করার সময়ে তাঁর এই স্বভাবগত রুচির ভালোরূপে পরিচয় পাওয়া যায়। এ কারণে হযরত ইবরাহীম আ. "মৃত্যুর পর জীবিত হওয়া" সম্বন্ধে আল্লাহ পাকের দরবারে প্রার্থনা জানালেন, "আপনি কেমন করে মৃতদেরকে জীবন দান করবেন, দয়া করে আমাকে একটু দেখিয়ে দিন।” আল্লাহ তাআলা ইবরাহীম আ.-কে বললেন, হে ইবরাহীম! তুমি কি এই বিষয়টির ওপর ঈমান এবং দৃঢ় বিশ্বাস রাখ না? ইবরাহীম আ. তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলেন, কেন রাখব না? আমি নিঃসঙ্কোচে এর ওপর ঈমান রাখছি। কিন্তু আমার এই প্রার্থনা ঈমান ও ইয়াকীনের বিরোধী এই জন্যে নয়, আমি দৃঢ় জ্ঞানমূলক দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে সাথে দিব্য বিশ্বাস এবং বাস্তব বিশ্বাসের প্রার্থী। আমার আকাঙ্ক্ষা, আমাকে দিব্য চক্ষে দেখিয়ে দিন।

মৃত্যুর পরে জীবিত হওয়ার আকৃতি এবং রূপ কী হবে? তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, আচ্ছা যদি তুমি চাক্ষুষ দেখতে চাও, তবে কয়েকটি পাখি আনয়ন কর এবং তাদেরকে খণ্ড খণ্ড করে সামনের পাহাড়ের ওপর রেখে আসো। এরপর দূরে দাঁড়িয়ে তাদেরকে ডাক। হযরত ইবরাহীম আ. তা-ই করলেন। এরপর ইবরাহীম আ. যখন তাদেরকে ডাকলেন, তখন তাদের দেহের খণ্ডগুলি পৃথক পৃথকভাবে তৎক্ষণাৎ নিজেদের আকৃতিতে এসে গেল এবং জীবিত হয়ে হযরত ইবরাহীম আ.-এর নিকট উড়ে চলে আসল। কুরআন মাজীদের সূরা বাকারায় এ ঘটনাটি নিম্নরূপে বর্ণনা করা হয়েছে:

وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ أَرِنِي كَيْفَ تُحْيِ الْمَوْتَى قَالَ أَوَلَمْ تُؤْمِنْ قَالَ بَلَى وَلَكِنْ لِيَطْمَئِنَّ قَلْبِي قَالَ فَخُذْ أَرْبَعَةً مِنَ الطَّيْرِ فَصُرُهُنَّ إِلَيْكَ ثُمَّ اجْعَلْ عَلَى كُلِّ جَبَلٍ مِنْهُنَّ جُزْءًا ثُمَّ ادْعُهُنَّ يَأْتِينَكَ سَعْيًا وَاعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ

“(স্মরণ করুন) যখন ইবরাহীম বললেন, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে দেখান, আপনি কিভাবে মৃতদিগকে জীবিত করেন? আল্লাহ পাক বললেন, তুমি কি (এ বিষয়ের ওপর) ঈমান রাখ না? ইবরাহীম বললেন, কেন রাখব না? কিন্তু আমার মনের তৃপ্তি চাচ্ছি। আল্লাহ বললেন, তবে চারটি পক্ষী লও এবং এদেরকে খণ্ড খণ্ড করে নিকটস্থ পাহাড়গুলির ওপর তাদের এক এক খণ্ড রেখে দাও। এরপর তাদেরকে ডাক, তারা দৌড়িয়ে তোমার নিকটে চলে আসবে। আর তুমি জেনে রাখ, আল্লাহ তাআলা মহাশক্তিমান প্রজ্ঞাময়।" (সূরা বাকারা: ২৬০)

মধ্যস্থলে যেহেতু হযরত ইসমাঈল আ. ও হযরত ইসহাক আ.-এর আলোচনা চলে এসেছিল, তাই তাঁদের দুজনের ঘটনাবলী বর্ণনা করে দেওয়া সঙ্গত মনে হল। যাতে ঘটনার ধারাবাহিকতায় রক্ষা হয়। এতদ্ভিন্ন এই ঘটনাগুলিও হযরত ইবরাহীম আ.-এরই যিন্দেগীর সাথে সংশ্লিষ্ট। সুতরাং তার উল্লেখ উপযুক্ত ক্ষেত্রেই হয়েছে। এখন হযরত ইবরাহীম আ.-এর জীবনের অবশিষ্ট অবস্থাবলীর প্রতি মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে।

বস্তুসমূহের স্বরূপ বা মূল তথ্যের অন্বেষণ ও অনুসন্ধান হযরত ইবরাহীম আ.-এর স্বভাবগত রুচি ছিল। তিনি প্রত্যেক বস্তুর তথ্য পর্যন্ত পৌঁছতে চেষ্টা করাকে নিজের জীবনের বিশেষ উদ্দেশ্য মনে করতেন। যাতে তার তথ্যাবলীর দ্বারা একমাত্র সত্তা আল্লাহ সুমহান সত্তা, তাঁর একত্ব এবং তাঁর অসীম ক্ষমতা সম্বন্ধে দিব্য বিশ্বাস লাভের পর বাস্তব বিশ্বাস লাভ করতে পারেন।

হযরত ইবরাহীম আ. পিতা আযর, কওম ও নমরূদের সঙ্গে বিতর্ক করার সময়ে তাঁর এই স্বভাবগত রুচির ভালোরূপে পরিচয় পাওয়া যায়। এ কারণে হযরত ইবরাহীম আ. "মৃত্যুর পর জীবিত হওয়া" সম্বন্ধে আল্লাহ পাকের দরবারে প্রার্থনা জানালেন, "আপনি কেমন করে মৃতদেরকে জীবন দান করবেন, দয়া করে আমাকে একটু দেখিয়ে দিন।” আল্লাহ তাআলা ইবরাহীম আ.-কে বললেন, হে ইবরাহীম! তুমি কি এই বিষয়টির ওপর ঈমান এবং দৃঢ় বিশ্বাস রাখ না? ইবরাহীম আ. তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলেন, কেন রাখব না? আমি নিঃসঙ্কোচে এর ওপর ঈমান রাখছি। কিন্তু আমার এই প্রার্থনা ঈমান ও ইয়াকীনের বিরোধী এই জন্যে নয়, আমি দৃঢ় জ্ঞানমূলক দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে সাথে দিব্য বিশ্বাস এবং বাস্তব বিশ্বাসের প্রার্থী। আমার আকাঙ্ক্ষা, আমাকে দিব্য চক্ষে দেখিয়ে দিন।

মৃত্যুর পরে জীবিত হওয়ার আকৃতি এবং রূপ কী হবে? তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, আচ্ছা যদি তুমি চাক্ষুষ দেখতে চাও, তবে কয়েকটি পাখি আনয়ন কর এবং তাদেরকে খণ্ড খণ্ড করে সামনের পাহাড়ের ওপর রেখে আসো। এরপর দূরে দাঁড়িয়ে তাদেরকে ডাক। হযরত ইবরাহীম আ. তা-ই করলেন। এরপর ইবরাহীম আ. যখন তাদেরকে ডাকলেন, তখন তাদের দেহের খণ্ডগুলি পৃথক পৃথকভাবে তৎক্ষণাৎ নিজেদের আকৃতিতে এসে গেল এবং জীবিত হয়ে হযরত ইবরাহীম আ.-এর নিকট উড়ে চলে আসল। কুরআন মাজীদের সূরা বাকারায় এ ঘটনাটি নিম্নরূপে বর্ণনা করা হয়েছে:

وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ أَرِنِي كَيْفَ تُحْيِ الْمَوْتَى قَالَ أَوَلَمْ تُؤْمِنْ قَالَ بَلَى وَلَكِنْ لِيَطْمَئِنَّ قَلْبِي قَالَ فَخُذْ أَرْبَعَةً مِنَ الطَّيْرِ فَصُرُهُنَّ إِلَيْكَ ثُمَّ اجْعَلْ عَلَى كُلِّ جَبَلٍ مِنْهُنَّ جُزْءًا ثُمَّ ادْعُهُنَّ يَأْتِينَكَ سَعْيًا وَاعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ

“(স্মরণ করুন) যখন ইবরাহীম বললেন, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে দেখান, আপনি কিভাবে মৃতদিগকে জীবিত করেন? আল্লাহ পাক বললেন, তুমি কি (এ বিষয়ের ওপর) ঈমান রাখ না? ইবরাহীম বললেন, কেন রাখব না? কিন্তু আমার মনের তৃপ্তি চাচ্ছি। আল্লাহ বললেন, তবে চারটি পক্ষী লও এবং এদেরকে খণ্ড খণ্ড করে নিকটস্থ পাহাড়গুলির ওপর তাদের এক এক খণ্ড রেখে দাও। এরপর তাদেরকে ডাক, তারা দৌড়িয়ে তোমার নিকটে চলে আসবে। আর তুমি জেনে রাখ, আল্লাহ তাআলা মহাশক্তিমান প্রজ্ঞাময়।" (সূরা বাকারা: ২৬০)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00