📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 সিরিয়া, মিসর ও ফিলিস্তিন সফর

📄 সিরিয়া, মিসর ও ফিলিস্তিন সফর


এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন:

"দূত তার (ইবরাহীম) প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করল। ইবরাহীম বলল, আমি আমার প্রতিপালকের উদ্দেশে দেশ ত্যাগ করছি। তিনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আমি ইবরাহীমকে দান করলাম ইসহাক ও ইয়াকুব এবং তাঁর বংশধরদের জন্যে স্থির করলাম নবুয়ত ও কিতাব। আর আমি তাকে দুনিয়ায় পুরস্কৃত করেছিলাম। আখিরাতেও সে নিশ্চয়ই সৎকর্ম পরায়ণদের অন্যতম হবে।" (সূরা আনকাবুত: ২৬-২৭)

আল্লাহ তাআলা বলেন:

"এবং আমি তাকে ও লূতকে উদ্ধার করে সেই দেশে নিয়ে গেলাম, যেখানে আমি কল্যাণ রেখেছি বিশ্ববাসীর জন্য। এবং আমি ইবরাহীমকে দান করেছিলাম ইসহাক এবং পৌত্ররূপে ইয়াকুব। আর প্রত্যেককেই করেছিলাম সৎকর্মপরায়ণ। এবং তাদেরকে করেছিলাম নেতা। তারা আমার নির্দেশ অনুসারে মানুষকে পথপ্রদর্শন করত। তাদেরকে ওহী প্রেরণ করেছিলাম সৎকর্ম করতে, সালাত কায়েম করতে এবং যাকাত প্রদান করতে; তারা আমারই ইবাদত করত।" (সূরা আম্বিয়া: ৭১-৭৩)

হযরত ইবরাহীম আ. নিজের দেশ ও জাতিকে ত্যাগ করে আল্লাহর রাহে হিজরত করেন। তাঁর স্ত্রী ছিলেন বন্ধ্যা। তাঁর কোনো সন্তান হত না এবং তাঁর কোনো পুত্র সন্তান ছিল না। বরং ভাতিজা লূত ইবনে হারান ইবনে আযর তাঁর সঙ্গে ছিল। এমতাবস্থায় আল্লাহ তাঁকে একাধিক পুত্র সন্তান দান করেন এবং তাদের সকলেই পুণ্যবান ছিলেন। ইবরাহীম আ.-এর বংশে নবুয়ত এবং কিতাব প্রেরণের ধারা চালু রাখেন।

সুতরাং ইবরাহীম আ.-এর পরে যিনিই নবী হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন, তাঁর বংশ থেকেই হয়েছেন এবং তাঁর পরে যে কিতাবই আসমান থেকে কোনো নবীর উপর অবতীর্ণ হয়েছে, তা তাঁর বংশধরদের উপরই অবতীর্ণ হয়েছে। এ সব পুরস্কার আল্লাহ তাঁকে দিয়েছেন তাঁর ত্যাগ ও কুরবানী এবং আল্লাহর জন্যে দেশ, পরিজন ও আত্মীয়-স্বজনকে পরিত্যাগ করার বিনিময়ে। এমন দেশের উদ্দেশে তিনি হিজরত করেছেন, যেখানে আল্লাহর ইবাদত এবং বান্দাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বানের সুযোগ ছিল। তাঁর সেই হিজরতের দেশটি হল শাম বা সিরিয়া। এ দেশ সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন:

ওয়া লূতওয়ান ইলাল আরদিল লাতী বারাকনা ফীহা লীল আলামীন 'সে দেশের দিকে, যেখানে আমি বিশ্ববাসীর জন্য বরকত রেখে দিয়েছি।'

উবাই ইবনে কাব ও কাতাদা প্রমুখ এ মত পোষণ করেন। কিন্তু আওফীর সূত্রে ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, উপর্যুক্ত আয়াতে যে দেশের কথা বলা হয়েছে, সে দেশ হল মক্কা। সাথে সাথে এর সমর্থনে তিনি নিম্নের আয়াত উল্লেখ করেন:

ইন্না আউওয়ালা বাইতিন উদিয়া লিন নাসি লাল্লাযী বিবাক্কাতা মুবারাকাও ওয়া হুদাল লীল আলামীন

"নিঃসন্দেহে সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্যে স্থাপিত হয়েছে, সেটাই হচ্ছে এ ঘর, যা মক্কায় অবস্থিত এবং সারা জাহানেরর জন্যে হিদায়াত ও বরকতময়।" (আলে ইমরান: ৯৬)

কাব আহবার এর মতে সে দেশটি ছিল হারান। ইতঃপূর্বে আমরা আহলে কিতাবদের বরাত দিয়ে বলে এসেছি, হযরত ইবরাহীম আ. তাঁর ভাতিজা লূত আ., ভাই নাহর, স্ত্রী সারাহ ও ভাইয়ের স্ত্রী মালিকাসহ বাবেল থেকে রওনা হন এবং হারানে পৌঁছে সেখানে বসবাস শুরু করেন। সেখানে ইবরাহীম আ.-এর পিতা 'তারেখ'-এর মৃত্যু হয়।

সুদদী রহ. লিখেছেন, ইবরাহীম আ. ও লূত আ. সিরিয়ার উদ্দেশে রওনা হন। পথে সারাহর সাথে সাক্ষাৎ হয়। সারাহ ছিলেন হারানের রাজকুমারী। তিনি তাঁর সম্প্রদায়ের ধর্মকে কটাক্ষ করতেন। ইবরাহীম আ. তাঁকে এই শর্তে বিবাহ করেন, তাঁকে ত্যাগ করবেন না। ইবনে জারীর রহ. এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন; কিন্তু ঐতিহাসিকগণের আর কেউ এ কথা বর্ণনা করেন নি।

প্রসিদ্ধ মতে সারাহ হযরত ইবরাহীম আ.-এর চাচা হারান-এর কন্যা। যার নামে হারান রাজ্যের পরিচিত। সুহায়লী রহ. কুতায়বী ও নাফফাসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, সারাহ হযরত ইবরাহীম আ.-এর সহোদর হারানের কন্যা লূত এর ভগ্নি। এ মত সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অমূলক।

এ মত পোষণকারীরা দাবি করেছেন, সে সময় ভাতিজী বিবাহ করা বৈধ ছিল। কিন্তু এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। যদি ধরেও নেওয়া হয়, কোনো একসময় ভাতিজী বিবাহ করা বৈধ ছিল। যেমন ইহুদি পণ্ডিতরা বলে থাকে, তবুও এটা সম্ভব নয়। কেননা নিরুপায় অবস্থায় কোনো কিছু বৈধ হলেও তার সুযোগ গ্রহণ নবী-রাসূলগণের উন্নত চরিত্রের মর্যাদার পক্ষে শোভনীয় নয়। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

প্রসিদ্ধ মত হল, হযরত ইবরাহীম আ. যখন বাবেল থেকে হিজরত করেন, তখন সারাহকে সাথে নিয়েই বের হয়েছিলেন। যেমনটি পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহই সম্যক জ্ঞাত। আহলে কিতাবদের বর্ণনা মতে হযরত ইবরাহীম আ. যখন সিরিয়ায় যান তখন আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে জানান, তোমার পরে এ দেশটি আমি তোমার উত্তরসূরীদের আয়ত্ত করে দেব। এই অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা প্রকাশস্বরূপ তিনি সেখানে কুরবানীর একটি কেন্দ্র নির্মাণ করেন এবং বায়তুল মুকাদ্দাসের পূর্ব প্রান্তে তিনি নিজের থাকার জন্যে একটি গুম্বুজ বিশিষ্ট প্রকোষ্ঠ নির্মাণ করেন। এরপর তিনি জীবিকার অন্বেষণে বের হন। এ সময় বায়তুল মুকাদ্দাস অঞ্চলে ছিল প্রচণ্ড আকাল ও দুর্ভিক্ষ, তাই সবাইকে নিয়ে তিনি মিসরে চলে যান। এই সাথে আহলে কিতাবরা সারাহ এবং তথাকার রাজার ঘটনা, সারাহকে নিজের বোন বলে পরিচয় দিতে শিখিয়ে দেওয়া, রাজা কর্তৃক সারাহ এর খিদমতের জন্যে হাজেরাকে দান, এরপর সেখান থেকে তাদেরকে বহিষ্কার করা এবং বরকতময় বায়তুল মুকাদ্দাস অঞ্চলে বহু জীব-জন্তু, দাস-দাসী ও ধন-সম্পদসহ প্রত্যাবর্তন করার কথা উল্লেখ করেছেন।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 হযরত ইবরাহীম আ. মিথ্যা বলেছেন কি না?

📄 হযরত ইবরাহীম আ. মিথ্যা বলেছেন কি না?


ইমাম বুখারী রহ. আবু হোরায়রা রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন, হযরত ইবরাহীম আ. তিনবার অসত্য উক্তি করেছিলেন। দুটি আল্লাহ সংক্রান্ত।

(১) তিনি বলেছিলেন, اِنِّى سَقِيمٌ আমি পীড়িত।

(২) আরেকবার বলেছিলেন, بَلْ فَعَلَهُ كَبِيرُهُمْ هَذَا এর বড় মূর্তিটিই এ কর্মটি করেছে।

(৩) উক্তিটি করেছিলেন নিজের ব্যাপারে।

ঘটনা হল, হযরত ইবরাহমীম আ. স্ত্রী সারাহসহ এক জালেম বাদশার এলাকা অতিক্রম করছিলেন। বাদশার নিকট সংবাদ গেল, এই এলাকায় একজন লোক আছে যার সাথে রয়েছে এক পরমা সুন্দরী নারী। জালিম বাদশা হযরত ইবরাহীম আ.-এর নিকট লোক পাঠাল। আগন্তুক এসে হযরত ইবরাহীম আ.-কে সারাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল, ওনি কে? উত্তরে তিনি বললেন: আমার বোন। এরপর হযরত ইবরাহীম আ. সারাহর কাছে এসে বললেন, দেখ সারাহ! এই ধরাপৃষ্ঠে আমি এবং তুমি ব্যতীত আর কোনো মুমিন নেই। এই আগন্তুক তোমার সাথে আমার সম্পর্কের কথা জানতে চেয়েছে। আমি তাকে বলে দিয়েছি, তুমি আমার বোন। এখন আমাকে তুমি মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করো না। এরপর ওই জালিম বাদশাহ সারাহকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে লোক পাঠাল।

সারাহ বাদশাহর দরবারে নীত হলে, বাদশাহ তাঁর প্রতি হাত বাড়ায়। সঙ্গে সঙ্গে সে খোদার গযবে পতিত হয়। বাদশা বলল, সারাহ আমার জন্যে দুআ কর! আমি তোমার কোনো ক্ষতি সাধন করব না। সারাহ দুআ করলেন। ফলে বাদশাহ ছাড়া পায়। কিন্তু দ্বিতীয়বার সে সারাহর প্রতি হাত বাড়ায়। এবারও সে পূর্বের মতো কিংবা তদপেক্ষা কঠিনভাবে তার ওপর শাস্তি নেমে আসে। পুনর্বার বাদশা বলল, আমার জন্যে দুআ কর! আমি তোমার কোনো অনিষ্ট করব না। সারাহ দুআ করলে সে পুনরায় রক্ষা পায়। তখন বাদশা তার উজিরকে ডেকে বলে, তুমি তো আমার কাছে কোনো মানবী আন নি, এনেছ এক দানবী। পরে বাদশা সারাহর খেদমতের জন্যে হাজেরাকে দান করল। সারাহ ইবরাহীম আ.-এর কাছে ফিরে এসে তাঁকে সালাত আদায় করতে দেখতে পান। হযরত ইবরাহীম আ. সালাতে থেকেই হাতের ইশারা দ্বারা ঘটনা জানতে চাইলেন। সারাহ বললেন, আল্লাহ অনাচারী কাফিরের চক্রান্ত নস্যাৎ করে দিয়েছেন এবং ওই জালিম আমার খেদমতের জন্যে হাজেরাকে দিয়েছে।

আবু হোরায়রা রাযি. বলেন, হে বেদুঈন আরব সন্তানরা! এই হাজেরাই তোমাদের আদি মাতা। ইমাম বুখারী রহ. একক সূত্রে হাদিসটি মওকূফরূপে বর্ণনা করেছেন।

হাফিজ আবু বকর আল বাযযার রহ. আবু হোরায়রা রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: হযরত ইবরাহীম আ. মাত্র তিনবার ছাড়া কখনও অসত্য উক্তি করেন নি। ওই তিনটি উক্তিই ছিল আল্লাহ সংক্রান্ত।

(১) নিজেকে (ইন্নী সাক্বীম) (আমি পীড়িত) বলা।

(২) (বাল ফাআলাহূ কাবীরুহুম) (এদের বড়টাই এ কাজ করেছে) বলা।

(৩) হযরত ইবরাহীম আ.-কোনো এক জালিম রাজার এলাকা দিয়ে সফর করার সময় কোনো এক মঞ্জিলে অবতরণ করেন। জালিম রাজা তথায় আগমন করে। তাকে জানানো হয় যে, এখানে একজন লোক এসেছেন। যার সাথে এক পরমা সুন্দরী রমণী আছে। রাজা তখনই ইবরাহীম আ.-এর নিকট লোক প্রেরণ করে। সে এসে মহিলাটি সম্পর্কে ইবরাহীম আ.-কে জিজ্ঞেস করল। তিনি বললেন, সে আমার বোন। এরপর ইবরাহীম আ. তাঁর স্ত্রীর কাছে আসেন এবং বলেন, একটি লোক তোমার সম্পর্কে আমার কাছে জিজ্ঞেস করেছে। আমি তোমাকে আমার বোন বলে পরিচয় দিয়েছি। এখন আমি আর তুমি ছাড়া পৃথিবীতে আর কোনো মুসলমান নেই। এ হিসেবে তুমি আমার বোনও বটে। সুতরাং রাজার কাছে আমাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করো না যেন। রাজা তাঁর দিকে হাত বাড়াতেই আল্লাহর পক্ষ থেকে এক আযাব এসে তাকে পাকড়াও করে। রাজা বলল, তুমি আল্লাহর কাছে দুআ কর! আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব না। তিনি দুআ করেন। ফলে সে মুক্ত হয়। কিন্তু পরক্ষণে আবার তাঁকে ধরার জন্যে হাত বাড়ায়।

এবারও আল্লাহর পক্ষ থেকে পূর্বের মতো কিংবা তদপেক্ষা শক্তভাবে পাকড়াও হয়। রাজা পুনরায় বলল, আমার জন্যে আল্লাহর নিকট দুআ কর, তোমার কোনো ক্ষতি আমি করব না। সুতরাং তিনি দুআ করায় সে মুক্তি পেয়ে যায়। এরূপ তিনবার ঘটে। এরপর রাজা তার সর্বাপেক্ষা ঘনিষ্ঠ অনুচরকে ডেকে বলল, তুমি তো কোনো মানবী আন নি; এনেছ দানবী। একে বের করে দাও এবং হাজেরাকেও সাথে দিয়ে দাও।

বিবি সারাহ ফিরে আসলেন। ইবরাহীম আ. তখন সালাতে রত ছিলেন। সারাহর শব্দ পেয়েই তিনি তাঁর দিকে ফিরে তাকালেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, ঘটনা কি? সারাহ বললেন, 'আল্লাহ জালিমের চক্রান্ত ব্যর্থ করে দিয়েছেন। আর সে আমার খিদমতের জন্যে হাজেরাকে দান করেছে।'

বাযযার রহ. বলেছেন, মুহাম্মদ রহ.-এর সূত্রে আবু হোরায়রা রাযি. থেকে হিশাম ব্যতীত কেউ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন বলে আমার জানা নেই। অন্যরা একে 'মওকূফ' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইমাম আহমদ রহ. আবু হোরায়রা রাযি. এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: হযরত ইবরাহীম আ. তিনবার ছাড়া কখনও মিথ্যা কথা বলেন নি।

(১) কাফিররা যখন তাদের মেলায় যাওয়ার জন্যে আহ্বান জানায়, তখন তিনি বলেছিলেন, ইন্নী সাক্বীম (আমি পীড়িত)।

(২) তিনি মূর্তি ভেঙ্গে বলেছিলেন, বাল ফাআলাহূ কাবীরুহুম হাজা (এদের মধ্যে এই বড়টিই এ কাজ করেছে।)

(৩) নিজের স্ত্রী সারাহর পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন: ইন্নাহা উখতী (এ আমার বোন)।

বর্ণনাকারী বলেন: হযরত ইবরাহীম আ. একবার কোনো এক জনপদে প্রবেশ করেন। সেখানে ছিল এক জালিম রাজা। তাকে জানানো হল, এ রাত্রে ইবরাহীম এক পরমা সুন্দরী নারীসহ এখানে এসেছে। রাজা তাঁর কাছে দূত পাঠাল। দূত হযরত ইবরাহীম আ.-কে জিজ্ঞেস করল। আপনার সাথী এ রমণীটি কে? ইবরাহীম আ. বললেন, আমার বোন। দূত বলল, একে রাজার কাছে পাঠিয়ে দিন।

হযরত ইবরাহীম আ. পাঠিয়ে দিলেন এবং বলে দিলেন, আমার উক্তিকে তুমি মিথ্যা প্রতিপন্ন করো না। কারণ, রাজাকে আমি জানিয়েছি, সম্পর্কে তুমি আমার বোন। বাস্তবে এ পৃথিবীর বুকে আমি এবং তুমি ছাড়া আর কোনো মুমিন নেই। সারাহ রাজার দরবারে পৌঁছলে সে সারাহর দিকে অগ্রসর হল। সারাহ তখন অযু করে সালাত আদায় করে এ দোয়াটি পড়লেন-

আল্লা-হুম্মা ইন কুনতা তালামু আন্নী আমানতু বিকা বি রসূলিকা ওয়া আহসানতু ফারজী ইল্লা আলা যাওজী ফালা তুসালিলত আলাল কাফির।

'হে আল্লাহ! আপনি অবশ্যই অবগত আছেন, আমি আপনার উপর ও আপনার রাসূলের উপর ঈমান এনেছি। আমার স্বামী ব্যতীত অন্য সবার থেকে আমার লজ্জাস্থানকে হিফাজত করেছি। অতএব কোনো কাফিরকে আমার উপর হস্তক্ষেপ করতে দিবেন না।

জালিম রাজাকে তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে এমনভাবে টুটি চেপে ধরা হল যে, পায়ের সাথে পা ঘর্ষণ করে ছটফট করতে লাগল। আবুয যিনাদ রহ. হযরত আবু হোরায়রা রাযি.-এর সূত্রে বলেন, সারাহ তখন পুনরায় দোয়া করেন, 'হে আল্লাহ! লোকটি এভাবে মারা গেলে লোকে বলবে আমিই তাকে হত্যা করেছি। অতএব রাজা শাস্তি থেকে মুক্তি লাভ করল।

কিন্তু পুনরায় রাজা তার দিকে অগ্রসর হল। সারাহও পূর্বের মতো অযু ও সালাত শেষে ওই দোয়াটি পড়লেন। রাজা পুনরায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ছটফট করতে থাকে। এ দেখে সারাহ বললেন, "হে আল্লাহ! এ যদি মারা যায় তবে লোকে বলবে ওই মহিলাটিই তাকে হত্যা করেছে।" এরপর সে মুক্তি লাভ করে। এভাবে তৃতীয় বা চতুর্থ বারের পর জালিম রাজা তার লোকদেরকে ডেকে বলল, তোমরা আমার কাছে তো একটা দানবী পাঠিয়েছ। একে ইবরাহীমের নিকট ফিরিয়ে দাও আর হাজেরাকেও এর সাথে দিয়ে দাও। বিবি সারাহ ফিরে এসে হযরত ইবরাহীম আ.কে জানালেন, আপনি কি জানতে পেরেছেন, আল্লাহ কাফিরদের চক্রান্ত ব্যর্থ করে দিয়েছেন এবং ওই জালিম একজন দাসীকেও দান করেছে?

কেবল ইমাম আহমদ রহ. এ সূত্রে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। সহি সনদের শর্ত অনুযায়ী। ইমাম বুখারী রহ. আবু হোরায়রা রাযি.-এর সূত্রে মারফুভাবে হাদিসটি সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণনা করেছেন।

ইবনে আবু হাতেম হযরত আবু সাঈদ রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: হযরত ইবরাহীম আ. যে তিনটি কথা বলেছিলেন, তার প্রতিটিই আল্লাহর দীনের গ্রন্থি উম্মোচন করে। তাঁর প্রথম কথা: ইন্নী সাক্বীম (আমি পীড়িত), দ্বিতীয় কথা: বাল ফাআলাহূ কাবীরুহুম হাজা (বরং এদের বড়জনই এ কাজ করেছে), তৃতীয় কথা: যখন রাজা তার স্ত্রীকে কামনা করেছিল, তখন বলেছিলেন, হিয়া উখতী (সে আমার বোন) অর্থাৎ আল্লাহর দীনের সম্পর্কে বোন।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 কোনো মহিলা নবী ছিলেন কি না?

📄 কোনো মহিলা নবী ছিলেন কি না?


কোনো কোনো বিজ্ঞ আলেমের মতে তিনজন মহিলা নবী ছিলেন। (১) সারাহ (২) হযরত মূসা আ.-এর মা (৩) মরিয়াম। কিন্তু অধিকাংশের মতে তাঁরা তিনজন সিদ্দীকা (সত‍্যপরায়ণা) ছিলেন। আমি কোনো কোনো বর্ণনায় দেখেছি। বিবি সারাহ যখন ইবরাহীম আ.-এর নিকট থেকে জালিম বাদশাহর কাছে যান, তখন থেকে তাঁর ফিরে আসা পর্যন্ত আল্লাহ ইবরাহীম আ. ও সারাহর মধ্যকার, পর্দা উঠিয়ে নেন। ফলে রাজার কাছে তাঁর থাকাকালীন যা যা ঘটছিল সবই তিনি প্রত্যক্ষ করছিলেন।

আল্লাহ এ ব্যবস্থা করেছিলেন, যাতে ইবরাহীম আ.-এর হৃদয় পবিত্র থাকে, চক্ষু শীতল থাকে এবং তিনি অন্তরে প্রশান্তি বোধ করেন। কেননা হযরত ইবরাহীম আ. সারাহকে তার দীনের জন্যে, আত্মীয়তার সম্পর্কের জন্যে ও অনুপম সৌন্দর্যের জন্যে তাকে গভীরভাবে মহব্বত করতেন। কেউ কেউ বলেছেন, বিবি হাওয়ার পর থেকে সারাহর যুগ পর্যন্ত তাঁর চাইতে অধিক সুন্দরী কোনো নারীর জন্ম হয় নি। সকল প্রশংসা আল্লাহরই।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 কে সেই রাজা!

📄 কে সেই রাজা!


কোনো কোনো ইতিহাসবিদ লিখেছেন, এই সময়ে মিসরের ফেরাউন ছিল বিখ্যাত জালিম বাদশাহ জাহহাকের ভাই। সে তার ভাইয়ের পক্ষ থেকে মিসরের শাসনকর্তা ছিল। তার নাম কেউ বলেন, সিনান ইবনে আলওয়ান ইবনে উবায়দ ইবনে উওয়ায়জ ইবনে আমলাক ইবনে লাওদ ইবনে সাম ইবনে নূহ। ইবনে হিশাম 'তীজান' নামক গ্রন্থে বলেছেন, যে রাজা সারাহর উপর লোভ করেছিল, তার নাম আমর ইবনে ইমরুল কায়স ইবনে মাইলুন ইবনে সাবা। সে মিসরের শাসনকর্তা ছিল। আল্লাহই সম্যক জ্ঞাত।

এরপর হযরত ইবরাহীম আ. মিসর থেকে তাঁর পূর্ববর্তী বাসস্থান বরকতের দেশ তথা বায়তুল মুকাদ্দাস যান। তাঁর সাথে বহু পশু সম্পদ, গোলাম, বাঁদী ও ধন-সম্পদ ছিল। মিসরের কিবতী বংশোদ্ভুত হাজেরাও সাথে ছিলেন। এই সময় হযরত লুত আ. তাঁর ধন-সম্পদসহ হযরত ইবরাহীম আ.-এর আদেশক্রমে পাশের দেশে চলে যান। 'গাওরে-যাগার' নামে এ স্থানটি প্রসিদ্ধ ছিল। তিনি সে অঞ্চলে ওই যুগের প্রসিদ্ধ শহর সদূমে অবতরণ করেন। শহরের বাসিন্দারা ছিল কাফির, পাপাসক্ত ও দুষ্কৃতকারী। আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহীম আ.-কে দৃষ্টি প্রসারিত করে উত্তর দক্ষিণ পূর্ব ও পশ্চিমে তাকাতে বলেন এবং সু-সংবাদ দেন, এই সমুদয় স্থান তোমাকে ও তোমার উত্তরসূরিদের চিরদিনের জন্য দান করব। তোমার সন্তানদের সংখ্যা এত বৃদ্ধি করে দেব, তাদের সংখ্যা পৃথিবীর বালুকণার সমান হয়ে যাবে। এই সুসংবাদ পূর্ণ মাত্রায় প্রতিফলিত হয়, বিশেষ করে এই উম্মতে মুহাম্মদিয়ার ক্ষেত্রে একটি হাদিস থেকে এর সমর্থন পাওয়া যায়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: আল্লাহ আমার সম্মুখে পৃথিবীর এক অংশকে ঝুঁকিয়ে দেন। আমি তার পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্ত দেখে নিলাম। অচিরেই উম্মতের রাজত্ব এই দেখান সীমানা পর্যন্ত বিস্তার লাভ করবে। ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, কিছুদিন পর ঐ দুরাচার লোকেরা হযরত লূত আ.-এর উপর চড়াও হয় এবং তাঁর পশু ও ধন-সম্পদ কেড়ে নিয়ে তাঁকে বন্দী করে রাখে। এ সংবাদ হযরত ইবরাহীম আ.-এর নিকট পৌঁছলে তিনি তিন শ আঠারজন সৈন্য নিয়ে তাদের উপর আক্রমণ করেন এবং লূত আ.-কে উদ্ধার করেন, তাঁর সম্পদ ফিরিয়ে আনেন।

আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিপুল সংখ্যক শত্রুকে হত্যা করেন। শত্রু বাহিনীকে পরাজিত করেন ও তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে তিনি দামেশকের পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছেন। শহরের উপকণ্ঠে বারযাহ নামক স্থানে সেনাছাউনি স্থাপন করেন। আমার ধারণা এ স্থানকে "মাকামে ইবরাহীম" বলার কারণ এটাই, এখানে ইবরাহীম খলীলুল্লাহর সৈন্য বাহিনীর শিবির ছিল।

তারপর ইবরাহীম আ. আল্লাহর সাহায্যপুষ্ট অবস্থায় বিজয়ীর বেশে নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। বায়তুল মুকাদ্দাসের শহরসমূহের শাসকবর্গ শ্রদ্ধাভরে ও বিনীতভাবে এসে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। তিনি সেখানেই বসবাস করতে থাকেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px