📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 হযরত ইবরাহীম আ.-এর প্রতি মাতৃস্নেহ

📄 হযরত ইবরাহীম আ.-এর প্রতি মাতৃস্নেহ


ইবনে আসাকির রহ. ইকরামা রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন: ইবরাহীম আ.-এর মা পুত্রকে এ অবস্থায় দেখে ডেকে বলেছিলেন, হে আমার প্রিয় পুত্র! আমি তোমার নিকট আসতে চাই। আল্লাহর কাছে একটু বল, যাতে তোমার চারপাশের আগুন থেকে আমাকে রক্ষা করেন। ইবরাহীম আ. বললেন, হ্যাঁ বলছি। তারপর মা পুত্রের নিকট চলে গেলেন। আগুন তাঁকে স্পর্শ করল না। কাছে গিয়ে মাতা আপন পুত্রকে আলিঙ্গন ও চুম্বন করলেন এবং পুনরায় অক্ষতভাবে সেখান থেকে বের হয়ে এলেন।

মিনহাল ইবনে আমর রাযি. বর্ণনা করেছেন : হযরত ইবরাহীম আ. আগুনের মধ্যে চল্লিশ কিংবা পঞ্চাশ দিন অবস্থান করেন। এই সময় সম্পর্কে হযরত ইবরাহীম আ. বলেন: আগুনের মধ্যে আমি যতদিন ছিলাম, ততদিন এমন শান্তি ও আরামে কাটিয়েছি, তার চেয়ে অধিক আরামের জীবন আমি কখনো উপভোগ করি নি।

তিনি আরো বলেন: আমার গোটা জীবন যদি ওইরূপ অবস্থায় কাটত, তবে কতই না উত্তম হত! এভাবে হযরত ইবরাহীম আ.-এর সম্প্রদায় শত্রুতাবশত প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল; কিন্তু তারা ব্যর্থ হল। তারা গৌরব অর্জন করতে চেয়েছিল, কিন্তু লাঞ্ছিত হল। তারা বিজয়ী হতে চেয়েছিল, কিন্তু পরাজিত হল। আল্লাহ বলেন: "তারা চক্রান্ত করে ক্ষতি করতে চেয়েছিল, কিন্তু আমি তাদের অধিকতর ক্ষতিগ্রস্ত করে দেয়।"

অপর আয়াতে আছে : "আমি তাদেরকে হীনতম করে দিই।" এরূপ দুনিয়ার জীবনে তারা ক্ষতি ও লাঞ্ছনাপ্রাপ্ত হয় আর আখিরাতের জীবনে তাদের ওপর আগুন না শীতল হবে, না শান্তিদায়ক হবে বরং সেখানকার অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন: "জাহান্নাম হল তাদের জন্যে নিকৃষ্ট আবাস ও ঠিকানা।" (সূরা ফুরকান: ৬৬)

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 গিরগিটি হত্যা করা

📄 গিরগিটি হত্যা করা


ইমাম বোখারি রহ. উম্মে শারিক রহ. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গিরগিটি মারার আদেশ দিয়েছেন। বলেছেন, ইবরাহীম আ.-এর বিরুদ্ধে এটি আগুনে ফুঁক দিয়েছিল। ইমাম মুসলিম রহ. ইবনে জুরায়জ রহ. সূত্রে এবং বোখারি, মুসলিম, নাসাঈ ও ইবনে মাজাহ রহ. সুফিয়ান ইবনে উয়ায়না রহ.-এর সূত্রে এ হাদিস বর্ণনা করেছেন।

ইমাম আহমাদ রহ. আয়েশা রাযি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা গিরগিটি হত্যা কর! কারণ, সে ইবরাহীম আ.-এর বিরুদ্ধে আগুনে ফুঁক দিয়েছিল। তাই হযরত আয়েশা রাযি. গিরগিটি হত্যা করতেন।

ইমাম আহমাদ রহ. নাফে রহ. এর সূত্রে বর্ণনা করেন, জনৈক মহিলা হযরত আয়েশা রাযি. এর গৃহে প্রবেশ করে একটি বর্শা দেখে জিজ্ঞেস করলেন: এ বর্শা দ্বারা আপনি কি করেন? উত্তরে আয়েশা রাযি. বললেন, এর দ্বারা আমি গিরগিটি নিধন করি। তারপর তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ইবরাহীম আ.-কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হয়, তখন সমস্ত জীব-জন্তু ও কীট-পতঙ্গ আগুন নিভাতে চেষ্টা করেছিল। কেবল গিরগিটি তা করে নি। উল্টো সে আগুনে ফুঁক দিয়েছিল। উপর্যুক্ত হাদিস দুটি ইমাম আহমাদ রহ. ছাড়া আর কেউ বর্ণনা করেন নি।

ইমাম আহমদ ... ফাকিহ ইবনুল মুগিরার মুক্ত দাসী সুমামা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: আমি একদা আয়েশা রাযি. এর গৃহে গেলাম। তখন সেখানে একটা বর্শা রাখা আছে দেখতে পেলাম। জিজ্ঞেস করলাম, হে উম্মুল মুমিনীন! এ বর্শা দিয়ে আপনি কী করেন? তিনি বললেন, এটা দিয়ে আমি গিরগিটি বধ করি। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে বলেছেন: ইবরাহীম আ.-কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হয়, তখন জমীনের উপর এমন কোনো জীব ছিল না, যারা আগুন নেভাতে চেষ্টা করে নি, কেবল এই গিরগিটি ব্যতীত। সে ইবরাহীম আ.-এর উপরে আগুনে ফুঁক দিয়েছিল। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে এগুলো হত্যা করতে আদেশ করেছেন। ইবনে মাজাহ রহ. জারির ইবনে হাযেম রাযি.-এর সূত্রে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 খোদায়ী দাবিদার

📄 খোদায়ী দাবিদার


أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِي حَاجَّ إِبْرَاهِيمَ فِي رَبِّهِ أَنْ آتَاهُ اللهُ الْمُلْكَ إِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّيَ الَّذِي يُحْيِي وَيُمِيتُ قَالَ أَنَا أُحْيِي وَأُمِيتُ قَالَ إِبْرَاهِيمُ فَإِنَّ اللَّهَ يَأْتِي بِالشَّمْسِ مِنَ الْمَشْرِقِ فَأْتِ بِهَا مِنَ الْمَغْرِبِ فَبُهِتَ الَّذِي كَفَرَ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ

এ বিষয়ে আমরা আলোচনা করেছি। আরও কিছু বিষয় এখানে আলোচনা করা হবে। এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহীম আ.-এর সাথে সেই সীমালঙ্ঘন কারী নিজেকে প্রতিপালক দাবিকারী প্রতাপশালী রাজার বিতর্কের কথা উল্লেখ করেছেন। হযরত ইবরাহীম খলীল আ. তার উপস্থাপিত যুক্তির অসারতা প্রমাণ করেন, তার মূর্খতা ও স্বল্পবুদ্ধিতা প্রকাশ করে দেন এবং নিজের দলিল দ্বারা তাকে নিরুত্তর করে দেন।

তাফসীরবিদ, ঐতিহাসিক ও বংশবিদদের মতে এ রাজা ছিল ব্যাবিলনের। মুজাহিদ রহ. তার নাম নমরূদ ইবনে কিনান ইবনে কৃশ ইবনে সাম ইবনে নূহ বলে উল্লেখ করেছেন। অন্যরা তার বংশধারা বলেছেন: নমরূদ ইবনে ফালিহ ইবনে আবির ইবনে সালিহ ইবনে আরফাখশাদ ইবনে সাম ইবনে নূহ।

মুজাহিদ রহ. ও প্রমুখ বলেছেন, যেসব রাজা-বাদশা দুনিয়া জোড়া রাজত্ব করেছে, এ ছিল তাদের অন্যতম। ঐতিহাসিকদের মতে এরূপ বাদশার সংখ্যা ছিল চারজন। দু'জন মুমিন ও দু'জন কাফির। মুমিন দু'জন হলেন, (১) যুলকারনাইন ও (২) সুলাইমান আ. আর কাফির দুজন হল (১) নমরূদ ও (২) বুখতে নসর। ঐতিহাসিকদের মতে নমরূদ চার শ বছরকালব্যাপী রাজত্ব করেছিল। ফলে সে জুলুম-অত্যাচার, দাম্ভিকতা ও সীমালঙ্ঘনের চরমে গিয়ে পৌঁছে এবং পার্থিব জীবনকেই সে চরম লক্ষ্য বলে বেছে নেয়। ইবরাহীম আ. যখন তাকে এক ও লা-শরীক আল্লাহর ইবাদতের জন্যে আহ্বান জানালেন, তখন তার মূর্খতা, পথ-ভ্রষ্টতা ও উচ্চাভিলাষ তাকে সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করতে প্ররোচিত করে। এ ব্যাপারে সে ইবরাহীম আ.-এর সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয় এবং নিজেই প্রতিপালক হওয়ার দাবি করে। হযরত ইবরাহীম আ. যখন বললেন আমার প্রতিপালক তো তিনি, যিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান। নমরূদ বলল, আমিও তো জীবন দান করি ও মৃত্যু ঘটাই।

কাতাদা, সুদদী ও মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক রহ. লিখেছেন: নমরূদ ওই সময় মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত দু ব্যক্তিকে ডেকে আনে। এরপর একজনকে হত্যা করে ও অপরজনকে ক্ষমা করে দেয়। এর দ্বারা সে বোঝাতে চায়, সে-ও একজনকে জীবন দান করল এবং অন্যজনের মৃত্যু দিল। এ কাজটি ইবরাহীম আ.-এর দলীলের কোনো মুকাবিলাই ছিল না বরং তা বিতর্কের সাথে সামাঞ্জস্যহীন একটা উদ্ভট দুষ্কর্ম ছাড়া কিছুই নয়। কেননা হযরত ইবরাহীম আ. বিদ্যমান সৃষ্ট বস্তুর দ্বারা সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব প্রমাণ করছেন। আবার কিছু দিন পর সেগুলো মৃত্যুবরণ করছে।

এ থেকেই বোঝা যায়, এ কাজের একজন কর্তা আছেন। যিনি প্রাণীকে সৃষ্টি করছেন ও মৃত্যু দিচ্ছেন। কারণ, কর্তা ছাড়া আপনা-আপনি কোনো কিছু হওয়া অসম্ভব। সুতরাং বিশ্বজগতে প্রাণী-অপ্রাণী যা কিছু আছে, তা একবার অস্তিত্বে আসা ও দ্বিতীয়বার অস্তিত্ব লোপ পাওয়া, সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করা; নক্ষত্র, বায়ু, মেঘমালা ও বৃষ্টি পরিচালনা করা ইত্যাদি কাজের জন্যে অবশ্যই একজন কর্তা আছেন। সে জন্যে ইবরাহীম আ. বললেন,

রব্বিয়িল্লাজি ইউহয়ি ওয়া ইউমীত

"আমার প্রতিপালক তিনিই, যিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান।" অতএব এ মূর্খ বাদশার এই যে দাবি "আমিও জীবন দান করি ও মৃত্যু ঘটাই"- এর দ্বারা যদি বোঝানো হয়ে থাকে, সে-ই দৃশ্যমান জগতের কর্তা, তবে এটা বৃথা দম্ভ ও বাস্তবকে অস্বীকার করা ছাড়া আর কিছুই নয়। অন্যথায় এ কথার দ্বারা যদি তা-ই বোঝানো হয়ে থাকে, যার উল্লেখ মুজাহিদ, সুদদী ও ইবনে ইসহাক রহ. করেছেন, তা হলে এ কথার কোনো মূল্যই নেই। কেননা ইবরাহীম আ.-এর পেশকৃত দলীলের খণ্ডন তাতে হয় না।

বাদশাহ নমরূদের এই যুক্তির অসারতা উপস্থিত অনেকের কাছে অস্পষ্ট হওয়ায় এবং অনুপস্থিতদের নিকট অস্পষ্ট হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকায় হযরত ইবরাহীম আ. আরো একটি যুক্তি পেশ করেন, যার দ্বারা সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব ও নমরূদের মিথ্যা দাবি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়।

কলা ইবরাহীমু ফায়িন্নাল্লাহা ইয়াতি বিশশামসি মিনাল মাশরিক্বি ফাতি বিহা মিনাল মাগরিব

"ইবরাহীম আ. বললেন, আল্লাহ তো সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন, তুমি একে পশ্চিম দিক থেকে উদিত করাও দেখি!”

অর্থাৎ এই সূর্য আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে প্রত্যহ পূর্ব দিক থেকে উদিত হয় এবং নির্দিষ্ট কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করে। এই আল্লাহ এক, অন্য কোনো ইলাহ নেই। তিনিই সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা। এখন তোমার জীবন দান ও মৃত্যু ঘটানোর দাবি যদি যথার্থ হয়, তবে এ সূর্যকে তুমি পশ্চিম দিক থেকে উদিত কর। কেননা যিনি জীবন দান ও মৃত্যু ঘটাতে পারেন, তিনি যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারেন। তাঁর ইচ্ছাকে কেউ বাধা দিতে পারে না, তাঁকে কেউ অক্ষম করতে পারে না। বরং সব কিছুর উপরই তাঁর কর্তৃত্ব চলে সব কিছুই তাঁর নির্দেশ মানতে বাধ্য।

অতএব নিজের দাবি অনুযায়ী তুমি যদি প্রতিপালক হয়ে থাক, তা হলে এটা করে দেখাও। আর যদি তা করতে না পার, তবে তোমার দাবি মিথ্যা। কিন্তু তুমিও জান এবং অন্যান্য প্রত্যেকেই জানে, এ কাজ করতে তুমি সক্ষম নও। এ তো দূরের কথা, একটা সামান্য মশা সৃষ্টি করাও তোমার পক্ষে সম্ভব নয়। এ যুক্তি প্রদর্শনের পরে নমরূদের ভ্রষ্টতা, মুর্খতা, মিথ্যাচার ও মূর্খ সমাজের কাছে তার দাম্ভিকতা স্পষ্ট হয়ে যায়। সে কোনো উত্তর দিতে সক্ষম হল না; নীরব-নিশ্চুপ হয়ে গেল। আল্লাহ তাআলা বলেন: ফাবুহিতাল্লাজি কাফারা ওয়াল্লাহু লা ইয়াহদিল কওমাজ জোয়ালিমীন কাফির লোকটি হতভম্ব হয়ে গেল। আর জালিম সম্প্রদায়কে আল্লাহ সুপথ দেখান না। (সূরা বাকারা: ২৫৮)

সুদদী রহ. লিখেছেন, নমরূদ ও ইবরাহীম আ.-এর মধ্যে এ বিতর্ক অগ্নি থেকে বের হয়ে আসার দিনের ঘটনা। এবং সেখানে লোকের কোনো জামায়েত ছিল না। কেবল দুজনের মধ্যেই বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়।

আব্দুর রাজ্জাক হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেছেন : নমরূদের নিকট সঞ্চিত খাদ্যভাণ্ডার ছিল। লোকজন দলে দলে তার নিকট খাদ্য আনার জন্যে যেত। হযরত ইবরাহীম আ.ও এরূপ একদলের সাথে খাদ্য আনতে যান। সেখানে বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। ফলে নমরূদ ইবরাহীম আ.-কে খাদ্য না দিয়ে ফিরিয়ে দেয়। ইবরাহীম আ. শূন্যপাত্র নিয়ে বেরিয়ে আসেন। বাড়ির কাছে এসে তিনি দুটি পাত্রে মাটি ভর্তি করে আনেন এবং মনে মনে ভাবেন, বাড়ি পৌঁছে সাংসারিক কাজে জড়িয়ে পড়বেন। বাড়ি পৌঁছে বাহন রেখে তিনি ঘরে প্রবেশ করে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে বসে পড়েন।

কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। ইবরারহীম আ.-এর স্ত্রী সারাহ পাত্র দুটির কাছে গিয়ে উৎকৃষ্ট খাদ্যদ্রব্য দ্বারা তা ভর্তি দেখতে পান এবং তা দ্বারা খাদ্য তৈরি করেন। ঘুম থেকে জেগে হযরত ইবরাহীম আ. রান্না করা খাদ্য দেখে জিজ্ঞেস করলেন, এ তোমরা কোথেকে পেলে? সারাহ জানালেন, আপনি যা এনেছেন তা থেকেই তৈরি করা হয়েছে। এ সময় ইবরাহীম আ. বুঝতে পারলেন, আল্লাহ তাআলা বিশেষ খাদ্য হিসেবে তাদেরকে এ রিযিক দান করেছেন।

যায়েদ ইবনে আসলাম রাযি. বর্ণনা করেছেন, উক্ত অহংকারী বাদশাহর নিকট আল্লাহ একজন ফেরেশতা প্রেরণ করেন। ফেরেশতা তাকে আল্লাহর উপর ঈমান আনতে বললে সে অস্বীকার করে। পুনরায় দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার আহ্বান জানালে প্রত্যেকবারেই সে অস্বীকৃতি জানায় এবং বলে দেয়, তুমি তোমার বাহিনী একত্র কর আর আমি আমার বাহিনী একত্র করি। পরের দিন সূর্যোদয়ের সময় নমরূদ তার সৈন্য-সামন্তের সমাবেশ ঘটায়। অপরদিকে আল্লাহ অগণিত মশা প্রেরণ করলেন। মশার সংখ্যা এত বেশি ছিল, তাতে তারা সূর্যের মুখ পর্যন্ত দেখতে সক্ষম হয় নি। আল্লাহ মশা বাহিনীকে তাদের উপর লেলিয়ে দেন। ফলে মশা তাদের রক্তমাংস খেয়ে সাদা হাড্ডি বের করে ফেলে। একটি মশা নমরূদের নাকের ছিদ্রপথে প্রবেশ করে। চারশ বছর এই মশা তার নাকের ছিদ্রে অবস্থান করে দংশন করতে থাকে। এই দীর্ঘ সময়ে সে হাতুড়ি দ্বারা নিজের মাথা ঠুকাতে থাকে। অবশেষে এভাবেই আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেন।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 সিরিয়া, মিসর ও ফিলিস্তিন সফর

📄 সিরিয়া, মিসর ও ফিলিস্তিন সফর


এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন:

"দূত তার (ইবরাহীম) প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করল। ইবরাহীম বলল, আমি আমার প্রতিপালকের উদ্দেশে দেশ ত্যাগ করছি। তিনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আমি ইবরাহীমকে দান করলাম ইসহাক ও ইয়াকুব এবং তাঁর বংশধরদের জন্যে স্থির করলাম নবুয়ত ও কিতাব। আর আমি তাকে দুনিয়ায় পুরস্কৃত করেছিলাম। আখিরাতেও সে নিশ্চয়ই সৎকর্ম পরায়ণদের অন্যতম হবে।" (সূরা আনকাবুত: ২৬-২৭)

আল্লাহ তাআলা বলেন:

"এবং আমি তাকে ও লূতকে উদ্ধার করে সেই দেশে নিয়ে গেলাম, যেখানে আমি কল্যাণ রেখেছি বিশ্ববাসীর জন্য। এবং আমি ইবরাহীমকে দান করেছিলাম ইসহাক এবং পৌত্ররূপে ইয়াকুব। আর প্রত্যেককেই করেছিলাম সৎকর্মপরায়ণ। এবং তাদেরকে করেছিলাম নেতা। তারা আমার নির্দেশ অনুসারে মানুষকে পথপ্রদর্শন করত। তাদেরকে ওহী প্রেরণ করেছিলাম সৎকর্ম করতে, সালাত কায়েম করতে এবং যাকাত প্রদান করতে; তারা আমারই ইবাদত করত।" (সূরা আম্বিয়া: ৭১-৭৩)

হযরত ইবরাহীম আ. নিজের দেশ ও জাতিকে ত্যাগ করে আল্লাহর রাহে হিজরত করেন। তাঁর স্ত্রী ছিলেন বন্ধ্যা। তাঁর কোনো সন্তান হত না এবং তাঁর কোনো পুত্র সন্তান ছিল না। বরং ভাতিজা লূত ইবনে হারান ইবনে আযর তাঁর সঙ্গে ছিল। এমতাবস্থায় আল্লাহ তাঁকে একাধিক পুত্র সন্তান দান করেন এবং তাদের সকলেই পুণ্যবান ছিলেন। ইবরাহীম আ.-এর বংশে নবুয়ত এবং কিতাব প্রেরণের ধারা চালু রাখেন।

সুতরাং ইবরাহীম আ.-এর পরে যিনিই নবী হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন, তাঁর বংশ থেকেই হয়েছেন এবং তাঁর পরে যে কিতাবই আসমান থেকে কোনো নবীর উপর অবতীর্ণ হয়েছে, তা তাঁর বংশধরদের উপরই অবতীর্ণ হয়েছে। এ সব পুরস্কার আল্লাহ তাঁকে দিয়েছেন তাঁর ত্যাগ ও কুরবানী এবং আল্লাহর জন্যে দেশ, পরিজন ও আত্মীয়-স্বজনকে পরিত্যাগ করার বিনিময়ে। এমন দেশের উদ্দেশে তিনি হিজরত করেছেন, যেখানে আল্লাহর ইবাদত এবং বান্দাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বানের সুযোগ ছিল। তাঁর সেই হিজরতের দেশটি হল শাম বা সিরিয়া। এ দেশ সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন:

ওয়া লূতওয়ান ইলাল আরদিল লাতী বারাকনা ফীহা লীল আলামীন 'সে দেশের দিকে, যেখানে আমি বিশ্ববাসীর জন্য বরকত রেখে দিয়েছি।'

উবাই ইবনে কাব ও কাতাদা প্রমুখ এ মত পোষণ করেন। কিন্তু আওফীর সূত্রে ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, উপর্যুক্ত আয়াতে যে দেশের কথা বলা হয়েছে, সে দেশ হল মক্কা। সাথে সাথে এর সমর্থনে তিনি নিম্নের আয়াত উল্লেখ করেন:

ইন্না আউওয়ালা বাইতিন উদিয়া লিন নাসি লাল্লাযী বিবাক্কাতা মুবারাকাও ওয়া হুদাল লীল আলামীন

"নিঃসন্দেহে সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্যে স্থাপিত হয়েছে, সেটাই হচ্ছে এ ঘর, যা মক্কায় অবস্থিত এবং সারা জাহানেরর জন্যে হিদায়াত ও বরকতময়।" (আলে ইমরান: ৯৬)

কাব আহবার এর মতে সে দেশটি ছিল হারান। ইতঃপূর্বে আমরা আহলে কিতাবদের বরাত দিয়ে বলে এসেছি, হযরত ইবরাহীম আ. তাঁর ভাতিজা লূত আ., ভাই নাহর, স্ত্রী সারাহ ও ভাইয়ের স্ত্রী মালিকাসহ বাবেল থেকে রওনা হন এবং হারানে পৌঁছে সেখানে বসবাস শুরু করেন। সেখানে ইবরাহীম আ.-এর পিতা 'তারেখ'-এর মৃত্যু হয়।

সুদদী রহ. লিখেছেন, ইবরাহীম আ. ও লূত আ. সিরিয়ার উদ্দেশে রওনা হন। পথে সারাহর সাথে সাক্ষাৎ হয়। সারাহ ছিলেন হারানের রাজকুমারী। তিনি তাঁর সম্প্রদায়ের ধর্মকে কটাক্ষ করতেন। ইবরাহীম আ. তাঁকে এই শর্তে বিবাহ করেন, তাঁকে ত্যাগ করবেন না। ইবনে জারীর রহ. এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন; কিন্তু ঐতিহাসিকগণের আর কেউ এ কথা বর্ণনা করেন নি।

প্রসিদ্ধ মতে সারাহ হযরত ইবরাহীম আ.-এর চাচা হারান-এর কন্যা। যার নামে হারান রাজ্যের পরিচিত। সুহায়লী রহ. কুতায়বী ও নাফফাসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, সারাহ হযরত ইবরাহীম আ.-এর সহোদর হারানের কন্যা লূত এর ভগ্নি। এ মত সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অমূলক।

এ মত পোষণকারীরা দাবি করেছেন, সে সময় ভাতিজী বিবাহ করা বৈধ ছিল। কিন্তু এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। যদি ধরেও নেওয়া হয়, কোনো একসময় ভাতিজী বিবাহ করা বৈধ ছিল। যেমন ইহুদি পণ্ডিতরা বলে থাকে, তবুও এটা সম্ভব নয়। কেননা নিরুপায় অবস্থায় কোনো কিছু বৈধ হলেও তার সুযোগ গ্রহণ নবী-রাসূলগণের উন্নত চরিত্রের মর্যাদার পক্ষে শোভনীয় নয়। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

প্রসিদ্ধ মত হল, হযরত ইবরাহীম আ. যখন বাবেল থেকে হিজরত করেন, তখন সারাহকে সাথে নিয়েই বের হয়েছিলেন। যেমনটি পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহই সম্যক জ্ঞাত। আহলে কিতাবদের বর্ণনা মতে হযরত ইবরাহীম আ. যখন সিরিয়ায় যান তখন আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে জানান, তোমার পরে এ দেশটি আমি তোমার উত্তরসূরীদের আয়ত্ত করে দেব। এই অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা প্রকাশস্বরূপ তিনি সেখানে কুরবানীর একটি কেন্দ্র নির্মাণ করেন এবং বায়তুল মুকাদ্দাসের পূর্ব প্রান্তে তিনি নিজের থাকার জন্যে একটি গুম্বুজ বিশিষ্ট প্রকোষ্ঠ নির্মাণ করেন। এরপর তিনি জীবিকার অন্বেষণে বের হন। এ সময় বায়তুল মুকাদ্দাস অঞ্চলে ছিল প্রচণ্ড আকাল ও দুর্ভিক্ষ, তাই সবাইকে নিয়ে তিনি মিসরে চলে যান। এই সাথে আহলে কিতাবরা সারাহ এবং তথাকার রাজার ঘটনা, সারাহকে নিজের বোন বলে পরিচয় দিতে শিখিয়ে দেওয়া, রাজা কর্তৃক সারাহ এর খিদমতের জন্যে হাজেরাকে দান, এরপর সেখান থেকে তাদেরকে বহিষ্কার করা এবং বরকতময় বায়তুল মুকাদ্দাস অঞ্চলে বহু জীব-জন্তু, দাস-দাসী ও ধন-সম্পদসহ প্রত্যাবর্তন করার কথা উল্লেখ করেছেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px