📄 আল্লাহর অপূর্ব সাহায্য
কোনো কোনো আলেম বলেন, জিবরাইল আ. শূন্যে থেকে হযরত ইবরাহীম আ.-কে বলেছিলেন: আপনার কোনো সাহায্যের প্রয়োজন আছে কি? উত্তরে ইবরাহীম আ. বলেছিলেন- 'সাহায্যের প্রয়োজন আছে, তবে আপনার কাছে নয়।'
ইবনে আব্বাস ও সাঈদ ইবনে যোবায়ের রাযি. থেকে বর্ণিত- সে সময় বৃষ্টির ফেরেশতা মিকাঈল আ. বলেছিলেন: আমাকে যখনই নির্দেশ দেওয়া হবে, তখনই বৃষ্টি প্রেরণ করব। কিন্তু আল্লাহর নির্দেশবাণী অধিক দ্রুত গতিতে পৌঁছে যায়: ক্বুলনা ইয়া নারু কুনী বারদাও ওয়া সালামান আলা ইবরাহীম
"আমি হুকুম করলাম, হে আগুন! তুমি ইবরাহীমের উপর শীতল ও শান্তিদায়ক হয়ে যাও!"
হযরত আলী ইবনে আবি তালেব রাযি. সালামান এর অর্থ করেছেন, তাকে কষ্ট দিও না। ইবনে আব্বাস রাযি. ও আবুল আলিয়া রহ. বলেছেন, আল্লাহ যদি وَسَلَامًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ না বলতেন, তা হলে ঠাণ্ডা ও শীতলতায় ইবরাহীম আ.-এর কষ্ট হত। কাবে আহবার বলেছেন, পৃথিবীর কোনো লোকই সেদিন আগুন থেকে কোনোরূপ উপকৃত হতে পারে নি এবং ইবরাহীম আ.-এর বন্ধনের রশি ছাড়া আর কিছুই জ্বলে নি। যাহহাক রহ. বলেছেন, সে সময় হযরত জিবরাঈল আ. ইবরাহীম আ.-এর সঙ্গে ছিলেন। এবং তাঁর শরীর থেকে ঘাম মুছে দিচ্ছিলেন। এই ঘাম নির্গমন ছাড়া আগুনের আর কোনো প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পায় নি।
সুদদী রহ. বলেছেন: ইবরাহীম আ.-এর সাথে ছায়াদানের ফেরেশতাও ছিলেন। হযরত ইবরাহীম আ. যখন প্রাচীর বেষ্টনীর মধ্যকার উক্ত গহ্বরে অবস্থান করছিলেন, তখন তাঁর চারপাশে আগুনের লেলিহান শিখা দাউদাউ করছিল। অথচ তিনি ছিলেন শ্যামল উদ্যানে শান্তি ও নিরাপদে। লোকজন এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করেছিল; কিন্তু না তারা ইবরাহীম আ.-এর নিকট যেতে পারছিল; আর না ইবরাহীম আ. বেরিয়ে তাদের কাছে আসতে পারছিলেন।
আবু হোরায়রা রাযি. বলেন : হযরত ইবরাহীম আ.-এর পিতা আপন পুত্রের এ অবস্থা দেখে একটি সুন্দর কথা বলেছিল: নিমা রব্বু রব্বুকা ইয়া ইবরাহীম - হে ইবরাহীম! তোমার প্রতিপালক কতই না উত্তম প্রতিপালক!
📄 হযরত ইবরাহীম আ.-এর প্রতি মাতৃস্নেহ
ইবনে আসাকির রহ. ইকরামা রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন: ইবরাহীম আ.-এর মা পুত্রকে এ অবস্থায় দেখে ডেকে বলেছিলেন, হে আমার প্রিয় পুত্র! আমি তোমার নিকট আসতে চাই। আল্লাহর কাছে একটু বল, যাতে তোমার চারপাশের আগুন থেকে আমাকে রক্ষা করেন। ইবরাহীম আ. বললেন, হ্যাঁ বলছি। তারপর মা পুত্রের নিকট চলে গেলেন। আগুন তাঁকে স্পর্শ করল না। কাছে গিয়ে মাতা আপন পুত্রকে আলিঙ্গন ও চুম্বন করলেন এবং পুনরায় অক্ষতভাবে সেখান থেকে বের হয়ে এলেন।
মিনহাল ইবনে আমর রাযি. বর্ণনা করেছেন : হযরত ইবরাহীম আ. আগুনের মধ্যে চল্লিশ কিংবা পঞ্চাশ দিন অবস্থান করেন। এই সময় সম্পর্কে হযরত ইবরাহীম আ. বলেন: আগুনের মধ্যে আমি যতদিন ছিলাম, ততদিন এমন শান্তি ও আরামে কাটিয়েছি, তার চেয়ে অধিক আরামের জীবন আমি কখনো উপভোগ করি নি।
তিনি আরো বলেন: আমার গোটা জীবন যদি ওইরূপ অবস্থায় কাটত, তবে কতই না উত্তম হত! এভাবে হযরত ইবরাহীম আ.-এর সম্প্রদায় শত্রুতাবশত প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল; কিন্তু তারা ব্যর্থ হল। তারা গৌরব অর্জন করতে চেয়েছিল, কিন্তু লাঞ্ছিত হল। তারা বিজয়ী হতে চেয়েছিল, কিন্তু পরাজিত হল। আল্লাহ বলেন: "তারা চক্রান্ত করে ক্ষতি করতে চেয়েছিল, কিন্তু আমি তাদের অধিকতর ক্ষতিগ্রস্ত করে দেয়।"
অপর আয়াতে আছে : "আমি তাদেরকে হীনতম করে দিই।" এরূপ দুনিয়ার জীবনে তারা ক্ষতি ও লাঞ্ছনাপ্রাপ্ত হয় আর আখিরাতের জীবনে তাদের ওপর আগুন না শীতল হবে, না শান্তিদায়ক হবে বরং সেখানকার অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন: "জাহান্নাম হল তাদের জন্যে নিকৃষ্ট আবাস ও ঠিকানা।" (সূরা ফুরকান: ৬৬)
📄 গিরগিটি হত্যা করা
ইমাম বোখারি রহ. উম্মে শারিক রহ. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গিরগিটি মারার আদেশ দিয়েছেন। বলেছেন, ইবরাহীম আ.-এর বিরুদ্ধে এটি আগুনে ফুঁক দিয়েছিল। ইমাম মুসলিম রহ. ইবনে জুরায়জ রহ. সূত্রে এবং বোখারি, মুসলিম, নাসাঈ ও ইবনে মাজাহ রহ. সুফিয়ান ইবনে উয়ায়না রহ.-এর সূত্রে এ হাদিস বর্ণনা করেছেন।
ইমাম আহমাদ রহ. আয়েশা রাযি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা গিরগিটি হত্যা কর! কারণ, সে ইবরাহীম আ.-এর বিরুদ্ধে আগুনে ফুঁক দিয়েছিল। তাই হযরত আয়েশা রাযি. গিরগিটি হত্যা করতেন।
ইমাম আহমাদ রহ. নাফে রহ. এর সূত্রে বর্ণনা করেন, জনৈক মহিলা হযরত আয়েশা রাযি. এর গৃহে প্রবেশ করে একটি বর্শা দেখে জিজ্ঞেস করলেন: এ বর্শা দ্বারা আপনি কি করেন? উত্তরে আয়েশা রাযি. বললেন, এর দ্বারা আমি গিরগিটি নিধন করি। তারপর তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ইবরাহীম আ.-কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হয়, তখন সমস্ত জীব-জন্তু ও কীট-পতঙ্গ আগুন নিভাতে চেষ্টা করেছিল। কেবল গিরগিটি তা করে নি। উল্টো সে আগুনে ফুঁক দিয়েছিল। উপর্যুক্ত হাদিস দুটি ইমাম আহমাদ রহ. ছাড়া আর কেউ বর্ণনা করেন নি।
ইমাম আহমদ ... ফাকিহ ইবনুল মুগিরার মুক্ত দাসী সুমামা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: আমি একদা আয়েশা রাযি. এর গৃহে গেলাম। তখন সেখানে একটা বর্শা রাখা আছে দেখতে পেলাম। জিজ্ঞেস করলাম, হে উম্মুল মুমিনীন! এ বর্শা দিয়ে আপনি কী করেন? তিনি বললেন, এটা দিয়ে আমি গিরগিটি বধ করি। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে বলেছেন: ইবরাহীম আ.-কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হয়, তখন জমীনের উপর এমন কোনো জীব ছিল না, যারা আগুন নেভাতে চেষ্টা করে নি, কেবল এই গিরগিটি ব্যতীত। সে ইবরাহীম আ.-এর উপরে আগুনে ফুঁক দিয়েছিল। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে এগুলো হত্যা করতে আদেশ করেছেন। ইবনে মাজাহ রহ. জারির ইবনে হাযেম রাযি.-এর সূত্রে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন।
📄 খোদায়ী দাবিদার
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِي حَاجَّ إِبْرَاهِيمَ فِي رَبِّهِ أَنْ آتَاهُ اللهُ الْمُلْكَ إِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّيَ الَّذِي يُحْيِي وَيُمِيتُ قَالَ أَنَا أُحْيِي وَأُمِيتُ قَالَ إِبْرَاهِيمُ فَإِنَّ اللَّهَ يَأْتِي بِالشَّمْسِ مِنَ الْمَشْرِقِ فَأْتِ بِهَا مِنَ الْمَغْرِبِ فَبُهِتَ الَّذِي كَفَرَ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ
এ বিষয়ে আমরা আলোচনা করেছি। আরও কিছু বিষয় এখানে আলোচনা করা হবে। এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহীম আ.-এর সাথে সেই সীমালঙ্ঘন কারী নিজেকে প্রতিপালক দাবিকারী প্রতাপশালী রাজার বিতর্কের কথা উল্লেখ করেছেন। হযরত ইবরাহীম খলীল আ. তার উপস্থাপিত যুক্তির অসারতা প্রমাণ করেন, তার মূর্খতা ও স্বল্পবুদ্ধিতা প্রকাশ করে দেন এবং নিজের দলিল দ্বারা তাকে নিরুত্তর করে দেন।
তাফসীরবিদ, ঐতিহাসিক ও বংশবিদদের মতে এ রাজা ছিল ব্যাবিলনের। মুজাহিদ রহ. তার নাম নমরূদ ইবনে কিনান ইবনে কৃশ ইবনে সাম ইবনে নূহ বলে উল্লেখ করেছেন। অন্যরা তার বংশধারা বলেছেন: নমরূদ ইবনে ফালিহ ইবনে আবির ইবনে সালিহ ইবনে আরফাখশাদ ইবনে সাম ইবনে নূহ।
মুজাহিদ রহ. ও প্রমুখ বলেছেন, যেসব রাজা-বাদশা দুনিয়া জোড়া রাজত্ব করেছে, এ ছিল তাদের অন্যতম। ঐতিহাসিকদের মতে এরূপ বাদশার সংখ্যা ছিল চারজন। দু'জন মুমিন ও দু'জন কাফির। মুমিন দু'জন হলেন, (১) যুলকারনাইন ও (২) সুলাইমান আ. আর কাফির দুজন হল (১) নমরূদ ও (২) বুখতে নসর। ঐতিহাসিকদের মতে নমরূদ চার শ বছরকালব্যাপী রাজত্ব করেছিল। ফলে সে জুলুম-অত্যাচার, দাম্ভিকতা ও সীমালঙ্ঘনের চরমে গিয়ে পৌঁছে এবং পার্থিব জীবনকেই সে চরম লক্ষ্য বলে বেছে নেয়। ইবরাহীম আ. যখন তাকে এক ও লা-শরীক আল্লাহর ইবাদতের জন্যে আহ্বান জানালেন, তখন তার মূর্খতা, পথ-ভ্রষ্টতা ও উচ্চাভিলাষ তাকে সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করতে প্ররোচিত করে। এ ব্যাপারে সে ইবরাহীম আ.-এর সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয় এবং নিজেই প্রতিপালক হওয়ার দাবি করে। হযরত ইবরাহীম আ. যখন বললেন আমার প্রতিপালক তো তিনি, যিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান। নমরূদ বলল, আমিও তো জীবন দান করি ও মৃত্যু ঘটাই।
কাতাদা, সুদদী ও মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক রহ. লিখেছেন: নমরূদ ওই সময় মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত দু ব্যক্তিকে ডেকে আনে। এরপর একজনকে হত্যা করে ও অপরজনকে ক্ষমা করে দেয়। এর দ্বারা সে বোঝাতে চায়, সে-ও একজনকে জীবন দান করল এবং অন্যজনের মৃত্যু দিল। এ কাজটি ইবরাহীম আ.-এর দলীলের কোনো মুকাবিলাই ছিল না বরং তা বিতর্কের সাথে সামাঞ্জস্যহীন একটা উদ্ভট দুষ্কর্ম ছাড়া কিছুই নয়। কেননা হযরত ইবরাহীম আ. বিদ্যমান সৃষ্ট বস্তুর দ্বারা সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব প্রমাণ করছেন। আবার কিছু দিন পর সেগুলো মৃত্যুবরণ করছে।
এ থেকেই বোঝা যায়, এ কাজের একজন কর্তা আছেন। যিনি প্রাণীকে সৃষ্টি করছেন ও মৃত্যু দিচ্ছেন। কারণ, কর্তা ছাড়া আপনা-আপনি কোনো কিছু হওয়া অসম্ভব। সুতরাং বিশ্বজগতে প্রাণী-অপ্রাণী যা কিছু আছে, তা একবার অস্তিত্বে আসা ও দ্বিতীয়বার অস্তিত্ব লোপ পাওয়া, সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করা; নক্ষত্র, বায়ু, মেঘমালা ও বৃষ্টি পরিচালনা করা ইত্যাদি কাজের জন্যে অবশ্যই একজন কর্তা আছেন। সে জন্যে ইবরাহীম আ. বললেন,
রব্বিয়িল্লাজি ইউহয়ি ওয়া ইউমীত
"আমার প্রতিপালক তিনিই, যিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান।" অতএব এ মূর্খ বাদশার এই যে দাবি "আমিও জীবন দান করি ও মৃত্যু ঘটাই"- এর দ্বারা যদি বোঝানো হয়ে থাকে, সে-ই দৃশ্যমান জগতের কর্তা, তবে এটা বৃথা দম্ভ ও বাস্তবকে অস্বীকার করা ছাড়া আর কিছুই নয়। অন্যথায় এ কথার দ্বারা যদি তা-ই বোঝানো হয়ে থাকে, যার উল্লেখ মুজাহিদ, সুদদী ও ইবনে ইসহাক রহ. করেছেন, তা হলে এ কথার কোনো মূল্যই নেই। কেননা ইবরাহীম আ.-এর পেশকৃত দলীলের খণ্ডন তাতে হয় না।
বাদশাহ নমরূদের এই যুক্তির অসারতা উপস্থিত অনেকের কাছে অস্পষ্ট হওয়ায় এবং অনুপস্থিতদের নিকট অস্পষ্ট হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকায় হযরত ইবরাহীম আ. আরো একটি যুক্তি পেশ করেন, যার দ্বারা সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব ও নমরূদের মিথ্যা দাবি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়।
কলা ইবরাহীমু ফায়িন্নাল্লাহা ইয়াতি বিশশামসি মিনাল মাশরিক্বি ফাতি বিহা মিনাল মাগরিব
"ইবরাহীম আ. বললেন, আল্লাহ তো সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন, তুমি একে পশ্চিম দিক থেকে উদিত করাও দেখি!”
অর্থাৎ এই সূর্য আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে প্রত্যহ পূর্ব দিক থেকে উদিত হয় এবং নির্দিষ্ট কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করে। এই আল্লাহ এক, অন্য কোনো ইলাহ নেই। তিনিই সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা। এখন তোমার জীবন দান ও মৃত্যু ঘটানোর দাবি যদি যথার্থ হয়, তবে এ সূর্যকে তুমি পশ্চিম দিক থেকে উদিত কর। কেননা যিনি জীবন দান ও মৃত্যু ঘটাতে পারেন, তিনি যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারেন। তাঁর ইচ্ছাকে কেউ বাধা দিতে পারে না, তাঁকে কেউ অক্ষম করতে পারে না। বরং সব কিছুর উপরই তাঁর কর্তৃত্ব চলে সব কিছুই তাঁর নির্দেশ মানতে বাধ্য।
অতএব নিজের দাবি অনুযায়ী তুমি যদি প্রতিপালক হয়ে থাক, তা হলে এটা করে দেখাও। আর যদি তা করতে না পার, তবে তোমার দাবি মিথ্যা। কিন্তু তুমিও জান এবং অন্যান্য প্রত্যেকেই জানে, এ কাজ করতে তুমি সক্ষম নও। এ তো দূরের কথা, একটা সামান্য মশা সৃষ্টি করাও তোমার পক্ষে সম্ভব নয়। এ যুক্তি প্রদর্শনের পরে নমরূদের ভ্রষ্টতা, মুর্খতা, মিথ্যাচার ও মূর্খ সমাজের কাছে তার দাম্ভিকতা স্পষ্ট হয়ে যায়। সে কোনো উত্তর দিতে সক্ষম হল না; নীরব-নিশ্চুপ হয়ে গেল। আল্লাহ তাআলা বলেন: ফাবুহিতাল্লাজি কাফারা ওয়াল্লাহু লা ইয়াহদিল কওমাজ জোয়ালিমীন কাফির লোকটি হতভম্ব হয়ে গেল। আর জালিম সম্প্রদায়কে আল্লাহ সুপথ দেখান না। (সূরা বাকারা: ২৫৮)
সুদদী রহ. লিখেছেন, নমরূদ ও ইবরাহীম আ.-এর মধ্যে এ বিতর্ক অগ্নি থেকে বের হয়ে আসার দিনের ঘটনা। এবং সেখানে লোকের কোনো জামায়েত ছিল না। কেবল দুজনের মধ্যেই বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়।
আব্দুর রাজ্জাক হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেছেন : নমরূদের নিকট সঞ্চিত খাদ্যভাণ্ডার ছিল। লোকজন দলে দলে তার নিকট খাদ্য আনার জন্যে যেত। হযরত ইবরাহীম আ.ও এরূপ একদলের সাথে খাদ্য আনতে যান। সেখানে বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। ফলে নমরূদ ইবরাহীম আ.-কে খাদ্য না দিয়ে ফিরিয়ে দেয়। ইবরাহীম আ. শূন্যপাত্র নিয়ে বেরিয়ে আসেন। বাড়ির কাছে এসে তিনি দুটি পাত্রে মাটি ভর্তি করে আনেন এবং মনে মনে ভাবেন, বাড়ি পৌঁছে সাংসারিক কাজে জড়িয়ে পড়বেন। বাড়ি পৌঁছে বাহন রেখে তিনি ঘরে প্রবেশ করে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে বসে পড়েন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। ইবরারহীম আ.-এর স্ত্রী সারাহ পাত্র দুটির কাছে গিয়ে উৎকৃষ্ট খাদ্যদ্রব্য দ্বারা তা ভর্তি দেখতে পান এবং তা দ্বারা খাদ্য তৈরি করেন। ঘুম থেকে জেগে হযরত ইবরাহীম আ. রান্না করা খাদ্য দেখে জিজ্ঞেস করলেন, এ তোমরা কোথেকে পেলে? সারাহ জানালেন, আপনি যা এনেছেন তা থেকেই তৈরি করা হয়েছে। এ সময় ইবরাহীম আ. বুঝতে পারলেন, আল্লাহ তাআলা বিশেষ খাদ্য হিসেবে তাদেরকে এ রিযিক দান করেছেন।
যায়েদ ইবনে আসলাম রাযি. বর্ণনা করেছেন, উক্ত অহংকারী বাদশাহর নিকট আল্লাহ একজন ফেরেশতা প্রেরণ করেন। ফেরেশতা তাকে আল্লাহর উপর ঈমান আনতে বললে সে অস্বীকার করে। পুনরায় দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার আহ্বান জানালে প্রত্যেকবারেই সে অস্বীকৃতি জানায় এবং বলে দেয়, তুমি তোমার বাহিনী একত্র কর আর আমি আমার বাহিনী একত্র করি। পরের দিন সূর্যোদয়ের সময় নমরূদ তার সৈন্য-সামন্তের সমাবেশ ঘটায়। অপরদিকে আল্লাহ অগণিত মশা প্রেরণ করলেন। মশার সংখ্যা এত বেশি ছিল, তাতে তারা সূর্যের মুখ পর্যন্ত দেখতে সক্ষম হয় নি। আল্লাহ মশা বাহিনীকে তাদের উপর লেলিয়ে দেন। ফলে মশা তাদের রক্তমাংস খেয়ে সাদা হাড্ডি বের করে ফেলে। একটি মশা নমরূদের নাকের ছিদ্রপথে প্রবেশ করে। চারশ বছর এই মশা তার নাকের ছিদ্রে অবস্থান করে দংশন করতে থাকে। এই দীর্ঘ সময়ে সে হাতুড়ি দ্বারা নিজের মাথা ঠুকাতে থাকে। অবশেষে এভাবেই আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেন।