📄 হযরত ইবরাহীম আ.-এর সঙ্গে রাসূলুল্লাহ-এর মিল
বোখারি শরিফে হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. সূত্রে বর্ণিত হয়েছে: ইবরাহীম আ.-কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হয়, তখন তিনি বলেছিলেন: حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ আর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন এ দোয়াটি পড়েছিলেন, যখন তাঁকে বলা হয়েছিল: إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إِيمَانًا وَقَالُوا حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ (۱۷৩) فَانْقَلَبُوا بِنِعْمَةٍ مِنَ اللَّهِ وَفَدْلٍ لَمْ يَمْسَسْهُمْ سُومٌ "তোমাদের বিরুদ্ধে লোক জামায়েত হয়েছে। সুতরাং তাদেরকে ভয় কর; কিন্তু এটা তাঁদের ঈমানকে আরও দৃঢ় করে দিয়েছিল। আর তারা বলেছিল, আল্লাহই আমাদের জন্যে যথেষ্ট এবং তিনি বড়ই উত্তম কর্মবিধায়ক। তারপর তারা আল্লাহর নেয়ামত ও অনুগ্রহসহ ফিরে এসেছিল। কোনোরূপ ক্ষতি তাদের স্পর্শ করতে পারে নি।" (সূরা আলে-ইমরান: ১৭৩-১৭৪)
আবু ইয়ালা রহ. ... হযরত আবু হোরায়রা রাযি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ইবরাহীম আ.-কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হয়, তখন তিনি বলেন: “হে আল্লাহ! আপনি আকাশ-রাজ্যে একা, আর জমিনে আমি একাই আপনার ইবাদত করছি।"
📄 আল্লাহর অপূর্ব সাহায্য
কোনো কোনো আলেম বলেন, জিবরাইল আ. শূন্যে থেকে হযরত ইবরাহীম আ.-কে বলেছিলেন: আপনার কোনো সাহায্যের প্রয়োজন আছে কি? উত্তরে ইবরাহীম আ. বলেছিলেন- 'সাহায্যের প্রয়োজন আছে, তবে আপনার কাছে নয়।'
ইবনে আব্বাস ও সাঈদ ইবনে যোবায়ের রাযি. থেকে বর্ণিত- সে সময় বৃষ্টির ফেরেশতা মিকাঈল আ. বলেছিলেন: আমাকে যখনই নির্দেশ দেওয়া হবে, তখনই বৃষ্টি প্রেরণ করব। কিন্তু আল্লাহর নির্দেশবাণী অধিক দ্রুত গতিতে পৌঁছে যায়: ক্বুলনা ইয়া নারু কুনী বারদাও ওয়া সালামান আলা ইবরাহীম
"আমি হুকুম করলাম, হে আগুন! তুমি ইবরাহীমের উপর শীতল ও শান্তিদায়ক হয়ে যাও!"
হযরত আলী ইবনে আবি তালেব রাযি. সালামান এর অর্থ করেছেন, তাকে কষ্ট দিও না। ইবনে আব্বাস রাযি. ও আবুল আলিয়া রহ. বলেছেন, আল্লাহ যদি وَسَلَامًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ না বলতেন, তা হলে ঠাণ্ডা ও শীতলতায় ইবরাহীম আ.-এর কষ্ট হত। কাবে আহবার বলেছেন, পৃথিবীর কোনো লোকই সেদিন আগুন থেকে কোনোরূপ উপকৃত হতে পারে নি এবং ইবরাহীম আ.-এর বন্ধনের রশি ছাড়া আর কিছুই জ্বলে নি। যাহহাক রহ. বলেছেন, সে সময় হযরত জিবরাঈল আ. ইবরাহীম আ.-এর সঙ্গে ছিলেন। এবং তাঁর শরীর থেকে ঘাম মুছে দিচ্ছিলেন। এই ঘাম নির্গমন ছাড়া আগুনের আর কোনো প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পায় নি।
সুদদী রহ. বলেছেন: ইবরাহীম আ.-এর সাথে ছায়াদানের ফেরেশতাও ছিলেন। হযরত ইবরাহীম আ. যখন প্রাচীর বেষ্টনীর মধ্যকার উক্ত গহ্বরে অবস্থান করছিলেন, তখন তাঁর চারপাশে আগুনের লেলিহান শিখা দাউদাউ করছিল। অথচ তিনি ছিলেন শ্যামল উদ্যানে শান্তি ও নিরাপদে। লোকজন এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করেছিল; কিন্তু না তারা ইবরাহীম আ.-এর নিকট যেতে পারছিল; আর না ইবরাহীম আ. বেরিয়ে তাদের কাছে আসতে পারছিলেন।
আবু হোরায়রা রাযি. বলেন : হযরত ইবরাহীম আ.-এর পিতা আপন পুত্রের এ অবস্থা দেখে একটি সুন্দর কথা বলেছিল: নিমা রব্বু রব্বুকা ইয়া ইবরাহীম - হে ইবরাহীম! তোমার প্রতিপালক কতই না উত্তম প্রতিপালক!
📄 হযরত ইবরাহীম আ.-এর প্রতি মাতৃস্নেহ
ইবনে আসাকির রহ. ইকরামা রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন: ইবরাহীম আ.-এর মা পুত্রকে এ অবস্থায় দেখে ডেকে বলেছিলেন, হে আমার প্রিয় পুত্র! আমি তোমার নিকট আসতে চাই। আল্লাহর কাছে একটু বল, যাতে তোমার চারপাশের আগুন থেকে আমাকে রক্ষা করেন। ইবরাহীম আ. বললেন, হ্যাঁ বলছি। তারপর মা পুত্রের নিকট চলে গেলেন। আগুন তাঁকে স্পর্শ করল না। কাছে গিয়ে মাতা আপন পুত্রকে আলিঙ্গন ও চুম্বন করলেন এবং পুনরায় অক্ষতভাবে সেখান থেকে বের হয়ে এলেন।
মিনহাল ইবনে আমর রাযি. বর্ণনা করেছেন : হযরত ইবরাহীম আ. আগুনের মধ্যে চল্লিশ কিংবা পঞ্চাশ দিন অবস্থান করেন। এই সময় সম্পর্কে হযরত ইবরাহীম আ. বলেন: আগুনের মধ্যে আমি যতদিন ছিলাম, ততদিন এমন শান্তি ও আরামে কাটিয়েছি, তার চেয়ে অধিক আরামের জীবন আমি কখনো উপভোগ করি নি।
তিনি আরো বলেন: আমার গোটা জীবন যদি ওইরূপ অবস্থায় কাটত, তবে কতই না উত্তম হত! এভাবে হযরত ইবরাহীম আ.-এর সম্প্রদায় শত্রুতাবশত প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল; কিন্তু তারা ব্যর্থ হল। তারা গৌরব অর্জন করতে চেয়েছিল, কিন্তু লাঞ্ছিত হল। তারা বিজয়ী হতে চেয়েছিল, কিন্তু পরাজিত হল। আল্লাহ বলেন: "তারা চক্রান্ত করে ক্ষতি করতে চেয়েছিল, কিন্তু আমি তাদের অধিকতর ক্ষতিগ্রস্ত করে দেয়।"
অপর আয়াতে আছে : "আমি তাদেরকে হীনতম করে দিই।" এরূপ দুনিয়ার জীবনে তারা ক্ষতি ও লাঞ্ছনাপ্রাপ্ত হয় আর আখিরাতের জীবনে তাদের ওপর আগুন না শীতল হবে, না শান্তিদায়ক হবে বরং সেখানকার অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন: "জাহান্নাম হল তাদের জন্যে নিকৃষ্ট আবাস ও ঠিকানা।" (সূরা ফুরকান: ৬৬)
📄 গিরগিটি হত্যা করা
ইমাম বোখারি রহ. উম্মে শারিক রহ. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গিরগিটি মারার আদেশ দিয়েছেন। বলেছেন, ইবরাহীম আ.-এর বিরুদ্ধে এটি আগুনে ফুঁক দিয়েছিল। ইমাম মুসলিম রহ. ইবনে জুরায়জ রহ. সূত্রে এবং বোখারি, মুসলিম, নাসাঈ ও ইবনে মাজাহ রহ. সুফিয়ান ইবনে উয়ায়না রহ.-এর সূত্রে এ হাদিস বর্ণনা করেছেন।
ইমাম আহমাদ রহ. আয়েশা রাযি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা গিরগিটি হত্যা কর! কারণ, সে ইবরাহীম আ.-এর বিরুদ্ধে আগুনে ফুঁক দিয়েছিল। তাই হযরত আয়েশা রাযি. গিরগিটি হত্যা করতেন।
ইমাম আহমাদ রহ. নাফে রহ. এর সূত্রে বর্ণনা করেন, জনৈক মহিলা হযরত আয়েশা রাযি. এর গৃহে প্রবেশ করে একটি বর্শা দেখে জিজ্ঞেস করলেন: এ বর্শা দ্বারা আপনি কি করেন? উত্তরে আয়েশা রাযি. বললেন, এর দ্বারা আমি গিরগিটি নিধন করি। তারপর তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ইবরাহীম আ.-কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হয়, তখন সমস্ত জীব-জন্তু ও কীট-পতঙ্গ আগুন নিভাতে চেষ্টা করেছিল। কেবল গিরগিটি তা করে নি। উল্টো সে আগুনে ফুঁক দিয়েছিল। উপর্যুক্ত হাদিস দুটি ইমাম আহমাদ রহ. ছাড়া আর কেউ বর্ণনা করেন নি।
ইমাম আহমদ ... ফাকিহ ইবনুল মুগিরার মুক্ত দাসী সুমামা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: আমি একদা আয়েশা রাযি. এর গৃহে গেলাম। তখন সেখানে একটা বর্শা রাখা আছে দেখতে পেলাম। জিজ্ঞেস করলাম, হে উম্মুল মুমিনীন! এ বর্শা দিয়ে আপনি কী করেন? তিনি বললেন, এটা দিয়ে আমি গিরগিটি বধ করি। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে বলেছেন: ইবরাহীম আ.-কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হয়, তখন জমীনের উপর এমন কোনো জীব ছিল না, যারা আগুন নেভাতে চেষ্টা করে নি, কেবল এই গিরগিটি ব্যতীত। সে ইবরাহীম আ.-এর উপরে আগুনে ফুঁক দিয়েছিল। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে এগুলো হত্যা করতে আদেশ করেছেন। ইবনে মাজাহ রহ. জারির ইবনে হাযেম রাযি.-এর সূত্রে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন।