📄 বাদশাহকে ইসলামের দাওয়াত প্রদান
এখন এ ব্যাপারে পরামর্শ হচ্ছিল, কী করা যায়? ক্রমে তৎকালীন বাদশার কান পর্যন্ত এ সমস্ত কথা গিয়ে পৌঁছাল। তৎকালে ইরাকের বাদশার উপাধি হত নমরূদ আর সে প্রজাবৃন্দের শুধু রাজাই হত না বরং নিজেকে তাদের খোদা ও মালিক মনে করত। আর প্রজাবৃন্দও অন্যান্য দেবতার মতো তাকেও নিজেদের মাবুদ এবং খোদা বলে মানত; তাকেও দেবতার মতোই পূজা করত। এমনকি দেবতাদের চেয়েও অধিকতর আদব রক্ষা করে চলত। কেননা সে জ্ঞানী এবং বুদ্ধিমানও হত আর শাহী সিংহাসন এবং রাজমুকুটের মালিকও। নমরূদ তা জানতে পেরে ক্রোধে অধীর হয়ে পড়ল এবং চিন্তা করতে লাগল, এই ব্যক্তির পয়গম্বরসুলভ তাবলীগ ও দাওয়াত যদি এভাবেই চলতে থাকে, তবে এ ব্যক্তি আমার খোদায়িত্ব, রাজত্ব এবং দেবত্ব হতেও সমস্ত প্রজাকে বিগড়িয়ে দিবে। এরূপে পূর্বপুরুষের ধর্মের সাথে সাথে আমার এ রাজত্বেরও অবসান ঘটবে। সুতরাং অঙ্কুরেই এ ব্যাপারটি খতম করে দেওয়া উত্তম।
এই ভেবে সে আদেশ করল, ইবরাহীমকে আমার দরবারে হাজির কর। ইবরাহীম আ. কে নমরূদের দরবারে পৌঁছালে নমরূদ কথা প্রসঙ্গে ইবরাহীম আ. কে জিজ্ঞাসা করল, "তুমি পূর্বপুরুষের ধর্মের বিরোধিতা কেন করছ? আর আমাকে খোদা মানতে তোমার অস্বীকৃতি কেন? ইবরাহীম আ. বললেন, আমি এক আল্লাহ তাআলার ইবাদত করছি। তাঁকে ছাড়া তাঁর সঙ্গে আর কাউকেও শরীক মানি না। সমুদয় সৃষ্টি এবং সমগ্র জগৎ তাঁরই সৃষ্ট। তিনিই সকলের স্রষ্টা ও মালিক।
তুমিও তেমনি একজন মানুষ যেমন আমরা মানুষ। তবে তুমি কিভাবে রব কিংবা খোদা হতে পার? আর কিভাবে এই বোবা, বধির ও অন্ধ কাষ্ঠ মূর্তিগুলি খোদা হতে পারে? আমি সঠিক পথের উপর আছি। আর তোমরা সকলে ভুল পথে রয়েছ। কাজেই আমি সত্যের প্রচার কিভাবে ত্যাগ করতে পারি? তোমাদের পূর্বপুরুষের মনগড়া ধর্মকে কিভাবে গ্রহণ করতে পারি?
নমরূদ ইবরাহীম আ. কে জিজ্ঞাসা করল, যদি আমি ছাড়া তোমার কোনো খোদা থাকে, তবে তার এমন গুণ বর্ণনা কর, যে শক্তি আমার মধ্যে নেই। তখন ইবরাহীম আ. বললেন: আমার খোদা সেই মহান সত্তা, যাঁর কবলে রয়েছে মৃত্যু ও জীবন, তিনিই মৃত্যু দান করে থাকেন এবং তিনিই জীবন দান করেন। বক্র বুদ্ধির নমরূদ মৃত্যু ও জীবনের নিগূঢ়তা সম্বন্ধে ছিল অজ্ঞ। নমরূদ বলতে লাগল, এরূপে মৃত্যু ও জীবন তো আমার কবলেও রয়েছে। এই বলে তখনই একজন নির্দোষ ব্যক্তিকে এনে জল্লাদকে আদেশ করল, তাকে হত্যা করে ফেল এবং মৃত্যুর ঘাটে নামিয়ে দাও। জল্লাদ তৎক্ষণাৎ আদেশ পালন করল। আর জনৈক মৃত্যুর দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীকে জেলখানা হতে ডেকে এনে আদেশ করল, যাও! আমি তোমার জীবন দান করলাম। এরপর ইবরাহীম আ. কে লক্ষ্য করে বলল, দেখলে আমিও কীভাবে জীবন ও মৃত্যু দান করে থাকি, তবে আর তোমার খোদার বিশেষত্ব কি রইল?
ইবরাহীম আ. বুঝলেন, নমরূদ হয়ত মৃত্যু ও জীবনের প্রকৃত তত্ত্ব অবগত না কিংবা জনসাধারণ ও প্রজাবৃন্দকে ভুল বুঝাতে চাচ্ছে। যেন তারা এই পার্থক্যটুকু বুঝতে না পারে যে, জীবন দান করা এর নাম নয় বরং অনস্তিত্ব হতে অস্তিত্বে আনয়ন করার নাম জীবন দান করা। আর এরূপে হত্যা কিংবা ফাঁসি হতে রক্ষা করার নাম মৃত্যুর মালিক হওয়া নয় মৃত্যুর মালিক তিনিই, যিনি মানুষের রূহকে তার দেহ হতে বের করে নিজের কবলে আনয়ন করেন।
এ জন্যই বহু শূলিতে চড়ানো এবং তরবারির আঘাত প্রাপ্ত মানুষ জীবন প্রাপ্ত হয়ে যায়। আর বহু শূলি ও হত্যা হতে রক্ষিত মানুষ মৃত্যুর গ্রাসে পরিণত হয়। কোনো শক্তি তাকে রোধ করতে পারে না। আর যদি মৃত্যুকে রোধ করা সম্ভব হত, তবে ইবরাহীম আ.-এর সঙ্গে বিতর্করত নমরুদ রাজার সিংহাসন অক্ষত করত না বরং তার বংশের প্রথম ব্যক্তিকেই আজ পর্যন্ত এই মুকুট ও সিংহাসনের মালিক দেখা যেত। কিন্তু জানা নেই, ইরাকের এই রাজত্বের কত দায়িদার মাটির নিচে সমাহিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও কতজনের পালা আসবে?
তবুও ইবরাহীম আ. ভাবলেন, আমি যদি এমন জীবন ও মৃত্যুর সূক্ষ্ম দার্শনিক তত্ত্ব আলোচনা করি, তবে নমরুদের উদ্দেশ্য সফল হয়ে যাবে। সে সর্বসাধারণকে ভুলে ফেলে আসল ব্যাপারটিকে অস্পষ্ট করে দিবে এবং এরূপে আমার সৎ উদ্দেশ্যটি সফল হতে পারবে না। আর সত্যের প্রচার প্রসঙ্গে জ্ঞানলব্ধ সংগ্রামে নমরুদকে নিমন্ত্রণ করে দেওয়ার সুযোগ নষ্ট হয়ে যাবে। কেননা আলোচনা ও সমালোচনা এবং ঝগড়া ও বিতর্ক আমার আসল উদ্দেশ্য নয় বরং মানুষের মগজে ও অন্তরে এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস জন্মানোই আমার একমাত্র উদ্দেশ্য। সুতরাং তিনি এ প্রসঙ্গটি ত্যাগ করে তাকে বুঝানোর জন্য অন্য উপায় অবলম্বন করলেন। তিনি এমন প্রতিজ্ঞা করলেন, যা প্রত্যেকটি মানুষই চাক্ষুষ দর্শন করতে থাকে এবং কোনো তর্কশাস্ত্রের প্রামাণ ব্যতীত দৈনন্দিন জীবনে তা দেখতে পায়।
ইবরাহীম আ. বললেন : আমি সেই মহান সত্তাকে আল্লাহ বলি যিনি প্রতি দিন সূর্যকে পূর্ব দিক হতে উদিত করেন এবং পশ্চিম দিকে নিয়ে যান। তুমিও যদি অনুরূপ শক্তির দাবি কর, তবে এর বিপরীত সূর্যকে পশ্চিম দিক হতে উদিত কর এবং পূর্ব দিকে অস্তমিত কর। একথা শুনে নমরুদ হতবাক ও নিরুত্তর হয়ে গেল। আর এরূপে ইবরাহীম আ.-এর মুখে আল্লাহ তাআলার প্রমাণ পূর্ণরূপে ফুটে গেল।
নমরুদ এ প্রমাণ শুনে হতবাক কেন হল এবং তাঁর নিকট এ প্রমাণের বিরুদ্ধে ভুল বুঝানোর অবকাশ কেন ছিল না, এর কারণ ইবরাহীম আ.-এর প্রমাণটির সারমর্ম ছিল : আমি এমন এক সত্তাকে আল্লাহ মানি, যাঁর সম্বন্ধে আমার আকীদা হল, জগতের কোনো বস্তু নির্ধারিত সময়ের পূর্বে নিজের স্থান হতে সরতে পারে না এবং এদিক-সেদিকও হতে পারে না। তোমরা সেই খোদায়ী ব্যবস্থাপনার মধ্যে সূর্যকেই দেখ, এই বিশ্বজগত এর দ্বারা কি পরিমাণ উপকার লাভ করতেছে? এতে কিছু পরিবর্তন ও বিবর্তন থাকলেও তা একটি সুনির্ধারিত শৃঙ্খলার অধীন।
অতএব সূর্যের কি সাধ্য আছে এই শৃঙ্খলার বাইরে যেতে চায়, তবে সে তাতে সক্ষম হবে না। কেননা তার লাগাম আল্লাহ পাকের কুদরতের হাতে রয়েছে। নিঃসন্দেহে তাঁর এই ক্ষমতা রয়েছে, তিনি যা ইচ্ছা করবেন, তা-ই করে ছাড়বেন। কিন্তু তিনি করেন তা-ই, যা তাঁর হেকমতের চাহিদা অনুযায়ী হয়।
সুতরাং নমরুদের জন্য এখন জবাব দেওয়ার তিনটি সুরতই হতে পারত। হয়ত সে বলত, সূর্যের উপর আমারও পূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে এবং আমিই এ সমস্ত শৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছি, কিন্তু এই উত্তর সে দেয় নাই। কারণ, সে নিজেও কোনো সময় বলত না যে, এই সমুদয় সৃষ্টি আমিই সৃষ্টি করেছি এবং সূর্যের গতিবিধি আমার ক্ষমতাধীন বরং সে তো শুধু নিজেকে নিজের প্রজাবৃন্দের খোদা ও দেবতা বলে পরিচয় দিত; আর কিছুই না।
দ্বিতীয়ত হতে পারত সে বলত, আমি এই জগতকে কারও সৃষ্টি বলে মানি না। আর সূর্য তো নিজেই স্বতন্ত্র দেবতা। তার ক্ষমতাধীনেই তো অনেক কিছু রয়েছে। কিন্তু এটাও সে বলে নাই। কারণ, যদি সে এরূপ বলত, তবে হযরত ইবরাহীম আ.-এর সেই প্রশ্নই সম্মুখে এসে পড়ত, যা তিনি জনসাধারণের সম্মুখে সূর্যের খোদায়িত্ব সম্বন্ধে উত্থাপন করেছিলেন অর্থাৎ যদি সূর্য খোদা হয়ে থাকে, তবে ভক্ত ও পূজারীদের চেয়ে অধিক এই মাবুদ ও দেবতার মধ্যে পরিবর্তন এবং ধ্বংসের লক্ষণসমূহ কেন বিদ্যমান? যিনি খোদা হবেন, তাঁর সাথে ধ্বংস ও পরিবর্তনের কি সম্পর্ক? আর তার নির্ধারিত সময়ের পূর্বে কিংবা পরে উদিত বা অস্তমিত হওয়ার কী সাধ্য আছে?
তৃতীয়ত সে ইবরাহীম আ.-এর চ্যালেঞ্জকে কবুল করে নিতে এবং পশ্চিম দিক হতে সূর্যকে উদিত করে দেখাতে পারত। কিন্তু নমরূদ যেহেতু এই তিন অবস্থার কোনোভাবেই জবাব দিতে পারছিল না, তাই হতবাক ও নিরুত্তর হয়ে যাওয়া ছাড়া তার জন্য অন্য কোনো উপায়ই ছিল না।
(ঈসায়ী পাদ্রীরা এবং তাদের অন্ধ অনুসরণে আর্য সমাজ ইবরাহীম আ.-এর উপরিউক্ত বিতর্কের উপর প্রশ্ন করছে, "যদি নমরূদ এরূপ বলে বসে, ইবরাহীম তুমিই তোমার খোদার সাহায্যে সূর্যকে পশ্চিম দিক হতে উদিত করে দাও! তবে ইবরাহীমের নিকট কি উত্তর ছিল? এই প্রশ্নটি খুবই দুর্বল ও হালকা। কেননা আমি ইবরাহীম আ.-এর বিতর্কের যেই ব্যাখ্যা বর্ণনা করেছি এবং যা প্রকৃত তথ্য, এরপর এরূপ প্রশ্নের উদভবই হয় না। কেননা নমরূদ জানত, সে এরূপ মোটেও বলতে পারে না।
কারণ, তা হলে প্রথমে তাকে নিজের অক্ষমতা ও অপারগতা স্বীকার করতে হয়। সঙ্গে সঙ্গে এটাও মেনে নিতে হয়, সূর্য আমাদের দেবতাও নয় এবং তার মধ্যে এ ক্ষমতাও নেই, সে আমাদের এ দাবিকে ইবরাহীমের মোকাবেলায় মনযুর করে নিবে। এ কারণেই সে নীরবতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। আর যদি সে এরূপ প্রশ্ন করেই বসত, তবে ইবরাহীম আ.-এর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, এরূপ চ্যালেঞ্জের সময় আল্লাহ তাআলা নিজের সত্য পয়গম্বরকে অপমানিত করবেন না। ইবরাহীম আ.-এর দোয়ায় নিঃসন্দেহে তিনি সূর্যকে পশ্চিম দিক হতে উদিত করে ইবরাহীম আ.-এর সত্যতা প্রকাশ করে দিবেন। অবশ্য এ বিষয়টি জড়বাদীদের জন্য এবং আল্লাহর কুদরতের উপর নিয়ন্ত্রণারোপকারীদের জন্য অবশ্যই বিস্ময়কর হতে পারে।
কিন্তু যাদের আকিদা, সৃষ্টিজগতের এ সমস্ত শৃঙ্খলা যদি নির্দিষ্ট নিয়মাবলীর চাপাকলের সঙ্গে দৃঢ়রূপে আবদ্ধই হয়, তবে তার এ চাপাকল ওই বস্তুসমূহের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের কারণে না বরং এ চাপাকলকে কষে বাঁধা ও দৃঢ় করা অন্য এক মহা ক্ষমতাশীল সত্তার কাজ। যিনি সকলের ঊর্ধ্বে এবং সমস্ত পদার্থের ক্রিয়া ও বৈশিষ্ট্য তাঁরই কুদরতের অধীন।
অতএব তিনি ইচ্ছা করলে যাবতীয় বস্তুর ক্রিয়া ও বৈশিষ্ট্যসমূহকে পরিবর্তিতও করে দিতে পারেন, ধ্বংসও করে দিতে পারেন। সেই পূর্ণ ক্ষমতাশীল, নিরঙ্কুশ মালিক ও সর্বাধিপতির নাম 'আল্লাহ'। এরূপ বিশ্বাস পোষণকারীদের দৃষ্টিতে এটা বিস্ময়কর নয়। নমরূদের সঙ্গে হযরত ইবরাহীম আ.-এর বিতর্কটির কথা সূরা বাকারায় সংক্ষিপ্ত কিন্তু নমনীয়ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে:
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِي حَاجَّ إِبْرَاهِيمَ فِي رَبِّهِ أَنْ آتَاهُ اللَّهُ الْمُلْكَ إِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّيَ الَّذِي يُحْيِي وَيُمِيتُ قَالَ أَنَا أُحْيِي وَأُمِيتُ قَالَ إِبْرَاهِيمُ فَإِنَّ اللَّهَ يَأْتِي بِالشَّمْسِ مِنَ الْمَشْرِقِ فَأْتِ بِهَا مِنَ الْمَغْرِبِ فَبُهِتَ الَّذِي كَفَرَ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ
"আপনি কি দেখেন নি সেই ব্যক্তির ঘটনা, যাকে আল্লাহ তাআলা রাজত্ব দান করেছিলেন। সে কেমনভাবে ইবরাহীম আ.-এর সাথে তার প্রতিপালক সম্বন্ধে বিতর্ক করল? যখন ইবরাহীম আ. বললেন, আমার রব তো জীবন দান করেন এবং মৃত্যু দান করেন। তখন বাদশা বলল, আমি জীবন দান করি এবং মৃত্যু দান করি। ইবরাহীম আ. বললেন, নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা সূর্যকে পূর্বদিক হতে উদয় করেন; তুমি তাকে পশ্চিম দিক হতে বের করে দেখাও! এরপর সেই কাফের বাদশা হতবাক ও নিরুত্তর হয়ে গেল। আর আল্লাহ তাআলা অনাচারীদের পথ দেখান না। (সূরা বাকারা: ২৫৮) মোটকথা, হযরত ইবরাহীম আ. সর্বপ্রথম নিজ পিতা আযরকে ইসলাম গ্রহণের উপদেশ প্রদান করলেন, সত্যের পয়গাম শুনালেন, সরল পথ দেখালেন। এরপর সাধারণ লোককে জনসমাবেশে ব্যাপক আহ্বান জানালেন। আল্লাহর আদেশ মেনে নেওয়ার জন্য প্রকৃতির উৎকৃষ্ট নিয়মাবলী এবং প্রমাণসমূহ পেশ করলেন। নম্রতা, মিষ্টি কথা অথচ মযবুত ও দৃঢ় এবং উজ্জ্বল দলিল-প্রমাণের সঙ্গে সত্যকে তাদের সম্মুখে প্রকাশ করলেন। সর্বশেষ বাদশা নমরূদের সাথে বিতর্ক করলেন। তার নিকট একথা স্পষ্ট করে দিলেন, খোদা ও মাবুদ হওয়ার দাবি একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্যই শোভা পায়।
বড় হতে বড় সম্রাট এবং রাজাধিরাজেরও তাঁর সমকক্ষতার দাবি করার অধিকার নেই। কেননা সে এবং সমগ্র সৃষ্টি তাঁর সৃষ্টি এবং অস্তিত্ব ও অনস্তিত্বের বন্ধনে আবদ্ধ। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাদশা, আযর এবং দেশের আপামর জনসাধারণ হযরত ইবরাহীম আ.-এর দলিল-প্রমাণাদির সম্মুখে নিরুত্তর ছিল। মনে মনে তাঁর সত্যতায় স্বীকারকারী; এমনকি মূর্তিসমূহের ব্যাপারে তো মুখেও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে, ইবরাহীম যা বলছে, তাই সত্য এবং সঠিক। তথাপি তাদের মধ্য হতে কেউই সরল পথ গ্রহণ করল না; সত্য গ্রহণে বিরতই থাকল।
শুধু এতটুকুই নয় বরং তার বিপরীত নিজেদের লজ্জা ও অপমানের প্রতিক্রিয়ায় প্রভাবিত হয়ে অত্যন্ত রাগান্বিত ও ক্রোধান্বিত হয়ে গেল। রাজা হতে প্রজাবৃন্দ পর্যন্ত সকলে ঐকমত্যে সিদ্ধান্ত করে ফেলল, দেবতাদের অপমান করা এবং পূর্বপুরুষের ধর্মের বিরোধিতা করার প্রতিফল স্বরূপ ইবরাহীমকে প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ডে ফেলে পুড়িয়ে ফেলা কর্তব্য। কেননা এমন ভীষণ অপরাধীর শাস্তি এটাই হতে পারে আর দেবতাদের অপমান করার প্রতিশোধ এরূপেই নেওয়া যেতে পারে।
কলুবনূ লাহূ বুনইয়ানান ফাআলকুহু ফিল জাহীম (৯৭) ফাআরাদু বিহী কাইদান ফাজাআল নাহুমুল আসফালীন "তারা বলল, এর জন্যে এক ইমারত তৈরি কর। তারপর একে জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষেপ কর। তারা ইবরাহীমের বিরুদ্ধে চক্রান্তের সংকল্প করেছিল, কিন্তু আমি তাদেরকে অতিশয় হেয় করে দিলাম।"
ইবরাহীম আ.-এর সাথে তারা যখন যুক্তি ও বিতর্কে পেরে উঠতে পারল না, তাদের পক্ষে উপস্থাপন করার মতো কোনোই দলিল-প্রমাণ থাকল না, তখন তারা বিতর্কের পথ এড়িয়ে শক্তি ও ক্ষমতা প্রয়োগের পথ অবলম্বন করল, যাতে করে নিজেদের নির্বুদ্ধিতা ও হঠকারিতা টিকিয়ে রাখতে পারে। আল্লাহ তাআলাও তাদের চক্রান্তকে ব্যর্থ করে দেওয়ার কৌশল নিলেন। আল্লাহ বলেন:
কলু হাররিকুহু ওয়ানসুরু আলিহাতাকুম ইন কুন্তুম ফািইিলীন (৬৮) কুলনা ইয়া নারু কুনী বারদাও ওয়া সালামান আলা ইবরাহীম (৬৯) ওয়া আরাদু বিহী কাইদান ফাজাআল নাহুমুল আখসারীন "তারা বলল, ইবরাহীমকে পুড়িয়ে দাও এবং তোমাদের দেবতাদেরকে সাহায্য কর, যদি তোমরা কিছু করতে চাও। আমি বললাম, হে আগুন! তুমি ইবরাহীমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও। তারা ইবরাহীমের ক্ষতিসাধন করতে চেয়েছিল; কিন্তু আমি তাদেরকে করে দিলাম সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত। (সূরা আম্বিয়া: ৬৮-৭০)
তারা বিভিন্ন স্থান থেকে সম্ভাব্য চেষ্টার মাধ্যমে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে থাকে। দীর্ঘ দিন পর্যন্ত তারা এ সংগ্রহের কাজে রত থাকে। তাদের মধ্যে কোনো মহিলা পীড়িত হলে মানত করত, যদি সে আরোগ্য লাভ করে, তবে ইবরাহীম আ. কে পোড়ানোর লাকড়ি সংগ্রহ করে দিবে। এরপর তারা বিরাট এক গর্ত তৈরি করে তার মধ্যে লাকড়ি নিক্ষেপ করে অগ্নি সংযোগ করে। ফলে তীব্র দহনে প্রজ্বলিত অগ্নিশিখা এত উপরে উঠতে থাকে, যার কোনো তুলনা হয় না।
তারপর ইবরাহীম আ. কে মিনজানিকের মতো নিক্ষেপণ যন্ত্রে বসিয়ে দেয়। এই যন্ত্রটি কুর্দি সম্প্রদায়ের হাযান নামক এক ব্যক্তি তৈরি করে ছিল। মিনজানিক যন্ত্র সে-ই সর্বপ্রথম আবিষ্কার করে। আল্লাহ তাকে মাটির মধ্যে ধসিয়ে দেন। কেয়ামত পর্যন্ত সে মাটির মধ্যে তলিয়ে যেতে থাকবে। তারপর তারা ইবরাহীম আ. কে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে টেনে নিয়ে যেতে থাকে। তখন তিনি বলতে থাকেন:
লَا إِلَهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ لَكَ الْحَمْدُ وَلَكَ الْمُلْكُ لَا شَرِيكَ لَكَ
"আপনি ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই। আপনি মহা পবিত্র। বাদশাহির মালিক কেবল আপনিই। আপনার কোনো শরিক নেই।"
ইবরাহীম আ.-কে মিনজানিকের পাল্লায় হাত-পা বাঁধা অবস্থায় রেখে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়। তখন তিনি বলেন: حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ "আমার জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট, তিনিই উত্তম অভিভাবক!”
📄 হযরত ইবরাহীম আ.-এর সঙ্গে রাসূলুল্লাহ-এর মিল
বোখারি শরিফে হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. সূত্রে বর্ণিত হয়েছে: ইবরাহীম আ.-কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হয়, তখন তিনি বলেছিলেন: حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ আর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন এ দোয়াটি পড়েছিলেন, যখন তাঁকে বলা হয়েছিল: إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إِيمَانًا وَقَالُوا حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ (۱۷৩) فَانْقَلَبُوا بِنِعْمَةٍ مِنَ اللَّهِ وَفَدْلٍ لَمْ يَمْسَسْهُمْ سُومٌ "তোমাদের বিরুদ্ধে লোক জামায়েত হয়েছে। সুতরাং তাদেরকে ভয় কর; কিন্তু এটা তাঁদের ঈমানকে আরও দৃঢ় করে দিয়েছিল। আর তারা বলেছিল, আল্লাহই আমাদের জন্যে যথেষ্ট এবং তিনি বড়ই উত্তম কর্মবিধায়ক। তারপর তারা আল্লাহর নেয়ামত ও অনুগ্রহসহ ফিরে এসেছিল। কোনোরূপ ক্ষতি তাদের স্পর্শ করতে পারে নি।" (সূরা আলে-ইমরান: ১৭৩-১৭৪)
আবু ইয়ালা রহ. ... হযরত আবু হোরায়রা রাযি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ইবরাহীম আ.-কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হয়, তখন তিনি বলেন: “হে আল্লাহ! আপনি আকাশ-রাজ্যে একা, আর জমিনে আমি একাই আপনার ইবাদত করছি।"
📄 আল্লাহর অপূর্ব সাহায্য
কোনো কোনো আলেম বলেন, জিবরাইল আ. শূন্যে থেকে হযরত ইবরাহীম আ.-কে বলেছিলেন: আপনার কোনো সাহায্যের প্রয়োজন আছে কি? উত্তরে ইবরাহীম আ. বলেছিলেন- 'সাহায্যের প্রয়োজন আছে, তবে আপনার কাছে নয়।'
ইবনে আব্বাস ও সাঈদ ইবনে যোবায়ের রাযি. থেকে বর্ণিত- সে সময় বৃষ্টির ফেরেশতা মিকাঈল আ. বলেছিলেন: আমাকে যখনই নির্দেশ দেওয়া হবে, তখনই বৃষ্টি প্রেরণ করব। কিন্তু আল্লাহর নির্দেশবাণী অধিক দ্রুত গতিতে পৌঁছে যায়: ক্বুলনা ইয়া নারু কুনী বারদাও ওয়া সালামান আলা ইবরাহীম
"আমি হুকুম করলাম, হে আগুন! তুমি ইবরাহীমের উপর শীতল ও শান্তিদায়ক হয়ে যাও!"
হযরত আলী ইবনে আবি তালেব রাযি. সালামান এর অর্থ করেছেন, তাকে কষ্ট দিও না। ইবনে আব্বাস রাযি. ও আবুল আলিয়া রহ. বলেছেন, আল্লাহ যদি وَسَلَامًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ না বলতেন, তা হলে ঠাণ্ডা ও শীতলতায় ইবরাহীম আ.-এর কষ্ট হত। কাবে আহবার বলেছেন, পৃথিবীর কোনো লোকই সেদিন আগুন থেকে কোনোরূপ উপকৃত হতে পারে নি এবং ইবরাহীম আ.-এর বন্ধনের রশি ছাড়া আর কিছুই জ্বলে নি। যাহহাক রহ. বলেছেন, সে সময় হযরত জিবরাঈল আ. ইবরাহীম আ.-এর সঙ্গে ছিলেন। এবং তাঁর শরীর থেকে ঘাম মুছে দিচ্ছিলেন। এই ঘাম নির্গমন ছাড়া আগুনের আর কোনো প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পায় নি।
সুদদী রহ. বলেছেন: ইবরাহীম আ.-এর সাথে ছায়াদানের ফেরেশতাও ছিলেন। হযরত ইবরাহীম আ. যখন প্রাচীর বেষ্টনীর মধ্যকার উক্ত গহ্বরে অবস্থান করছিলেন, তখন তাঁর চারপাশে আগুনের লেলিহান শিখা দাউদাউ করছিল। অথচ তিনি ছিলেন শ্যামল উদ্যানে শান্তি ও নিরাপদে। লোকজন এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করেছিল; কিন্তু না তারা ইবরাহীম আ.-এর নিকট যেতে পারছিল; আর না ইবরাহীম আ. বেরিয়ে তাদের কাছে আসতে পারছিলেন।
আবু হোরায়রা রাযি. বলেন : হযরত ইবরাহীম আ.-এর পিতা আপন পুত্রের এ অবস্থা দেখে একটি সুন্দর কথা বলেছিল: নিমা রব্বু রব্বুকা ইয়া ইবরাহীম - হে ইবরাহীম! তোমার প্রতিপালক কতই না উত্তম প্রতিপালক!
📄 হযরত ইবরাহীম আ.-এর প্রতি মাতৃস্নেহ
ইবনে আসাকির রহ. ইকরামা রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন: ইবরাহীম আ.-এর মা পুত্রকে এ অবস্থায় দেখে ডেকে বলেছিলেন, হে আমার প্রিয় পুত্র! আমি তোমার নিকট আসতে চাই। আল্লাহর কাছে একটু বল, যাতে তোমার চারপাশের আগুন থেকে আমাকে রক্ষা করেন। ইবরাহীম আ. বললেন, হ্যাঁ বলছি। তারপর মা পুত্রের নিকট চলে গেলেন। আগুন তাঁকে স্পর্শ করল না। কাছে গিয়ে মাতা আপন পুত্রকে আলিঙ্গন ও চুম্বন করলেন এবং পুনরায় অক্ষতভাবে সেখান থেকে বের হয়ে এলেন।
মিনহাল ইবনে আমর রাযি. বর্ণনা করেছেন : হযরত ইবরাহীম আ. আগুনের মধ্যে চল্লিশ কিংবা পঞ্চাশ দিন অবস্থান করেন। এই সময় সম্পর্কে হযরত ইবরাহীম আ. বলেন: আগুনের মধ্যে আমি যতদিন ছিলাম, ততদিন এমন শান্তি ও আরামে কাটিয়েছি, তার চেয়ে অধিক আরামের জীবন আমি কখনো উপভোগ করি নি।
তিনি আরো বলেন: আমার গোটা জীবন যদি ওইরূপ অবস্থায় কাটত, তবে কতই না উত্তম হত! এভাবে হযরত ইবরাহীম আ.-এর সম্প্রদায় শত্রুতাবশত প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল; কিন্তু তারা ব্যর্থ হল। তারা গৌরব অর্জন করতে চেয়েছিল, কিন্তু লাঞ্ছিত হল। তারা বিজয়ী হতে চেয়েছিল, কিন্তু পরাজিত হল। আল্লাহ বলেন: "তারা চক্রান্ত করে ক্ষতি করতে চেয়েছিল, কিন্তু আমি তাদের অধিকতর ক্ষতিগ্রস্ত করে দেয়।"
অপর আয়াতে আছে : "আমি তাদেরকে হীনতম করে দিই।" এরূপ দুনিয়ার জীবনে তারা ক্ষতি ও লাঞ্ছনাপ্রাপ্ত হয় আর আখিরাতের জীবনে তাদের ওপর আগুন না শীতল হবে, না শান্তিদায়ক হবে বরং সেখানকার অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন: "জাহান্নাম হল তাদের জন্যে নিকৃষ্ট আবাস ও ঠিকানা।" (সূরা ফুরকান: ৬৬)