📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 পিতাকে ইসলামের দাওয়াত প্রদান এবং পিতাপুত্রে বিতর্ক

📄 পিতাকে ইসলামের দাওয়াত প্রদান এবং পিতাপুত্রে বিতর্ক


হযরত ইবরাহীম আ. দেখলেন, শিরকের সর্বাপেক্ষা প্রধান কেন্দ্র তাঁর নিজের ঘরে বর্তমান। আর আযরের মূর্তিনির্মাণ ও মূর্তিপূজা গোটা কওমের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র ও মেরুদণ্ড হয়ে রয়েছে। তাই তিনি ভাবলেন, সুকৌশল হচ্ছে সত্যের প্রতি আহ্বান এবং সত্যের পয়গাম প্রচারের কর্তব্য পালন নিজ ঘর হতেই আরম্ভ করা। অতএব ইবরাহীম আ. সর্বপ্রথম নিজের পিতা আযারকেই লক্ষ্য করে বললেন পিতা! আল্লাহর এবাদত এবং আল্লাহকে চেনার জন্য আপনি যে পন্থা অবলম্বন করেছেন এবং যাকে পূর্বপূরুষদের পুরাতন পন্থা বলেন, এটা প্রকাশ্য ভ্রান্তি এবং বাতেল পন্থা। সিরাতুল মুস্তাকীম ও সত্যপথ হলো, আমি যেদিকে আহ্বান করছি। পিতা! এক আল্লাহর অস্তিত্ব ও একত্বে বিশ্বাস করাই নাজাতের উৎস; আপনার হাতে গড়া এ সমস্ত মূর্তিপূজা নয়।

আপনি এই পন্থা ত্যাগ করুন এবং আল্লাহর একত্বের পথকে দৃঢ়তার সঙ্গে গ্রহণ করুন। তাতে আপনি আল্লাহ তাআলার সন্তোষ এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সৌভাগ্য লাভ করতে পারবেন। কিন্তু আফসোস! আযরের উপর ইবরাহীম আ.-এর এ উপদেশ ও নসিহতের কোনোই ক্রিয়া হল না বরং সত্য কবুল করার পরিবর্তে আযর তার পুত্রকে ধমকাতে লাগল :

"তুমি যদি মূর্তিসমূহের নিন্দাবাদ হতে বিরত না হও, তবে আমি তোমাকে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করব।"

হযরত ইবরাহীম আ. দেখলেন, বিষয়টা সীমা ছাড়িয়ে গেছে। একদিকে যদি পিতার সম্মান রক্ষা করার প্রশ্ন হয়, তবে অন্যদিকে কর্তব্য পালন, সত্যের সংরক্ষণ ও আল্লাহর আদেশ পালনের প্রশ্ন। অতএব তিনি চিন্তা করলেন এবং শেষ পর্যন্ত তা-ই করলেন, যা এরূপ একজন মনোনীত মানুষ এবং আল্লাহ পাকের উচ্চ মর্যাদাশালী পয়গম্বরের মর্যাদার উপযোগী ছিল। তিনি পিতার কঠোর উক্তির উত্তর কঠোরতার দ্বারা দিলেন না, হীনতা ও নীচতার পন্থা অবলম্বন করলেন না। বরং নিছক নম্রতা, কোমলতা এবং মহান চরিত্রের সাথে উত্তর দিলেন: পিতা! যদি আমার কথার উত্তর এটাই হয়, তবে আজ থেকে আপনাকে সালাম করে পৃথক হয়ে যাচ্ছি। আমি আল্লাহ তাআলার সত্য ধর্ম ত্যাগ করতে পারি না। এবং কোনো অবস্থাতেই মূর্তিসমূহের পূজা করতে পারি না। আমি আজ হতে আপনার সংশ্রব থেকে পৃথক হয়ে যাচ্ছি। কিন্তু আপনার অগোচরে আপনার জন্য আল্লাহ তাআলার দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকব। যাতে আপনার হেদায়েত লাভের সৌভাগ্য হয় এবং আপনি আল্লাহর আযাব হতে নাজাত পান।

হযরত ইবরাহীম আ. সর্বপ্রথম আপন পিতাকে ঈমানের দাওয়াত দিলেন। তার পিতা ছিল মূর্তিপূজারী। কাজেয় কল্যাণের দিকে আহ্বান পাওয়ার অধিকার তারই সবচাইতে বেশি। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّهُ كَانَ صِدِّيقًا نَبِيًّا (٤١) إِذْ قَالَ لِأَبِيهِ يَا أَبَتِ لِمَ تَعْبُدُ مَا لَا يَسْمَعُ وَلَا يُبْصِرُ وَلَا يُغْنِي عَنْكَ شَيْئًا (٤٢) يَا أَبَتِ إِنِّي قَدْ جَاءَنِي مِنَ الْعِلْمِ مَا لَمْ يَأْتِكَ فَاتَّبِعْنِي أَهْدِكَ صِرَاطًا سَوِيًّا (٤٣) يَا أَبَتِ لَا تَعْبُدِ الشَّيْطَانَ إِنَّ الشَّيْطَانَ كَانَ لِلرَّحْمَنِ عَصِيًّا (٤٤) يَا أَبَتِ إِنِّي أَخَافُ أَنْ يَمَسَّكَ عَذَابٌ مِنَ الرَّحْمَنِ فَتَكُونَ لِلشَّيْطَانِ وَلِيًّا (٤٥) قَالَ أَرَاغِبُ أَنتَ عَنْ آلِهَتِي يَا إِبْرَاهِيمُ لَئِنْ لَمْ تَنْتَهِ لَأَرْجُمَنَّكَ وَاهْجُرْنِي مَلِيًّا (٤٦) قَالَ سَلَامٌ عَلَيْكَ سَأَسْتَغْفِرُ لَكَ رَبِّي إِنَّهُ كَانَ بِي حَفِيًّا (٤٧) وَأَعْتَزِلُكُمْ وَمَا تَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَأَدْعُو رَبِّى عَسَى أَلَّا أَكُونَ بِدُعَاءِ رَبِّى شَقِيًّا

স্মরণ কর! এ কিতাবে উল্লিখিত ইবরাহীম আ.-এর কথা! সে ছিল সত্যনিষ্ঠ নবী। যখন সে তার পিতাকে বলল, 'হে আমার পিতা! তুমি কেন তার ইবাদত কর- যে শুনে না, দেখে না এবং তোমার কোনো কাজেই আসে না? হে আমার পিতা! আমার নিকট তো এসেছে জ্ঞান, যা তোমার নিকট আসে নি। সুতরাং আমার অনুসরণ কর, আমি তোমাকে সঠিক পথ দেখাব। হে আমার পিতা! শয়তানের ইবাদত কর না; শয়তান তো দয়াময়ের অবাধ্য। হে আমার পিতা! আমি আশঙ্কা করছি, তোমাকে দয়াময়ের শাস্তি স্পর্শ করবে এবং তুমি শয়তানের বন্ধু হয়ে পড়বে। পিতা বলল, 'হে ইবরাহীম! তুমি কি আমার দেব-দেবী হতে বিমুখ? যদি তুমি নিবৃত্ত না হও, তবে আমি পাথরের আঘাতে তোমার প্রাণনাশ করবই। তুমি চিরদিনের জন্যে আমার নিকট হতে দূর হয়ে যাও!' ইবরাহীম আ. বলল, 'তোমার প্রতি সালাম। আমি আমার প্রতিপালকের নিকট তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব, তিনি আমার প্রতি অতিশয় অনুগ্রহশীল। আমি তোমাদের হতে ও তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদের ইবাদত কর, তাদের হতে পৃথক হচ্ছি। আমি আমার প্রতিপালককে আহ্বান করি, আশা করি আমার প্রতিপালককে আহ্বান করে আমি ব্যর্থ হব না। (সূরা মারইয়াম: ৪১-৪৮)

এখানে আল্লাহ তাআলা ইবরাহীম আ. ও তাঁর পিতার মধ্যে যে কথোপকথন ও বিতর্ক হয়েছিল, তা উল্লেখ করেছেন। সত্যের দিকে পিতাকে তিনি কোমল ভাষায় ও উত্তম ভঙ্গিতে আহ্বান করেছেন, তা এখানে সুন্দরভাবে ব্যক্ত হয়েছে। তিনি পিতার মূর্তিপূজার অসারতা তুলে ধরছেন, তা হলে এরা কিভাবে উপাসকদের উপকার করবে? কিভাবে তাদের খাদ্য ও সাহায্য দান করে তাদের কল্যাণ করবে? তারপর আল্লাহ তাকে যে হেদায়েত ও উপকারী জ্ঞান দান করেছেন, তার ভিত্তিতে পিতাকে সর্তক করে দেন, যদিও বয়সে তিনি স্বভাবতই পিতার চেয়ে ছোট।

يَا أَبَتِ إِنِّي قَدْ جَاءَنِي مِنَ الْعِلْمِ مَا لَمْ يَأْتِكَ فَاتَّبِعْنِي أَهْدِكَ صِرَاطًا سَوِيًّا

"হে আমার পিতা! আমার কাছে জ্ঞান এসেছে, যা আপনার নিকট আসে নি। সুতরাং আপনি আমার অনুসরণ করুন! আমি আপনাকে সরল সঠিক পথ দেখাব। অর্থাৎ এমন পথ যা অতি সুদৃঢ়, সহজ ও সরল। যে পথ অবলম্বন করলে দুনিয়া ও আখিরাতে আপনাকে কল্যাণের পথে নিয়ে যাবে। ইবরাহীম আ. যখন পিতার নিকট এই সত্য পথ ও উপদেশ পেশ করলেন। পিতা তা গ্রহণ করল না বরং উল্টো তাঁকে ধমকাল ও ভয় দেখাল। সে বলল:

قَالَ أَرَاغِبٌ أَنْتَ عَنْ آلِهَتِي يَا إِبْرَاهِيمُ لَئِنْ لَمْ تَنْتَهِ لَأَرْجُمَنَّكَ وَاهْجُرْنِي مَلِيًّا

“হে ইবরাহীম! তুমি কি আমার দেব-দেবী থেকে বিমুখ? যদি তুমি নিবৃত্ত না হও, তবে আমি পাথরের আঘাতে তোমার প্রাণনাশ করবই।"

কেউ কেউ বলেন, মৌখিকভাবে। আবার কেউ কেউ বলেন, বাস্তবেই পাথর মারব। (وَاهْجُرْنِي مَلِيًّا (চিরতরের জন্যে দূর হয়ে যাও) অর্থাৎ আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে দীর্ঘকালের জন্যে চলে যাও। ইবরাহীম আ. তখন বলেছিলেন: سَلَامٌ عَلَيْكَ অর্থাৎ আমার পক্ষ থেকে কোনো রকম কষ্টদায়ক ব্যবহার তুমি পাবে না। আমার তরফ থেকে তুমি সম্পূর্ণ নিরাপদ। ইবরাহীম আ. অতিরিক্ত আরও বললেন: سَأَسْتَغْفِرُ لَكَ رَبِّي إِنَّهُ كَانَ بِي حَفِيًّا - আমি আমার প্রতিপালকের নিকট তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব। তিনি আমার প্রতি অতিশয় অনুগ্রহশীল।

ইবনে আব্বাস রাযি. প্রমুখ বলেছেন- লতিফান অর্থ দয়ালু। কেননা তিনি আমাকে সত্য পথের সন্ধান দিয়েছেন। একনিষ্ঠভাবে তাঁর ইবাদত করার তাওফিক দিয়েছেন। কাজেই তিনি বললেন: وَأَعْتَزِلُكُمْ وَمَا تَدْعُونَ مِنْ دুونِ اللَّهِ وَأَدْعُو رَبِّي عَسَى أَلَّا أَكُونَ بِدُعَاءِ رَبِّي شَقِيًّا "আমি তোমাদেরকে পরিত্যাগ করছি এবং আল্লাহ ব্যতীত যাদের পূজা তোমরা করছ, তাদেরও পরিত্যাগ করছি। আমি কেবল আমার পালনকর্তাকেই আহ্বান করি। আশা করি, আমার প্রতিপালককে আহ্বান করে আমি ব্যর্থ-নিষ্ফল হব না।”

এ ওয়াদা অনুযায়ী ইবরাহীম আ. পিতার জন্যে সর্বদা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন। পরে যখন জানলেন, তাঁর পিতা আল্লাহর দুশমন; তখন তিনি তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে দেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন: وَمَا كَانَ اسْتِغْفَارُ إِبْرَاهِيمَ لِأَبِيهِ إِلَّا عَنْ مَوْعِدَةٍ وَعَدَهَا إِيَّاهُ فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُ أَنَّهُ عَدُوٌّ لِلَّهِ تَبَرَّأَ مِنْهُ إِنَّ إِبْرَاهِيمَ لَأَوَّاهُ حَلِيمٌ

ইবরাহীম আ. তাঁর পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন, তাকে এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বলে, এরপর যখন এটা তার নিকট সুস্পষ্ট হল, সে আল্লাহর শত্রু, তখন ইবরাহীম আ. তার সম্পর্ক ছিন্ন করলেন। ইবরাহীম আ. তো কোমলপ্রাণ ও সহনশীল। (সূরা তাওবা: ১১৪)

ইমাম বোখারি রহ. হযরত আবু হোরায়রা রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন কেয়ামতের দিন ইবরাহীম আ.-এর সাথে তাঁর পিতা আযরের সাক্ষাৎ হবে। আযরের চেহারা মলিন ও কালিমালিপ্ত দেখে ইবরাহীম আ. বলবেন: আমি কি আপনাকে দুনিয়ায় বলি নি, আমার অবাধ্য হবেন না? পিতা বলবে, 'আজ আর আমি তোমার অবাধ্য হব না।' তখন ইবরাহীম আ. বলবেন, হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, পুনরুত্থান দিবসে আমাকে লাঞ্ছিত করবেন না। কিন্তু আমার পিতা যেখানে আপনার দয়া ও ক্ষমা থেকে দূরে থাকছে, সেখানে এর চেয়ে অধিক লাঞ্ছনা আর কি হতে পারে? আল্লাহ বলবেন, আমি কাফেরদের উপর জান্নাত হারাম করে দিয়েছি। তারপর বলা হবে: হে ইবরাহীম! তোমার পায়ের নিচে কি? নিচের দিকে তাকিয়ে তিনি দেখবেন, একটি জবাইকৃত পশু রক্তাপ্লুত অবস্থায় পড়ে আছে। তারপর পশুটির পাগুলি ধরে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

ইমাম বোখারি রহ. 'কিতাবুত তাফসিরে' ভিন্ন সূত্রে এ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম নাসায়িও হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। এসব বর্ণনায় ইবরাহীম আ.-এর পিতা আযর বলে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ لِأَبِيهِ آزَرَ أَتَتَّخِذُ أَصْنَامًا آلِهَةً إِنِّي أَرَاكَ وَقَوْمَكَ فِي ضَلَالٍ مُبِينٍ

স্মরণ কর! ইবরাহীম আ. তার পিতা আযরকে বলেছিলেন, আপনি কি মূর্তিকে ইলাহরূপে গ্রহণ করেছেন? আমি আপনাকে ও আপনার সম্প্রদায়কে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে দেখছি! (সূরা আনআম: ৭৪)

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 কওমকে ইসলামের প্রতি আহবান

📄 কওমকে ইসলামের প্রতি আহবান


পিতা ও পুত্রের মধ্যে যখন ঐক্য হওয়ার কোনোই উপায় হল না এবং আযর কোনোক্রমেই ইবরাহীম আ.-এর হেদায়াত ও নসিহত কবুল করল না, তখন হযরত ইবরাহীম আ. আযর হতে পৃথক হয়ে গেলেন এবং নিজে সত্যের দাওয়াত ও ধর্মপ্রচারকে ব্যাপক করে দিলেন। এখন শুধু আযরই সম্বোধনস্থল রইল না বরং গোটা কওমকে সম্বোধনস্থল করে নিলেন। কিন্তু কওম নিজেদের পূর্বপুরুষের ধর্ম ত্যাগ করতে প্রস্তুত হল না। তারা ইবরাহীম আ.-এর কোনো কথাই শুনল না। বরং সত্যের দাওয়াতের সম্মুখে নিজেদের বাতেল মাবুদগুলোর মতোই বোবা, অন্ধ এবং বধির হয়ে রইল।

তাদের কান ছিল কিন্তু সত্যের আওয়াজ শ্রবণের জন্য বধির ছিল। চোখের পুতলিগুলি যথাস্থানেই জীবিত মানুষের চক্ষুর মতো অবশ্যই নড়াচড়া করত, কিন্তু সত্য দর্শন হতে বঞ্চিত ছিল। মুখ বাকশক্তি সম্পন্ন অবশ্যই ছিল, কিন্তু সত্যকথা উচ্চারণ হিসাবে বোবা ছিল। এই মর্মে সূরা আরাফে আল্লাহ তাআলা বলেন:

لَهُمْ قُلُوبٌ لَا يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لَا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لَا يَسْمَعُونَ بِهَا أُولَئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ أُولَئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ

"তাদের অন্তর আছে কিন্তু তা দিয়ে বুঝে না, তাদের চক্ষু আছে কিন্তু তা দিয়ে দেখে না। এবং তাদের কান আছে কিন্তু তা দিয়ে শুনে না; এরা চতুষ্পদ জন্তুর মতো বরং তার চেয়েও অধিক পথভ্রষ্ট। তারা গাফলত এবং অমনোযোগিতার মধ্যে মত্ত-বিহ্বল। (সূরা আরাফ: ১৭৯)

আর যখন ইবরাহীম আ. তাদেরকে শক্তভাবে জিজ্ঞাসা করলেন: বল! তোমরা যাদের পূজা করছ, তারা তোমাদের কোনো উপকার বা ক্ষতি করতে পারে কি না? তারা বলল, আমরা এ সমস্ত বিষয়ের ঝগড়ায় লিপ্ত হতে চাই না। আমরা তো জানি, আমাদের পূর্বপুরুষগণ এটা করে আসছেন। অতএব আমরাও তা করছি। তখন হযরত ইবরাহীম আ. তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে বলতে লাগলেন, আমি তো তোমাদের এ সমস্ত মূর্তিকে আমার শত্রু মনে করছি। অর্থাৎ তাদের হতে নির্ভীক হয়ে তাদের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করছি। এরা যদি আমার কোনো ক্ষতি করতে সক্ষম হয়, তবে নিজেদের সখ ও আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করে নিক।

অবশ্য আমি শুধু সেই সত্তাকে আমার মালিক মনে করছি, যিনি সারা জাহানের প্রতিপালক। যিনি আমাকে পয়দা করেছেন এবং সত্য ও সরল পথ প্রদর্শন করেছেন, যিনি আমাকে খাদ্য-পানীয় দান করেন। অর্থাৎ রিযিক প্রদান করেন। যখন আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি, তখন আমাকে সুস্থতা দান করেন। যিনি আমার জীবন ও মৃত্যুর মালিক। আমি কোনো অপরাধ বা ত্রুটি করে ফেললে তাঁর দরবারে আশা রাখি, তিনি আমাকে কিয়ামতের দিন ক্ষমা করে দিবেন। আমি তাঁর দরবারে প্রার্থনা করি, হে আমার প্রতিপালক। আপনি আমাকে সঠিক মীমাংসার শক্তি দান করুন, আমাকে মুখের সত্যতা দান করুন আর আমাকে জান্নাতুন নাঈমের উত্তরাধীকারীদের শামিল করুন।

নসিহত ও উপদেশাবলীর ক্রিয়াশীল পদ্ধতিতে হযরত ইবরাহীম আ. নিজের পিতা ও কওমের সম্মুখে যা কিছু পেশ করলেন, সূরা শুআরায় বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে: وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ إِبْرَاهِيمَ (৬৯) إِذْ قَالَ لِأَبِيهِ وَقَوْمِهِ مَا تَعْبُدُونَ (৭০) قَالُوا نَعْبُدُ أَصْنَامًا فَنَظَلُّ لَهَا عَاكِفِينَ (৭১) قَالَ هَلْ يَسْمَعُونَكُمْ إِذْ تَدْعُونَ (۷২) أَوْ يَنْفَعُونَكُمْ أَوْ يَضُرُّونَ (৭৩) قَالُوا بَلْ وَجَدْنَا آبَاءَنَا كَذَلِكَ يَفْعَلُونَ (٧٤) قَالَ أَفَرَأَيْتُمْ مَا كُنْتُمْ تَعْبُدُونَ (٧٥) أَنْتُمْ وَآبَاؤُكُمُ الْأَقْدَمُونَ (٧٦) فَإِنَّهُمْ عَدُوٌّ لِي إِلَّا رَبَّ الْعَالَمِينَ (۷৭) الَّذِي خَلَقَنِي فَهُوَ يَهْدِينِ (۷৮) وَالَّذِي هُوَ يُطْعِمُنِي وَيَسْقِينِ (۷৯) وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ (৮০) وَالَّذِي يُمِيتُنِي ثُمَّ يُحْيِينِ (৮১) وَالَّذِي أَطْمَعُ أَنْ يَغْفِرَ لِي خَطِيئَتِي يَوْمَ الدِّينِ (৮২) رَبِّ هَبْ لِي حُكْمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ (৮৩) وَاجْعَلْ لِي لِسَانَ صِدْقٍ فِي الْآخِرِينَ (٨٤) وَاجْعَلْنِي مِنْ وَرَثَةِ جَنَّةِ النَّعِيمِ (٨٥) وَاغْفِرْ لِأَبِي إِنَّهُ كَانَ مِنَ الضَّالِّينَ (৮৬) وَلَا تُخْزِنِي يَوْমَ يُبْعَثُونَ (৮৭) يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ (৮৮) إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ

"আর তাদেরকে ইবরাহীম আ.-এর সংবাদ পাঠ করে শুনিয়ে দিন, যখন তিনি নিজের পিতাকে ও নিজের কওমকে বললেন- কীসের পূজা করছ? তারা বলল, মূর্তিসমূহের পূজা করছি। অতএব তাদের নিকট অনবরত বসে থাকি। ইবরাহীম আ. বললেন: যখন তোমরা এদের ডাক, তখন এরা তোমাদের কথা কি কিছু শুনে? তোমাদের কি কোনো উপকার কিংবা কোনো ক্ষতি করতে পারে? তারা বলল: না, তবে আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের এ কাজ করতে দেখেছি। তিনি বললেন, তোমরা কি চিন্তা করে দেখেছ, যাদের পূজা করছ তোমরা এবং তোমাদের পূর্বপুরুেষরা?

অতএব এরা আমার শত্রু; কিন্তু রাব্বুল আলামিন আল্লাহ যিনি আমাকে পয়দা করেছেন, অনন্তর তিনি আমাকে সৎপথ প্রদর্শন করেছেন, আমাকে খাদ্য দান করেছেন, পানীয় দান করেছেন আর যখন আমি পীড়িত হয়ে পড়ি, তখন তিনিই আমাকে সুস্থতা দান করেন। আর তাঁর নিকট আমি এ আশা রাখি, আমার ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলি তিনি কেয়ামতের দিন ক্ষমা করবেন। হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ধর্মীয় জ্ঞানের শক্তি দান করুন। আর আমাকে নেককারদের সঙ্গে মিলিত করুন আর পরবর্তী লোকদের মধ্যে আমার কথাবার্তা সত্য রাখুন! আমাকে জান্নাতুন নাঈমের ওয়ারিসদের দলভুক্ত করুন এবং আমার পিতাকে ক্ষমা করুন! তিনি পথভ্রষ্টদের মধ্যে রয়েছে। আর যে দিন সকলে পুনরায় জীবিত হয়ে উঠবে, সেদিন আমাকে লজ্জিত করবেন না। যে দিন ধন-সম্পদও কোনো কাজে আসবে না এবং কোনো ছেলে-সন্তানও না। কিন্তু যে ব্যক্তি আল্লাহর দরবারে নিরোগ অন্তর নিয়ে আসবে। (সে ব্যক্তি হবে সফলকাম)। (সূরা শুআরা: ৬৯-৮৯)

আযর ও আযরের কওমের অন্তর কোনো ক্রমেই সত্যকে কবুল করার জন্য নরম হল না এবং তারা অবিশ্বাস ও অস্বীকৃতির সীমা ছাড়িয়ে যেতে লাগল। ইতোপূর্বে বলে এসেছি, হযরত ইবরাহীম আ.-এর কওম মূর্তিপূজার সাথে সাথে নক্ষত্রপূজাও করত। তাদের বিশ্বাস ছিল মানুষের মৃত্যু ও জীবন, তাদের রিযিক, তাদের লাভ-লোকসান, দুর্ভিক্ষ, জয়-পরাজয় মোটকথা জগতের যাবতীয় কাজের শৃঙ্খলা নক্ষত্রসমূহ এবং তাদের গতিবিধির প্রভাবেই চলছে। এবং এ প্রভাব এগুলোর নিজস্ব একটি বৈশিষ্ট্য। সুতরাং ওগুলোকে সন্তুষ্ট রাখা অবশ্য কর্তব্য। আর তা এদেরকে পূজা করা ভিন্ন সম্ভব নয়।

হযরত ইবরাহীম আ. যেভাবে তাদের নিম্নজগতের বাতেল মাবুদগুলোর স্বরূপ উদঘাটিত করে দিয়ে তাদের সত্য পথের দিকে আহ্বান করলেন, তদ্রুপ তারা ঊর্ধ্বজগতের (আসমানের) বাতেল মাবুদগুলোরও অস্থায়িত্ব এবং ধ্বংসশীল হওয়ার দৃশ্য তাদের সম্মুখে পেশ করে এই তথ্যটিও জানিয়ে দেওয়াও জরুরি মনে করলেন, তোমাদের এই উজ্জ্বল ও দীপ্তিমান নক্ষত্র চন্দ্র ও সূর্য গ্রহগুলির খোদায়ী শক্তির আধিপত্য থাকার ধারণাটিও নিশ্চিত ভ্রান্ত। ব্যাপারটা কখনও তা নয়; এটা ভুল ধারণা এবং ভুল বিশ্বাস। কিন্তু এই বাতিলের পূজকেরা যখন নিজেদের স্বহস্তে নির্মিত মূর্তিকে এত ভয় করত, এদের নিন্দুকেরা এদের কোপে পতিত হয়ে ধ্বংস ও বরবাদ হয়ে যাবে বলে ভাবত। তখন এ কল্পনাপূজারীদের অন্তরে ঊর্ধ্বজগতের সেই নক্ষত্রপূজার বিপরীত প্রেরণা সৃষ্টি করা কোনো সহজ কাজ ছিল না। সুতরাং মুজাদ্দিদে আম্বিয়া হযরত ইবরাহীম আ. তাদের মস্তিষ্কের উপযোগী এক বিচিত্র ও চিত্তাকর্ষণ বর্ণনা পদ্ধতি অবলম্বন করলেন। রাত্রি ছিল নক্ষত্রপূর্ণ। একটি নক্ষত্র ছিল অত্যন্ত দীপ্তিমান। হযরত ইবরাহীম আ. তাকে দেখে বললেন, এটি কি আমার খোদা? কোনো নক্ষত্র যদি খোদায়িত্বের শক্তি রাখে, তবে কি এটি তন্মধ্যে সর্বাপেক্ষা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত এবং উজ্জ্বল।

কিন্তু যখন তা নিজের নির্ধারিত সময়ে দৃষ্টির বাইরে অদৃশ্য হয়ে গেল এবং তা আরও একটি মুহূর্ত অন্যান্য নক্ষত্রগুলির জন্য নিজের দীপ্তি প্রকাশ করার সাধ্য তার হল না, সম্ভব হল না বিশ্বজগতের শৃঙ্খলার অন্যথা করে নিজের পূজকদের সাক্ষাতের কেন্দ্রস্থল হয়ে থাকা, তখন হযরত ইবরাহীম আ. বললেন, আমি আত্মগোপনকারীদের পছন্দ করি না। অর্থাৎ যে বস্তু পরিবর্তনের প্রভাবে আমার চেয়েও অধিক প্রভাবিত হয় এবং যা তাড়াতাড়ি ওই সমস্ত পরিবর্তনের প্রভাব গ্রহণ করে, তা আমার মাবুদ কেমন করে হতে পারে?

আবার তাকিয়ে দেখতে পেলেন, চন্দ্র অতিশয় দীপ্তি ও আলো নিয়ে সম্মুখে বিদ্যমান। (কোরআন মাজিদে এ কথা উল্লেখ নেই, এই কথোপকথন কয়েক রাত্রিতে হয়েছিল না কি এক রাত্রিতে। যদি একই রাত্রিতে হয়ে থাকে, তবে মনে হয় এটা এমন এক রাত্রের ঘটনা, যে রাতের কিছু অংশ গত হওয়ার পর চাঁদ উদয় হয়েছিল।)

তিনি চন্দ্রকে দেখে বললেন, এ কি আমার খোদা? কেননা এটা খুব উজ্জ্বল এবং নিজের স্নিগ্ধ আলোকে সারা বিশ্বকে আলোময় করে দিয়েছে। অতএব যদি নক্ষত্রসমূহকে খোদা বানানো হয়, তবে এ চন্দ্রকেই কেন বানানো হবে না। একেই তো খোদা হওয়ার অধিক উপযোগী দেখা যাচ্ছে।

ভোর ঘনিয়ে এলে ক্রমেই চন্দ্রের আলোও নিভে যেতে লাগল। তারও আত্মগোপন করার সময় হয়ে গেল। আর যতই সূর্যোদয়ের সময় ঘনিয়ে আসতে লাগল, ততই চাঁদের অস্তিত্ব দশনার্থীর দৃষ্টি হতে অদৃশ্য হতে লাগল। এ দেখে ইবরাহীম আ. এমন একটি বাক্য বললেন, যাতে চাঁদের খোদা হওয়ার উপর নেতিবাচক পর্দা টেনে দেওয়ার সাথে সাথে এক আল্লাহ তাআলার অস্তিত্বের দিকে কওমের দৃষ্টি এমন নীরবতার সাথে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, যাতে কওম তা অনুভবই করতে না পারে। আর এ কথোপকথনের যে একক উদ্দেশ্য অর্থাৎ এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা, তা তাদের অন্তরে অনিচ্ছাকৃতভাবে বসে যায়। তিনি বললেন, "আমার প্রকৃত পরওয়ারদিগার যদি আমাকে পথ প্রর্দশন না করতেন, তবে আমিও অবশ্যই পথভ্রষ্ট কওমেরই অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতাম।"

এতটুকু বলেই তিনি নীরব হয়ে গেলেন। কেননা এই শৃঙ্খলের আরও একটি কড়া এখনও অবশিষ্ট রয়েছে। কওমের সঙ্গে মোকাবেলা করার জন্য আরও একটি অস্ত্র বাকী আছে। অতএব এর চেয়ে অতিরিক্ত কিছু বলা সমচীন ছিল না। নক্ষত্রপূর্ণ রাত্রির অবসান হল। নক্ষত্র, চন্দ্র সবকিছুই দৃষ্টি হতে অদৃশ্য হয়ে গেল কেন? কারণ বিশ্ব উজ্জ্বলকারী সূর্যের দ্বীপ্তিমান চেহারা এখন সম্মুখে আসছে। দিবা উদ্ভাসিত হল এবং সূর্য পূর্ণ আলো ও দীপ্তির সাথে দীপ্তিমান হতে লাগল।

ইবরাহীম আ. তা দেখে বললেন, এটাই আমার খোদা। কেননা গ্রহগুলোর মধ্যে এটা সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সৌরজগতে এর চেয়ে বড় গ্রহ আমাদের সম্মুখে দ্বিতীয়টি নেই। সারা দিন দীপ্তিমান ও আলোময় থাকার এবং সমগ্র বিশ্বকে আলোকিত করার পর নির্ধারিত সময়ে তা-ও ইরাকের ভূখণ্ড হতে সরে পড়তে লাগল। অন্ধকার রাত্রি ক্রমেই সম্মুখে আসতে লাগল এবং অবশেষে সূর্যও দৃষ্টিপথ হতে অদৃশ্য হয়ে গেল! এখন সময় আসে, ইবরাহীম আ. প্রকৃত তথ্য ঘোষণা করে দিয়ে কওমকে নিরুত্তর করে দেওয়ার।

তারা যেন ভাবতে বাধ্য হয়, তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী যদি এ সমস্ত গ্রহ-নক্ষত্রাদি খোদা ও মাবুদ হওয়ার অধিকারী হয়, তবে কি কারণে তাদের মধ্যে আমাদের চেয়েও অধিক পরিবর্তন ও অস্থায়িত্ব দেখা যায়? এবং কেন তারা অতি তাড়াতাড়ি পরিবর্তনের ও স্থায়িত্বের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে যায়। যদি এরা মাবুদ হয়ে থাকে, তবে তারা অস্তমিত হয় কেন? তথা যেমনিভাবে দীপ্তিমান ও উজ্জ্বল দৃষ্ট হচ্ছিল, তদ্রুপ উজ্জ্বল ও দীপ্তিমান থাকে না কেন? ক্ষুদ্র তারকাগুলির আলোকে চাঁদের আলো অনুজ্জ্বল করে দিল কেন? চন্দ্রের উজ্জ্বল চেহারাকে সূর্যের আলো কেন আলো বিহীন করে দিল?

অতএব হে কওম! আমি এসমস্ত শিরকমূলক বিশ্বাস হতে পবিত্র এবং শিরকের বন্দিগীর প্রতি অসন্তুষ্ট। নিঃসন্দেহে আমি আমার মনোযোগকে শুধু এক আল্লাহ তাআলার দিকে নিবিষ্ট করছি, যিনি আসমানসমূহ এবং জমিনকে সৃষ্টি করেছেন। আমি সত্যের প্রতি আকৃষ্ট, মুশরিক নই।

এখন কওম বুঝতে পারল, এ কী হলো। ইবরাহীম আ. আমাদের সকল অস্ত্র অকেজো করে দিলেন এবং আমাদের সমুদয় প্রমাণকে পদদলিত করে দিলেন। এখন আমরা ইবরাহীম আ.-এর এই মযবুত ও কঠিন প্রমাণকে কেমন করে খণ্ডন করি এবং তাঁর এই স্পষ্ট প্রমাণের কি উত্তর দিই? তারা এর জন্য সম্পূর্ণ অক্ষম ও অপারগ ছিল। যখন কোনো উপায়ই খুঁজে পেল না, তখন কিছু বলা এবং সত্যের আওয়াজকে কবুল করার পরিবর্তে ইবরাহীম আ.-এর সাথে ঝগড়া করতে এবং তাদের বাতেল মাবুদদের ভয় দেখাতে আরম্ভ করল- এরা এই অপমানের প্রতিশোধ অবশ্যই তোমার থেকে গ্রহণ করবে এবং তোমাকে এর দণ্ড অবশ্যই ভুগতে হবে।

হযরত ইবরাহীম আ. বললেন, তোমরা আমার সাথে ঝগড়া করছ এবং আমাকে মূর্তিসমূহের ভয় দেখাচ্ছ, অথচ আল্লাহ তাআলা আমাকে সঠিক পথ দেখিয়ে দিয়েছেন। আমি কোনো পরোয়া করি না। আমার পালনকর্তা যা চাইবেন, তা-ই হবে। তোমাদের মূর্তিগুলি কিছুই করতে পারবে না। এ সমস্ত কথায় তোমাদের কি কিছুই উপদেশ লাভ হয় না? তোমরা তো আল্লাহ পাকের নাফরমানি করতে এবং তাঁর সাথে শরিক সাব্যস্ত করতে ভয় কর না।

অথচ এই শরিক সাব্যস্ত করার পক্ষে তোমাদের নিকট দলিলও নাই। অথচ আমার থেকে আশা কর, এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী হয়ে এবং বিশ্বের নিরাপত্তার যিম্মাদার হয়ে আমি তোমাদের মূর্তিসমূহকে ভয় করব। আহা! কতই না ভালো হত যদি তোমরা বুঝতে পারতে- কে ফাসাদ বিস্তারকারী আর কে সংশোধনকারী? সঠিক নিরাপত্তার জীবন সে ব্যক্তিই লাভ করেছে, যে ব্যক্তি এক আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে এবং শিরক হতে পবিত্র থাকে; সেই ব্যক্তিই সৎপথ প্রাপ্ত হয়েছে।

মোটকথা, আল্লাহ তাআলার এ সকল প্রমাণের মাধ্যমে হযরত ইবরাহীম আ. মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে দলিল ও প্রমাণ পেশ করেছেন। এবং হেদায়েত ও তাবলিগের পূর্ণাঙ্গ দাওয়াত প্রদান করে তাঁর দায়িত্ব যথাযথ আদায় করে দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে সূরা আনআমের নিচের আয়াতগুলি অবতীর্ণ: وَكَذَٰلِكَ نُرِي إِبْرَاهِيمَ مَلَكُوتَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلِيَكُونَ مِنَ الْمُوقِنِينَ (٧٥) فَلَمَّا جَنَّ عَلَيْهِ اللَّيْلُ رَأَىٰ كَوْكَبًا ۖ قَالَ هَٰذَا رَبِّي ۖ فَلَمَّا أَفَلَ قَالَ لَا أُحِبُّ الْآفِلِينَ (٧٦) فَلَمَّا رَأَى الْقَمَرَ بَازِغًا قَالَ هَٰذَا رَبِّي ۖ فَلَمَّا أَفَلَ قَالَ لَئِنْ لَمْ يَهْدِنِي رَبِّي لَأَكُونَنَّ مِنَ الْقَوْمِ الضَّالِّينَ (٧٧) فَلَمَّا رَأَى الشَّمْسَ بَازِغَةً قَالَ هَٰذَا رَبِّي هَٰذَا أَكْبَرُ ۖ فَلَمَّا أَفَلَتْ قَالَ يَا قَوْمِ إِنِّي بَرِيءٌ مِمَّا تُشْرِكُونَ (৭৮) إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ حَنِيفًا ۖ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ (৭৯) وَحَاجَّهُ قَوْمُهُ ۚ قَالَ أَتُحَاجُّونِّي فِي اللَّهِ وَقَدْ هَدَانِ ۚ وَلَا أَخَافُ مَا تُشْرِكُونَ بِهِ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ رَبِّي شَيْئًا ۚ وَسِعَ رَبِّي كُلَّ شَيْءٍ عِلْمًا ۗ أَفَلَا تَتَذَكَّرُونَ (৮০) وَكَيْفَ أَخَافُ مَا أَشْرَكْتُمْ وَلَا تَخَافُونَ أَنَّكُمْ أَشْرَكْتُمْ بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ عَلَيْكُمْ سُلْطَانًا ۚ فَأَيُّ الْفَرِيقَيْنِ أَحَقُّ بِالْأَمْنِ ۖ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ (৮১) الَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيمَانَهُمْ بِظُلْمٍ أُولَٰئِكَ لَهُمُ الْأَمْنُ وَهُمْ مُهْتَدُونَ (৮২) وَتِلْكَ حُجَّتُنَا আতাইনাহা إِبْرَاهِيمَ عَلَىٰ قَوْمِهِ ۚ نَرْفَعُ دَرَجَاتٍ مَنْ نَشَاءُ ۗ إِنَّ رَبَّكَ حَكِيمٌ عَلِيمٌ

"আর এরূপে আমি ইবরাহীম আ. কে আসমানসমূহের এবং জমিনের রাজত্বের ঝলক দেখিয়ে দিলাম, যাতে সে বিশ্বাসকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। এরপর (দেখুন,) যখন তাঁর উপর রাত্রির অন্ধকার ছেয়ে গেল, তখন তিনি (আসমানে) একটি নক্ষত্র (দীপ্তিমান) দেখলেন। তিনি বললেন, (তোমাদের মতানুসারে) এটা আমার পালনকর্তা! (কেননা সকলে এর পূজা করে থাকে।) কিন্তু যখন তা ডুবে গেল, তখন বললেন: না, আমি অস্তাচলে গমনকারীদের পছন্দ করি না। (অর্থাৎ যারা উদিত ও অস্তমিত হয়।) এরপর যখন চন্দ্র উজ্জ্বল দীপ্তি সহকারে উদিত হল। তখন ইবরাহীম আ. বললেন: এটা আমার পালনকর্তা! কিন্তু যখন এটাও অস্তমিত হল, তখন বললেন- যদি আমার পালনকর্তা আমাকে সঠিক পথ প্রদর্শন না করতেন, তবে আমি অবশ্যই সেই দলেরই অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়তাম, যারা সত্যপথ হতে ভ্রষ্ট হয়ে গেছে। এরপর যখন প্রভাত হল এবং সূর্য (সর্বাপেক্ষা অধিক) প্রদীপ্ত হয়ে উদিত হল, তখন ইবরাহীম আ. বললেন: এটা আমার পালনকর্তা! এ সকলের চেয়ে বড়। কিন্তু যখন এটা অস্তমিত হয়ে গেল, তখন তিনি বললেন: (হে আমার কওম!) তোমরা যে সমস্তকে আল্লাহ তাআলার শরীক সাব্যস্ত করছ, আমি তৎসমুদয়ের প্রতি অসন্তুষ্ট। আমি তো সবকিছু হতে বিমুখ হয়ে শুধু সেই সত্তার দিকে মুখ করেছি, যিনি (কারও দ্বারা সৃষ্ট নন বরং তিনিই) আসমানসমূহ এবং জমিনকে সৃষ্টি করেছেন (এবং যাঁর আদেশ অনুযায়ী আসমান জমিন ও সমস্ত সৃষ্ট বস্তুসমূহ চলছে।) আর আমি তাদের দলভুক্ত নই, যারা আল্লাহর সঙ্গে শরীক সাব্যস্ত করে এবং (এর পর) ইবরাহীম আ.-এর সাথে তাঁর কওম ঝগড়া করতে লাগল।

ইবরাহীম আ. বললেন, তোমরা কি আমার সঙ্গে আল্লাহ তাআলা সম্বন্ধে ঝগড়া করছ? অথচ তিনি আমাকে সত্যপথ দেখিয়েছেন। যাদেরকে তোমরা আল্লাহর শরীক সাব্যস্ত করেছ, আমি তাদেরকে ভয় করি না। আমি জানি যে, এরা আমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। তবে হ্যাঁ, যদি আমার পালনকর্তাই আমার কোনো ক্ষতি করতে ইচ্ছা করেন। (তবে সেই ক্ষতি রোধ করার সাধ্য কারো নেই।) আমার পালনকর্তা নিজের জ্ঞানের গণ্ডি দ্বারা সমুদয় বস্তুকে বেষ্টন করে রেখেছেন। তবে কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর না? আর (দেখ!) আমি সে সমস্ত বস্তুকে কেমন করে ভয় করতে পারি, যাদেরকে তোমরা আল্লাহর শরীক সাব্যস্ত করে রেখেছ।

যখন তোমরা আল্লাহর সাথে অন্যান্য বস্তুকে শরীক সাব্যস্ত করতে ভয় কর না? যার জন্য তিনি সনদ এবং দলিল তোমাদের উপর নাযিল করেন নি? এখন বল, আমাদের উভয়ের মধ্যে কার পথ নিরাপত্তার পথ হল? যদি তোমাদের জ্ঞান ও অন্তরচক্ষু থাকে! যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে এবং নিজের ঈমানকে জুলুমের (অর্থাৎ শিরকের) সাথে মিশ্রিত করে নি, তবে তাদেরই জন্য নিরাপত্তা আর সেই হক পথের উপর রয়েছে। আর (দেখ) এটা আমার প্রমাণ, যা আমি ইবরাহীমকে সেই কওমের উপর দান করেছিলাম। আমি যার মর্যাদাকে উচ্চ করতে ইচ্ছা করি, তাদেকে ইলম ও দলীল-প্রমাণের পরিচয়-জ্ঞান দিয়ে উচ্চ মর্যাদাশালী করে দিই আর নিশ্চয়ই তোমার পালনকর্তা প্রজ্ঞাময় জ্ঞানময়। (সূরা আনআম: ৭৫-৮৩)

ইবরাহীম আ. তাঁর সম্প্রদায়ের লোকদের মূর্তিপূজার সমালোচনা করেন এবং তাদের কাছে ওগুলোর অসারতা ও অক্ষমতার কথা তুলে ধরেন। সুতরাং তিনি বলেছেন : مَا هَذِهِ التَّمَاثِيلُ الَّتِي أَنْتُمْ لَهَا عَاكِفُونَ "এই মূর্তিগুলো কি? যাদের পূজায় তোমরা রত রয়েছ?" অর্থাৎ এদের নিকট নিষ্ঠার সাথে বসে থাক ও কাতর হয়ে পড়ে থাক। তারা উত্তর দিল, قَالُوا وَجَدْنَا آبَاءَنَا لَهَا عَابِدِينَ "আমরা আমাদের পূর্ব-পুরুষদের এদের পূজারীরূপে পেয়েছি।" তাদের যুক্তি ছিল একটাই, তাদের বাপ-দাদারা এরূপ দেবদেবীর পূজা-অর্চনা করত। قَالَ لَقَدْ كُنْتُمْ أَنْتُمْ وَآباؤُكُمْ فِي ضَلَالٍ مُبِينٍ সুতরাং তিনি বললেন, তোমরা ও তোমাদের বাপ-দাদারা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছ। যেমন আল্লাহ বলেছেন: إِذْ قَالَ لِأَبِيهِ وَقَوْمِهِ مَاذَا تَعْبُدُونَ (৮৫) أَيِفْكًا آلِهَةً دُونَ اللَّهِ تُرِيدُونَ (৮৬) فَمَا ظَنُّكُمْ بِرَبِّ الْعَالَمِينَ "যখন সে তার পিতা ও তার সম্প্রদায়কে জিজ্ঞেস করেছিল, তোমরা কিসের পূজা করছ? তোমরা কি আল্লাহর পরিবর্তে অলীক ইলাহগুলোকে চাও? তা হলে জগতসমূহের প্রতিপালক সম্পর্কে তোমাদের ধারণা কি?"

কাতাদা রহ. এ আয়াতাংশের ব্যাখ্যা করেছেন, বিশ্ব জাহানের পালনকর্তা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যখন তোমরা অন্যদের ইবাদত করছ, তখন যেদিন তাঁর সাথে সাক্ষাৎ হবে, সেদিন তিনি তোমাদের সাথে কিরূপ ব্যবহার করবেন বলে মনে কর? ইবরাহীম আ. যখন তাদেরকে বলেছেন : قَالَ هَلْ يَسْمَعُونَكُمْ إِذْ تَدْعُونَ (৭২) أَوْ يَنْفَعُونَكُمْ أَوْ يَضُرُّونَ (৭৩) قَالُوا بَلْ وَجَدْنَا آبَاءَنَا كَذَلِكَ يَفْعَلُونَ

তোমরা প্রার্থনা করলে ওরা কি শোনে? অথবা ওরা কি তোমাদের উপকার কিংবা অপকার করতে পারে? তারা বলল, না! তবে আমাদের বাপ-দাদাদেরকে এরূপই করতে দেখেছি। (সূরা শুআরা: ৭২-৭৪)

তারা স্বীকার করে নিল, আহবানকারীর ডাক ওরা শোনে না, কারও কোনো উপকারও করতে পারে না; অপকারও করতে পারে না। তারা এরূপ করছে কেবল তাদের মূর্খ পূর্ব-পুরুষের অন্ধ আনুগত্য হিসেবে। এ জন্যেই তিনি তাদেরকে বলে দেন,

أَفَرَأَيْتُمْ مَا كُنْتُمْ تَعْبُدُونَ (٧٥) أَنْتُمْ وَآبَاؤُكُمُ الْأَقْدَمُونَ (٧٦) فَإِنَّهُمْ عَدُوٌّ لِي إِلَّا رَبَّ الْعَالَمِينَ

তোমরা কি তাদের সম্পর্কে ভেবে দেখেছ, যাদের পূজা করে আসছ? তোমরা ও তোমাদের পূর্ববর্তী পিতৃ-পুরুষেরা; কেননা রাব্বুল আলামিন ব্যতীত তারা সবাই আমার দুশমন। (সূরা শুআরা: ৭৫- ৭৭)

তারা মূর্তির উপাস্য হওয়ার যে দাবি করত, তা যে বাতিল ও ভ্রান্ত, উল্লিখিত আয়াতসমূহে তার অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়। কেননা হযরত ইবরাহীম আ. এগুলোকে পরিত্যাগ করেন ও হেয়প্রতিপন্ন করেন। এতে যদি তাদের ক্ষমতা থাকত ক্ষতি করার, তা হলে অবশ্যই তারা তাঁর ক্ষতি করত অথবা যদি আদৌ কোনো প্রভাবের অধিকারী হত, তবে অবশ্যই তাঁর উপর সে ধরনের প্রভাব ফেলত।

قَالُوا أَجِئْتَنَا بِالْحَقِّ أَمْ أَنْتَ مِنَ اللَّاعِبِينَ

"তারা বলল, তুমি কি আমাদের নিকট সত্যসহ আগমন করেছ, না কি তুমি কৌতুকচ্ছলে উপাস্যদেরকে তিরষ্কার করছ!”

হে ইবরাহীম! তুমি আমাদের নিকট যা কিছু বলছ, আমাদের উপাস্যদেরকে তিরষ্কার করছ এবং আমাদের পূর্ব-পুরুষদের সমালোচনা করছ, এ সব কি তুমি সত্যি সত্যিই বলছ, নাকি কৌতুক করছ?

قَالَ بَلْ رَبُّكُمْ رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الَّذِي فَطَرَهُنَّ وَأَنَا عَلَى ذَلِكُمْ مِنَ الشَّاهِدِينَ

"সে বলল : না, তোমাদের প্রতিপালক তো তিনি, যিনি আসমান ও জমীনের প্রতিপালক, যিনি এগুলো সৃজন করেছেন এবং আমিই এর উপর অন্যতম সাক্ষী।”

অর্থাৎ আমি তোমাদের নিকট যা কিছু বলছি, সবই সত্য ও যথার্থ বলছি। বস্তুত তোমাদের উপাস্য সেই একজনই, যিনি ব্যতীত অন্য কোনো উপাস্য নেই। তিনি তোমাদের প্রতিপালক এবং আসমান-জমিনেরও প্রতিপালক। পূর্বদৃষ্টান্ত ছাড়াই তিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং ইবাদতের যোগ্য একমাত্র তিনিই, তাঁর কোনো শরীক নেই এবং আমি নিজেই এর সাক্ষী।

فأقبلوا إِلَيْهِ يَزِفُونَ "তারপর তারা ইবরাহীমের দিকে তেড়ে আসল।" মুজাহিদ রহ. বলেছেন, “يَزِفُونَ অর্থ “يُسرعون" তথা দ্রুত ধেয়ে যাওয়া, ক্রোধে তেড়ে আসা।

أَتَعْبُدُونَ مَا تَنْحِتُونَ তোমরা কি সেই সব দেবতাদের পূজা কর, যেগুলো তোমরা নিজেরাই খোদাই করে তৈরি কর? (অর্থাৎ তোমরা কিভাবে এমন সব মূর্তির পূজা কর, যেগুলো নিজেরাই খোদাই করে তৈরি কর?) অর্থাৎ তোমরা কি সেই সব দেবতাদের পূজা কর, যেগুলো তোমরা স্বহস্তে কাঠ অথবা পাথর খোদাই করে নির্মাণ করে থাক এবং নিজেদের ইচ্ছামতো আকৃতি দান কর।

وَاللَّهُ خَلَقَكُمْ وَمَا تَعْمَلُونَ অথচ আল্লাহই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাদেরকে তোমরা তৈরি করে থাক। এখানে মা অক্ষরটি মাছদারিয়াও হতে পারে; আবার মাওছুলাও হতে পারে। যেটাই হোক, এখানে যেকথা বলা উদ্দেশ্য, তা হল, তোমরাও সৃষ্টি আর এই মূর্তিগুলোও সৃষ্টি। এখন একটি সৃষ্টি অপর একটি সৃষ্টির ইবাদত কিভাবে করতে পারে। কেননা তোমরা তাদের উপাস্য না হয়ে তারা তোমাদের উপাস্য হবে এই অগ্রাধিকারের কোনো ভিত্তি নেই। এটাও যেমন ভিত্তিহীন, তেমনি এর বিপরীতটা অর্থাৎ তোমার উপাস্য হওয়াও ভিত্তিহীন। কারণ, ইবাদত-উপাসনা পাওয়ার অধিকারী কেবল সৃষ্টিকর্তাই; এ ব্যাপারে কেউ তাঁর শরীক নেই।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 সমাধানপূর্ণ তাফসির

📄 সমাধানপূর্ণ তাফসির


যদিও এ কথার উপর সকলের ঐকমত্য রয়েছে, হযরত ইবরাহীম আ. কখনও গ্রহ-নক্ষত্রের পূজা করেন নাই এবং তাঁর গোটা জীবন শিরকের অপবিত্র পরশ হতে পবিত্র। তথাপি সূরা আনআমের উপর্যুক্ত আয়াতগুলির তাফসিরে উলামায়ে কেরামের বিভিন্ন মত রয়েছে। এই আয়াতগুলির সূচনায় যা কিছু লেখা হয়েছে, তা সেই মতগুলির মধ্যে অন্যতম মতানুযায়ী লিখা হয়েছে। তার সারমর্ম হলো, ইবরাহীম আ.-এর এই কথাগুলি ছিল কওমের নক্ষত্রপূজা খণ্ডন সম্বন্ধে তাদেরকে নিরুত্তর করে দেওয়ার জন্য।

কেননা দুটি দল যখন কোনো বিষয়ে মতভেদ করে বসে, তখন সত্যকে প্রমাণিত করার জন্য বিতর্কসুলভ দলিলসমূহের এক প্রকারের দলিল হল, নিজেদের দাবি প্রমাণে শুধু থিওরিসমূহ পেশ না করে, বরং চাক্ষুশ দর্শনের এমন একটি পথ অবলম্বন করা হয়, যাতে বিপক্ষ তার দাবির সামনে সম্পূর্ণ নিরুত্তর হয়ে যায়। প্রথম পক্ষের প্রমাণ খণ্ডনের সকল পথ তার সম্মুখে বন্ধ হয়ে যায়।

এখন যদি বিপক্ষের মধ্যে হঠকারিতা না থাকে বরং ন্যায়ের পথ অবলম্বনের স্পৃহা অবশিষ্ট থাকে অর্থাৎ তার অন্তরে সত্য গ্রহণের সম্ভাবনা থাকে, তবে সে তা গ্রহণ করে নেয়। অন্যথায় বিনা প্রমাণে লড়াই-ঝগড়া করতে প্রস্তুত হয়ে যায়। তখন এরূপ হক-বাতিলের মধ্যে পার্থক্য ফুটে উঠে এবং মূল ও প্রকৃত বিষয়টি ছেঁকে পরিষ্কার হয়ে যায়।

হযরত ইবরাহীম আ. অতি উচ্চ মর্যাদাশালী পয়গাম্বর। তাই তাঁর মিশন তর্কশাস্ত্রের নিয়ম-কানুনের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না বরং প্রকৃত তথ্যকে প্রাকৃতিক প্রমাণসমূহের সরলতা দ্বারা প্রকাশ করে দেওয়াই ছিল তাঁর বৈশিষ্ট্য। সুতরাং তিনি এ পথই অবলম্বন করলেন এবং কওমের সম্মুখে পরিষ্কার করে দিলেন, গ্রহাদি চাই সূর্য হোক কিংবা চন্দ্র, এগুলোর কোনোটা রব তথা মাবুদ হওয়ার যোগ্য নয়। বরং এর যোগ্য জমিনের ও আসমানের তথা নিম্ন জগতের ও ঊর্ধ্ব জগতের সমুদয় সৃষ্টির স্রষ্টা ও মালিক।

যেহেতু কওমের নিকট এই উৎকৃষ্ট প্রমাণের কোনো জবাব ছিল না, তাই তারা বিরক্ত হয়ে সত্য বিষয়কে গ্রহণ করার পরিবর্তে লড়াই ও ঝগড়া করতে প্রস্তুত হয়ে গেল। কিন্তু তাদের অন্তর মানতে বাধ্য হল যে, ইবরাহীম আ. যা কিছু বলেছেন, তা সত্য। আমাদের নিকট এর কোনো সঠিক জবাব নেই। হযরত ইবরাহীম আ.-এরও উদ্দেশ্য ছিল এটা এবং তাঁর কর্তব্য পালনের সীমাও ছিল এ পর্যন্তই। কেননা হৃদয় চিরে সত্যকে তার ভিতরে ঢুকিয়ে দেওয়া ছিল তাঁর সাধ্যের বাইরে।

এই তাফসির অনুযায়ী কোরআন মাজিদের এই আয়াতগুলিতে কোনো ব্যাখ্যারও প্রয়োজন হয় না। কোনো উহ্য এবারতও মানতে হয় না। এতদ্ভিন্ন গ্রহাদির চাক্ষুশ দর্শন সম্বন্ধে আয়াতগুলির পূর্ব ও পরের কথা সহজেই এ তাফসিরের পোষকতা করছে। যেমন এ সম্পর্কিত (সূরা আনআম: ৭৪-৭৫) পূর্বের দুটি আয়াত ছিল:

وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ لِأَبِيهِ آزَرَ أَتَتَّخِذُ أَصْنَامًا آلِهَةً إِنِّي أَرَاكَ وَقَوْمَكَ فِي ضَلَالٍ مُبِينٍ (٧٤) وَكَذَلِكَ نُرِي إِبْرَاهِيمَ مَلَكُوتَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلِيَكُونَ مِنَ الْمُوقِنِينَ

"যখন ইবরাহীম আ. তাঁর পিতা আযরকে বললেন, আপনি কি মূর্তিগুলিকে খোদা বানাচ্ছেন? আমি আপনাকে ও আপনার কওমকে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতার মধ্যে দেখছি। আর এরূপে আমি ইবরাহীম আ. কে আসমানসমূহ ও জমিনের রাজত্বের চাক্ষুশ দর্শন দিয়েছি, যাতে তিনি বিশ্বাসীদের দলভুক্ত হয়ে যান।" (সূরা আন'আম: ৭৫)

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 আয়াত দুটির ফলাফল

📄 আয়াত দুটির ফলাফল


১। গ্রহাদি দর্শন ব্যাপারটি হযরত ইবরাহীম আ.-এর সঙ্গে এরূপ সময়ে ঘটেছে, যখন তিনি আপন পিতা ও কওমের সঙ্গে সত্যধর্ম প্রচার সম্বন্ধীয় বিতর্কে লিপ্ত ছিলেন। কেননা প্রথম আয়াতটির পরে দ্বিতীয় আয়াতটিকে "আর এরূপে" বলে আরম্ভ করার দ্বারা তাই বুঝা যায়। আর তৃতীয় আয়াতটির শুরুতে "এরপর যখন” কথায় "এরপর” শব্দটি বুঝাচ্ছে, এটা দ্বিতীয় আয়াতটির সংশ্লিষ্ট এবং এরূপে তিনটি আয়াতই একটির সঙ্গে অপরটি সম্পৃক্ত।

২। আল্লাহ তাআলা ইবরাহীম আ. কে যেভাবে মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে উজ্জ্বল প্রমাণ দান করেছিলেন, যেন তিনি আযর এবং তার কওমকে নিরুত্তর করে দিতে পারেন এবং হেদায়েতের পথ দেখান; এরূপে গ্রহাদি পূজার বিরুদ্ধেও তিনি ইবরাহীম আ. কে আসমানসমূহ ও জমিনের রাজত্ব চাক্ষুষ দেখিয়ে দিয়েছেন, যেন তিনি সমুদয় সৃষ্টির গূঢ়তত্ত্ব সম্বন্ধে অবহিত হয়ে যান এবং তিনি দিব্য স্তরের জ্ঞান লাভ করেন।

এরপর তিনি গ্রহাদির পূজার বিরুদ্ধেও উৎকৃষ্ট প্রমাণ পেশ করতে পারেন এবং এ বিষয়েও কওমকে সত্যপথ দেখিয়ে তাদের এই ভুলপন্থা সম্বন্ধে তাদেরকে নিরুত্তর করে দিতে পারেন। এ তো "দেখিয়ে দেওয়ার" আয়াতটি ছিল পূর্বের আয়াত। এখন শেষের আয়াতটি অনুধাবনযোগ্য। যখন ইবরাহীম আ. পরিশেষে সূর্যের প্রতি দৃষ্টি করলেন এবং তা-ও পরে দৃষ্টিপথ হতে অদৃশ্য হতে আরম্ভ করল, তখন এ আয়াতেই নিম্নোক্ত বাক্যটি দেখা যায়।

قَالَ يَا قَوْمِ إِنِّي بَرِيءٌ مِمَّا تُشْرِكُونَ "ইবরাহীম বললেন, হে আমার কওম! আমি অংশীবাদীদের হতে সম্পূর্ণ মুক্ত।" সেই সঙ্গে এ আয়াতটিও উল্লিখিত রয়েছে:

إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ حَنِيفًا ۖ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ "নিঃসন্দেহ আমি আমার চেহারা শুধু সেই খোদার দিকে ফিরাচ্ছি, যিনি আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, এই অবস্থায়, আমি সবকিছু হতে বিরত হয়ে এক আল্লাহর প্রতি আকৃষ্ট এবং আমি অংশীবাদী নই।" (সূরা আনআম: ৭৯)

এরপরেই আছে: وَحَاجَّهُ قَوْمُهُ قَالَ أَتَحَاخُونِي فِي اللَّهِ "আর ইবরাহীমের কওম তাঁর সাথে ঝগড় করতে আরম্ভ করলে, তিনি বললেন, তোমরা কি আল্লাহ সম্বন্ধে আমার সাথে ঝগড়া করছ?"

আর সর্বশেষ আয়াতে বলা হয়েছে: وَتِلْكَ حُجَّتُنَا আতাইনাহা إِبْرَاهِيمَ عَلَىٰ قَوْمِهِ ۚ نَرْفَعُ دَرَجَاتٍ مَنْ نَشَاءُ ۗ إِنَّ رَبَّكَ حَكِيمٌ عَلِيمٌ "আর তা আমার দলিল-প্রমাণ, যা আমি ইবরাহীমকে তাঁর কওমের মোকাবেলায় দান করেছি। আমি যার মর্যাদা উন্নত করতে ইচ্ছা করি, উন্নত করে দিই। নিঃসন্দেহ আপনার রব হেকমতওয়ালা জ্ঞানময়।" (সূরা আনআম: ৮৩)

মোটকথা, দেখা যাচ্ছে: (১) গ্রহাদি দর্শনের ব্যাপারটি কওমের সঙ্গে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট ছিল। সুতরাং তৃতীয় দফায় ইবরাহীম আ. নিজেকে সম্বোধন করার পরিবর্তে তৎক্ষণাৎ কওমকে সম্বোধন আরম্ভ করে দিলেন। (২) আর কওমও সবকিছু শুনে প্রমাণের উত্তর প্রমাণ দ্বারা দেওয়ার পরিবর্তে ইবরাহীম আ.-এর সাথে ঝগড়া-বিবাদ করতে আরম্ভ করল। (৩) কওমের সাথে ইবরাহীম আ.-এর এই কথোপকথন তথা প্রমাণ প্রদানকে আল্লাহ তাআলা নিজের পক্ষ হতে প্রমাণ প্রদান সাব্যস্ত করেছেন। "ইবরাহীমের রেসালাতের মর্যাদা বহু ঊর্ধ্বে এবং বহু উন্নত।" সুতরাং কওম তাঁর পথ প্রদর্শনের একান্ত মুখাপেক্ষী। আল্লাহ তাআলা ইবরাহীম আ. সম্বন্ধে আরও বলেছেন: وَلَقَدْ আতাইনা إِبْرَاهِيمَ رُشْدَهُ مِنْ قَبْلُ وَكُنَّا بِهِ عَالِمِينَ "আর নিঃসন্দেহ আমি ইবরাহীমকে পূর্বে হতেই হেদায়েত প্রদান করে ছিলাম। আর তার সম্বন্ধে আমি ছিলাম অবহিত।" (আম্বিয়া: ৫১)

সুতরাং এ ব্যাপারটি হযরত ইবরাহীমের বাল্যকালের ঘটনাও হতে পারে না এবং তার নিজের আকীদা এবং ঈমানের ব্যাপারও হতে পারে না। এ বিস্তারিত বিবরণ হতে অনুমান করা যেতে পারে, বর্ণিত তাফসিরই আয়াতগুলির বিশুদ্ধ তাফসির। আর নিঃসন্দেহে এটা ইবরাহীম আ.-এর পক্ষ হতে কওমের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রমাণ ছিল তাদের গ্রহাদির পূজা করা, এদের জন্য মন্দির নির্মাণ করা, নিজেদের নিম্নজগতের দেবতাসমূহের নাম উক্ত গ্রহাদির নামানুযায়ী রাখা বিপক্ষে। মোটকথা, এদেরকে, মাবুদ, খোদা ও রব মনে করা নিশ্চিতরূপে বাতেল এবং পথভ্রষ্টতা। কেননা এই সমুদয় গ্রহ-নক্ষত্র সকলেই এক বিশেষ শৃঙ্খলে জড়িত এবং দিবা ও রাত্রির পরিবর্তনের সাথে নানা প্রকার পরিবর্তন গ্রহণ করে। এই পূর্ণ শৃঙ্খলার মালিক এবং স্রষ্টা শুধু সেই মহা শক্তিমান সত্তাই, যাঁর কুদরতের হস্ত এসব কিছুকে বশীভূত করে রেখেছে আর তিনি "আল্লাহ"। আল্লাহর বশীভূত থাকার ফলে: "সূর্যেরও সাধ্য নাই, সে চন্দ্রকে ধরতে পারে এবং রাত্রেরও সাধ্য নাই যে, সে দিনকে পিছে হটিয়ে দিয়ে তার স্থান নিজে গ্রহণ করবে। (সূরা ইয়াসীন: ৪০)

এ সমস্ত উজ্জ্বল প্রমাণ ও অকাট্য দলিলের পরেও যখন কওম ইসলামের দাওয়াত কবুল করল না, মূর্তিপূজা ও নক্ষত্রাদি পূজায় পূর্ববৎ বহাল রইল, তখন হযরত ইবরাহীম আ. একদিন সর্ব সাধারণের সম্মুখে যুদ্ধ ঘোষণা করে দিলেন, আমি তোমাদের এই মূর্তিগুলি সম্বন্ধে এমন এক চাল চালব, যা তোমাদিগকে উত্ত্যক্ত করেই ছাড়বে: وَتَاللَّهِ لَا كِيدَنَّ أَصْنَامَكُمْ بَعْدَ أَنْ تُوَلُّوا مُدْبِرِينَ "আর আল্লাহর কসম! তোমাদের অনুপস্থিতিতে আমি অবশ্যই তোমাদের মূর্তিসমূহের সাথে এক গোপন চাল চালব।" (সূরা আম্বিয়া: ৫৭)

সর্বসাধারণকে মূর্তিপূজার দোষ প্রকাশ করে তা হতে বিরত রাখার চেষ্টা করলেন এবং সর্বপ্রকার উপদেশ ও নসিহত দ্বারা তাদেরকে একথা বিশ্বাস করাতে পূর্ণশক্তি প্রয়োগ করলেন, এ সমস্ত মূর্তি কোনো উপকারও করতে পারে না, ক্ষতিও না। তোমাদের গণকেরা ও নেতারা এদের সম্বন্ধে তোমাদের মনে অমূলক ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে। যেমন যদি এদেরকে অবিশ্বাস কর, তবে এরা রাগান্বিত হয়ে তোমাদেরকে ধ্বংস করে ফেলবে। এরা তো নিজেদের সম্মুখে বিপদ উপস্থিত হলে তাও দূর করতে সক্ষম নয়। কিন্তু আযর এবং কওমের অন্তরে কোনোই ক্রিয়া হল না। তারা নিজেদের দেবতাদের খোদায়ী শক্তি সম্বন্ধীয় বিশ্বাস হতে কোনোক্রমেই বিরত হল না এবং হযরত ইবরাহীম আ.-এর নসিহতের প্রতি কর্ণপাত করতে কঠোরভাবে বারণ করে দিল।

তখন হযরত ইবরাহীম আ. ভাবলেন, এখন আমাকে হেদায়েত ও নসিহতের এমন উপায় বের করতে হবে, যাতে বাস্তবিকই তারা মনে করে, আমাদের দেবতা শুধু কাষ্ঠ ও প্রস্তরের মূর্তি। যা বোবা, বধীর এবং অন্ধও। আর তাদের অন্তরে এই ধারণা যেন দৃঢ় হয়, এ পর্যন্ত আমাদের গণক ও নেতারা এদের সম্বন্ধে যা-কিছু বলত, তা সম্পূর্ণই ভুল এবং ভিত্তিহীন। ইবরাহীমের কথাই সত্য। যদি এরূপ কোনো ব্যবস্থা হয়ে যায়, তবে আমার সত্য প্রচারের জন্য সহজ পন্থা আবিষ্কৃত হয়ে যাবে। এই ভেবে একটি কর্মপদ্ধতি প্রস্তুত করলেন। কারও নিকটেই তা প্রকাশ করলেন না। এই কার্যটি এভাবে আরম্ভ করলেন যে, কথা প্রসঙ্গে নিজ কওমের লোকদেরকে বলে ফেললেন, "আমি তোমাদের দেবতাদের সাথে এক গোপন চাল চালব।"

যেন এই উপায়ে তাদেরকে একথা জানিয়ে দেওয়া উদ্দেশ্য ছিল যে, যদি তোমাদের দেবতাদের মধ্যে কোনো ক্ষমতা থাকে, যেমনটি তোমরা দাবি করে থাক, তবে তারা আমার চালকে বাতিল এবং আমাকে অক্ষম করে দিক; যেন এরূপ করতে না পারি। কিন্তু তাঁর কথা যেহেতু পরিষ্কার ছিল না, কাজেই কওমের লোকেরা এদিকে কোনো মনোযোগই দিল না। একটা সুবর্ণ সুযোগও পাওয়া গেল। অনতিপরেই কওমের এক ধর্মীয় মেলা আসল। সকলেই উক্ত মেলায় যোগদানের জন্য পীড়াপীড়ি করতে লাগল। হযরত ইবরাহীম আ. প্রথমে অস্বীকার করলেন।

এরপর যখন তাদের পক্ষ হতে খুব বেশি চাপ দিতে লাগল, তখন তিনি নক্ষত্রসমূহের প্রতি দৃষ্টি করে বললেন, "আমি আজ কিছু পীড়িত বোধ করছি।" ইবরাহীম আ.-এর কওম গ্রহাদির পূজারী হওয়ার কারণে নক্ষত্রসমূহের প্রতি বিশ্বাসী ছিল। সুতরাং নিজেদের ভক্তি ও বিশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে তারা মনে করল, ইবরাহীম আ. আজ কোনো অশুভ নক্ষত্রের অশুভ ক্রিয়ায় রয়েছে। অতএব তারা এ ভেবে অবস্থার কোনো বিস্তারিত বিবরণ জিজ্ঞাসা না করে ইবরাহীম আ.-কে শহরে রেখেই মেলায় চলে গেল। কুরআন মাজীদে এ ঘটনাটি নিম্নরূপে বর্ণিত হয়েছে: ফানাজারা নাজরাতান ফিন নুজূম (৮৮) ফাকলা ইন্নী সাক্বীম (৮৯) ফাতাওয়াল্লাও আনহু মুদবিরীন

"এরপর তিনি (ইবরাহীম আ.) উপরের দিকে নযর উঠিয়ে নক্ষত্রসমূহের প্রতি দৃষ্টি করলেন এবং বললেন, 'আমি পীড়িত।' অতএব তারা তাঁকে ছেড়ে চলে গেল। (সূরা সাফফাত: ৮৮-৯০)

অনন্তর যখন গোটা কওম, বাদশা মোহন্ত ও ধর্মীয় নেতারা সকলেই মেলার আনন্দে মত্ত এবং শরাবে ও কাবাবে মশগুল। তখন হযরত ইবরাহীম আ. ভাবলেন, এখন উপযুক্ত সময় এসে গেছে। কাজেই আমি আমার কল্পিত কর্ম সম্পন্ন করে ফেলি এবং চাক্ষুষ দর্শনের আকারে সর্ব সাধারণের নিকট স্পষ্টরূপে প্রকাশ করে দিই, তাদের দেবতার স্বরূপ কী? তিনি উঠলেন এবং শ্রেষ্ঠ দেবতার মন্দিরে প্রবেশ করে দেখলেন, সেখানে দেবতাদের সম্মুখে নানা রকমের মিষ্টি, ফলমূল এবং হালুয়া উৎসর্গ করে রাখা হয়েছে।

ইবরাহীম আ. বিদ্রুপের সূরে চুপিচুপি সেই মূর্তিসমূহকে সম্বোধন করে বললেন: তোমাদের সামনে এতসব সুস্বাদু খাদ্য বিদ্যমান। এগুলো খাচ্ছ না কেন? এরপর সবগুলি মূর্তিকে ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেললেন এবং হাতের কুঠারখানি সকলের বড় মূর্তিটির কাঁধে ঝুলিয়ে রাখলেন। এই ঘটনাটি কুরআন মাজীদে এরূপে বর্ণনা করেছেন: ফারাগ্বা ইলা আলিহাতিহিম ফাকলা আলা তাকুরূন (৯১) মা লাকুম লা তানতিক্বূন (৯২) ফারাগ্বা আলাইহিম দদর্বাম বিল ইয়ামীন

"এরপর ইবরাহীম আ. চুপিচুপি গিয়ে তাদের মূর্তিসমূহের মন্দিরে প্রবেশ করলেন এবং তাদের মূর্তিসমূহকে বললেন, (তোমাদের সম্মুখে স্তরে স্তরে সাজানো এ সমস্ত সুস্বাদু খাদ্যদ্রব্য) তোমরা খাচ্ছ না কেন? তোমাদের কি হল, কথা বলছ না কেন? এরপর নিজের ডান হাত দ্বারা সমস্ত মূর্তিগুলিকে ভেঙে ফেললেন।" (সূরা সাফফাত: ৯১-৯৩) ফাজাআলাহুম জুজাজান ইল্লা কাবীরাল লাহুম লাল্লাহুম ইলাইহি ইয়ারজিউন

"এরপর এদের খণ্ড-বিখণ্ড করে ফেললেন। কিন্তু তাদের বড় দেবতাটিকে ত্যাগ করলেন, যেন কওমের লোকেরা এসে (নিজেদের আকিদা অনুযায়ী) তার দিকে রুজু করে। (এবং জিজ্ঞাসা করে, এ কী হয়ে গেল?)" (সূরা আম্বিয়া: ৫৮-৬০)

লোকেরা মেলা হতে ফিরে এসে যখন মন্দিরে দেবতাদের এ অবস্থা দেখল, তখন অত্যন্ত রাগান্তিত হল এবং পরস্পর বলাবলি করতে লাগল কি হল, এমন কাজ কে করল? তাদের মধ্যে ওই ব্যক্তিও ছিল, যার সম্মুখে হযরত ইবরাহীম আ. "আল্লাহর কসম আমি তোমাদের মূর্তিসমূহের সহিত এক গোপন ষড়যন্ত্র করব।" কথাটি বলেছিলেন, সে তৎক্ষণাৎ বলে উঠল, এটা সেই ইবরাহীম নামক লোকটিরই কাজ। সে-ই আমাদের দেবতাদের শত্রু। কুরআন মাজীদে এ কথাটি নিম্নরূপে ব্যক্ত হয়েছে: কলু মান ফাআলা হাজা বিআলিহাতিনা ইন্নাহূ লািমনাজ জোয়ালিমীন (৫৯) কলু সামিনা ফাত্তাই ইয়াজকুরুহুম ইউক্বলু লাহূ ইবরাহীম

"তারা বলতে লাগল, আমাদের দেবতাদের সাথে এরূপ ব্যবহার কে করল? নিঃসন্দেহ সে অবশ্যই জালিম, (তাদের মধ্যে কেউ) বলল, আমি জনৈক যুবককে এই মূর্তিসমূহের (নিন্দার সাথে) আলোচনা করতে শুনেছি। তাকে ইবরাহীম বলা হয়। (অর্থাৎ এটা তারই কাজ।)

মোহন্ত ও নেতৃবৃন্দ একথা শুনে দুঃখে ও ক্রোধে লাল হয়ে বলতে লাগল, তাকে জনগণের সম্মুখে নিয়ে এসো! সকলে দেখুক অপরাধী কোন ব্যক্তি। ইবরাহীম আ.-কে সম্মুখে আনয়ন করা হল। বড়ই ভীতিপ্রদ প্রভাবের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করল, ইবরাহীম! আমাদের দেবতাদের সঙ্গে তুমি এসব আচরণ কেন করলে? এই মর্মে কোরআন মাজিদে এরূপ বর্ণিত আছে: কলু ফাতু বিহী আলা আইয়ুনিন নাাসি লাল্লাহুম ইয়াশহাদূন (৬১) কলু আ আনতা ফাআলতা হাজা বিআলিহাতিনা ইয়া ইবরাহীম

"তারা বলল, ইবরাহীমকে জনতার সম্মুখে নিয়ে এসো! যেন তারা (অপরাধীকে) দেখতে পায়, (ইবরাহীম আ. জনসমক্ষে উপস্থিত হওয়ার পর) তারা বলল, "তুমিই কি আমাদের দেবতাদের সঙ্গে এরূপ আচরণ করেছ?" (সূরা আম্বিয়া: ৬১-৬২)

ইবরাহীম আ. দেখলেন, এখন সুবর্ণ সুযোগ এসে পড়েছে। যার জন্য আমি এই উপায়টি অবলম্বন করেছি। জনসমাবেশ বিদ্যমান, সর্বসাধারণ লোকেরা দেখছে, তাদের দেবতাদের কি দুর্দশা ঘটেছে। অতএব এখন মোহন্ত ও নেতৃবৃন্দকে সর্বসাধারণের সমক্ষে তাদের বাতেল আকিদার উপর লজ্জিত করে দেওয়ার সময়, যাতে সাধারণ লোকেরা চোখে দেখে বুঝতে পারে যে, আজ পর্যন্ত দেবতাদের সম্বন্ধে মোহন্তগণ ও নেতৃবৃন্দ আমাদেরকে যা কিছু বলেছে, সবকিছুই তাদের ধোঁকা ও প্রতারণা ছিল। আমার এখন তাদেকে বলা উচিত, এই সমস্ত হল বড় মূর্তিটির কাজ, তাকেই জিজ্ঞাসা কর। তখনই আমার উদ্দেশ্য সফল হয়ে যাবে। তখন আমি তাদের আকিদা-বিশ্বাসের অসারতা সর্বসাধারণের নিকট প্রকাশ করে দিয়ে সঠিক ও বিশুদ্ধ বিশ্বাসের শিক্ষা প্রদান করতে পারব। বলে দিব, তারা কিরূপে বাতেল মতবাদ ও পথভ্রষ্টতার মধ্যে লিপ্ত রয়েছে। তখন মোহন্ত এবং পূজারীদের নিকট লজ্জা ছাড়া কি থাকবে? অতএব হযরত ইবরাহীম আ. উত্তর করলেন:

কলা বাল ফাআলাহূ কাবীরুহুম হাজা ফাসআলুহুম ইন কানূ ইয়ানতিক্বূন ইবরাহীম আ. বললেন: বরং এদের মধ্যে এ বড় মূর্তিটি এই কাজ করেছে। অতএব যদি তোমাদের এই দেবতাদের বাকশক্তি থাকে, তবে তাকেই জিজ্ঞাসা করে নাও।” (সূরা আম্বিয়া: ৬৩)

ইবরাহীম আ.-এর এই সুনিশ্চিত প্রমাণের বিরুদ্ধে মোহন্ত ও পূজারীদের আর কি জবাব হতে পারত! তারা লজ্জায় নিমজ্জিত ছিল। মনে মনে হীন ও অপমানিত হয়ে পড়েছিল এবং ভাবছিল কি জবাব দিবে? জনসাধারণও আজ সবকিছু বুঝে গেল এবং তারা স্বচক্ষে সেই দৃশ্য দেখে নিল, যার জন্য তারা প্রস্তুত ছিল না এবং পরিশেষে ছোট- বড় সকলকেই মনে মনে স্বীকার করতে হল, ইবরাহীম অন্যায়কারী নয় বরং অন্যায়কারী আমরা। কারণ, এমন প্রমাণবিহীন বাতেল আকিদার উপর বিশ্বাস রাখছি, তখন তারা অত্যন্ত লজ্জায় মস্তক অবনত করে বলতে লাগল, ইবরাহীম! তুমি তো ভালো করেই জান, এ সমস্ত দেবতার মধ্যে বাকশক্তি নাই। এরা তো বানানো মূর্তি মাত্র। এ ঘটনাটিকে কোরআন মাজিদ এরূপে ব্যক্ত করছে: ফারাজাঊ ইলা আনফুসিহিম ফাক্বলু ইন্নাকুম আন্তুমুজ জোয়ালিমূন (৬৪) ছুম্মা নুকিসূ আলা রুঊসিহিম লাক্কদ আিলমতা মা হাউলাি ইয়ানতিক্বূন

"এরপর তারা নিজেদের অন্তরে চিন্তা করল এবং বলতে লাগল, নিঃসন্দেহ তোমরাই (অর্থাৎ আমরাই) অন্যায়কারী। এরপর (লজ্জায়) নিজেদের মস্তক অবনত করে বলতে লাগল, (হে ইবরাহীম!) তুমি খুব ভালো করেই জান, এ দেবতাগুলির বাকশক্তি নাই।" (সূরা আম্বিয়া: ৬৪-৬৫)

এরূপে হযরত ইবরাহীম আ.-এর দলিল ও প্রমাণ সফলকাম হল এবং শত্রুরা স্বীকার করল, "অন্যায়কারী আমরাই" এবং তাদেরকে জনসাধারণের সম্মুখে নিজেদের মুখে স্বীকার করতে হল, আমাদের এই দেবতাসমূহের জবাব দেওয়ার ও কথা বলার শক্তি নেই আর উপকার ও ক্ষতি করার শক্তি থাকা তো দূরেরই কথা।

অতএব এখন ইবরাহীম আ. সংক্ষিপ্ত ব্যাপকার্থকবোধক শব্দে তাদের উপদেশ প্রদান করলেন এবং তিরস্কারও করলেন। সাথে সাথে বললেন, যখন তোমাদের এ দেবতারা উপকারও করতে পারে না এবং ক্ষতিও করতে পারে না, তবে এরা খোদা এবং মাবুদ কেমন করে হতে পারে? আফসোস! এতটুকু কথাও তোমরা বুঝ না? কিংবা জ্ঞান- বুদ্ধিকে কাজে লাগাও না? এ মর্মে কুরআন মাজিদে উল্লেখ হয়েছে:

কলা আ ফাতাবুদূনা মিন দুনিল্লাহি মা লা ইয়ানফাউকুম শাইয়াও ওয়া লা ইয়াদদুরুকুম (৬৬) উফফীল লাকুম ওয়া লিমা তাবিদুনা মিন দুনিল্লাহি আ ফালা তাআক্বিলূন "তোমরা কি আল্লাহকে ছেড়ে ওই সমস্ত উপাস্যের পূজা করছ, যারা তোমাদের কোনো উপকারও করতে পারে না এবং কোনো ক্ষতিও করতে পারে না? তোমাদের উপর আফসুস এবং তোমাদের সেই বাতেল মাবুদগুলির উপরও; যাদেরকে তোমরা আল্লাহকে ছাড়া পূজা করছ। তোমরা কি জ্ঞান খাটিয়ে কাজ কর না।" (সূরা আম্বিয়া: ৬৬-৬৭)

"এরপর সকলে হৈ-হল্লা করে ইবরাহীম আ.-এর চতুর্দিকে সমবেত হয়ে গেল। ইবরাহীম আ. বললেন, তোমরা কি তোমাদের গড়া মূর্তিসমূহের পূজা করছ? আসল কথা এই যে, আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে পয়দা করেছেন এবং ওই সমস্ত কাজকেও, যা তোমরা করছ?" (সূরা সাফফাত: ৯৪, ৯৫)

হযরত ইবরাহীম আ.-এর নসিহত এবং উপদেশের ফলে কওমের সমস্ত লোক নিজেদের বাতেল আকিদা হতে তওবা করে হানাফী ধর্ম গ্রহণ করে নেওয়া এবং বক্রপথ ত্যাগ করে সিরাতুল মুস্তাকিমের ওপর চলা উচিত ছিল। কিন্তু অন্তরসমূহের বক্রতা, নফসের অবাধ্যতা, নাফরমানিমূলক মনোবৃত্তি এবং আভ্যন্তরীণ অপবিত্রতা ও হীনতা তাদেরকে এদিকে অগ্রসর হতে দিল না। উল্টো তারা সকলে ইবরাহীম আ.-এর শত্রুতা ও দুশমনির আওয়ায তুলল। একে অন্যকে বলল, যদি দেবতাদের সন্তোষ কামনা কর, তবে এ ব্যক্তিকে এই ধৃষ্টতা ও অপরাধকর্মের জন্য কঠোর শাস্তি প্রদান কর এবং জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করে পুড়িয়ে ফেল। যাতে তার এই তাবলিগ ও দাওয়াতের ব্যাপারই খতম হয়ে যায়। কুরআনে আল্লাহ তাআলা সেকথাই জানিয়ে দিলেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px