📄 আযর শব্দের বিশ্লেষণ
যেহেতু ইতিহাস ও তাওরাত হযরত ইবরাহীম আ.-এর পিতার নাম 'তারেখ' বলছে আর কোরআন মাজিদ বলছে, 'আযর'। তাই মুফাসসিরগণ এর তথ্য-বিশ্লেষণে দ্বিমত পোষণ করেছেন: (১) এমন ছুরত বের করতে হবে, যাতে উভয় নাম এক হয়ে অনৈক্য দূর হয়ে যায়। (২) তথ্য বিশ্লেষণপূর্বক মীমাংসিত কথা বলে দেওয়া অর্থাৎ এ দুটি নামের মধ্যে কোনটি সঠিক আর কোনটি ভুল অথবা দুটি নামই ঠিক, কিন্তু দুজন পৃথক পৃথক লোকের নাম কি না?
প্রথমদল আলেমগণের মতে, দুটি নামই এক ব্যক্তির। তবে 'তারেখ' ব্যক্তিবাচক নাম আর আযার 'গুণবাচক নাম।' এদের মধ্যে কেউ কেউ বলেন, 'আযর' হিব্রু ভাষায় মূর্তির প্রেমিককে বলা হয়। আর যেহেতু তারেখের মধ্যে মূর্তিনির্মাণ ও মূর্তিপূজা উভয় গুণই বিদ্যমান ছিল। এ কারণে তাকে 'আযার' নামে অভিহিত করা হয়েছে। আবার কেউ কেউ ধারণা করেন, 'আযর' শব্দের অর্থ 'আওয়ায'। অর্থাৎ স্বল্প বুদ্ধি বা নির্বোধ এবং অতিশয় দুর্বল বৃদ্ধ। যেহেতু তারেখের মধ্যে এ বিষয়গুলো বিদ্যমান ছিল, তাই তাকে এ বিশেষণে ভূষিত করা হয়েছে। কোরআন মাজিদ তার ওই গুণবাচক প্রসিদ্ধ নামটিকে বর্ণনা করেছে। সোহাইল 'রাওযুল আনফ' নামক কিতাবে এই মতই গ্রহণ করেছেন।
আর দ্বিতীয় দল আলেমণের বিশ্লেষণ মতে, 'আযর' একটি মূর্তির নাম। 'তারেখ' সেই মূর্তিটির পূজারী ও মোহন্ত ছিল। যেমন মুজাহিদ রহ. থেকে রেওয়ায়েত আছে, কোরআন মাজিদে উপর্যুক্ত আয়াতের অর্থ হল: أَتَتَّخِذُ آزر إلها اي أَتَتَّخِذُ أَصْنَامًا آلِهَةً "আপনি কি 'আযর'কে খোদা বলে মান্য করেন। অর্থাৎ মূর্তিগুলিকে খোদা বলে মানেন।"
আর 'ছাগানীর' মতও প্রায় এরূপই। শুধু ব্যাকরণের দিক দিয়ে তিনি উহ্য শব্দ সম্বন্ধে অন্য পথ অবলম্বন করেছেন। মোটকথা, তাদের উভয়ের নিকট أبيه শব্দটি آزر শব্দের بدل অর্থাৎ noun of opposition নয় বরং মূর্তির নাম। এ বর্ণনানুযায়ী ইবরাহীম আ.-এর পিতার নাম কোরআন মাজিদে উল্লেখ নেই।
একটি প্রসিদ্ধ কথাও আছে, হযরত ইবরাহীম আ.-এর পিতার নাম তারেখ ছিল এবং তার চাচার নাম ছিল 'আযর'। যেহেতু 'আযার'ই তাকে সন্তানের মতো প্রতিপালন করেছিলেন, এ জন্য কোরআন মাজিদ 'আযর'কে তার পিতা বলে সম্বোধন করেছে। যেমন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "চাচা পিতারই অনুরূপ।"
আল্লামা আবদুল ওহাব বোখারী বলেন: এ সমস্ত অভিমতের মধ্যে মুজাহিদ রহ.-এর অভিমতই যুক্তিসঙ্গত ও গ্রহণযোগ্য। কেননা মিসরবাসীদের একটি পুরাতন দেবতার নাম 'আযওয়ারীস'ও পাওয়া যায়। এর অর্থ 'শক্তিমান ও নামানুকরণ খোদা।' মূর্তিপূজক জাতিগুলোর নামানুসারেই নতুন দেবতাগুলির নাম 'আযর' রাখা হয়েছে। তবে হযরত ইবরাহীম আ.-এর পিতার নাম 'তারেখ'ই ছিল।
আমাদের মতে এ সমস্ত উক্তি অযথা জটিলতা সৃষ্টি করা ছাড়া অন্য কিছুই নয়। কেননা কোরআন মাজিদ যখন পরিষ্কারভাবে 'আযর'কে ইবরাহীম আ.-এর পিতাই বলেছে, তখন বংশপরিচয় বিশারদের এবং বাইবেলের আনুমানিক যুক্তিতে প্রভাবিত হয়ে কোরআন মাজিদের নিশ্চিত বিবৃতিকে রূপক অর্থে নেওয়ার কিংবা তা হতেও অগ্রসর হয়ে অযথা কোরআন মাজিদে ব্যাকরণ শাস্ত্রের উহ্য শব্দ মানার জন্য শরিয়তসম্মত কোনো প্রকৃত প্রয়োজন বাধ্য করছে?
যদি মেনে নেওয়া হয়, আযর মূর্তির প্রেমিককে বলা হয়। কিংবা কোনো মূর্তির নাম। এ দু কারণে আযরের নাম 'আযর' রাখা হয়েছে। যেমন: মূর্তিপূজক কওমগুলির মধ্যে প্রাচীনকাল হতে এ রীতি চলে আসছে, তারা কোনো কোনো সময় নিজেদের সন্ত ানের নাম 'দেবতার গোলাম' অর্থ প্রকাশ করে রাখত। আবার কোনো কোনো সময় দেবতা বা মূর্তির নামেই নাম রেখে দিত।
বস্তুত কালদী ভাষায় دَارَ 'আদার' শ্রেষ্ঠ পূজারীকে বলা হয়, আরবী ভাষায় একেই آزر 'আযর' বলা হয়েছে। 'তারেখ' যেহেতু মূর্তি নির্মাতা ও শ্রেষ্ঠ মূর্তিপূজক ছিল, তাই সে 'আযর' নামেই প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এটা তার ব্যক্তিগত নাম ছিল না; বরং গুণবাচক উপাধি ছিল। উপাধি যখন নামের স্থান দখল করে ফেলেছে, তাই কোরআন মাজিদেও তাকে এ নামেই সম্বোধন করা হয়েছে। এছাড়াও সেই পবিত্র মানব ইবরাহীম আ.-এর চরিত্র এত উন্নত ছিল, মূর্তিপূজার নিন্দা প্রসঙ্গে যখন আযরের সঙ্গে তাঁর বিতর্ক হয়ে গেল এবং আযর বিরক্ত হয়ে বলল:
أَرَاغِبٌ أَنْتَ عَنْ آلِهَتِي يَا إِبْرَاهِيمُ لَئِنْ لَمْ تَنْتَهِ لَأَرْجُمَنَّكَ وَاهْجُرْنِي مَلِيًّا
"ইবরাহীম! তুমি কি আমার খোদাদের প্রতি অসন্তুষ্ট? তুমি যদি এরূপ কার্য হতে নিবৃত্ত না হও, তবে নিশ্চয় তোমাকে প্রস্তর নিক্ষেপে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিব। যাও, আমার সম্মুখ হতে দূর হয়ে যাও।" (সূরা মারইয়াম: ৪৬)
এমন কঠোর ও বেদনাদায়ক কথোপকথনের সময়ও হযরত ইবরাহীম পিতৃসম্পর্কের মর্যাদা রক্ষা করে শুধু এতটুকুই বলেছিলেন:
سَلَامٌ عَلَيْكَ سَأَسْتَغْفِرُ لَكَ رَبِّي إِنَّهُ كَانَ بِي حَفِيًّا
"আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। অচিরেই আপনার জন্য আমি আমার পালনকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করব। নিশ্চয় তিনি আমার প্রতি অতি দয়ালু। (সূরা মারইয়াম: ৪৭)
অতএব ইতিহাসের 'তারেখ'-ই মূলত আযর। এটা তার ব্যক্তিগত নাম, গুণবাচক নাম নয়। 'তারেখ' হয়ত ভুল নাম অথবা 'আযর' শব্দের অনুবাদ, যা তাওরাতের অন্যান্য নামের মতো শেষ পর্যন্ত অনুবাদ থাকে নি বরং আসল নামে পরিণত হয়ে গেছে।
'মারাতশী' সপ্তদশ শতাব্দীর একজন খৃস্টান শিক্ষাবিদ। তিনি কোরআন মাজিদের অনুবাদ করেছেন এবং কোরআন মাজিদের ওপর খুবই সূক্ষ্ম ও পক্ষপাতমূলক আক্রমণ করেছেন। তিনি এ ক্ষেত্রেও নিজের অভ্যাসানুযায়ী একটি অনর্থক ও দুর্বল প্রশ্নের অবতারণা করেছেন। তার সারমর্ম হল, "ইউযবিউসের গির্জার ইতিহাসের একটি বাক্যে এ শব্দটি এসেছে। যাকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভুল শব্দরূপের সাথে কোরআন মাজিদে যোগ করে দিয়েছেন।"
কথাটি নেহাৎ হাস্যকরই বটে। কারণ, মারাতশীর এ উক্তিটি সম্পূর্ণ প্রমাণ বিহীন অনর্থক কথা, যা শুধু পক্ষপাতিত্ব ও মূর্খতার কারণে বলা হয়েছে। বস্তুত সত্য তা-ই, যা আমরা শুরুতে আলোচনা করেছি।
কোরআনের উক্ত আয়াত ও বর্ণিত হাদিসগুলো থেকে প্রমাণিত হয়, ইবরাহীম আ.- এর পিতার নাম আযর। ইবনে আব্বাস রাযি.-সহ অধিকাংশ বংশবিশারদদের মতে ইবরাহীম আ.-এর পিতার নাম তারেখ। আহলে কিতাবদের মতে তারেখ একটি মূর্তির নাম। ইবরাহীম আ.-এর পিতা এর পূজা করত আর এরই নামানুসারে তাকে তারেখ উপাধি দেওয়া হয়। কিন্তু প্রকৃত নাম আযর। ইবনে জারির লিখেছেন: সঠিক কথা হলো, 'আযর' তার প্রকৃত নাম অথবা 'আযর' ও 'তারেখ' দুটোই তার আসল নাম কিংবা এর কোনো একটা উপাধি এবং অপরটা নাম। ইবনে জারিরের উক্তিটি সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আল্লাহই অধিকতর জ্ঞাত।
📄 হযরত নূহ আ. পর্যন্ত হযরত ইবরাহীম আ.-এর বংশধারা
তাওরাত ও ইতিহাস গ্রন্থে হযরত ইবরাহীম আ. হতে হযরত নূহ আ. পর্যন্ত বংশধারা গণনা করা হয়েছে। এ বর্ণনার শুদ্ধতা-অশুদ্ধতার ব্যাপারটি আনুমানিক ও ধারণাপ্রসূত মতের অধিক কিছু নয়। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-
এর বংশ সম্বন্ধে যদিও সুনিশ্চিত, তিনি ইবরাহীম আ.-এর বংশধর, তবুও ‘আদনান’ হতে উপরের দিকের ক্রমধারাগুলো সম্বন্ধে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ফায়সালা হল, “বংশ সূত্রে বিজ্ঞগণ নামগুলোর নির্দিষ্টকরণে ভুল বর্ণনা করেছেন। অতএব হযরত ইবরাহীম আ. হতে হযরত নূহ আ. পর্যন্ত বংশধারা এই ভুল থেকে কেমন করে বিশুদ্ধ থাকতে পারে?
গণনানুযায়ী হযরত ইবরাহীম আ.-এর জন্মকাল হতে হযরত নূহ আ. পর্যন্ত ৮৯০ বছর। হযরত নূহ আ.-এর পূর্ণ বয়স যখন ৯৫০ বছর বলা হয়, তখন এর অর্থ এ দাঁড়ায়, হযরত নূহ আ.-এর বয়স ৬০ বছর বাকি থাকতে তাঁর জীবদ্দশায়ই হযরত ইবরাহীম আ.-এর জন্ম হয় এবং তাঁরা উভয়ে এই ষাট বছর সময়ে সমসাময়িকভাবে জীবন যাপন করেন। নিঃসন্দেহে এটা ভিত্তিহীন কথা। এবং নিশ্চিতরূপে ভুল ও অর্থহীন। কাজেই একথা মানতেই হবে, তাওরাতের গণনার মধ্যে বানোয়াটি রয়েছে। বাস্তবেই প্রাচীনকালে ইহুদিদের নিকট ইতিহাসের অধ্যায় এ জাতীয় কাহিনী এবং রেওয়ায়েতের ওপরই প্রতিষ্ঠিত ছিল। এতে ঐতিহাসিক সত্যতা এবং সময়ের বৈপরিত্বে মতানৈক্যের প্রতি বিন্দুমাত্র লক্ষ রাখা হয় নি।
📄 নবুওয়াত প্রাপ্তি
কোরআন মাজিদে হযরত ইবরাহীম আ.-এর জ্ঞানচক্ষু উন্মোচনকারী হেদায়েত ও সৎপথ প্রাপ্তির বিষয় এরূপে বর্ণনা করা হয়েছে: وَلَقَدْ آتَيْنَا إِبْرَاهِيمَ رُشْدَهُ مِنْ قَبْلُ وَكُنَّا بِهِ عَالِمِينَ (٥١) إِذْ قَالَ لِأَبِيهِ وَقَوْمِهِ مَا هَذِهِ التَّمَاثِيلُ الَّتِي أَنْتُمْ لَهَا عَاكِفُونَ (٥٢) قَالُوا وَجَدْنَا آبَاءَنَا لَهَا عَابِدِينَ (٥٣) قَالَ لَقَدْ كُنْتُمْ أَنْتُمْ وَآباؤُكُمْ فِي ضَلَالٍ مُبِينٍ (٥٤) قَالُوا أَجِئْتَنَا بِالْحَقِّ أَمْ أَنْتَ مِنَ اللَّاعِبِينَ (٥٥) قَالَ بَلْ رَبُّكُمْ رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الَّذِي فَطَرَهُنَّ وَأَنَا عَلَى ذَلِكُمْ مِنَ الشَّاهِدِينَ
“নিঃসন্দেহে আমি ইবরাহীমকে প্রথম হতেই হেদায়েত ও সৎপথের জ্ঞান দান করেছিলাম এবং তাঁর (কার্যকলাপ) সম্বন্ধে খুব পরিজ্ঞাত ছিলাম। যখন তিনি তাঁর পিতা ও কওমকে বললেন, এই মূর্তিগুলি কি, যা নিয়ে তোমরা বসে আছ? তারা বলল, আমরা আমাদের পূর্বপুরুষগণকে এদেরই পূজা করতে দেখেছি। ইবরাহীম আ. বললেন, নিঃসন্দেহে তোমরা এবং তোমাদের পূর্বপুরুষগণ প্রকাশ্য ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছ। তারা উত্তর দিল- তুমি কি আমাদের জন্য কোনো সত্য নিয়ে এসেছ, নাকি এমনি বিদ্রূপকারীদের মতো বলছ? ইবরাহীম আ. বললেন, (এ সমস্ত মূর্তি তোমাদের প্রতিপালক নয়) বরং তোমাদের প্রতিপালক জমিন ও আসমানসমূহের পালনকর্তা এই সমুদয়কে সৃষ্টি করেছেন। আর আমি এ বিশ্বাসই পোষণ করেছি। (সূরা আম্বিয়া: ৫১-৫৬)
যখন হযরত ইবরাহীম আ.-এর ওপর আল্লাহ তাআলার অবারিত অনুগ্রহ ও দানের স্রোত অবিরত ধারায় প্রবাহিত হল, তখন তিনি আম্বিয়ায়ে কেরামের সারিতে বিশিষ্ট স্থান লাভ করলেন এবং তাঁর দাওয়াত ও তাবলিগ কেন্দ্রটি 'দীনে হানিফ' নামে অভিহিত হল।
তিনি যখন দেখলেন, কওম মূর্তিপূজা, নক্ষত্রপুজা এবং বিভিন্ন জড়পদার্থের পূজায় এমনভাবে মশগুল রয়েছে, আল্লাহ তাআলার অসীম কুদরত ও তাঁর একত্ব এবং তাঁর অভাব-শূন্যতার কল্পনাও তাদের অন্তরে অবশিষ্ট নেই। তাদের নিকট আল্লাহ তাআলার একত্ববাদের বিশ্বাসের চেয়ে অধিক বিস্ময়কর এবং আজগুবি কথা আর কিছুই নেই। এমনি সময়ে হযরত ইবরাহীম আ. এক আল্লাহ তাআলার উপর ভরসা করে কওমের সম্মুখে সত্যের পয়গাম উপস্থিত করলেন এবং ঘোষণা করলেন:
"হে কওম! ইহা আমি কি দেখছি? তোমরা স্বহস্তে নির্মিত মূর্তিসমূহের পূজায় মগ্ন রয়েছ! তোমরা কি এমনই অজ্ঞতার নিদ্রায় বিভোর রয়েছ, সে সমস্ত কাঠ নিজেরা যন্ত্রপাতির সাহায্যে কেটেকুটে মূতি প্রস্তুত করছ। যদি তা তোমাদের মর্জি অনুযায়ী তৈরি না হয়, তবে একে ভেঙ্গে দিয়ে অন্য একটি নির্মাণ করছ। নির্মাণের পর তাকেই আবার পূজা কর এবং উপকার ও ক্ষতি সাধনের মালিক মনে কর। তোমরা এ সমস্ত অনর্থক কর্ম হতে বিরত হও। আল্লাহ তাআলার একত্ববাদ স্বীকার করে নাও। এবং একমাত্র সেই প্রকৃত মালিকের সম্মুখে বিনয়ের সঙ্গে মাথা নত কর, যিনি আমার ও তোমাদের এবং সমগ্র বিশ্ব জগতের স্রষ্টা ও মালিক।
কিন্তু কওম তাঁর আহ্বানের প্রতি একটুও কর্ণপাত করল না। আর যেহেতু তারা সত্য গ্রহণকারী কর্ণ এবং সত্য দর্শনকারী চক্ষু হতে বঞ্চিত ছিল, তাই তারা এমন উচ্চ মর্যাদাশালী পয়গম্বরের সত্যের দাওয়াত নিয়ে উপহাস করল এবং আরও অধিক অবাধ্যতা ও নাফরমানি করতে লাগল।
📄 পিতাকে ইসলামের দাওয়াত প্রদান এবং পিতাপুত্রে বিতর্ক
হযরত ইবরাহীম আ. দেখলেন, শিরকের সর্বাপেক্ষা প্রধান কেন্দ্র তাঁর নিজের ঘরে বর্তমান। আর আযরের মূর্তিনির্মাণ ও মূর্তিপূজা গোটা কওমের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র ও মেরুদণ্ড হয়ে রয়েছে। তাই তিনি ভাবলেন, সুকৌশল হচ্ছে সত্যের প্রতি আহ্বান এবং সত্যের পয়গাম প্রচারের কর্তব্য পালন নিজ ঘর হতেই আরম্ভ করা। অতএব ইবরাহীম আ. সর্বপ্রথম নিজের পিতা আযারকেই লক্ষ্য করে বললেন পিতা! আল্লাহর এবাদত এবং আল্লাহকে চেনার জন্য আপনি যে পন্থা অবলম্বন করেছেন এবং যাকে পূর্বপূরুষদের পুরাতন পন্থা বলেন, এটা প্রকাশ্য ভ্রান্তি এবং বাতেল পন্থা। সিরাতুল মুস্তাকীম ও সত্যপথ হলো, আমি যেদিকে আহ্বান করছি। পিতা! এক আল্লাহর অস্তিত্ব ও একত্বে বিশ্বাস করাই নাজাতের উৎস; আপনার হাতে গড়া এ সমস্ত মূর্তিপূজা নয়।
আপনি এই পন্থা ত্যাগ করুন এবং আল্লাহর একত্বের পথকে দৃঢ়তার সঙ্গে গ্রহণ করুন। তাতে আপনি আল্লাহ তাআলার সন্তোষ এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সৌভাগ্য লাভ করতে পারবেন। কিন্তু আফসোস! আযরের উপর ইবরাহীম আ.-এর এ উপদেশ ও নসিহতের কোনোই ক্রিয়া হল না বরং সত্য কবুল করার পরিবর্তে আযর তার পুত্রকে ধমকাতে লাগল :
"তুমি যদি মূর্তিসমূহের নিন্দাবাদ হতে বিরত না হও, তবে আমি তোমাকে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করব।"
হযরত ইবরাহীম আ. দেখলেন, বিষয়টা সীমা ছাড়িয়ে গেছে। একদিকে যদি পিতার সম্মান রক্ষা করার প্রশ্ন হয়, তবে অন্যদিকে কর্তব্য পালন, সত্যের সংরক্ষণ ও আল্লাহর আদেশ পালনের প্রশ্ন। অতএব তিনি চিন্তা করলেন এবং শেষ পর্যন্ত তা-ই করলেন, যা এরূপ একজন মনোনীত মানুষ এবং আল্লাহ পাকের উচ্চ মর্যাদাশালী পয়গম্বরের মর্যাদার উপযোগী ছিল। তিনি পিতার কঠোর উক্তির উত্তর কঠোরতার দ্বারা দিলেন না, হীনতা ও নীচতার পন্থা অবলম্বন করলেন না। বরং নিছক নম্রতা, কোমলতা এবং মহান চরিত্রের সাথে উত্তর দিলেন: পিতা! যদি আমার কথার উত্তর এটাই হয়, তবে আজ থেকে আপনাকে সালাম করে পৃথক হয়ে যাচ্ছি। আমি আল্লাহ তাআলার সত্য ধর্ম ত্যাগ করতে পারি না। এবং কোনো অবস্থাতেই মূর্তিসমূহের পূজা করতে পারি না। আমি আজ হতে আপনার সংশ্রব থেকে পৃথক হয়ে যাচ্ছি। কিন্তু আপনার অগোচরে আপনার জন্য আল্লাহ তাআলার দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকব। যাতে আপনার হেদায়েত লাভের সৌভাগ্য হয় এবং আপনি আল্লাহর আযাব হতে নাজাত পান।
হযরত ইবরাহীম আ. সর্বপ্রথম আপন পিতাকে ঈমানের দাওয়াত দিলেন। তার পিতা ছিল মূর্তিপূজারী। কাজেয় কল্যাণের দিকে আহ্বান পাওয়ার অধিকার তারই সবচাইতে বেশি। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّهُ كَانَ صِدِّيقًا نَبِيًّا (٤١) إِذْ قَالَ لِأَبِيهِ يَا أَبَتِ لِمَ تَعْبُدُ مَا لَا يَسْمَعُ وَلَا يُبْصِرُ وَلَا يُغْنِي عَنْكَ شَيْئًا (٤٢) يَا أَبَتِ إِنِّي قَدْ جَاءَنِي مِنَ الْعِلْمِ مَا لَمْ يَأْتِكَ فَاتَّبِعْنِي أَهْدِكَ صِرَاطًا سَوِيًّا (٤٣) يَا أَبَتِ لَا تَعْبُدِ الشَّيْطَانَ إِنَّ الشَّيْطَانَ كَانَ لِلرَّحْمَنِ عَصِيًّا (٤٤) يَا أَبَتِ إِنِّي أَخَافُ أَنْ يَمَسَّكَ عَذَابٌ مِنَ الرَّحْمَنِ فَتَكُونَ لِلشَّيْطَانِ وَلِيًّا (٤٥) قَالَ أَرَاغِبُ أَنتَ عَنْ آلِهَتِي يَا إِبْرَاهِيمُ لَئِنْ لَمْ تَنْتَهِ لَأَرْجُمَنَّكَ وَاهْجُرْنِي مَلِيًّا (٤٦) قَالَ سَلَامٌ عَلَيْكَ سَأَسْتَغْفِرُ لَكَ رَبِّي إِنَّهُ كَانَ بِي حَفِيًّا (٤٧) وَأَعْتَزِلُكُمْ وَمَا تَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَأَدْعُو رَبِّى عَسَى أَلَّا أَكُونَ بِدُعَاءِ رَبِّى شَقِيًّا
স্মরণ কর! এ কিতাবে উল্লিখিত ইবরাহীম আ.-এর কথা! সে ছিল সত্যনিষ্ঠ নবী। যখন সে তার পিতাকে বলল, 'হে আমার পিতা! তুমি কেন তার ইবাদত কর- যে শুনে না, দেখে না এবং তোমার কোনো কাজেই আসে না? হে আমার পিতা! আমার নিকট তো এসেছে জ্ঞান, যা তোমার নিকট আসে নি। সুতরাং আমার অনুসরণ কর, আমি তোমাকে সঠিক পথ দেখাব। হে আমার পিতা! শয়তানের ইবাদত কর না; শয়তান তো দয়াময়ের অবাধ্য। হে আমার পিতা! আমি আশঙ্কা করছি, তোমাকে দয়াময়ের শাস্তি স্পর্শ করবে এবং তুমি শয়তানের বন্ধু হয়ে পড়বে। পিতা বলল, 'হে ইবরাহীম! তুমি কি আমার দেব-দেবী হতে বিমুখ? যদি তুমি নিবৃত্ত না হও, তবে আমি পাথরের আঘাতে তোমার প্রাণনাশ করবই। তুমি চিরদিনের জন্যে আমার নিকট হতে দূর হয়ে যাও!' ইবরাহীম আ. বলল, 'তোমার প্রতি সালাম। আমি আমার প্রতিপালকের নিকট তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব, তিনি আমার প্রতি অতিশয় অনুগ্রহশীল। আমি তোমাদের হতে ও তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদের ইবাদত কর, তাদের হতে পৃথক হচ্ছি। আমি আমার প্রতিপালককে আহ্বান করি, আশা করি আমার প্রতিপালককে আহ্বান করে আমি ব্যর্থ হব না। (সূরা মারইয়াম: ৪১-৪৮)
এখানে আল্লাহ তাআলা ইবরাহীম আ. ও তাঁর পিতার মধ্যে যে কথোপকথন ও বিতর্ক হয়েছিল, তা উল্লেখ করেছেন। সত্যের দিকে পিতাকে তিনি কোমল ভাষায় ও উত্তম ভঙ্গিতে আহ্বান করেছেন, তা এখানে সুন্দরভাবে ব্যক্ত হয়েছে। তিনি পিতার মূর্তিপূজার অসারতা তুলে ধরছেন, তা হলে এরা কিভাবে উপাসকদের উপকার করবে? কিভাবে তাদের খাদ্য ও সাহায্য দান করে তাদের কল্যাণ করবে? তারপর আল্লাহ তাকে যে হেদায়েত ও উপকারী জ্ঞান দান করেছেন, তার ভিত্তিতে পিতাকে সর্তক করে দেন, যদিও বয়সে তিনি স্বভাবতই পিতার চেয়ে ছোট।
يَا أَبَتِ إِنِّي قَدْ جَاءَنِي مِنَ الْعِلْمِ مَا لَمْ يَأْتِكَ فَاتَّبِعْنِي أَهْدِكَ صِرَاطًا سَوِيًّا
"হে আমার পিতা! আমার কাছে জ্ঞান এসেছে, যা আপনার নিকট আসে নি। সুতরাং আপনি আমার অনুসরণ করুন! আমি আপনাকে সরল সঠিক পথ দেখাব। অর্থাৎ এমন পথ যা অতি সুদৃঢ়, সহজ ও সরল। যে পথ অবলম্বন করলে দুনিয়া ও আখিরাতে আপনাকে কল্যাণের পথে নিয়ে যাবে। ইবরাহীম আ. যখন পিতার নিকট এই সত্য পথ ও উপদেশ পেশ করলেন। পিতা তা গ্রহণ করল না বরং উল্টো তাঁকে ধমকাল ও ভয় দেখাল। সে বলল:
قَالَ أَرَاغِبٌ أَنْتَ عَنْ آلِهَتِي يَا إِبْرَاهِيمُ لَئِنْ لَمْ تَنْتَهِ لَأَرْجُمَنَّكَ وَاهْجُرْنِي مَلِيًّا
“হে ইবরাহীম! তুমি কি আমার দেব-দেবী থেকে বিমুখ? যদি তুমি নিবৃত্ত না হও, তবে আমি পাথরের আঘাতে তোমার প্রাণনাশ করবই।"
কেউ কেউ বলেন, মৌখিকভাবে। আবার কেউ কেউ বলেন, বাস্তবেই পাথর মারব। (وَاهْجُرْنِي مَلِيًّا (চিরতরের জন্যে দূর হয়ে যাও) অর্থাৎ আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে দীর্ঘকালের জন্যে চলে যাও। ইবরাহীম আ. তখন বলেছিলেন: سَلَامٌ عَلَيْكَ অর্থাৎ আমার পক্ষ থেকে কোনো রকম কষ্টদায়ক ব্যবহার তুমি পাবে না। আমার তরফ থেকে তুমি সম্পূর্ণ নিরাপদ। ইবরাহীম আ. অতিরিক্ত আরও বললেন: سَأَسْتَغْفِرُ لَكَ رَبِّي إِنَّهُ كَانَ بِي حَفِيًّا - আমি আমার প্রতিপালকের নিকট তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব। তিনি আমার প্রতি অতিশয় অনুগ্রহশীল।
ইবনে আব্বাস রাযি. প্রমুখ বলেছেন- লতিফান অর্থ দয়ালু। কেননা তিনি আমাকে সত্য পথের সন্ধান দিয়েছেন। একনিষ্ঠভাবে তাঁর ইবাদত করার তাওফিক দিয়েছেন। কাজেই তিনি বললেন: وَأَعْتَزِلُكُمْ وَمَا تَدْعُونَ مِنْ دুونِ اللَّهِ وَأَدْعُو رَبِّي عَسَى أَلَّا أَكُونَ بِدُعَاءِ رَبِّي شَقِيًّا "আমি তোমাদেরকে পরিত্যাগ করছি এবং আল্লাহ ব্যতীত যাদের পূজা তোমরা করছ, তাদেরও পরিত্যাগ করছি। আমি কেবল আমার পালনকর্তাকেই আহ্বান করি। আশা করি, আমার প্রতিপালককে আহ্বান করে আমি ব্যর্থ-নিষ্ফল হব না।”
এ ওয়াদা অনুযায়ী ইবরাহীম আ. পিতার জন্যে সর্বদা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন। পরে যখন জানলেন, তাঁর পিতা আল্লাহর দুশমন; তখন তিনি তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে দেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন: وَمَا كَانَ اسْتِغْفَارُ إِبْرَاهِيمَ لِأَبِيهِ إِلَّا عَنْ مَوْعِدَةٍ وَعَدَهَا إِيَّاهُ فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُ أَنَّهُ عَدُوٌّ لِلَّهِ تَبَرَّأَ مِنْهُ إِنَّ إِبْرَاهِيمَ لَأَوَّاهُ حَلِيمٌ
ইবরাহীম আ. তাঁর পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন, তাকে এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বলে, এরপর যখন এটা তার নিকট সুস্পষ্ট হল, সে আল্লাহর শত্রু, তখন ইবরাহীম আ. তার সম্পর্ক ছিন্ন করলেন। ইবরাহীম আ. তো কোমলপ্রাণ ও সহনশীল। (সূরা তাওবা: ১১৪)
ইমাম বোখারি রহ. হযরত আবু হোরায়রা রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন কেয়ামতের দিন ইবরাহীম আ.-এর সাথে তাঁর পিতা আযরের সাক্ষাৎ হবে। আযরের চেহারা মলিন ও কালিমালিপ্ত দেখে ইবরাহীম আ. বলবেন: আমি কি আপনাকে দুনিয়ায় বলি নি, আমার অবাধ্য হবেন না? পিতা বলবে, 'আজ আর আমি তোমার অবাধ্য হব না।' তখন ইবরাহীম আ. বলবেন, হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, পুনরুত্থান দিবসে আমাকে লাঞ্ছিত করবেন না। কিন্তু আমার পিতা যেখানে আপনার দয়া ও ক্ষমা থেকে দূরে থাকছে, সেখানে এর চেয়ে অধিক লাঞ্ছনা আর কি হতে পারে? আল্লাহ বলবেন, আমি কাফেরদের উপর জান্নাত হারাম করে দিয়েছি। তারপর বলা হবে: হে ইবরাহীম! তোমার পায়ের নিচে কি? নিচের দিকে তাকিয়ে তিনি দেখবেন, একটি জবাইকৃত পশু রক্তাপ্লুত অবস্থায় পড়ে আছে। তারপর পশুটির পাগুলি ধরে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
ইমাম বোখারি রহ. 'কিতাবুত তাফসিরে' ভিন্ন সূত্রে এ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম নাসায়িও হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। এসব বর্ণনায় ইবরাহীম আ.-এর পিতা আযর বলে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ لِأَبِيهِ آزَرَ أَتَتَّخِذُ أَصْنَامًا آلِهَةً إِنِّي أَرَاكَ وَقَوْمَكَ فِي ضَلَالٍ مُبِينٍ
স্মরণ কর! ইবরাহীম আ. তার পিতা আযরকে বলেছিলেন, আপনি কি মূর্তিকে ইলাহরূপে গ্রহণ করেছেন? আমি আপনাকে ও আপনার সম্প্রদায়কে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে দেখছি! (সূরা আনআম: ৭৪)