📄 তাওরাতে হযরত ইবরাহীম আ.
ইবরাহীম ইবনে তারেখ ইবনে নাহুর ইবনে সারূজ ইবনে রাউ ইবনে ফালেহ ইবনে আবের ইবনে ছালেহ ইবনে আরফাকশায ইবেন সাম ইবনে নূহ আ.। এ বিবরণটি তাওরাত এবং ইতিহাসের অনুরূপ। কিন্তু কোরআন মাজিদে তাঁর পিতার নাম 'আযর বলা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে:
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ لِأَبِيهِ آزَرَ أَتَتَّخِذُ أَصْنَامًا آلِهَةً
"আর (স্মরণ করুন সে সময়ের কথা) যখন ইবরাহীম নিজের পিতা 'আযর'কে বললেন, আপনি কি মূর্তিসমূহকে খোদা সাব্যস্ত করছেন।" (সূরা আনআম: ৭৪)
তাওরাত বলে, ইবরাহীম আ. ইরাকের 'আত্তর' নামক স্থানের অধিবাসী এবং 'ফাদ্দান' গোত্রের লোক ছিলেন। আর তাঁর কওম ছিল মূর্তিপূজক।
ইঞ্জীল বর্ণনাতে বর্ণিত আছে, তাঁর পিতা ছুতারের কাজ করতেন এবং নিজ সম্প্রদায়ের বিভিন্ন গোত্রের জন্য কাঠের মূর্তি নির্মাণ করে বিক্রয় করতেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহীম আ.-কে প্রথম হতেই সত্যের উপলদ্ধি এবং সত্যপথের সন্ধান ও হেদায়েত দান করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস রাখতেন, মূর্তিগুলি শুনতেও পারে না, দেখতেও পারে না এবং কারো ডাকে সাড়া দিতেও পারে না কারো ক্ষতি বা উপকার সাধনের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্কও নেই।
বস্তুত কাঠের এ পুতুলগুলো এবং অন্যান্য হস্তনির্মিত পদার্থগুলির মধ্যে কোনো পার্থক্যও নেই। তিনি প্রত্যহ সকাল-সন্ধ্যায় স্বচক্ষে দেখতেন, এ সমস্ত নিষ্প্রাণ মূর্তিগুলোকে আপন পিতা নিজ হাতে নির্মাণ করে থাকেন। এবং যেরূপ তাঁর ইচ্ছা হয় নাসিকা, কর্ণ, চক্ষু এবং দেহাবয়ব কর্তন ও কুন্দন করে নির্মাণ করেন। এরপর ক্রেতাদের নিকট যে সমতুল্য ও সমকক্ষ বলা যেতে পারে? কখনও না। এরপর নবুয়ত লাভ করে সর্বপ্রথম তিনি এদিকেই মনোযোগ প্রদান করলেন।
📄 আযর শব্দের বিশ্লেষণ
যেহেতু ইতিহাস ও তাওরাত হযরত ইবরাহীম আ.-এর পিতার নাম 'তারেখ' বলছে আর কোরআন মাজিদ বলছে, 'আযর'। তাই মুফাসসিরগণ এর তথ্য-বিশ্লেষণে দ্বিমত পোষণ করেছেন: (১) এমন ছুরত বের করতে হবে, যাতে উভয় নাম এক হয়ে অনৈক্য দূর হয়ে যায়। (২) তথ্য বিশ্লেষণপূর্বক মীমাংসিত কথা বলে দেওয়া অর্থাৎ এ দুটি নামের মধ্যে কোনটি সঠিক আর কোনটি ভুল অথবা দুটি নামই ঠিক, কিন্তু দুজন পৃথক পৃথক লোকের নাম কি না?
প্রথমদল আলেমগণের মতে, দুটি নামই এক ব্যক্তির। তবে 'তারেখ' ব্যক্তিবাচক নাম আর আযার 'গুণবাচক নাম।' এদের মধ্যে কেউ কেউ বলেন, 'আযর' হিব্রু ভাষায় মূর্তির প্রেমিককে বলা হয়। আর যেহেতু তারেখের মধ্যে মূর্তিনির্মাণ ও মূর্তিপূজা উভয় গুণই বিদ্যমান ছিল। এ কারণে তাকে 'আযার' নামে অভিহিত করা হয়েছে। আবার কেউ কেউ ধারণা করেন, 'আযর' শব্দের অর্থ 'আওয়ায'। অর্থাৎ স্বল্প বুদ্ধি বা নির্বোধ এবং অতিশয় দুর্বল বৃদ্ধ। যেহেতু তারেখের মধ্যে এ বিষয়গুলো বিদ্যমান ছিল, তাই তাকে এ বিশেষণে ভূষিত করা হয়েছে। কোরআন মাজিদ তার ওই গুণবাচক প্রসিদ্ধ নামটিকে বর্ণনা করেছে। সোহাইল 'রাওযুল আনফ' নামক কিতাবে এই মতই গ্রহণ করেছেন।
আর দ্বিতীয় দল আলেমণের বিশ্লেষণ মতে, 'আযর' একটি মূর্তির নাম। 'তারেখ' সেই মূর্তিটির পূজারী ও মোহন্ত ছিল। যেমন মুজাহিদ রহ. থেকে রেওয়ায়েত আছে, কোরআন মাজিদে উপর্যুক্ত আয়াতের অর্থ হল: أَتَتَّخِذُ آزر إلها اي أَتَتَّخِذُ أَصْنَامًا آلِهَةً "আপনি কি 'আযর'কে খোদা বলে মান্য করেন। অর্থাৎ মূর্তিগুলিকে খোদা বলে মানেন।"
আর 'ছাগানীর' মতও প্রায় এরূপই। শুধু ব্যাকরণের দিক দিয়ে তিনি উহ্য শব্দ সম্বন্ধে অন্য পথ অবলম্বন করেছেন। মোটকথা, তাদের উভয়ের নিকট أبيه শব্দটি آزر শব্দের بدل অর্থাৎ noun of opposition নয় বরং মূর্তির নাম। এ বর্ণনানুযায়ী ইবরাহীম আ.-এর পিতার নাম কোরআন মাজিদে উল্লেখ নেই।
একটি প্রসিদ্ধ কথাও আছে, হযরত ইবরাহীম আ.-এর পিতার নাম তারেখ ছিল এবং তার চাচার নাম ছিল 'আযর'। যেহেতু 'আযার'ই তাকে সন্তানের মতো প্রতিপালন করেছিলেন, এ জন্য কোরআন মাজিদ 'আযর'কে তার পিতা বলে সম্বোধন করেছে। যেমন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "চাচা পিতারই অনুরূপ।"
আল্লামা আবদুল ওহাব বোখারী বলেন: এ সমস্ত অভিমতের মধ্যে মুজাহিদ রহ.-এর অভিমতই যুক্তিসঙ্গত ও গ্রহণযোগ্য। কেননা মিসরবাসীদের একটি পুরাতন দেবতার নাম 'আযওয়ারীস'ও পাওয়া যায়। এর অর্থ 'শক্তিমান ও নামানুকরণ খোদা।' মূর্তিপূজক জাতিগুলোর নামানুসারেই নতুন দেবতাগুলির নাম 'আযর' রাখা হয়েছে। তবে হযরত ইবরাহীম আ.-এর পিতার নাম 'তারেখ'ই ছিল।
আমাদের মতে এ সমস্ত উক্তি অযথা জটিলতা সৃষ্টি করা ছাড়া অন্য কিছুই নয়। কেননা কোরআন মাজিদ যখন পরিষ্কারভাবে 'আযর'কে ইবরাহীম আ.-এর পিতাই বলেছে, তখন বংশপরিচয় বিশারদের এবং বাইবেলের আনুমানিক যুক্তিতে প্রভাবিত হয়ে কোরআন মাজিদের নিশ্চিত বিবৃতিকে রূপক অর্থে নেওয়ার কিংবা তা হতেও অগ্রসর হয়ে অযথা কোরআন মাজিদে ব্যাকরণ শাস্ত্রের উহ্য শব্দ মানার জন্য শরিয়তসম্মত কোনো প্রকৃত প্রয়োজন বাধ্য করছে?
যদি মেনে নেওয়া হয়, আযর মূর্তির প্রেমিককে বলা হয়। কিংবা কোনো মূর্তির নাম। এ দু কারণে আযরের নাম 'আযর' রাখা হয়েছে। যেমন: মূর্তিপূজক কওমগুলির মধ্যে প্রাচীনকাল হতে এ রীতি চলে আসছে, তারা কোনো কোনো সময় নিজেদের সন্ত ানের নাম 'দেবতার গোলাম' অর্থ প্রকাশ করে রাখত। আবার কোনো কোনো সময় দেবতা বা মূর্তির নামেই নাম রেখে দিত।
বস্তুত কালদী ভাষায় دَارَ 'আদার' শ্রেষ্ঠ পূজারীকে বলা হয়, আরবী ভাষায় একেই آزر 'আযর' বলা হয়েছে। 'তারেখ' যেহেতু মূর্তি নির্মাতা ও শ্রেষ্ঠ মূর্তিপূজক ছিল, তাই সে 'আযর' নামেই প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এটা তার ব্যক্তিগত নাম ছিল না; বরং গুণবাচক উপাধি ছিল। উপাধি যখন নামের স্থান দখল করে ফেলেছে, তাই কোরআন মাজিদেও তাকে এ নামেই সম্বোধন করা হয়েছে। এছাড়াও সেই পবিত্র মানব ইবরাহীম আ.-এর চরিত্র এত উন্নত ছিল, মূর্তিপূজার নিন্দা প্রসঙ্গে যখন আযরের সঙ্গে তাঁর বিতর্ক হয়ে গেল এবং আযর বিরক্ত হয়ে বলল:
أَرَاغِبٌ أَنْتَ عَنْ آلِهَتِي يَا إِبْرَاهِيمُ لَئِنْ لَمْ تَنْتَهِ لَأَرْجُمَنَّكَ وَاهْجُرْنِي مَلِيًّا
"ইবরাহীম! তুমি কি আমার খোদাদের প্রতি অসন্তুষ্ট? তুমি যদি এরূপ কার্য হতে নিবৃত্ত না হও, তবে নিশ্চয় তোমাকে প্রস্তর নিক্ষেপে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিব। যাও, আমার সম্মুখ হতে দূর হয়ে যাও।" (সূরা মারইয়াম: ৪৬)
এমন কঠোর ও বেদনাদায়ক কথোপকথনের সময়ও হযরত ইবরাহীম পিতৃসম্পর্কের মর্যাদা রক্ষা করে শুধু এতটুকুই বলেছিলেন:
سَلَامٌ عَلَيْكَ سَأَسْتَغْفِرُ لَكَ رَبِّي إِنَّهُ كَانَ بِي حَفِيًّا
"আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। অচিরেই আপনার জন্য আমি আমার পালনকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করব। নিশ্চয় তিনি আমার প্রতি অতি দয়ালু। (সূরা মারইয়াম: ৪৭)
অতএব ইতিহাসের 'তারেখ'-ই মূলত আযর। এটা তার ব্যক্তিগত নাম, গুণবাচক নাম নয়। 'তারেখ' হয়ত ভুল নাম অথবা 'আযর' শব্দের অনুবাদ, যা তাওরাতের অন্যান্য নামের মতো শেষ পর্যন্ত অনুবাদ থাকে নি বরং আসল নামে পরিণত হয়ে গেছে।
'মারাতশী' সপ্তদশ শতাব্দীর একজন খৃস্টান শিক্ষাবিদ। তিনি কোরআন মাজিদের অনুবাদ করেছেন এবং কোরআন মাজিদের ওপর খুবই সূক্ষ্ম ও পক্ষপাতমূলক আক্রমণ করেছেন। তিনি এ ক্ষেত্রেও নিজের অভ্যাসানুযায়ী একটি অনর্থক ও দুর্বল প্রশ্নের অবতারণা করেছেন। তার সারমর্ম হল, "ইউযবিউসের গির্জার ইতিহাসের একটি বাক্যে এ শব্দটি এসেছে। যাকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভুল শব্দরূপের সাথে কোরআন মাজিদে যোগ করে দিয়েছেন।"
কথাটি নেহাৎ হাস্যকরই বটে। কারণ, মারাতশীর এ উক্তিটি সম্পূর্ণ প্রমাণ বিহীন অনর্থক কথা, যা শুধু পক্ষপাতিত্ব ও মূর্খতার কারণে বলা হয়েছে। বস্তুত সত্য তা-ই, যা আমরা শুরুতে আলোচনা করেছি।
কোরআনের উক্ত আয়াত ও বর্ণিত হাদিসগুলো থেকে প্রমাণিত হয়, ইবরাহীম আ.- এর পিতার নাম আযর। ইবনে আব্বাস রাযি.-সহ অধিকাংশ বংশবিশারদদের মতে ইবরাহীম আ.-এর পিতার নাম তারেখ। আহলে কিতাবদের মতে তারেখ একটি মূর্তির নাম। ইবরাহীম আ.-এর পিতা এর পূজা করত আর এরই নামানুসারে তাকে তারেখ উপাধি দেওয়া হয়। কিন্তু প্রকৃত নাম আযর। ইবনে জারির লিখেছেন: সঠিক কথা হলো, 'আযর' তার প্রকৃত নাম অথবা 'আযর' ও 'তারেখ' দুটোই তার আসল নাম কিংবা এর কোনো একটা উপাধি এবং অপরটা নাম। ইবনে জারিরের উক্তিটি সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আল্লাহই অধিকতর জ্ঞাত।
📄 হযরত নূহ আ. পর্যন্ত হযরত ইবরাহীম আ.-এর বংশধারা
তাওরাত ও ইতিহাস গ্রন্থে হযরত ইবরাহীম আ. হতে হযরত নূহ আ. পর্যন্ত বংশধারা গণনা করা হয়েছে। এ বর্ণনার শুদ্ধতা-অশুদ্ধতার ব্যাপারটি আনুমানিক ও ধারণাপ্রসূত মতের অধিক কিছু নয়। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-
এর বংশ সম্বন্ধে যদিও সুনিশ্চিত, তিনি ইবরাহীম আ.-এর বংশধর, তবুও ‘আদনান’ হতে উপরের দিকের ক্রমধারাগুলো সম্বন্ধে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ফায়সালা হল, “বংশ সূত্রে বিজ্ঞগণ নামগুলোর নির্দিষ্টকরণে ভুল বর্ণনা করেছেন। অতএব হযরত ইবরাহীম আ. হতে হযরত নূহ আ. পর্যন্ত বংশধারা এই ভুল থেকে কেমন করে বিশুদ্ধ থাকতে পারে?
গণনানুযায়ী হযরত ইবরাহীম আ.-এর জন্মকাল হতে হযরত নূহ আ. পর্যন্ত ৮৯০ বছর। হযরত নূহ আ.-এর পূর্ণ বয়স যখন ৯৫০ বছর বলা হয়, তখন এর অর্থ এ দাঁড়ায়, হযরত নূহ আ.-এর বয়স ৬০ বছর বাকি থাকতে তাঁর জীবদ্দশায়ই হযরত ইবরাহীম আ.-এর জন্ম হয় এবং তাঁরা উভয়ে এই ষাট বছর সময়ে সমসাময়িকভাবে জীবন যাপন করেন। নিঃসন্দেহে এটা ভিত্তিহীন কথা। এবং নিশ্চিতরূপে ভুল ও অর্থহীন। কাজেই একথা মানতেই হবে, তাওরাতের গণনার মধ্যে বানোয়াটি রয়েছে। বাস্তবেই প্রাচীনকালে ইহুদিদের নিকট ইতিহাসের অধ্যায় এ জাতীয় কাহিনী এবং রেওয়ায়েতের ওপরই প্রতিষ্ঠিত ছিল। এতে ঐতিহাসিক সত্যতা এবং সময়ের বৈপরিত্বে মতানৈক্যের প্রতি বিন্দুমাত্র লক্ষ রাখা হয় নি।
📄 নবুওয়াত প্রাপ্তি
কোরআন মাজিদে হযরত ইবরাহীম আ.-এর জ্ঞানচক্ষু উন্মোচনকারী হেদায়েত ও সৎপথ প্রাপ্তির বিষয় এরূপে বর্ণনা করা হয়েছে: وَلَقَدْ آتَيْنَا إِبْرَاهِيمَ رُشْدَهُ مِنْ قَبْلُ وَكُنَّا بِهِ عَالِمِينَ (٥١) إِذْ قَالَ لِأَبِيهِ وَقَوْمِهِ مَا هَذِهِ التَّمَاثِيلُ الَّتِي أَنْتُمْ لَهَا عَاكِفُونَ (٥٢) قَالُوا وَجَدْنَا آبَاءَنَا لَهَا عَابِدِينَ (٥٣) قَالَ لَقَدْ كُنْتُمْ أَنْتُمْ وَآباؤُكُمْ فِي ضَلَالٍ مُبِينٍ (٥٤) قَالُوا أَجِئْتَنَا بِالْحَقِّ أَمْ أَنْتَ مِنَ اللَّاعِبِينَ (٥٥) قَالَ بَلْ رَبُّكُمْ رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الَّذِي فَطَرَهُنَّ وَأَنَا عَلَى ذَلِكُمْ مِنَ الشَّاهِدِينَ
“নিঃসন্দেহে আমি ইবরাহীমকে প্রথম হতেই হেদায়েত ও সৎপথের জ্ঞান দান করেছিলাম এবং তাঁর (কার্যকলাপ) সম্বন্ধে খুব পরিজ্ঞাত ছিলাম। যখন তিনি তাঁর পিতা ও কওমকে বললেন, এই মূর্তিগুলি কি, যা নিয়ে তোমরা বসে আছ? তারা বলল, আমরা আমাদের পূর্বপুরুষগণকে এদেরই পূজা করতে দেখেছি। ইবরাহীম আ. বললেন, নিঃসন্দেহে তোমরা এবং তোমাদের পূর্বপুরুষগণ প্রকাশ্য ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছ। তারা উত্তর দিল- তুমি কি আমাদের জন্য কোনো সত্য নিয়ে এসেছ, নাকি এমনি বিদ্রূপকারীদের মতো বলছ? ইবরাহীম আ. বললেন, (এ সমস্ত মূর্তি তোমাদের প্রতিপালক নয়) বরং তোমাদের প্রতিপালক জমিন ও আসমানসমূহের পালনকর্তা এই সমুদয়কে সৃষ্টি করেছেন। আর আমি এ বিশ্বাসই পোষণ করেছি। (সূরা আম্বিয়া: ৫১-৫৬)
যখন হযরত ইবরাহীম আ.-এর ওপর আল্লাহ তাআলার অবারিত অনুগ্রহ ও দানের স্রোত অবিরত ধারায় প্রবাহিত হল, তখন তিনি আম্বিয়ায়ে কেরামের সারিতে বিশিষ্ট স্থান লাভ করলেন এবং তাঁর দাওয়াত ও তাবলিগ কেন্দ্রটি 'দীনে হানিফ' নামে অভিহিত হল।
তিনি যখন দেখলেন, কওম মূর্তিপূজা, নক্ষত্রপুজা এবং বিভিন্ন জড়পদার্থের পূজায় এমনভাবে মশগুল রয়েছে, আল্লাহ তাআলার অসীম কুদরত ও তাঁর একত্ব এবং তাঁর অভাব-শূন্যতার কল্পনাও তাদের অন্তরে অবশিষ্ট নেই। তাদের নিকট আল্লাহ তাআলার একত্ববাদের বিশ্বাসের চেয়ে অধিক বিস্ময়কর এবং আজগুবি কথা আর কিছুই নেই। এমনি সময়ে হযরত ইবরাহীম আ. এক আল্লাহ তাআলার উপর ভরসা করে কওমের সম্মুখে সত্যের পয়গাম উপস্থিত করলেন এবং ঘোষণা করলেন:
"হে কওম! ইহা আমি কি দেখছি? তোমরা স্বহস্তে নির্মিত মূর্তিসমূহের পূজায় মগ্ন রয়েছ! তোমরা কি এমনই অজ্ঞতার নিদ্রায় বিভোর রয়েছ, সে সমস্ত কাঠ নিজেরা যন্ত্রপাতির সাহায্যে কেটেকুটে মূতি প্রস্তুত করছ। যদি তা তোমাদের মর্জি অনুযায়ী তৈরি না হয়, তবে একে ভেঙ্গে দিয়ে অন্য একটি নির্মাণ করছ। নির্মাণের পর তাকেই আবার পূজা কর এবং উপকার ও ক্ষতি সাধনের মালিক মনে কর। তোমরা এ সমস্ত অনর্থক কর্ম হতে বিরত হও। আল্লাহ তাআলার একত্ববাদ স্বীকার করে নাও। এবং একমাত্র সেই প্রকৃত মালিকের সম্মুখে বিনয়ের সঙ্গে মাথা নত কর, যিনি আমার ও তোমাদের এবং সমগ্র বিশ্ব জগতের স্রষ্টা ও মালিক।
কিন্তু কওম তাঁর আহ্বানের প্রতি একটুও কর্ণপাত করল না। আর যেহেতু তারা সত্য গ্রহণকারী কর্ণ এবং সত্য দর্শনকারী চক্ষু হতে বঞ্চিত ছিল, তাই তারা এমন উচ্চ মর্যাদাশালী পয়গম্বরের সত্যের দাওয়াত নিয়ে উপহাস করল এবং আরও অধিক অবাধ্যতা ও নাফরমানি করতে লাগল।