📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 হযরত ইবরাহীম আ.-এর বংশ পরিচয়

📄 হযরত ইবরাহীম আ.-এর বংশ পরিচয়


হযরত ইবরাহীম আ.-এর নসবনামা: ইবরাহীম ইবনে তারেখ (২৫০) ইবনে লাহুর (১৪৮) ইবনে সারূগ (২৩০) ইবনে রাউ (২৩৯) ইবনে ফালিগ (৪৩৯) ইবনে আবির (৪৬৪) ইবনে শালিহ (৪৩৩) ইবনে আরফাখশাদ (৪৩৮) ইবনে সাম (৬০০) ইবনে নূহ আ.। আহলে কিতাবদের গ্রন্থে এভাবেই হযরত ইবরাহীম আ.-এর নসবনামা উল্লেখ করা হয়েছে। উপরে বন্ধনীর মধ্যে বয়স দেখানো হয়েছে। হযরত নূহ আ.-এর বয়স ইতোপূর্বে তাঁর আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে। তাই এখানে পুনরুল্লেখের প্রয়োজন নেই।

হাফেয ইবনে আসাকির রহ. তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে ইসহাক ইবনে বিশর কাহিলীর 'আল-মাবদা' গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, ইবরাহীম আ.-এর মায়ের নাম ছিল উমায়লা। এরপর তিনি ইবরাহীম আ.-এর জন্মের এক দীর্ঘ কাহিনীও লিখেছেন। ফালবী লিখেছেন, ইবরাহীম আ.-এর মায়ের নাম বুনা বিনতে কারবানা ইবনে কুরসি। তিনি ছিলেন আরফাখশাদ ইবনে সাম ইবনে নূহের বংশধর।

ইবনে আসাকির হযরত ইকরামা রাযি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন, হযরত ইবরাহীম আ.-এর কুনিয়াত-উপনাম ছিল আবুয যায়ফান। বর্ণনাকারীগণ বলেছেন, তারেখের বয়স যখন ৭৫ বছর তখন তার ঔরসে ইবরাহীম, নাহূর ও হারান-এর জন্ম হয়। হারানের পুত্রের নাম ছিল লূত আ.। বর্ণনাকারীদের মতে ইবরাহীম ছিলেন তিন পুত্রের মধ্যে মেজ। হারান পিতার জীবদ্দশায় নিজ জন্মস্থান কালদান অর্থাৎ বাবেলে (ব্যাবিলনে) মৃত্যুবরণ করেন। ঐতিহাসিক ও জীবনীকারদের নিকট এ মতই প্রসিদ্ধ ও যথার্থ।

ইবনে আসাকির হযরত ইবনে আব্বাস রাযি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন: ইবরাহীম আ. গুতায়ে দামেশকের বুরযা নামক গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। যা কাসিয়ুন পর্বতের সন্নিকটে অবস্থিত। এরপর ইবনে আসাকির বলেন: সঠিক মতে হযরত লূত আ. কে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে যখন তিনি এখানে আগমন করেছিলেন, তখন তিনি সেখানে সালাত আদায় করেছিলেন। ইবরাহীম আ. বিবি সারাহকে এবং নাতুর আপন ভাই হারানের কন্যা মালিকাকে বিবাহ করেন।

সারাহ ছিলেন বন্ধ্যা। তার কোনো সন্তান হত না। ইতিহাসবেত্তাদের মতে তারাখ নিজ পুত্র ইবরাহীম তার স্ত্রী সারাহ ও হারানের পুত্র লুতকে নিয়ে কালাদানীদের এলাকা থেকে কেনানের উদ্দেশে রওনা হন। হারান নামক স্থানে তারা অবতরণ করেন। এখানেই তারেখের মৃত্যু ঘটে। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল দুই শ পঞ্চাশ বছর।

এ বর্ণনা থেকে প্রমাণ হয়, ইবরাহীম আ.-এর জন্ম হারানে হয় নি বরং কাশদানী জাতির ভূ-খণ্ডই তার জন্মস্থান। এ স্থানটি হল বাবেল ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকা। এরপর তারা সেখান থেকে কেনানের আবাসভূমির উদ্দেশে যাত্রা করেন। এটা হল বায়তুল মুকাদ্দাসের এলাকা। তারপর তারা হারানে বসবাস শুরু করেন। হারান হল সেকালের কাশদানী জাতির আবাসভূমি। জাসীরা এবং শাসও এর অন্তর্ভুক্ত।

এখানকার অধিবাসীরা সাতটি নক্ষত্রের পূজা করত। সেই জাতির লোকেরা দামেশক শহর নির্মাণ করেছিল। তারা এই দীনের অনুসারী ছিল। তারা উত্তর মেরুর দিকে মুখ করে বিভিন্ন ধরনের ক্রিয়াকলাপ বা মন্ত্রের দ্বারা সাতটি তারকার পূজা করত। এই কারণেই প্রাচীন দামেশকের সাতটি প্রবেশ দ্বারের প্রতিটিতে উক্ত সাত তারকার এক একটি তারকার বিশাল মূর্তি স্থাপিত ছিল। এদের নামে তারা বিভিন্ন পর্ব ও উৎসব পালন করত। হারানের অধিবাসীরাও নক্ষত্র ও মূর্তি পূজা করত।

মোটকথা, সে সময় ভূ-পৃষ্ঠে যত লোক ছিল, তাদের মধ্য থেকে শুধু ইবরাহীম আ., তাঁর স্ত্রী (সারা) ও ভাতিজা লূত আ. ব্যতীত সবাই ছিল কাফের। আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহীম আ. দ্বারা সেসব দুষ্কৃতি ও ভ্রান্তি বিদূরিত করেন। কেননা আল্লাহ তাকে বাল্যকালেই সঠিক পথের সন্ধান দেন। রাসূল হওয়ার গৌরব দান করেন এবং বৃদ্ধ বয়েসে খলীল বা বন্ধুরূপে গ্রহণ করেন।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 তাওরাতে হযরত ইবরাহীম আ.

📄 তাওরাতে হযরত ইবরাহীম আ.


ইবরাহীম ইবনে তারেখ ইবনে নাহুর ইবনে সারূজ ইবনে রাউ ইবনে ফালেহ ইবনে আবের ইবনে ছালেহ ইবনে আরফাকশায ইবেন সাম ইবনে নূহ আ.। এ বিবরণটি তাওরাত এবং ইতিহাসের অনুরূপ। কিন্তু কোরআন মাজিদে তাঁর পিতার নাম 'আযর বলা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে:

وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ لِأَبِيهِ آزَرَ أَتَتَّخِذُ أَصْنَامًا آلِهَةً

"আর (স্মরণ করুন সে সময়ের কথা) যখন ইবরাহীম নিজের পিতা 'আযর'কে বললেন, আপনি কি মূর্তিসমূহকে খোদা সাব্যস্ত করছেন।" (সূরা আনআম: ৭৪)

তাওরাত বলে, ইবরাহীম আ. ইরাকের 'আত্তর' নামক স্থানের অধিবাসী এবং 'ফাদ্দান' গোত্রের লোক ছিলেন। আর তাঁর কওম ছিল মূর্তিপূজক।

ইঞ্জীল বর্ণনাতে বর্ণিত আছে, তাঁর পিতা ছুতারের কাজ করতেন এবং নিজ সম্প্রদায়ের বিভিন্ন গোত্রের জন্য কাঠের মূর্তি নির্মাণ করে বিক্রয় করতেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহীম আ.-কে প্রথম হতেই সত্যের উপলদ্ধি এবং সত্যপথের সন্ধান ও হেদায়েত দান করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস রাখতেন, মূর্তিগুলি শুনতেও পারে না, দেখতেও পারে না এবং কারো ডাকে সাড়া দিতেও পারে না কারো ক্ষতি বা উপকার সাধনের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্কও নেই।

বস্তুত কাঠের এ পুতুলগুলো এবং অন্যান্য হস্তনির্মিত পদার্থগুলির মধ্যে কোনো পার্থক্যও নেই। তিনি প্রত্যহ সকাল-সন্ধ্যায় স্বচক্ষে দেখতেন, এ সমস্ত নিষ্প্রাণ মূর্তিগুলোকে আপন পিতা নিজ হাতে নির্মাণ করে থাকেন। এবং যেরূপ তাঁর ইচ্ছা হয় নাসিকা, কর্ণ, চক্ষু এবং দেহাবয়ব কর্তন ও কুন্দন করে নির্মাণ করেন। এরপর ক্রেতাদের নিকট যে সমতুল্য ও সমকক্ষ বলা যেতে পারে? কখনও না। এরপর নবুয়ত লাভ করে সর্বপ্রথম তিনি এদিকেই মনোযোগ প্রদান করলেন।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 আযর শব্দের বিশ্লেষণ

📄 আযর শব্দের বিশ্লেষণ


যেহেতু ইতিহাস ও তাওরাত হযরত ইবরাহীম আ.-এর পিতার নাম 'তারেখ' বলছে আর কোরআন মাজিদ বলছে, 'আযর'। তাই মুফাসসিরগণ এর তথ্য-বিশ্লেষণে দ্বিমত পোষণ করেছেন: (১) এমন ছুরত বের করতে হবে, যাতে উভয় নাম এক হয়ে অনৈক্য দূর হয়ে যায়। (২) তথ্য বিশ্লেষণপূর্বক মীমাংসিত কথা বলে দেওয়া অর্থাৎ এ দুটি নামের মধ্যে কোনটি সঠিক আর কোনটি ভুল অথবা দুটি নামই ঠিক, কিন্তু দুজন পৃথক পৃথক লোকের নাম কি না?

প্রথমদল আলেমগণের মতে, দুটি নামই এক ব্যক্তির। তবে 'তারেখ' ব্যক্তিবাচক নাম আর আযার 'গুণবাচক নাম।' এদের মধ্যে কেউ কেউ বলেন, 'আযর' হিব্রু ভাষায় মূর্তির প্রেমিককে বলা হয়। আর যেহেতু তারেখের মধ্যে মূর্তিনির্মাণ ও মূর্তিপূজা উভয় গুণই বিদ্যমান ছিল। এ কারণে তাকে 'আযার' নামে অভিহিত করা হয়েছে। আবার কেউ কেউ ধারণা করেন, 'আযর' শব্দের অর্থ 'আওয়ায'। অর্থাৎ স্বল্প বুদ্ধি বা নির্বোধ এবং অতিশয় দুর্বল বৃদ্ধ। যেহেতু তারেখের মধ্যে এ বিষয়গুলো বিদ্যমান ছিল, তাই তাকে এ বিশেষণে ভূষিত করা হয়েছে। কোরআন মাজিদ তার ওই গুণবাচক প্রসিদ্ধ নামটিকে বর্ণনা করেছে। সোহাইল 'রাওযুল আনফ' নামক কিতাবে এই মতই গ্রহণ করেছেন।

আর দ্বিতীয় দল আলেমণের বিশ্লেষণ মতে, 'আযর' একটি মূর্তির নাম। 'তারেখ' সেই মূর্তিটির পূজারী ও মোহন্ত ছিল। যেমন মুজাহিদ রহ. থেকে রেওয়ায়েত আছে, কোরআন মাজিদে উপর্যুক্ত আয়াতের অর্থ হল: أَتَتَّخِذُ آزر إلها اي أَتَتَّخِذُ أَصْنَامًا آلِهَةً "আপনি কি 'আযর'কে খোদা বলে মান্য করেন। অর্থাৎ মূর্তিগুলিকে খোদা বলে মানেন।"

আর 'ছাগানীর' মতও প্রায় এরূপই। শুধু ব্যাকরণের দিক দিয়ে তিনি উহ্য শব্দ সম্বন্ধে অন্য পথ অবলম্বন করেছেন। মোটকথা, তাদের উভয়ের নিকট أبيه শব্দটি آزر শব্দের بدل অর্থাৎ noun of opposition নয় বরং মূর্তির নাম। এ বর্ণনানুযায়ী ইবরাহীম আ.-এর পিতার নাম কোরআন মাজিদে উল্লেখ নেই।

একটি প্রসিদ্ধ কথাও আছে, হযরত ইবরাহীম আ.-এর পিতার নাম তারেখ ছিল এবং তার চাচার নাম ছিল 'আযর'। যেহেতু 'আযার'ই তাকে সন্তানের মতো প্রতিপালন করেছিলেন, এ জন্য কোরআন মাজিদ 'আযর'কে তার পিতা বলে সম্বোধন করেছে। যেমন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "চাচা পিতারই অনুরূপ।"

আল্লামা আবদুল ওহাব বোখারী বলেন: এ সমস্ত অভিমতের মধ্যে মুজাহিদ রহ.-এর অভিমতই যুক্তিসঙ্গত ও গ্রহণযোগ্য। কেননা মিসরবাসীদের একটি পুরাতন দেবতার নাম 'আযওয়ারীস'ও পাওয়া যায়। এর অর্থ 'শক্তিমান ও নামানুকরণ খোদা।' মূর্তিপূজক জাতিগুলোর নামানুসারেই নতুন দেবতাগুলির নাম 'আযর' রাখা হয়েছে। তবে হযরত ইবরাহীম আ.-এর পিতার নাম 'তারেখ'ই ছিল।

আমাদের মতে এ সমস্ত উক্তি অযথা জটিলতা সৃষ্টি করা ছাড়া অন্য কিছুই নয়। কেননা কোরআন মাজিদ যখন পরিষ্কারভাবে 'আযর'কে ইবরাহীম আ.-এর পিতাই বলেছে, তখন বংশপরিচয় বিশারদের এবং বাইবেলের আনুমানিক যুক্তিতে প্রভাবিত হয়ে কোরআন মাজিদের নিশ্চিত বিবৃতিকে রূপক অর্থে নেওয়ার কিংবা তা হতেও অগ্রসর হয়ে অযথা কোরআন মাজিদে ব্যাকরণ শাস্ত্রের উহ্য শব্দ মানার জন্য শরিয়তসম্মত কোনো প্রকৃত প্রয়োজন বাধ্য করছে?

যদি মেনে নেওয়া হয়, আযর মূর্তির প্রেমিককে বলা হয়। কিংবা কোনো মূর্তির নাম। এ দু কারণে আযরের নাম 'আযর' রাখা হয়েছে। যেমন: মূর্তিপূজক কওমগুলির মধ্যে প্রাচীনকাল হতে এ রীতি চলে আসছে, তারা কোনো কোনো সময় নিজেদের সন্ত ানের নাম 'দেবতার গোলাম' অর্থ প্রকাশ করে রাখত। আবার কোনো কোনো সময় দেবতা বা মূর্তির নামেই নাম রেখে দিত।

বস্তুত কালদী ভাষায় دَارَ 'আদার' শ্রেষ্ঠ পূজারীকে বলা হয়, আরবী ভাষায় একেই آزر 'আযর' বলা হয়েছে। 'তারেখ' যেহেতু মূর্তি নির্মাতা ও শ্রেষ্ঠ মূর্তিপূজক ছিল, তাই সে 'আযর' নামেই প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এটা তার ব্যক্তিগত নাম ছিল না; বরং গুণবাচক উপাধি ছিল। উপাধি যখন নামের স্থান দখল করে ফেলেছে, তাই কোরআন মাজিদেও তাকে এ নামেই সম্বোধন করা হয়েছে। এছাড়াও সেই পবিত্র মানব ইবরাহীম আ.-এর চরিত্র এত উন্নত ছিল, মূর্তিপূজার নিন্দা প্রসঙ্গে যখন আযরের সঙ্গে তাঁর বিতর্ক হয়ে গেল এবং আযর বিরক্ত হয়ে বলল:

أَرَاغِبٌ أَنْتَ عَنْ آلِهَتِي يَا إِبْرَاهِيمُ لَئِنْ لَمْ تَنْتَهِ لَأَرْجُمَنَّكَ وَاهْجُرْنِي مَلِيًّا

"ইবরাহীম! তুমি কি আমার খোদাদের প্রতি অসন্তুষ্ট? তুমি যদি এরূপ কার্য হতে নিবৃত্ত না হও, তবে নিশ্চয় তোমাকে প্রস্তর নিক্ষেপে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিব। যাও, আমার সম্মুখ হতে দূর হয়ে যাও।" (সূরা মারইয়াম: ৪৬)

এমন কঠোর ও বেদনাদায়ক কথোপকথনের সময়ও হযরত ইবরাহীম পিতৃসম্পর্কের মর্যাদা রক্ষা করে শুধু এতটুকুই বলেছিলেন:

سَلَامٌ عَلَيْكَ سَأَسْتَغْفِرُ لَكَ رَبِّي إِنَّهُ كَانَ بِي حَفِيًّا

"আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। অচিরেই আপনার জন্য আমি আমার পালনকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করব। নিশ্চয় তিনি আমার প্রতি অতি দয়ালু। (সূরা মারইয়াম: ৪৭)

অতএব ইতিহাসের 'তারেখ'-ই মূলত আযর। এটা তার ব্যক্তিগত নাম, গুণবাচক নাম নয়। 'তারেখ' হয়ত ভুল নাম অথবা 'আযর' শব্দের অনুবাদ, যা তাওরাতের অন্যান্য নামের মতো শেষ পর্যন্ত অনুবাদ থাকে নি বরং আসল নামে পরিণত হয়ে গেছে।

'মারাতশী' সপ্তদশ শতাব্দীর একজন খৃস্টান শিক্ষাবিদ। তিনি কোরআন মাজিদের অনুবাদ করেছেন এবং কোরআন মাজিদের ওপর খুবই সূক্ষ্ম ও পক্ষপাতমূলক আক্রমণ করেছেন। তিনি এ ক্ষেত্রেও নিজের অভ্যাসানুযায়ী একটি অনর্থক ও দুর্বল প্রশ্নের অবতারণা করেছেন। তার সারমর্ম হল, "ইউযবিউসের গির্জার ইতিহাসের একটি বাক্যে এ শব্দটি এসেছে। যাকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভুল শব্দরূপের সাথে কোরআন মাজিদে যোগ করে দিয়েছেন।"

কথাটি নেহাৎ হাস্যকরই বটে। কারণ, মারাতশীর এ উক্তিটি সম্পূর্ণ প্রমাণ বিহীন অনর্থক কথা, যা শুধু পক্ষপাতিত্ব ও মূর্খতার কারণে বলা হয়েছে। বস্তুত সত্য তা-ই, যা আমরা শুরুতে আলোচনা করেছি।

কোরআনের উক্ত আয়াত ও বর্ণিত হাদিসগুলো থেকে প্রমাণিত হয়, ইবরাহীম আ.- এর পিতার নাম আযর। ইবনে আব্বাস রাযি.-সহ অধিকাংশ বংশবিশারদদের মতে ইবরাহীম আ.-এর পিতার নাম তারেখ। আহলে কিতাবদের মতে তারেখ একটি মূর্তির নাম। ইবরাহীম আ.-এর পিতা এর পূজা করত আর এরই নামানুসারে তাকে তারেখ উপাধি দেওয়া হয়। কিন্তু প্রকৃত নাম আযর। ইবনে জারির লিখেছেন: সঠিক কথা হলো, 'আযর' তার প্রকৃত নাম অথবা 'আযর' ও 'তারেখ' দুটোই তার আসল নাম কিংবা এর কোনো একটা উপাধি এবং অপরটা নাম। ইবনে জারিরের উক্তিটি সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আল্লাহই অধিকতর জ্ঞাত।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 হযরত নূহ আ. পর্যন্ত হযরত ইবরাহীম আ.-এর বংশধারা

📄 হযরত নূহ আ. পর্যন্ত হযরত ইবরাহীম আ.-এর বংশধারা


তাওরাত ও ইতিহাস গ্রন্থে হযরত ইবরাহীম আ. হতে হযরত নূহ আ. পর্যন্ত বংশধারা গণনা করা হয়েছে। এ বর্ণনার শুদ্ধতা-অশুদ্ধতার ব্যাপারটি আনুমানিক ও ধারণাপ্রসূত মতের অধিক কিছু নয়। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-
এর বংশ সম্বন্ধে যদিও সুনিশ্চিত, তিনি ইবরাহীম আ.-এর বংশধর, তবুও ‘আদনান’ হতে উপরের দিকের ক্রমধারাগুলো সম্বন্ধে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ফায়সালা হল, “বংশ সূত্রে বিজ্ঞগণ নামগুলোর নির্দিষ্টকরণে ভুল বর্ণনা করেছেন। অতএব হযরত ইবরাহীম আ. হতে হযরত নূহ আ. পর্যন্ত বংশধারা এই ভুল থেকে কেমন করে বিশুদ্ধ থাকতে পারে?

গণনানুযায়ী হযরত ইবরাহীম আ.-এর জন্মকাল হতে হযরত নূহ আ. পর্যন্ত ৮৯০ বছর। হযরত নূহ আ.-এর পূর্ণ বয়স যখন ৯৫০ বছর বলা হয়, তখন এর অর্থ এ দাঁড়ায়, হযরত নূহ আ.-এর বয়স ৬০ বছর বাকি থাকতে তাঁর জীবদ্দশায়ই হযরত ইবরাহীম আ.-এর জন্ম হয় এবং তাঁরা উভয়ে এই ষাট বছর সময়ে সমসাময়িকভাবে জীবন যাপন করেন। নিঃসন্দেহে এটা ভিত্তিহীন কথা। এবং নিশ্চিতরূপে ভুল ও অর্থহীন। কাজেই একথা মানতেই হবে, তাওরাতের গণনার মধ্যে বানোয়াটি রয়েছে। বাস্তবেই প্রাচীনকালে ইহুদিদের নিকট ইতিহাসের অধ্যায় এ জাতীয় কাহিনী এবং রেওয়ায়েতের ওপরই প্রতিষ্ঠিত ছিল। এতে ঐতিহাসিক সত্যতা এবং সময়ের বৈপরিত্বে মতানৈক্যের প্রতি বিন্দুমাত্র লক্ষ রাখা হয় নি।

ফন্ট সাইজ
15px
17px