📄 কয়েকটি উপদেশমূলক দৃষ্টান্ত
১। 'নাক্বাতুল্লাহ' যদিও সালেহ আ.-এর একটি মোজেযা। অর্থাৎ তাঁর নবুয়তের সত্যতার একটি নিদর্শন ছিল, তবুও কোরআন মাজিদ বলে এটা সামুদ সম্প্রদায়ের জন্য পরীক্ষা ছিল এবং পরিণামে তাদের ধ্বংসের নিদর্শন প্রমাণিত হল। যেমন আল্লাহ পাক বলেন:
"নিঃসন্দেহে আমি তাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য উটনী পাঠিয়েছি। অতএব হে নবী! এর অপেক্ষায় থাকুন এবং ধৈর্যধারণ করতে থাকুন।" (সূরা আলকামার; ২৭)
২। আল্লাহ পাকের প্রচলিত রীতি হল, যদি তিনি কোনো কওমের হেদায়েতের জন্য তাঁর নবীকে প্রেরণ করেন এবং কওম তাঁর হেদায়েতের প্রতি কর্ণপাত না করে, তবে ওই কওমকে ধ্বংসই করে দেওয়া জরুরি হয়ে যায় না। কিন্তু যেই কওম নিজেদের নবীর নিকট মোজেযা তলব করে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়, যদি তাদের দাবিকৃত মোজেযা প্রকাশিত হয়ে যায়, তবে তারা অবশ্যই ঈমান আনয়ন করবে। এরপর যদি তারা ঈমান আনয়ন না করে, তবে সেই কওমের ধ্বংস সুনিশ্চিত হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা তাদের ক্ষমা করেন না, যদি না তারা তওবা করে এবং আল্লাহর দীন কবুল করে, কিংবা আল্লাহর আযাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে অন্যান্য লোকদের জন্য উপদেশমূলক দৃষ্টান্ত হয়।
৩। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পয়গাম্বরী আল্লাহ তাআলার এ নিয়মের ঊর্ধ্বে। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: আমি আল্লাহ পাকের দরবারে প্রার্থনা করেছি, তিনি যেন আমার (বর্তমান ও ভবিষ্যতের উম্মতদের উপর ব্যাপক আযাব নাযিল না করেন এবং কোরআন মাজিদে আল্লাহ পাক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম.-এর সেই দোয়া এই বলে মনযুর করেছেন :
"হে রাসূল! আপনি তাদের মধ্যে বিদ্যমান থাকাকালে আল্লাহ তাআলা এ উম্মতের উপর ব্যাপক আযাব নাযিল করবেন না।"
৪। একটি মারাত্মক ভুল এবং নফসের ধোঁকা হলো, মানুষ স্বচ্ছলজীবিকা, আরামের যিন্দেগি এবং দুনিয়াবি মান-মর্যাদাকেই নিরাপত্তা মনে করে। যে সম্প্রদায় বা ব্যক্তির কাছে এ সমস্ত বিদ্যমান রয়েছে, তারা অবশ্যই আল্লাহ তাআলার আশ্রয়ে আছে। এমনকি তাদের স্বচ্ছলতাই প্রমাণ করে আল্লাহ তাআলার সন্তোষ ও সম্মতি তাদের সাথে ছিল। এ ধারণা ভুল এবং ধোঁকা এ জন্য, এই সামুদের ঘটনাটিতে স্থানে স্থানে বর্ণিত আছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি স্বচ্ছলতা ও সুখ-শান্তি অধিকতর আযাব ও ধ্বংসের পূর্বাভাস বলে সাব্যস্ত হয়ে থাকে। যদিও কওমসমূহের জন্য এর মেয়াদ কয়েক মাস কিংবা কয়েক বছর নয় বরং ভীত করে দেওয়ার মতো দীর্ঘকালই হোক না কেন। কিন্তু সর্বপ্রকারের পার্থিব সফলতা এবং আনন্দময় জীবনের সাথে যখন কুফর, অবাধ্যাচরণ এবং অহঙ্কার কোনো কওমের একান্ত অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন মনে করবে, কওমের ধ্বংস হওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে। মনে রাখবে :
"তোমার রবের ধরা বড় কঠিন।"
অবশ্য যদি এ সমস্ত শান্তি ও আনন্দময় জীবনের সাথে কওমের অধিকাংশ লোক আল্লাহ পাকের শোকর আদায়কারী হয়, তাঁর বান্দাগণের সাথে সদাচারী হয় এবং পরস্পর নেকনিয়ত ও হিতাকাঙ্ক্ষার উপর কাজ করতে থাকে, তবে নিঃসন্দেহ তারা আল্লাহ পাকের দরবারে প্রিয়। তাদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতার সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। আর তাদের জন্য এই পার্থিব জীবনের অসীম নেয়ামতের ঘোষণা রয়েছে। যেমন আল্লাহ পাক বলেন:
"আল্লাহ পাক ওই সমস্ত লোকের সাথে ওয়াদাবদ্ধ হয়েছেন, যারা তোমাদের মধ্য হতে ইমান এনেছে এবং নেকআমল করেছে এই মর্মে, তাদেরকে জমিনের প্রতিনিধিত্ব দান করবেন। যেমনি তাদের পূর্ববর্তী লোকদের প্রতিনিধি বানিয়েছিলেন। আর তাদের জন্য তাদের দীন ও ঈমান মযবুত করে দিবেন, যেরূপ তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছিলেন। আর তাদের ভয়-ভীতিকে নিরাপত্তায় রূপান্তরিত করে দেবেন। তারা আমার ইবাদত করবে এবং আমার সাথে (কাউকেও কোনো প্রকারেই) শরিক করবে না।" (সূরা নূর: ৫৫)
"আর নিঃসন্দেহ আমি নসিহতের পর যাবুর কিতাবে লিখে দিয়েছি, জমিনের উত্তরাধিকারিত্ব আমার নেককার বান্দাগণ লাভ করবে।" (সূরা আম্বিয়া: ১০৫)
এ আয়াতগুলো স্পষ্টরূপে প্রমাণ করছে, শাসনক্ষমতা ও রাষ্ট্রপরিচালনার অধিকার উত্তরাধিকারসূত্রে প্রদানের ওয়াদা তাদেরই প্রাপ্য, যারা মুমিনও হয় এবং আল্লাহ পাকের আহকাম অনুযায়ী আমল করে 'সালেহীন' তথা নেককার লোকদের দলভুক্তও হয়। অর্থাৎ যাদের সামগ্রিক জীবন একসঙ্গে এ দুটি গুণে গুণান্বিত, তাদের জন্য নিঃসন্দেহে এ শাসনক্ষমতা ও রাষ্ট্রপরিচালনা ক্ষমতা আল্লাহ পাকের পুরস্কার ও অনুগ্রহ স্বরূপ হবে। আর যদি এ গুণের অধিকারী না হয়, তবে শাসন-ক্ষমতা ও রাষ্ট্রপরিচালনার জন্য মুমিন ও কাফেরের কোনো বৈশিষ্ট্য নাই। আল্লাহ পাকের প্রজ্ঞা ও কল্যাণকামনার প্রেক্ষিতে এটা পার্থিব উপকরণ হিসেবে সচল ছায়াও বটে। আর এরূপ শাসনক্ষমতা ও রাষ্ট্রপরিচালনার জন্য এর প্রতি আল্লাহ পাকের সন্তোষ এবং সম্মতি থাকা জরুরি নয়।