📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 উটনী হত্যাকারী

📄 উটনী হত্যাকারী


যে লোক উটনী হত্যার দায়িত্ব গ্রহণ করে তার নাম কিদার ইবনে সালিফ ইবনে জানদা। সে ছিল সম্প্রদায়ের অন্যতম নেতা। সে ছিল গৌরবর্ণ, নীলচোখ ও পিঙ্গল চুল বিশিষ্ট। কথিত মতে সে ছিল সালিফ এর জারজ সন্তান। সায়বান নামক এক ব্যক্তির ঔরসে তার জন্ম হয়। কিদার একাই হত্যা করলেও যেহেতু সম্প্রদায়ের সকলের ঐকমত্যে কাজটি করেছিল তাই হত্যা করার দায়িত্ব সবার প্রতি আরোপিত হয়েছে।

ইবেন জারীর রহ. প্রমুখ মুফাসসির লিখেছেন: সামুদ সম্প্রদায়ের দুই মহিলা একজনের নাম সাদুক। সে মাহয়া ইবনে যুহায়র ইবনে মুখতারের কন্যা এবং প্রচুর ধন-সম্পদ ও বংশীয় গৌরবের অধিকারী। তার স্বামী ইসলাম গ্রহণ করে। ফলে স্ত্রী তাকে ত্যাগ করে এবং নিজের চাচাত ভাই মিসরা ইবনে মিহরাজ ইবনে মাহয়াকে বলে, যদি তুমি উটনীটি হত্যা করতে পার, তবে তোমাকে আমি বিবাহ করব। অপর মহিলাটি ছিল বৃদ্ধা এবং কাফির। তার স্বামী ছিল সম্প্রদায়ের অন্যতম সর্দার যুওয়াব ইবনে আমর। এই স্বামীর ঔরসে তার চারটি কন্যা ছিল। মহিলাটি কিদার ইবনে সালিফকে প্রস্তার দেয়, সে যদি উটনীটি হত্যা করতে পারে, তবে তার এ চার কন্যার মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা বিয়ে করতে পারবে। তখন ওই যুবকদ্বয় উটনী হত্যার দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং সম্প্রদায়ের লোকদের সমর্থন লাভের চেষ্টা চালায়। সে মতে অপর সাত ব্যক্তি তাদের ডাকে সাড়া দেয়। এভাবে তারা নয়জন ঐক্যবদ্ধ হয়। কোরআনে সে কথাই বলা হয়েছে: আর সেই শহরে ছিল এমন নয় ব্যক্তি, যারা দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করত এবং কোনো সৎকর্ম করত না। (সূরা নামল: ৪৮)

তারপর এ নয়জন গোটা সম্প্রদায়ের কাছে যায় এবং উটনী হত্যার উদ্যোগের কথা জানায়। এ ব্যাপারে সকলেই তাদেরকে সমর্থন করে। সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। এরপর তারা উটনীর সন্ধানে বের হয়। তারা দেখতে পেল, উটনীটি পানির ঘাট থেকে ফিরে আসছে। মিসরা আগে থেকে থেকে ওঁৎ পেতে বসে ছিল। সে একটা তীর তার দিকে ছুঁড়ে মারে। তীরটি উটনীর পায়ের গোছা ভেদ করে চলে যায়। এদিকে মহিলারা তাদের মুখমণ্ডল আবৃত করে গোটা কবিলার মধ্যে উটনী হত্যার কথা ছড়িয়ে তাদেরকে উৎসাহিত করতে থাকে। কিদার ইবনে সালিফ অগ্রসর হয়ে তলোয়ার দিয়ে আঘাত করে উটনীটির পায়ের গোছার রগ কেটে দেয়। সাথে সাথে উটনীটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে এবং বিকট শব্দে চিৎকার দিয়ে ওঠে। চিৎকারের মাধ্যমে সে তার পেটের বাচ্চাকে সতর্ক করে। কিদার পুনরায় বর্শা দিয়ে উটনীটির বুকে আঘাত করে এবং তাকে হত্যা করে। ওদিকে বাচ্চাটি একটি দুর্গম পাহাড়ে আরোহণ করে তিনবার ডাক দেয়।

আবদুর রাজ্জাক রহ. হাসান থেকে বর্ণিত সনদে বলেন: উটনীটির বাচ্চার ডাক ছিল, হে আমার রব! আমার মা কোথায়? এরপর সে একটি পাথরের মধ্যে প্রবেশ করে অদৃশ্য হয়ে যায়। কারো কারো মতে লোকজন ওই বাচ্চার পশ্চাদ্ধাবন করে তাকেও হত্যা করেছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন: এরপর তারা তাদের এক সঙ্গীকে আহ্বান করল এবং সে এসে উটনীটিকে ধরে হত্যা করল। দেখ, কি কঠোর ছিল আমার শাস্তিও সতর্কবাণী। (সূরা কামার: ২৯-৩০) অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন: 'ওদের মধ্যে যে সর্বাধিক হতভাগ্য, সে যখন তৎপর হয়ে উঠল। তখন আল্লাহর রাসূল বলল, আল্লাহর উটনী ও তার পানি পান করার বিষয়ে সাবধান হও।' অর্থাৎ তোমরা একে ভয় কর। কিন্তু তারা রাসূলকে অস্বীকার করল এবং উটনীটিকেও হত্যা করে ফেলল। "তাদের পাপের জন্যে তাদের প্রতিপালক তাদেরকে সমূলে ধ্বংস করে একাকার করে দিলেন এবং এর পরিণামের জন্য আল্লাহর আশঙ্কা করার কিছু নেই।" (সূরা শামস: ১২-১৫)

ইমাম আহমদ রহ. আবদুল্লাহ ইবনে নুমায়ের রহ. সূত্রে আবদুল্লাহ ইবনে যামআ রাযি. থেকে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার ভাষণ দিতে গিয়ে উটনী ও তার হত্যাকারীর প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছিলেন : "তাদের মধ্যে যে সর্বাধিক হতভাগা সে যখন তাৎপর হয়ে উঠল।" যে লোকটি তৎপর হয়েছিল, সে অত্যন্ত কঠিন, রূঢ় ও কওমের সর্দার। আবু যামআর মতো মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক লিখেছেন, ইয়াযীদ ইবনে মুহাম্মদ আম্মার ইবনে ইয়াসির রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: হে আলী! আমি কি তোমাকে মানব গোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় দুই হতভাগার কথা শুনাব? আলী রাযি, বললেন: বলুন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বললেন: একজন হল ছামূদ সম্প্রদায়ের সেই গৌরবর্ণ লোকটি, যে উটনী হত্যা করেছিল আর দ্বিতীয়জন হল সেই ব্যক্তি, যে তোমার এই স্থানে (অর্থাৎ মস্তকের পার্শ্বে) আঘাত করবে, যার ফলে এটা অর্থাৎ দাড়ি ভিজে যাবে। ইবনে আবু হাতিম রহ. এ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন।

হযরত সালেহ আ.-এর জাতি বলল : "হে সালিহ! তুমি রাসূল হয়ে থাকলে আমাদেরকে যার ভয় দেখাচ্ছ তা আনয়ন কর।" (সূরা আরাফ: ৭৭) এ উক্তির মধ্যে তারা কয়েকটি জঘন্য কুফরী কথা বলেছে। যথা: (১) আল্লাহ যে উটনী তাদের জন্যে নিদর্শনরূপে পাঠিয়েছেন, তাকে কোনো প্রকার কষ্ট দিতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছিলেন। তারা তাকে হত্যা করে আল্লাহ ও রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে। (২) আযাব আনয়নের জন্যে তারা অতি বেশি তাড়াহুড়া করে। এরপর দুই কারণে তারা সে আযাবে গ্রেফতার হয়। (ক) তাদের উপর আরোপিত শর্ত (এক) কোনোরূপ কষ্ট দিও না, অন্যথায় অতি শীঘ্রই আযাব তোমাদেরকে পাকড়াও করবে।)। অন্য এক আয়াতে আছে- ভয়াবহ আযাব, অন্য এক আয়াতে আছে- মর্মন্তুদ আযাব-এর প্রতিটিই যথার্থরূপে দেখা দেয়। (খ) আযাব তাড়াতাড়ি এনে দেওয়ার জন্য তাদের পীড়াপীড়ি করা। (৩) তারা তাদের নিকট প্রেরিত রাসূলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, অথচ তিনি তাঁর নবুয়তের দাবির সত্যতার পক্ষে চূড়ান্ত প্রমাণ দিয়েছেন। কিন্তু তাদের এ হীন মানসিকতা ও আযাবে গ্রেফতার হওয়ার যোগ্যতাই তাদেরকে ভ্রান্তি ও কুফুরী পথে যেতে এবং বিদ্বেষী হয়ে চলতে উদ্বুদ্ধ করে। আল্লাহ তাআলা বলেন: কিন্তু ওরা তাকে বধ করল। ফলে সালেহ বললেন, তোমরা তোমাদের বাড়িতে তিনদিন জীবন উপভোগ করে নাও। এ এমন একটি ওয়াদা, যা মিথ্যা হওয়ার নয়। (সূরা হূদ: ৬৫)

মুফাসসিরগণ লিখেছেন, উটনীটির উপর প্রথম যে ব্যক্তি হামলা করে তার নাম কিদার ইবনে সালিফ (তার প্রতি আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক)। প্রথম আঘাতেই উটনীটির পায়ের গোছা কেটে যায় এবং সে মাটিতে পড়ে যায়। এরপর অন্যরা দৌড়ে গিয়ে তরবারি দ্বারা কেটে উটনীটির দেহ খণ্ড-বিখণ্ড করে। উটনীটির সদ্য প্রসূত বাচ্চা এ অবস্থা দেখে দৌড়ে নিকটবর্তী এক পাহাড়ে গিয়ে ওঠে এবং তিনবার আওয়াজ দেয়। এ জন্য সালেহ আ. তাদের বললেন : (তোমরা তিনদিন পর্যন্ত তোমাদের ঘরবাড়িতে জীবন উপভোগ কর। অর্থাৎ ঘটনার ওইদিন বাদ দিয়ে পরবর্তী তিন দিন। কিন্তু এত কঠোর সতর্কবাণী শুনানো সত্ত্বেও তারা এ কথা বিশ্বাস করল না। বরং ওই রাতেই নবীকেও হত্যা করার ষড়যন্ত্র আঁটল এবং উটনীর মতো তাঁকেও খতম করার পরিকল্পনা করল। "তারা পরস্পরে বলল, আল্লাহর নামে কসম কর! আমরা সালেহ ও তাঁর পরিবারসহ লোকদের উপর রাত্রিবেলায় আক্রমণ চালাব।" অর্থাৎ আমরা তাঁর বাড়িতে হামলা করে সালেহকে তার পরিবার-পরিজনসহ হত্যা করব। পরে তার অভিভাবকরা যদি রক্তপণ চায়, তবে আমরা হত্যা করার কথা অস্বীকার করব। এ কথাই কোরআনে বলা হয়েছে: পরে তার অভিভাবককে বলব, আমরা তার পরিবারের হত্যা প্রত্যক্ষ করি নি।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 সামুদ জাতির ধ্বংসলীলা

📄 সামুদ জাতির ধ্বংসলীলা


যে কয় ব্যক্তি হযরত সালেহ আ. কে হত্যা করতে সংকল্পবদ্ধ হয়, আল্লাহ প্রথম তাদের উপর পাথর নিক্ষেপ করে চূর্ণ-বিচূর্ণ করেন। পরে গোটা সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেন। যে তিনদিন তাদেরকে অবকাশ দেওয়া হয়েছিল, তার প্রথমদিন ছিল বৃহস্পতিবার। এই দিন আসার সাথে সাথে সম্প্রদায়ের সকলের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়। সন্ধ্যা হলে পরস্পর বলাবলি করল, 'জেনে রেখ! নির্ধারিত সময়ের প্রথম দিন শেষ হয়ে গেছে। দ্বিতীয় দিন শুক্রবারে সকলের চেহারা লাল রং ধারণ করে। সন্ধ্যায় তারা বলাবলি করে, শুনে রেখ! নির্ধারিত সময়ের দুদিন কেটে গেছে। তৃতীয়দিন শনিবারে সকলের চেহারা কালো রং ধারণ করে। সন্ধ্যায় তারা বলাবলি করে, জেনে নাও! নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে গেছে। রবিবার সকালে তারা খোশবু লাগিয়ে প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষায় থাকল কী শান্তি ও আযাব-গযব নাযিল হয় তা দেখার জন্যে। তাদের কোনো ধারণাই ছিল না, তাদেরকে কী করা হবে এবং কোন দিক থেকে আযাব আসবে। কিছু সময় পর সূর্য যখন উপরে এসে উজ্জ্বল হয়ে উঠল, তখন আসমানের দিক থেকে বিকট আওয়াজ এলো এবং নিচের দিক থেকে প্রবল ভূকম্পন শুরু হল। সাথে সাথে তাদের প্রাণবায়ু উড়ে গেল। সকল নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেল। শোরগোল স্তব্ধ হল এবং যা সত্য তাই বাস্তবে ঘটে গেল। ফলে সবাই লাশ হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে রইল।

ইতিহাসবিদগণ লিখেছেন, সামুদ সম্প্রদায়ের এ আযাব থেকে একজন মাত্র মহিলা ছাড়া আর কেউই মুক্তি পায় নি। মহিলার নাম কালবা বিনতে সালাকা। ডাকনাম জারিআ। সে ছিল কট্টর কাফের এবং হযরত সালেহ আ.-এর চরম দুশমন। আযাব আসতে দেখেই সে দ্রুত বের হয়ে দৌড়ে এক আরব গোত্রে গিয়ে উঠল। এবং তার সম্প্রদায়ের উপর পতিত যে আযাব সে প্রত্যক্ষ করে এসেছে- তার বর্ণনা দিল। পিপাসায় কাতর হয়ে সে পানি পান করতে চাইল। কিন্তু পানি পান করার সাথে সাথেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। আল্লাহ তা'আলার বাণী: (যেন সেখানে তারা কোনো দিন বসবাস করে নাই।) আল্লাহ তাআলা বলেন: "জেনে রেখ! সামুদ সম্প্রদায় তাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করেছিল। জেনে রেখ! ধ্বংসই হল সামুদ সম্প্রদায়ের পরিণাম।" (সূরা হূদ: ৬৮)

ইমাম আহমাদ হযরত জাবের রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার হিজর উপত্যকা দিয়ে অতিক্রম করার সময় বলেন: তোমরা আল্লাহর নিদর্শন অর্থাৎ মুজিযা দেখার আবদার করো না। সালেহ আ.-এর সম্প্রদায় এরূপ আবদার জানিয়েছিল। সেই নিদর্শনের উটনী এই গিরিপথ দিয়ে পানি পান করার জন্যে যেত এবং পান করার পর এই পথ দিয়েই উঠে আসত। (তারা আল্লাহর হুকুমের অবাধ্য হল ও উটনীটিকে বধ করল)। উটনী একদিন তাদের পানি পান করত এবং তারা একদিন উটনীর দুধ পান করত। পরে তারা উটনীটিকে বধ করে। ফলে এক বিকট আওয়াজ তাদেরকে পাকড়াও করে। এতে সামুদ সম্প্রদায়ের শুধু একজন লোক ব্যতীত আসমানের নিচে তাদের যত লোক ছিল, সবাইকে আল্লাহ ধ্বংস করে দেন। সেই লোকটা হারাম শরিফে অবস্থান করছিল। সঙ্গীরা জিজ্ঞেস করল, কে সেই লোকটা ইয়া রাসুলুল্লাহ। তিনি বললেন, তার নাম আবু রাগাল। পরে হারাম শরিফ থেকে বের হওয়ার পর ওই আযাব তাকে ধ্বংস করে, যে আযাব তার সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছিল। এ হাদীসটি ইমাম মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সংগৃহীত। কিন্তু হাদীসের প্রসিদ্ধ ছয়টি কিতাবের কোনোটিতেই এর কোনো উল্লেখ নেই। আল্লাহ সর্বজ্ঞ।

আবদুর রাজ্জাক রহ. ইসমাইল ইবনে উমাইয়া রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন। একবার নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু রাগালের কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন: তোমরা কি জান, এই কবরবাসী কে? তারা বলল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই সম্যক জানেন। তিনি বললেন, এটা আবু রাগালের কবর। সে সামুদ সম্প্রদায়ের লোক। হারাম শরিফে অবস্থান করছিল। আল্লাহ পাক হারাম শরিফকে আযাব পতিত হওয়া থেকে মুক্ত রেখেছেন। আবু রাগাল যখন হারামের সীমানা থেকে বের হলো, সেই আযাব তাকে ধ্বংস করে দেয়, যে আযাব তার সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছিল। তারপর এখানে তাকে দাফন করা হয় এবং তার সাথে স্বর্ণনির্মিত একটি ডালও দাফন করা হয়। এ কথা শুনে কাফেলার সবাই বাহন থেকে নেমে এসে তরবারি দ্বারা কবর খুঁড়ে স্বর্ণের ডাল বের করে নিয়ে আসে।

আবদুর রাজ্জাক রহ. যুহরি থেকে বর্ণনা করেছেন। আবু রাগালের অপর নাম আবু সাকিফ। বর্ণনার এ সূত্রটি মুরসাল। এ হাদিসটি মুত্তাসিল সনদেও বর্ণিত হয়েছে। যেমন মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক রহ. তাঁর সিরাত গ্রন্থে আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাযি. প্রমুখ থেকে বর্ণনা করেছেন। আবদুল্লাহ রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর তায়েফ গমনের সময় আমরাও সাথে ছিলাম। একটি কবর অতিক্রম করার সময় তিনি বললেন, এটি আবু রাগালের কবর, যাকে আবু সাকিফও বলা হয়। সে সামুদ সম্প্রদায়ের লোক। হারাম শরিফে অবস্থান করায় তার ওপর তাৎক্ষণিকভাবে আযাব আসে নি। পরে যখন হারাম থেকে বেরিয়ে এই স্থানে আসে, তখন সেই আযাব তার উপর পতিত হয়, যে আযাব তার সম্প্রদায়ের উপর পতিত হয়েছিল। এখানেই তাকে দাফন করা হয়। এর প্রমাণ হলো, তার সাথে স্বর্ণের একটি ডালও দাফন করা হয়েছিল। তোমরা তার কবর খুঁড়লে সাথে ওই ডালটিও পাবে। তখনই লোকজন কবরটি খুঁড়ে ডালটি বের করে আনে। আবু দাউদ রহ. মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক রহ. সূত্রে এ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। হাফেজ আবুল হাজ্জাজ মাযযী একে হাসান ও আযিয পর্যায়ের হাদিস বলেছেন।

আমার (ইবনে কাসীর রহ. এর) মতে এ হাদিসটি বুজায়ের ইবনে আবু বুজায়ের একাই বর্ণনা করেছেন। এ হাদিস ব্যতীত অন্য কোনো হাদিসের বর্ণনাকারী হিসেবে তাকে দেখা যায় না। এ ছাড়া ইসমাইল ইবনে উমাইয়া ব্যতীত অন্য কেউ এটা বর্ণনা করেন নি। শায়খ আবুল হাজ্জাজ বলেছেন, এ হাদিসকে মারফু বলা অমূলক। এটা আসলে আবদুল্লাহ ইবনে আমরের উক্তি। তবে পূর্বে বর্ণিত মুরসাল ও জাবের রাযি.-এর হাদিসে এর সমর্থন পাওয়া যায়।

সম্প্রদায়ের ধ্বংসের পর হযরত সালেহ আ. তাঁর সম্প্রদায়ের এলাকা থেকে অন্যত্র যাওয়ার সময় তাদের উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন: "হে আমার সম্প্রদায়! আমার রবের পয়গাম আমি তোমাদের নিকট পৌঁছিয়ে দিয়েছিলাম এবং তোমাদেরকে উপদেশও দিয়েছিলাম"। অর্থাৎ তোমাদের হিদায়াতের জন্যে আমি আমার সাধ্যমত চেষ্টা করেছিলাম। কথা, কাজ ও সদিচ্ছা দিয়ে তা একান্ত ভাবে কামনা করেছিলাম : (কিন্তু হিতাকাঙ্ক্ষীদেরকে তোমরা পছন্দ কর না।) অর্থাৎ সত্য তোমরা কবূল কর নি আর না কবুল করতে প্রস্তুত ছিলে। এ কারনেই আজ তোমরা চিরস্থায়ী আযাবের মধ্যে পড়ে রয়েছ। এখন আমার কিছু করার নেই। তোমাদের থেকে আযাব দূর করার কোনো শক্তি আমার আদৌ নেই। আল্লাহর বাণী পৌছিয়ে দেওয়া ও উপদেশ দেওয়ার দায়িত্বই আমার উপর ন্যাস্ত ছিল। সে দায়িত্ব আমি পালন করেছি। কিন্তু কার্যত সেটাই হয়, যেটা আল্লাহ চান।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও অনুরূপভাবে বদর প্রান্তরে অবস্থিত কূপে নিক্ষিপ্ত নিহত কাফের সরদারদের লাশগুলো সম্বোধন করে ভাষণ দিয়েছিলেন। বদর যুদ্ধে নিহত কুরায়েশ সর্দারকে বদরের কূপে কূপে নিক্ষেপ করা হয়। তিনদিন পর শেষ রাতে ময়দান ত্যাগ করার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উক্ত কূূূূপের নিকট দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, 'হে কূূূূপবাসীরা! তোমাদের সাথে তোমাদের প্রভু যে ওয়াদা করেছিলেন, তার সত্যতা দেখতে পেয়েছ তো? আমার সাথে আমার প্রভুর যে ওয়াদা ছিল, তা আমি পুরোপুরি সত্যরূপে পেয়েছি। 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, "তোমরা হচ্ছ নবীর নিকৃষ্ট পরিজন। তোমরা তো তোমাদের নবীকে মিথ্যুক প্রতিপন্ন করেছ। কিন্তু অন্য লোকেরা আমাকে সত্য বলে স্বীকার করেছে। তোমরা আমাকে দেশ থেকে বের করে দিয়েছ। অন্যরা আমাকে আশ্রয় দিয়েছে। তোমরা আমার বিরুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছ, পক্ষান্তরে অন্যরা আমাকে সাহায্য করেছে, তোমরা তোমাদের নবীর কত জঘন্য পরিজন ছিলে!"

হযরত ওমর রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বললেন : আল্লাহর রাসুল! আপনি এমন একদল লোকের সাথে কথা বলছেন, যারা লাশ হয়ে পড়ে আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, "যে মহান সত্তার হাতে আমার জীবন, তাঁর শপথ করে বলছি আমি যেসব কথাবার্তা বলছি, তা ওদের চেয়ে তোমরা মোটেও বেশি শুনছ না; কিন্তু তারা উত্তর দিচ্ছে না এই যা।"

কথিত আছে, হযরত সালেহ আ. এ ঘটনার পর হারাম শরিফ চলে যান এবং ইনতেকাল পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করেন। ইমাম আহমাদ হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন, বিদায় হজের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন উসফান উপত্যকা অতিক্রম করেন, তখন জিজ্ঞেস করেন: আবু বকর! এটা কোন উপত্যকা? আবু বকর রাযি. বলেন, এটা উসফান উপত্যকা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এ স্থান দিয়ে হুদ ও সালেহ আ. নবীদ্বয় অতিক্রম করেছিলেন। তাদের বাহন ছিল উটনী। লাগাম ছিল খেজুর গাছের ছাল দ্বারা তৈরি রশি। পরনে ছিল জুব্বা এবং গায়ে ছিল চাদর। হজের উদ্দেশ্যে তালবিয়া পড়তে পড়তে তাঁরা আল্লাহর ঘর তওয়াফ করছিলেন। এ হাদিসের সনদ হাসান পর্যায়ের। হযরত নূহ নবীর আলোচনায় তাবারানি থেকে এ হাদিসটি উদ্ধৃত করা হয়েছে। সেখানে হযরত নূহ হুদ ও ইবরাহীম আ.-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 কওমের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর হযরত সালেহ আ.-এর

📄 কওমের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর হযরত সালেহ আ.-এর


একটা ঐতিহাসিক প্রশ্ন, সামুদ সম্প্রদায় যখন ধ্বংস প্রাপ্ত হল, তখন হযরত সালেহ আ. ও তাঁর অনুগামী ঈমানদার লোকেরা কোথায় বসতি স্থাপন করলেন? এ প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিত ও নির্দিষ্টরূপে প্রদান করা অসম্ভব। প্রবল ধারণা হল, তারা কওমের ধ্বংস প্রাপ্তির পর ফিলিস্তিন অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করেন। কেননা হিজর এর নিকটবর্তী এই স্থানটিই এরূপ ছিল, যা সবুজ-সতেজ এবং গৃহপালিত পশুদের দানা-পানির জন্যও উত্তম ছিল। আর ফিলিস্তিন অঞ্চলে এই স্থানটি সম্ভবত 'রামলা' হবে কিংবা অন্য কোনো স্থান। তাফসিরকারকগণ এ প্রশ্নের জওয়াবে কয়েকটি মত পোষণ করেন:
১। তাঁরা ফিলিস্তিনের 'রামলা' নামক স্থানের নিকটে বসতি স্থাপন করেন। তাফসিরে খাযেনে এরূপই উল্লেখ আছে।
২। হাযরা মাউতে বসবাস করেন। এটাই তাদের আদি ও আসল বাসস্থান ছিল। কারণ, এটা আহকাফেরই একটি অংশ। এখানে একটি কবর রয়েছে, যা সালেহ আ.-এর কবর বলে প্রসিদ্ধ।
৩। সামুদ সম্প্রদায় ধ্বংসের পর মক্কা মুআযযামায় এসে এখানেই বাস করতে থাকেন। এখানেই ইনতেকাল করেন। তাঁদের কবর কাবা ঘরের পশ্চিম দিকে হারাম শরিফের মধ্যেই অবস্থিত। সাইয়েদ মাহমুদ আলুসি রহ. তাঁর তাফসিরে রুহুল মাআনিতে উদ্ধৃত করেছেন, হযরত সালেহ আ.-এর ওপর ঈমান আনয়নকারী মুসলমানগণ, যাঁরা তাঁর সাথে আযাব হতে রক্ষিত ছিলেন, তাঁদের সংখ্যা একশ বিশ জন ছিল। আর ধ্বংস প্রাপ্ত সংখ্যা ছিল, প্রায় দেড় হাজার পরিবার।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 কোরআন মাজিদে হযরত সালেহ আ.-এর

📄 কোরআন মাজিদে হযরত সালেহ আ.-এর


বিভিন্নমুখী আলোচনার পর এখন এ ঘটনা সম্বন্ধীয় কোরআন মাজিদের আয়াতগুলো পাঠ করুন। যা উপরে বর্ণিত ঘটনাগুলির প্রকৃত উৎস এবং উপদেশ ও নসিহতের অনুপম রসদ সরবরাহ করছে:

১। "আর (এরূপে) আমি সামুদ সম্প্রদায়ের প্রতি তাদেরই ভাইদের মধ্য হতে সালেহকে প্রেরণ করলাম। সে বলল, হে আমার কওম! আল্লাহ পাকের বন্দেগী কর, তিনি ব্যতীত কোনো মাবুদ নেই। দেখ, তোমাদের প্রতিপালকের তরফ হতে তোমাদের সম্মুখে এক একটি (চরম মীমাংসাকারী) নিদর্শন। অতএব একে স্বাধীনভাবে মুক্ত ছেড়ে দাও। সে খোদার জমিনে যথেচ্ছা বিচরণ করবে। এর কোনো প্রকারের ক্ষতি করো না। তা হলে (এর প্রতিফল স্বরূপ) মারাত্মক প্রাণবিনাশী আযাব এসে তোমাদের পাকড়াও করবে। আর সেই সময়টুকু স্মরণ কর, যখন আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে আদ সম্প্রদায়ের পরে তাদের স্থলবর্তী করেছিলেন এবং এই ভূ-খণ্ডে এমনভাবে বসতি করতে দিয়েছেন, মুক্ত ময়দানেও বাড়ি-ঘর নির্মাণ করেছ এবং পাহাড়সমূহকেও কেটে নিজেদের বাসগৃহ নির্মাণ করেছ, (এটা তোমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ) অতএব আল্লাহ তাআলার নেয়ামতসমূহ স্মরণ কর এবং দেশে অবাধ্যতার সাথে ফাসাদ বিস্তার করো না। কওমের যে সমস্ত নেতৃস্থানীয় লোকের মধ্যে (নিজেদের ধন-সম্পদ ও শক্তি-সামর্থ্যের) অহঙ্কার ছিল, তারা মুমিনদের বলল, আর এই মুমিনগণ এমন লোক ছিল, যাদেরকে (দারিদ্র্য ও নিরাশ্রয়তার দরুন) দুর্বল ও হীন মনে করা হতো। তোমরা কি সত্যিকারভাবেই জেনে নিয়েছ, সালেহ খোদার প্রেরিত? (অর্থাৎ আমরা তো তাঁর মধ্যে এমন কোনো বিষয় দেখতে পাই না!) তারা বললঃ হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে তিনি যেই সত্যের পয়গামসহ প্রেরিত হয়েছেন, আমরা তার উপর পূর্ণ ঈমান রাখি। এতে অহঙ্কারীরা বলল, তোমরা যে বিষয়ের উপর ঈমান এনেছ, আমরা তা অবিশ্বাস করি। তারা উটনীটিকে হত্যা করে ফেলল এবং নিজেদের প্রতিপালকের নির্দেশ অমান্য করল ও অবাধ্য হলো। তারা বলল, হে সালেহ! যদি তুমি বাস্তবিকই পয়গম্বরদের মধ্য হতে হও, তবে সেই বিষয়টি আমাদের ওপর এনে দেখাও, যে বিষয়ের তুমি আমাদেরকে ভয় প্রদর্শন করেছিলে। এরপর প্রকম্পিতকারী ভয়াবহ বস্তু এসে তাদেরকে পাকড়াও করল। যখন তাদের উপর সকাল হলো, তখন তারা সবাই (মৃত অবস্থায়) উপুড় হয়ে পড়ে ছিল। এরপর সালেহ আ. তাদের থেকে সরে গেলেন। (এবং মৃতলাশসমূহকে লক্ষ্য করে) বললেন, হে আমার কওম! আমি আমার প্রতিপালকের পয়গাম তোমাদের পৌঁছিয়ে দিয়েছি, কিন্তু তোমাদের জন্য আফসোস! তোমরা নসিহতকারীদের পছন্দ করতে না। (সূরা আরাফ: ৭৩-৭৯)

২। "আর আমি কওমে সামুদের প্রতি তাদের ভাইগণের মধ্য হতে সালেহকে প্রেরণ করলাম। সে (কওমের নিকট গিয়ে) বলল, হে আমার কওম! আল্লাহ তাআলার বন্দেগী করো। তিনি ব্যতীত অন্য কেউই তোমাদের মাবুদ নয়। তিনিই সেই সত্তা, যিনি তোমাদেরকে মাটি হতে সৃষ্টি করেছিলেন এবং এই মাটিতেই তোমাদেরকে বসতি করতে দিয়েছেন। অতএব তোমাদের উচিত তাঁর সমীপে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং তাঁর দিকে রুজু হয়ে থাকা। দৃঢ় বিশ্বাস রাখ, আমার প্রতিপালক (প্রত্যেকের) নিকট রয়েছে এবং (প্রত্যেকের) প্রার্থনাসমূহের জবাব দিতেছেন। সেই লোকেরা বলল, হে সালেহ! পূর্বে তো তুমি এমন একজন লোক ছিলে, আমাদের সকলেরই আশা ভরসা তোমার সাথে সম্পৃক্ত ছিল। তুমি কি আমাদেরকে সেসমস্ত মাবুদের পূজা থেকে বারণ করছ, যাদেরকে আমাদের পূর্ব-পুরুষেরা পূজা-আরাধনা করে আসছে? (এ কেমন কথা?) এ কথার প্রতি তো আমাদের ঘোরতর সন্দেহ রয়েছে, যার প্রতি তুমি আমাদের আহ্বান করছ। আমাদের অন্তরে প্রত্যয় হচ্ছে না। সালেহ আ. বললেন: হে আমার কওম! তোমরা কি এটাও ভেবে দেখেছ, আমি যদি আমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এক উজ্জ্বল প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকি আর তিনি নিজ হতে আমাকে রহমত দান করে থাকেন, তবে এমন কে আছে, যে আল্লাহর (আযাবের) মুকাবিলায় আমাকে সাহায্য করে- যদি আমি তাঁর হুকুমের নাফরমানি করি? তোমরা (নিজেদের বাসনানুযায়ী কাজের প্রতি আহ্বান করে) আমার কোনো উপকার করছ না; ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে চাচ্ছ। আর হে আমার কওম! এটা আল্লাহ তাআলার উটনী তোমাদের জন্য একটি মীমাংসাকারী নিদর্শন। অতএব একে ছেড়ে দাও! আল্লাহর জমিনে বিচরণ করুক একে কোনো প্রকার কষ্ট দিও না। অন্যথায় তাৎক্ষণিক আযাব এসে তোমাদের পাকড়াও করবে। কিন্তু লোকেরা (আরো অধিক হঠকারিতা করে) একে হত্যা করে ফেলল। তখন সালেহ আ. বললেন, (এখন তোমাদের জন্য শুধু) তিন দিনের অবকাশ, নিজেদের ঘরে থেকে পানাহার করে নাও। এটা আল্লাহর ওয়াদা, কখনও মিথ্যা হবে না। এরপর যখন আমার নির্ধারিত বিষয়ের সময় আসল, তখন আমি সালেহকে এবং ওই সমস্ত লোককে, যারা সালেহ-এর সাথে ঈমান আনয়ন করেছিলেন, নিজের রহমতে রক্ষা করলাম এবং সেই দিনের অপমান হতে মুক্তি দিলাম। হে পয়গম্বর! আপনার প্রতিপালকই হচ্ছেন যিনি মহাক্ষমতাশালী (এবং) সর্বজয়ী। আর যারা জুলুম (অর্থাৎ কুফর) করেছিল, তাদের এরূপ অবস্থা হলো, একদিন বজ্রধ্বনি এসে তাদেরকে পাকড়াও করল। যখন ভোর হলো, তখন সকলে নিজেদের ঘরে উপুড় হয়ে (মৃত অবস্থায়) পড়ে রইল (তারা হঠাৎ করে এমনভাবে মরে রইল; যেন সে সমস্ত ঘরে তারা কোনো দিন বাসই করে নি)। জেনে রাখ, নিশ্চয় সামুদ জাতি তাদের রবের সঙ্গে কুফরি করেছে। জেনে রাখ, সামুদ জাতির জন্য রয়েছে ধ্বংস। (সূরা হূদ: ৬১-৬৮)

৩। "আর দেখ, হিজরের লোকেরাও রাসূলগণকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করল। আমি আমার নিদর্শনসমূহ তাদের দেখালাম। কিন্তু তারা (সত্য হতে) মুখ ফিরাতেই থাকল। তারা পাহাড় কেটে গৃহ নির্মাণ করত। যেন সুরক্ষিত থাকে; কিন্তু (এ সুরক্ষা কোনো কাজ দিলো না।) একদিন ভোরে এক ভয়ঙ্কর ও বিকট ধ্বনি এসে তাদেরকে পাকড়াও করল। (এবং সকলে নিজ গৃহে ধ্বংস হয়ে গেল।) আর তারা নিজেদের চেষ্টা তদবীর দ্বারা যা-কিছু উপার্জন করেছিল, তা তাদের কোনোই কাজে এলো না।" (সূরা হিজর: ৮০-৮৩)

৪। সামুদ সম্প্রদায় পয়গম্বরগণকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করল। যখন তাদের ভাই সালেহ আ. তাদেরকে বললেন, "তোমরা কি ভয় কর না? আমি তোমাদের প্রতি বিশ্বস্ত পয়গম্বর। অতএব আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার কথা মান্য কর। আর আমি এই কাজের জন্য তোমাদের নিকট হতে কোনো পারিশ্রমিক দাবি করছি না। আমার বিনিময় তো রাব্বুল আলামিনের হাতে রয়েছে। তোমাদেরকে কি ইহলোকের এ সমস্ত বস্তুর মধ্যে নিরাপদে ছেড়ে রাখা হবে? উদ্যান ও ঝরণায়, আর ক্ষেত-খামার ও কোমল শীষবিশিষ্ট খেজুর বাগানে? আর তোমরা পাহাড়গুলো কেটে জাঁকজমকপূর্ণ বাসগৃহ নির্মাণ করছ। অতএব আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার কথা মানো। আর এই বেপরোয়া লোকদের কথা মান্য কর না, যারা দেশে ফাসাদ বিস্তার করছে এবং সংশোধন করে না। তারা (পয়গম্বরকে) বলল, তোমার উপর তো কেউ যাদু করেছে। তুমিও তো আমাদের মতো একজন মানুষই। অতএব (নিজের নবুয়তের) নিদর্শন আনুয়ন কর। যদি সত্যবাদী হও। (সালেহ আ.) বললেন, এই একটি উটনী। এর জন্য পানি পান করার একটি পালা আর তোমাদের জন্য একটি পালা এক নির্দিষ্ট দিনে। আর একে বিরক্ত কর না অন্যায়ভাবে, অন্যথায় তোমাদেরকে এক কঠিন দিবসের আযাব এসে পাকড়াও করবে। এরপর তারা এর পা কেটে (হত্যা করে) ফেলল, অনন্তর পরের দিন অনুতাপ করতে লাগল। তৎক্ষণাৎ আযাব এসে তাদের পাকড়াও করল। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শন রয়েছে। আর তাদের মধ্যে অধিকাংশ লোকই ঈমান আনয়ন করে না। আর নিঃসন্দেহ আপনার রবই মহা শক্তিমান (এবং) দয়ালু। (সূরা শুআরা: ১৪১-১৫৯)

৫। আমি সামুদ সম্প্রদায়ের প্রতি তাদের ভাই সালেহ আ. কে প্রেরণ করলাম (তিনি সেখানে গিয়ে বললেন,) আল্লাহ তাআলার বন্দিগি কর। এরপর তারা দুই দলে বিভক্ত হয়ে ঝগড়া করতে লাগল। সালেহ আ. বললেন, হে আমার কওম! তোমরা কেন তাড়াতাড়ি কামনা করছ মঙ্গলের পূর্বে অমঙ্গলকে। অপরাধ কেন ক্ষমা করিয়ে নাও না আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে। হয়তো তোমাদের প্রতি রহমত হয়ে যাবে। (কওম) বলল, আমরা তোমার ও তোমার সঙ্গীদের থেকে অশুভ পদক্ষেপ দেখছি। তিনি বললেন, তোমাদের বদ কিসমত (দুর্ভাগ্য) আল্লাহর নিকট রয়েছে। তোমাদের কথা ঠিক নয় বরং তোমাদের পরীক্ষা করা হচ্ছে। আর সেই শহরে নয়জন লোক ছিল, যারা দেশে ফাসাদ বিস্তার করত; ভালো কাজ করত না। তারা বলাবলি করল, "আল্লাহর নামে কসম কর, অবশ্যই আমরা রাত্রিযোগে তাকে ও তার পরিবারবর্গকে আক্রমণ করব। এরপর তার খুনের বদলা দাবিকারীকে বলব, আমরা দেখি নাই কখন তার পরিবার ধ্বংস হয়েছে এবং আমরা সত্যই বলছি। আর তারা এক গোপন ষড়যন্ত্র করল। আমিও এক গোপন ষড়যন্ত্র করলাম। তারা তা টেরই পেল না। এরপর দেখে নাও, তাদের সেই ষড়যন্ত্রের পরিণাম ফল কেমন হল! আমি ধ্বংস করে দিলাম তাদেকে এবং তাদের কওমের সকলকে। অতএব এই দেখ, তাদের কুফরের দরুন তাদের বাসগৃহসমূহ বিধ্বস্ত অবস্থায় পতিত রয়েছে। অবশ্যই এর মধ্যে সেসমস্ত লোকের জন্য নিদর্শন রয়েছে যারা জ্ঞানী। আর আমি রক্ষা করলাম তাদেরকে, যারা ঈমান এনেছিল এবং (অবাধ্যচারণ থেকে) আত্মরক্ষা করেছিল। (সূরা নামল: ৪৫-৫৩)

৬. "আর সামুদ গোত্রকে আমি পথপ্রদর্শন করলাম। এরপর তারা পথ দেখার চেয়ে অন্ধ থাকাকেই পছন্দ করল। অনন্তর তাদের অর্জিত কর্মের প্রতিফল স্বরূপ অপমানকর শাস্তির বজ্রধ্বনি এসে তাদেরকে পাকড়াও করল। আর যারা ঈমান আনয়ন করেছিল এবং (অপকর্ম থেকে) আত্মরক্ষা করেছিল, আমি তাদেরকে নাজাত দিলাম।" (সূরা হা-মীম সাজদা: ১৭-১৮)

৭। আর নিদর্শন রয়েছে সামুদ সম্প্রদায়ের মধ্যে। যখন তাদেরকে বলা হল, এক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত উপভোগ করে নাও। এরপর তারা রবের আদেশ লঙ্ঘন করতে লাগল। অনন্তর তাদেরকে বজ্রধ্বনি এসে পাকড়াও করল এবং তারা তা দেখছিল। এরপর দাঁড়াতে বা উঠতে সক্ষম হল না এবং প্রতিশোধ নেওয়ারও ক্ষমতা হল না। (সূরা যারিয়াহ : ৪৩-৪৫)

৮। আর এই যে, তিনি প্রথম আদ সম্প্রদায়কে ধ্বংস করে দিলেন এবং সামূদকেও। এরপর (তাদের) কাউকেও অবশিষ্ট রাখলেন না। (সূরা নাজম ৫০-৫১)

৯। সামুদ সম্প্রদায় ভয় প্রদর্শনকারী (রাসূল) দের মিথ্যা প্রতিপন্ন করল। অনন্তর বলল, আমাদেরই মধ্য হতে একজন মাত্র লোক, আমরা সকলে তারই অনুসরণ করব? তা হলে তো আমরা বিভ্রান্তিতে পতিত হলাম এবং আগুনের প্রতি ঝুঁকলাম। আমাদের সকলের মধ্যে কি তারই উপর নসিহত নাযিল হল? (আমাদের মধ্য হতে আর কেউ কি এর উপযুক্ত নেই?) এ ব্যক্তি বড় মিথ্যাবাদী, শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করছে। আগামীকাল তারা জানতে পারবে, কে মিথ্যা গর্ব প্রকাশকারী। আমি তাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য উটনী পাঠাচ্ছি। অতএব (হে নবী!) তাদের জন্য অপেক্ষা কর এবং ধৈর্যধারণ করতে থাক। আর তাদেরকে শুনিয়ে দাও, পানি পান করার জন্য তাদের মধ্যে পালা বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকে নিজ নিজ পালাক্রমে পানির নিকট হাজির হবে। অনন্তর তারা নিজেদের (বন্ধু বা সাথী) কে ডাকল। এরপর হাত চালাল এবং (উটনীটিকে) হত্যা করে ফেলল। অনন্তর কেমন হল আমার আযাব ও ভয় প্রদর্শন? আমি তাদের প্রতি প্রেরণ করলাম এক (ভয়ঙ্কর) গর্জন। এরপর তারা পদদলিত (পুরাতন) কাঁটার বেড়ার মতো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়ে রইল। আর আমি বুঝার জন্য কোরআনকে সহজ করে দিয়েছি। এরপর আছে কি কেউ চিন্তাশীল (ও উপদেশ গ্রহণকারী)? (সূরা কামার: ২৩-৩২)

১০। সামুদ ও আদ সম্প্রদায় সজোরে আঘাতকারী (কেয়ামত) কে অস্বীকার করেছিল। আর সামুদ সম্প্রদায়, তাদেরকে বিকট শব্দ দ্বারা ধ্বংস করা হয়েছিল। (সূরা হাককা: ৪-৫)

১১। সামুদ সম্প্রদায় (নবী ও নবীর মোজেযাকে) মিথ্যা প্রতিপন্ন করল দুষ্কর্মহেতু। যখন তাদের মধ্যকার (সর্বাপেক্ষা অধিক) হতভাগ্য ব্যক্তি (উটনীকে হত্যা করার জন্য) উত্তেজিত হয়ে উঠল, তখন আল্লাহর রাসূল তাদেরকে (সতর্ক করে) বললেন: আল্লাহর উটনীর ব্যাপারে সতর্ক থাক এবং এর পানি পান করার পালা সম্পর্কে। কিন্তু তারা নবীকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করল। তারপর এর পা কেটে ফেলল। এরপর তাদের পাপের দরুন তাদের প্রতিপালক তাদেরকে ধ্বংস করে দিলেন। অনন্তর সকলকে সমান করে দিলেন। আর আল্লাহ পাক বদলা নিতে ভয় করেন না। (সূরা আশ্-শামস: ১১-১৫)

ফন্ট সাইজ
15px
17px