📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 সামুদ জাতির জবাব

📄 সামুদ জাতির জবাব


আমার প্রতিপালক নিকটেই আছেন। তিনি তওবা কবুল করবেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। তারা বলল, হে সালেহ! ইতোপূর্বে তোমার উপর আমাদের বড় আশা ছিল। অর্থাৎ তোমার এই জাতীয় কথাবার্তা বলার পূর্বে আমাদের আশা ছিল, তুমি একজন প্রজ্ঞাবান লোক হবে। কিন্তু আমাদের সে আশা ভুলুণ্ঠিত হল, এখন তুমি আমাদেরকে এক আল্লাহর ইবাদত করতে, আমরা যে দেবতাদের পূজা করছি সেগুলো বর্জন করতে এবং বাপ-দাদার ধর্ম ত্যাগ করতে বলছ! আমাদের বাপ-দাদারা যাদের পূজা করত, তুমি কি আমাদেরকে তাদের পূজা করতে নিষেধ করছ? তুমি আমাদেরকে যে আহবান জানাচ্ছ, তাতে আমরা বিভ্রান্তিকর সন্দেহ পোষণ করি। সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা কি ভেবে দেখেছ আমি যদি আমার প্রতিপালক প্রেরিত স্পষ্ট প্রামাণসহ প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকি আর তিনি যদি আমাকে তাঁর নিজ অনুগ্রহ দান করে থাকেন, তারপর আমি যদি তাঁর অবাধ্যতা করি, তবে তাঁর শাস্তি থেকে আমাকে কে রক্ষা করবে? তোমরা তো কেবল আমার ক্ষতিই বাড়িয়ে দিচ্ছ। (সূরা হূদ: ৬২-৬৩)

এ হচ্ছে হযরত সালেহ আ.-এর কোমল ভাষা ব্যবহার ও সৌজন্যমূলক আচরণের মাধ্যমে তাদেরকে কল্যাণের পথে আহ্বান। অর্থাৎ তোমাদের কি ধারণা, যদি আমি তোমাদেরকে যেদিকে আহ্বান জনাচ্ছি, তা প্রকৃতপক্ষে সত্য হয়ে থাকে, তবে আল্লাহর নিকট তোমাদের কি ওজর থাকবে এবং তখন তোমাদেরকে কী-সে মুক্তি দিবে? অথচ তোমরা আমাকে আল্লাহর দিকে দাওয়াতের কাজ পরিহার করতে বলছ আর তা কোনোক্রমেই আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কেননা এটি আমার অপরিহার্য কর্তব্য। আমি যদি তা ত্যাগ করি, তবে তাঁর পাকড়াও থেকে না তোমরা আমাকে বাঁচাতে পারবে, না অন্য কেউ, না কেউ আমাকে সাহায্য করতে সক্ষম হবে। সুতরাং তোমাদের ও আমার মধ্যে আল্লাহর ফয়সালা আসার পূর্ব পর্যন্ত আমি এক আল্লাহর দিকে আহ্বান করতে থাকব। সালেহ আ. কে তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা বলল: "তুমি তো একজন জাদুগ্রস্ত লোক"। অর্থাৎ তোমার উপর জাদুর প্রভাব পড়েছে, তাই সকল দেবতাকে বাদ দিয়ে এক আল্লাহর ইবাদত করার জন্যে তুমি যে আমাদের আহ্বান জানাচ্ছ। তাতে কী বলছ তা তুমি নিজেই বুঝতে পারছ না। আলেমগণ مُسَخَّرِينَ অর্থ করেছেন জাদুকর। তারা বলছে, তুমি একজন মানুষ। তোমার জাদু জানা আছে। তবে প্রথম অর্থই অধিকতর স্পষ্ট। কেননা পরেই তাদের কথা আসছে, তারা বলেছে: তুমি তো আমাদের মতোই মানুষ। তুমি কোনো একটা নিদর্শন নিয়ে আসো, যদি তুমি সত্যবাদী হয়ে থাক। তারা নবীর কাছে দাবি জানায়, যে কোনো একটা অলৌকিক জিনিস দেখিয়ে তিনি যেন নিজের দাবির সত্যতার পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপিত করেন।

সালেহ আ. বললেন: এই উটনী, এর জন্যে আছে পানি পানের পালা এবং তোমাদের জন্য আছে পানি পানের পালা, নির্দিষ্ট এক এক দিনের। তোমরা একে কোনো কষ্ট দিও না, তা হলে তোমাদেরকে মহা দিবসের আযাব পাকড়াও করবে। (সূরা শুআরা: ১৫৩) আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেন: তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে স্পষ্ট নিদর্শন এসেছে। আল্লাহর এ উটনী তোমাদের জন্যে একটি নিদর্শন। অতএব, একে আল্লাহর জমিন চরে খেতে দাও। একে কোনো ক্লেশ দিও না; দিলে মর্মন্তুদ শাস্তি তোমাদের উপর আপতিত হবে। (সূরা আরাফ: ৭৩)

আল্লাহর বাণী: "আমি শিক্ষাপ্রদ নিদর্শনস্বরূপ ছামূদ জাতিকে উটনী দিয়েছিলাম। কিন্তু ওরা তার প্রতি জুলুম করেছিল।" (সূরা বনি ইসরাইল: ৫৯)

মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেন, সামুদ সম্প্রদায়ের লোকেরা একবার এক স্থানে সমবেত হয়। ওই সমাবেশে আল্লাহর নবী হযরত সালেহ আ. আগমন করেন। তিনি তাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান জানান, উপদেশ দান করেন, ভীতি প্রদর্শন করেন, নসিহত করেন এবং তাদেরকে সৎ কাজের নির্দেশ দেন। উপস্থিত লোকজন তাঁকে বলল: ওই যে একটা পাথর দেখা যায়, ওর মধ্য থেকে যদি অমুক অমুক গুণসম্পন্ন একটি দীর্ঘকায় দশ মাসের গর্ভবতী উটনী বের করে দেখাতে পার, তবে দেখাও। সালেহ আ. বললেন: তোমাদের বর্ণিত গুণসম্পন্ন উটনী যদি আমি বের করে দিই, তা হলে কি তোমরা আমার আনীত দীন ও আমার নবুয়তের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে? তারা সবাই বলল: হ্যাঁ, বিশ্বাস করব। তখন তিনি এ কথার উপর তাদের থেকে অঙ্গীকার ও প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেন। এরপর সালেহ আ. নামায আদায়ের জন্যে দাঁড়িয়ে যান এবং নামায শেষে আল্লাহর নিকট তাদের আবদার পূরণ করার জন্য দোয়া করেন। আল্লাহ ওই পাথরকে ফেঁটে গিয়ে অনুরূপ গুণসম্পন্ন একটি উটনী বের করে দেওয়ার নির্দেশ দেন। যখন তারা স্বচক্ষে এরূপ উটনী দেখতে পেল, তখন তারা সত্যি সত্যি এক বিস্ময়কর বিষয়, ভীতিপ্রদ দৃশ্য, সুস্পষ্ট কুদরত ও চূড়ান্ত প্রমাণই প্রত্যক্ষ করল। এ দৃশ্য দেখার পর উপস্থিত বহু লোক ঈমান আনল বটে, কিন্তু অধিকাংশ লোকই তাদের কুফুরী, গুমরাহী ও বিরোধিতার উপর অটল থাকল।

এ জন্যেই কুরআনে বলা হয়েছে: فَظَلَمُوا بِهَا (তারা তার সাথে জুলুম করল) অর্থাৎ তাদের অধিকাংশই মানতে অস্বীকার করল এবং সত্যকে গ্রহণ করল না। যারা ঈমান এনেছিল, তাদের প্রধান ছিল জানদা ইবনে মুহাল্লাত ইবনে লবীদ ইবনে জুওয়াস। সে ছিল সামুদ সম্প্রদায়ের অন্যতম নেতা। সম্প্রদায়ের অবশিষ্ট শীর্ষ স্থানীয় ব্যক্তিবর্গও ইসলাম গ্রহণে উদ্যত হয়। কিন্তু তিন ব্যক্তি তাদেরকে তা থেকে বিরত রাখে। তারা হল (১) যাওয়াব ইবনে উমর ইবনে লবীদ (২) খাববাব। এ দুইজন ছিল তাদের ধর্মগুরু। (৩) রাবার ইবনে সামআর ইবনে জালমাস। জানদা ইসলাম গ্রহণ করার পর আপন চাচাত ভাই শিহাব ইবনে খলীফাকে ঈমান আনার জন্যে আহ্বান জানায়। সে-ও ছিল সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় লোক। তার ইসলাম গ্রহণ করার জন্যে মিহরাশ ইবনে গানামা ইবনে যুমায়ল নামক জনৈক মুসলমান কবি তাঁর কবিতায় বলেন:

"আমার পরিবারের একদল লোক শিহাবকে নবীর দীন কবুল করার জন্যে আহ্বান জানায়। এরা সকলেই সামুদ সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট লোক। শিহাবও সে আহ্বানে সাড়া দিতে আগ্রহী হয়। যদি সে সাড়া দিত তা হলে নবী সালেহ আ. আমাদের মাঝে বিপুল ক্ষমতার অধিকারী হয়ে যেত। জুওয়াব তার সঙ্গীর সাথে সুবিচার করে নি বরং হিজর উপত্যকার কতিপয় নির্বোধ লোক আলোর পথ দেখার পরেও মুখ ফিরিয়ে থাকে।"

উল্লেখ্য, হযরত সালেহ আ. যে তাদের বললেন: "এটি আল্লাহর উটনী, তোমাদের জন্যে নিদর্শন"। এখানে আল্লাহর উটনী শব্দটি বলা হয়েছে উটনীটির মর্যাদা নির্দেশের উদ্দেশ্যে। যেমন: বলা হয় আল্লাহর ঘর, আল্লাহর বান্দা, তোমাদের জন্যে নিদর্শন। অর্থাৎ আমি তোমাদের কাছে যে দাওয়াত নিয়ে এসেছি, এটা তার সত্যতার প্রমাণ। 'একে আল্লাহর জমিনে চরে খেয়ে বেড়াতে দাও এবং এর অনিষ্ট করো না। অন্যথায় এক নিকটবর্তী আযাব তোমাদেরকে পাকড়াও করবে।' এ ঘোষণার পর এ উটনীটি তাদের মধ্যে স্বাধীনভাবে যেখানে ইচ্ছা চরে বেড়াত। একদিন পর পর পানির ঘাটে অবতরণ করত। যেদিন সে পানি পান করত, সেদিন কূপের সমস্ত পানি নিঃশেষ করে ফেলত। তাই সম্প্রদায়ের লোকেরা তাদের পালার দিনে পরের দিনের জন্যে প্রয়োজনীয় পানি উত্তোলন করে রাখত। কথিত আছে, সম্প্রদায়ের লোকজন এ উটনীটির দুধ পর্যাপ্ত পরিমাণ পান করত।

(আমি এ উটনী পাঠিয়েছি তাদের পরীক্ষার জন্যে) পরীক্ষা ছিল, তারা কি এতে ঈমান আনে, না- কি কুফরী করে। আর প্রকৃতপক্ষে তারা কি করবে, তা আল্লাহই ভালো জানেন। (অতএব, তুমি তাদের আচরণের প্রতি লক্ষ রাখ।) এবং প্রতীক্ষায় থাক (এবং ধৈর্যধারণ কর) তাদের থেকে যে কষ্ট আসে তা সহ্য কর। অচিরেই তোমার নিকট সুস্পষ্ট খবর এসে পড়বে। সুতরাং কোরআনের অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে: (এবং তাদের জানিয়ে দাও, তাদের মধ্যে পানি বণ্টন নির্ধারিত এবং পানির অংশের জন্যে প্রত্যেকে উপস্থিত হবে পালাক্রমে। (সূরা কামার: ২৭-২৮)

দীর্ঘ দিন যাবত এ অবস্থা চলতে থাকায় সম্প্রদায়ের লোকেরা অধৈর্য হয়ে পড়ে। এর থেকে নিষ্কৃতি লাভের জন্যে তারা একদিন এক স্থানে সমবেত হয়ে পরামর্শ করে। তারা সম্মিলিতভাবে এই সিদ্ধান্ত করে, উটনীটিকে হত্যা করবে। ফলে তারা উটনীটির কবল থেকে নিষ্কৃতি পাবে এবং সমস্ত পানির উপর পূর্ণ কর্তৃত্ব তাদের প্রতিষ্ঠিত হবে। শয়তান তাদেরকে এ কাজের যুক্তি ও সুফল প্রদর্শন করল। আল্লাহ তাআলা বলেন: এরপর তারা সেই উটনীটি বধ করে এবং আল্লাহর আদেশ অমান্য করে এবং বলে: হে সালেহ, তুমি রাসূল হয়ে থাকলে আমাদেরকে যে ভয় দেখাচ্ছ, তা নিয়ে এসো। (সূরা আরাফ: ৭৭)

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 উটনী হত্যাকারী

📄 উটনী হত্যাকারী


যে লোক উটনী হত্যার দায়িত্ব গ্রহণ করে তার নাম কিদার ইবনে সালিফ ইবনে জানদা। সে ছিল সম্প্রদায়ের অন্যতম নেতা। সে ছিল গৌরবর্ণ, নীলচোখ ও পিঙ্গল চুল বিশিষ্ট। কথিত মতে সে ছিল সালিফ এর জারজ সন্তান। সায়বান নামক এক ব্যক্তির ঔরসে তার জন্ম হয়। কিদার একাই হত্যা করলেও যেহেতু সম্প্রদায়ের সকলের ঐকমত্যে কাজটি করেছিল তাই হত্যা করার দায়িত্ব সবার প্রতি আরোপিত হয়েছে।

ইবেন জারীর রহ. প্রমুখ মুফাসসির লিখেছেন: সামুদ সম্প্রদায়ের দুই মহিলা একজনের নাম সাদুক। সে মাহয়া ইবনে যুহায়র ইবনে মুখতারের কন্যা এবং প্রচুর ধন-সম্পদ ও বংশীয় গৌরবের অধিকারী। তার স্বামী ইসলাম গ্রহণ করে। ফলে স্ত্রী তাকে ত্যাগ করে এবং নিজের চাচাত ভাই মিসরা ইবনে মিহরাজ ইবনে মাহয়াকে বলে, যদি তুমি উটনীটি হত্যা করতে পার, তবে তোমাকে আমি বিবাহ করব। অপর মহিলাটি ছিল বৃদ্ধা এবং কাফির। তার স্বামী ছিল সম্প্রদায়ের অন্যতম সর্দার যুওয়াব ইবনে আমর। এই স্বামীর ঔরসে তার চারটি কন্যা ছিল। মহিলাটি কিদার ইবনে সালিফকে প্রস্তার দেয়, সে যদি উটনীটি হত্যা করতে পারে, তবে তার এ চার কন্যার মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা বিয়ে করতে পারবে। তখন ওই যুবকদ্বয় উটনী হত্যার দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং সম্প্রদায়ের লোকদের সমর্থন লাভের চেষ্টা চালায়। সে মতে অপর সাত ব্যক্তি তাদের ডাকে সাড়া দেয়। এভাবে তারা নয়জন ঐক্যবদ্ধ হয়। কোরআনে সে কথাই বলা হয়েছে: আর সেই শহরে ছিল এমন নয় ব্যক্তি, যারা দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করত এবং কোনো সৎকর্ম করত না। (সূরা নামল: ৪৮)

তারপর এ নয়জন গোটা সম্প্রদায়ের কাছে যায় এবং উটনী হত্যার উদ্যোগের কথা জানায়। এ ব্যাপারে সকলেই তাদেরকে সমর্থন করে। সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। এরপর তারা উটনীর সন্ধানে বের হয়। তারা দেখতে পেল, উটনীটি পানির ঘাট থেকে ফিরে আসছে। মিসরা আগে থেকে থেকে ওঁৎ পেতে বসে ছিল। সে একটা তীর তার দিকে ছুঁড়ে মারে। তীরটি উটনীর পায়ের গোছা ভেদ করে চলে যায়। এদিকে মহিলারা তাদের মুখমণ্ডল আবৃত করে গোটা কবিলার মধ্যে উটনী হত্যার কথা ছড়িয়ে তাদেরকে উৎসাহিত করতে থাকে। কিদার ইবনে সালিফ অগ্রসর হয়ে তলোয়ার দিয়ে আঘাত করে উটনীটির পায়ের গোছার রগ কেটে দেয়। সাথে সাথে উটনীটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে এবং বিকট শব্দে চিৎকার দিয়ে ওঠে। চিৎকারের মাধ্যমে সে তার পেটের বাচ্চাকে সতর্ক করে। কিদার পুনরায় বর্শা দিয়ে উটনীটির বুকে আঘাত করে এবং তাকে হত্যা করে। ওদিকে বাচ্চাটি একটি দুর্গম পাহাড়ে আরোহণ করে তিনবার ডাক দেয়।

আবদুর রাজ্জাক রহ. হাসান থেকে বর্ণিত সনদে বলেন: উটনীটির বাচ্চার ডাক ছিল, হে আমার রব! আমার মা কোথায়? এরপর সে একটি পাথরের মধ্যে প্রবেশ করে অদৃশ্য হয়ে যায়। কারো কারো মতে লোকজন ওই বাচ্চার পশ্চাদ্ধাবন করে তাকেও হত্যা করেছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন: এরপর তারা তাদের এক সঙ্গীকে আহ্বান করল এবং সে এসে উটনীটিকে ধরে হত্যা করল। দেখ, কি কঠোর ছিল আমার শাস্তিও সতর্কবাণী। (সূরা কামার: ২৯-৩০) অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন: 'ওদের মধ্যে যে সর্বাধিক হতভাগ্য, সে যখন তৎপর হয়ে উঠল। তখন আল্লাহর রাসূল বলল, আল্লাহর উটনী ও তার পানি পান করার বিষয়ে সাবধান হও।' অর্থাৎ তোমরা একে ভয় কর। কিন্তু তারা রাসূলকে অস্বীকার করল এবং উটনীটিকেও হত্যা করে ফেলল। "তাদের পাপের জন্যে তাদের প্রতিপালক তাদেরকে সমূলে ধ্বংস করে একাকার করে দিলেন এবং এর পরিণামের জন্য আল্লাহর আশঙ্কা করার কিছু নেই।" (সূরা শামস: ১২-১৫)

ইমাম আহমদ রহ. আবদুল্লাহ ইবনে নুমায়ের রহ. সূত্রে আবদুল্লাহ ইবনে যামআ রাযি. থেকে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার ভাষণ দিতে গিয়ে উটনী ও তার হত্যাকারীর প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছিলেন : "তাদের মধ্যে যে সর্বাধিক হতভাগা সে যখন তাৎপর হয়ে উঠল।" যে লোকটি তৎপর হয়েছিল, সে অত্যন্ত কঠিন, রূঢ় ও কওমের সর্দার। আবু যামআর মতো মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক লিখেছেন, ইয়াযীদ ইবনে মুহাম্মদ আম্মার ইবনে ইয়াসির রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: হে আলী! আমি কি তোমাকে মানব গোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় দুই হতভাগার কথা শুনাব? আলী রাযি, বললেন: বলুন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বললেন: একজন হল ছামূদ সম্প্রদায়ের সেই গৌরবর্ণ লোকটি, যে উটনী হত্যা করেছিল আর দ্বিতীয়জন হল সেই ব্যক্তি, যে তোমার এই স্থানে (অর্থাৎ মস্তকের পার্শ্বে) আঘাত করবে, যার ফলে এটা অর্থাৎ দাড়ি ভিজে যাবে। ইবনে আবু হাতিম রহ. এ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন।

হযরত সালেহ আ.-এর জাতি বলল : "হে সালিহ! তুমি রাসূল হয়ে থাকলে আমাদেরকে যার ভয় দেখাচ্ছ তা আনয়ন কর।" (সূরা আরাফ: ৭৭) এ উক্তির মধ্যে তারা কয়েকটি জঘন্য কুফরী কথা বলেছে। যথা: (১) আল্লাহ যে উটনী তাদের জন্যে নিদর্শনরূপে পাঠিয়েছেন, তাকে কোনো প্রকার কষ্ট দিতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছিলেন। তারা তাকে হত্যা করে আল্লাহ ও রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে। (২) আযাব আনয়নের জন্যে তারা অতি বেশি তাড়াহুড়া করে। এরপর দুই কারণে তারা সে আযাবে গ্রেফতার হয়। (ক) তাদের উপর আরোপিত শর্ত (এক) কোনোরূপ কষ্ট দিও না, অন্যথায় অতি শীঘ্রই আযাব তোমাদেরকে পাকড়াও করবে।)। অন্য এক আয়াতে আছে- ভয়াবহ আযাব, অন্য এক আয়াতে আছে- মর্মন্তুদ আযাব-এর প্রতিটিই যথার্থরূপে দেখা দেয়। (খ) আযাব তাড়াতাড়ি এনে দেওয়ার জন্য তাদের পীড়াপীড়ি করা। (৩) তারা তাদের নিকট প্রেরিত রাসূলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, অথচ তিনি তাঁর নবুয়তের দাবির সত্যতার পক্ষে চূড়ান্ত প্রমাণ দিয়েছেন। কিন্তু তাদের এ হীন মানসিকতা ও আযাবে গ্রেফতার হওয়ার যোগ্যতাই তাদেরকে ভ্রান্তি ও কুফুরী পথে যেতে এবং বিদ্বেষী হয়ে চলতে উদ্বুদ্ধ করে। আল্লাহ তাআলা বলেন: কিন্তু ওরা তাকে বধ করল। ফলে সালেহ বললেন, তোমরা তোমাদের বাড়িতে তিনদিন জীবন উপভোগ করে নাও। এ এমন একটি ওয়াদা, যা মিথ্যা হওয়ার নয়। (সূরা হূদ: ৬৫)

মুফাসসিরগণ লিখেছেন, উটনীটির উপর প্রথম যে ব্যক্তি হামলা করে তার নাম কিদার ইবনে সালিফ (তার প্রতি আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক)। প্রথম আঘাতেই উটনীটির পায়ের গোছা কেটে যায় এবং সে মাটিতে পড়ে যায়। এরপর অন্যরা দৌড়ে গিয়ে তরবারি দ্বারা কেটে উটনীটির দেহ খণ্ড-বিখণ্ড করে। উটনীটির সদ্য প্রসূত বাচ্চা এ অবস্থা দেখে দৌড়ে নিকটবর্তী এক পাহাড়ে গিয়ে ওঠে এবং তিনবার আওয়াজ দেয়। এ জন্য সালেহ আ. তাদের বললেন : (তোমরা তিনদিন পর্যন্ত তোমাদের ঘরবাড়িতে জীবন উপভোগ কর। অর্থাৎ ঘটনার ওইদিন বাদ দিয়ে পরবর্তী তিন দিন। কিন্তু এত কঠোর সতর্কবাণী শুনানো সত্ত্বেও তারা এ কথা বিশ্বাস করল না। বরং ওই রাতেই নবীকেও হত্যা করার ষড়যন্ত্র আঁটল এবং উটনীর মতো তাঁকেও খতম করার পরিকল্পনা করল। "তারা পরস্পরে বলল, আল্লাহর নামে কসম কর! আমরা সালেহ ও তাঁর পরিবারসহ লোকদের উপর রাত্রিবেলায় আক্রমণ চালাব।" অর্থাৎ আমরা তাঁর বাড়িতে হামলা করে সালেহকে তার পরিবার-পরিজনসহ হত্যা করব। পরে তার অভিভাবকরা যদি রক্তপণ চায়, তবে আমরা হত্যা করার কথা অস্বীকার করব। এ কথাই কোরআনে বলা হয়েছে: পরে তার অভিভাবককে বলব, আমরা তার পরিবারের হত্যা প্রত্যক্ষ করি নি।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 সামুদ জাতির ধ্বংসলীলা

📄 সামুদ জাতির ধ্বংসলীলা


যে কয় ব্যক্তি হযরত সালেহ আ. কে হত্যা করতে সংকল্পবদ্ধ হয়, আল্লাহ প্রথম তাদের উপর পাথর নিক্ষেপ করে চূর্ণ-বিচূর্ণ করেন। পরে গোটা সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেন। যে তিনদিন তাদেরকে অবকাশ দেওয়া হয়েছিল, তার প্রথমদিন ছিল বৃহস্পতিবার। এই দিন আসার সাথে সাথে সম্প্রদায়ের সকলের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়। সন্ধ্যা হলে পরস্পর বলাবলি করল, 'জেনে রেখ! নির্ধারিত সময়ের প্রথম দিন শেষ হয়ে গেছে। দ্বিতীয় দিন শুক্রবারে সকলের চেহারা লাল রং ধারণ করে। সন্ধ্যায় তারা বলাবলি করে, শুনে রেখ! নির্ধারিত সময়ের দুদিন কেটে গেছে। তৃতীয়দিন শনিবারে সকলের চেহারা কালো রং ধারণ করে। সন্ধ্যায় তারা বলাবলি করে, জেনে নাও! নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে গেছে। রবিবার সকালে তারা খোশবু লাগিয়ে প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষায় থাকল কী শান্তি ও আযাব-গযব নাযিল হয় তা দেখার জন্যে। তাদের কোনো ধারণাই ছিল না, তাদেরকে কী করা হবে এবং কোন দিক থেকে আযাব আসবে। কিছু সময় পর সূর্য যখন উপরে এসে উজ্জ্বল হয়ে উঠল, তখন আসমানের দিক থেকে বিকট আওয়াজ এলো এবং নিচের দিক থেকে প্রবল ভূকম্পন শুরু হল। সাথে সাথে তাদের প্রাণবায়ু উড়ে গেল। সকল নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেল। শোরগোল স্তব্ধ হল এবং যা সত্য তাই বাস্তবে ঘটে গেল। ফলে সবাই লাশ হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে রইল।

ইতিহাসবিদগণ লিখেছেন, সামুদ সম্প্রদায়ের এ আযাব থেকে একজন মাত্র মহিলা ছাড়া আর কেউই মুক্তি পায় নি। মহিলার নাম কালবা বিনতে সালাকা। ডাকনাম জারিআ। সে ছিল কট্টর কাফের এবং হযরত সালেহ আ.-এর চরম দুশমন। আযাব আসতে দেখেই সে দ্রুত বের হয়ে দৌড়ে এক আরব গোত্রে গিয়ে উঠল। এবং তার সম্প্রদায়ের উপর পতিত যে আযাব সে প্রত্যক্ষ করে এসেছে- তার বর্ণনা দিল। পিপাসায় কাতর হয়ে সে পানি পান করতে চাইল। কিন্তু পানি পান করার সাথে সাথেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। আল্লাহ তা'আলার বাণী: (যেন সেখানে তারা কোনো দিন বসবাস করে নাই।) আল্লাহ তাআলা বলেন: "জেনে রেখ! সামুদ সম্প্রদায় তাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করেছিল। জেনে রেখ! ধ্বংসই হল সামুদ সম্প্রদায়ের পরিণাম।" (সূরা হূদ: ৬৮)

ইমাম আহমাদ হযরত জাবের রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার হিজর উপত্যকা দিয়ে অতিক্রম করার সময় বলেন: তোমরা আল্লাহর নিদর্শন অর্থাৎ মুজিযা দেখার আবদার করো না। সালেহ আ.-এর সম্প্রদায় এরূপ আবদার জানিয়েছিল। সেই নিদর্শনের উটনী এই গিরিপথ দিয়ে পানি পান করার জন্যে যেত এবং পান করার পর এই পথ দিয়েই উঠে আসত। (তারা আল্লাহর হুকুমের অবাধ্য হল ও উটনীটিকে বধ করল)। উটনী একদিন তাদের পানি পান করত এবং তারা একদিন উটনীর দুধ পান করত। পরে তারা উটনীটিকে বধ করে। ফলে এক বিকট আওয়াজ তাদেরকে পাকড়াও করে। এতে সামুদ সম্প্রদায়ের শুধু একজন লোক ব্যতীত আসমানের নিচে তাদের যত লোক ছিল, সবাইকে আল্লাহ ধ্বংস করে দেন। সেই লোকটা হারাম শরিফে অবস্থান করছিল। সঙ্গীরা জিজ্ঞেস করল, কে সেই লোকটা ইয়া রাসুলুল্লাহ। তিনি বললেন, তার নাম আবু রাগাল। পরে হারাম শরিফ থেকে বের হওয়ার পর ওই আযাব তাকে ধ্বংস করে, যে আযাব তার সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছিল। এ হাদীসটি ইমাম মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সংগৃহীত। কিন্তু হাদীসের প্রসিদ্ধ ছয়টি কিতাবের কোনোটিতেই এর কোনো উল্লেখ নেই। আল্লাহ সর্বজ্ঞ।

আবদুর রাজ্জাক রহ. ইসমাইল ইবনে উমাইয়া রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন। একবার নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু রাগালের কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন: তোমরা কি জান, এই কবরবাসী কে? তারা বলল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই সম্যক জানেন। তিনি বললেন, এটা আবু রাগালের কবর। সে সামুদ সম্প্রদায়ের লোক। হারাম শরিফে অবস্থান করছিল। আল্লাহ পাক হারাম শরিফকে আযাব পতিত হওয়া থেকে মুক্ত রেখেছেন। আবু রাগাল যখন হারামের সীমানা থেকে বের হলো, সেই আযাব তাকে ধ্বংস করে দেয়, যে আযাব তার সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছিল। তারপর এখানে তাকে দাফন করা হয় এবং তার সাথে স্বর্ণনির্মিত একটি ডালও দাফন করা হয়। এ কথা শুনে কাফেলার সবাই বাহন থেকে নেমে এসে তরবারি দ্বারা কবর খুঁড়ে স্বর্ণের ডাল বের করে নিয়ে আসে।

আবদুর রাজ্জাক রহ. যুহরি থেকে বর্ণনা করেছেন। আবু রাগালের অপর নাম আবু সাকিফ। বর্ণনার এ সূত্রটি মুরসাল। এ হাদিসটি মুত্তাসিল সনদেও বর্ণিত হয়েছে। যেমন মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক রহ. তাঁর সিরাত গ্রন্থে আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাযি. প্রমুখ থেকে বর্ণনা করেছেন। আবদুল্লাহ রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর তায়েফ গমনের সময় আমরাও সাথে ছিলাম। একটি কবর অতিক্রম করার সময় তিনি বললেন, এটি আবু রাগালের কবর, যাকে আবু সাকিফও বলা হয়। সে সামুদ সম্প্রদায়ের লোক। হারাম শরিফে অবস্থান করায় তার ওপর তাৎক্ষণিকভাবে আযাব আসে নি। পরে যখন হারাম থেকে বেরিয়ে এই স্থানে আসে, তখন সেই আযাব তার উপর পতিত হয়, যে আযাব তার সম্প্রদায়ের উপর পতিত হয়েছিল। এখানেই তাকে দাফন করা হয়। এর প্রমাণ হলো, তার সাথে স্বর্ণের একটি ডালও দাফন করা হয়েছিল। তোমরা তার কবর খুঁড়লে সাথে ওই ডালটিও পাবে। তখনই লোকজন কবরটি খুঁড়ে ডালটি বের করে আনে। আবু দাউদ রহ. মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক রহ. সূত্রে এ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। হাফেজ আবুল হাজ্জাজ মাযযী একে হাসান ও আযিয পর্যায়ের হাদিস বলেছেন।

আমার (ইবনে কাসীর রহ. এর) মতে এ হাদিসটি বুজায়ের ইবনে আবু বুজায়ের একাই বর্ণনা করেছেন। এ হাদিস ব্যতীত অন্য কোনো হাদিসের বর্ণনাকারী হিসেবে তাকে দেখা যায় না। এ ছাড়া ইসমাইল ইবনে উমাইয়া ব্যতীত অন্য কেউ এটা বর্ণনা করেন নি। শায়খ আবুল হাজ্জাজ বলেছেন, এ হাদিসকে মারফু বলা অমূলক। এটা আসলে আবদুল্লাহ ইবনে আমরের উক্তি। তবে পূর্বে বর্ণিত মুরসাল ও জাবের রাযি.-এর হাদিসে এর সমর্থন পাওয়া যায়।

সম্প্রদায়ের ধ্বংসের পর হযরত সালেহ আ. তাঁর সম্প্রদায়ের এলাকা থেকে অন্যত্র যাওয়ার সময় তাদের উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন: "হে আমার সম্প্রদায়! আমার রবের পয়গাম আমি তোমাদের নিকট পৌঁছিয়ে দিয়েছিলাম এবং তোমাদেরকে উপদেশও দিয়েছিলাম"। অর্থাৎ তোমাদের হিদায়াতের জন্যে আমি আমার সাধ্যমত চেষ্টা করেছিলাম। কথা, কাজ ও সদিচ্ছা দিয়ে তা একান্ত ভাবে কামনা করেছিলাম : (কিন্তু হিতাকাঙ্ক্ষীদেরকে তোমরা পছন্দ কর না।) অর্থাৎ সত্য তোমরা কবূল কর নি আর না কবুল করতে প্রস্তুত ছিলে। এ কারনেই আজ তোমরা চিরস্থায়ী আযাবের মধ্যে পড়ে রয়েছ। এখন আমার কিছু করার নেই। তোমাদের থেকে আযাব দূর করার কোনো শক্তি আমার আদৌ নেই। আল্লাহর বাণী পৌছিয়ে দেওয়া ও উপদেশ দেওয়ার দায়িত্বই আমার উপর ন্যাস্ত ছিল। সে দায়িত্ব আমি পালন করেছি। কিন্তু কার্যত সেটাই হয়, যেটা আল্লাহ চান।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও অনুরূপভাবে বদর প্রান্তরে অবস্থিত কূপে নিক্ষিপ্ত নিহত কাফের সরদারদের লাশগুলো সম্বোধন করে ভাষণ দিয়েছিলেন। বদর যুদ্ধে নিহত কুরায়েশ সর্দারকে বদরের কূপে কূপে নিক্ষেপ করা হয়। তিনদিন পর শেষ রাতে ময়দান ত্যাগ করার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উক্ত কূূূূপের নিকট দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, 'হে কূূূূপবাসীরা! তোমাদের সাথে তোমাদের প্রভু যে ওয়াদা করেছিলেন, তার সত্যতা দেখতে পেয়েছ তো? আমার সাথে আমার প্রভুর যে ওয়াদা ছিল, তা আমি পুরোপুরি সত্যরূপে পেয়েছি। 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, "তোমরা হচ্ছ নবীর নিকৃষ্ট পরিজন। তোমরা তো তোমাদের নবীকে মিথ্যুক প্রতিপন্ন করেছ। কিন্তু অন্য লোকেরা আমাকে সত্য বলে স্বীকার করেছে। তোমরা আমাকে দেশ থেকে বের করে দিয়েছ। অন্যরা আমাকে আশ্রয় দিয়েছে। তোমরা আমার বিরুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছ, পক্ষান্তরে অন্যরা আমাকে সাহায্য করেছে, তোমরা তোমাদের নবীর কত জঘন্য পরিজন ছিলে!"

হযরত ওমর রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বললেন : আল্লাহর রাসুল! আপনি এমন একদল লোকের সাথে কথা বলছেন, যারা লাশ হয়ে পড়ে আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, "যে মহান সত্তার হাতে আমার জীবন, তাঁর শপথ করে বলছি আমি যেসব কথাবার্তা বলছি, তা ওদের চেয়ে তোমরা মোটেও বেশি শুনছ না; কিন্তু তারা উত্তর দিচ্ছে না এই যা।"

কথিত আছে, হযরত সালেহ আ. এ ঘটনার পর হারাম শরিফ চলে যান এবং ইনতেকাল পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করেন। ইমাম আহমাদ হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন, বিদায় হজের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন উসফান উপত্যকা অতিক্রম করেন, তখন জিজ্ঞেস করেন: আবু বকর! এটা কোন উপত্যকা? আবু বকর রাযি. বলেন, এটা উসফান উপত্যকা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এ স্থান দিয়ে হুদ ও সালেহ আ. নবীদ্বয় অতিক্রম করেছিলেন। তাদের বাহন ছিল উটনী। লাগাম ছিল খেজুর গাছের ছাল দ্বারা তৈরি রশি। পরনে ছিল জুব্বা এবং গায়ে ছিল চাদর। হজের উদ্দেশ্যে তালবিয়া পড়তে পড়তে তাঁরা আল্লাহর ঘর তওয়াফ করছিলেন। এ হাদিসের সনদ হাসান পর্যায়ের। হযরত নূহ নবীর আলোচনায় তাবারানি থেকে এ হাদিসটি উদ্ধৃত করা হয়েছে। সেখানে হযরত নূহ হুদ ও ইবরাহীম আ.-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 কওমের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর হযরত সালেহ আ.-এর

📄 কওমের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর হযরত সালেহ আ.-এর


একটা ঐতিহাসিক প্রশ্ন, সামুদ সম্প্রদায় যখন ধ্বংস প্রাপ্ত হল, তখন হযরত সালেহ আ. ও তাঁর অনুগামী ঈমানদার লোকেরা কোথায় বসতি স্থাপন করলেন? এ প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিত ও নির্দিষ্টরূপে প্রদান করা অসম্ভব। প্রবল ধারণা হল, তারা কওমের ধ্বংস প্রাপ্তির পর ফিলিস্তিন অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করেন। কেননা হিজর এর নিকটবর্তী এই স্থানটিই এরূপ ছিল, যা সবুজ-সতেজ এবং গৃহপালিত পশুদের দানা-পানির জন্যও উত্তম ছিল। আর ফিলিস্তিন অঞ্চলে এই স্থানটি সম্ভবত 'রামলা' হবে কিংবা অন্য কোনো স্থান। তাফসিরকারকগণ এ প্রশ্নের জওয়াবে কয়েকটি মত পোষণ করেন:
১। তাঁরা ফিলিস্তিনের 'রামলা' নামক স্থানের নিকটে বসতি স্থাপন করেন। তাফসিরে খাযেনে এরূপই উল্লেখ আছে।
২। হাযরা মাউতে বসবাস করেন। এটাই তাদের আদি ও আসল বাসস্থান ছিল। কারণ, এটা আহকাফেরই একটি অংশ। এখানে একটি কবর রয়েছে, যা সালেহ আ.-এর কবর বলে প্রসিদ্ধ।
৩। সামুদ সম্প্রদায় ধ্বংসের পর মক্কা মুআযযামায় এসে এখানেই বাস করতে থাকেন। এখানেই ইনতেকাল করেন। তাঁদের কবর কাবা ঘরের পশ্চিম দিকে হারাম শরিফের মধ্যেই অবস্থিত। সাইয়েদ মাহমুদ আলুসি রহ. তাঁর তাফসিরে রুহুল মাআনিতে উদ্ধৃত করেছেন, হযরত সালেহ আ.-এর ওপর ঈমান আনয়নকারী মুসলমানগণ, যাঁরা তাঁর সাথে আযাব হতে রক্ষিত ছিলেন, তাঁদের সংখ্যা একশ বিশ জন ছিল। আর ধ্বংস প্রাপ্ত সংখ্যা ছিল, প্রায় দেড় হাজার পরিবার।

ফন্ট সাইজ
15px
17px