📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 আল্লাহ তাআলার উটনী

📄 আল্লাহ তাআলার উটনী


হযরত সালেহ আ. বারবার তাঁর কওমকে বুঝাতে থাকলেন। তাঁর নসিহত কওমের ওপর কোনোই ক্রিয়া করল না। বরং তাদের শত্রুতা ও বিরোধিতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধিই পেতে থাকল। তারা কোনো প্রকারেই মূর্তিপূজা থেকে হতে বিরত হলো না। যদিও দুর্বল ও নগণ্য একটি দল ঈমান আনয়ন করল এবং মুসলমান হলো, কিন্তু কওমের নেতৃস্থানীয় বড় বড় লোকেরা আগের মতো মূর্তিপূজার ওপরই অবিচল রইল। তারা খোদাপ্রদত্ত সর্বপ্রকারের স্বচ্ছলতা ও শান্তির শোকরগুযারি করার বদলে নেয়ামতের না- শোকরি করাকে নিজেদের অভ্যাসে পরিণত করে নিল। তারা হযরত সালেহ আ.-কে বিদ্রুপ করে বলত, আমরা যদি ধর্মে অবিশ্বাসীই হতাম এবং পছন্দনীয় পন্থার উপর প্রতিষ্ঠিত না হতাম, তবে আমরা এত প্রচুর ধন-সম্পদ, সবুজ-শ্যামল বাগানসমূহ, সোনা-রূপার প্রাচুর্য, সুউচ্চ ও সুদৃঢ় আলিশান অট্টালিকা ও নহরসমূহ এবং উত্তম নানা জাতীয় সুস্বাদু ফলমূলসমূহ, মিঠাপানির নহর এবং উত্তম চারণভূমিসমূহ পেতাম না। তুমি তোমার নিজেকে এবং তোমার অনুসারীদের দেখ! এরপর তাদের সঙ্কীর্ণ ও দারিদ্র্যপূর্ণ অবস্থার প্রতি লক্ষ কর। এবং বল, আল্লাহর প্রিয় ও মকবুল কারা! আমরা না তোমরা?

হযরত সালেহ আ. বলতেন, তোমরা নিজেদের এই আরাম ও আনন্দময় জীবিকার সাজসরঞ্জামের জন্য গর্ব প্রকাশ করো না। আল্লাহ পাকের সত্য রাসূল এবং তাঁর সত্য ধর্মের সঙ্গে বিদ্রুপ করো না। যদি তোমাদের গর্ব, অহঙ্কার ও বিরোধিতার অবস্থা এরূপই থাকে, তবে এক নিমিষে এর সবকিছুই বিলীন হয়ে যাবে। এরপর তোমরাও থাকবে না এবং তোমাদের এ সমস্ত সাজ-সরঞ্জামও থাকবে না। নিঃসন্দেহে এই সমস্তই আল্লাহ পাকের নেয়ামত। যে ব্যক্তি এ সমস্ত নেয়ামত পেয়েও আল্লাহর শোকর আদায় করে না, তাঁর ইবাদত করে না, নিঃসন্দেহে এগুলোই তার জন্য আযাব ও লানতের কারণ হয়ে যায়। যদি এ নেয়ামত প্রাপ্তিতে গর্ব ও অহঙ্কার করা হয়। সুতরাং এরূপ মনে করা নিতান্ত ভুল, প্রত্যেক আনন্দময় জীবিকার সরঞ্জাম আল্লাহ পাকের খুশি থাকার ফল।

কওমে সামুদ এ ভাবনায় পেরেশান ছিল, এটা কীভাবে সম্ভব, আমাদেরই মধ্যকার একজন লোক আল্লাহ তাআলার পয়গম্বর হবেন! সে আল্লাহর আহকাম শুনাতে আরম্ভ করবেন? তারা অত্যন্ত বিস্ময়ের সাথে বলত : "আমরা বিদ্যমান থাকতে কি এ লোকটির ওপর আল্লাহর উপদেশগ্রন্থ নাযিল হয়?" অর্থাৎ মানুষকেই যদি নবী করা হতো, তবে এর যোগ্য ছিলাম আমরা, সালেহ নয়। আবার কোনো কোনো সময় নিজেদের কওমের দুর্বল লোকদেরকে যারা মুসলমান হয়েছিল, তাদের লক্ষ্য করে বলত: "সত্যই কি তোমরা বিশ্বাস কর, নিঃসন্দেহে সালেহ তাঁর রবের প্রেরিত রাসূল?" আর মুসলমানগণ উত্তর করত, নিঃসন্দেহে আমরা তাঁর আনীত পয়গামের ওপর বিশ্বাস রাখি। তখন সেই অহঙ্কারী নেতারা ক্রোধান্বিত হয়ে বলত: "নিঃসন্দেহে আমরা তো ওই বস্তুকে অবিশ্বাস করছি, যার উপর তোমরা ঈমান আনয়ন করেছ।"

হযরত সালেহ আ.-এর কওম তাঁর নবীসূলভ তাবলিগ ও নসিহতকে মেনে নিতে অস্বীকার করল। তারা তাঁর কাছে আল্লাহ পাকের মেজেযা (কুদরতি নিদর্শন) দাবি করল। সালেহ আ. আল্লাহ পাকের দরবারে দোয়া করলেন। দোয়া কবুল হওয়ার পর তিনি কওমকে বললেন, তোমাদের দাবিকৃত নিদর্শন (মোজেযা) উষ্ট্রীর আকারে এই যে উপস্থিত। যদি তোমরা এই উষ্ট্রীকে কোনো প্রকার কষ্ট প্রদান কর, তবে এটাই তোমাদের ধ্বংসের আলামত বলে সাব্যস্ত হবে। আল্লাহ তাআলা তোমাদের ও উষ্ট্রীটির মধ্যে কূপের পানির জন্য পালা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। একদিন তোমাদের, একদিন উটনীর। এর ব্যতিক্রম যেন না হয়।

কোরআন মাজিদে এটিকে نَاقَةُ اللهِ (আল্লাহর উটনী) বলা হয়েছে। যেন তাদের স্মরণে থাকে, এমনি তো সমস্ত মাখলুকই আল্লাহ তাআলার অধীন; কিন্তু ছামুদ সম্প্রদায় যেহেতু এটিকে আল্লাহ পাকের একটি নিদর্শনস্বরূপ দাবি করেছিল। তাই এর বর্তমান বৈশিষ্ট্য এবং মর্যাদা একে "নাকাতুল্লাহ" নামে ভূষিত করল।

কোরআন মাজিদ থেকে এ প্রসঙ্গে শুধু দুটি বিষয় প্রমাণিত হয়। প্রথমত সামুদ সম্প্রদায় হযরত সালেহ আ.-এর কাছে নিদর্শন-মোজেযা চেয়েছিল। হযরত সালেহ আ. ‘উটনী'টিকে মোজেযা স্বরূপ পেশ করলেন। দ্বিতীয়ত, হযরত সালেহ আ. কওমকে বলে দিয়েছিলেন, তারা যেন উটনীটির কোনো ক্ষতি না করে। আর তাদের ও উটনীটির পানি পানের পালা নির্ধারণ করে দেন। একদিন উটনীর, একদিন কওমের। যদি তারা উটনীটির কোনো ক্ষতি করে, তবে তাই হবে কওমের ধ্বংস হওয়ার সূচনা ও নিদর্শন। কিন্তু তারা উটনীটি হত্যা করল। এবং আল্লাহর আযাব দ্বারা নিজেরাও ধ্বংস হলো।

এ ঘটনা সম্পর্কে এর চেয়ে অতিরিক্ত যা কিছু রয়েছে, তার ভিত্তি হয়তো ওই সমস্ত হাদিসের ওপর, যা “খবরে ওয়াহেদ” বা বাইবেল ও প্রাচীন ইতিহাসের রেওয়ায়েতগুলোর ওপর। যতটুকু বিবরণ 'খবরে ওয়াহিদগুলো থেকে পাওয়া যায়, মুহাদ্দিসিনের মতে তার কোনো কোনোটি সহি, কোনো কোনোটি দুর্বল হাদিস। এ কারণে হাফেয ইমাদুদ্দীন ইবনে কাসির সূরা আরাফের তাফসিরে 'নাকাতুল্লাহ' অস্তিত্বপ্রাপ্ত হওয়া সম্বন্ধীয় রেওয়ায়াতগুলোকে সনদ রেওয়ায়েত করার নিয়ম অনুযায়ী উদ্ধৃত করেন নি। বরং একটি ঐতিহাসিক ঘটনারূপে লিপিবদ্ধ করেছেন।

ঘটনাটির বিস্তৃত বিবরণ হলো- হযরত সালেহ আ. যখন ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন, তখন নেতৃস্থানীয়রা কওমের লোকদের সামনে হযরত সালেহ আ.-এর কাছে দাবি করল- হে সালেহ! যদি তুমি বাস্তবিকই আল্লাহর প্রেরিত রাসূল হও, তবে কোনো নিদর্শন দেখাও! যাতে আমরা তোমার সত্যতা বিশ্বাস করতে পারি। হযরত সালেহ আ. বললেন: এমন যেন না হয়, নিদর্শন আসার পরেও অবিশ্বাসের উপরই হঠকারিতা এবং অবাধ্যাচরণ করতে থাক। কওমের নেতারা দৃঢ়তার সঙ্গে ওয়াদা করল, নিদর্শন আসলে আমরা তৎক্ষণাৎ ঈমান আনব। হযরত সালেহ আ. তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কী নিদর্শন চাও। তারা দাবি করল, সামনের এ পাহাড় থেকে একটি উষ্ট্রী বের কর, যা গর্ভবতী হবে এবং এক্ষুনি বাচ্চা প্রসব করবে। হযরত সালেহ আ. আল্লাহ পাকের দরবারে দোয়া করলেন। তৎক্ষণাৎ পাহাড় থেকে সবার সামনে একটি গর্ভবতী উষ্ট্রী প্রকাশিত হলো এবং সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চা প্রসব করল। এ দেখে নেতৃবৃন্দের মধ্য হতে জোন্দো ইবনে আমর তো তখনই ইসলাম গ্রহণ করেন। অন্যান্য নেতারাও তাঁর অনুসরণে ইসলাম গ্রহণের ইচ্ছা করেন। তখন মূর্তিপূজারী অন্য সরদাররা তাদের বিরত রাখে। এরূপে তারা অন্যদেরও ইসলাম গ্রহণ করতে নিষেধ করে।

এখন হযরত সালেহ আ. কওমের সকল লোকদের সতর্ক করে বললেন, দেখ! এ নিদর্শন তোমাদের দাবির প্রেক্ষিতে প্রেরিত হয়েছে। আল্লাহ পাকের সিদ্ধান্ত হলো, কূপের পানি পান করার জন্য পালা নির্ধারিত হোক। একদিন এ উষ্ট্রীটির আর একদিন তোমাদের ও তোমাদের প্রাণীদের। কিন্তু সাবধান! উষ্ট্রীটি যেন কোনো কষ্ট না পায়। যদি তাকে কোনো কষ্ট দেওয়া হয়, তবে তোমাদেরও মঙ্গল নেই। কওম যদিও এই বিস্ময়কর মোজেযা দেখেও ঈমান আনল না, কিন্তু মনে মনে একে মোজেযা বলেই স্বীকার করেছিল। তাই একে কষ্ট প্রদান করা থেকে বিরত রইল। অনন্তর এ প্রথাই চালু রইল, পানি পান করার পালা একদিন উষ্ট্রীটির থাকত আর সমুদয় কওমের লোকেরা এর দুগ্ধ দ্বারা উপকৃত হত। দ্বিতীয় দিবসে কওমের পালা হতো। এই উষ্ট্রীটি ও এর বাচ্চা নির্বিঘ্নে চারণভূমিতে চরে বেড়াত এবং তৃপ্তি লাভ করত। কিন্তু ক্রমে ক্রমে এটাও তাদের অন্তরে বাধতে লাগল।

তাদের মধ্যে পরামর্শ হতে লাগল, উষ্ট্রীটিকে খতম করে দেওয়া হোক। তা হলে এই পালার ব্যাপারটির অবসান ঘটবে এবং আমরা ঝামেলামুক্ত হবো। কেননা আমাদের পশুগুলোর জন্য এবং আমাদের নিজেদের জন্য এই শর্তটি অসহনীয়। এরূপ কথাবার্তা চলছিল ঠিক, কিন্তু কেউই উষ্ট্রীটিকে হত্যা করতে সাহস পাচ্ছিল না।

যে লোক উটনী হত্যার দায়িত্ব গ্রহণ করে তার নাম কিদার ইবনে সালিফ ইবনে জানদা। সে ছিল সম্প্রদায়ের অন্যতম নেতা। সে ছিল গৌরবর্ণ, নীল চোখ ও পিঙ্গল চুল বিশিষ্ট। কথিত আছে, কিদার ছিল সালিফের যারজ সন্তান। সায়বান নামক এক ব্যক্তির ঔরসে তার জন্ম হয়। ইবনে জারির ও প্রমুখ মুফাসসির লিখেছেন: সামুদ সম্প্রদায়ের দুই মহিলা- এক জনের নাম সাদুকা। সে মাহইয়া ইবনে যুহায়ের ইবনে মুখতারের কন্যা। মহিলা ছিল প্রচুর ধন-সম্পদ ও বংশীয় গৌরবের অধিকারী। তার স্বামী ইসলাম গ্রহণ করে। ফলে স্ত্রী তাকে ত্যাগ করে এবং নিজের চাচাতো ভাই মিসরা ইবনে মিহরাজ ইবনে মাহইয়াকে বলল, যদি তুমি উটনীটি হত্যা করতে পার, আমি তোমাকে বিবাহ করব।

অপর মহিলার নাম উনায়যা বিনতে গুনায়েম ইবনে মিজলায়। তাকে উম্মে উসমান নামে ডাকা হতো। মহিলা ছিল বৃদ্ধা ও কাফের। তার স্বামী ছিল সম্প্রদায়ের অন্যতম সরদার যুওয়াব ইবনে আমর। এই স্বামীর ঔরসে তার ৪টি মেয়ে ছিল। মহিলাটি কিদার ইবনে সালিফকে প্রস্তাব দিল, সে যদি উটনীটি হত্যা করতে পারে তবে তার এ চার কন্যার মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছে বিয়ে করতে পারবে। তখন এ দুই যুবক (কিদার ও মিসরা) উটনী হত্যার দায়িত্ব গ্রহণ করে। স্থির হলো, তারা পথে ওঁৎপেতে বসে থাকবে। উটনীটি চারণভূমির দিকে গমনকালে উভয়ে আক্রমণ করবে। অন্যরা তাদের সাহায্য করবে।

পুরা কাজটা তারা চক্রান্ত মোতাবেক করল। ষড়যন্ত্র করে উটনীটিকে হত্যা করে ফেলল। এরপর পরস্পর শপথ করল, রাত হলে আমরা সবাই মিলে সালেহ ও তাঁর পরিবারের সকলকেও হত্যা করে ফেলব। এরপর তার স্বজন-বন্ধুদের শপথ করে বিশ্বাস করাব, এটা আমাদের কাজ না। উটনীর বাচ্চাটি মায়ের হত্যাকাণ্ড দেখে পালিয়ে পাহাড়ে আরোহণ করল। এবং চিৎকার করতে করতে অদৃশ্য হয়ে গেল।

হযরত সালেহ আ. এ সংবাদ পেয়ে আফসুসের সঙ্গে কওমকে সম্বোধন করে বললেন, পরিশেষে তা-ই হলো, যা আমি আশঙ্কা করেছিলাম। এখন তোমরা আল্লাহ তাআলার আযাবের অপেক্ষা করতে থাক। যা তিন দিন পরে তোমাদের নিপাত করে দেবে। এরপর বিদ্যুতের চমক ও বজ্রধ্বনির আযাব এসে এক রাতেই সবাইকে ধ্বংস করে দিল এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির সবক দিয়ে গেল।

এ ঘটনার সঙ্গে ইবনে কাসির রহ. কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করেছেন। যেমন: তাবুক যুদ্ধের সময় হুযুরে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হিজর নামক স্থানে পৌঁছলেন, তখন সাহাবায়ে কেরাম কওমে সামুদের কূপ থেকে পানি নিয়ে তা দ্বারা আটা গুলে রুটি তৈরি করতে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা জানতে পেয়ে পানি ফেলে দিতে, হাড়ি পাতিলগুলো উপুড় করে ফেলতে এবং আটাগুলি অনুপযুক্ত করে দিতে আদেশ করলেন। আর বললেন, এটা সেই জনপদ, যার উপর আল্লাহ তাআলার আযাব নাযিল হয়েছিল। এখানে অবস্থানও করো না। এখানকার কোনো বস্তু কাজেও লাগিও না। সম্মুখে অগ্রসর হয়ে শিবির স্থাপন কর। পাছে না তোমরাও কোনো বিপদে আক্রান্ত হয়ে পড়।

অন্য রেওয়ায়েতে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: তোমরা এ হিজরের বসতিগুলোতে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করে বিনয়-নম্রতার সঙ্গে রোদন করতে করতে প্রবেশ করো। নচেৎ এসব বসতিতে প্রবেশই করো না। পাছে না তোমরাও নিজেদের অসর্তকতার দরুন আযাবে পতিত হয়ে যাও।

অন্য হাদিসে আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হিজর নামক স্থানে প্রবেশ করলেন, তখন বললেন: আল্লাহ তাআলার কাছে নিদর্শন চেয়ো না। দেখ! সালেহ আ.-এর কওম নিদর্শন দাবি করেছিল। এবং সেই উটনীটি এখানকার পাহাড়ের গুহা থেকে বের হয়ে নিজের পালার দিন পানাহার করে সেখানেই চলে যেত। আর যেদিন তার পালার দিন হতো, সেদিন সামুদ সম্প্রদায়কে নিজের দুগ্ধ দ্বারা পরিতৃপ্ত করত। কিন্তু সামুদ গোত্র পরিশেষে নাফরমানি করল। তারা উটনীটির পায়ের গোছা কেটে হত্যা করে ফেলল। ফলে আল্লাহ পাক তাদের ওপর বিকট ধ্বনির আযাব চাপিয়ে দিলেন। এ আযাবের ফলে তারা নিজ নিজ ঘরের মধ্যেই মরে পড়ে রইল। কেবল আবু রাগাল নামক এক ব্যক্তি অবশিষ্ট রইল। সে হারাম শরিফে গিয়েছিল। কিন্তু যখনই সে হারামের সীমানা হতে বের হল, তখনই সেই আযাবের শিকার হলো। হাফেয ইবনে কাসির রহ. এ রেওয়ায়েত তিনটি সনদের সঙ্গে মুসনাদে আহমাদ থেকে নকল করে এগুলোকে নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাস্য বলেছেন।

এ বিস্তারিত বিবরণের সারমর্ম হলো, কোরআন মাজিদ থেকে তো নিশ্চিত প্রমাণিত হলো, 'নাকাতুল্লাহ' (আল্লাহ তাআলার উষ্ট্রী) আল্লাহ পাকের একটি নিদর্শন ছিল। সেটি নিজের মধ্যে অবশ্যই এমন কোনো বৈশিষ্ট্য ধারণ করত যার কারণে তাকে আল্লাহর নিদর্শন বলা যেতে পারে। কোরআন মাজিদ যাকে এরূপ গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করছে- "এই নাকাতুল্লাহ তোমাদের জন্য নিদর্শন।" এরপর পানি পান করার পালা যেভাবে উটনী ও কওমে সামুদের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন, তা স্বয়ং স্বতন্ত্র একটি প্রমাণ, এ উটনীটি এমন বিশেষত্ব ধারণ করত, যা আল্লাহর নিদর্শন নামে আখ্যায়িত হওয়ার যোগ্য। কিন্তু এর অস্তিত্ব কিরূপ হলো? কী কারণে তা আল্লাহর নিদর্শন ও নবীর মোজেযা হলো, কোরআন মাজিদে তার কোনো উল্লেখ নেই।

অবশ্য বিভিন্ন সহি 'খবর ওয়াহেদ' দ্বারা এ ব্যাপারটির ওপর আলোকপাত হচ্ছে। যার বিবরণ ইবনে কাসির থেকে ওপরে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু ঘটনাটির বিস্তৃত বিবরণ সেখানেও পরিষ্কার বর্ণিত হয় নি। বরং তাফসিরের কিতাবসমূহে ইসরাইলি রেওয়ায়েত থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে কিংবা হাদিসের দুর্বল রেওয়ায়েত থেকে গৃহীত হয়েছে।

সুতরাং ঘটনাটির মোটামুটি বিবরণ ও বিস্তৃত বিবরণের মধ্যে মর্যাদার পার্থক্যের প্রতি অবশ্যই খেয়াল রাখা উচিত। যে পরিমাণ ঘটনা কোরআন মাজিদ স্পষ্ট বর্ণনা করেছে কোনো প্রকার ব্যাখ্যা না করে এর প্রতি বিশ্বাস রাখা ওয়াজিব। আর সহি হাদিসে (তা খবরে ওয়াহেদই হোক না কেন) বর্ণিত উক্ত মোটামুটি বিবরণের যে পরিমাণ বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়, তা মোটামুটি কথার বিস্তারিত বিবরণ হিসাবে গ্রহণীয়। যদিও তা কোরআন মাজিদের বর্ণনার স্তরে পৌঁছতে পারে না। এর চেয়ে অধিক অবশিষ্ট বিস্তারিত বিবরণের মর্যাদা তা-ই, যা সাধারণ ঐতিহাসিক ঘটনা ও ইসরাইলি রেওয়ায়েতসমূহের মর্যাদা। এছাড়া একে "তোমাদের জন্য নিদর্শন" বলে বুঝানো হয়েছে, এই নিদর্শনটিতে বিশেষ কোনো গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু হতভাগ্য কওমে সামুদ বেশি সময় পর্যন্ত একে বরদাশত করতে পারল না। তারা সেটিকে হত্যা করে ফেলল।

আল্লাহ তাআলা কোরআন শরিফে জুদী পাহাড়ের উল্লেখ করেছেন। সে কি বিরাট পাহাড়! দজলার পাশে জাজিরা ইবনে উমরের পূর্ব অংশে এর অবস্থান। মাওসিলের কাছে দক্ষিণ থেকে উত্তরে তার দৈর্ঘ্য হলো, তিন দিনের পথ আর উচ্চতা আধা দিনের পথ। সবুজ বর্ণ। পাহাড়টি ওক জাতীয় গাছে পরিপূর্ণ। তার পাশে আছে একটি গ্রাম। নাম করিআতুস সামানিন (৮০ জনের গ্রাম)। একাধিক মুফাসসিরের মতে তা নূহ আ. এর সাথে মুক্তিপ্রাপ্ত লোকজনের আবাসস্থল ছিল। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 সামুদ জাতির প্রতি তাদের নবীর উপদেশ

📄 সামুদ জাতির প্রতি তাদের নবীর উপদেশ


এখন সামুদ জাতির অবস্থা ও তাদের ঘটনা বর্ণনা করা আমাদের উদ্দেশ্য। অর্থাৎ তাদের নবী হযরত সালেহ আ. কে এবং যারা তাঁর উপর ঈমান এনেছিল, তাদেরকে কীভাবে আযাব থেকে বাঁচিয়ে রাখলেন আর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণকারী, অত্যাচারী কাফেরদের কীভাবে নির্মূল করেছিলেন, এখন তা বর্ণনা করা হবে। পূর্বেই বলা হয়েছে, সামুদ সম্প্রদায় জাতিতে ছিল আরব। আদ সম্প্রদায়ের ধ্বংস হওয়ার পর সামুদ সম্প্রদায়ের আবির্ভাব হয়। তারা তাদের অবস্থা থেকে কোনো শিক্ষা গ্রহণ করে নি। এ কারণে তাদের নবী তাদের বলেছিলেন:

হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের আর কোনো ইলাহ নেই। তোমাদের নিকট তোমাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে স্পষ্ট নিদর্শন এসেছে। আল্লাহর এই উটনী তোমাদের জন্যে একটি নিদর্শন। একে আল্লাহর জমিনে চরে খেতে দাও এবং একে কোনো কষ্ট দিও না, দিলে কঠিন শাস্তি তোমাদের উপর আপতিত হবে। স্মরণ কর, আদ জাতির পর তিনি তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছেন, তিনি তোমাদেরকে পৃথিবীতে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তোমরা সমতল ভূমিতে প্রাসাদ ও পাহাড় কেটে বাসগৃহ নির্মাণ করছ। সুতরাং আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় ঘটিয়ো না। (সূরা আরাফ : ৭৩-৭৪)

অর্থাৎ আদ জাতিকে ধ্বংস করে তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করার উদ্দেশ্য হল, তাদের ঘটনা থেকে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে এবং তারা যে সব অন্যায় আচরণ করত, তোমরা তা করবে না। এ জমিন তোমাদের আয়ত্তাধীন করে দেওয়া হয়েছে। তাই এর সমতলভূমিতে তোমরা অট্টালিকা নির্মাণ করছ আর পাহাড় কেটে সুনিপুণভাবে তাতে ঘরবাড়ি তৈরি করছ। অতএব এর অনিবার্য দাবি হিসেবে এসব নিয়ামতের শোকর আদায় কর, সৎকর্মে তৎপর থাক, একনিষ্ঠভাবে এক আল্লাহর বন্দেগী কর, যাঁর কোনো শরীক নেই। তাঁর নাফরমানী ও দাসত্ব থেকে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে সাবধান থাক। কেননা এর পরিণতি খুবই জঘন্য। হযরত সালেহ আ. তাঁর কওমকে বললেন: তোমাদেরকে কি এ জগতের ভোগ-বিলাসের মধ্যে নিরাপদে রেখে দেওয়া হবে? উদ্যানসমূহের মধ্যে ও ঝরনাসমূহের মধ্যে? শস্যক্ষেত্রের মধ্যে ও মঞ্জুরিত খেজুর বাগানের মধ্যে? (সূরা শুআরা: ১৪৬-১৪৮) তোমরা পাহাড় কেটে জাঁকজমকপূর্ণ ঘরবাড়ি নির্মাণ করছ। সুতরাং আল্লাহকে ভয় কর ও আমার আনুগত্য কর এবং সীমালঙ্ঘনকারীদের আদেশ মান্য করো না; যারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে এবং শান্তি স্থাপন করে না। (সূরা শুআরা: ১৪১-১৪২) হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর দাসত্ব কবুল কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের আর কোনো ইলাহ নেই। তিনিই তোমাদেরকে যমীন থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার মধ্যেই বসবাস করার সুবিধা দিয়েছেন। অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং যমীন থেকে উদ্ভাবন করেছেন। তারপর তোমাদেরকেই যমীনের আবাদকারী বানিয়েছেন। অর্থাৎ পৃথিবীর যাবতীয় শস্য এবং ফল-ফলাদি তোমাদেরকে প্রদান করেছেন। এভাবে তিনিই তোমাদের সৃষ্টিকারী ও রিযিকদাতা। সুতরাং ইবাদত পাওয়ার হকদার একমাত্র তিনিই, অন্য কেউ নয়। অতএব তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর ও তওবা কর। অর্থাৎ তোমাদের বর্তমান কর্মনীতি পরিহার করে তার ইবাদতের দিকে ধাবিত হও! তোমাদের ইবাদত-ইসতিগফার কবুল করবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিবেন।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 সামুদ জাতির জবাব

📄 সামুদ জাতির জবাব


আমার প্রতিপালক নিকটেই আছেন। তিনি তওবা কবুল করবেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। তারা বলল, হে সালেহ! ইতোপূর্বে তোমার উপর আমাদের বড় আশা ছিল। অর্থাৎ তোমার এই জাতীয় কথাবার্তা বলার পূর্বে আমাদের আশা ছিল, তুমি একজন প্রজ্ঞাবান লোক হবে। কিন্তু আমাদের সে আশা ভুলুণ্ঠিত হল, এখন তুমি আমাদেরকে এক আল্লাহর ইবাদত করতে, আমরা যে দেবতাদের পূজা করছি সেগুলো বর্জন করতে এবং বাপ-দাদার ধর্ম ত্যাগ করতে বলছ! আমাদের বাপ-দাদারা যাদের পূজা করত, তুমি কি আমাদেরকে তাদের পূজা করতে নিষেধ করছ? তুমি আমাদেরকে যে আহবান জানাচ্ছ, তাতে আমরা বিভ্রান্তিকর সন্দেহ পোষণ করি। সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা কি ভেবে দেখেছ আমি যদি আমার প্রতিপালক প্রেরিত স্পষ্ট প্রামাণসহ প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকি আর তিনি যদি আমাকে তাঁর নিজ অনুগ্রহ দান করে থাকেন, তারপর আমি যদি তাঁর অবাধ্যতা করি, তবে তাঁর শাস্তি থেকে আমাকে কে রক্ষা করবে? তোমরা তো কেবল আমার ক্ষতিই বাড়িয়ে দিচ্ছ। (সূরা হূদ: ৬২-৬৩)

এ হচ্ছে হযরত সালেহ আ.-এর কোমল ভাষা ব্যবহার ও সৌজন্যমূলক আচরণের মাধ্যমে তাদেরকে কল্যাণের পথে আহ্বান। অর্থাৎ তোমাদের কি ধারণা, যদি আমি তোমাদেরকে যেদিকে আহ্বান জনাচ্ছি, তা প্রকৃতপক্ষে সত্য হয়ে থাকে, তবে আল্লাহর নিকট তোমাদের কি ওজর থাকবে এবং তখন তোমাদেরকে কী-সে মুক্তি দিবে? অথচ তোমরা আমাকে আল্লাহর দিকে দাওয়াতের কাজ পরিহার করতে বলছ আর তা কোনোক্রমেই আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কেননা এটি আমার অপরিহার্য কর্তব্য। আমি যদি তা ত্যাগ করি, তবে তাঁর পাকড়াও থেকে না তোমরা আমাকে বাঁচাতে পারবে, না অন্য কেউ, না কেউ আমাকে সাহায্য করতে সক্ষম হবে। সুতরাং তোমাদের ও আমার মধ্যে আল্লাহর ফয়সালা আসার পূর্ব পর্যন্ত আমি এক আল্লাহর দিকে আহ্বান করতে থাকব। সালেহ আ. কে তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা বলল: "তুমি তো একজন জাদুগ্রস্ত লোক"। অর্থাৎ তোমার উপর জাদুর প্রভাব পড়েছে, তাই সকল দেবতাকে বাদ দিয়ে এক আল্লাহর ইবাদত করার জন্যে তুমি যে আমাদের আহ্বান জানাচ্ছ। তাতে কী বলছ তা তুমি নিজেই বুঝতে পারছ না। আলেমগণ مُسَخَّرِينَ অর্থ করেছেন জাদুকর। তারা বলছে, তুমি একজন মানুষ। তোমার জাদু জানা আছে। তবে প্রথম অর্থই অধিকতর স্পষ্ট। কেননা পরেই তাদের কথা আসছে, তারা বলেছে: তুমি তো আমাদের মতোই মানুষ। তুমি কোনো একটা নিদর্শন নিয়ে আসো, যদি তুমি সত্যবাদী হয়ে থাক। তারা নবীর কাছে দাবি জানায়, যে কোনো একটা অলৌকিক জিনিস দেখিয়ে তিনি যেন নিজের দাবির সত্যতার পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপিত করেন।

সালেহ আ. বললেন: এই উটনী, এর জন্যে আছে পানি পানের পালা এবং তোমাদের জন্য আছে পানি পানের পালা, নির্দিষ্ট এক এক দিনের। তোমরা একে কোনো কষ্ট দিও না, তা হলে তোমাদেরকে মহা দিবসের আযাব পাকড়াও করবে। (সূরা শুআরা: ১৫৩) আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেন: তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে স্পষ্ট নিদর্শন এসেছে। আল্লাহর এ উটনী তোমাদের জন্যে একটি নিদর্শন। অতএব, একে আল্লাহর জমিন চরে খেতে দাও। একে কোনো ক্লেশ দিও না; দিলে মর্মন্তুদ শাস্তি তোমাদের উপর আপতিত হবে। (সূরা আরাফ: ৭৩)

আল্লাহর বাণী: "আমি শিক্ষাপ্রদ নিদর্শনস্বরূপ ছামূদ জাতিকে উটনী দিয়েছিলাম। কিন্তু ওরা তার প্রতি জুলুম করেছিল।" (সূরা বনি ইসরাইল: ৫৯)

মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেন, সামুদ সম্প্রদায়ের লোকেরা একবার এক স্থানে সমবেত হয়। ওই সমাবেশে আল্লাহর নবী হযরত সালেহ আ. আগমন করেন। তিনি তাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান জানান, উপদেশ দান করেন, ভীতি প্রদর্শন করেন, নসিহত করেন এবং তাদেরকে সৎ কাজের নির্দেশ দেন। উপস্থিত লোকজন তাঁকে বলল: ওই যে একটা পাথর দেখা যায়, ওর মধ্য থেকে যদি অমুক অমুক গুণসম্পন্ন একটি দীর্ঘকায় দশ মাসের গর্ভবতী উটনী বের করে দেখাতে পার, তবে দেখাও। সালেহ আ. বললেন: তোমাদের বর্ণিত গুণসম্পন্ন উটনী যদি আমি বের করে দিই, তা হলে কি তোমরা আমার আনীত দীন ও আমার নবুয়তের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে? তারা সবাই বলল: হ্যাঁ, বিশ্বাস করব। তখন তিনি এ কথার উপর তাদের থেকে অঙ্গীকার ও প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেন। এরপর সালেহ আ. নামায আদায়ের জন্যে দাঁড়িয়ে যান এবং নামায শেষে আল্লাহর নিকট তাদের আবদার পূরণ করার জন্য দোয়া করেন। আল্লাহ ওই পাথরকে ফেঁটে গিয়ে অনুরূপ গুণসম্পন্ন একটি উটনী বের করে দেওয়ার নির্দেশ দেন। যখন তারা স্বচক্ষে এরূপ উটনী দেখতে পেল, তখন তারা সত্যি সত্যি এক বিস্ময়কর বিষয়, ভীতিপ্রদ দৃশ্য, সুস্পষ্ট কুদরত ও চূড়ান্ত প্রমাণই প্রত্যক্ষ করল। এ দৃশ্য দেখার পর উপস্থিত বহু লোক ঈমান আনল বটে, কিন্তু অধিকাংশ লোকই তাদের কুফুরী, গুমরাহী ও বিরোধিতার উপর অটল থাকল।

এ জন্যেই কুরআনে বলা হয়েছে: فَظَلَمُوا بِهَا (তারা তার সাথে জুলুম করল) অর্থাৎ তাদের অধিকাংশই মানতে অস্বীকার করল এবং সত্যকে গ্রহণ করল না। যারা ঈমান এনেছিল, তাদের প্রধান ছিল জানদা ইবনে মুহাল্লাত ইবনে লবীদ ইবনে জুওয়াস। সে ছিল সামুদ সম্প্রদায়ের অন্যতম নেতা। সম্প্রদায়ের অবশিষ্ট শীর্ষ স্থানীয় ব্যক্তিবর্গও ইসলাম গ্রহণে উদ্যত হয়। কিন্তু তিন ব্যক্তি তাদেরকে তা থেকে বিরত রাখে। তারা হল (১) যাওয়াব ইবনে উমর ইবনে লবীদ (২) খাববাব। এ দুইজন ছিল তাদের ধর্মগুরু। (৩) রাবার ইবনে সামআর ইবনে জালমাস। জানদা ইসলাম গ্রহণ করার পর আপন চাচাত ভাই শিহাব ইবনে খলীফাকে ঈমান আনার জন্যে আহ্বান জানায়। সে-ও ছিল সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় লোক। তার ইসলাম গ্রহণ করার জন্যে মিহরাশ ইবনে গানামা ইবনে যুমায়ল নামক জনৈক মুসলমান কবি তাঁর কবিতায় বলেন:

"আমার পরিবারের একদল লোক শিহাবকে নবীর দীন কবুল করার জন্যে আহ্বান জানায়। এরা সকলেই সামুদ সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট লোক। শিহাবও সে আহ্বানে সাড়া দিতে আগ্রহী হয়। যদি সে সাড়া দিত তা হলে নবী সালেহ আ. আমাদের মাঝে বিপুল ক্ষমতার অধিকারী হয়ে যেত। জুওয়াব তার সঙ্গীর সাথে সুবিচার করে নি বরং হিজর উপত্যকার কতিপয় নির্বোধ লোক আলোর পথ দেখার পরেও মুখ ফিরিয়ে থাকে।"

উল্লেখ্য, হযরত সালেহ আ. যে তাদের বললেন: "এটি আল্লাহর উটনী, তোমাদের জন্যে নিদর্শন"। এখানে আল্লাহর উটনী শব্দটি বলা হয়েছে উটনীটির মর্যাদা নির্দেশের উদ্দেশ্যে। যেমন: বলা হয় আল্লাহর ঘর, আল্লাহর বান্দা, তোমাদের জন্যে নিদর্শন। অর্থাৎ আমি তোমাদের কাছে যে দাওয়াত নিয়ে এসেছি, এটা তার সত্যতার প্রমাণ। 'একে আল্লাহর জমিনে চরে খেয়ে বেড়াতে দাও এবং এর অনিষ্ট করো না। অন্যথায় এক নিকটবর্তী আযাব তোমাদেরকে পাকড়াও করবে।' এ ঘোষণার পর এ উটনীটি তাদের মধ্যে স্বাধীনভাবে যেখানে ইচ্ছা চরে বেড়াত। একদিন পর পর পানির ঘাটে অবতরণ করত। যেদিন সে পানি পান করত, সেদিন কূপের সমস্ত পানি নিঃশেষ করে ফেলত। তাই সম্প্রদায়ের লোকেরা তাদের পালার দিনে পরের দিনের জন্যে প্রয়োজনীয় পানি উত্তোলন করে রাখত। কথিত আছে, সম্প্রদায়ের লোকজন এ উটনীটির দুধ পর্যাপ্ত পরিমাণ পান করত।

(আমি এ উটনী পাঠিয়েছি তাদের পরীক্ষার জন্যে) পরীক্ষা ছিল, তারা কি এতে ঈমান আনে, না- কি কুফরী করে। আর প্রকৃতপক্ষে তারা কি করবে, তা আল্লাহই ভালো জানেন। (অতএব, তুমি তাদের আচরণের প্রতি লক্ষ রাখ।) এবং প্রতীক্ষায় থাক (এবং ধৈর্যধারণ কর) তাদের থেকে যে কষ্ট আসে তা সহ্য কর। অচিরেই তোমার নিকট সুস্পষ্ট খবর এসে পড়বে। সুতরাং কোরআনের অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে: (এবং তাদের জানিয়ে দাও, তাদের মধ্যে পানি বণ্টন নির্ধারিত এবং পানির অংশের জন্যে প্রত্যেকে উপস্থিত হবে পালাক্রমে। (সূরা কামার: ২৭-২৮)

দীর্ঘ দিন যাবত এ অবস্থা চলতে থাকায় সম্প্রদায়ের লোকেরা অধৈর্য হয়ে পড়ে। এর থেকে নিষ্কৃতি লাভের জন্যে তারা একদিন এক স্থানে সমবেত হয়ে পরামর্শ করে। তারা সম্মিলিতভাবে এই সিদ্ধান্ত করে, উটনীটিকে হত্যা করবে। ফলে তারা উটনীটির কবল থেকে নিষ্কৃতি পাবে এবং সমস্ত পানির উপর পূর্ণ কর্তৃত্ব তাদের প্রতিষ্ঠিত হবে। শয়তান তাদেরকে এ কাজের যুক্তি ও সুফল প্রদর্শন করল। আল্লাহ তাআলা বলেন: এরপর তারা সেই উটনীটি বধ করে এবং আল্লাহর আদেশ অমান্য করে এবং বলে: হে সালেহ, তুমি রাসূল হয়ে থাকলে আমাদেরকে যে ভয় দেখাচ্ছ, তা নিয়ে এসো। (সূরা আরাফ: ৭৭)

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 উটনী হত্যাকারী

📄 উটনী হত্যাকারী


যে লোক উটনী হত্যার দায়িত্ব গ্রহণ করে তার নাম কিদার ইবনে সালিফ ইবনে জানদা। সে ছিল সম্প্রদায়ের অন্যতম নেতা। সে ছিল গৌরবর্ণ, নীলচোখ ও পিঙ্গল চুল বিশিষ্ট। কথিত মতে সে ছিল সালিফ এর জারজ সন্তান। সায়বান নামক এক ব্যক্তির ঔরসে তার জন্ম হয়। কিদার একাই হত্যা করলেও যেহেতু সম্প্রদায়ের সকলের ঐকমত্যে কাজটি করেছিল তাই হত্যা করার দায়িত্ব সবার প্রতি আরোপিত হয়েছে।

ইবেন জারীর রহ. প্রমুখ মুফাসসির লিখেছেন: সামুদ সম্প্রদায়ের দুই মহিলা একজনের নাম সাদুক। সে মাহয়া ইবনে যুহায়র ইবনে মুখতারের কন্যা এবং প্রচুর ধন-সম্পদ ও বংশীয় গৌরবের অধিকারী। তার স্বামী ইসলাম গ্রহণ করে। ফলে স্ত্রী তাকে ত্যাগ করে এবং নিজের চাচাত ভাই মিসরা ইবনে মিহরাজ ইবনে মাহয়াকে বলে, যদি তুমি উটনীটি হত্যা করতে পার, তবে তোমাকে আমি বিবাহ করব। অপর মহিলাটি ছিল বৃদ্ধা এবং কাফির। তার স্বামী ছিল সম্প্রদায়ের অন্যতম সর্দার যুওয়াব ইবনে আমর। এই স্বামীর ঔরসে তার চারটি কন্যা ছিল। মহিলাটি কিদার ইবনে সালিফকে প্রস্তার দেয়, সে যদি উটনীটি হত্যা করতে পারে, তবে তার এ চার কন্যার মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা বিয়ে করতে পারবে। তখন ওই যুবকদ্বয় উটনী হত্যার দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং সম্প্রদায়ের লোকদের সমর্থন লাভের চেষ্টা চালায়। সে মতে অপর সাত ব্যক্তি তাদের ডাকে সাড়া দেয়। এভাবে তারা নয়জন ঐক্যবদ্ধ হয়। কোরআনে সে কথাই বলা হয়েছে: আর সেই শহরে ছিল এমন নয় ব্যক্তি, যারা দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করত এবং কোনো সৎকর্ম করত না। (সূরা নামল: ৪৮)

তারপর এ নয়জন গোটা সম্প্রদায়ের কাছে যায় এবং উটনী হত্যার উদ্যোগের কথা জানায়। এ ব্যাপারে সকলেই তাদেরকে সমর্থন করে। সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। এরপর তারা উটনীর সন্ধানে বের হয়। তারা দেখতে পেল, উটনীটি পানির ঘাট থেকে ফিরে আসছে। মিসরা আগে থেকে থেকে ওঁৎ পেতে বসে ছিল। সে একটা তীর তার দিকে ছুঁড়ে মারে। তীরটি উটনীর পায়ের গোছা ভেদ করে চলে যায়। এদিকে মহিলারা তাদের মুখমণ্ডল আবৃত করে গোটা কবিলার মধ্যে উটনী হত্যার কথা ছড়িয়ে তাদেরকে উৎসাহিত করতে থাকে। কিদার ইবনে সালিফ অগ্রসর হয়ে তলোয়ার দিয়ে আঘাত করে উটনীটির পায়ের গোছার রগ কেটে দেয়। সাথে সাথে উটনীটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে এবং বিকট শব্দে চিৎকার দিয়ে ওঠে। চিৎকারের মাধ্যমে সে তার পেটের বাচ্চাকে সতর্ক করে। কিদার পুনরায় বর্শা দিয়ে উটনীটির বুকে আঘাত করে এবং তাকে হত্যা করে। ওদিকে বাচ্চাটি একটি দুর্গম পাহাড়ে আরোহণ করে তিনবার ডাক দেয়।

আবদুর রাজ্জাক রহ. হাসান থেকে বর্ণিত সনদে বলেন: উটনীটির বাচ্চার ডাক ছিল, হে আমার রব! আমার মা কোথায়? এরপর সে একটি পাথরের মধ্যে প্রবেশ করে অদৃশ্য হয়ে যায়। কারো কারো মতে লোকজন ওই বাচ্চার পশ্চাদ্ধাবন করে তাকেও হত্যা করেছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন: এরপর তারা তাদের এক সঙ্গীকে আহ্বান করল এবং সে এসে উটনীটিকে ধরে হত্যা করল। দেখ, কি কঠোর ছিল আমার শাস্তিও সতর্কবাণী। (সূরা কামার: ২৯-৩০) অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন: 'ওদের মধ্যে যে সর্বাধিক হতভাগ্য, সে যখন তৎপর হয়ে উঠল। তখন আল্লাহর রাসূল বলল, আল্লাহর উটনী ও তার পানি পান করার বিষয়ে সাবধান হও।' অর্থাৎ তোমরা একে ভয় কর। কিন্তু তারা রাসূলকে অস্বীকার করল এবং উটনীটিকেও হত্যা করে ফেলল। "তাদের পাপের জন্যে তাদের প্রতিপালক তাদেরকে সমূলে ধ্বংস করে একাকার করে দিলেন এবং এর পরিণামের জন্য আল্লাহর আশঙ্কা করার কিছু নেই।" (সূরা শামস: ১২-১৫)

ইমাম আহমদ রহ. আবদুল্লাহ ইবনে নুমায়ের রহ. সূত্রে আবদুল্লাহ ইবনে যামআ রাযি. থেকে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার ভাষণ দিতে গিয়ে উটনী ও তার হত্যাকারীর প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছিলেন : "তাদের মধ্যে যে সর্বাধিক হতভাগা সে যখন তাৎপর হয়ে উঠল।" যে লোকটি তৎপর হয়েছিল, সে অত্যন্ত কঠিন, রূঢ় ও কওমের সর্দার। আবু যামআর মতো মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক লিখেছেন, ইয়াযীদ ইবনে মুহাম্মদ আম্মার ইবনে ইয়াসির রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: হে আলী! আমি কি তোমাকে মানব গোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় দুই হতভাগার কথা শুনাব? আলী রাযি, বললেন: বলুন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বললেন: একজন হল ছামূদ সম্প্রদায়ের সেই গৌরবর্ণ লোকটি, যে উটনী হত্যা করেছিল আর দ্বিতীয়জন হল সেই ব্যক্তি, যে তোমার এই স্থানে (অর্থাৎ মস্তকের পার্শ্বে) আঘাত করবে, যার ফলে এটা অর্থাৎ দাড়ি ভিজে যাবে। ইবনে আবু হাতিম রহ. এ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন।

হযরত সালেহ আ.-এর জাতি বলল : "হে সালিহ! তুমি রাসূল হয়ে থাকলে আমাদেরকে যার ভয় দেখাচ্ছ তা আনয়ন কর।" (সূরা আরাফ: ৭৭) এ উক্তির মধ্যে তারা কয়েকটি জঘন্য কুফরী কথা বলেছে। যথা: (১) আল্লাহ যে উটনী তাদের জন্যে নিদর্শনরূপে পাঠিয়েছেন, তাকে কোনো প্রকার কষ্ট দিতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছিলেন। তারা তাকে হত্যা করে আল্লাহ ও রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে। (২) আযাব আনয়নের জন্যে তারা অতি বেশি তাড়াহুড়া করে। এরপর দুই কারণে তারা সে আযাবে গ্রেফতার হয়। (ক) তাদের উপর আরোপিত শর্ত (এক) কোনোরূপ কষ্ট দিও না, অন্যথায় অতি শীঘ্রই আযাব তোমাদেরকে পাকড়াও করবে।)। অন্য এক আয়াতে আছে- ভয়াবহ আযাব, অন্য এক আয়াতে আছে- মর্মন্তুদ আযাব-এর প্রতিটিই যথার্থরূপে দেখা দেয়। (খ) আযাব তাড়াতাড়ি এনে দেওয়ার জন্য তাদের পীড়াপীড়ি করা। (৩) তারা তাদের নিকট প্রেরিত রাসূলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, অথচ তিনি তাঁর নবুয়তের দাবির সত্যতার পক্ষে চূড়ান্ত প্রমাণ দিয়েছেন। কিন্তু তাদের এ হীন মানসিকতা ও আযাবে গ্রেফতার হওয়ার যোগ্যতাই তাদেরকে ভ্রান্তি ও কুফুরী পথে যেতে এবং বিদ্বেষী হয়ে চলতে উদ্বুদ্ধ করে। আল্লাহ তাআলা বলেন: কিন্তু ওরা তাকে বধ করল। ফলে সালেহ বললেন, তোমরা তোমাদের বাড়িতে তিনদিন জীবন উপভোগ করে নাও। এ এমন একটি ওয়াদা, যা মিথ্যা হওয়ার নয়। (সূরা হূদ: ৬৫)

মুফাসসিরগণ লিখেছেন, উটনীটির উপর প্রথম যে ব্যক্তি হামলা করে তার নাম কিদার ইবনে সালিফ (তার প্রতি আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক)। প্রথম আঘাতেই উটনীটির পায়ের গোছা কেটে যায় এবং সে মাটিতে পড়ে যায়। এরপর অন্যরা দৌড়ে গিয়ে তরবারি দ্বারা কেটে উটনীটির দেহ খণ্ড-বিখণ্ড করে। উটনীটির সদ্য প্রসূত বাচ্চা এ অবস্থা দেখে দৌড়ে নিকটবর্তী এক পাহাড়ে গিয়ে ওঠে এবং তিনবার আওয়াজ দেয়। এ জন্য সালেহ আ. তাদের বললেন : (তোমরা তিনদিন পর্যন্ত তোমাদের ঘরবাড়িতে জীবন উপভোগ কর। অর্থাৎ ঘটনার ওইদিন বাদ দিয়ে পরবর্তী তিন দিন। কিন্তু এত কঠোর সতর্কবাণী শুনানো সত্ত্বেও তারা এ কথা বিশ্বাস করল না। বরং ওই রাতেই নবীকেও হত্যা করার ষড়যন্ত্র আঁটল এবং উটনীর মতো তাঁকেও খতম করার পরিকল্পনা করল। "তারা পরস্পরে বলল, আল্লাহর নামে কসম কর! আমরা সালেহ ও তাঁর পরিবারসহ লোকদের উপর রাত্রিবেলায় আক্রমণ চালাব।" অর্থাৎ আমরা তাঁর বাড়িতে হামলা করে সালেহকে তার পরিবার-পরিজনসহ হত্যা করব। পরে তার অভিভাবকরা যদি রক্তপণ চায়, তবে আমরা হত্যা করার কথা অস্বীকার করব। এ কথাই কোরআনে বলা হয়েছে: পরে তার অভিভাবককে বলব, আমরা তার পরিবারের হত্যা প্রত্যক্ষ করি নি।

ফন্ট সাইজ
15px
17px