📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 হযরত ছালেহ আ.-এর বংশ পরিচয়

📄 হযরত ছালেহ আ.-এর বংশ পরিচয়


ওলামায়ে কেরাম হযরত সালেহ আ.-এর বংশ পরিচয় বর্ণনায় একাধিক মত পেশ করেছেন। হাফেযে হাদিস ইমাম বাগাবি রহ. তাঁর বংশ পরিচয় বর্ণনা করেছেন: "সালেহ ইবনে ওবাইদ ইবনে আসেক ইবনে মাশেহ ইবনে উবাইদ ইবনে হাদের ইবনে সামুদ"। বিখ্যাত তাবেয়ি হযরত ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ বলেছেন: সালেহ ইবনে ওবাইদ ইবনে জাবের ইবনে সামুদ।

বাগাবি রহ. কালক্রমের হিসেবে ওহাব রহ.-এর চেয়ে অনেক পরবর্তীকালের লোক। ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ তাওরাতের বড় আলেমও বটে। তবুও হযরত সালেহ আ. থেকে সামুদ পর্যন্ত যে সমস্ত যোগসূত্র বাগাবি রহ, বলছেন, নসব সম্বন্ধীয় আলেমদের কাছে তা-ই ঐতিহাসিক দিক দিয়ে প্রবল এবং সত্যসংলগ্ন। এই নসবনামা হতে পরিষ্কার হয়ে যায়, সেই কওমটিকে- যার মধ্যে হযরত সালেহ আ.ও একজন, সামুদ এ জন্য বলা হয়, সেই বংশের আদি পুরুষের নাম সামুদ এবং এ কওম বা গোত্র তার সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত। সামুদ হতে হযরত নূহ আ. পর্যন্ত নসবনামা সম্বন্ধে একাধিক মত রয়েছে। (১) সামুদ ইবনে আমের ইবনে এরাম ইবনে সাম ইবনে নূহ আ. (২) সামুদ ইবনে আদ ইবনে আওছ ইবনে এরাম ইবনে সাম ইবনে নূহ আ.।

সাইয়েদ মাহমুদ আলুসি রহ. তাফসিরে রূহুল মাআনিতে (৯/১৪২) বলেন: 'ইমাম সালাবি দ্বিতীয় মতটিকে প্রবল মনে করেন।' যা হোক। দুনো রেওয়ায়েতের ভিত্তিতে প্রমাণিত হয়, সামুদ সম্প্রদায়ও সামের বংশধরগণের একটি শাখা। এবং নিশ্চিত করেই বলা যায়, এরাই সে সমস্ত লোক, যারা ১ম আদ সম্প্রদায় বিধ্বস্ত হওয়ার কালে হযরত হুদ আ.-এর সঙ্গে রক্ষা পেয়েছিল এবং এ বংশই দ্বিতীয় আদ নামে পরিচিত। আর নিঃসন্দেহে এ কওমই "আরবে বায়েদাহ" বা বিধ্বস্ত আরব বংশ এর অন্তর্গত।

সামুদ একটি ইতিহাস প্রসিদ্ধ জাতি। তাদের পূর্ব-পুরুষ 'সামুদ' এর নামানুসারে এ জাতির নামকরণ করা হয়েছে। সামুদের এক ভাই ছিল জুদায়স। তারা উভয়ে আবির ইবনে ইরাম ইবনে সাম ইবনে নূহ-এর পুত্র। এরা ছিল আরবে আরিবা তথা আদি আরব সম্প্রদায়ের লোক। হিজায ও তাবুকের মধ্যবর্তী 'হিজর' নামক স্থানে তারা বসবাস করত। তাবুক যুদ্ধে যাওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ পথ দিয়ে অতিক্রম করেছিলেন। এর বর্ণনা পরে আসছে। আদ জাতির পর সামুদ জাতির অভ্যুদয় ঘটে। তাদের মতো এরাও মূর্তিপূজা করত। এদের মধ্য থেকে আল্লাহ তাঁর এক বান্দা সালেহ আ. কে রাসূলরূপে প্রেরণ করেন। তাঁর বংশ তালিকা হচ্ছে: 'সালেহ ইবনে আবদ ইবনে মাসিহ ইবনে উবায়দা ইবনে হাজির ইবনে সামুদ ইবনে আবির ইবনে ইরাম ইবনে সাম ইবনে নূহ আ.। তিনি তাদেরকে এক আল্লাহর ইবাদত করতে, তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক না করতে এবং মূর্তিপূজা ও শিরক বর্জনের নির্দেশ দেন। ফলে কিছুসংখ্যক লোক তাঁর প্রতি ঈমান আনে। কিন্তু অধিকাংশ লোকই কুফরিতে লিপ্ত থাকে এবং কথায়-কাজে তাঁকে কষ্ট দেয়। এমনকি একপর্যায়ে তাঁকে হত্যা করতেও উদ্যত হয়। তারা নবীর সেই উটনীটিকে হত্যা করে ফেলে, যা আল্লাহ তাআলা নবুওয়াতের প্রমাণস্বরূপ প্রেরণ করেছিলেন।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 সামুদ গোত্রের বস্তিসমূহ

📄 সামুদ গোত্রের বস্তিসমূহ


কওমে সামুদ কোথায় বাস করত এবং ভূ-পৃষ্ঠের কোন অংশে ছড়িয়ে পড়েছিল, এ সম্পর্কে মীমাংসিত কথা হলো, তাদের বসতিগুলো 'হিজর' নামক স্থানে অবস্থিত ছিল। হেজায ও সিরিয়ার মধ্যস্থলে ওয়াদিউল কোরা পর্যন্ত যেই প্রান্তরটি দেখা যায়, এই সমুদয়ই তাদের বাসস্থান ছিল। বর্তমানে ফাজজুন-নাকাহ নামে প্রসিদ্ধ। কওমে সামুদের বসতিসমূহের ধ্বংসাবশেষ এবং এর চিহ্নসমূহ আজও দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। এ কালেও কোনো কোনো মিসরীয় তত্ত্বজ্ঞানীরা তা স্বচক্ষে দর্শন করেছেন। তাঁদের বর্ণনা মতে, তাঁরা এমন একটি বাড়িতে প্রবেশ করেছিলেন, যাকে 'শাহি হাবিলি' অর্থাৎ রাজপ্রসাদ বলা হতো। তাতে বহু কামরা রয়েছে। প্রাসাদের সঙ্গে একটি বিরাট হাউজ রয়েছে। গোটা বাড়িটি পাহাড় কেটে নির্মিত।

আরবের বিখ্যাত ঐতিহাসিক মাসউদি লিখেছেন: যারা সিরিয়া থেকে হেজাযে আগমন করেন, রাস্তায় কওমে সামুদের বিধ্বস্ত বসতিসমূহের ভগ্নাবশেষ এবং তার পুরাতন চিহ্নসমূহ তাদের দৃষ্টিগোচর হয়। হিজরের এ স্থানটি- যা হিজরে সামুদ বলে পরিচিত- মাদায়েন শহর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে এমনভাবে অবস্থিত, 'আকাবা' উপসাগর তার সম্মুখে পড়ে। আদ সম্প্রদায়কে যেমন 'আদে এরাম' বলা হয়েছে, (এমনকি কোরআন মাজিদ তো 'এরাম' শব্দটিকে তাদের স্বতন্ত্র বিশেষণ বানিয়ে দিয়েছে।) তেমনি আদে এরামের ধ্বংসের পরবর্তী সম্প্রদায়কে 'সামুদেদ-এরাম' বা দ্বিতীয় আদ বলা হচ্ছে।

প্রাচ্যবিদগণ (পাশ্চাত্যের সে সমস্ত জ্ঞানীবৃন্দ যারা প্রাচ্যের জ্ঞানবিজ্ঞান ও ইতিহাস সম্বন্ধে গবেষণা করে থাকেন) প্রাচ্য বিশেষত আরব সম্বন্ধে যেমন নিজেদের ঐতিহাসিক জ্ঞানের গভীরতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে গিয়ে তত্ত্বজ্ঞানের নামে ভুল বিবরণ পরিবেশনে অভ্যস্ত, তদ্রুপ তারা সামুদ সম্প্রদায়কেও নিজেদের অনুশীলনীর শ্লেট বানিয়েছে। তাদের প্রশ্ন হলো সামুদের মূল কী এবং কোথায়? তাদের আবির্ভাব কখন এবং কোন যুগে হয়েছে? এ প্রশ্নের উত্তরে তারা দুই দলে বিভক্ত হয়েছে। একদল বলে, এরা ইহুদিদের একটি সম্প্রদায় ছিল, যারা ফিলিস্তিনে প্রবেশ করে নি।

ঐতিহাসিকরা এ কথায় একমত, সামুদ সম্প্রদায়ের লোকেরা জনবসতি থেকে বের হয়ে যাওয়ার আগেই ধ্বংস হয়ে গেছে। তাদের সমূলে ধংবস করে দেওয়া হয়েছিল। কোরআন মাজিদ পরিষ্কার ভাষায় বর্ণনা করছে: যখন মূসা আ. কে ফেরাউন ও তার কওম অবিশ্বাস করল, তখন ফেরাউনের বংশের একজন মুমিন ব্যক্তি এ কথা বলে নিজ কওমকে ভয় প্রদর্শন করেছিল, 'তোমাদের এই মিথ্যাচারিতার পরিণাম যেন এমন না হয়, যা তোমাদের পূর্বে নূহ আ. আদ ও সামুদের এবং তাদের পরবর্তী সম্প্রদায়সমূহের নিজ পয়গম্বরদের সঙ্গে মিথ্যাচারিতার কারণে হয়েছিল।'

ঐতিহাসিকদের এক দল বলেন, সামুদ সম্প্রদায় ছিল আমালেকা সম্প্রদায়ের একটি শাখা। তারা ফোরাতের পশ্চিম তীরের বসতি ত্যাগ করে এখানে এসে বসতি স্থাপন করেছিল। তাদের মধ্যে কারো কারো ধারণা, এরা সেই আমালেকা সম্প্রাদায়ের একটি দল, যাদেরকে মিসরের বাদশাহ আহমাস তৎকালে মিসর হতে বের করে দিয়েছিল। যেহেতু মিসরে অবস্থানকালে তারা পাথর কেটে গৃহনির্মাণ শিল্প আয়ত্ত করেছিল। তাই হিজর নামক স্থানে গমন করে পাহাড় ও পাথরসমূহ কেটে কেটে তারা অনুপম প্রাসাদসমূহ নির্মাণ করল এবং সাধারণ প্রচলিত নিয়মেও বিরাট অট্টালিকা নির্মাণ করল।

কিন্তু আমরা আদ সম্প্রদায়ের ঘটনায় প্রমাণ করে এসেছি, আদ ও সামুদ উভয় সম্প্রদায়ই সামের আওলাদভুক্ত। আরবরা ইহুদিদের ভুল অনুসরণে এদেরকে আমালেকা সম্প্রদায়ভুক্ত বলে ফেলে। অথচ আমলিক ইবনে উদ্দের সঙ্গে এ বংশের কোনো সম্পর্কই পাওয়া যায় না। অতএব এরূপ বলাও ঠিক নয়। এ সমস্ত মতের বিপরীত প্রকৃত তত্ত্বজ্ঞানীদের মতে, এরা হুদ আ.-এর কালে বিধ্বস্ত সম্প্রদায়েরই অবশিষ্ট লোক। যারা হযরত হূদ আ.-এর সাথে হাযরা মাউতবাসীদের দাবি, সামুদ সম্প্রদায়ের বসতি ও অট্টালিকাগুলো আদ সম্প্রদায়ের কারিগরি ও শিল্পবিদ্যার উৎকর্ষতার ফল। সামুদ সম্প্রদায় অট্টালিকা নির্মাণ শিল্পে বিশেষ দক্ষ ও পারদর্শী ছিল এবং তাদের কালের এই অট্টালিকগুলি তাদের নিজেদেরই নির্মিত এ দাবির বিপরীত নয়। কেননা প্রথম আদ ও দ্বিতীয় আদ সর্বাবস্থায় আদই বটে। হযরত সালেহ আ: নিজ কওমাকে এরূপ সম্বোধন করাও তা-ই প্রমাণ করে:

"আর স্মরণ কর, আল্লাহ পাক যখন আদ জাতির পর তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করলেন এবং তোমাদেরকে যমিনে আবাস দিলেন। তোমরা তার সমতল ভূমিতে প্রাসাদ নির্মাণ করছ এবং পাহাড় কেটে বাড়ি বাড়ি বানাচ্ছ। সুতরাং তোমরা আল্লাহর নেয়ামতসমূহকে স্মরণ কর এবং যমিনে ফাসাদকারীরূপে ঘুরে বেড়িয়ো না।" (সূরা আরাফ: ৭৪)

বাকি রইল সামুদ সম্প্রদায়ের যুগ সম্বন্ধীয় বিষয়টি। এ সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো সময়ের কথা বলা যায় না। কেননা ইতিহাস এ সম্বন্ধে কোনো স্থির সিদ্ধান্তে আসতে পারে নি। অবশ্য এ কথা নিশ্চিতরূপে বলা যেতে পারে, এদের যুগ হযরত ইবরাহীম আ.-এর পূর্বেকার যুগ। এরা এ মহান মর্যাদার অধিকারী পয়গম্বরের নবুয়তের বহু পূর্বে ধ্বংসপ্রাপ্তা হয়েছিল। এটাও লক্ষণীয়, সামুদ সম্প্রদায়ের বসতিগুলোর কাছে এমন কতগুলো কবর দেখা যায়, যার উপর 'আরমি' ভাষায় লিখিত ফলক সংযোজিত রয়েছে। সেই ফলকসমূহে যে তারিখ খোদিত রয়েছে, তা হযরত ঈসা আ.-এর জন্মের পূর্বের। অতএব এতে এই ভুল ধারণা জন্মে, এ সম্প্রদায়টি হযরত মূসা আ.-এর পরে অস্তিত্ব লাভ করেছে। অথচ ব্যাপারটি এরূপ নয়।

এগুলো আসলে ওই সমস্ত লোকের কবর, যারা এ কওম ধ্বংস হওয়ার হাজার হাজার বছর পরে অবলীলাক্রমে এখানে বসতি করেছিল। তারা স্বীয় পূর্বপুরুষদের প্রাচীনতার নিদর্শন প্রকাশ করার উদ্দেশ্য 'আরামী' অক্ষরে (যা বহু প্রাচীন যুগের প্রচলিত অক্ষর) নিজেদের ফলকসমূহে লিখে লাগিয়ে দিয়েছিল। যেন প্রাচীনকালের স্মৃতি রক্ষিত থাকে। অন্যথায় সেই কবরগুলি সামুদ সম্প্রদায়েরও নয় এবং তাদের যুগও এটা ছিল না।

মিসরের ঐতিহাসিক 'জোর্জিযায়দান' রচিত "আল-আরব কাবলাল ইসলাম” গ্রন্থে প্রায় অনুরূপ লিখেছেন: "কবরসমূহের নামফলক পাঠ করলে যা-কিছু প্রকাশ পায়, তা হলো- সালেহ আ.-এর কওমের বসতিসমূহ ঈসা আ.-এর জন্মের কিছুকাল আগে নাবতীদের ক্ষমতাধীন হয়ে গিয়েছিল। এরা 'বাতরা' নামক স্থানের অধিবাসীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। (সামনে তাদের আলোচনা আসবে।) তাদের বসতির চিহ্ন ও টিলাসমূহ প্রাচ্যবিদ্যায় আগ্রহী বহু ইউরোপীয় ঐতিহাসিক স্বচক্ষে দেখেছেন। সামুদ সম্প্রদায়ের পরিচয়পত্র তারা পাঠ করেছেন, যা পাথরসমূহের ওপর খোদিত ছিল। তন্মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধিক গুরুত্বপূর্ণ সেই প্রাসাদের ভগ্নাবশেষগুলো, যা কেলআত ও বুরজ নামে নামস্কৃত। এ সব যা কিছু লেখা হয়েছে, তা নাবতি অক্ষরে লিখিত। এগুলোর কোনো কোনোটি কিংবা সবগুলোতে সেই লেখাই বিদ্যমান, যা বিভিন্ন কবরের উপরে লিখিত বা খোদিত রয়েছে।"

প্রাচ্যবিদ ঐতিহাসিকগণ এখানে যা কিছু পেয়েছেন, তন্মধ্যে একটি কবরফলক নাবতী অক্ষরে পাথরে খোদিত হযরত ঈসা আ.-এর জন্মের পূর্বেকার লেখা। বাক্যগুলোর অর্থ হলো : "মকবারা কুমকুম বিনতে ওয়ায়েলাহ বিনতে হারাম"। কুমকুমের মেয়ে, কালিবা নিজের ও নিজের সন্তানের জন্য নির্মাণ করিয়েছে। এর নির্মাণকাজ মোবারক মাসে শুরু করা হয়েছে। এটা নাবতিদের বাদশা হারেসের সিংহাসন আরোহণের নবম বর্ষ। তিনি সেই হারেস, যিনি নিজ গোত্রের প্রতি সত্যিকারের মহব্বত রাখেন। লাত মানাত আমান্দ ও কায়সের লানত তার প্রতি, যে এ কবরগুলো বিক্রয় করবে। বা দায়বদ্ধ রাখবে। কিংবা তা হতে কোনো দেহ বা অঙ্গ বের করবে কিংবা এখানে কুমকুম, কালিবা বা তার কন্যা কিংবা তার সন্তানদের ছাড়া অন্য কাউকে দাফন করবে। আর যে ব্যক্তিই এর উপর লিখিত বিষয়ের বিপরীত করবে, তার উপর 'যুশ শরা, হোবাল ও মানাতের পাঁচটি লানত হোক। আর যে যাদুকর এর বিপরীত করে তার ওপর এক হাজার হাবসি দিরহাম জরিমানা ওয়াজিব হবে। কিন্তু যদি তার হাতে কুমকুম, কালিবা বা তার আওলাদের মধ্য হতে কারো হাতের লিপিকা থাকে, যাতে এ অনাত্মীয় কবরের জন্য পরিষ্কার ও স্পষ্ট কথায় অনুমতি বিদ্যমান থাকে এবং আসল হয়, নকল না হয় (তবে এ জরিমানা ওয়াজিব হবে না)। এ সমাধিস্থান ওয়াহবুল্লাহ ইবনে উবায়দা নির্মাণ করেন।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 আল্লাহ তাআলার উটনী

📄 আল্লাহ তাআলার উটনী


হযরত সালেহ আ. বারবার তাঁর কওমকে বুঝাতে থাকলেন। তাঁর নসিহত কওমের ওপর কোনোই ক্রিয়া করল না। বরং তাদের শত্রুতা ও বিরোধিতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধিই পেতে থাকল। তারা কোনো প্রকারেই মূর্তিপূজা থেকে হতে বিরত হলো না। যদিও দুর্বল ও নগণ্য একটি দল ঈমান আনয়ন করল এবং মুসলমান হলো, কিন্তু কওমের নেতৃস্থানীয় বড় বড় লোকেরা আগের মতো মূর্তিপূজার ওপরই অবিচল রইল। তারা খোদাপ্রদত্ত সর্বপ্রকারের স্বচ্ছলতা ও শান্তির শোকরগুযারি করার বদলে নেয়ামতের না- শোকরি করাকে নিজেদের অভ্যাসে পরিণত করে নিল। তারা হযরত সালেহ আ.-কে বিদ্রুপ করে বলত, আমরা যদি ধর্মে অবিশ্বাসীই হতাম এবং পছন্দনীয় পন্থার উপর প্রতিষ্ঠিত না হতাম, তবে আমরা এত প্রচুর ধন-সম্পদ, সবুজ-শ্যামল বাগানসমূহ, সোনা-রূপার প্রাচুর্য, সুউচ্চ ও সুদৃঢ় আলিশান অট্টালিকা ও নহরসমূহ এবং উত্তম নানা জাতীয় সুস্বাদু ফলমূলসমূহ, মিঠাপানির নহর এবং উত্তম চারণভূমিসমূহ পেতাম না। তুমি তোমার নিজেকে এবং তোমার অনুসারীদের দেখ! এরপর তাদের সঙ্কীর্ণ ও দারিদ্র্যপূর্ণ অবস্থার প্রতি লক্ষ কর। এবং বল, আল্লাহর প্রিয় ও মকবুল কারা! আমরা না তোমরা?

হযরত সালেহ আ. বলতেন, তোমরা নিজেদের এই আরাম ও আনন্দময় জীবিকার সাজসরঞ্জামের জন্য গর্ব প্রকাশ করো না। আল্লাহ পাকের সত্য রাসূল এবং তাঁর সত্য ধর্মের সঙ্গে বিদ্রুপ করো না। যদি তোমাদের গর্ব, অহঙ্কার ও বিরোধিতার অবস্থা এরূপই থাকে, তবে এক নিমিষে এর সবকিছুই বিলীন হয়ে যাবে। এরপর তোমরাও থাকবে না এবং তোমাদের এ সমস্ত সাজ-সরঞ্জামও থাকবে না। নিঃসন্দেহে এই সমস্তই আল্লাহ পাকের নেয়ামত। যে ব্যক্তি এ সমস্ত নেয়ামত পেয়েও আল্লাহর শোকর আদায় করে না, তাঁর ইবাদত করে না, নিঃসন্দেহে এগুলোই তার জন্য আযাব ও লানতের কারণ হয়ে যায়। যদি এ নেয়ামত প্রাপ্তিতে গর্ব ও অহঙ্কার করা হয়। সুতরাং এরূপ মনে করা নিতান্ত ভুল, প্রত্যেক আনন্দময় জীবিকার সরঞ্জাম আল্লাহ পাকের খুশি থাকার ফল।

কওমে সামুদ এ ভাবনায় পেরেশান ছিল, এটা কীভাবে সম্ভব, আমাদেরই মধ্যকার একজন লোক আল্লাহ তাআলার পয়গম্বর হবেন! সে আল্লাহর আহকাম শুনাতে আরম্ভ করবেন? তারা অত্যন্ত বিস্ময়ের সাথে বলত : "আমরা বিদ্যমান থাকতে কি এ লোকটির ওপর আল্লাহর উপদেশগ্রন্থ নাযিল হয়?" অর্থাৎ মানুষকেই যদি নবী করা হতো, তবে এর যোগ্য ছিলাম আমরা, সালেহ নয়। আবার কোনো কোনো সময় নিজেদের কওমের দুর্বল লোকদেরকে যারা মুসলমান হয়েছিল, তাদের লক্ষ্য করে বলত: "সত্যই কি তোমরা বিশ্বাস কর, নিঃসন্দেহে সালেহ তাঁর রবের প্রেরিত রাসূল?" আর মুসলমানগণ উত্তর করত, নিঃসন্দেহে আমরা তাঁর আনীত পয়গামের ওপর বিশ্বাস রাখি। তখন সেই অহঙ্কারী নেতারা ক্রোধান্বিত হয়ে বলত: "নিঃসন্দেহে আমরা তো ওই বস্তুকে অবিশ্বাস করছি, যার উপর তোমরা ঈমান আনয়ন করেছ।"

হযরত সালেহ আ.-এর কওম তাঁর নবীসূলভ তাবলিগ ও নসিহতকে মেনে নিতে অস্বীকার করল। তারা তাঁর কাছে আল্লাহ পাকের মেজেযা (কুদরতি নিদর্শন) দাবি করল। সালেহ আ. আল্লাহ পাকের দরবারে দোয়া করলেন। দোয়া কবুল হওয়ার পর তিনি কওমকে বললেন, তোমাদের দাবিকৃত নিদর্শন (মোজেযা) উষ্ট্রীর আকারে এই যে উপস্থিত। যদি তোমরা এই উষ্ট্রীকে কোনো প্রকার কষ্ট প্রদান কর, তবে এটাই তোমাদের ধ্বংসের আলামত বলে সাব্যস্ত হবে। আল্লাহ তাআলা তোমাদের ও উষ্ট্রীটির মধ্যে কূপের পানির জন্য পালা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। একদিন তোমাদের, একদিন উটনীর। এর ব্যতিক্রম যেন না হয়।

কোরআন মাজিদে এটিকে نَاقَةُ اللهِ (আল্লাহর উটনী) বলা হয়েছে। যেন তাদের স্মরণে থাকে, এমনি তো সমস্ত মাখলুকই আল্লাহ তাআলার অধীন; কিন্তু ছামুদ সম্প্রদায় যেহেতু এটিকে আল্লাহ পাকের একটি নিদর্শনস্বরূপ দাবি করেছিল। তাই এর বর্তমান বৈশিষ্ট্য এবং মর্যাদা একে "নাকাতুল্লাহ" নামে ভূষিত করল।

কোরআন মাজিদ থেকে এ প্রসঙ্গে শুধু দুটি বিষয় প্রমাণিত হয়। প্রথমত সামুদ সম্প্রদায় হযরত সালেহ আ.-এর কাছে নিদর্শন-মোজেযা চেয়েছিল। হযরত সালেহ আ. ‘উটনী'টিকে মোজেযা স্বরূপ পেশ করলেন। দ্বিতীয়ত, হযরত সালেহ আ. কওমকে বলে দিয়েছিলেন, তারা যেন উটনীটির কোনো ক্ষতি না করে। আর তাদের ও উটনীটির পানি পানের পালা নির্ধারণ করে দেন। একদিন উটনীর, একদিন কওমের। যদি তারা উটনীটির কোনো ক্ষতি করে, তবে তাই হবে কওমের ধ্বংস হওয়ার সূচনা ও নিদর্শন। কিন্তু তারা উটনীটি হত্যা করল। এবং আল্লাহর আযাব দ্বারা নিজেরাও ধ্বংস হলো।

এ ঘটনা সম্পর্কে এর চেয়ে অতিরিক্ত যা কিছু রয়েছে, তার ভিত্তি হয়তো ওই সমস্ত হাদিসের ওপর, যা “খবরে ওয়াহেদ” বা বাইবেল ও প্রাচীন ইতিহাসের রেওয়ায়েতগুলোর ওপর। যতটুকু বিবরণ 'খবরে ওয়াহিদগুলো থেকে পাওয়া যায়, মুহাদ্দিসিনের মতে তার কোনো কোনোটি সহি, কোনো কোনোটি দুর্বল হাদিস। এ কারণে হাফেয ইমাদুদ্দীন ইবনে কাসির সূরা আরাফের তাফসিরে 'নাকাতুল্লাহ' অস্তিত্বপ্রাপ্ত হওয়া সম্বন্ধীয় রেওয়ায়াতগুলোকে সনদ রেওয়ায়েত করার নিয়ম অনুযায়ী উদ্ধৃত করেন নি। বরং একটি ঐতিহাসিক ঘটনারূপে লিপিবদ্ধ করেছেন।

ঘটনাটির বিস্তৃত বিবরণ হলো- হযরত সালেহ আ. যখন ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন, তখন নেতৃস্থানীয়রা কওমের লোকদের সামনে হযরত সালেহ আ.-এর কাছে দাবি করল- হে সালেহ! যদি তুমি বাস্তবিকই আল্লাহর প্রেরিত রাসূল হও, তবে কোনো নিদর্শন দেখাও! যাতে আমরা তোমার সত্যতা বিশ্বাস করতে পারি। হযরত সালেহ আ. বললেন: এমন যেন না হয়, নিদর্শন আসার পরেও অবিশ্বাসের উপরই হঠকারিতা এবং অবাধ্যাচরণ করতে থাক। কওমের নেতারা দৃঢ়তার সঙ্গে ওয়াদা করল, নিদর্শন আসলে আমরা তৎক্ষণাৎ ঈমান আনব। হযরত সালেহ আ. তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কী নিদর্শন চাও। তারা দাবি করল, সামনের এ পাহাড় থেকে একটি উষ্ট্রী বের কর, যা গর্ভবতী হবে এবং এক্ষুনি বাচ্চা প্রসব করবে। হযরত সালেহ আ. আল্লাহ পাকের দরবারে দোয়া করলেন। তৎক্ষণাৎ পাহাড় থেকে সবার সামনে একটি গর্ভবতী উষ্ট্রী প্রকাশিত হলো এবং সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চা প্রসব করল। এ দেখে নেতৃবৃন্দের মধ্য হতে জোন্দো ইবনে আমর তো তখনই ইসলাম গ্রহণ করেন। অন্যান্য নেতারাও তাঁর অনুসরণে ইসলাম গ্রহণের ইচ্ছা করেন। তখন মূর্তিপূজারী অন্য সরদাররা তাদের বিরত রাখে। এরূপে তারা অন্যদেরও ইসলাম গ্রহণ করতে নিষেধ করে।

এখন হযরত সালেহ আ. কওমের সকল লোকদের সতর্ক করে বললেন, দেখ! এ নিদর্শন তোমাদের দাবির প্রেক্ষিতে প্রেরিত হয়েছে। আল্লাহ পাকের সিদ্ধান্ত হলো, কূপের পানি পান করার জন্য পালা নির্ধারিত হোক। একদিন এ উষ্ট্রীটির আর একদিন তোমাদের ও তোমাদের প্রাণীদের। কিন্তু সাবধান! উষ্ট্রীটি যেন কোনো কষ্ট না পায়। যদি তাকে কোনো কষ্ট দেওয়া হয়, তবে তোমাদেরও মঙ্গল নেই। কওম যদিও এই বিস্ময়কর মোজেযা দেখেও ঈমান আনল না, কিন্তু মনে মনে একে মোজেযা বলেই স্বীকার করেছিল। তাই একে কষ্ট প্রদান করা থেকে বিরত রইল। অনন্তর এ প্রথাই চালু রইল, পানি পান করার পালা একদিন উষ্ট্রীটির থাকত আর সমুদয় কওমের লোকেরা এর দুগ্ধ দ্বারা উপকৃত হত। দ্বিতীয় দিবসে কওমের পালা হতো। এই উষ্ট্রীটি ও এর বাচ্চা নির্বিঘ্নে চারণভূমিতে চরে বেড়াত এবং তৃপ্তি লাভ করত। কিন্তু ক্রমে ক্রমে এটাও তাদের অন্তরে বাধতে লাগল।

তাদের মধ্যে পরামর্শ হতে লাগল, উষ্ট্রীটিকে খতম করে দেওয়া হোক। তা হলে এই পালার ব্যাপারটির অবসান ঘটবে এবং আমরা ঝামেলামুক্ত হবো। কেননা আমাদের পশুগুলোর জন্য এবং আমাদের নিজেদের জন্য এই শর্তটি অসহনীয়। এরূপ কথাবার্তা চলছিল ঠিক, কিন্তু কেউই উষ্ট্রীটিকে হত্যা করতে সাহস পাচ্ছিল না।

যে লোক উটনী হত্যার দায়িত্ব গ্রহণ করে তার নাম কিদার ইবনে সালিফ ইবনে জানদা। সে ছিল সম্প্রদায়ের অন্যতম নেতা। সে ছিল গৌরবর্ণ, নীল চোখ ও পিঙ্গল চুল বিশিষ্ট। কথিত আছে, কিদার ছিল সালিফের যারজ সন্তান। সায়বান নামক এক ব্যক্তির ঔরসে তার জন্ম হয়। ইবনে জারির ও প্রমুখ মুফাসসির লিখেছেন: সামুদ সম্প্রদায়ের দুই মহিলা- এক জনের নাম সাদুকা। সে মাহইয়া ইবনে যুহায়ের ইবনে মুখতারের কন্যা। মহিলা ছিল প্রচুর ধন-সম্পদ ও বংশীয় গৌরবের অধিকারী। তার স্বামী ইসলাম গ্রহণ করে। ফলে স্ত্রী তাকে ত্যাগ করে এবং নিজের চাচাতো ভাই মিসরা ইবনে মিহরাজ ইবনে মাহইয়াকে বলল, যদি তুমি উটনীটি হত্যা করতে পার, আমি তোমাকে বিবাহ করব।

অপর মহিলার নাম উনায়যা বিনতে গুনায়েম ইবনে মিজলায়। তাকে উম্মে উসমান নামে ডাকা হতো। মহিলা ছিল বৃদ্ধা ও কাফের। তার স্বামী ছিল সম্প্রদায়ের অন্যতম সরদার যুওয়াব ইবনে আমর। এই স্বামীর ঔরসে তার ৪টি মেয়ে ছিল। মহিলাটি কিদার ইবনে সালিফকে প্রস্তাব দিল, সে যদি উটনীটি হত্যা করতে পারে তবে তার এ চার কন্যার মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছে বিয়ে করতে পারবে। তখন এ দুই যুবক (কিদার ও মিসরা) উটনী হত্যার দায়িত্ব গ্রহণ করে। স্থির হলো, তারা পথে ওঁৎপেতে বসে থাকবে। উটনীটি চারণভূমির দিকে গমনকালে উভয়ে আক্রমণ করবে। অন্যরা তাদের সাহায্য করবে।

পুরা কাজটা তারা চক্রান্ত মোতাবেক করল। ষড়যন্ত্র করে উটনীটিকে হত্যা করে ফেলল। এরপর পরস্পর শপথ করল, রাত হলে আমরা সবাই মিলে সালেহ ও তাঁর পরিবারের সকলকেও হত্যা করে ফেলব। এরপর তার স্বজন-বন্ধুদের শপথ করে বিশ্বাস করাব, এটা আমাদের কাজ না। উটনীর বাচ্চাটি মায়ের হত্যাকাণ্ড দেখে পালিয়ে পাহাড়ে আরোহণ করল। এবং চিৎকার করতে করতে অদৃশ্য হয়ে গেল।

হযরত সালেহ আ. এ সংবাদ পেয়ে আফসুসের সঙ্গে কওমকে সম্বোধন করে বললেন, পরিশেষে তা-ই হলো, যা আমি আশঙ্কা করেছিলাম। এখন তোমরা আল্লাহ তাআলার আযাবের অপেক্ষা করতে থাক। যা তিন দিন পরে তোমাদের নিপাত করে দেবে। এরপর বিদ্যুতের চমক ও বজ্রধ্বনির আযাব এসে এক রাতেই সবাইকে ধ্বংস করে দিল এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির সবক দিয়ে গেল।

এ ঘটনার সঙ্গে ইবনে কাসির রহ. কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করেছেন। যেমন: তাবুক যুদ্ধের সময় হুযুরে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হিজর নামক স্থানে পৌঁছলেন, তখন সাহাবায়ে কেরাম কওমে সামুদের কূপ থেকে পানি নিয়ে তা দ্বারা আটা গুলে রুটি তৈরি করতে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা জানতে পেয়ে পানি ফেলে দিতে, হাড়ি পাতিলগুলো উপুড় করে ফেলতে এবং আটাগুলি অনুপযুক্ত করে দিতে আদেশ করলেন। আর বললেন, এটা সেই জনপদ, যার উপর আল্লাহ তাআলার আযাব নাযিল হয়েছিল। এখানে অবস্থানও করো না। এখানকার কোনো বস্তু কাজেও লাগিও না। সম্মুখে অগ্রসর হয়ে শিবির স্থাপন কর। পাছে না তোমরাও কোনো বিপদে আক্রান্ত হয়ে পড়।

অন্য রেওয়ায়েতে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: তোমরা এ হিজরের বসতিগুলোতে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করে বিনয়-নম্রতার সঙ্গে রোদন করতে করতে প্রবেশ করো। নচেৎ এসব বসতিতে প্রবেশই করো না। পাছে না তোমরাও নিজেদের অসর্তকতার দরুন আযাবে পতিত হয়ে যাও।

অন্য হাদিসে আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হিজর নামক স্থানে প্রবেশ করলেন, তখন বললেন: আল্লাহ তাআলার কাছে নিদর্শন চেয়ো না। দেখ! সালেহ আ.-এর কওম নিদর্শন দাবি করেছিল। এবং সেই উটনীটি এখানকার পাহাড়ের গুহা থেকে বের হয়ে নিজের পালার দিন পানাহার করে সেখানেই চলে যেত। আর যেদিন তার পালার দিন হতো, সেদিন সামুদ সম্প্রদায়কে নিজের দুগ্ধ দ্বারা পরিতৃপ্ত করত। কিন্তু সামুদ গোত্র পরিশেষে নাফরমানি করল। তারা উটনীটির পায়ের গোছা কেটে হত্যা করে ফেলল। ফলে আল্লাহ পাক তাদের ওপর বিকট ধ্বনির আযাব চাপিয়ে দিলেন। এ আযাবের ফলে তারা নিজ নিজ ঘরের মধ্যেই মরে পড়ে রইল। কেবল আবু রাগাল নামক এক ব্যক্তি অবশিষ্ট রইল। সে হারাম শরিফে গিয়েছিল। কিন্তু যখনই সে হারামের সীমানা হতে বের হল, তখনই সেই আযাবের শিকার হলো। হাফেয ইবনে কাসির রহ. এ রেওয়ায়েত তিনটি সনদের সঙ্গে মুসনাদে আহমাদ থেকে নকল করে এগুলোকে নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাস্য বলেছেন।

এ বিস্তারিত বিবরণের সারমর্ম হলো, কোরআন মাজিদ থেকে তো নিশ্চিত প্রমাণিত হলো, 'নাকাতুল্লাহ' (আল্লাহ তাআলার উষ্ট্রী) আল্লাহ পাকের একটি নিদর্শন ছিল। সেটি নিজের মধ্যে অবশ্যই এমন কোনো বৈশিষ্ট্য ধারণ করত যার কারণে তাকে আল্লাহর নিদর্শন বলা যেতে পারে। কোরআন মাজিদ যাকে এরূপ গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করছে- "এই নাকাতুল্লাহ তোমাদের জন্য নিদর্শন।" এরপর পানি পান করার পালা যেভাবে উটনী ও কওমে সামুদের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন, তা স্বয়ং স্বতন্ত্র একটি প্রমাণ, এ উটনীটি এমন বিশেষত্ব ধারণ করত, যা আল্লাহর নিদর্শন নামে আখ্যায়িত হওয়ার যোগ্য। কিন্তু এর অস্তিত্ব কিরূপ হলো? কী কারণে তা আল্লাহর নিদর্শন ও নবীর মোজেযা হলো, কোরআন মাজিদে তার কোনো উল্লেখ নেই।

অবশ্য বিভিন্ন সহি 'খবর ওয়াহেদ' দ্বারা এ ব্যাপারটির ওপর আলোকপাত হচ্ছে। যার বিবরণ ইবনে কাসির থেকে ওপরে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু ঘটনাটির বিস্তৃত বিবরণ সেখানেও পরিষ্কার বর্ণিত হয় নি। বরং তাফসিরের কিতাবসমূহে ইসরাইলি রেওয়ায়েত থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে কিংবা হাদিসের দুর্বল রেওয়ায়েত থেকে গৃহীত হয়েছে।

সুতরাং ঘটনাটির মোটামুটি বিবরণ ও বিস্তৃত বিবরণের মধ্যে মর্যাদার পার্থক্যের প্রতি অবশ্যই খেয়াল রাখা উচিত। যে পরিমাণ ঘটনা কোরআন মাজিদ স্পষ্ট বর্ণনা করেছে কোনো প্রকার ব্যাখ্যা না করে এর প্রতি বিশ্বাস রাখা ওয়াজিব। আর সহি হাদিসে (তা খবরে ওয়াহেদই হোক না কেন) বর্ণিত উক্ত মোটামুটি বিবরণের যে পরিমাণ বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়, তা মোটামুটি কথার বিস্তারিত বিবরণ হিসাবে গ্রহণীয়। যদিও তা কোরআন মাজিদের বর্ণনার স্তরে পৌঁছতে পারে না। এর চেয়ে অধিক অবশিষ্ট বিস্তারিত বিবরণের মর্যাদা তা-ই, যা সাধারণ ঐতিহাসিক ঘটনা ও ইসরাইলি রেওয়ায়েতসমূহের মর্যাদা। এছাড়া একে "তোমাদের জন্য নিদর্শন" বলে বুঝানো হয়েছে, এই নিদর্শনটিতে বিশেষ কোনো গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু হতভাগ্য কওমে সামুদ বেশি সময় পর্যন্ত একে বরদাশত করতে পারল না। তারা সেটিকে হত্যা করে ফেলল।

আল্লাহ তাআলা কোরআন শরিফে জুদী পাহাড়ের উল্লেখ করেছেন। সে কি বিরাট পাহাড়! দজলার পাশে জাজিরা ইবনে উমরের পূর্ব অংশে এর অবস্থান। মাওসিলের কাছে দক্ষিণ থেকে উত্তরে তার দৈর্ঘ্য হলো, তিন দিনের পথ আর উচ্চতা আধা দিনের পথ। সবুজ বর্ণ। পাহাড়টি ওক জাতীয় গাছে পরিপূর্ণ। তার পাশে আছে একটি গ্রাম। নাম করিআতুস সামানিন (৮০ জনের গ্রাম)। একাধিক মুফাসসিরের মতে তা নূহ আ. এর সাথে মুক্তিপ্রাপ্ত লোকজনের আবাসস্থল ছিল। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 সামুদ জাতির প্রতি তাদের নবীর উপদেশ

📄 সামুদ জাতির প্রতি তাদের নবীর উপদেশ


এখন সামুদ জাতির অবস্থা ও তাদের ঘটনা বর্ণনা করা আমাদের উদ্দেশ্য। অর্থাৎ তাদের নবী হযরত সালেহ আ. কে এবং যারা তাঁর উপর ঈমান এনেছিল, তাদেরকে কীভাবে আযাব থেকে বাঁচিয়ে রাখলেন আর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণকারী, অত্যাচারী কাফেরদের কীভাবে নির্মূল করেছিলেন, এখন তা বর্ণনা করা হবে। পূর্বেই বলা হয়েছে, সামুদ সম্প্রদায় জাতিতে ছিল আরব। আদ সম্প্রদায়ের ধ্বংস হওয়ার পর সামুদ সম্প্রদায়ের আবির্ভাব হয়। তারা তাদের অবস্থা থেকে কোনো শিক্ষা গ্রহণ করে নি। এ কারণে তাদের নবী তাদের বলেছিলেন:

হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের আর কোনো ইলাহ নেই। তোমাদের নিকট তোমাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে স্পষ্ট নিদর্শন এসেছে। আল্লাহর এই উটনী তোমাদের জন্যে একটি নিদর্শন। একে আল্লাহর জমিনে চরে খেতে দাও এবং একে কোনো কষ্ট দিও না, দিলে কঠিন শাস্তি তোমাদের উপর আপতিত হবে। স্মরণ কর, আদ জাতির পর তিনি তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছেন, তিনি তোমাদেরকে পৃথিবীতে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তোমরা সমতল ভূমিতে প্রাসাদ ও পাহাড় কেটে বাসগৃহ নির্মাণ করছ। সুতরাং আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় ঘটিয়ো না। (সূরা আরাফ : ৭৩-৭৪)

অর্থাৎ আদ জাতিকে ধ্বংস করে তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করার উদ্দেশ্য হল, তাদের ঘটনা থেকে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে এবং তারা যে সব অন্যায় আচরণ করত, তোমরা তা করবে না। এ জমিন তোমাদের আয়ত্তাধীন করে দেওয়া হয়েছে। তাই এর সমতলভূমিতে তোমরা অট্টালিকা নির্মাণ করছ আর পাহাড় কেটে সুনিপুণভাবে তাতে ঘরবাড়ি তৈরি করছ। অতএব এর অনিবার্য দাবি হিসেবে এসব নিয়ামতের শোকর আদায় কর, সৎকর্মে তৎপর থাক, একনিষ্ঠভাবে এক আল্লাহর বন্দেগী কর, যাঁর কোনো শরীক নেই। তাঁর নাফরমানী ও দাসত্ব থেকে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে সাবধান থাক। কেননা এর পরিণতি খুবই জঘন্য। হযরত সালেহ আ. তাঁর কওমকে বললেন: তোমাদেরকে কি এ জগতের ভোগ-বিলাসের মধ্যে নিরাপদে রেখে দেওয়া হবে? উদ্যানসমূহের মধ্যে ও ঝরনাসমূহের মধ্যে? শস্যক্ষেত্রের মধ্যে ও মঞ্জুরিত খেজুর বাগানের মধ্যে? (সূরা শুআরা: ১৪৬-১৪৮) তোমরা পাহাড় কেটে জাঁকজমকপূর্ণ ঘরবাড়ি নির্মাণ করছ। সুতরাং আল্লাহকে ভয় কর ও আমার আনুগত্য কর এবং সীমালঙ্ঘনকারীদের আদেশ মান্য করো না; যারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে এবং শান্তি স্থাপন করে না। (সূরা শুআরা: ১৪১-১৪২) হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর দাসত্ব কবুল কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের আর কোনো ইলাহ নেই। তিনিই তোমাদেরকে যমীন থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার মধ্যেই বসবাস করার সুবিধা দিয়েছেন। অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং যমীন থেকে উদ্ভাবন করেছেন। তারপর তোমাদেরকেই যমীনের আবাদকারী বানিয়েছেন। অর্থাৎ পৃথিবীর যাবতীয় শস্য এবং ফল-ফলাদি তোমাদেরকে প্রদান করেছেন। এভাবে তিনিই তোমাদের সৃষ্টিকারী ও রিযিকদাতা। সুতরাং ইবাদত পাওয়ার হকদার একমাত্র তিনিই, অন্য কেউ নয়। অতএব তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর ও তওবা কর। অর্থাৎ তোমাদের বর্তমান কর্মনীতি পরিহার করে তার ইবাদতের দিকে ধাবিত হও! তোমাদের ইবাদত-ইসতিগফার কবুল করবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিবেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px